📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 প্রথম স্তর ও তাতে অর্ন্তভুক্ত বিষয় সমূহ।

📄 প্রথম স্তর ও তাতে অর্ন্তভুক্ত বিষয় সমূহ।


তাকদীরের প্রতি ঈমানের প্রথম স্তর হচ্ছে, অন্তর দিয়ে এই বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা'আলা তার সকল সৃষ্টি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত আছেন। আরো বিশ্বাস করা যে, বান্দারা যেসব আমল করে থাকে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর চিরন্তন ও অবিনশ্বর ইলম দ্বারা আগে থেকেই অবগত আছেন। সর্বদাই তিনি এই বিশেষণে বিশেষিত। অর্থাৎ মাখলুক সৃষ্টি করার আগেও তিনি এই গুণে গুণান্বিত ছিলেন, এখনো তা দ্বারা বিশেষিত আছেন এবং আবাদুল আবাদ এই বিশেষণে বিশেষিত থাকবেন। এই কথা বিশ্বাস করাও তাকদীরের প্রথম স্তরের অন্তর্ভুক্ত যে, তিনি বান্দাদের সকল অবস্থা যেমন তাদের সকল প্রকার সৎ আমল, পাপাচার, রিযিক, বয়স ইত্যাদি সবকিছুই জানেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির তাকদীর সমূহ লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন। তিনি সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে কলমকে আদেশ করলেন যে, লিখো। কলম বলল: কী লিখবো? আল্লাহ তা'আলা বললেন: কিয়ামাত পর্যন্ত যা কিছু হবে, সবই লিখো。
সুতরাং মানুষের জন্য যা হবার, তা হবেই। আর যা তার জন্য ঘটার নয়, তা ঘটবেই না। কলমের কালি শুকিয়ে গেছে এবং দফতর গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنْ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنْ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
"তুমি কি জান না, আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেক জিনিসই আল্লাহ জানেন? সবকিছু একটি কিতাবে লিখিত আছে। আল্লাহর জন্য এটা মোটেই কঠিন নয়”। (সূরা হজ্জ ২২:৭০) আল্লাহ তা'আলা সূরা হাদীদের ২২ নং আয়াতে আরো বলেন:
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن تَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
"পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের উপর যেসব মসিবত আসে তার একটিও এমন নয় যে, তাকে আমি সৃষ্টি করার পূর্বে একটি গ্রন্থে লিখে রাখিনি। এমনটি করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ"। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইলমের অনুগামী এই তাকদীর বিভিন্ন স্থানে লিখা হয়। একই সময় একসাথে লিখা এবং বিভিন্ন সময় আলাদাভাবেও লিখা হয়ে থাকে。
আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেছেন, লাওহে মাফুযে তাই লিখে রেখেছেন। আর যখন মাতৃগর্ভে শিশুর দৈহিক আকৃতি দান করেন, তখন তাতে রূহ ফুকে দেয়ার পূর্বে তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠান এবং ফেরেশতাকে চারটি কথা লিখে দেয়ার আদেশ করা হয়। তাকে বলা হয়, (১) রিযিক লিখে দাও, (২) তার বয়স লিখে দাও, (৩) সে কী আমল করবে তা লিখে দাও এবং (৪) হতভাগ্য হবে না সৌভাগ্যবান হবে? তাও লিখে দাও। অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ও লিখার আদেশ করা হয়。
পূর্বকালের কাদারীয়াদের মধ্য হতে যারা তাকদীরকে অস্বীকার করায় সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ি করেছিল, তারা তাকদীরের এই স্তরকে অস্বীকার করতো। তবে বর্তমানে তাতে অবিশ্বীদের সংখ্যা খুবই কম。
الأزل দ্বারা অতীতের এমন প্রাচীনত্ব, পূর্ববর্তীতা, অগ্রগামীতা, অগ্রবর্তীতা ও চিরন্তনতা বুঝানো হয়েছে, যার কোন শুরু নেই। আর الأبد দ্বারা ভবিষ্যতে এমন অবিনশ্বরতা, চিরন্তনতা, স্থায়িত্ব এবং টিকে থাকা বুঝানো হয়েছে, যার কোন শেষ নেই। الطاعات শব্দটি لطاعة এর বহুবচন।
শারীয়াতের আদেশ মেনে নেওয়াকে الطاعة (আনুগত্য) বলা হয়。
আর শারীয়াতের আদেশের বিরোধীতা করাকে المعصية (পাপাচার) বলা হয়। المعاصي শব্দটি المعصية এর বহুবচন। الأرزاق শব্দটি رزق (রিযিক) এর বহুবচন। মানুষের জন্য যা উপকারী হয়, তাই রিযিক। الأجل শব্দটি الأجل।-এর বহুবচন। কোন বস্তুর কিংবা কাজের সময়সীমাকে আজাল বলা হয়। মানুষের আজাল বলতে মৃত্যুর মাধ্যমে তার দুনিয়ার জীবনে বয়সের পরিসমাপ্তি বুঝায়。
লাওহে মাহফুয অর্থ হচ্ছে أم الكتاب 'মূল কিতাব'। মাহফুয অর্থ সংরক্ষিত। উহাতে কোন কিছু বাড়ানো কিংবা উহা থেকে কোন কিছু কমানো হতে এই কিতাবকে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে。
ঈমান বিল কাদারের স্তর দু'টির মধ্য হতে প্রথম স্তরটি যেসব বিষয়কে শামিল করে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে ঐসব বিষয় উল্লেখ করেছেন। মোট কথা তাকদীরের প্রথম স্তর দু'টি জিনিস বা স্তরকে শামিল করে।
প্রথম স্তর: আল্লাহ তা'আলার ইলম বিশেষণে বিশ্বাস করা, যা অস্তিত্বশীল কিংবা অস্তিত্বহীন সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে। এই ইলম আল্লাহ তা'আলার ঐ সমস্ত সিফাতে যাতীয়া বা সত্তাগত বিশেষণসমূহের মধ্যে গণ্য, যার মাধ্যমে তিনি সর্বদাই বিশেষিত। বান্দার ভাল-মন্দ আমলগুলো সম্পর্কে তিনি অবগত, তাদের রিযিক, বয়স ইত্যাদি সকল অবস্থা সম্পর্কেও তিনি অবগত。
দ্বিতীয় স্তর: তাকদীরের দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে লিখার স্তর। আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুযে সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত যত মাখলুক সৃষ্টি হবে তাদের সকলের সমস্ত অবস্থা, হায়াত-রিযিক, আমল, পরিণতি-পরিণাম ইত্যাদি সবকিছুই লিখে রেখেছেন。
সুতরাং সৃষ্টিজগতে যা কিছু হবে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আগে থেকেই অবগত আছেন এবং তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উপরোক্ত স্তর দু'টির পক্ষে কুরআন সুন্নাহর দলীল পেশ করেছেন। সুন্নাতের দলীলগুলো থেকে শাইখ এ ব্যাপারে একটি হাদীসের অর্থ উল্লেখ করেছেন。
হাদীসের শব্দগুলো ইমাম আবু দাউদ স্বীয় সুনানে উবাদাহ বিন সামেত হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি রসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি,
«أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ فَقَالَ: لَهُ اكْتُبْ َوقَالَ: وَمَا أَكْتُبُ قَالَ: اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ»
"আল্লাহ্ তা'আলা কলম সৃষ্টি করে সর্বপ্রথম তাকে বললেন: লিখো। কলম বলল: হে আমার প্রতিপালক! কী লিখবো? আল্লাহ্ বললেন: কিয়ামাত পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো"।৬৪
এই হাদীস তাকদীর লিখার স্তর সাব্যস্ত করে। সেই সাথে আরো প্রমাণ করে যে, সবকিছুই লিখা রয়েছে।
:فَأَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْقَلَمَ قَالَ لَهُ: اكْتُبْ এখানে أول এবং القلم শব্দ দু'টিকে এই হিসাবে নসব (যবর) দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এখানে মোট বাক্য একটিই। তখন বাক্যটি হবে এ রকম : أول ما خلق الله القلم قال له اكتب (কলম সৃষ্টি করে আল্লাহ কলমকে আদেশ করলেন: তুমি লিখো)। এর অর্থ হলো কলম সৃষ্টির সময় কলমের প্রতি প্রথম আদেশ ছিল, তুমি লিখো。
أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ اول এবং القلم শব্দ দু'টিকে রফা (পেশ) দিয়েও বর্ণনা করা হয়েছে। তখন মোট বাক্য হবে দু'টি। তখন প্রথম বাক্যটি হবে الْقَلَ مُ (সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলা কলম সৃষ্টি করেছেন)। আর দ্বিতীয় বাক্যটি হবে : قَلَ لَهُ اكتب (কলমকে আদেশ করলেন: তুমি লিখো)। সবগুলো শব্দ মিলে তখন হাদীসের অর্থ হবে, সৃষ্টিজগতের সর্বপ্রথম সৃষ্টি হচ্ছে কলম।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: فَمَا أَصَابَ الْإِنْسَانَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَهُ وَمَا أَخْطَأَهُ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَهُ جَفْتِ الْأَقْلَامُ وَطُويَتِ الصحف সুতরাং মানুষের জন্য যা হবার, তা হবেই। আর যা তার জন্য ঘটার নয়, তা ঘটবেই না। কলমের কালি শুকিয়ে গেছে এবং দফতর গুটিয়ে নেয়া হয়েছে:
الصحف সুতরাং মানুষের জন্য যা হবার, তা হবেই, এটি হাদীসের রাবী উবাদাহ ইবনে সামেতের উক্তি। অর্থাৎ মানুষ কল্যাণকর যেসব বিষয় অর্জন করে এবং ক্ষতিকর যেসব বিষয়ের সম্মুখীন হয়, তা তার জন্য নির্ধারিত। তা অবশ্যই তার জন্য অর্জিত হবে। কখনো তার বিপরীত হবে না।
جَفْتِ الْأَقْلَامُ وَطُويَتِ الصُّحُفُ কলমের কালি শুকিয়ে গেছে এবং দফতর গুটিয়ে নেয়া হয়েছে: এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পূর্বেই সবকিছু নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তা লিখে শেষ করা হয়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এর হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে এখানে সে কথাই বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে,
رفعتتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ যা কিছু নির্ধারণ করা হয়েছে, তা লিখার পর কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং লিখার পর কলমের কালি শুকিয়ে গেছে। ৬৫ ইমাম তিরমিযী এই হাদীস বর্ণনা করেছেন。
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া কুরআনের দলীলগুলো উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
"তুমি কি জান না, আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই আল্লাহ জানেন? সবকিছু একটি কিতাবে লিখা আছে। আল্লাহর জন্য এটা একদম সহজ"। (সূরা হজ্জ ২২:৭০)
এখানে জানার জন্য প্রশ্ন করা হয়নি; বরং আসমান-যমীনের সবকিছু সম্পর্কে আল্লাহর ইলম সাব্যস্ত করার জন্যই প্রশ্নটি করা হয়েছে। অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! তুমি অবশ্যই অবগত আছো যে, আল্লাহ তা'আলা আসমান-যমীনের সবকিছু সম্পর্কে অবগত আছেন। এতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান উর্ধ ও নিম্ন জগতের সবকিছুকেই পরিবেষ্টন করে আছে। তাকদীরের এই স্তর হলো আল্লাহ তা'আলার ইলমের সম্পর্কে।
إن ذلك নিশ্চয়ই উহা, অর্থাৎ আসমান ও যমীনে যা আছে, তা আল্লাহ তা'আলার অবগতিতে একটি কিতাবের মধ্যেই রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নিকট যেই মূল কিতাব রয়েছে, তাতে সবই লিখা রয়েছে। এটি হচ্ছে তাকদীর লিখার স্তর।
إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ আল্লাহর জন্য এটা একদম সহজ: অর্থাৎ জ্ঞানের মাধ্যমে আসমান-যমীনের সবকিছুকে পরিবেষ্টন করা এবং তা লিখে রাখা আল্লাহ তা'আলার জন্য মোটেই কঠিন নয়।
উপরের আয়াতে কারীমা থেকে জানা গেল, সবকিছু সম্পর্কে আল্লাহর ইলম রয়েছে এবং তা হওয়ার পূর্বেই লাওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তাকদীরের প্রথম স্তরটি এই বিষয় দু'টিকেই শামিল করে।
শাইখ সূরা হাদীদের ২২ নং আয়াত থেকেও দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ আয়াতে আরো বলেন: مَّا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّنْ قَبْلِ أَن تَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ
"পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের উপর যেসব মসিবত আসে তার একটিও এমন নয় যে, তাকে আমি সৃষ্টি করার পূর্বে বিশেষ একটি কিতাবে লিখে রাখিনি। এমনটি করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ"।
অর্থাৎ যমীনে যেই অনাবৃষ্টি, ফসলের ঘাটতি, ফলফলাদির কমতি দেখা দেয়, তোমাদের শরীরে যেই ব্যথা, রোগ-ব্যাধি এবং জীবনোপকরণে যেই সংকীর্ণতা অনুভব করো, তা বিশেষ একটি কিতাবে লিখা রয়েছে। অর্থাৎ লাওহে মাহফুযে তা লিখিত আকারে রয়েছে।
مِّنْ قَبْلِ أَن تَبْرَأَهَا সৃষ্টি করার পূর্বে: অর্থাৎ সৃষ্টি করার আগেই আমি প্রত্যেক জিনিসকে লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছি। আল্লাহর জন্য উহা একদম সহজ। অর্থাৎ মাখলুকের সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক হওয়া সত্ত্বেও সেগুলো লাওহে মাহফুযে লিখে রাখা আল্লাহ তা'আলার জন্য একেবারেই সহজ।
এই আয়াতে কারীমাতেও উর্ধ্ব ও নিম্নগতের ঘটনাবলী সংঘটিত হওয়ার আগেই লাওহে মাহফুযে লিখে রাখার দলীল পাওয়া যায়। এর দ্বারা আরো বুঝা যায় যে, লিখার পূর্বেই উক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান রয়েছে। সুতরাং আয়াতটি তাকদীরের দু'টি স্তর অর্থাৎ আল্লাহর ইলম এবং সে অনুযায়ী সবকিছু লিখে রাখার অন্যতম একটি দলীল।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইঙ্গিত করেছেন যে, তাকদীর দুই প্রকার।
(১) সাধারণ তাকদীর, যা প্রত্যেক সৃষ্টিকেই একসাথে শামিল করে নিয়েছে। এটি হচ্ছে সেই তাকদীর, যা দলীল-প্রমাণসহ একটু পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। লাওহে মাহফুযে এই প্রকার তাকদীর লিখা আছে।
(২) খাস (নির্দিষ্ট) তাকদীর। সাধারণ তাকদীরের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও শ্রেণী বিন্যাসই হলো খাস তাকদীর। খাস তাকদীর আবার তিন প্রকার: (ক) তাকদীরে উমুরী (تقدير عمري) তথা পুরো জীবনের তাকদীর (খ) তাকদীরে হাওলী (تقدیر حولي) তথা একবছরের তাকদীর এবং (গ) তাকদীরে ইয়াওমী (تقدير يومي) তথা দৈনন্দিন তাকদীর।
وَهَذَا التَّقْدِيرُ التَّابِعُ لِعِلْمِهِ سُبْحَانَهُ يَكُونُ فِي : আল্লাহ তা'আলার ইলমের অনুগামী এই তাকদীর ه المَوَاضِعَ جُمْلَةً وَتَفْصِيلًا
বিভিন্ন স্থানে লিখা হয়। একই সময় একসাথে লিখা এবং বিভিন্ন সময় আলাদাভাবেও লিখা হয়। সমস্ত মাখলুকের তাকদীর একসাথে একই সময় লাওহে মাহফুযে লিখা হয়েছে। এই আম তাকদীরকে আবার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে ভাগ ভাগ করেও লিখা হয়। আর সেই স্থান ও সময়গুলো হচ্ছে:
১। তাকদীরে উমুরী এবং উহা লিখার স্থান ও সময়: যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের হাদীসে এসেছে, মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই শিশুর উপর যে চারটি বাক্য লিখে দেয়া হয়, উহাই হচ্ছে তাকদীরে উমুরী। লিখে দেয়া হয় তার রিযিক, তার বয়স, তার আমল এবং তার হতভাগ্য হওয়া কিংবা সৌভাগ্যবান হওয়ার কথা।
২। তাকদীরে হাওলী এবং উহা লিখার সময়: লাইলাতুল কদরে বাৎসরিক তাকদীর লিখিত হয়। তাতে পুরো বছরের সকল বিষয় একসাথে লিখা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ أَمْرًا مِنْ عِنْدِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ) "আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা হয় আমার আদেশক্রমে। আমিই প্রেরণকারী"। (সূরা দুখান ৪৪:৩-৫)
৩। তাকদীরে ইয়াওমী: হায়াত, মওত, সম্মান, অপমান ইত্যাদি আরো যা প্রতিদিন নির্ধারণ করা হয়, তাই দৈন্দিন তাকদীর। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: كُلِّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ "তিনি প্রতিদিন কোন না কোন মহানকার্যে রত আছেন” (সূরা আর্-রহমান ৫৫:২৯)।
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
(إن الله خلق لوحا محفوظا من درة بيضاء دفتاه من ياقوتة حمراء قلمه نور وكتابته نور وعرضه ما بين السماء والأرض، ينظر في كل يوم ثلاثمائة وستين نظرة، يحيى ويميت ويعز ويذل ويفعل ما يشاء. فكذلك قوله سبحانه: { كُلِّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ} رواه عبد الرزاق وابن المنذر والطبراني والحاكم [رواه الحاكم ( 474/2) و (519) - وصححه - وابن جرير الطبري ( 135/27) وأبو الشيخ في (العظمة) (492/2) والبيهقي في (الأسماء والصفات) (828)].
আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের মধ্য হতে অন্যতম একটি সৃষ্টি হচ্ছে লাওহে মাহফুয। সাদা মুক্তা দিয়ে তিনি এটি তৈরী করেছেন। তার উভয় পার্শ্ব তৈরী করা হয়েছে লাল রঙ্গের হিরা দিয়ে। কলমটি হচ্ছে নূরের তৈরী, কালিও নূরের। উহার প্রশস্ততা হচ্ছে আসমান-যমীনের মধ্যকার প্রশস্ততার সমপরিমাণ। আল্লাহ্ তা'আলা তাতে দৈনিক তিনশ ষাট বার দৃষ্টি দেন। প্রত্যেকবার দৃষ্টি দেয়ার সময় কাউকে জীবিত রাখেন (কোন না কোন বস্তু সৃষ্টি করেন), কারো মৃত্যু ঘটান, কাউকে সম্মানিত করেন, কাউকে অপমানিত করেন এবং তিনি যা চান তাই করেন। এটিই হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার এই বাণী: كُلِّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنِ “তিনি প্রতিদিন কোন না কোন মহান কার্যে রত আছেন", এর মর্মার্থ (সূরা আর-রাহমান: ২৯)।৬৬ ইমাম আব্দুর রায্যাক, ইবনুল মুনযির, তাবারানী এবং হাকেম এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।
তাকদীর অস্বীকার করার ক্ষেত্রে পূর্বযুগের কাদারীয়া সম্প্রদায়ের যেসব লোক সীমালংঘন করেছে, তারা উপরোক্ত আম ও খাস উভয় প্রকার তাকদীরকে অস্বীকার করেছে। সৃষ্টিজগতে যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়, তা ঘটার পূর্বে সেগুলো সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ইলম বা অবগতিকে তারা অস্বীকার করে। লাওহে মাহফুযে এবং অন্যান্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা যা কিছু পূর্বেই লিখে রেখেছেন, তারা তাও অস্বীকার করেছে।
তারা আরো বলে থাকে, আল্লাহ তা'আলা আদেশ করেছেন এবং নিষেধ করেছেন। কিন্তু কারা সেই আদেশ মানবে, কারা সেই নিষেধ থেকে বিরত থাকবে, আদেশ বা নিষেধ বাস্তবায়ন হওয়ার পূর্বে আল্লাহ তা'আলা তা জানেন না। (নাউযুবিল্লাহ) তাদের মতে "الأمر أنف আল্লাহর কাছে সকল বিষয়ই নতুন"। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার ইলম ও তাকদীরে আগে থেকে কিছুই নির্ধারিত নয়। যারা এই কথা বলেছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ তাদেরকে কাফের ফতোয়া দিয়েছে। তবে সীমা লংঘনকারী এই ফির্কার লোকেরা বিলুপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের মাযহাবও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাই শাইখুল ইসলাম বলেন: منكروه اليوم قلیل বর্তমানে আল্লাহর ইলমকে অস্বীকার কারীর সংখ্যা খুবই কম।
কাদারীয়াদের যেই ফির্কা এখনো রয়েছে, তারা আল্লাহর ইলমকে স্বীকার করে। তবে বান্দারা যেসব কাজ-কর্ম করে, তাদের মতে সেগুলো তাকদীরের মধ্যে শামিল নয়। এই ফির্কার লোকেরা মনে করে বান্দার কর্ম বান্দা নিজেই সৃষ্টি করে, আল্লাহ তা'আলা উহা সৃষ্টি করেননি এবং সৃষ্টি করার ইচ্ছাও করেননি। সামনে এ বিষয়ে আরো বিবরণ আসছে।

টিকাঃ
৬৪. সহীহ: আবু দাউদ ৪৭০০, তিরমিযী ২১৫৫, সুনানুল কুবরা বাইহাকী ২০৮৭৫।
৬৫. সহীহ: তিরমিযী ২৫১৬, মুসনাদে আহমাদ ২৬৬৯।
৬৬. সহীহ: মুস্তাদরকে হাকিম ৩৯১৭

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 তাকদীরের দ্বিতীয় স্তর ও সংশ্লিষ্ট বিষয়।

📄 তাকদীরের দ্বিতীয় স্তর ও সংশ্লিষ্ট বিষয়।


তাকদীরেরর প্রতি ঈমান আনয়নের দ্বিতীয় স্তর বলতে আল্লাহ তা'আলার ঐ ইচ্ছাকে বুঝায়, যা প্রত্যেক জিনিসের উপরই বাস্তবায়ন হয় এবং তাঁর ঐ সার্বভৌম ক্ষমতাকে বুঝায়, যা সকল বস্তুর উপর পরিব্যাপ্ত।
সুতরাং এই বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তাই হয়। তিনি যা ইচ্ছা করেন না, তা কখনো সংঘটিত হয় না। আরো বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইচ্ছা ব্যতীত আসমান ও যমীনের কোন কিছুই নড়াচড়া করে না কিংবা স্থির হয় না এবং তাঁর রাজ্যের মধ্যে তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই সংঘটিত হয় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অস্তিত্বশীল এবং অস্থিত্বহীন সকল বস্তুর উপরই ক্ষমতাবান। আসমান ও যমীনে যত মাখলুক রয়েছে, তার সবগুলোর স্রষ্টাই একমাত্র আল্লাহ। তিনি ছাড়া আর কোন স্রষ্টা নেই, তিনি ব্যতীত অন্য কোন রবও নেই।
ব্যাখ্যা: এখানে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া তাকদীরের প্রতি ঈমানের তৃতীয় এবং চতুর্থ স্তর বর্ণনা করেছেন। তৃতীয় স্তরের প্রতি তিনি এই বলে ইঙ্গিত করেছেন যে, উহা হলো আল্লাহ তা'আলার ঐ ইচ্ছা, যা অবশ্যই কার্যকর হয় এবং তাঁর ঐ সার্বভৌম ক্ষমতাকে বুঝায়, যা সকল বস্তুর উপর পরিব্যাপ্ত। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা অবশ্যই বাস্তবায়ন হয়। তা কেউ প্রতিহত করতে পারে না। আল্লাহ তা'আলার সার্বভৌম ক্ষমতা বলতে সেই ক্ষমতাকে বুঝায়, যা অস্তিত্বশীল ও অস্তিত্বহীন সকল বস্তুর উপরই বিদ্যমান।
وَهُوَ الْإِيْمَانُ : তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়নের এই স্তরের অর্থ হলো এই বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি ও নির্ধারণ করতে চান, তাই সৃষ্টি ও নির্ধারণ হয়। আর যা তিনি সৃষ্টি ও নির্ধারণ করার ইচ্ছা করেন না, তা কখনো সৃষ্টি ও নির্ধারণ হয়না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইচ্ছা ব্যতীত আসমান ও যমীনের কোন কিছুই নড়াচড়া করে না কিংবা স্থির হয় না: অর্থাৎ তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত উপরোক্ত বিষয়গুলোর কোন একটিও সংঘটিত হয়না।
তাঁর রাজ্যের মধ্যে তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই সংঘটিত হয় না: অর্থাৎ তাঁর সৃষ্টিগত ও নির্ধারণগত ইচ্ছার বাইরে কোন কিছুই সংঘটিত হয় না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অস্তিত্বশীল এবং অস্থিত্বহীন সকল বস্তুর উপরই ক্ষমতাবান: কেননা আল্লাহ তা'আলা অনেক আয়াতে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। অস্তিত্বশীল এবং অস্তিত্বহীন সকল বস্তুই এই ব্যাপকতার অধীন। অর্থাৎ তিনি অস্তিত্বশীলকে বিলীন করে দিতে এবং অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্বে আনয়ন করতে সক্ষম।
فَمَا مِنْ مَخْلُوق فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ إِلَّا اللَّهُ خَالِقُهُ سُبْحَانَهُ যমীনে যত মাখলুক রয়েছে, তার সবগুলোর স্রষ্টাই একমাত্র আল্লাহ: এই অংশের মধ্যে শাইখুল ইসলাম তাকদীরের চতুর্থ স্তরের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এটি হচ্ছে সৃষ্টি করা এবং অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্বে আনয়নের স্তর। আল্লাহ ছাড়া যা আছে, সবই মাখলুক। বান্দার ভাল-মন্দ সকল কর্মই আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ ছাড়া আর কোন স্রষ্টা নেই এবং তিনি ব্যতীত আর কোন রবও নেই।
শাইখ যখন তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়নের স্তরগুলো উল্লেখ করে শেষ করলেন, তখন এর সাথে সম্পৃক্ত আরো কিছু মাস'আলার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।
প্রথম মাস'আলা: তাকদীর ও শরীয়াত পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়। তাই তাকদীর দ্বারা দলীল গ্রহণ করে শরীয়াতের বিরোধিতা করা হারাম।
দ্বিতীয় মাস'আলা: আল্লাহ তা'আলার নির্ধারণে পাপাচার সংঘটিত হওয়া এবং পাপাচারের প্রতি আল্লাহর ঘৃণা থাকাও পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়। আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র স্রষ্টা। তাই ঈমান, সৎ আমল, কুফরী ও পাপাচার সবই তাঁর সৃষ্টি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি কুফরী ও পাপাচারকে ভালবাসেন। তিনি পাপাচারকে কখনো ভালবাসেন না; বরং ঘৃণা করেন।
তৃতীয় মাস'আলা: আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের সকল কাজ-কর্ম সৃষ্টি ও নির্ধারণ করেন। বান্দারা তাদের ইচ্ছা ও এখতিয়ার দ্বারা সেই কাজ-কর্ম সম্পাদন করেন। এই দু'টি বিষয় পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00