📄 ক্বিয়ামতের দিন মু‘মিনগণ তাদের রবকে দেখবে।
وقوله: {وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ * إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ} { عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ} {لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ} {لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ} وهذا الباب في كتاب الله كثير. ومن تدبر القرآن طلبًا للهدى تبين له طريق الحق.
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ “সে দিন অনেক মুখ-মন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে” (সূরা কিয়ামাহ ৭৫: ২২-২৩)। আল্লাহ তা'আলা সূরা মুতাফফিফীনের ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ “উঁচু আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউনুসের ২৬ নং আয়াতে আরো বলেন: لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ক্বাফ এর ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ সেখানে তারা যা চাইবে তাই তাদের জন্য প্রস্তুত থাকবে। আর আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে, তার জন্য সত্যের পথ পরিস্কার হবে।
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন মুমিনদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। ناضرة শব্দটি النضارة থেকে যোয়াদ বর্ণ দিয়ে পড়তে হবে। এর অর্থ হচ্ছে উজ্জ্বল ও সুন্দর হওয়া অর্থাৎ আলোকোজ্জল, তরতাজা, সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় হওয়া। সেদিন তারা তাদের প্রভু ও সৃষ্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা তাদের চোখ দ্বারাই তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এ সম্পর্কে রসূল হতে মুতাওয়াতির সূত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈ এবং উম্মতের সালাফগণের ইজমা হয়েছে এবং ইসলামের ইমামগণ তাতে একমত হয়েছেন।
আয়াতে কারীমার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলো যে, মুমিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখতে পাবেন। عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ : الأرائك শব্দটি أريكة এর বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে সিংহাসন বা খাঁট। মুমিনগণ সিংহাসনে বসে তাদের রব আল্লাহ তা'আলার দিকে তাকিয়ে দেখবে। আর কাফেরদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে যেমন এই আয়াতের পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে, তারা عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ নিশ্চয়ই সেদিন তাদের রবের দর্শন থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখা হবে।
এ আয়াত থেকেও কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য তাদের মহান রবকে দেখার বিষয়টি প্রমাণিত হলো। لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব আমল ওয়াজিব করেছেন, উহা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং যেসব পাপাচার থেকে তাদেরকে নিষেধ করেছেন, যারা তা বর্জন করার মাধ্যমে কল্যাণের পথ অবলম্বন করবে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ তথা উত্তম বিনিময়। এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, উহা হচ্ছে জান্নাত। زيادة )আরো বেশী( এর তাফসীরে সহীহ মুসলিম এবং অন্যান্য কিতাবে সহীহ সূত্রে নাবী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে যিয়াদাহ বা বেশী বলতে আল্লাহর মহান চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা। এই উম্মতের সালাফে সালেহীনগণও এই ব্যাখ্যা করেছেন। তাই উপরের আলোচনা হতে প্রমাণ মিলছে যে, মুমিনদের জন্য কিয়ামাতের দিন তাদের রবকে দেখার সুযোগ রয়েছে।
لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তাই থাকবে: জান্নাতে মুমিনদের মন যা চাইবে, তাদের জন্য তাই রয়েছে সেখানে। তাদের চোখ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত এবং অপরিমীত কল্যাণ পেয়ে শীতল হবে।
وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে: অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত ও কল্যাণের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা হলো আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা।
আয়াতে কারীমার এই অংশ থেকেই প্রমাণ নেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে মুমিনদের তাকানো প্রমাণিত হয়েছে।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে যা শিক্ষণীয়: উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য আল্লাহর দিদার প্রমাণিত হলো। আর এটিই হবে মুমিনদের জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার বিষয়ে এটিই হচ্ছে সাহাবী, তাবেঈ এবং মুসলিমদের সম্মানিত ইমামগণের কথা। শিয়াদের রাফেযী সম্প্রদায়, জাহমীয়া এবং মুতাযেলারা এই মাসআলায় খেলাফ করেছে। তারা আল্লাহর দিদারকে অস্বীকার করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং উম্মতের সালাফ ও ইমামগণের বিরোধীতা করেছে। উপরোক্ত বাতিল ফির্কার লোকেরা আল্লাহর দিদার অস্বীকার করার পক্ষে কতিপয় দুর্বল সন্দেহ এবং ভ্রান্ত দলীল পেশ করেছে। তার মধ্যে
(১) আল্লাহকে দেখা যাবে এই কথা সাব্যস্ত করলে আবশ্যক হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন একটি দিকে রয়েছেন। আর তিনি যদি কোন দিকে থাকেন, তাহলে তার জন্য জিসিম (দেহ, কায়া, আকৃতি, শরীর ইত্যাদি) সাব্যস্ত হয়। অথচ আল্লাহ তা'আলা জিসিম বা দেহ ও শরীর থেকে পবিত্র।
এই সন্দেহের জবাব এই যে, দিক শব্দটির মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। এর দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঢুকে আছেন, তাহলে এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল। অসংখ্য দলীল এই কথাকে বাতিল প্রমাণিত করেছে। আল্লাহকে দেখা যাবে বা তাকে দেখা সম্ভব এটা সাব্যস্ত করলে, আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত হয়ে যায় না। আর যদি দিক দ্বারা উপরের দিক উদ্দেশ্য হয় তথা এটি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপরে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপরের দিক সুসাব্যস্ত। এটি অস্বীকার করা অন্যায়। আল্লাহ তা'আলার দিদার অর্জিত হওয়ার সাথে তিনি উপরের দিকে হওয়া সাংঘর্ষিক নয়।
(২) মুতাযেলা এবং আল্লাহর দিদারে অবিশ্বাসী অন্যান্য সম্প্রদায় দলীল হিসাবে আল্লাহর বাণী: لن تراني "তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না"- এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে। তাদের দলীল গ্রহণের জবাবে বলা হয়েছে যে, আয়াতে দুনিয়াতে আল্লাহর দিদার নাকোচ করা হয়েছে। আখেরাতের দিদার নাকোচ করা হয়নি। যেমন অন্যান্য দলীলের মাধ্যমে আখেরাতে আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়েছে। আখেরাতে মানুষের অবস্থা দুনিয়ার অবস্থার চেয়ে ভিন্ন হবে। ২১
(৩) তারা আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারাও দলীল গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ "দৃষ্টিশক্তি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (সূরা আনআম ৬:১০৩)
এর জবাবে বলা হয়েছে যে, এই আয়াতে ইদরাক তথা আল্লাহকে আয়ত্ত করার নাফী এসেছে। আল্লাহর দিদার নফী করা হয়নি। إدراك অর্থ হচ্ছে আয়ত্ত ও বেষ্টন করা।
মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলাকে দেখবে; কিন্তু তাঁকে আয়ত্ত করতে পারবে না। বরং মানুষের দৃষ্টিসমূহ আল্লাহকে বেষ্টন করতে পারবে না, এই কথা থেকেও আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এই আয়াতটি আল্লাহর দর্শন সাব্যস্ত করার অন্যতম দলীল। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জানেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ কুরআনে আল্লাহর জন্য নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করার বিষয়ে অনেক আলোচনা এসেছে। গ্রন্থকার এখানে তা থেকে সামান্য কিছু উল্লেখ করেছেন। কুরআনের অনেক আয়াতে আল্লাহর নাম এবং তাঁর সিফাতের বর্ণনা এসেছে। এগুলো আল্লাহর জন্য ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করতে হবে, যেভাবে সাব্যস্ত করলে আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় হয়।
যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে অর্থাৎ তাতে চিন্তা-গবেষণা করবে এবং কুরআন যেই হেদায়াতের প্রমাণ বহন করে, তার উপর দৃষ্টি দিবে, তার জন্য সত্যের পথ উন্মুক্ত হবে। সত্যের রাস্তা তার জন্য পরিস্কার হবে। কুরআন নিয়ে গবেষণা করাই হচ্ছে উহা পাঠ করার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ "এটি একটি অত্যন্ত বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে এরা তার আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং জ্ঞানী ও চিন্তাশীলরা তা থেকে শিক্ষা নেয়”। (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯) আল্লাহ তা'আলা সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
"তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের হৃদয়ের উপর তালা লাগানো আছে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমিনুনের ৬৮ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ أَمْ جَاءَهُم مَّا لَمْ يَأْتِ آبَاءَهُمُ الْأَوَّلِينَ
"তারা কি কখনো এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা করেনি? না কি সে এমন কথা নিয়ে এসেছে যা কখনো তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে আসেনি?
টিকাঃ
২১. দুনিয়াতে মানুষের চোখ দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে দুনিয়ায় তৈরী করা হয়নি। পাহাড়ের গঠন মানুষ গঠনের চেয়ে অধিক মজবুত ও শক্ত হওয়ার পরও যেহেতু পাহাড় আল্লাহর নূরের সামনে টিকে থাকতে পারেনি এবং আল্লাহ তা'আলা যখন পাহাড়ের উপর স্বীয় জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল, তাই বুঝা গেল যে মানুষ চর্ম চক্ষু দিয়ে দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখতে সক্ষম নয়। (আল্লাহই সর্বাধিক জানেন)
وقوله: {وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ * إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ} { عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ} {لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ} {لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ} وهذا الباب في كتاب الله كثير. ومن تدبر القرآن طلبًا للهدى تبين له طريق الحق.
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ “সে দিন অনেক মুখ-মন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে” (সূরা কিয়ামাহ ৭৫: ২২-২৩)। আল্লাহ তা'আলা সূরা মুতাফফিফীনের ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ “উঁচু আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউনুসের ২৬ নং আয়াতে আরো বলেন: لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ক্বাফ এর ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ সেখানে তারা যা চাইবে তাই তাদের জন্য প্রস্তুত থাকবে। আর আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে, তার জন্য সত্যের পথ পরিস্কার হবে।
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন মুমিনদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। ناضرة শব্দটি النضارة থেকে যোয়াদ বর্ণ দিয়ে পড়তে হবে। এর অর্থ হচ্ছে উজ্জ্বল ও সুন্দর হওয়া অর্থাৎ আলোকোজ্জল, তরতাজা, সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় হওয়া। সেদিন তারা তাদের প্রভু ও সৃষ্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা তাদের চোখ দ্বারাই তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এ সম্পর্কে রসূল হতে মুতাওয়াতির সূত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈ এবং উম্মতের সালাফগণের ইজমা হয়েছে এবং ইসলামের ইমামগণ তাতে একমত হয়েছেন।
আয়াতে কারীমার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলো যে, মুমিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখতে পাবেন। عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ : الأرائك শব্দটি أريكة এর বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে সিংহাসন বা খাঁট। মুমিনগণ সিংহাসনে বসে তাদের রব আল্লাহ তা'আলার দিকে তাকিয়ে দেখবে। আর কাফেরদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে যেমন এই আয়াতের পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে, তারা عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ নিশ্চয়ই সেদিন তাদের রবের দর্শন থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখা হবে।
এ আয়াত থেকেও কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য তাদের মহান রবকে দেখার বিষয়টি প্রমাণিত হলো। لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব আমল ওয়াজিব করেছেন, উহা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং যেসব পাপাচার থেকে তাদেরকে নিষেধ করেছেন, যারা তা বর্জন করার মাধ্যমে কল্যাণের পথ অবলম্বন করবে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ তথা উত্তম বিনিময়। এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, উহা হচ্ছে জান্নাত। زيادة )আরো বেশী( এর তাফসীরে সহীহ মুসলিম এবং অন্যান্য কিতাবে সহীহ সূত্রে নাবী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে যিয়াদাহ বা বেশী বলতে আল্লাহর মহান চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা। এই উম্মতের সালাফে সালেহীনগণও এই ব্যাখ্যা করেছেন। তাই উপরের আলোচনা হতে প্রমাণ মিলছে যে, মুমিনদের জন্য কিয়ামাতের দিন তাদের রবকে দেখার সুযোগ রয়েছে।
لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তাই থাকবে: জান্নাতে মুমিনদের মন যা চাইবে, তাদের জন্য তাই রয়েছে সেখানে। তাদের চোখ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত এবং অপরিমীত কল্যাণ পেয়ে শীতল হবে।
وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে: অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত ও কল্যাণের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা হলো আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা।
আয়াতে কারীমার এই অংশ থেকেই প্রমাণ নেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে মুমিনদের তাকানো প্রমাণিত হয়েছে।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে যা শিক্ষণীয়: উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য আল্লাহর দিদার প্রমাণিত হলো। আর এটিই হবে মুমিনদের জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার বিষয়ে এটিই হচ্ছে সাহাবী, তাবেঈ এবং মুসলিমদের সম্মানিত ইমামগণের কথা। শিয়াদের রাফেযী সম্প্রদায়, জাহমীয়া এবং মুতাযেলারা এই মাসআলায় খেলাফ করেছে। তারা আল্লাহর দিদারকে অস্বীকার করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং উম্মতের সালাফ ও ইমামগণের বিরোধীতা করেছে। উপরোক্ত বাতিল ফির্কার লোকেরা আল্লাহর দিদার অস্বীকার করার পক্ষে কতিপয় দুর্বল সন্দেহ এবং ভ্রান্ত দলীল পেশ করেছে। তার মধ্যে
(১) আল্লাহকে দেখা যাবে এই কথা সাব্যস্ত করলে আবশ্যক হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন একটি দিকে রয়েছেন। আর তিনি যদি কোন দিকে থাকেন, তাহলে তার জন্য জিসিম (দেহ, কায়া, আকৃতি, শরীর ইত্যাদি) সাব্যস্ত হয়। অথচ আল্লাহ তা'আলা জিসিম বা দেহ ও শরীর থেকে পবিত্র।
এই সন্দেহের জবাব এই যে, দিক শব্দটির মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। এর দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঢুকে আছেন, তাহলে এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল। অসংখ্য দলীল এই কথাকে বাতিল প্রমাণিত করেছে। আল্লাহকে দেখা যাবে বা তাকে দেখা সম্ভব এটা সাব্যস্ত করলে, আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত হয়ে যায় না। আর যদি দিক দ্বারা উপরের দিক উদ্দেশ্য হয় তথা এটি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপরে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপরের দিক সুসাব্যস্ত। এটি অস্বীকার করা অন্যায়। আল্লাহ তা'আলার দিদার অর্জিত হওয়ার সাথে তিনি উপরের দিকে হওয়া সাংঘর্ষিক নয়।
(২) মুতাযেলা এবং আল্লাহর দিদারে অবিশ্বাসী অন্যান্য সম্প্রদায় দলীল হিসাবে আল্লাহর বাণী: لن تراني "তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না"- এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে। তাদের দলীল গ্রহণের জবাবে বলা হয়েছে যে, আয়াতে দুনিয়াতে আল্লাহর দিদার নাকোচ করা হয়েছে। আখেরাতের দিদার নাকোচ করা হয়নি। যেমন অন্যান্য দলীলের মাধ্যমে আখেরাতে আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়েছে। আখেরাতে মানুষের অবস্থা দুনিয়ার অবস্থার চেয়ে ভিন্ন হবে। ২১
(৩) তারা আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারাও দলীল গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ "দৃষ্টিশক্তি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (সূরা আনআম ৬:১০৩)
এর জবাবে বলা হয়েছে যে, এই আয়াতে ইদরাক তথা আল্লাহকে আয়ত্ত করার নাফী এসেছে। আল্লাহর দিদার নফী করা হয়নি। إدراك অর্থ হচ্ছে আয়ত্ত ও বেষ্টন করা।
মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলাকে দেখবে; কিন্তু তাঁকে আয়ত্ত করতে পারবে না। বরং মানুষের দৃষ্টিসমূহ আল্লাহকে বেষ্টন করতে পারবে না, এই কথা থেকেও আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এই আয়াতটি আল্লাহর দর্শন সাব্যস্ত করার অন্যতম দলীল। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জানেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ কুরআনে আল্লাহর জন্য নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করার বিষয়ে অনেক আলোচনা এসেছে। গ্রন্থকার এখানে তা থেকে সামান্য কিছু উল্লেখ করেছেন। কুরআনের অনেক আয়াতে আল্লাহর নাম এবং তাঁর সিফাতের বর্ণনা এসেছে। এগুলো আল্লাহর জন্য ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করতে হবে, যেভাবে সাব্যস্ত করলে আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় হয়।
যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে অর্থাৎ তাতে চিন্তা-গবেষণা করবে এবং কুরআন যেই হেদায়াতের প্রমাণ বহন করে, তার উপর দৃষ্টি দিবে, তার জন্য সত্যের পথ উন্মুক্ত হবে। সত্যের রাস্তা তার জন্য পরিস্কার হবে। কুরআন নিয়ে গবেষণা করাই হচ্ছে উহা পাঠ করার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ "এটি একটি অত্যন্ত বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে এরা তার আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং জ্ঞানী ও চিন্তাশীলরা তা থেকে শিক্ষা নেয়”। (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯) আল্লাহ তা'আলা সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
"তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের হৃদয়ের উপর তালা লাগানো আছে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমিনুনের ৬৮ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ أَمْ جَاءَهُم مَّا لَمْ يَأْتِ آبَاءَهُمُ الْأَوَّلِينَ
"তারা কি কখনো এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা করেনি? না কি সে এমন কথা নিয়ে এসেছে যা কখনো তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে আসেনি?
টিকাঃ
২১. দুনিয়াতে মানুষের চোখ দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে দুনিয়ায় তৈরী করা হয়নি। পাহাড়ের গঠন মানুষ গঠনের চেয়ে অধিক মজবুত ও শক্ত হওয়ার পরও যেহেতু পাহাড় আল্লাহর নূরের সামনে টিকে থাকতে পারেনি এবং আল্লাহ তা'আলা যখন পাহাড়ের উপর স্বীয় জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল, তাই বুঝা গেল যে মানুষ চর্ম চক্ষু দিয়ে দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখতে সক্ষম নয়। (আল্লাহই সর্বাধিক জানেন)