📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 উম্মাতের বিভিন্ন ফিক্বহীর মধ্যে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মর্যাদা।

📄 উম্মাতের বিভিন্ন ফিক্বহীর মধ্যে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মর্যাদা।


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
بَلْ هُمُ الْوَسَطُ فِي فِرَقِ الْأُمَّةِ كَمَا أَنَّ الْأُمَّةَ هِيَ الْوَسَطُ فِي الْأُمَمِ فَهُمْ وَسَطٌ فِي بَابِ صِفَاتِ اللَّهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بَيْنَ أَهْلِ التَّعْطِيلِ الْجَهْمِيَّةِ وَأَهْلِ التَّمْثِيلِ الْمُشَبِّهَةِ وَهُمْ وَسَطٌ فِي بَابٍ أَفْعَالِ اللَّهِ بَيْنَ الْجَبْرِيَّةِ وَالْقَدَرِيَّةِ وغيرهم وَفِي بَاب وَعِيدِ اللَّهِ بَيْنَ الْمُرْجِنَةِ وَالْوَعِيدِيَّةِ مِنَ الْقَدَرِيَّةِ وَغَيْرِهِمْ وَفِي بَاب أَسْمَاءِ الْإِيمَانِ وَالدِّينِ بَيْنَ الْحَرُورِيَّةِ وَالْمُعْتَزِلَةِ وَبَيْنَ الْمُرْجِنَةِ وَالْجَهْمِيَّةِ وَفِي أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ الرَّافِضَةِ وَالْخَوَارِجِ
বরং এই উম্মত যেমন পূর্বের উম্মতসমূহের তুলনায় মধ্যমপন্থী উম্মত হিসাবে পরিগণিত, ঠিক তেমনি এই উম্মতের মধ্যকার বিভিন্ন ফির্কার তুলনায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মধ্যমপন্থী জামা'আত হিসাবে গণ্য।
আল্লাহ তা'আলার সুউচ্চ সিফাতের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অবস্থান হচ্ছে সিফাতকে অস্বীকারকারী জাহমীয়া সম্প্রদায় এবং আল্লাহ তা'আলার সুমহান সিফাতকে বান্দার সিফাতের সাথে তুলনাকারী মুশাব্বেহা সম্প্রদায়ের অবস্থানের মাঝখানে।
আল্লাহ তা'আলার কর্মসমূহের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হচ্ছে জাবরীয়া এবং কাদারীয়া ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অবস্থানের মাঝখানে।
আল্লাহ তা'আলার ওয়াঈদ তথা গুনাহর কারণে আল্লাহ তা'আলার কিতাবে এবং রসূল পবিত্র সুন্নাতে শাস্তির যেসব ধমক এসেছে, তাতেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান মুরজীয়া এবং কাদারীয়াদের ওয়াঈদিয়ী সম্প্রদায়ের মাঝখানে।
ঈমান এবং দ্বীনের নামগুলোর বিষয়েও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান একদিকে হারুরী (খারেজী) ও মুতাযেলাদের মাঝখানে এবং অন্যদিকে মুরজীয়া ও জাহমীয়াদের মাঝখানে।
এমনি রসূল সাহাবীদের ব্যাপারেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান খারেজী এবং রাফেযৌদের মাঝখানে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া কুরআন ও সহীহ হাদীসের দলীল দ্বারা সুসাব্যস্ত আল্লাহ তা'আলার সুউচ্চ সিফাতগুলোর ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান বর্ণনা করার পর উপরোক্ত বাক্যগুলোর মাধ্যমে তাদের ফাযীলাত ও মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। যাতে করে অন্যদের তুলনায় তাদের মর্যাদা ও ফাযীলাত সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। কেননা কোন বিষয়ের সৌন্দর্য কেবল তার বিপরীত বিষয়ের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। সকল জিনিসের ক্ষেত্রেই একই কথা। সমস্ত বস্তুই তার বিপরীত বস্তুর মাধ্যমেই সুস্পষ্ট হয়।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উম্মতের সমস্ত ফির্কার তুলনায় মধ্যমপন্থী ফির্কা হিসাবে স্বীকৃত: আল-মিসবাহুল মুনীর নামক কিতাবে রয়েছে যে, الوسط শব্দের ওয়াও এবং س বর্ণে যবর দিয়ে পড়া হয়েছে। ওয়াসাত অর্থ হলো সরল-সোজা। তবে এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ন্যায়পরায়ন এবং উৎকৃষ্ট। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ১৪৩ নং আয়াতে বলেন:
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ ﴾
"আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যমপন্থী উম্মতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীদের উপর সাক্ষী হতে পারো"।
সুতরাং আহলে সুন্নাতের লোকেরা 'ওয়াসাত'। الوسط অর্থ হচ্ছে তারা ন্যায়পরায়ন, উৎকৃষ্ট এবং উত্তম। দ্বীনের ক্ষেত্রে কঠোরতায় এবং শৈথিল্য প্রদর্শনে যে দু'টি দল বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করেছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান তাদের উভয়ের মাঝখানে। সেই সাথে যেসব ফির্কা নিজেদেরকে ইসলামের দিকে সম্বন্ধিত করে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাদের তুলনায় মধ্যমপন্থী।
মুসলিম উম্মত পূর্বের উম্মতদের তুলনায় মধ্যমপন্থী। অতীতের যেসব উম্মত বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘনের দিকে ঝুকে পড়েছে এবং যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও ঢিলামি করেছে এই উম্মত তাদের তুলনায় মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মধ্যমপন্থী মাযহাবের বিস্তারিত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তারা অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা
প্রথমত: আল্লাহ তা'আলার সিফাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সিফাতকে বাতিলকারী জাহমীয়া এবং আল্লাহর সিফাতের উপমা পেশকারী মুশাব্বেহা সম্প্রদায়ের অবস্থানের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে।
জাহমীয়াদের ইমাম জাহাম বিন সাফওয়ান আত্ তিরমিযীর দিকে নিসবত করে জাহমীয়া সম্প্রদায়ের নাম রাখা হয়েছে। এরা আল্লাহ তা'আলার সত্তাকে পবিত্র সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করেছে। এমনকি তারা আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ বিশেষণগুলোকেও অস্বীকার করেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের ধারণাপ্রসূত দলীল হচ্ছে আল্লাহর জন্য নাম ও সিফাত সাব্যস্ত করা হলে মাখলুকের সাথে আল্লাহর তুলনা হয়ে যায়। তাই তারা সমস্ত নাম ও সিফাতকে বাতিল করে দিয়েছে। এ কারণেই তাদেরকে মুআত্তেলা তথা আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ সিফাতসমূহকে বাতিলকারী সম্প্রদায় বলা হয়। কারণ আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তাকে অতি সুন্দর নাম ও সুমহান সিফাত থেকে মুক্ত করে ফেলেছে।
আর আল্লাহর সিফাতকে মানুষের সিফাতের সাথে তুলনাকারী সম্প্রদায়ের লোকদেরকে মুশাব্বেহা সম্প্রদায় বলার কারণ হলো তারা আল্লাহ তা'আলার সিফাত সাব্যস্ত করতে গিয়ে খুব বাড়াবাড়ি এবং শৈথিল্য প্রদর্শন করেছে। এমনকি আল্লাহকে মাখলুকের সাথে তুলনা করে ফেলেছে এবং আল্লাহর সুউচ্চ সিফাতগুলোকে মাখলুকের সাধারণ সিফাতসমূহের সাথে তুলনা করেছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ সমস্ত কথার অনেক উর্ধে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উপরোক্ত উভয় সম্প্রদায়ের মাঝখানে। তারা আল্লাহর সিফাতগুলোকে আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই সাব্যস্ত করেন। তারা আল্লাহর সিফাতকে মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনা করেনা এবং আল্লাহর সুউচ্চ সিফাতগুলোর কোন উপমা ও দৃষ্টান্তও পেশ করেন না। সুতরাং তারা আল্লাহকে মাখলুকের সিফাত থেকে পবিত্র করতে গিয়েও বাড়াবাড়ি করেন না এবং তাঁর সুউচ্চ সিফাতগুলো সাব্যস্ত করতে গিয়েও বাড়াবাড়ি করেন না। বরং তারা আল্লাহর সিফাতগুলো বাতিল করা ছাড়াই আল্লাহকে সকল ত্রুটিপূর্ণ ও দোষযুক্ত বৈশিষ্ট থেকে পবিত্র করেন এবং মাখলুকের সাথে তুলনা করা ব্যতীতই তারা আল্লাহর জন্য অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী সাব্যস্ত করেন।
দ্বিতীয়ত: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আল্লাহর কর্মসমূহের ক্ষেত্রেও জাবরীয়া এবং কাদারীয়া সম্প্রদায়ের অবস্থানের মাঝখানে। الجبر শব্দের দিকে নিসবত করে তাদের জাবরীয়া সম্প্রদায় হিসাবে নাম রাখা হয়েছে। কেননা তারা বলে: إن العبد مجبور على فعله অর্থাৎ বান্দা তার কর্মের উপর একান্ত বাধ্য। তার কোন স্বাধীনতা নেই। সুতরাং তারা আল্লাহর কর্মগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে গিয়ে মারাত্মক বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করেছে। এমনকি বান্দার কোন কাজই নেই বলে ধারণা করেছে। তারা আরো মনে করেছে যে, বান্দারা কোন কাজই করে না। তাদের ধারণায় আল্লাহ তা'আলাই একমাত্র কর্তা এবং বান্দার কর্মও আল্লাহ তা'আলাই করেন। (নাউযুবিল্লাহ) তাদের মতে বান্দার সমস্ত নড়াচড়া এবং কর্ম একান্তই বাধ্যতামূলক। বান্দা যেই নড়াচড়া ও কর্ম সম্পাদন করে, তা জ্বরে আক্রান্ত রোগীর কম্পনের মতই। বান্দার কাজগুলো বান্দার দিকে কেবল রূপকার্থেই নিসবত করা হয়।
এবার কাদারীয়া সম্প্রদায়ের কথায় আসি। القدر শব্দের দিকে নিসবত করে তাদেরকে কাদারীয়া বলা হয়। তারা বান্দাদের জন্য তাদের কর্মসমূহ সাব্যস্ত করতে গিয়ে খুবই বাড়াবাড়ি করেছে। তারা বলেছে, বান্দাই তার নিজের কর্মের স্রষ্টা। এতে আল্লাহর কোন ইচ্ছা নেই। সুতরাং তাদের ধারণায় বান্দাদের কর্মসমূহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন নয়, আল্লাহ তা নির্ধারণ করেন নি এবং তার ইচ্ছাও করেন নি। বরং বান্দারা নিজেদের স্বাধীন ও মুক্ত ইচ্ছাতেই তাদের কর্মসমূহ সম্পাদন করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তারা বলেছে, বান্দার জন্য এখতিয়ার ও ইচ্ছা রয়েছে। বান্দার কাজ বান্দার দ্বারাই সংঘটিত হয়। তবে সে আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কিছুই করতে পারে না। সে কেবল উহাই করে, যা আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি ও নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴾وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ "আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমরা যা করো তাও তিনি সৃষ্টি করেছেন"। (সূরা সাফফাত ৩৭:৯৬) এখানে বান্দাদের জন্য কর্ম সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, সেই কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা সূরা তাকবীরের ২৯ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ "তোমরা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার বাইরে কিছুই ইচ্ছা করতে পারো না"। এই আয়াতে বান্দাদের জন্য এমন ইচ্ছা সাব্যস্ত করা হয়েছে, যা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার পরে হয়। কাদার তথা তাকদীরের মাসআলা আলোচনা করার সময় এ বিষয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা অচিরেই সামনে আসছে ইনশা-আল্লাহ।
তৃতীয়ত: আল্লাহর অঈদ বা শাস্তির ভয় দেখানোর ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত মধ্যমপন্থী। الوعيد অর্থ হচ্ছে আযাবের ভয়।
দেখানো। তবে এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐসব আয়াত ও হাদীস, যাতে পাপীদের জন্য আযাবের ভয় দেখানো হয়েছে। শাইখুল ইসলামের উক্তিঃ بين المرجئة والوعيدية من القدرية وغيرهم অঈদের (শাস্তি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের) ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অবস্থান হচ্ছে মুরর্জিয়া এবং কাদারীয়াদের ওয়াঈদীয়া ফির্কার লোকদের অবস্থানের মাঝামাঝি। الإرجاء শব্দের দিকে নিসবত করে তাদেরকে المرجئة বলা হয়। الإرجاء অর্থ পিছিয়ে দেয়া বা বের করে দেয়া। তারা যেহেতু আমলকে ঈমান থেকে পিছিয়ে দিয়েছে এবং আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না, তাই তাদেরকে মুরজিয়া বলা হয়। তারা মনে করে কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তি ফাসেক নয়। তারা আরো বলে যে, ঈমান ঠিক থাকলে পাপাচারে লিপ্ত হওয়া ক্ষতিকর নয়। যেমন কাফের অবস্থায় সৎকাজ করলে সৎকাজ কোন উপকারে আসবে না।
সুতরাং তাদের নিকট কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার। সে শাস্তির সম্মুখীন হবে না। তারা কবীরাহ গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে হুকুম লাগাতে গিয়ে চরম শৈথিল্য প্রদর্শন করেছে। এমনকি তাদের ধারণায় পাপাচারের কারণে ঈমানের কোন ক্ষতি হয় না এবং কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তির উপর ফাসেক হওয়ার হুকুমও লাগানো যাবে না।
আর ওয়াঈদীয়া সম্প্রদায়ের মতে গুনাহগারের জন্য শাস্তির যেই ধমক এসেছে, তা বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব। কবীরা গুনাহ্ক্বারী মুমিনের ব্যাপারে তারা আরো কড়াকড়ি করে বলেছে যে, সে যদি মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে মৃত্যু বরণ করে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করে তথায় চিরকাল অবস্থান করবে। দুনিয়ার হুকুমে সে ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে।
কিন্তু কবীরা গুনাহ্ক্বারী মুমিনের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উপরোক্ত উভয় ফির্কার লোকদের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বলেন যে, কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তি অপরাধী এবং শাস্তির সম্মুখীন হতে পারে। তার ঈমানেও কমতি আসবে এবং তাকে ফাসেক বলা হবে। মুরজিয়াদের ন্যায় তারা কবীরা গুনাহ্ক্বারীকে পূর্ণ ঈমানদার বলে না। সে শাস্তি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ এ কথাও বলে না। কিন্তু সে ঈমানের গন্ডি থেকে বের হবেনা এবং কিয়ামাতের দিন জাহান্নামে প্রবেশ করলেও সেখানে চিরকাল থাকবেনা। তার ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে তাঁকে ক্ষমা করে দিবেন এবং ইচ্ছা করলে অপরাধের পরিমাণ মোতাবেক তাকে শাস্তি দিবেন। অতঃপর সে জাহান্নাম থেকে বের হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা ওয়াঈদীয়া সম্প্রদায়ের মত এ কথা বলেনা যে, ঈমান থেকে বের হয়ে যাবে এবং পরকালে জাহান্নামে প্রবেশ করে তথায় চিরকাল অবস্থান করবে।
সুতরাং মুরজিয়ারা শুধু ঐসব আয়াত ও হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে, যেখানে ঈমান আনলেই (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বললেই) জান্নাতে যাওয়া যাবে বলে ওয়াদা করা হয়েছে। আর ওয়াঈদীয়ারা (খারেজী ও মুতাযেলারা) কেবল ঐসব আয়াত ও হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, পাপাচারে লিপ্ত হলে জাহান্নামে যেতে হবে।
কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উভয় প্রকার দলীলকে একত্র করেছেন এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছেন।
চতুর্থত: ঈমান ও দ্বীনের বিভিন্ন পরিভাষাতেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন। অর্থাৎ মানুষকে কাফের বলা, মুসলিম বলা এবং ফাসেক বলার ক্ষেত্রেও তারা মধ্যমপন্থী। দুনিয়া ও আখিরাতে গুনাহগারদেরকে কি রকম শাস্তি দেয়া হবে, তাতেও তারা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান হারুরী ও মুতাযেলা এবং মুরজিয়া ও জাহমীয়াদের অবস্থানের মাঝখানে। হারুরীরাই খারেজী। হারুরা নামক স্থানের দিকে সম্বন্ধ করে তাদেরকে হারুরী বলা হয়। হারুরা ইরাকের একটি গ্রামের নাম। আলী এর পক্ষ ত্যাগ করে তারা হারুরা নামক গ্রামে একত্রিত হয়েছিল। এই জন্যই তাদেরকে হারুরী বলা হয়।
ওয়াসেল বিন আতার অনুসারীদেরকে মুতাযেলা বলা হয়। মুসলিমদের কেউ কবীরা গুনাহয় লিপ্ত হলে তার হুকুম কী হবে, এই মাসআলায় তার মাঝে এবং হাসান বসরী এর মাঝে মতভেদ হওয়ার কারণে ওয়াসেল প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বসরীর মজলিস ত্যাগ করেছিল। পরবর্তীতে ওয়াসেলের অনুসারীরাও হাসান বসরীর দারস ত্যাগ করে ওয়াসেলের সাথে যোগ দেয়। এতে হাসান বসরী বললেন: إنه قد اعتزلنا অর্থাৎ ওয়াসেল আমাদের মজলিস পরিত্যাগ করেছে। ইমাম হাসান বসরী এর এই কথা থেকেই তাদেরকে মুতাযেলা বলা হয়।
কবীরা গুনাহয় লিপ্ত মুসলিমের হুকুমের ব্যাপারে খারেজী ও মুতাযেলাদের মাযহাব অত্যন্ত কঠোর। তারা তাকে ইসলামের বাইরে বলে হুকুম লাগিয়েছে। অতঃপর মুতাযেলারা বলেছে, সে মুসলিমও নয়, কাফেরও নয়; বরং সে ঈমান এবং কুফুরী, -এই দুই স্তরের মাঝখানে অবস্থান করবে।
আর খারেজীরা বলেছে যে, সে কাফের হয়ে যাবে। তবে উভয় দল পরকালের হুকুমে একমত হয়ে বলেছে যে, কবীরা গুনাহকারী যদি সেই অবস্থায় মারা যায়, তাহলে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।
মুরজিয়া ও জাহমীয়াদের অবস্থান খারেজী ও মুতাযেলাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তির উপর হুকুম লাগাতে গিয়ে তারা চরম শৈথিল্য ও ঢিলামি করেছে এবং তার সাথে সহনশীলতা প্রদর্শনে বাড়াবাড়ি করেছে। মুরজিয়াদের কথা হচ্ছে لا يضر مع الإيمان معصية অর্থাৎ ঈমান ঠিক থাকলে পাপাচার কোন ক্ষতি করে না। কেননা তাদের মতে শুধু অন্তরের সত্যায়নকে ঈমান বলা হয়। তবে তাদের কারো মতে অন্তরের বিশ্বাসের সাথে জবানের উচ্চারণও জরুরী। কিন্তু তাদের কেউ এই কথা বলেনি যে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হবে। তাই তাদের মতে আনুগত্যের মাধ্যমে ঈমান বাড়েনা এবং পাপাচারের মাধ্যমে উহা কমেনা। সুতরাং পাপাচার ঈমানকে কমিয়ে দেয়না এবং পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামের শাস্তিরও হকদার হয় না। বিশেষ করে যখন পাপাচারকে হালাল মনে করে তাতে লিপ্ত না হবে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উপরোক্ত উভয় দলের তুলনায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। তারা বলেছে পাপাচারী পাপাচারে লিপ্ত হলেই ঈমান থেকে বের হয়ে যায় না। ফলে সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন থাকবে। আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর ইচ্ছা করলে জাহান্নামের আগুনে শাস্তি দিবেন। কিন্তু শাস্তি দেয়া হলেও চিরকাল জাহান্নামে রাখা হবে না। যেমন বলে থাকে খারেজী এবং মুতাযেলারা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আরো বলে যে, পাপাচার ঈমানের মধ্যে কমতি আনয়ন করে এবং পাপাচারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশের যোগ্য হয়ে যায়। তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দিলে সে কথা ভিন্ন। আর কবীরা গুনাহকারী ফাসেক হয়ে যাবে এবং তার ঈমানও ত্রুটিপূর্ণ হবে। তারা মুরজিয়াদের ন্যায় কবীরা গুনাহকারীকে কামেল (পূর্ণ) ঈমানদার বলে না।
পঞ্চমত: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা রসূল ﷺ সাহাবীদের ব্যাপারে রাফেযী ও খারেজীদের তুলনায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। সাহাবী ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, هو من لقي النبي صلى الله عليه وسلم مؤمنا به ومات على ذلك এর সাথে সাক্ষাৎ করেছে এবং ঈমান অবস্থায়ই মৃত্যু বরণ করেছে"।
রাফেযী নামটি الرفض থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। রাফয অর্থ বর্জন করা, পরিত্যাগ করা। শিয়াদেরকে রাফেযী বলার কারণ হলো, তারা তাদের অন্যতম ইমাম যায়েদ বিন আলী বিন হুসাইনকে বললেন, আপনি আবু বকর ও উমারের নাম উচ্চারণের পর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলা বর্জন করুন। অর্থাৎ তাদের ফাযীলত, প্রশংসা ও সুনাম বলা বর্জন করুন। আলী বিন হুসাইন তখন বললেন, معاذ الله অর্থাৎ এরূপ করা থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। এতে তারা যায়েদকেই পরিত্যাগ করলো। এ জন্যই তাদেরকে রাফেযী (পরিত্যাগকারী) হিসাবে নাম রাখা হয়েছে।
সাহাবীদের ব্যাপারে রাফেযীদের মাযহাব হচ্ছে, তারা আলী বিন আবু তালিব এবং আহলে বাইতের ফাযীলত বর্ণনায় বাড়াবাড়ি করে থাকে এবং তাদেরকে অন্যসব সাহাবীদের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, তারা বাকীসব সাহাবীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। বিশেষ করে তিন খলীফা অর্থাৎ আবু বকর, উমার এবং উছমান (রাঃ)-কে তারা শত্রু মনে করে, তাদেরকে গালি দেয় এবং তাদের উপর লা'নত বর্ষণ করে। কখনো কখনো তারা কয়েকজন সাহাবী ব্যতীত বাকী সবাইকে অথবা কতিপয় সাহাবীকে কাফের বলে।
খারেজীরা শিয়া ও রাফেযীদের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা আলী (রাঃ)-কে এবং তাঁর সাথে অনেক সাহাবীকেই কাফের বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে ও তাদের জান-মাল হালাল করেছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা রাফেযী এবং খারেজী এই উভয় দলের বিরোধী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সমস্ত সাহাবীর সাথেই বন্ধুত্ব রাখে। কারো প্রতি ভালবাসা পোষণে বাড়াবাড়ি করে না; বরং সকল সাহাবীর ফাযীলাত ও মর্যাদার স্বীকৃতি দেয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী (সাঃ)-এর পরে সাহাবীদেরকেই এই উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মনে করে। এ বিষয়ে সামনে আরো বিবরণ আসছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00