📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 সর্বপ্রথম যিনি জান্নাতের দরজা খুলবেন, সর্বপ্রথম তাতে প্রবেশ করবেন এবং নাবী শাফাআ‘তের বর্ণনা।

📄 সর্বপ্রথম যিনি জান্নাতের দরজা খুলবেন, সর্বপ্রথম তাতে প্রবেশ করবেন এবং নাবী শাফাআ‘তের বর্ণনা।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَأَوَّلُ مَنْ يَسْتَفْتِحُ بَابَ الْجَنَّةِ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنَ الْأُمَمِ أُمَّتُهُ وَلَهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْقِيَامَةِ ثَلَاثُ شَفَاعَاتٍ أَمَّا الشَّفَاعَةُ الْأُولَى فَيَشْفَعُ فِي أَهْلِ الْمَوْقِفِ حَتَّى يُقْضَى بَيْنَهُمْ بَعْدَ أَنْ يَتَرَاجَعَ الْأَنْبِيَاءُ آدَمُ ، وَنُوحٍ ، وَإِبْرَاهِيمُ ، وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ عَنِ الشَّفَاعَةِ حَتَّى تَنْتَهِيَ إِلَيْهِ وَأَمَّا الشَّفَاعَةُ الثَّانِيَةُ: فَيَشْفَعُ فِي أَهْلِ الْجَنَّةِ أَنْ يَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَهَاتَانِ الشَّفَاعَتَانِ خَاصَّتَانِ لَهُ وَأَمَّا الشَّفَاعَةُ الثَّالِثَةُ : فَيَشْفَعُ فِيمَنِ اسْتَحَقَّ النَّارَ وَهَذِهِ الشَّفَاعَةُ لَهُ وَلِسَائِرِ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِيقِينَ وَغَيْرِهِمْ ، فَيَشْفَعُ فِيمَنِ اسْتَحَقَّ النَّارَ أَلَّا يَدْخُلَهَا وَيَشْفَعُ فِيمَنْ دَخَلَهَا أَنْ يَخْرُجَ مِنْهَا
কিয়ামাতের দিন সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ বেহেশতের দরজা খুলবেন। সমস্ত উম্মতের মধ্য হতে তাঁর উম্মতই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তিনি কিয়ামাতের দিন তিনটি শাফা'আত করবেন।
প্রথম শাফা'আতটি করবেন হাশরের মাঠে অবস্থানকারী সকল মানুষের জন্য। যাতে তাদের মধ্যে দ্রুত ফায়সালা করা হয়। আদম, নূহ, ইবরাহীম, মুসা, এবং সমস্ত নাবীই সেদিন আল্লাহর নিকট শাফা'আত করতে অক্ষমতা প্রকাশ করার পর শাফা'আতের বিষয়টি পরিশেষে মুহাম্মাদ এর নিকট ফিরে আসবে।
দ্বিতীয় শাফা'আতটি হবে জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য। এ দু'টি শাফা'আত নাবী ﷺ এর জন্য খাস।
আর তৃতীয় শাফা'আতটি হবে ঐসব লোকের ব্যাপারে, যাদের জন্য জাহান্নাম আবশ্যক হয়ে যাবে। এই শাফা'আতটি হবে সমস্ত নাবী, সিদ্দীক এবং অন্যান্যদের জন্য। সুতরাং যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদের জন্য তিনি সুপারিশ করবেন, তাদেরকে যেন জাহান্নামে প্রবেশ করানো না হয়। তিনি আরো সুপারিশ করবেন ঐ সব লোকের জন্য, যারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তাদেরকে সেখান থেকে বের করার সুপারিশ করবেন।
ব্যাখ্যা: (৮) কিয়ামাত দিবসের যেসব অবস্থা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তা অতিক্রম করার পর সেদিন মুমিনদের সর্বশেষ অবস্থা কী হবে, শাইখুল ইসলাম এখানে তা বর্ণনা করেছেন। পূর্বোক্ত অধ্যায়ে তিনি বলেছেন: অতঃপর যখন তাদেরকে পারস্পরিক যুলুম থেকে পরিশুদ্ধ ও পরিস্কার করা হবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার অনুমতির পূর্বে এবং জান্নাতের দরজা খোলার আবেদন করার আগে কেউ তাতে প্রবেশ করতে পারবে না।
নাবী ﷺ সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা খুলবেন। যেমন সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নাবী ﷺ বলেন: «آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتَفْتِحُ فَيَقُولُ الْحَازِنُ مَنْ أَنْتَ فَأَقُولُ مُحَمَّدٌ. فَيَقُولُ بِكَ أُمِرْتُ لَا أَفْتَحُ لِأَحَدٍ قَبْلَكَ»
"কিয়ামাতের দিন আমি জান্নাতে দরজায় উপস্থিত হয়ে উহার দরজা খোলার আবেদন করবো। তখন জান্নাতের প্রহরী বলবে: আপনি কে? আমি বলবো: মুহাম্মাদ। প্রহরী তখন বলবে: আপনার জন্য দরজা খুলতে আমাকে আদেশ করা হয়েছে। আপনার পূর্বে অন্য কারো জন্য আমি জান্নাতের দরজা খুলবো না"। ৫৯
الاستفتاح অর্থ হচ্ছে খোলার আবেদন করা। এখানে নাবী সম্মান ও ফাযীলাত প্রকাশ করা হয়েছে।
সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেননা তাদের ফাযীলত অন্যান্য সকল উম্মাতের উপরে। মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত হাদীসে এই কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। নাবী বলেন:
نَحْنُ الْآخِرُونَ الأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَنَحْنُ أَوَّلُ مَنْ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ»
"আমরা সকলের পরে দুনিয়াতে আসলেও কিয়ামাতের দিন সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করবো"। ৬০
কিয়াম তের দিন খাসভাবে নাবী তিনটি শাফা'আত করবেন। الشفاعات قمة الشفاعة এর বহুবচন। শাফা'আত শব্দের আভিধানিক অর্থ মধ্যস্থতা করা, সুপারিশ করা। আর শরীয়াতের পরিভাষায় শাফা'আত অর্থ السؤال الخير للغير অর্থাৎ অন্যের জন্য কল্যাণের আবেদন করা। الشفاعة শব্দটি الشفع থেকে নেওয়া হয়েছে। ইহা الوتر শব্দের বিপরীত। شفع অর্থ জোড় আর وتر অর্থ বে-জোড়। শাফাআতকারী তার আবেদনের সাথে সুপারিশকৃতের আবেদনকেও শামিল করে নেয় বলেই তাকে সুপারিশকারী বলা হয়। অথচ এর আগে সে ছিল একাকী।
শাইখুল ইসলাম বলেন: "কিয়ামাতের দিন নাবী ﷺ এর জন্য তিনটি শাফা'আত হবে"। কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলার অনুমতিক্রমে নাবী যেসব শাফা'আত করবেন, তিনি এখানে ঐসব শাফা'আতের আলোচনা করেছেন। শাইখুল ইসলাম এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে শাফা'আতের প্রকারভেদ বর্ণনা করেছেন। তবে অনুসন্ধানের পর মোট আট প্রকার শাফাআতের কথা জানা যাচ্ছে। এগুলোর মধ্য হতে কতিপয় শাফা'আত নাবী এর সাথে খাস এবং আরো কিছু শাফা'আতের কথা জানা যায়, যা তাঁর জন্য এবং অন্যদের জন্যও সাব্যস্ত।
১) الشفاعة العظمى وهي المقام المحمود : শাফা'আতে উযমা; মাকামে মাহমুদে। হাশরের মাঠে লোকদের দীর্ঘ অবস্থানের পর এবং আদম থেকে শুরু করে ঈসা পর্যন্ত সবার কাছে সুপারিশের জন্য গমন করার পর নাবী আল্লাহ তা'আলার নিকট বান্দাদের মাঝে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আবেদন করবেন। সকল নাবীই যখন আল্লাহর নিকট সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন নাবী মুহাম্মাদ তাঁর প্রভুর অনুমতি নিয়ে শাফা'আত করবেন।
২) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم ـ في دخول أهل الجنة بعد الفراغ من الحساب জান্নাতীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফা'আত: হিসাবের পর জান্নাতীদেরকে দ্রুত জান্নাতে প্রবেশের অনুমতির জন্য নাবী আল্লাহর নিকট শাফা'আত করবেন।
৩) شفاعته - صلى الله عليه وسلم - في عمه أبي طالب তাঁর চাচা আবু তালেবের জন্য নাবী এর শাফা'আত: নাবী কিয়ামতের দিন তাঁর চাচা আবু তালেবের শাস্তি হালকা করার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন। এই শাফা'আত তাঁর সাথেই খাস। কেননা আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কাফেরদের জন্য সুপারিশকারীদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না। নাবী সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁর শাফা'আত কেবল তাওহীদপন্থীদের জন্যই খাস। সুতরাং তাঁর কাফের চাচা আবু তালেবের জন্য যেই শাফা'আত তিনি করবেন, তা কেবল তাঁর সাথেই এবং আবু তালেবের জন্যই খাস। উপরের তিন প্রকার শাফাআত কেবল আমাদের নাবী মুহাম্মাদ জন্যই নির্দিষ্ট।
৪) شفاعته فيمن استحق النار من عصاة الموحدين أن لا يدخلها তাওহীদপন্থীদের মধ্য হতে যাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদেরকে তথায় না পাঠানোর শাফা'আত: যেসব গুনাহগারদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যাবে, তাদেরকে জাহান্নামে না পাঠানোর জন্য নাবী কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবেন।
(৫) شفاعته - صلى الله عليه وسلم - فيمن دخل النار من عصاة الموحدين أن يخرج منها তাওহীদপন্থী মুমিনদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার সুপারিশ: জাহান্নামে প্রবেশকারী তাওহীদপন্থী একদল পাপী লোককে তা থেকে বের করার জন্য তিনি শাফাআত করবেন।
৬) شفاعته ـ صلى الله عليه وسلم - في رفع درجات بعض أهل الجنة জান্নাতের ভিতরে মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ: জান্নাতবাসী কিছু লোকের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য নাবী শাফাআত করবেন।
(৭) شفاعته - صلى الله عليه وسلم - فيمن استوت حسناتهم وسيئاتهم গুনাহর পাল্লা এবং নেকীর পাল্লা সমান সমান হবে, তাদের জন্য সুপারিশ: কিয়ামাতের দিন যাদের গুনাহর পাল্লা এবং নেকীর পাল্লা সমান সমান হবে, তাদের জন্য নাবী শাফা'আত করবেন যে, তাদেরকে যেন জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। আলেমদের এক মত অনুযায়ী তারা হলেন আরাফবাসী।
(৮) شفاعته - صلى الله عليه وسلم - في دخول بعض المؤمنين الجنة بلا حساب ولا عذاب বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে এক শ্রেণীর লোককে জান্নাতে প্রবেশ করানোর শাফা'আত: যেমন উক্কাশা বিন মিহসানের ব্যাপারে নাবী এর শাফা'আত। উক্কাশা যখন শুনলেন, এই উম্মাতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে ও বিনা আযাবে জান্নাতে যাবে, তখন তিনি আবেদন করলেন: হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ তা'আলার নিকট আমার জন্য দু'আ করুন, তিনি যেন আমাকে সেই সত্তর হাজারের অন্তর্ভূক্ত করেন। নাবী তখন উক্কাশার জন্য উক্ত সত্তর হাজারের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার দু'আ করলেন। ৬১
এ শেষোক্ত পাঁচ প্রকারের শাফা'আত করার মধ্যে নাবী ﷺ এর সাথে আরো অনেকেই শরীক থাকবে। যেমন অন্যান্য নাবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ এবং শহীদগণ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উপরোক্ত সকল প্রকার শাফা'আতেই বিশ্বাস করে। কেননা সহীহ সূত্রে বর্ণিত অনেক দলীল দ্বারা তা প্রমাণিত। তবে দু'টি শর্ত ছাড়া শাফাআত হবে না।
প্রথম শর্ত: শাফা'আতকারীকে শাফা'আত করার পূর্বে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে শাফা'আতের অনুমতি লাভ করতে হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ
কে আছে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?" (সূরা বাকারা ২:২৫৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
مَا مِن شَفِيعِ إِلَّا مِن بَعْدِ إِذْنِهِ
"কোন শাফা'আতকারী এমন নেই, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া শাফা'আত করতে পারে (সূরা ইউনুস ১০:৩)।
দ্বিতীয় শর্ত: যার জন্য সুপারিশ করা হবে তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنْ ارْتَضَ
"তারা কেবল তাদের জন্যই সুপারিশ করবেন, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট আছেন”। (সূরা আম্বীয়া ২১:২৮) এ দু'টি শর্ত সূরা নাজমের ২৬ নং আয়াতে একসাথে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَكَم مِّن مَّلَكِ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى
"আসমানে অনেক ফেরেশতা আছে, যাদের সুপারিশও কোন কাজে আসবেনা। যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ ইচ্ছায় যাকে খুশী তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দান করেন"।
কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত হয়ে যেসব মুমিন মৃত্যুবরণ করবে তাদের কেউ জাহান্নামের হকদার হলে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ না করানোর জন্য শাফা'আতের ব্যাপারে মুতাযেলা সম্প্রদায় লোকেরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের বিরোধিতা করেছে। সেই সাথে যারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, সেখান থেকে তাদের বের হওয়ার ব্যাপারেও শাফা'আত হওয়াকে মুতাযেলারা অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ তারা শাফা'আতের উপরোক্ত প্রকারসমূহ থেকে পঞ্চম ও ষষ্ট প্রকার শাফা'আতকেও তারা অস্বীকার করেছে। তারা আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারা দলীল গ্রহণ করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ فَمَا تَنفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ ﴾ "সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কাজে আসবে না (সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:৪৮)।
তাদের কথার জবাব হলো, আয়াতটি কাফেরদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাফেরদের কোন কাজে আসবে না। তবে মুমিনদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে কতিপয় শর্তসাপেক্ষ সুপারিশ তাদের উপকার করবে।
মোটকথা শাফা'আতের ব্যাপারে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে।
(১) এক শ্রেণীর লোক শাফা'আতকে সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমা লংঘন ও বাড়াবাড়ি করেছে। নাসারা, মুশরিক, সীমালংঘনকারী সুফী এবং কবর পূজারীরা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এরা যাদেরকে তা'যীম করে, আল্লাহ তা'আলার নিকটে তাদের শাফাআতকে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের নিকট পরিচিত শাফা'আতের মতই মনে করে থাকে। সুতরাং তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে শাফাআত প্রার্থনা করেছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন যে, মুশরিকদের জন্য সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাজে আসবে না।
(২) মুতাযেলা ও খারেজীরা শাফা'আতকে একদম অস্বীকার করেও সীমা লংঘন করেছে। তারা কবীরা গুনাহকারীদের জন্য নাবী ﷺ এবং অন্যদের শাফা'আতকে অস্বীকার করেছে।
(৩) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা কুরআনের আয়াত এবং নাবী ﷺ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত শাফা'আতকে সাব্যস্ত করে। সুতরাং তারা শর্তসাপেক্ষ শাফা'আতকে সাব্যস্ত করে。

টিকাঃ
৫৯. সহীহ মুসলিম ১৯৭।
৬০. সহীহ মুসলিম ৮৫৫।
৬১. সহীহ মুসলিম ২২০, সহীহ বুখারী ৫৭৫২।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 কতিপয় পাপীকে শাফাআত ব্যতীত শুধু আল্লাহর রহমতেই জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশের পর সেখানে জায়গা খালি থাকলে বা জান্নাতীদের তুলনায় জান্নাত অধিক প্রশস্ত হলে কী করা হবে?

📄 কতিপয় পাপীকে শাফাআত ব্যতীত শুধু আল্লাহর রহমতেই জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশের পর সেখানে জায়গা খালি থাকলে বা জান্নাতীদের তুলনায় জান্নাত অধিক প্রশস্ত হলে কী করা হবে?


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَيُخْرِجُ اللَّهُ مِنَ النَّارِ أَقْوَامًا بِغَيْرِ شَفَاعَةٍ بَلْ بِفَضْلِهِ وَرَحْمَتِهِ وَيَبْقَى فِي الْجَنَّةِ فَضْلٌ عَمَّنْ دَخَلَهَا مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا فَيُنْشِئُ اللَّهُ لَهَا أَقْوَامًا فَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ وَأَصْنَافُ مَا تَضَمَّنَتْهُ الدَّارُ الْآخِرَةُ مِنَ الْحِسَابِ وَالثَّوَابِ وَالْعِقَابِ وَالْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَتَفَاصِيلُ ذَلِكَ مَذْكُورَةٌ فِي الْكُتُبِ الْمُنَزَّلَةِ مِنَ السَّمَاءِ وَالْآثَارِ مِنَ الْعِلْمِ الْمَأْثُورِ عَنِ الْأَنْبِيَاءِ وَفِي الْعِلْمِ الْمَوْرُوثِ عَنْ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ ذَلِكَ مَا يَشْفِي وَيَكْفِي فَمَنِ ابْتَغَاهُ وَجَدَهُ
কোন শাফা'আত ছাড়াই আল্লাহ তা'আলা স্বীয় অনুগ্রহে ও দয়ায় অনেক মানুষকে জাহান্নام থেকে বের করবেন। দুনিয়াবাসীদের থেকে যারা জান্নাতবাসী হবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পরেও জান্নাতে কিছু বাড়তি জায়গা থাকবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের জন্য নতুন কিছু মানুষ সৃষ্টি করবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আখিরাতের জগতে যেসব বিষয় হবে যেমন হিসাব, ভাল আমলের ছাওয়াব, মন্দ আমলের শাস্তি প্রদান, জান্নাত, জাহান্নام ইত্যাদির বিস্তারিত বিবরণ আসমানি কিতাবসমূহে এবং নাবীদের থেকে বর্ণিত ইলমের মধ্যে রয়েছে। মুহাম্মাদ থেকে এ বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে, তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং আমাদের জন্য তাই যথেষ্ট। যে ব্যক্তি তা অনুসন্ধান করবে, সে তা পেয়ে যাবে।
ব্যাখ্যা: (৯) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার অনুমতিতে যত প্রকার শাফাআত হবে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঐসব লোকদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার শাফা'আত, যারা ইতিমধ্যেই জাহান্নামে প্রবেশ করেছে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া প্রথমে তাদের বিষয়টি উল্লেখ করার পর এখানে উল্লেখ করেছেন যে, শাফা'আত ছাড়াও অন্য একটি কারণে অনেক লোক জাহান্নাম থেকে বের হবে।
আর সেটি হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার রহমত, অনুগ্রহ এবং তাঁর দয়া। সুতরাং তাওহীদপন্থী যেসব গুনাহগার মুমিনের অন্তরে একটি দানার চেয়েও কম পরিমাণ ঈমান থাকবে, তারা জাহান্নাম থেকে বের হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না। শির্ক ব্যতীত অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন” (সূরা নিসা ৪:৪৮)।
বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে রয়েছে, নাবী বলেছেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা বলবেন:
شَفَعَتِ الْمَلَائِكَةُ وَشَفَعَ النَّبِيُّونَ وَشَفَعَ الْمُؤْمِنُونَ وَلَمْ يَبْقَ إِلَّا أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ فَيَقْبِضُ قَبْضَةً مِنَ النَّارِ فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ)
"ফেরেশতাগণ শাফাআত করেছে, নাবীগণ শাফা'আত করেছেন এবং মুমিনগণও শাফা'আত করেছেন। এখন সবচেয়ে দয়ালু আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কারো শাফা'আত বাকী নেই। অতঃপর তিনি জাহান্নামের আগুন থেকে একমুষ্ঠি গ্রহণ করবেন। এর মাধ্যমে তিনি জাহান্নাম থেকে এমন একদল মানুষকে বের করবেন, যারা কখনো কোন ভাল আমলই করেনি"। ৬২
وَيبقى في الجنة فضل : অর্থাৎ জান্নাতে কিছু বাড়তি জায়গা থাকবে; দুনিয়াবাসীদের থেকে যারা জান্নাতবাসী হবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করার পর ও তাতে প্রশস্ত জায়াগা খালী পড়ে থাকবে। কেননা আল্লাহ তা'আলা জান্নাতকে খুব প্রশস্ত করে সৃষ্টি করেছেন।
তিনি সূরা আল ইমরানের ১৩৩ নং আয়াতে বলেন:
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
"তোমরা দৌড়ে চলো তোমাদের রবের ক্ষমার পথে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা পৃথিবী ও আকাশের সমান। মুত্তাকী লোকদের জন্য উহা তৈরী করে রাখা হয়েছে"।
فَيُنْشِئُ اللَّهُ : অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করবেন অনেক লোক। অতঃপর তিনি তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ ও দয়ায় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। কেননা জান্নাত হচ্ছে আল্লাহর রহমত। এর মাধ্যমে তিনি যাকে ইচ্ছা দয়া করবেন। আর জাহান্নামে কেবল তাদেরকেই শাস্তি দিবেন, যারা হেদায়াতের দলীল পৌঁছার পর আল্লাহ তা'আলাহকে অস্বীকার করেছে এবং রসূলদেরকে অমান্য করেছে।
وَأَصْنَافُ مَا تَضَمَّنَتْهُ الدَّارُ الْآخِرَةُ الخ...... বিষয় হবে..: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রহি.। আখেরাত দিবসের অবস্থা এবং তাতে যা হবে, উহা থেকে অনেক বিষয় উল্লেখ করার পর বাকীগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। কেননা আখেরাতের বিষয়গুলো ইলমে গায়বের অন্তর্ভুক্ত, যা অহীর মাধ্যম ছাড়া অবগত হওয়া সম্ভব নয়。

টিকাঃ
৬২. সহীহ মুসলিম ১৮৩।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 তাকদীরের প্রতি ঈমান এবং তাতে যেসব বিষয় শামিল রয়েছে।

📄 তাকদীরের প্রতি ঈমান এবং তাতে যেসব বিষয় শামিল রয়েছে।


[ঈমানের ছয়টি রুকনের একটি হচ্ছে তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা]
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَتُؤْمِنُ الْفِرْقَةُ النَّاحِيَةُ مِنْ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ وَالْإِيمَانُ بِالْقَدَرِ عَلَى دَرَجَتَيْنِ كُلُّ دَرَجَةٍ تَتَضَمَّنُ شَيْئَيْنِ
নাজাতপ্রাপ্ত দল অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করে। উহার মধ্যে যেসব ভাল রয়েছে তার প্রতি এবং যেসব মন্দ রয়েছে, তার প্রতিও। তাকদীরের প্রতি ঈমানের দু'টি স্তর রয়েছে। প্রত্যেক স্তরই দু'টি জিনিসকে শামিল করে।
ব্যাখ্যা: القدر শব্দটি قدرت الشيئ إذا أحطت بمقداره এর মাসদার। অর্থাৎ যখন কোন জিনিস সম্পর্কে সকল দিক অবগত হওয়া যায়, তখন বলা হয় أحطت بمقداره "আমি উহার পরিমাণ সম্পর্কে অবগত হয়েছি”। এই কথা আপনি ঠিক ঐ সময়ই বলে থাকেন, যখন সেই বিষয়ের খুঁটিনাটি সবকিছুই আপনি অবগত হতে সক্ষম হন।
কাদার বা তাকদীর দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, সকল সৃষ্টি সম্পর্কেই আল্লাহ তা'আলার ইলম রয়েছে। মাখলুকসমূহ সৃষ্টি করার আগেই আযালে (আদিতে) আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে অবগত আছেন।
পৃথিবীতে এমন কোন ঘটনা ঘটে না, যা আল্লাহ তা'আলা নির্ধারণ করেন নি। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আগে থেকেই সে সম্পর্কে জানেন এবং সেই ঘটনার সাথে তাঁর ইচ্ছাও রয়েছে। তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ঈমানের ছয় রুকনের একটি। তাকাদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা মানে উহার ভাল-মন্দ উভয়ের প্রতিই বিশ্বাস করা।
শাইখুল ইসলামের উক্তি: وتؤمن الفرقة الناجية - أهل السنة والجماعة - بالقدر خيره وشره নাজী ফিরকা অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করে: এই কথার মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, যারা তাকদীরের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করেনা, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্তর্ভুক্ত নয়। কুরআন ও হাদীসের দলীলের দাবীও তাই। যেমন হাদীসে জিবরীলে এসেছে, জিবরীল যখন নাবী ﷺ কে ঈমান সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন, তখন তিনি বললেন: أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
"তুমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে (১) আল্লাহ পাকের উপর (২) তাঁর ফেরেশতাদের উপর (৩) তাঁর কিতাবসমূহের উপর (৪) তাঁর রসূলদের উপর (৫) আখেরাত বা শেষ দিবসের উপর এবং (৬) তাকদীরের ভাল-মন্দের উপর"। ৬০
এ হাদীসে নাবী ﷺ তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়নকে ঈমানের ষষ্ঠ রুকন হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি ইহা অস্বীকার করবে, সে মুমিন হিসাবে গণ্য হবে না। তেমনি ঈমানের অন্য কোন রুকন অস্বীকার করলেও মুমিন হিসাবে গণ্য হবে না।
তাকদীরের প্রতি ঈমান দু'টি স্তরে বিভক্ত: শাইখুল ইসলাম এখানে উল্লেখ করেছেন যে, তাকদীরের প্রতি ঈমানের সর্বমোট চারটি স্তর রয়েছে। সংক্ষিপ্তাকারে এই স্তরগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ।
(১) প্রত্যেক জিনিস সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার আযালী ইলম। অর্থাৎ মাখলুক সৃষ্টি করার আগে থেকেই আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সকল অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। বান্দারা যেসব আমল করে থাকে, তা সম্পাদন করার পূর্বেই সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার অবগতিও সেই ইলমে আযালীর অন্তর্ভুক্ত।
(২) সেই ইলম অনুযায়ী সবকিছু লাওহে মাহফুযে লিখে রাখা হয়েছে।
(৩) যা কিছু ঘটে, তার প্রত্যেকটির মধ্যেই আল্লাহর (সৃষ্টি ও নির্ধারণগত) ইচ্ছা শামিল থাকে এবং তা আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ক্ষমতাধীন।
(৪) আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইলম, নির্ধারণ এবং ইচ্ছা মোতাবেক সমস্ত মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। আর তিনিই একমাত্র স্রষ্টা। তিনি ব্যতীত সবকিছুই সৃষ্টি। এই হচ্ছে সংক্ষিপ্তাকারে তাকদীরের স্তরসমূহ। এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসছে。

টিকাঃ
৬৩. সহীহ মুসলিম ৮, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 তাকদীর ও শারীয়াত পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয় এবং পাপাচারে নির্ধারণ করা এবং সেগুলোকে অপছন্দ ও ঘৃণা করাও পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়।

📄 তাকদীর ও শারীয়াত পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয় এবং পাপাচারে নির্ধারণ করা এবং সেগুলোকে অপছন্দ ও ঘৃণা করাও পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়।


উহা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে তাঁর এবং তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি তাঁর আদেশ অমান্য করতে এবং পাপাচারে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুত্তাকী, সৎকর্মশীল এবং ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। যারা ঈমান আনয়ন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি কাফেরদেরকে ভালবাসেন না এবং ফাসেক সম্প্রদায়ের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট হন না। তিনি অশ্লীলতার আদেশ করেন না, তাঁর বান্দাদের কুফরী করাকে পছন্দ করেন না এবং ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে ভালবাসেন না।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম যখন তাকদীরের চারটি স্তর যথাক্রমে: ইলম, লিখা, ইচ্ছা করা ও সৃষ্টি করা, এই চারটি বিষয় সাব্যস্ত করলেন এবং আরো সাব্যস্ত করলেন যে, সৃষ্টিজগতে যা কিছু সৃষ্টি ও সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে ও হবে, আল্লাহ তা'আলা উহা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত রয়েছেন, তিনি তা আগেই লিখে রেখেছেন, উহা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন ও ইচ্ছা করেছেন এবং তিনি উহা সৃষ্টি করেছেন, পূর্বোক্ত বক্তব্যে ইহা সাব্যস্ত করার পর এখানে বর্ণনা করছেন যে, উক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে এবং আল্লাহ তা'আলা যে তাঁর বান্দাদেরকে আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেছেন, তাঁর মধ্যে কোন বৈপরিত্য, পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘর্ষ নেই। পাপাচার সংঘটিত হওয়ার নির্ধারণ করা এবং উহাকে ঘৃণা করার মধ্যে কোন পারস্পরিক সংঘর্ষ, বিরোধ ও বৈপরিত্য নেই।
শাইখুল ইসলামের উক্তি: ومع ذلك উহা সত্ত্বেও: অর্থাৎ সকল বস্তু সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অবগতি, সবকিছু নির্ধারণ, সবকিছু লিখা এবং সৃষ্টি করার ইচ্ছা করা ও সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করার হুকুম করেছেন এবং তাঁর নাফরমানি করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আল্লাহর কিতাব রাসূলের সুন্নাহতে এ বিষয়ে বহু দীলল রয়েছে। এগুলোতে তিনি তাঁর আনুগত্য করার আদেশ এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের (শরীয়তের) বিরোধীতা করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা শরীয়ত ও হুকুম-আহকাম প্রেরণ করেছেন এবং সবকিছু সৃষ্টি ও নির্ধারণ করেছেন। এগুলোর মাঝে কোন প্রকার পারস্পরিক সংঘর্ষ, অসংগতি ও বিরোধ নেই। যেমন ধারণা করে থাকে ঐ সমস্ত গোমরাহ সম্প্রদায়, যারা শরীয়তকে তাকদীরের বিপরীত মনে করে।
শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে তাঁর লিখিত অন্যতম একটি রেসালা 'তাদমুরিয়াতে' বলেন: গোমরাহ ফির্কার লোকেরা তাকদীরের বিষয়ে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। অগ্নিপূজক, মুশরিক এবং ইবলীসের দল।
ক) مجوسية অগ্নিপূজক: যারা আল্লাহ তা'আলার তাকদীরকে অস্বীকার করে, তারা এই উম্মতের মাজুসী। যদিও তারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধে বিশ্বাস করে। এই দলের সীমালংঘনকারীরা আল্লাহ তা'আলার ইলম ও ইলম অনুযায়ী সবকিছু লিখে রাখাকে অস্বীকার করেছে। আর মধ্যমপন্থীরা ইলম ও লিখাকে স্বীকার করলেও তারা এই কথা স্বীকার করে না যে, সবকিছুর উপর রয়েছে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা, সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি এবং কুদরতের অধীন। এরাই হলো মুতাযেলা এবং যারা তাদের অনুসরণ করে থাকে।
)খ( মুশরিক: আর যারা তাকদীর ও আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় বিশ্বাসী, কিন্তু শরীয়তের আদেশ ও নিষেধকে অস্বীকার করেছে, তারা হলো মুশরিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন: سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّى ذَاقُوا بَأْسَنَا قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ
"এ মুশরিকরা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে আমরা শির্ক করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও শির্ক করতো না। আর আমরা কোন জিনিসকে হারামও গণ্য করতাম না। এ ধরনের উদ্ভট কথা তৈরী করে এদের পূর্ববর্তী লোকেরাও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা অবশেষে আমার আযাবের স্বাদ গ্রহণ করেছে। এদেরকে বলে দাও, তোমাদের কাছে কোন জ্ঞান আছে কি? থাকলে আমার কাছে পেশ করো। তোমরা তো নিছক ধারণার অনুসরণ করে চলছো। শুধু আন্দাজ করা ব্যতীত তোমাদের কাছে আর কিছুই নেই" (সূরা আন'আম ১৪৮)।
যারা তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ বাতিল করে দেয়, তারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
গ) ইবলীসের দল: এ বিষয়ে তৃতীয় দলটি হচ্ছে ইবলীসের দল। তারা তাকদীর ও শরীয়াত উভয়কেই স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু তারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার শরীয়াত ও তাকদীরকে পরস্পর সাংঘর্ষিক ও বিরোধী মনে করেছে। এর মাধ্যমে তারা হিকমত ও আদালতে ইলাহীয়ার মধ্যে আপত্তি করেছে। যেমন তাদের প্রথম উস্তাদ ইবলীস থেকে উহা উল্লেখ করা হয়েছে।
মোটকথা আহলে বাতিলরা নিজেদের পক্ষ হতে বানিয়ে উপরোক্ত কথা বলে থাকে। হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং সফলকাম লোকেরা তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস করে এবং শরীয়তকেও বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা, প্রত্যেক জিনিসের প্রভু ও মালিক। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই হয়। তিনি যা ইচ্ছা করেন না, তা কখনো হয়না এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। ইলমের মাধ্যমে তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন এবং প্রত্যেক জিনিসকে একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিখে সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
وَهُوَ سُبْحَانَهُ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ وَالْمُحْسِنِينَ وَالْمُقْسِطِينَ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুত্তাকী, সৎকর্মশীল এবং ইনসাফ কারীদেরকে ভালবাসেন: অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রশংসনীয় গুণে গুণান্বিত হয়, যেমন তাকওয়া, সৎকর্ম ন্যায়বিচার-ইনসাফ ইত্যাদি ভাল গুণে বিশেষিত হয়, তাকে ভালোবাসেন।
وَيَرْضَى عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন: যেমন অনেক আয়াতে সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, যারা ঈমান আনয়ন করে এবং সৎ আমল করে তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন ও তাদেরকে ভালবাসেন।
وَلَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ وَلَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ ভালোবাসেন না এবং ফাসেক সম্প্রদায়ের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট হন না: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব স্বভাব ও বৈশিষ্টকে ঘৃণা করেন; যেমন কুফরী, পাপাচার এবং অন্যান্য নিকৃষ্ট স্বভাব, যারা এ জাতীয় স্বভাব ও বৈশিষ্ট দ্বারা বিশেষিত হয়, তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন না।
وَلَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ তিনি অশ্লীলতার আদেশ করেন না: অশ্লীলতা বলতে ঐসব গুনাহ ও পাপের কথা ও কাজ বুঝায়, যা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত।
وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَلَا يُحِبُّ الْفَسَادَ পছন্দ করেন না এবং ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে ভালবাসেন না: কেননা কুফরী ও ফাসাদ অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ এবং তাতে রয়েছে দেশ ও জাতির জন্য অনেক ক্ষতি।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা ঐসব লোকদের প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, যারা মনে করে আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা ও ভালবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যখন কোন জিনিসের ইচ্ছা করেন তখন উহাকে ভালবাসেন বলেই উহার ইচ্ছা করেন এবং কোন জিনিসকে যখন ভালবাসেন তখন উহার অর্থ এই যে, তিনি উহার ইচ্ছা পোষণ করেন। এই কথা একদম বাতিল।
সঠিক কথা হলো আল্লাহ তা'আলার الإرادة (ইচ্ছা) এবং المحبة (ভালবাসা) পরস্পর সম্পৃক্ত নয়। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা ও তাঁর ভালোবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত নয়। এ দু'টির একটি অন্যটিকে আবশ্যক করেনা। আল্লাহ তা'আলা কখনো এমন জিনিসের ইচ্ছা করেন, যা তিনি পছন্দ করেন না এবং এমন জিনিস পছন্দ করেন, যা সংঘটিত করার ইচ্ছা করেন না।
প্রথমটির উদাহরণ হলো যেমন ইবলীস ও তার সৈনিকদেরকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করা এবং আল্লাহ তা'আলার ঐ ব্যাপক ইচ্ছা, যা রয়েছে সৃষ্টিজগতের কিছু কিছু জিনিসের মধ্যে। যদিও তিনি উহাকে ঘৃণা করেন এবং অপছন্দ করেন।
আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো, যেমন তিনি কাফেরদের ঈমান আনয়ন করাকে ভালবাসেন এবং তাদের থেকে আনুগত্যের কাজ সংঘটিত হওয়া পছন্দ করেন, কিন্তু তিনি তাদের থেকে উহা বাস্তবায়ন হওয়ার ইচ্ছা করেননি। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে অবশ্যই তাদের দ্বারা উহা বাস্তবায়ন হতো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00