📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 নাবী ﷺ এর হাউয এবং তার স্থান ও বৈশিষ্ট্য।

📄 নাবী ﷺ এর হাউয এবং তার স্থান ও বৈশিষ্ট্য।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া ؒ বলেন:
وَفِي عَرَصَاتِ الْقِيَامَةِ الْحَوْضُ الْمَوْرُودُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَاؤُهُ أَشَدُّ بَيَاضًا مِنَ اللَّبَنِ وَأَحْلَى مِنَ الْعَسَلِ آنِيَتُهُ عَدَدُ نُجُومِ السَّمَاءِ طُولُهُ شَهْرٌ وَعَرْضُهُ شَهْرٌ مَنْ يَشْرَبُ مِنْهُ شَرْبَةً لَا يَظْمَأُ بَعْدَهَا أَبَدًا
কিয়ামাতের ময়দানে থাকবে নাবী ﷺ এর হাওয। তাঁর অনুসারীরা পানি পান করার জন্য সেখানে উপস্থিত হবে। এই হাউযের পানি হবে দুধের চেয়েও অধিক সাদা, মধুর চেয়েও অধিক মিষ্টি, উহার পানপাত্রের সংখ্যা হবে আকাশের তারকার সমান। এর দৈর্ঘ হবে একমাসের দূরত্বের সমান এবং প্রস্থ হবে এক মাসের দূরত্বের সমান। যে উহা থেকে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসিত হবে না।
ব্যাখ্যা: (৫) কিয়ামাতের দিন আরো যা থাকবে, তার মধ্যে নাবী ﷺ এর হাওয অন্যতম। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া ؒ এখানে হাওযে কাওছারের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: কিয়ামতের ময়দানে থাকবে নাবী ﷺ এর হাওযে কাউছার। তাঁর অনুসারীরা সেখানে পানি পান করার জন্য আগমন করবে।
সহীহ সনদে নাবী ﷺ থেকে এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম ؒ বলেন: চল্লিশজন সাহাবী নাবী ﷺ থেকে হাওযে কাউছারের হাদীস বর্ণনা করেছেন। এই হাদীসগুলোর অনেকগুলোই বা অধিকাংশই সহীহ বুখারীতে রয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম ؒ এর কথা এখানেই শেষ। العرصات এর বর্ণনা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
الحوض শব্দের আভিধানিক অর্থ পানি জমা হওয়ার স্থান। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ঐক্যমতে নাবী হাওয সাব্যস্ত। মুতাযেলারা এতে ভিন্নমত করেছে। তারা নাবী এর হাওয সাব্যস্ত করেনা এবং এ বিষয়ে বর্ণিত সহীহ হাদীসগুলোও কবুল করে না। তারা হাওয সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করে এবং এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ পরিবর্তন করে থাকে।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম হাওযের কতপিয় বৈশিষ্ট বর্ণনা করেছেন, যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এই বৈশিষ্টগুলো একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা সুসাব্যস্ত। যেমন বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত হয়েছে, নাবী বলেন:
حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنَ اللَّبَنِ وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنَ الْمِسْكِ وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلَا يَظْمَأُ أَبَدًا»
"আমার হাওযের প্রশস্ততা হচ্ছে এক মাসের দূরত্বের সমান। এর পানি হবে দুধের চেয়ে সাদা, তার সুঘ্রাণ হবে কস্তুরীর চেয়েও অধিক পবিত্র, উহার পেয়ালার সংখ্যা হবে আকাশের তারকার সমান। যে ব্যক্তি একবার তা থেকে পান করবে সে কখনই পিপাসিত হবেনা। ৫৮

টিকাঃ
৫৮. সহীহ বুখারী ৬৫৭৯, সহীহ মুসলিম ২২৯২।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 সিরাত, তার অর্থ, স্থান এবং এর উপর দিয়ে মানুষের অতিক্রম।

📄 সিরাত, তার অর্থ, স্থান এবং এর উপর দিয়ে মানুষের অতিক্রম।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَالصِّرَاطُ مَنْصُوبٌ عَلَى مَتْن جَهَنَّمَ وَهُوَ الْجِسْرُ الَّذِي بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ يَمُرُّ النَّاسُ عَلَيْهِ عَلَى قَدْرِ أَعْمَالِهِمْ فَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ كَلَمْحِ الْبَصَرِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ كَالْبَرْقِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ كَالرِّيحِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ كَالْفَرَسِ الْجَوَادِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ كَرُكَابِ الْإِبِلِ وَمِنْهُمْ مَنْ يَعْدُو عَدْوًا وَمِنْهُمْ مَنْ يَمْشِي مَشْيًا وَمِنْهُمْ مَنْ يَرْحَفُ زَحْفًا وَمِنْهُمْ مَنْ يُخْطَفُ خَطْفًا وَيُلْقَى فِي جَهَنَّمَ فَإِنَّ الْجِسْرَ عَلَيْهِ كَلَالِيبُ تَخْطَفُ النَّاسَ بِأَعْمَالِهِمْ
কিয়ামাতের দিন জাহান্নামের উপর সিরাত স্থাপন করা হবে। উহা হচ্ছে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে স্থাপিত একটি পুল। লোকেরা নিজ নিজ আমল অনুযায়ী এর উপর দিয়ে অতিক্রম করবে। তাদের কেউ চোখের পলকের গতিতে চলবে, কেউ বিজলির গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে পার হবে, কেউ উটে আরোহীদের গতিতে, কেউ দৌড়ে, কেউ হেঁটে এবং কেউ হামাগুড়ি দিয়ে পার হবে। কাউকে সেখান থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। পুলের উপর থাকবে লোহার অসংখ্য আঁকুড়া বা কাঁটা। এগুলো আমল অনুযায়ী মানুষকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে।
ব্যাখ্যা: (৬) শাইখুল ইসলাম এখানে উল্লেখ করেছেন যে, কিয়ামাতের দিন যা হবে, তার মধ্যে পুলসিরাতের উপর দিয়ে অতিক্রম করার বিষয়টি অন্যতম।
الصراط সিরাত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো প্রশস্ত রাস্তা। আর শারীয়াতের পরিভাষায় পুলসিরাতের পরিচয় শাইখ নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, এটি মূলতঃ জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যকার একটি সেতু। পুলসিরাত কোথায় স্থাপন করা হবে, এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শাইখুল ইসলাম বলেন যে, তা হবে على متن جهنم অর্থাৎ জাহান্নামের আগুনের উপর। ইহার উপর দিয়ে লোকদের অতিক্রম করার অবস্থা সম্পর্কে বলেন, কেউ পার হবে চোখের পলকে, কেউ বা বিজলির গতিতে। অর্থাৎ ঈমান এবং ঐ সমস্ত সৎ আমল অনুপাতে পুলসিরাতের উপরে তাদের অতিক্রমের গতি দ্রুত কিংবা ধীর হবে, যা তারা দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় সম্পাদন করেছিল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দুনিয়াতে দ্বীন ইসলামের উপর টিকে থাকা ও দৃঢ়তা অনুপাতেই পুলসিরাতের উপর তাদের টিকে থাকা এবং অতিক্রম করার বিষয়টি নির্ভর করছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি দুনিয়াতে صراط معنوی সিরাতে মানাভী (আদর্শিক পথ) তথা দ্বীন ইসলামের উপর সুদৃঢ় থাকবে, তারাই কিয়ামতের দিন জাহান্নামের উপর স্থাপিত صراط حسی সিরাতে হিস্সী (বাহ্যিক পথ) পুলসিরাতের উপর দৃঢ়পদ থাকবে। আর দুনিয়াতে যে ব্যক্তি এই ইসলামের পথ থেকে বিচ্যুত হবে, সে কিয়ামতের দিন সিরাতে হিস্সীর উপর তথা পুলসিরাতের উপর থেকে ছিটকে পড়বে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
يعدو عدوا অর্থ হচ্ছে দ্রুত গতিতে দৌড়িয়ে চলবে। আর يزحف زحفا মানে পায়ের বদলে নিতম্বের উপর ভর দিয়ে চলবে। وعليه كلاليب পুলসিরাতের উপর থাকবে বাঁকা মাথা বিশিষ্ট লোহা। کلالیب শব্দটি کلوب এর বহুবচন। کلوب শব্দের 'কাফ' বর্ণে যবর এবং 'লাম' বর্ণে তাশদীদ ও পেশ দিয়ে পড়া হয়েছে। قطف এর 'তোয়া' বর্ণে যবর দিয়ে পড়া হয়েছে। যের দিয়ে পড়াও জায়েয। خطف। মাসদার থেকে এই শব্দটি গঠিত। কোন জিনিসকে খুব দ্রুত উঠিয়ে নিয়ে যাওয়াকে খাতাফ বলা হয়। মন্দ আমলের কারণে মানুষকে পুলসিরাতের উপর থেকে দ্রুত উঠিয়ে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। শুবুহাত এবং শাহওয়াত (সন্দেহ এবং কুপ্রবৃত্তি) মানুষকে দুনিয়াতে সীরাতুল মুস্তাকীম থেকে দ্রুত সরিয়ে ফেলা অনুপাতেই পুলসিরাতের উপরের লোহার বক্র কাঁটাগুলো মানুষকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে। কিয়ামাতের দিন জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে এবং লোকেরা তার উপর দিয়ে অতিক্রম করবে। নাবী থেকে যেহতু এ বিষয়ে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে ঈমান আনয়ন করে।
মুতাযেলী আলিম কাযী আব্দুল জাব্বার এবং তার অনেক অনুসারী জাহান্নামের উপর সিরাত স্থাপনের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেছে। সে বলেছে, উপরোক্ত সিরাত বলতে জান্নাত ও জাহান্নামের দিকে যাওয়ার রাস্তাকে বুঝানো হয়েছে। তাদের মতে আল্লাহ তা'আলা সূরা মুহাম্মাদের ৫-৬ নং আয়াতে বলেছেন:
سَيَهْدِيهِمْ وَيُصْلِحُ بَالَهُمْ وَيُدْخِلُهُمُ الْجَنَّةَ عَرَّفَهَا لَهُمْ
"তিনি অচিরেই তাদের পথপ্রদর্শন করবেন, তাদের অবস্থা শুধরে দিবেন এবং তাদেরকে সেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পরিচয় তিনি তাদেরকে আগেই অবহিত করেছেন" দ্বারা জান্নাতের পথের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা সূরা সাফফাতের ২২-২৩ নং আয়াতে বলেন:
احْشُرُوا الَّذِينَ ظَلَمُوا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَاهْدُوهُمْ إِلَى صِرَاطِ الْجَحِيمِ
কিয়ামাতের দিন আদেশ করা হবে, ধরে নিয়ে এসো যালেমদেরকে, তাদের সহযোগীদেরকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যেসব মাবুদের ইবাদাত করতো। অতঃপর তাদের সবাইকে জাহান্নামের পথ দেখিয়ে দাও
দ্বারা জাহান্নামের দিকে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাদের এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল এবং বিনা দলীলে এর দ্বারা সুস্পষ্ট সহীহ হাদীসগুলোকে পরিত্যাগ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীসের উক্তি থেকে প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করা অপরিহার্য। কোন ক্রমেই বিনা কারণে প্রকাশ্য অর্থ বাদ দিয়ে অন্য অর্থ গ্রহণ করা যাবে না。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00