📄 মহা প্রলয় এবং তাতে সংঘটিতব্য বিষয় সমূহ।
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
إِلَى أَنْ تَقُومَ الْقِيَامَةُ الْكُبْرَى فَتُعَادُ الْأَرْوَاحُ إِلَى الْأَجْسَادِ وَتَقُومُ الْقِيَامَةُ الَّتِي أَخْبَرَ اللَّهُ بِهَا فِي كِتَابِهِ وَعَلَى لِسَانِ رَسُولِهِ وَأَجْمَعَ عَلَيْهَا الْمُسْلِمُونَ فَيَقُومُ النَّاسُ مِنْ قُبُورِهِمْ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا
কবরের ফিতনার পর কারো শাস্তি বা নিয়ামাত মহাপ্রলয় সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। তখন সমস্ত মানুষের রূহগুলোকে তাদের দেহে ফিরিয়ে দেয়া হবে। কিয়ামত সংঘটিত হবে, এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে এবং রসূল তাঁর হাদীসে সংবাদ দিয়েছেন। মুসলিমগণ এ বিষয়ে ইজমা পোষণ করেছেন। 'লোকেরা কিয়ামাতের দিন সমস্ত সৃষ্টির প্রভুর সামনে খালী পায়ে, উলঙ্গ এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় হাযির হবে। ৫০
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এ অধ্যায়ে এবং তার পরবর্তী অধ্যায়সমূহে ঐসব বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা আখেরাতে সংঘটিত হবে। আর এ সব বিষয় কিয়ামাত সংঘটিত হওয়ার পর থেকেই শুরু হবে। মোট ঘর বা বাসস্থান হলো তিনটি।
(১) দুনিয়ার ঘর (دار الدنيا)
(২) বারযাখ তথা কবর জগতের ঘর (دار البرزخ)
(৩) আখেরাতের ঘর (الدار الآخرة)।
এই তিনটি ঘরের প্রত্যেকটির জন্য বিশেষ বিশেষ হুকুম-আহকাম রয়েছে এবং এগুলোর জন্য এমন এমন ঘটনা রয়েছে, যা তাতে সংঘটিত হবে। বারযাখের গৃহে যা হবে, শাইখ তা পূর্বের অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন।
এখানে তিনি ঐসব বিষয়ের আলোচনা শুরু করেছেন, যা আখেরাতের ঘরে সংঘটিত হবে। তিনি বলেন:
কবরের ফিতনার পর কারো শাস্তি অথবা নিয়ামত মহাপ্রলয় সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। কিয়ামাত দু'টি। ছোট কিয়ামত ও বড় কিয়ামত। মৃত্যু হলো ছোট কিয়ামাত। এই ছোট কিয়ামত প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদাভাবে কায়েম হবে। দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর এবং দেহ থেকে রূহ বের হওয়ার দিনই তার উপর এই কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হবে। ৫১
আর বড় কিয়ামাত সমস্ত মানুষের উপর একসাথে কায়েম হবে এবং সব মানুষকে দুনিয়া থেকে একসাথেই উঠিয়ে নিবে। এই দিনকে কিয়ামাত (দন্ডায়মান) দিবস হিসাবে নাম দেয়ার কারণ হলো তাতে শেষ ফুৎকারের সাথে সাথে সকল মানুষ তাদের কবর থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দন্ডায়মান হবে। তাই শাইখুল ইসলাম বলেছেন, তখন রূহগুলোকে দেহের মধ্যে ফিরিয়ে দেয়া হবে। আর এটি তখনই হবে, যখন ইসরাফীল সিঙ্গায় ফুঁ দিবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَن بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَا﴾
"তারপর শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে এবং সহসা তারা নিজেদের রবের সামনে হাযির হবার জন্য নিজেদের কবর থেকে বের হবে। ভীত হয়ে বলবে, হায় আফসোস! কে আমাদেরকে আমাদের সমাধি থেকে উঠিয়ে দাঁড় করালো? (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৫১-৫২)। আল্লাহ তা'আলা সূরা ঘুমারের ৬৮ নং আয়াতে আরো বলেন:
﴿ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ﴾
"অতঃপর আরেকবার শিংগায় ফুঁ দেয়া হবে তখন হঠাৎ সবাই দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে"।
الروح শব্দের বহুবচন হচ্ছে الأرواح অর্থাৎ রূহসমূহ। মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণী যার বদৌলতে বেঁচে থাকে, তার নাম রূহ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ রূহের হাকীকত তথা আসল অবস্থা সম্পর্কে অবগত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي *
"এরা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করছে। বলে দাও, রূহ আমার রবের আদেশ মাত্র”। (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:৮৫)
কিয়ামাত সংঘটিত হবে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে এবং রসূল তাঁর হাদীসে সংবাদ দিয়েছেন। মুসলিমগণ এ বিষয়ে ইজমা পোষণ করেছেন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে কিয়ামাতের দিন সৃষ্টির পুনরুত্থানের দলীলগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং মুসলিমদের ইজমা, মানুষের বোধশক্তি এবং ফিতরাত পরিশুদ্ধ সৃষ্টিগত স্বভাব দ্বারা পুনরুত্থান প্রমাণিত। আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে পুনরুত্থান সম্পর্কে খবর দিয়েছেন, এর উপর দলীল কায়েম করেছেন এবং কুরআনের অধিকাংশ সূরাতেই পুনরুত্থানে অবিশ্বাসীদের প্রতিবাদ করেছেন। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ যেহেতু সর্বশেষ নাবী, তাই তিনি আখেরাতের বিষয়গুলোর এমন খোলাখুলি বিবরণ দিয়েছেন, যা অনেক নাবীর কিতাবসমূহেই পাওয়া যাবে না।
আমলের বিনিময় দেয়া মানুষের বিবেক ও বোধশক্তি দ্বারাই প্রমাণিত। আর শারীয়াত এটিকে সুসাব্যস্ত করেছে। কেননা আল্লাহ তা'আলা কুরআনের অনেক স্থানেই মানুষের বোধশক্তিকে পুনরুত্থানের প্রতি সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা'আলা সেখানে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ কি মনে করে, তাকে বিনা হিসাবে ছেড়ে দেয়া হবে? অথবা তারা কি মনে করে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছেন? তাদেরকে আদেশ-নিষেধ করা হবেনা? তাদেরকে পুরস্কার কিংবা শাস্তি দেয়া হবেনা? আল্লাহ তা'আলার হিকমাতের সাথে মোটেই শোভনীয় ও সঙ্গতিপূর্ণ নয় যে, তিনি মানুষকে অযথা সৃষ্টি করবেন, কোন দায়িত্ব না দিয়েই তাদেরকে ছেড়ে দিবেন, আদেশ-নিষেধ করবেন না এবং তাদের কর্ম অনুপাতে ছাওয়اب বা শাস্তি দিবেন না। আল্লাহর হিকমাত এটি সমর্থন করে না।
এ রকম কোন সম্ভাবনা নাই যে, আল্লাহ তা'আলা সৎকর্মশীলকে অসৎকর্মীর সমান করবেন কিংবা মুসলিমদেরকে অপরাধীদের কাতারে শামিল করবেন। কেননা কতক সৎকর্মশীল ব্যক্তি তার সৎকর্মের বিনিময় পাওয়ার আগেই মৃত্যু বরণ করে এবং কতিপয় অপরাধী তার অপরাধের উপযুক্ত সাজা ভোগ করার আগেই মারা যায়। সুতরাং এমন একটি জগৎ অবশ্যই থাকা দরকার যেখানে উপরোক্ত উভয় শ্রেণীর লোকই ন্যায্য বিনিময় পেয়ে যাবে। পুনরুত্থানে অবিশ্বাসী কাফের হিসাবে গণ্য হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَن لَّن يُبْعَثُوا )
"কাফেররা ধারণা করে বলেছে যে, মরার পরে আর কখনো তাদের জীবিত করে উঠানো হবেনা"। (সূরা তাগাবুন ৬৪:৭)
فَيَقُومُ النَّاسُ مِنْ قُبُورِهِمْ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا : 1019 102 101
কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর লোকেরা সমস্ত সৃষ্টির প্রভুর সামনে খালী পায়ে, উলঙ্গ এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় দন্ডায়মান হবে: حفاة শব্দটি حاف এর বহুবচন। যার পায়ে জুতা কিংবা মোজা থাকে না, তাকে حاف বলায় হয়। عراق )উলঙ্গ, বস্ত্রহীন) ১৬ এর বহুবচন। যার শরীরে কোন কাপড় থাকে না, সেই হচ্ছে । আর غراً শব্দটি أغرل এর বহুবচন। খাতনাবিহীন লোককে আগরাল বলা হয়। যার পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া কেটে খাতনা করা হয়নি, সেই আগরাল। লোকেরা যখন কবর থেকে উঠে হাশরের মাঠে দন্ডায়মান হবে, তখন এই তিনটি বৈশিষ্ট তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। আয়েশা হতে বর্ণিত সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে এই কথা পাওয়া যাচ্ছে। রসূল বলেন:
إنكم تعشرون إلى اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلًا
"কিয়ামাতের দিন নগ্নপদ, উলঙ্গ, এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় তোমাদেরকে আল্লাহর নিকট উপস্থিত করা হবে"। ৫২
টিকাঃ
৫০. সহীহ বুখারী ৪৬২৫, সহীহ মুসলিম ২৮৫৯, তিরমিযী ২৪২৩, নাসাঈ ২০৮৩, মুসনাদে আহমাদ ২০৯৬, দারিমী ২৮৪৪।
৫১. শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া কিয়ামাত এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনার সাথে কিয়ামতের আলামতগুলো উল্লেখ করেননি। কিয়ামতের আলামতগুলো যেহেতু কিয়ামাতের মতই গায়েবী বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত, তাই অন্যান্য আলেমগণ আকীদাহর বিষয়গুলোর সাথে কিয়ামতের বড় বড় আলামতগুলোও উল্লেখ করেছেন। তাই আমরা বিশ্বাস করি যে, কুরআন ও সহীহ হাদীসে কিয়ামাতের যেসমস্ত আলামতের কথা বর্ণিত হয়েছে তা প্রকাশ হওয়ার পূর্বে কিয়ামত সংঘটিত হবে না। কিয়ামতের ছোট আলামতগুলোর অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে। যা এখনও প্রকাশিত হয়নি তা অবশ্যই প্রকাশিত হবে। সহীহ মুসলিম (২৯০১) হুযায়ফা হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন:
اطَّلَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْنَا وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ فَقَالَ مَا تَذَاكَرُونَ قَالُوا تَذْكُرُ السَّاعَةَ قَالَ إِنَّهَا لَنْ تَقُومَ حَتَّى تَرَوْنَ قَبْلَهَا عَشْرَ آيَاتٍ فَذَكَرَ الدُّعَانَ وَالدَّجَّالَ وَالدَّابَّةَ وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا وَنُزُولَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَثَلَاثَةَ حُسُوفٍ خَسْفٌ بِالْمَشْرِقِ وَخَسَفَ بِالْمَغْرِبِ وَحَسْفٌ بِجَزِيرَةِ الْعَرَبِ وَآخِرُ ذَلِكَ نَارٌ تَخْرُجُ مِنَ الْيَمَنِ تَطْرُدُ النَّاسَ إِلَى مَحْشَرِهِمْ
"একদা রসূল আমাদের নিকট আগমন করলেন। আমরা তখন কিয়ামাতের আলামত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন: যতদিন তোমরা দশটি আলামত না দেখতে পাবে ততদিন কিয়ামত হবে না। (১) ধোঁয়া (২) দাজ্জালের আগমন (৩) ভূগর্ভ থেকে নির্গত দাব্বাতুল আরদ্ নামক অদ্ভুত এক জানোয়ারের আগমন ৪) পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় (৫) ঈসা ইবনে মারইয়ামের আগমন (৬) ইয়াজুয-মা'জুযের আবির্ভাব (৭) পূর্বে ভূমিধবস (৮) পশ্চিমে ভূমিধবস (৯) আরব উপদ্বীপে ভূমিধবস (১০) সর্বশেষে ইয়ামান থেকে একটি আগুন বের হয়ে মানুষকে সিরিয়ার দিকে হাঁকিয়ে নিবে"।
আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের বিশ্বাস হচ্ছে কিয়ামাতের এ সমস্ত আলামতের একটিও এখনো প্রকাশিত হয়নি। কিয়ামাতের পূর্বে এগুলো প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত তা সংঘটিত হবে না।
৫২. সহীহ বুখারী ৪৬২৫, সহীহ মুসলিম ২৮৫৯, তিরমিযী ২৪২৩, নাসাঈ ২০৮৩, মুসনাদে আহমাদ ২০৯৬, দারিমী ২৮৪৪।