📄 কতিপয় পাপীকে শাফাআত ব্যতীত শুধু আল্লাহর রহমতেই জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশের পর সেখানে জায়গা খালি থাকলে বা জান্নাতীদের তুলনায় জান্নাত অধিক প্রশস্ত হলে কী করা হবে?
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَيُخْرِجُ اللَّهُ مِنَ النَّارِ أَقْوَامًا بِغَيْرِ شَفَاعَةٍ بَلْ بِفَضْلِهِ وَرَحْمَتِهِ وَيَبْقَى فِي الْجَنَّةِ فَضْلٌ عَمَّنْ دَخَلَهَا مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا فَيُنْشِئُ اللَّهُ لَهَا أَقْوَامًا فَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ وَأَصْنَافُ مَا تَضَمَّنَتْهُ الدَّارُ الْآخِرَةُ مِنَ الْحِسَابِ وَالثَّوَابِ وَالْعِقَابِ وَالْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَتَفَاصِيلُ ذَلِكَ مَذْكُورَةٌ فِي الْكُتُبِ الْمُنَزَّلَةِ مِنَ السَّمَاءِ وَالْآثَارِ مِنَ الْعِلْمِ الْمَأْثُورِ عَنِ الْأَنْبِيَاءِ وَفِي الْعِلْمِ الْمَوْرُوثِ عَنْ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ ذَلِكَ مَا يَشْفِي وَيَكْفِي فَمَنِ ابْتَغَاهُ وَجَدَهُ
কোন শাফা'আত ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহে ও দয়ায় অনেক মানুষকে জাহান্নام থেকে বের করবেন। দুনিয়াবাসীদের থেকে যারা জান্নাতবাসী হবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পরেও জান্নাতে কিছু বাড়তি জায়গা থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের জন্য নতুন কিছু মানুষ সৃষ্টি করবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আখিরাতের জগতে যেসব বিষয় হবে যেমন হিসাব, ভাল আমলের ছাওয়াব, মন্দ আমলের শাস্তি প্রদান, জান্নাত, জাহান্নام ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ আসমানি কিতাবসমূহে এবং নাবীদের থেকে বর্ণিত ইলমের মধ্যে রয়েছে। মুহাম্মাদ থেকে এ বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে, তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং আমাদের জন্য তাই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি তা অনুসন্ধান করবে, সে তা পেয়ে যাবে।
ব্যাখ্যা: (৯) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার অনুমতিতে যত প্রকার শাফাআত হবে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঐসব লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার শাফা'আত, যারা ইতিমধ্যেই জাহান্নামে প্রবেশ করেছে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া প্রথমে তাদের বিষয়টি উল্লেখ করার পর এখানে উল্লেখ করেছেন যে, শাফা'আত ছাড়াও অন্য একটি কারণে অনেক লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে।
আর সেটি হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার রহমত, অনুগ্রহ এবং তাঁর দয়া। সুতরাং তাওহীদপন্থী যেসব গুনাহগার মুমিনের অন্তরে একটি দানার চেয়েও কম পরিমাণ ঈমান থাকবে, তারা জাহান্নাম থেকে বের হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না। শির্ক ব্যতীত অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন” (সূরা নিসা ৪:৪৮)।
বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে রয়েছে, নাবী বলেছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন:
شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَشَفَعَ النَّبِيُّونَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ)
"ফেরেশতাগণ শাফাআত করেছে, নাবীগণ শাফা'আত করেছেন এবং মুমিনগণও শাফা'আত করেছেন। এখন সবচেয়ে দয়ালু আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারো শাফা'আত বাকী নেই। অতঃপর তিনি জাহান্নামের আগুন থেকে একমুষ্ঠি গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি জাহান্নাম থেকে এমন একদল মানুষকে বের করবেন, যারা কখনো কোন ভাল আমলই করেনি"। ৬২
وَيبقى في الجنة فضل : অর্থাৎ জান্নাতে কিছু বাড়তি জায়গা থাকবে; দুনিয়াবাসীদের থেকে যারা জান্নাতবাসী হবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পর ও তাতে প্রশস্ত জায়াগা খালী পড়ে থাকবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে খুব প্রশস্ত করে সৃষ্টি করেছেন।
তিনি সূরা আল ইমরানের ১৩৩ নং আয়াতে বলেন:
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
"তোমরা দৌড়ে চলো তোমাদের রবের ক্ষমার পথে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা পৃথিবী ও আকাশের সমান। মুত্তাকী লোকদের জন্য উহা তৈরী করে রাখা হয়েছে"।
فَيُنْشِئُ اللَّهُ : অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করবেন অনেক লোক। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়ায় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। কেননা জান্নাত হচ্ছে আল্লাহর রহমত। এর মাধ্যমে তিনি যাকে ইচ্ছা দয়া করবেন। আর জাহান্নামে কেবল তাদেরকেই শাস্তি দিবেন, যারা হেদায়াতের দলীল পৌঁছার পর আল্লাহ তা'আলাহকে অস্বীকার করেছে এবং রসূলদেরকে অমান্য করেছে।
وَأَصْنَافُ مَا تَضَمَّنَتْهُ الدَّارُ الْآخِرَةُ الخ...... বিষয় হবে..: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রহি.। আখেরাত দিবসের অবস্থা এবং তাতে যা হবে, উহা থেকে অনেক বিষয় উল্লেখ করার পর বাকীগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। কেননা আখেরাতের বিষয়গুলো ইলমে গায়বের অন্তর্ভুক্ত, যা অহীর মাধ্যম ছাড়া অবগত হওয়া সম্ভব নয়。
টিকাঃ
৬২. সহীহ মুসলিম ১৮৩।
📄 তাকদীরের প্রতি ঈমান এবং তাতে যেসব বিষয় শামিল রয়েছে।
[ঈমানের ছয়টি রুকনের একটি হচ্ছে তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা]
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَتُؤْمِنُ الْفِرْقَةُ النَّاحِيَةُ مِنْ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ وَالْإِيمَانُ بِالْقَدَرِ عَلَى دَرَجَتَيْنِ كُلُّ دَرَجَةٍ تَتَضَمَّنُ شَيْئَيْنِ
নাজাতপ্রাপ্ত দল অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করে। উহার মধ্যে যেসব ভাল রয়েছে তার প্রতি এবং যেসব মন্দ রয়েছে, তার প্রতিও। তাকদীরের প্রতি ঈমানের দু'টি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তরই দু'টি জিনিসকে শামিল করে।
ব্যাখ্যা: القدر শব্দটি قدرت الشيئ إذا أحطت بمقداره এর মাসদার। অর্থাৎ যখন কোন জিনিস সম্পর্কে সকল দিক অবগত হওয়া যায়, তখন বলা হয় أحطت بمقداره "আমি উহার পরিমাণ সম্পর্কে অবগত হয়েছি”। এই কথা আপনি ঠিক ঐ সময়ই বলে থাকেন, যখন সেই বিষয়ের খুঁটিনাটি সবকিছুই আপনি অবগত হতে সক্ষম হন।
কাদার বা তাকদীর দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, সকল সৃষ্টি সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলার ইলম রয়েছে। মাখলুকসমূহ সৃষ্টি করার আগেই আযালে (আদিতে) আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে অবগত আছেন।
পৃথিবীতে এমন কোন ঘটনা ঘটে না, যা আল্লাহ তা'আলা নির্ধারণ করেন নি। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আগে থেকেই সে সম্পর্কে জানেন এবং সেই ঘটনার সাথে তাঁর ইচ্ছাও রয়েছে। তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ঈমানের ছয় রুকনের একটি। তাকাদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা মানে উহার ভাল-মন্দ উভয়ের প্রতিই বিশ্বাস করা।
শাইখুল ইসলামের উক্তি: وتؤمن الفرقة الناجية - أهل السنة والجماعة - بالقدر خيره وشره নাজী ফিরকা অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করে: এই কথার মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যারা তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করেনা, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্তর্ভুক্ত নয়। কুরআন ও হাদীসের দলীলের দাবীও তাই। যেমন হাদীসে জিবরীলে এসেছে, জিবরীল যখন নাবী ﷺ কে ঈমান সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন, তখন তিনি বললেন: أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
"তুমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে (১) আল্লাহ পাকের উপর (২) তাঁর ফেরেশতাদের উপর (৩) তাঁর কিতাবসমূহের উপর (৪) তাঁর রসূলদের উপর (৫) আখেরাত বা শেষ দিবসের উপর এবং (৬) তাকদীরের ভাল-মন্দের উপর"। ৬০
এ হাদীসে নাবী ﷺ তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়নকে ঈমানের ষষ্ঠ রুকন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইহা অস্বীকার করবে, সে মুমিন হিসাবে গণ্য হবে না। তেমনি ঈমানের অন্য কোন রুকন অস্বীকার করলেও মুমিন হিসাবে গণ্য হবে না।
তাকদীরের প্রতি ঈমান দু'টি স্তরে বিভক্ত: শাইখুল ইসলাম এখানে উল্লেখ করেছেন যে, তাকদীরের প্রতি ঈমানের সর্বমোট চারটি স্তর রয়েছে। সংক্ষিপ্তাকারে এই স্তরগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ।
(১) প্রত্যেক জিনিস সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার আযালী ইলম। অর্থাৎ মাখলুক সৃষ্টি করার আগে থেকেই আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সকল অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। বান্দারা যেসব আমল করে থাকে, তা সম্পাদন করার পূর্বেই সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার অবগতিও সেই ইলমে আযালীর অন্তর্ভুক্ত।
(২) সেই ইলম অনুযায়ী সবকিছু লাওহে মাহফুযে লিখে রাখা হয়েছে।
(৩) যা কিছু ঘটে, তার প্রত্যেকটির মধ্যেই আল্লাহর (সৃষ্টি ও নির্ধারণগত) ইচ্ছা শামিল থাকে এবং তা আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ক্ষমতাধীন।
(৪) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইলম, নির্ধারণ এবং ইচ্ছা মোতাবেক সমস্ত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। আর তিনিই একমাত্র স্রষ্টা। তিনি ব্যতীত সবকিছুই সৃষ্টি। এই হচ্ছে সংক্ষিপ্তাকারে তাকদীরের স্তরসমূহ। এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে。
টিকাঃ
৬৩. সহীহ মুসলিম ৮, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান।
📄 তাকদীর ও শারীয়াত পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয় এবং পাপাচারে নির্ধারণ করা এবং সেগুলোকে অপছন্দ ও ঘৃণা করাও পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়।
উহা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে তাঁর এবং তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি তাঁর আদেশ অমান্য করতে এবং পাপাচারে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুত্তাকী, সৎকর্মশীল এবং ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। যারা ঈমান আনয়ন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি কাফেরদেরকে ভালবাসেন না এবং ফাসেক সম্প্রদায়ের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট হন না। তিনি অশ্লীলতার আদেশ করেন না, তাঁর বান্দাদের কুফরী করাকে পছন্দ করেন না এবং ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে ভালবাসেন না।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম যখন তাকদীরের চারটি স্তর যথাক্রমে: ইলম, লিখা, ইচ্ছা করা ও সৃষ্টি করা, এই চারটি বিষয় সাব্যস্ত করলেন এবং আরো সাব্যস্ত করলেন যে, সৃষ্টিজগতে যা কিছু সৃষ্টি ও সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে ও হবে, আল্লাহ তা'আলা উহা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত রয়েছেন, তিনি তা আগেই লিখে রেখেছেন, উহা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন ও ইচ্ছা করেছেন এবং তিনি উহা সৃষ্টি করেছেন, পূর্বোক্ত বক্তব্যে ইহা সাব্যস্ত করার পর এখানে বর্ণনা করছেন যে, উক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে এবং আল্লাহ তা'আলা যে তাঁর বান্দাদেরকে আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেছেন, তাঁর মধ্যে কোন বৈপরিত্য, পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘর্ষ নেই। পাপাচার সংঘটিত হওয়ার নির্ধারণ করা এবং উহাকে ঘৃণা করার মধ্যে কোন পারস্পরিক সংঘর্ষ, বিরোধ ও বৈপরিত্য নেই।
শাইখুল ইসলামের উক্তি: ومع ذلك উহা সত্ত্বেও: অর্থাৎ সকল বস্তু সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অবগতি, সবকিছু নির্ধারণ, সবকিছু লিখা এবং সৃষ্টি করার ইচ্ছা করা ও সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করার হুকুম করেছেন এবং তাঁর নাফরমানি করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আল্লাহর কিতাব রাসূলের সুন্নাহতে এ বিষয়ে বহু দীলল রয়েছে। এগুলোতে তিনি তাঁর আনুগত্য করার আদেশ এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের (শরীয়তের) বিরোধীতা করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা শরীয়ত ও হুকুম-আহকাম প্রেরণ করেছেন এবং সবকিছু সৃষ্টি ও নির্ধারণ করেছেন। এগুলোর মাঝে কোন প্রকার পারস্পরিক সংঘর্ষ, অসংগতি ও বিরোধ নেই। যেমন ধারণা করে থাকে ঐ সমস্ত গোমরাহ সম্প্রদায়, যারা শরীয়তকে তাকদীরের বিপরীত মনে করে।
শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে তাঁর লিখিত অন্যতম একটি রেসালা 'তাদমুরিয়াতে' বলেন: গোমরাহ ফির্কার লোকেরা তাকদীরের বিষয়ে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। অগ্নিপূজক, মুশরিক এবং ইবলীসের দল।
ক) مجوسية অগ্নিপূজক: যারা আল্লাহ তা'আলার তাকদীরকে অস্বীকার করে, তারা এই উম্মতের মাজুসী। যদিও তারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধে বিশ্বাস করে। এই দলের সীমালংঘনকারীরা আল্লাহ তা'আলার ইলম ও ইলম অনুযায়ী সবকিছু লিখে রাখাকে অস্বীকার করেছে। আর মধ্যমপন্থীরা ইলম ও লিখাকে স্বীকার করলেও তারা এই কথা স্বীকার করে না যে, সবকিছুর উপর রয়েছে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা, সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি এবং কুদরতের অধীন। এরাই হলো মুতাযেলা এবং যারা তাদের অনুসরণ করে থাকে।
)খ( মুশরিক: আর যারা তাকদীর ও আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় বিশ্বাসী, কিন্তু শরীয়তের আদেশ ও নিষেধকে অস্বীকার করেছে, তারা হলো মুশরিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন: سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّى ذَاقُوا بَأْسَنَا قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ
"এ মুশরিকরা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে আমরা শির্ক করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও শির্ক করতো না। আর আমরা কোন জিনিসকে হারামও গণ্য করতাম না। এ ধরনের উদ্ভট কথা তৈরী করে এদের পূর্ববর্তী লোকেরাও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা অবশেষে আমার আযাবের স্বাদ গ্রহণ করেছে। এদেরকে বলে দাও, তোমাদের কাছে কোন জ্ঞান আছে কি? থাকলে আমার কাছে পেশ করো। তোমরা তো নিছক ধারণার অনুসরণ করে চলছো। শুধু আন্দাজ করা ব্যতীত তোমাদের কাছে আর কিছুই নেই" (সূরা আন'আম ১৪৮)।
যারা তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ বাতিল করে দেয়, তারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
গ) ইবলীসের দল: এ বিষয়ে তৃতীয় দলটি হচ্ছে ইবলীসের দল। তারা তাকদীর ও শরীয়াত উভয়কেই স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু তারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার শরীয়াত ও তাকদীরকে পরস্পর সাংঘর্ষিক ও বিরোধী মনে করেছে। এর মাধ্যমে তারা হিকমত ও আদালতে ইলাহীয়ার মধ্যে আপত্তি করেছে। যেমন তাদের প্রথম উস্তাদ ইবলীস থেকে উহা উল্লেখ করা হয়েছে।
মোটকথা আহলে বাতিলরা নিজেদের পক্ষ হতে বানিয়ে উপরোক্ত কথা বলে থাকে। হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং সফলকাম লোকেরা তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস করে এবং শরীয়তকেও বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা, প্রত্যেক জিনিসের প্রভু ও মালিক। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই হয়। তিনি যা ইচ্ছা করেন না, তা কখনো হয়না এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। ইলমের মাধ্যমে তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন এবং প্রত্যেক জিনিসকে একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিখে সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
وَهُوَ سُبْحَانَهُ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ وَالْمُحْسِنِينَ وَالْمُقْسِطِينَ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুত্তাকী, সৎকর্মশীল এবং ইনসাফ কারীদেরকে ভালবাসেন: অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রশংসনীয় গুণে গুণান্বিত হয়, যেমন তাকওয়া, সৎকর্ম ন্যায়বিচার-ইনসাফ ইত্যাদি ভাল গুণে বিশেষিত হয়, তাকে ভালোবাসেন।
وَيَرْضَى عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন: যেমন অনেক আয়াতে সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, যারা ঈমান আনয়ন করে এবং সৎ আমল করে তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন ও তাদেরকে ভালবাসেন।
وَلَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ وَلَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ ভালোবাসেন না এবং ফাসেক সম্প্রদায়ের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট হন না: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব স্বভাব ও বৈশিষ্টকে ঘৃণা করেন; যেমন কুফরী, পাপাচার এবং অন্যান্য নিকৃষ্ট স্বভাব, যারা এ জাতীয় স্বভাব ও বৈশিষ্ট দ্বারা বিশেষিত হয়, তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন না।
وَلَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ তিনি অশ্লীলতার আদেশ করেন না: অশ্লীলতা বলতে ঐসব গুনাহ ও পাপের কথা ও কাজ বুঝায়, যা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত।
وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَلَا يُحِبُّ الْفَسَادَ পছন্দ করেন না এবং ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে ভালবাসেন না: কেননা কুফরী ও ফাসাদ অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ এবং তাতে রয়েছে দেশ ও জাতির জন্য অনেক ক্ষতি।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা ঐসব লোকদের প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, যারা মনে করে আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা ও ভালবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যখন কোন জিনিসের ইচ্ছা করেন তখন উহাকে ভালবাসেন বলেই উহার ইচ্ছা করেন এবং কোন জিনিসকে যখন ভালবাসেন তখন উহার অর্থ এই যে, তিনি উহার ইচ্ছা পোষণ করেন। এই কথা একদম বাতিল।
সঠিক কথা হলো আল্লাহ তা'আলার الإرادة (ইচ্ছা) এবং المحبة (ভালবাসা) পরস্পর সম্পৃক্ত নয়। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা ও তাঁর ভালোবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত নয়। এ দু'টির একটি অন্যটিকে আবশ্যক করেনা। আল্লাহ তা'আলা কখনো এমন জিনিসের ইচ্ছা করেন, যা তিনি পছন্দ করেন না এবং এমন জিনিস পছন্দ করেন, যা সংঘটিত করার ইচ্ছা করেন না।
প্রথমটির উদাহরণ হলো যেমন ইবলীস ও তার সৈনিকদেরকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করা এবং আল্লাহ তা'আলার ঐ ব্যাপক ইচ্ছা, যা রয়েছে সৃষ্টিজগতের কিছু কিছু জিনিসের মধ্যে। যদিও তিনি উহাকে ঘৃণা করেন এবং অপছন্দ করেন।
আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো, যেমন তিনি কাফেরদের ঈমান আনয়ন করাকে ভালবাসেন এবং তাদের থেকে আনুগত্যের কাজ সংঘটিত হওয়া পছন্দ করেন, কিন্তু তিনি তাদের থেকে উহা বাস্তবায়ন হওয়ার ইচ্ছা করেননি। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে অবশ্যই তাদের দ্বারা উহা বাস্তবায়ন হতো।
📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার পক্ষ হতে তাকদীর নির্ধারণ করা (বান্দাদের কর্ম সৃষ্টি হওয়া) এবং প্রকৃতপক্ষে বান্দাদের কাজ-কর্ম তাদের প্রতি সম্বন্ধ করার মধ্যে পারষ্পারিক কোন বিরোধ নেই। বান্দাই নিজস্ব ইচ্ছা ও এখতিয়ার দ্বারা তাদের কাজ-কর্ম সম্পাদন করে থাকে।
বান্দারা প্রকৃতপক্ষেই তাদের কাজগুলো সম্পাদন করে। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তিনি তাদের কাজগুলোরও স্রষ্টা। বান্দাই মুমিন হয়, কাফির হয়, সৎকর্মশীল হয়, পাপাচারী হয়, মুসল্লী হয় এবং সিয়াম পালনকারী হয়। বান্দাদের কাজ-কর্ম করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। রয়েছে তাদের ইচ্ছা। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের ক্ষমতা এবং ইচ্ছারও স্রষ্টা তিনিই। যেমন আল্লাহ তা'আলা সূরা তাকভীরের ২৮-২৯ নং আয়াতে বলেছেন:
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
"এটা সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য একটা উপদেশ মাত্র। তোমাদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তির জন্য, যে সত্য সরল পথে চলতে চায়। আর তোমরা ইচ্ছা করলেই সত্য সরল পথে চলতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাদেরকে সরল পথে চালানোর ইচ্ছা করেন"।
তাকদীরের এই স্তরকে কাদারীয়াদের অধিকাংশ ফির্কাই অস্বীকার করেছে। এই জন্যই নাবী তাদেরকে এই উম্মতের মাজুসী তথা অগ্নিপূজক হিসাবে নামকরণ করেছেন।
ঐদিকে তাকদীর সাব্যস্ত করতে গিয়ে আরেক দল লোক (জাবরীয়া সম্প্রদায়) খুব বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করে ফেলেছে। এমনকি কাজ-কর্ম করার জন্য বান্দার কোন শক্তি, ইচ্ছা ও এখতিয়ার থাকার কথাকে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে থাকে। শুধু তাই নয়; আল্লাহ তা'আলার ক্রিয়া- কর্ম এবং তাঁর হুকুম-আহকামের মধ্যে যেসব হিকমত এবং কল্যাণ রয়েছে তারা সেগুলোও অস্বীকার করে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বর্ণনা করতে চাচ্ছেন যে, পূর্বোক্ত সকল স্তরসহ তাকদীর সাব্যস্ত করার মধ্যে এবং বান্দারাই যে তাদের এখতিয়ার দ্বারা কর্ম সম্পাদন করে এবং তারা যে তাদের ইচ্ছাতেই আমল করে, এর মধ্যে কোন বৈপরিত্য, পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং বিরোধ নেই।
এই অংশের মাধ্যমে শাইখুল ইসলামের উদ্দেশ্য হলো ঐসব লোকের প্রতিবাদ করা, যারা বলে, যদি এটি সাব্যস্ত করা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার কাজ-কর্ম সৃষ্টি করেন এবং বান্দারাও তাদের নিজস্ব ইচ্ছা দ্বারা কাজ-কর্ম করে, তাহলে উভয় কথার মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়। এই পারস্পরিক দ্বন্ধের ধারণা থেকেই বাতিলপন্থীদের একটি দল তাকদীর (আল্লাহর ইচ্ছা, শক্তি, ক্ষমতা, সৃষ্টি করা, সবকিছুর উপর তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) সাব্যস্ত করতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করেছে। এমনকি বান্দার উপর থেকে কাজ-কর্ম করার ক্ষমতা এবং এখতিয়ারকে সম্পূর্ণরূপে তুলে নিয়েছে!!
বাতিলদের আরেকটি দল বান্দাদের কাজ-কর্ম এবং এখতিয়ার সাব্যস্ত করতে গিয়ে মারাত্মক সীমালংঘন করে ফেলেছে। এমনকি তারা বান্দাদেরকেই তাদের নিজস্ব কাজ-কর্মের স্রষ্টা হিসাবে নির্ধারণ করেছে। তারা আরো বলেছে যে, বান্দাদের কর্মের সাথে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার কোন সম্পর্ক নেই এবং বান্দাদের কাজ-কর্মের উপর আল্লাহর কোন ক্ষমতাও নেই!!
উপরে পরস্পর বিপরীতমুখী যে দু'টি গোমরাহ দলের আলোচনা করা হলো, তাদের প্রথম দলটিকে বলা হয় জাবরীয়া। কেননা তারা বলে বান্দা থেকে যা প্রকাশিত হয় কিংবা সে যেই কাজ ও নড়াচড়া করে, তাতে সে মাজবুর (বাধ্যগত)। তাতে তার কোন নিজস্ব এখতিয়ার, ইচ্ছা ও স্বাধীনতা নেই। আর দ্বিতীয় দলকে বলা হয় কাদারীয়া। কারণ তারা তাকদীর তথা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারণকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে!!
সুতরাং শাইখের উক্তি: বান্দারা প্রকৃতপক্ষেই তাদের কাজগুলো সম্পাদন করে, -এর মাধ্যমে তিনি জাবরীয়াদের প্রতিবাদ করেছেন। কেননা তারা বলে, বান্দারা প্রকৃতপক্ষে কোন কাজই করে না। শুধু রূপকার্থে তাদের প্রতি কর্মসমূহের নিসবত (সম্বন্ধ) করা হয়েছে!!!
আর শাইখের কথা, وَاللَّهُ خَالْقُهم وخالق أَفْعَالَهُمْ আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তিনি তাদের কাজগুলোরও স্রষ্টা: এর মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয় ফির্কা তথা তাকদীরকে অস্বীকারকারী কাদারীয়া সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ করেছেন। কেননা তারা বলে থাকে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের কর্মসমূহ সৃষ্টি করেন না; বরং বান্দারা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও নির্ধারণ ছাড়াই নিজেদের কর্মগুলো নিজেরাই সৃষ্টি করে!!
বান্দাই মুমিন হয়, কাফির হয়, সৎকর্মশীল হয়, পাপাচারী হয়, সলাত আদায়কারী হয় এবং সিয়ামপালনকারী হয়। বান্দাদের কাজ-কর্ম করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে, রয়েছে তাদের ইচ্ছা: এতে জাবরীয়াদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। অর্থাৎ বান্দারা উপরোক্ত আমলসমূহে মাজবুর (বাধ্যগত) নয়। কেননা তাই যদি হতো তাহলে তাদেরকে উপরোক্ত বিশেষণগুলো দ্বারা বিশেষিত করা হতো না। কেননা মাজবুরের কাজকে তার দিকে নিসবত (সম্বোধন) করা হয় না, তা দ্বারা তাকে বিশেষিতও করা হয় না৬৭ এবং মাজবুর (বাধ্যের) দ্বারা যা হয়, তাতে সে ছাওয়াবের হকদার হয় না কিংবা শাস্তিরও যোগ্য বিবেচ্য হয় না।
وَهَذِهِ الدَّرَجَةُ مِنَ الْقَدَرِ يُكَذِّبُ بِهَا عَامَّةُ الْقَدَرِيَّةِ কাদারীয়াদের অধিকাংশ ফির্কাই অস্বীকার করে: এই স্তর বলতে আল্লাহ তা'আলার সার্বিক ও সার্বজনীন ইচ্ছা, প্রত্যেক জিনিসই তাঁর ইচ্ছাতেই হওয়া এবং সবকিছুই তাঁর সৃষ্টি, এই কথা বুঝায়। এই স্তরে ইহাও রয়েছে যে, বান্দারা প্রকৃতপক্ষেই তাদের কর্মসমূহ সম্পাদন করে। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তিনি তাদের কর্মেরও স্রষ্টা। কাদারীয়ারা তাকদীরের এই স্তরকে অস্বীকার করে। তাদের ধারণা মতে বান্দাই তার নিজের কর্ম সৃষ্টি করে। এতে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার প্রয়োজন পড়ে না। এদেরকে নাবী এই উম্মতের মাজুসী বলে নামকরণ করেছেন। কেননা এই মাস'আলাতে অগ্নিপূজকদের সাথে তাদের সাদৃশ্য রয়েছে। অগ্নিপূজকরা দু'টি স্রষ্টা সাব্যস্ত করে। তারা নূর বা আলোকে ন্যায় ও কল্যাণের স্রষ্টা মনে করে এবং অন্ধকারকে অন্যায় ও অকল্যাণের স্রষ্টা মনে করে। সুতরাং তারা বলে কল্যাণ নূরের সৃষ্টি আর অকল্যাণ অন্ধকারের সৃষ্টি। এর মাধ্যমে তারা দুই স্রষ্টায় বিশ্বাসী হয়েছে।
কাদারীয়ারাও অগ্নিপূজকদের মতই। কেননা তারা আল্লাহর সাথে অন্যকেও স্রষ্টা সাব্যস্ত করেছে। তারা মনে করে, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ব্যতীত বান্দারাই তাদের কর্ম সৃষ্টি করে থাকে। শুধু তাই নয়; তারা মনে করে বান্দারা নিজস্ব ও সতন্ত্র ক্ষমতা বলেই তাদের কর্ম সৃষ্টি করে।
নাবী তাদেরকে এই উম্মতের অগ্নিপূজক বলেছেন,-এই কথা এক বাক্যে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। কেননা নাবী এর যামানা পার হয়ে যাওয়ার পর তাদের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের নিন্দায় যা বর্ণনা করা হয়, তার অধিকাংশই সাহাবীদের উপর মাওকুফ। অর্থাৎ এগুলোর সহীহ সনদ শুধু সাহাবীগণ পর্যন্তই পৌঁছে।
সুতরাং প্রথম দল অর্থাৎ কাদারীয়ারা বান্দার কর্ম সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। এমনকি বান্দার কর্ম থেকে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাকে বের করে ফেলেছে। আর জাবরীয়ারা বান্দাদের কর্মকে একদম অস্বীকার করেছে। এমনকি কাজ-কর্ম করার উপর বান্দাদের কোন ক্ষমতা ও এখতিয়ার থাকাকেই অস্বীকার করেছে।
وَيُخْرِجُونَ عَنْ أَفْعَالِ اللَّهِ وَأَحْكَامِهِ حِكَمَهَا
وَمَصَالِحَهَا আল্লাহ তা'আলার ক্রিয়া-কর্ম এবং তাঁর হুকুম-আহকামের মধ্যে যেসব হিকমত এবং কল্যাণ রয়েছে তারা সেগুলোও অস্বীকার করে: حكم শব্দটি حكمة এর বহুবচন। আর مصاح শব্দটি مصلحة এর বহুবচন। অর্থাৎ জাবরীরা যখন বান্দার কাজ-কর্ম থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং কাজ-কর্ম করার উপর বান্দার ক্ষমতা এবং এখতিয়ার থাকাকেও অস্বীকার করেছে, তখন এর মাধ্যমে তারা শরীয়াতের আদেশ ও নিষেধের মধ্যে যেই হিকমত, ছাওয়াব ও শাস্তি রয়েছে, তাও অস্বীকার করে ফেলেছে।
তারা বলেছে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে এমন কাজের ছাওয়াব দেন, যা তাদের কর্মের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এমন কর্মের কারণে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেন, যা তাদের কর্মের মধ্যে শামিল নয়। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে এমন কাজের আদেশ করেন, যা করতে বান্দারা সক্ষম নয়। সুতরাং তারা আল্লাহ তা'আলাকে যুলুম এবং নিরর্থক কাজ করার অপবাদ দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অপবাদের অনেক উর্ধ্বে।
টিকাঃ
৬৭. সুতরাং যাকে জোর করে বিষ পান করানো হয়, তার ব্যাপারে এটি বলা হয় না যে, অমুক ব্যক্তি বিষ পান করেছে; বরং বলা হয় বল প্রয়োগ করে বিষ পান করিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মানুষ তাকে দোষরোপ করে না। ঐদিকে যে নিজ ইচ্ছায় হাতে বিষ নিয়ে তা পান করে এবং নিজের জান বের করে দেয়, তাকে মানুষ দোষারোপ করে। সহীহ হাদীছে তাকে জাহান্নামী বলা হয়েছে।
এমনি বাতাস যাকে ছাদের উপর থেকে ফেলে দেয়, সে মারা গেলেও কেউ তাকে দোষারোপ করেনা; বরং তার জন্য আফসোস করে এবং দু'আ করে। অনিচ্ছায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কেউ মৃত্যু বরণ করলে তাকে শহীদ বলা হয়। পক্ষান্তরে স্ব-ইচ্ছায় কেউ ছাদের উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মৃত্যু বরণ করলে কিংবা গাড়ির নিচে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করলে কোন মানুষ তাকে ভালবাসে না।
এমনি বান্দা নিজ ইচ্ছাতে নামায পড়ে বলে তাকে নামাযী বলা হয়, সে নিজেই ঈমান আনয়ন করে বলেই তাকে মুমিন বলা হয় এবং সে নিজেই রোজা রাখে বলেই তাকে রোযাদার বলা হয়। অনুরূপ যে চুরি করে তাকে চোর বলা হয়, কিন্তু যার পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে চোর সাব্যস্ত করা হয়, তাকে কেউ চোর বলে না।
সুতরাং কোন কাজ মানুষের ইচ্ছাতে হয় আর কোন কাজ তাদের অনিচ্ছায় হয়, মানুষেরা তাদের বোধশক্তি দ্বারাই বুঝে ফেলে। তাদের ফয়সালাও হয় তার আলোকেই। ইসলামী শরীয়ত মানুষের উপর এমন আকীদাহ, বিশ্বাস ও আমল চাপিয়ে দেয়নি, যা মানুষের স্বাধীন বোধশক্তি উপলব্ধি করতে অক্ষম।
মোট কথা, তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে শরীয়তের সীমা লংঘন করে এই কথা বলা ঠিক নয় যে, আমার নিজস্ব ইচ্ছায় নামায ত্যাগ করিনা, মদপান করিনা কিংবা পাপাচারে লিপ্ত হইনা; বরং তাকদীরে লিখা আছে, তাই আমার দ্বারা এগুলো হচ্ছে এবং আমি এগুলো করতে বাধ্য। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তুমি হেদায়াতের পথ দেখাও। আমীন