📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া 📄 এই বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে সমুন্নত, আরো বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, তিনি সমস্ত মাখলূকের উপরে এবং সকল মাখলূকের সাথে। মাখলূকের উপরে হওয়া এবং তাদের সাথে থাকা পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়।

📄 এই বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে সমুন্নত, আরো বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, তিনি সমস্ত মাখলূকের উপরে এবং সকল মাখলূকের সাথে। মাখলূকের উপরে হওয়া এবং তাদের সাথে থাকা পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: فصل: وَقَدْ دَخَلَ فِيمَا ذَكَرْنَاهُ مِنَ الإِيمَانِ بالله الإِيمَانُ بِمَا أَخْبَرَ اللَّهُ بِهِ فِي كِتَابِهِ، وَتَوَاتَرَ عَن رَّسُولِهِ، وَأَجْمَعَ عَلَيْهِ سَلَفُ الأُمَّةِ مِنْ أَنَّهُ سُبْحَانَهُ فَوْقَ سَمَاوَاتِهِ، عَلَى عَرْشِهِ، عَلِيٌّ عَلَى خَلْقِهِ، وَهُوَ سُبْحَانَهُ مَعَهُمْ أَيْنَمَا كَانُوا، يَعْلَمُ مَا هُمْ عَامِلُونَ؛ كَمَا جَمَعَ بَيْنَ ذَلِكَ فِي قَوْلِهِ هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنْ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَلَيْسَ مَعْنَى قَوْلِهِ: (وَهُوَ مَعَكُمْ أَنَّهُ مُخْتَلِطٌ بِالْخَلْقِ؛ فَإِنَّ هَذَا لَا تُوجِبُهُ، اللَّغَةُ، بَلِ الْقَمَرُ آيَةٌ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ مِنْ أَصْغَرِ مَخْلُوقَاتِهِ، وَهُوَ مَوْضُوعٌ فِي السَّمَاءِ، وَهُوَ مَعَ الْمُسَافِرِ وَغَيْرُ الْمُسَافِرِ أَيْنَمَا كَانَ. وَهُوَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ ، رَقِيبٌ عَلَى خَلْقِهِ، مُهَيْمِنٌ عَلَيْهِمْ، مُطَّلِعُ عَلَيْهِم... إلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِن مَّعَانِي رُبُوبَيَّتِهِ.
অনুচ্ছেদ: ইতিপূর্বে আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের বিষয়টি উল্লেখ করেছি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে যেসব বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন, রসূল থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে (প্রচুর সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে) যা বর্ণিত হয়েছে এবং এই উম্মতের সালাফগণ যেসব বিষয়ের উপর একমত হয়েছে, তাতে বিশ্বাস করাও আল্লাহর প্রতি ঈমানের মধ্যে শামিল। তার মধ্যে এও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহের উপরে অবস্থিত আরশের উপর এবং সকল মাখলুকের উপর। সেই সাথে তিনি মাখলুকের সাথেও। তারা যেখানেই থাকে না কেন, আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথেই। তারা যা আমল করে, আল্লাহ তা'আলা তা জানেন। আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতে মাখলুকের উপরে থাকা এবং তাদের সাথে থাকাকে একসাথে একত্র করেছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াতে বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
"আল্লাহই আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। যা কিছু মাটির মধ্যে প্রবেশ করে, যা কিছু তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং যা কিছু আসমান থেকে অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু আসমানে উঠে, তা তিনি জানেন। তোমরা যেখানেই থাকনা কেন তিনি তোমাদের সাথেই"।
وَهُوَ مَعَكُمْ 'তিনি তোমাদের সাথেই' এ কথার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথে মিশে রয়েছেন। আরবী ভাষা এই অর্থকে আবশ্যক করেনা। আল্লাহ মাখলুকের সাথে মিশে আছেন, এই ধারণা এই উম্মাতের সালাফদের ইজমার পরিপন্থী এবং আল্লাহ তা'আলা মানুষকে যেই ফিতরাত (স্বভাব) দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তারও খেলাফ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অথচ আল্লাহর জন্যই সর্বোত্তম উদাহরণ, চন্দ্র আল্লাহর অন্যতম একটি নিদর্শন, আল্লাহর সৃষ্টিরাজির মধ্য হতে ক্ষুদ্র সৃষ্টিসমূহের অন্যতম। ইহাকে রাখা হয়েছে আসমানে। তারপরও চাঁদ ভ্রমণকারীর সাথেও থাকে এবং গৃহে অবস্থানকারীর সাথেও থাকে। ভ্রমণকারী যেখানে অবতরণ করে এবং যেখানেই চলে চাঁদ তার সাথেই থাকে।
আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে থেকেও মাখলুকের নিকটে। তাদের রক্ষক, তাদের সম্পর্কে অবগত এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁর রুবুবীয়াতের অন্যান্য সিফাতের মাধ্যমে তিনি মাখলুকের উপরে এবং তাদের অতি নিকটে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বিশেষভাবে দু'টি মাস'আলা বর্ণনা করেছেন।
(১) আরশের উপর আল্লাহ তা'আলার সমুন্নত হওয়া এবং
(২) তাঁর মাখলুকের সাথে থাকা।
শাইখুল ইসলাম একটি সন্দেহ দূর করার জন্য বিশেষভাবে এ দু'টি মাস'আলার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে থাকা এবং সৃষ্টির সাথে থাকার বিষয়টিকে কেউ কেউ পরস্পর সাংঘর্ষিক মনে করতে পারে। আবার কেউ এই ধারণাও করতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথেই, এর মানে হচ্ছে আল্লাহর সিফাতগুলো মাখলুকদের সিফাতের মতই এবং তিনি আমাদের সাথে একদম মিশে আছেন। যেমন এক মাখলুক অন্য মাখলুকের সাথে মিশে থাকে। সুতরাং প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সমস্ত সৃষ্টির উপরে আরশের উপর সমুন্নত হয়ে আবার সৃষ্টির সাথে না মিশে তাদের অতি নিকটবর্তী হন কিভাবে?
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই সন্দেহের একাধিক জবাব দিয়েছেন:
প্রথম জবাব: আরবদের যেই ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে তা এই অর্থকে আবশ্যক করে না। কেননা শব্দটি ভাষাগত দিক থেকে সাধারণ সান্নিধ্য ও নিকটত্ব অর্থ প্রদান করে; সহাবস্থান, সংমিশ্রণ, লাগালাগি এবং সংস্পর্শ ইত্যাদি অর্থ প্রদান করে না। কেননা আপনি বলে থাকেন, زوجتي معي আমার স্ত্রী আমার সাথেই। অথচ এই কথা বলার সময় আপনি থাকেন একস্থানে, আপনার স্ত্রী থাকে অন্য স্থানে। আপনারা আরো বলে থাকেন, مازلنا نسير والقمر معنا আমরা পথ চলছিলাম, চাঁদ আমাদের সাথেই ছিল।
অথচ চাঁদ থাকে আসমানে, থাকে মুসাফিরের সাথে এবং থাকে স্বদেশে অবস্থানকারীর সাথেও। সাধারণ একটি সৃষ্টি চাঁদের ব্যাপারে যদি এটি বলা সঠিক হয়, তাহলে যেই মহান স্রষ্টা সবচেয়ে বড় তাঁর শানে এটি বলা কেন জায়েয হবে না যে, তিনি আসমানের উপরে আরশের উপর থেকেও আমাদের সাথে?
দ্বিতীয় জবাব: আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথে একদম মিশে আছেন, এই কথা উম্মতের সালাফে সালেহীন তথা সাহাবী, তাবেঈ এবং তাদের অনুসারীদের ইজমার পরিপন্থী। অথচ তারা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ এবং উত্তম আদর্শ। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত, সকল সৃষ্টির উপরে এবং তাদের থেকে আলাদা। তারা আরো একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা ইলমের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সাথে রয়েছেন। তারা আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَهُوَ مَّعَكُمۡ এর ব্যাখ্যা এভাবেই করেছেন। অর্থাৎ জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথেই।
তৃতীয় জবাব: আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে নন বরং তাদের সাথে মিশে আছেন, এই কথা মানুষের ঐ স্বভাব-প্রকৃতির দাবীর পরিপন্থী, যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে যেই স্বভাব স্থাপন করেছেন, এই বিশ্বাস তার বিপরীত। কেননা আল্লাহ তা'আলা যে মাখলুকের উপরে, সৃষ্টিগত স্বভাব অনুযায়ী মাখলুক এই কথার স্বীকৃতি প্রদান করে। মানুষ বিপদাপদ ও সঙ্কটময় মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণাপন্ন হওয়ার সময় উপরের দিকে অন্তরকে ধাবিত করে। ডান দিকে কিংবা বাম দিকে দৃষ্টিপাত করেনা। এ বিষয়ে কারো দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। এটি কেবল ঐ সৃষ্টিগত স্বভাবের দাবীতেই করে থাকে, যা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।
চতুর্থত জবাব: আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে যে সংবাদ দিয়েছেন এবং রসূল ﷺ মুতাওয়াতির সূত্রে যা বর্ণিত হয়েছে, এই ধারণা তার বিপরীত। কুরআন ও হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা সমস্ত সৃষ্টির উপরে এবং আরশেরও উপরে। সেই সাথে তিনি সৃষ্টির সাথেও তারা যেখানেই থাকুক না কেন। মুতাওয়াতির হাদীস,
هو ما رواه جماعة تحيل العادة تواطؤهم على الكذب عن مثلهم من الابتداء إلى الانتهاء
যার সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন একদল রাবী তাদের অনুরূপ আরেক দল রাবী থেকে বর্ণনা করেছেন, মিথ্যার উপর যাদের একমত হওয়া সাধারণত অসম্ভব হয়।
আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে এবং তাদের সাথে, এ বিষয়ে অনেক আয়াত এবং বহু হাদীস রয়েছে। সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াত তার মধ্যে অন্যতম, যা শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উপরে উল্লেখ করেছেন।
وَهُوَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ رَقِيبٌ عَلَى خَلْقِهِ، مُهَيْمِنٌ عَلَيْهِمْ مُطَّلِعٌ عَلَيْهِم আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে থেকেও মাখলুকের নিকটে। তাদের পর্যবেক্ষক এবং তাদের সম্পর্কে অবগত: এখানে তিনি পূর্বের কথাকেই পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন। এর পূর্বে তিনি বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরশের উপরে এবং মাখলুকের সাথে। এখানেও তিনি আল্লাহ তা'আলার অতি সুন্দর নাম সমূহের মধ্য হতে الرقيب (পর্যবেক্ষক) এবং المهيمن (সংরক্ষক)-এই নাম দু'টি উল্লেখ করে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটেই। আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ১ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর কড়া নজর রাখেন"।
এখানে رقيب অর্থ হচ্ছে তিনি তাঁর বান্দাদের সকল অবস্থার পর্যবেক্ষণ করেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটে।
আল্লাহ তা'আলা সূরা হাশরের ২৩ নং আয়াতে আরো বলেন:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ
"আল্লাহই সেই মহান সত্তা, যিনি ছাড়া কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি বাদশাহ, অতীব পবিত্র, সকল দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, হেফাযতকারী, পরাক্রমশালী, প্রবলশক্তিধর (শক্তির মাধ্যমে সবকিছুকে সংশোধনকারী) এবং অতীব মহিমান্বিত"।
إلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِن مَّعَانِي رُبُوبَيَّتِهِ আল্লাহ তা'আলা তাঁর রুবুবীয়াতের অন্যান্য সিফাতের মাধ্যমে তিনি মাখলুকের উপরে এবং তাদের অতি নিকটে:
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার রুবুবীয়াতের দাবী হচ্ছে তিনি স্বীয় সত্তাসহ সব সৃষ্টির উপরে, তিনি বান্দাদের সকল কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবগত। সেই সাথে তিনি তাঁর ইলমের মাধ্যমে তাদের অতি নিকটে এবং তিনি তাদেরকে সকল দিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছেন। তিনি তাদের সকল বিষয় পরিচালনা করেন, তাদের আমলসমূহ সংরক্ষণ করেন এবং তার বিনিময় প্রদান করেন。

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া 📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টির উপরে এবং মাখলূকের সাথে থাকার ব্যাপারে যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তাঁর আসমানে থাকার অর্থ ও তার দলীলসমূহ।

📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টির উপরে এবং মাখলূকের সাথে থাকার ব্যাপারে যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তাঁর আসমানে থাকার অর্থ ও তার দলীলসমূহ।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَكُلُّ هَذَا الْكَلَامِ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ مِنْ أَنَّهُ فَوْقَ الْعَرْشِ وَأَنَّهُ مَعَنَا حَقٌّ عَلَى حَقِيقَتِهِ لَا يَحْتَاجُ إِلَى تَحْرِيفِ وَلَكِنْ يُصَانُ عَنِ الظُّنُونِ الْكَاذِبَةِ مِثْل أَنْ يُظَنَّ أَنْ ظَاهِرَ قَوْلِهِ : (فِي السَّمَاءِ أَنَّ السَّمَاءَ تُظِلُّهُ أَوْ تُقِلُّهُ ، وَهَذَا بَاطِلٌ بِإِجْمَاعِ أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْإِيمَانِ فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَهُوَ الَّذِي ( يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولَا وَيُمْسِكُ السَّمَاءَ أَنْ تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ) (وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ)
আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন, তিনি আরশের উপরে। আরো বলেছেন যে, তিনি আমাদের সাথে। প্রকৃতপক্ষেই তিনি আরশের উপরে এবং প্রকৃতপক্ষেই তিনি আমাদের সাথে। এইসব কথার তাহরীফ (পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন) করার প্রয়োজন নেই। তবে আল্লাহ তা'আলার কালামকে বাতিল ধারণা থেকে সংরক্ষণ করতে হবে। যেমন في السماء অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমানে, এই কথা থেকে কেউ ধারণা করতে পারে যে, আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করে আছে অথবা আসমান আল্লাহকে ঢেকে রেখেছে ও ছায়া দিচ্ছে। আলেম ও মুমিনদের সর্ব সম্মতিক্রমে এই কথা বাতিল। কেননা আল্লাহ তা'আলার কুরসী সমস্ত আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। (সূরা বাকারা ২:২৫৫)
তিনি (আল্লাহ) সেই সত্তা, যিনি আকাশ ও পৃথিবীকে অনড় রেখেছেন, যাতে ওরা স্থানচ্যুত না হয়। (সূরা ফাতির ৩৫:৪১)
আর তিনিই আকাশকে এমনভাবে ধরে রেখেছেন, যার ফলে তাঁর হুকুম ছাড়া তা পৃথিবীর উপর পতিত হয় না”। (সূরা হজ্জ ২২:৬৫)
"তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী তাঁর হুকুমেই সুপ্রতিষ্ঠিত”। (সূরা রূম ৩০:২৫)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সম্পর্কে যেই সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আরশের উপরে এবং তিনি আমাদের সাথেও, এ বিষয়ে যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, শাইখুল ইসলাম এখানে তা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেমন সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আরশের উপরে এবং তিনি আমাদের সাথেও, উহার উপর ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব। এই কথার তাবীল (ব্যাখ্যা) করা জায়েয নয় এবং উহার বাহ্যিক অর্থকে পরিবর্তন করাও বৈধ নয়। যেমন ব্যাখ্যা করে থাকে জাহমীয়াদের মুআত্তিলা সম্প্রদায় এবং মুতাযেলা ও তাদের অনুরূপ ফির্কার লোকেরা। তারা ধারণা করে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতপক্ষে আরশের উপরে সমুন্নত নন; বরং আরশের উপর সমুন্নত হওয়া মাজায তথা রূপকার্থবোধক। তাই তারা الاستواء على العرش আরশের উপর আল্লাহ তা'আলার সমুন্নত হওয়ার ব্যাখ্যা এভাবে করে থাকে যে, الاستيلاء على الملك অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাজত্ব দখল করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে রয়েছেন, এই কথার ব্যাখ্যায় তারা বলে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে علو القهر والقدرة অর্থাৎ আল্লাহর প্রতাপ, শক্তি ও তাঁর ক্ষমতা সকলের উপরে। তারা অনুরূপ আরো এমন বাতিল ব্যাখ্যা করে থাকে, যা আল্লাহ তা'আলার কালামকে তার আসল অর্থ থেকে স্থানান্তরের শামিল।
বিদ'আতীদের কেউ কেউ বলে থাকে যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের সাথে, এই কথার অর্থ হচ্ছে তিনি সর্বত্র বিরাজমান, উপস্থিত এবং তিনি প্রত্যেক স্থানেই রয়েছেন। যেমন বলে থাকে জাহমীয়াদের সর্বেশ্বরবাদী সম্প্রদায় এবং অন্যরা। আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার অনেক উর্ধ্বে।
আল্লাহ তা'আলার এ সম্পর্কিত কালামকে বাতিল ধারণা থেকে সংরক্ষণ করতে হবে। যেমন فى السماء অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমানে, এই কথা থেকে কেউ ধারণা করতে পারে যে, আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করে আছে অথবা আসমান আল্লাহকে ঢেকে রাখছে ও ছায়া দিচ্ছে: এখানে تقله অর্থ হচ্ছে تحمله 'তাকে বহন করছে'। আর نظله মানে تستره 'তাকে ঢেকে রেখেছে'। 'ছায়া' বলা হয় ঐ জিনিসকে, যা তোমাকে উপরের দিক থেকে ঢেকে রাখে। আল্লাহ তা'আলা আসমানে থাকার অর্থ এই নয় যে, আসমান তাঁকে বহন করছে, (নাউযুবিল্লাহ) এবং আসমান তাঁকে ঢেকে রেখেছে ও ছায়া দিচ্ছে। যে ব্যক্তি এই ধারণা পোষণ করবে, সে দুই কারণে মারাত্মক ভুলের মধ্যে পতিত হবে।
প্রথম কারণ: আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করছে অথবা আল্লাহ তা'আলাকে ঢেকে রেখেছে, এই ধারণা আলেমদের ও ঈমানদারদের ইজমার পরিপন্থী। আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে এবং তাঁর সৃষ্টির বাইরে বা তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। তাঁর পবিত্র সত্তার মধ্যে মাখলুকের কোন স্বভাব নেই এবং সৃষ্টির মধ্যেও তাঁর যাতের কিছুই নেই। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ
"তোমরা কি নিরাপত্তা পেয়েছ যে, আসমানে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরসহ ভূমিকে ধসিয়ে দিবেন না? (সূরা মুলক ৬৭:১৬-১৭)
এই আয়াতের ব্যাখ্যা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে যে, এখানে আসমান দ্বারা যদি আমাদের উপরে নির্মিত আসমান উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এখানেও হরফে জারটি على অর্থে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ على السماء তা'আলা আসমানের উপরে'। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ
"এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের মধ্যে শুলিবিদ্ধ করবো"। এখানেও فى হারফে জারটি على অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের উপর শুলিবিদ্ধ করবো।
আর যদি السماء দ্বারা العلو (উপর) উদ্দেশ্য হয়, তাহলে فى السماء অর্থ হবে فى العلو অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা উপরে। (আল্লাহই সর্বাধিক জানেন)
দ্বিতীয় কারণ: আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করছে এবং আসমান তাঁকে ঢেকে রেখেছে, এই ধারণা কুরআনের ঐসব সুস্পষ্ট দলীলের পরিপন্থী, যা আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও সৃষ্টির প্রতি তাঁর অমুখাপেক্ষীতার প্রমাণ করে। বরং সকল সৃষ্টিই আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)
"আল্লাহ তা'আলার কুরসী সমস্ত আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে” (সূরা বাকারা ২:২৫৫)।
আরশের মধ্যে কুরসী একটি বিশাল সৃষ্টি। ইহা আসমান ও যমীনের চেয়ে বড়। আরশ কুরসীর চেয়েও অনেক বড়। আসমান ও যমীনসমূহ যদি কুরসীর চেয়ে ছোট হয়, কুরসী যদি আরশের চেয়ে ছোট হয় এবং আল্লাহ তা'আলা যেহেতু সবকিছু থেকে বড়, তাহলে আসমান কিভাবে আল্লাহকে তার নিজের মধ্যে পুরে রাখবে বা তাঁকে বহন করবে অথবা ছায়া দিবে কিংবা ঢেকে রাখবে? আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَن تَزُولَا، وَلَئِن زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِّن بَعْدِهِ ﴾
"আসলে আল্লাহই আকাশ ও পৃথিবীকে অটল ও অনড় রেখেছেন। আসমান ও যমীন যদি স্বীয় স্থান থেকে সরে যায়, তাহলে আল্লাহর পরে আর কেউ তাদেরকে স্থির রাখার ক্ষমতা রাখে না"। (সূরা ফাতির ৩৫:৪১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَيُمْسِكُ السَّمَاءَ أَن تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ
"আর তিনিই আকাশকে এমনভাবে ধরে রেখেছেন, যার ফলে তাঁর হুকুম ছাড়া তা পৃথিবীর উপর পড়ে যায় না”। (সূরা হাজ্জ ২২:৬৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَن تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ﴾
"আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এও রয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী তাঁর হুকুমেই সুপ্রতিষ্ঠিত” (সূরা রূম ৩০: ২৫)।
উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আসমান ও যমীন আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আল্লাহই আসমানকে ধরে রেখেছেন, যাতে উহা স্বীয় স্থান থেকে সরে না যেতে পারে এবং তিনি আসমানকে আটকিয়ে রেখেছেন, যাতে উহা যমীনের উপর পড়ে না যায়। একমাত্র আল্লাহর আদেশেই আসমান দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং ইহা জানার পর এই কথা বোধগম্য নয় যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের প্রতি মুখাপেক্ষী এবং আসমান তাঁকে বহন করছে কিংবা ছায়া দিচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা এ বাতিল ধারণার অনেক উর্ধ্বে।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া 📄 এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হওয়া ও সৃষ্টির উপরে থাকা শারীয়াত পরিপন্থী নয়।

📄 এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হওয়া ও সৃষ্টির উপরে থাকা শারীয়াত পরিপন্থী নয়।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَقَدْ دَخَلَ فِي ذَلِكَ الْإِيمَانُ بِأَنَّهُ قَرِيبٌ مُجِيبٌ كَمَا جَمَعَ بَيْنَ ذَلِكَ فِي قَوْلِهِ وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ، وَقَوْلِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ( إِنَّ الَّذِي تَدْعُونَهُ أَقْرَبُ إِلَى أَحَدِكُمْ مِنْ عُنُقِ رَاحِلَتِهِ ) وَمَا ذُكِرَ فِي الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ مِنْ قُرْبِهِ وَمَعِيَّتِهِ لَا يُنَافِي مَا ذُكِرَ مِنْ عُلُوِّهِ وَفَوْقِيَّتِهِ فَإِنَّهُ سُبْحَانَهُ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ فِي جَمِيعِ نُعُوتِهِ وَهُوَ عَلِيٌّ فِي دُنُوِّهِ قَرِيبٌ فِي عُلُوهِ
আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের অতি নিকটবর্তী হন এবং তিনি তাদের আহবানে সাড়া দেন। আল্লাহ তা'আলার এই সিফাত দু'টির প্রতি বিশ্বাস করা আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তিনি নিজেকে যেসব সুউচ্চ গুণাবলী দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সেগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন করার মধ্যে শামিল। যেমন আল্লাহ তা'আলা ঐ দু'টি সিফাতকে অর্থাৎ মাখলুকের নিকটবর্তী হওয়া এবং তাদের আহবানে সাড়া দেয়াকে একই আয়াতে একত্র করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ﴾ "আর হে নাবী! আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাকের জবাব দেই” (সূরা বাকারা ২:১৮৬) নাবী বলেন:
إِنَّ الَّذِي تَدْعُونَهُ أَقْرَبُ إِلَى أَحَدِكُمْ مِنْ عُنُقِ رَاحِلَتِهِ "তোমাদের কেউ বাহনে আরোহন করা অবস্থায় তার বাহনের ঘাড়ের যত নিকটবর্তী থাকে, তোমরা যাকে আহবান করছো, তিনি তার চেয়েও অধিক নিকটে”। ৪৫
আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটে ও সাথে থাকার বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহয় যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা ঐসব আয়াত ও হাদীসের পরিপন্থী নয়, যাতে বলা হয়েছে যে, তিনি মাখলুকের উপরে রয়েছেন। কেননা আল্লাহর সমস্ত সুউচ্চ সিফাতের কোনো সূদশ নেই। তিনি নিকটে থেকেও সৃষ্টির উপরে এবং উপরে থেকেও তাদের নিকটে।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির উপরে এবং তিনি স্বীয় আরশের উপর সমুন্নত। পূর্বোক্ত অধ্যায়সমূহে শাইখুল ইসলাম দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে ইহা প্রমাণ করার পর এই অধ্যায়ে বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা উপরে, এই বিশ্বাসের সাথে আরো বিশ্বাস করা জরুরী যে, তিনি মাখলুকের অতি নিকটে। আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটে, এই কথা বিশ্বাস করাও আল্লাহ তা'আলার প্রতি এবং আল্লাহর সুউচ্চ সিফাতসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অন্তর্ভুক্ত। তিনি মাখলুকের অতি নিকটে এবং তিনি মাখলুকের দু'আ শ্রবণ করেন। আল্লাহ তা'আলা এ দু'টি বিশেষণকে একসাথে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ নিকটে থাকা ও দু'আ শ্রবণ করা, এ দু'টি বিশেষণ আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ "আর হে নাবী! আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের উচিৎ আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার উপর ঈমান আনয়ন করা। এতে আশা করা যায় যে, তারা সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে"।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, জনৈক লোক নাবী নিকট আগমন করল। সে বলল: হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ কি আমাদের নিকটে যে, আমরা তাঁকে নিরবে ডাকবো? না কি তিনি আমাদের থেকে অনেক দূরে যে, উঁচু আওয়াজে ডাকবো?
নাবী তার এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে চুপ থাকলেন। তখন উপরোক্ত আয়াত নাযিল হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ফإني قريب আমি আহবানকারীর অতি নিকটে। সে যখন আমাকে ডাকে, আমি তখন তার ডাকে সাড়া দেই।
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, দু'আ চুপিসারেই করা উচিৎ। দু'আতে আওয়াজ উঁচু করার কোন প্রয়োজন নেই। যেমন নাবী বলেছেন: إِنَّ الَّذِي تَدْعُونَهُ أَقْرَبُ إِلَى أَحَدِكُمْ مِنْ عُنُقِ رَاحِلَتِهِ
"তোমাদের কেউ বাহনে আরোহন করা অবস্থায় তার বাহনের ঘাড়ের যত নিকটবর্তী থাকে, তোমরা যাকে আহবান করছো, তিনি তার চেয়েও অধিক নিকটে"। এই হাদীসের ব্যাখ্যা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসে দলীল পাওয়া যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে যে ব্যক্তি দু'আ করে, তিনি জবাব দেয়ার মাধ্যমে তার নিকটবর্তী হন। এই নিকটবর্তী হওয়া আল্লাহ তা'আলা উপরে থাকার পরিপন্থী নয়। এ জন্যই শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটে ও সাথে থাকার বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহয় যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা ঐসব আয়াত ও হাদীসের পরিপন্থী নয়, যাতে বলা হয়েছে যে, তিনি মাখলুকের উপরে রয়েছেন। কেননা সবগুলোই সত্য। সত্য বিষয় কখনো পরস্পর বিরোধী হয় না। আল্লাহ তা'আলার সুউচ্চ সিফাতের কোন সূদশ নেই।
আল্লাহ তা'আলার সিফাতের ব্যাপারে এই কথা বলা যাবে না যে, তিনি যখন সৃষ্টির উপরে থাকবেন, তখন মাখলুকের সাথে থাকেন কিভাবে? কেননা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে ভুল ধারণার কারণেই এই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ভুল ধারণাটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলাকে মাখলুকের সাথে কিয়াস করা। এই কিয়াস বাতিল। কেননা لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ আল্লাহ তা'আলার কোন সদৃশ নেই।
অতএব একই সাথে উপরে ও নিকটে থাকা আল্লাহ তা'আলার সুমহান সিফাতের মধ্যে মিলিত হতে পারে। কেননা তিনি সর্বাধিক মহান, সবচেয়ে বড়, মহামহিম এবং তিনি সমস্ত সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন। একজন বান্দার হাতে একটি সরিষার দানা যেমন, বিশাল বিশাল সাতটি আসমান আল্লাহ তা'আলার হাতের মধ্যে ঠিক ঐ পরিমাণ স্থান দখল করে। সুতরাং যার বড়ত্বের কিছু দিক এ রকমই, তিনি কত বড়!! যিনি এত বড়, তাঁর জন্য আরশের উপরে থাকা এবং যখন ইচ্ছা আরশের উপরে থেকেই মাখলুকের নিকবর্তী হওয়া কিভাবে অসম্ভব হতে পারে?
আল্লাহ তা'আলা علي في دنوه قريب في علوه "নিকটে থেকেও উপরে এবং উপরে থেকেও নিকটে"। কুরআন ও সুন্নাহর দলীলগুলো এ কথারই প্রমাণ করে। এই কথার উপর মুসলিম মিল্লাতের আলেমগণের ইজমা সংঘটিত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সুমহান সিফাত হচ্ছে علي في دنوه "তিনি মাখলুকের নিকটে থাকা অবস্থায়ও উপরে থাকেন" এবং قريب في علوه "আরশের উপরে থাকা অবস্থায়ও মাখলুকের নিকটে থাকেন"。

টিকাঃ
৪৫. সহীহ: মুসনাদে আহমাদ ১৯৫৯৯, সহীহ মুসলিম ২৭০৪, আবু দাউদ ১৫২৬।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া 📄 এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, কুরআন প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা‘আলার কালাম।

📄 এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, কুরআন প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা‘আলার কালাম।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَمِنَ الْإِيمَانِ بِاللَّهِ وَكُتُبِهِ الْإِيمَانُ بِأَنَّ الْقُرْآنَ كَلَامُ اللَّهِ مُنَزَّلٌ غَيْرُ مَخْلُوقَ مِنْهُ بَدَأَ وَإِلَيْهِ يَعُودُ وَأَنَّ اللَّهَ تَكَلَّمَ بِهِ حَقِيقَةً وَأَنَّ هَذَا الْقُرْآنَ الَّذِي أَنْزَلَهُ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ كَلَامُ اللَّهِ حَقِيقَةً لَا كَلَامُ غَيْرِهِ وَلَا يَجُوزُ إِطْلَاقُ الْقَوْلِ بِأَنَّهُ حِكَايَةٌ عَنْ كَلَامِ اللَّهِ أَوْ عِبَارَةٌ بَلْ إِذَا قَرَأَهُ النَّاسُ أَوْ كَتَبُوهُ فِي الْمَصَاحِفِ لَمْ يَخْرُجْ بِذَلِكَ عَنْ أَنْ يَكُونَ كَلَامُ اللَّهِ تَعَالَى حَقِيقَةً فَإِنَّ الْكَلَامَ إِنَّمَا يُضَافُ حَقِيقَةً إِلَى مَنْ قَالَهُ مُبْتَدِنَا لَا إِلَى مَنْ قَالَهُ مُبَلِّغَا مُؤَدِّيًا وَهُوَ كَلَامُ اللَّهِ حُرُوفُهُ وَمَعَانِيهِ لَيْسَ كَلَامُ اللَّهِ الْحُرُوفِ دُونَ الْمَعَانِي وَلَا الْمَعَانِي دُونَ الْحُرُوفِ
আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান এবং তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করার মধ্যে এ বিশ্বাস করাও শামিল যে, কুরআন আল্লাহর কালাম। কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিল হয়েছে। উহা আল্লাহর কালাম ও সিফাত, মাখলুক নয়। উহা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এসেছে এবং আখেরী যামানায় তাঁর দিকেই ফিরে যাবে। কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতপক্ষেই কথা বলেছেন। এ কুরআন আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ এর উপর নাযিল করেছেন। উহা প্রকৃত অর্থেই আল্লাহর কালাম; অন্যের কালাম নয়।৪৬
কুরআনের ব্যাপারে এ কথা বলা জায়েয হবে না যে, এটি কেবল আল্লাহর কালামের বিবরণ অথবা আল্লাহ তা'আলার সত্তায় যে কালাম প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তা প্রকাশের মাধ্যম। মানুষ এটি পাঠ করলেই কিংবা কাগজে লিখলেই তা আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত কালাম হতে বের হয়ে যায় না। কেননা কোন কালাম সর্বপ্রথম যার নিকট থেকে শুরু হয়, ঐ কালামকে তার দিকেই সম্বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে যে উক্ত কালামকে অন্যের নিকট পৌছিয়ে দেয়, তার দিকে সেই কালামের সম্বন্ধ হয় না। কুরআনের অক্ষরগুলো এবং অর্থসমূহ আল্লাহ তা'আলারই কালাম। কুরআনের মর্মার্থগুলো ব্যতীত শুধু অক্ষরগুলোই যে আল্লাহর কালাম, তা নয় এবং উহার অক্ষরগুলো ছাড়া শুধু মর্মার্থগুলোই যে তাঁর কালাম, তাও নয়; বরং অক্ষরসমূহ এবং মর্মার্থসমূহ মিলেই আল্লাহর কালাম।
ব্যাখ্যা: পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে যে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের রূকনসমূহের অন্যতম। ঈমানের এ দু'টি মূলনীতির মধ্যে এ বিশ্বাসও শামিল যে, কুরআন আল্লাহর কালাম। কেননা আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আল্লাহর সুমহান সিফাতগুলোর প্রতি ঈমানকেও শামিল করে। আল্লাহর কালাম তাঁর সুমহান সিফাতসমূহের মধ্যেই গণ্য। কালামকে আল্লাহ তা'আলা নিজের দিকে সম্বন্ধিত করেছেন। সিফাতকে তার মাউসুফের দিকে ইযাফাত করার যে নিয়ম রয়েছে, এটি হচ্ছে সেই নিয়মের ইযাফত। আল্লাহর সিফাতসমূহ মাখলুক নয়। সুতরাং আল্লাহর কালামও মাখলুক নয়।
অনেক ফির্কা এই মাসআলায় মতভেদ করেছে। তাদের মতে কুরআন মাখলুক। (নাউযুবিল্লাহ)। যারা কুরআনকে মাখলুক বলে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া তাদের কতিপয়ের মত এ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন।
এক. জাহমীয়াদের মতামত: তারা বলে থাকে, আল্লাহ তা'আলা কথা বলেন না। তিনি অন্যের মধ্যে কালাম সৃষ্টি করেছেন। সেই কালামকেই তার দিকে সম্বন্ধ করে বর্ণনা করা হয়। তাই তাদের মতে রূপক অর্থে আল্লাহ তা'আলার দিকে কালামের সম্বন্ধ করা হয়, প্রকৃত অর্থে নয়। কেননা তিনি কালাম সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তিনি কথা বলেন মানে অন্যের মধ্যে কথা সৃষ্টি করেন।
আল্লাহর কালাম সম্পর্কে এই কথা বাতিল। এই কথা কুরআন ও হাদীসের দলীল বিরোধী এবং মানুষের বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা বোধগম্য নয়। সালাফদের কথা এবং মুসলিমদের ইমামগণের মতেরও বিরোধী। কেননা প্রকৃতপক্ষে যে কথা বলতে পারে না অথবা যার গুণাবলীর মধ্যে 'কথা বলা' বিশেষণ নেই, তাকে মুতাকাল্লিম (বক্তা) বলা হয় না। সুতরাং কিভাবে এই কথা বলা যেতে পারে যে, قال الله "আল্লাহ বলেছেন", অথচ বাস্তবে এর প্রবক্তা আল্লাহ তা'আলা নন; বরং অন্য কেউ? কিভাবেই বা এটি বলা জায়েয হতে পারে যে, هذا كلام الله "এটি আল্লাহর কালাম", অথচ বাস্তবে তা অন্যের কালাম; আল্লাহর নয়?!
শাইখুল ইসলাম বলেন, কুরআন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে শুরু হয়েছে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে। কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতপক্ষেই কথা বলেছেন। তিনি এ কুরআন মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিল করেছেন, উহা প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর কালাম; অন্যের কালাম নয়: এই বক্তব্যের মাধ্যমে শাইখের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জাহমীয়া ফির্কার প্রতিবাদ করা। তারা বলে, কুরআন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে শুরু হয়েছে এবং তিনি কুরআনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কথা বলেননি; বরং রূপক অর্থে কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলা হয়েছে। অথচ উহা অন্যের কালাম। আল্লাহর দিকে কুরআনকে সম্বন্ধ করার কারণ হলো, উহা আল্লাহর সৃষ্টি।
কুরআন আল্লাহর নিকট থেকে শুরু হয়েছে, এ কথার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা থেকেই তা বের হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি এর মাধ্যমে কথা বলেছেন। এখানে من হরফে জারটি সীমানার শুরু বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
তাঁর দিকেই ফিরে যাবে: অর্থাৎ কুরআন পুনরায় আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে। কেননা আখেরী যামানায় কুরআন উঠিয়ে নেয়া হবে। মানুষের অন্তরে কুরআনের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এবং কাগজেও লিখা থাকবে না। এটি কিয়ামাতের অন্যতম আলামত।
অথবা কুরআন আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, এ কথার অর্থ এটাও হতে পারে যে, কুরআনকে কেবল আল্লাহর দিকেই সম্বন্ধ করা হবে।
দুই. কুল্লাবিয়া সম্প্রদায়ের মত: অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া আব্দুল্লাহ বিন সাঈদ বিন কুল্লাবের অনুসারী কুল্লাবিয়া সম্প্রদায়ের মতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তারা বলে কুরআন হচ্ছে আল্লাহর কালামের বিবরণ। তাদের মতে, كلام الله هو المعنى القائم في نفسه لازم لذاته كلزوم الحياة والعلم "আল্লাহর কালাম বলতে এমন মর্মার্থ উদ্দেশ্য, যা আল্লাহর পবিত্র সত্তার সাথে যুক্ত। আল্লাহর হায়াত এবং ইলমের মতই এটি তাঁর সত্তার জন্য আবশ্যক। আল্লাহর কালাম তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত নয়। আল্লাহ তা'আলার সত্তার মধ্যে এই মর্মার্থটি মাখলুক তথা সৃষ্টি নয়। অক্ষর দ্বারা গঠিত শব্দমালা এবং সেগুলো উচ্চারণের আওয়াজসমূহ সৃষ্টি। এগুলো আল্লাহর কালামের হেকায়াত (বিবরণ); এগুলো হুবহু আল্লাহর কালাম নয়।
তিন. আশায়েরাদের মত: আবুল হাসান আল-আশআরী এর অনুসারীগণ বলে থাকে, কুরআন আল্লাহর কালাম প্রকাশের ইবারাত বা মর্মার্থ ও তাৎপর্য। সুতরাং তাদের মতে আল্লাহর কালাম হচ্ছে এমন এবারত বা মর্মার্থ ও তাৎপর্য, যা আল্লাহর পবিত্র সত্তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আর এই মর্মার্থ ও তাৎপর্য মাখলুক নয়। আমরা যেই শব্দগুলো পাঠ করি, তা আল্লাহ তা'আলার সত্তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত মর্মাথ ও তাৎপর্যেরই নাম। আমাদের দ্বারা পঠিত শব্দগুলো মাখলুক। এগুলো আল্লাহর কালামের বিবরণ, এই কথা বলা যাবে না।
কোন কোন আলিম বলেছেন, কুরআনের ব্যাপারে আশায়েরা এবং কুল্লাবিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ শুধু শাব্দিক। এই মতভেদে কোন লাভ নেই। আশায়েরা এবং কুল্লাবিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে থাকে, কুরআন দুই প্রকার। শব্দমালা এবং অর্থসমূহ। কুরআনের শব্দগুলো মাখলুক। কুরআনের মধ্যে যেই শব্দমালা রয়েছে, তা মাখলুক। আর কুরআনের অর্থগুলো কাদীম (অবিনশ্বর ও চিরন্তন) এবং তা আল্লাহ তা'আলার সত্তার সাথে প্রতিষ্ঠিত। সমস্ত কুরআনের সব অর্থ মিলে মূলতঃ একটি অর্থই প্রকাশ করে, তা বিভক্তিযোগ্য নয় এবং একাধিকও নয়। সে যাই হোক, উপরোক্ত মত দু'টি এক রকম না হলেও পরস্পর কাছাকাছি।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এ দু'টি মতকেই বাতিল হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন: কুরআনের ব্যাপারে এ কথা বলা জায়েয হবে না যে, এটি কেবল আল্লাহর কালামের বিবরণ। যেমন বলে থাকে কুল্লাবিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা অথবা এ কথাও বলা বৈধ হবে না যে, উহা আল্লাহর কালাম প্রকাশের মাধ্যম মাত্র। যেমন বলে থাকে আশায়েরা সম্প্রদায়ের লোকেরা।
শাইখুল ইসলাম আরো বলেন: মানুষ এটি পাঠ করলেই কিংবা কাগজে লিখলেই তা আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত কালাম হতে বের হয়ে যায় না। কুরআন আল্লাহর কালাম। যেখানেই কুরআন পাওয়া যাবে, উহার অক্ষরসমূহ এবং মর্মার্থসমূহ আল্লাহর কালাম বলেই গণ্য হবে। চাই তা মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত থাকুক বা জবানের মাধ্যমে তেলাওয়াত করা হোক অথবা কাগজে লিখিত অবস্থায় থাকুক। উপরোক্ত কোন অবস্থাতেই কুরআনকে আল্লাহ তা'আলার প্রকৃত কালামের বাইরে গণনা করা যাবে না।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালামের মধ্যে গণ্য হওয়ার দলীল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: কোন কালাম সর্বপ্রথম যার নিকট থেকে শুরু হয়, উহাকে তার দিকেই সম্বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে যে উক্ত কালামকে অন্যের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়, তার দিকে সেই কালামের সম্বন্ধ হয়না। কেননা যে ব্যক্তি মুবাল্লিগ বা প্রচারক হয়ে অন্যের কালাম পৌঁছিয়ে দেয়, তাকে কেবল মাধ্যম বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবার ৬ নং আয়াতে বলেন:
وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ
"আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পারে, তাহলে তাকে আল্লাহর কালাম শ্রবণ করা পর্যন্ত আশ্রয় দাও। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও। কেননা এরা একটি অজ্ঞ সম্প্রদায়"।
এ আয়াতে যেই শ্রবণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা কেবল প্রচারকারীর মাধ্যমেই হতে পারে। অর্থাৎ প্রচারকের নিকট থেকেই, কেবল শ্রবণ করা সম্ভব। আর শ্রুত জিনিসকেই আল্লাহর কালাম হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হলো যে, কোন কথা সর্বপ্রথম যে বলে, সেই কথাকে তার দিকেই সম্বন্ধ করা হয়।
চার. মুতাযেলাদের মত: তারা বলে থাকে, কুরআনের অক্ষরগুলোই শুধু আল্লাহর কালাম। উহার মর্মার্থ ও তাৎপর্য আল্লাহর কালাম নয়। তাই তারা বলে থাকে, সাধারণভাবে যখন এই কথা বলা হবে, ইহা আল্লাহর কালাম, তখন শুধু শব্দ উদ্দেশ্য হবে। যাকে আল্লাহর কালাম বলে নাম দেয়া হয়েছে, তার দ্বারা শুধু শব্দই উদ্দেশ্য হবে, উহার মর্মার্থ কালামের অংশ হবে না; বরং আল্লাহ তা'আলার কালামের শব্দগুলো যা বুঝায়, উহা আল্লাহর কালাম নয়।
অতঃপর শাইখের উক্তি: ولا الحروف دون المعاني উহার অক্ষরগুলো ব্যতীত শুধু মর্মার্থগুলোই আল্লাহর কালাম নয়, এর মাধ্যমে মুতাযেলাদের মাযহাবের বিপরীত মত বর্ণনা করেছেন। যেমন কুল্লাবীয়া এবং আশায়েরাদের মাযহাব। যেমন একটু পূর্বে ব্যাখ্যাসহ তাদের মাযহাব বর্ণনা করা হয়েছে।
সঠিক মাযহাব হচ্ছে, অক্ষর এবং মর্মার্থগুলো সহকারেই কুরআন আল্লাহর কালাম। এটিই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মত। আল্লাহর কিতাব এবং রসূলের সুন্নাতের দলীল-প্রমাণ দ্বারা ইহাই সুসাব্যস্ত。

টিকাঃ
৪৬. আখেরী যামানায় এক রাতেই কুরআন উঠিয়ে নেয়া হবে। তখন মানুষের অন্তর এবং মুসহাফ থেকে কুরআন উঠে যাবে। তাদের অন্তরে ও মুসহাফে কুরআনের কোন অংশই অবশিষ্ট থাকবে না। পৃথিবী তখন পাপাচারে ভরে যাবে। এমনকি আল্লাহ আল্লাহ বলার মত কোন লোক থাকবে না। তখন সেই নিকৃষ্ট লোকদের উপর কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية