📄 আল্লাহর জন্য কালাম (কথা বলার বিশেষণ) সাব্যস্ত করা।
وَقَوْلُهُ: {وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا } { وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا} {إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ} { وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا } { وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا} { مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ} { وَلَمَّا جَاء مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ} {وَنَادَيْنَاهُ مِن جَانِبِ الطُّورِ الأَيْمَنِ وَقَرَّبْنَاهُ نَجِيًّا } {وَإِذْ نَادَى رَبُّكَ مُوسَى أَنِ ائْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} { وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ} {وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ} { وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ} {وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِن بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ} {يُرِيدُونَ أَن يُبَدِّلُوا كَلامَ اللَّهِ قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ} { وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن كِتَابِ رَبِّكَ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ} {إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا “আর আল্লাহর কথার চেয়ে বেশী সত্য আর কার কথা হতে পারে? (সূরা নিসা ৪: ৮৭)। আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ১২২ নং আয়াতে আরো বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا
“আর আল্লাহর চেয়ে বেশী সত্যবাদী আর কে হতে পারে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা মায়িদার ১১৬ নং আয়াতে আরো বলেন:
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ ﴾
“স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা!”। আল্লাহ তা'আলা সূরা আনআমের ১১৫ নং আয়াতে আরো বলেন:
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ﴾
“সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে তোমার রবের কথা পূর্ণাঙ্গ, তাঁর কালেমাসমূহ পরিবর্তন করার কেউ নেই,”। আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ১৬৪ নং আয়াতে আরো বলেন:
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا
“আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছেন ঠিক যেমনভাবে কথা বলা হয়”। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ২৫৩ নং আয়াতে বলেন:
مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ ﴾
"তাদের কারোর সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা আরাফের ১৪৩ নং আয়াতে বলেন:
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَىٰ لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ ﴾
“অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তাঁর সাথে কথা বললেন”। আল্লাহ তা'আলা সূরা মারইয়ামের ৫২ নং আয়াতে বলেন:
وَنَادَيْنَاهُ مِن جَانِبِ الطُّورِ الْأَيْمَنِ وَقَرَّبْنَاهُ نَجِيًّا
"আমি তাকে তাঁর ডান দিকের তুর পাহাড়ের দিক থেকে ডাকলাম এবং গোপন আলাপের মাধ্যমে তাকে নৈকট্য দান করলাম”। আল্লাহ তা'আলা সূরা শুআরার ১০ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَإِذْ نَادَى رَبُّكَ مُوسَى أَنِ ائْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴾ "যখন তোমার রব মুসা কে ডেকে বলেছিলেন: যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও"। আল্লাহ তা'আলা সূরা আরাফের ২২ নং আয়াতে আরো বলেন:
﴿ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ ﴾ "তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, "আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি” আল্লাহ তা'আলা সূরা কাসাসের ৬৫ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ ﴾ স্মরণ করো সেদিনের কথা, যেদিন তিনি তাদেরকে ডাকবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবার ৬ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ﴾ "আর যদি মুশরিকদের কোন ব্যক্তি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পারে, তাহলে তাকে আল্লাহর কালাম শ্রবণ করা পর্যন্ত আশ্রয় দাও”। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ৭৫ নং আয়াতে আরো বলেন:
﴿ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِن بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ ﴾ "অথচ তাদের একটি দল এমন ছিল, যারা আল্লাহর কালাম শ্রবণ করতো। অতঃপর তা খুব ভালো করে জেনেবুঝে সজ্ঞানে তার মধ্যে তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন করতো"। আল্লাহ তা'আলা সূরা ফাতাহ এর ১৫ নং আয়াতে বলেন:
يُرِيدُونَ أَن يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللَّهِ ۚ قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَٰلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ
"এরা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে দিতে চায়। এদের বলে দাও, তোমরা কখনই আমাদের সাথে যেতে পারবে না, আল্লাহ তো আগেই এ কথা বলে দিয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা কাহাফের ২৭ নং আয়াতে বলেন:
وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن كِتَابِ رَبِّكَ ۖ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ
"হে নাবী! তোমার রবের কিতাবের মধ্য থেকে যাকিছু তোমার উপর অহী করা হয়েছে তা তুমি পাঠ করে শুনিয়ে দাও। তাঁর কালেমা পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই"। আল্লাহ তা'আলা সূরা নামালের ৭৬ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
"যথার্থই এই কুরআন বনী ইসরাইলের জন্য বেশির ভাগ এমনসব কথার স্বরূপ বর্ণনা করে, যেগুলোতে তারা মতভেদ করে"।
ব্যাখ্যাঃ وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ : আর আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে? অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কেউ নেই। আয়াতে যে প্রশ্ন করা হয়েছে তা হচ্ছে ইস্তেফহামে ইনকারী তথা অস্বীকারের প্রশ্ন। আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কেউ থাকাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে।
حديثا কথায়: অর্থাৎ কথায়, সংবাদ প্রদানে, আদেশ করায়, ওয়াদা-অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কেউ নেই।
وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا আল্লাহর চেয়ে বেশী সত্যবাদী আর কে হতে পারে? القيل হচ্ছে قال يقول এর মাসদার। এটি القول এর অনুরূপ। এই আয়াতাংশের অর্থও পূর্বের আয়াতের মতই। আল্লাহর কথার চেয়ে অধিক সত্য আর কারো কথা নেই এবং আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদীও আর কেউ নেই।
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার জন্য قيل ও حديث অর্থাৎ কথা বলা বিশেষণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং এতে আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম (কথা বলা) সাব্যস্ত করা হয়েছে।
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা: অর্থাৎ স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা! অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা ঈসা কে এই কথা বলবেন। যেসব নাসারা ঈসা এবং তাঁর মাতা মারইয়ামের ইবাদাত করছে, এই কথার মাধ্যমে তাদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে। এটি পূর্বের আয়াতদ্বয়ের মতই। এখানেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কথা বলা সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি যখন ইচ্ছা কথা বলেন।
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا “সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে তোমার রবের কথা পূর্ণাঙ্গ: এখানে কালেমা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কালাম উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সংবাদের ক্ষেত্রে সত্যবাদী এবং হুকুম-আহকামে ইনসাফকারী। صدقا এবং عدلا এই শব্দ দু'টি তামীয হিসাবে মানসুব হয়েছে। এই আয়াতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছেন ঠিক যেমনভাবে কথা বলা হয়: এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মুসাকে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা মুসার সাথে কথা বলেছেন এবং সেই কথা মুসাকে শুনিয়েছেন। এ জন্যই মুসাকে কালীমুল্লাহ বলা হয়।
মুসার সাথে আল্লাহর কালাম (কথা বলা) থেকে রূপকার্থের সম্ভাবনা দূর করার জন্য تكليما মাসদারকে তাগিদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতেও আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি মুসা এর সাথে কথা বলেছেন।
مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ তাদের কারো সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন: অর্থাৎ রসূলদের কারো কারো সাথে আল্লাহ তা'আলা কথা বলেছেন। বিনা মধ্যস্থতায় সরাসরি কথা বলেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মূসা এবং মুহাম্মাদ এর সাথে কথা বলেছেন। এমনি আদম এর সাথেও কথা বলেছেন। সহীহ ইবনে হিব্বানে এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এই আয়াতে আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি কতক রসূলের সাথে অতীতে কথা বলেছেন।
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুসার আগমণের জন্য যেই সময় নির্ধারণ করলেন, মূসা ঠিক সেই নির্ধারিত সময়েই উপস্থিত হলো।
وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ এবং তাঁর রব তাঁর সাথে কথা বললেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বিনা মধ্যস্থতায় মুসাকে তাঁর কথা বললেন। সুতরাং এ আয়াতেও আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা কথা বলেন। তিনি বিনা মধ্যস্থতায় মূসার সাথে কথা বলেছেন।
وَنَادَيْنَاهُ আমি তাকে ডাকলাম: আল্লাহ তা'আলা মূসাকে ডাক দিয়েছেন। উঁচু আওয়াজে ডাক দেয়াকে النداء বলা হয়।
مِن جانب الطُّور আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তুর পাহাড়ের দিক থেকে ডাক দিয়েছেন। মাদায়েন শহর এবং মিশরের মাঝখানের একটি পাহাড়ের নাম তুর।
الْأَيْمَنِ ডান দিক: মূসা যখন আগুন দেখে তা থেকে একটি জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে গেলেন তখন মূসার ডান দিক থেকে ডাক দেয়া হল। এখানে পাহাড়ের ডান দিক উদ্দেশ্য নয়। কেননা পাহাড়ের কোন ডান-বাম হয় না।
وَقَرَّبْنَاهُ তাকে নৈকট্য দান করলাম: আর আমি মুসা এর সাথে চুপিসারে কথা বলার জন্য তাঁকে নৈকট্য দান করলাম।
نجيا শব্দটি مناجيا অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ চুপিসারে কথার বলার জন্য মূসা কে আমার নৈকট্য দান করলাম। মুনাজাত মুনাদার (উঁচু আওয়াজে আহবানের) বিপরীত।
এই আয়াতে কারীমার মধ্যে আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উঁচু আওয়াজে ডাক দেন, আহবান করেন এবং চুপিসারেও কথা বলেন। ডাক দেয়া এবং মুনাজাত করা (নীচু আওয়াজে কথা বলা) কালামের (কথা বলার) দু'টি প্রকার। ডাক দেয়া সাধারণত উঁচু আওয়াজে হয় আর মুনাজাত নীচু আওয়াজের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
وَإِذْ نَادَىٰ رَبُّكَ مُوسَى যখন তোমার রব মুসাকে ডেকে বলেছিলেন, যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও: অর্থাৎ তাদেরকে পাঠ করে শুনাও সেই ঘটনা অথবা স্মরণ করো সেই সময়ের ঘটনা, যখন তোমার রব মুসা কে ডেকে বলেছিলেন। আহবান করাকে النداء বলা হয়। أن أنتِ এখানে أن অব্যয়টি أن مفسرة এবং أن مصدرية উভয়ই হতে পারে।
اذهب إلى الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ তুমি যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও: ফেরাউন সম্প্রদায়কে যালেম বলার কারণ এই যে, তারা কুফুরীর যুলুম এবং পাপাচারের যুলুমকে নিজেদের মধ্যে একত্র করেছিল। কুফুরীর মাধ্যমে তারা নিজেদের নফসের উপর যুলুম করেছিল এবং পাপাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে তারা অন্যদের উপর যুলুম করেছিল। যেমন তারা বনী ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করে রেখেছিল এবং তাদের ছেলে সন্তানদেরকে হত্যা করেছিল।
এই আয়াতে কারীমাতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম (কথা) সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যার সাথে ইচ্ছা কথা বলেন এবং তাকে স্বীয় কথা শুনিয়ে দেন।
وَ نَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি: আল্লাহ তা'আলা আদম ও হাওয়াকে এই বলে ডাক দিলেন যে, আমি কি তোমাদেরকে ঐ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি? অর্থাৎ ঐ গাছের ফল খেতে নিষেধ করিনি? এই কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের দুইজনকে ধমক দিয়েছেন। কেননা তাদেরকে যেই বস্তু হতে সাবধান করা হয়েছিল, তা থেকে তারা বিরত থাকে নি।
এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আরো সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ হতে আদম ও তাঁর স্ত্রী হাওয়ার জন্য ডাক এসেছিল।
وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ সেদিনের কথা, যেদিন তিনি তাদেরকে ডাকবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন: তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে? অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কিয়ামাতের দিন এই মুশরেকদেরকে ডাক দিবেন এবং বলবেন, তোমরা রসূলদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে? যেসব নাবীকে তোমাদের নিকট পাঠানো হয়েছিল, তারা যখন তোমাদের কাছে আমার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিয়েছিলো তাদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে?
এই আয়াতেও আল্লাহর জন্য কালাম (কথা বলা) সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামাতের দিন মানুষকে ডাক দিবেন।
وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! যেসব মুশরেকের সাথে তোমাকে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে, তাদের কেউ যদি আল্লাহর কালাম শ্রবণ করার জন্য তোমার কাছে আসতে চায়, তোমার নিরাপত্তা কামনা করে এবং আশ্রয় চায়, তুমি তাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দান করো।
حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهُ যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়। অর্থাৎ তোমার জবানীতে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং তুমি যে বিষয়ের প্রতি আহবান করছো, তার প্রকৃত অবস্থাও বোধগম্য হয়।
এই আয়াত থেকেও আল্লাহ তা'আলার কালাম (কথা বলা বিশেষণ) রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ আমরা যা তেলাওয়াত করি, তা আল্লাহর কালাম।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ তাদের মধ্যে একটি দল ছিল: এটি হচ্ছে ইহুদীদের দল। فریق শব্দটি اسم جمع। এই শব্দের কোন একবচন নেই।
يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ তারা আল্লাহর কালাম শ্রবণ করতো। এখানে কালাম দ্বারা তাওরাত উদ্দেশ্য। ইহুদীরা তাওরাতের আয়াত শ্রবণ করতো।
ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ অতঃপর তারা উহার মধ্যে বিকৃতি সাধন করতো। অর্থাৎ তারা আসল ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে অন্য ব্যাখ্যা করতো।
مِن بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ তারা তার মধ্যে তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন করতো: অর্থাৎ ভাল করে জেনে-বুঝে তারা তাওরাতের বিপরীত আমল করতো।
وَهُمْ يَعْلَمُونَ তারা ভাল করেই জানতো যে, তারা যেই তাহরীফ বা পরিবর্তন করছে এবং যেই অপব্যাখ্যা করছে, তাতে তারা অপরাধী।
এই আয়াতে কারীমা থেকেও আল্লাহর কালাম আছে বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তাওরাতও আল্লাহর কালামের অন্তর্ভুক্ত। আর ইহুদীরা তাওরাতের মধ্যে তাহরীফ করেছে, উহার মধ্যে পরিবর্তন ও রদবদল করেছে।
يُرِيدُونَ أَن يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللهِ قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে দিতে চায়। এদের বলে দাও: তোমরা কখনই আমাদের সাথে যেতে পারবে না, আল্লাহ তো আগেই এ কথা বলে দিয়েছেন।
يُريدُونَ এরা: এখানে পিছনে থেকে যাওয়া ঐ সমস্ত গ্রাম্য লোক উদ্দেশ্য, যারা রসূল ﷺ এর সাথে জিহাদে বের না হয়ে পরিবার-পরিজন ও নিজেদের কাজ-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। হুদায়বিয়ার বছরও তারা রসূল ﷺ এর সাথে বের না হয়ে নিজেদের গৃহেই বসেছিল।
أَن يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللَّهِ তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করতে চায়। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার সেই কথাকে পরিবর্তন করতে চায়, যার মাধ্যমে তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, খায়বারের গণীমত কেবল তারাই পাবে।
قُل لَّن تَتَّبِعُونَا বলো, তোমরা কখনই আমাদের সাথে যেতে পারবে না, এই বাক্যটি না বাচক হলেও তা নিষেধাজ্ঞা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। لا تتبعونا অর্থাৎ আমাদের সাথে তোমরা বের হয়ো না।
كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ আল্লাহ তো আগেই এই কথা বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সাথে আগেই ওয়াদা করেছিলেন যে, পরের বছর খায়বারের যুদ্ধে যেই গণীমত হাসিল হবে, তা কেবল হুদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যই।
উক্ত আয়াতে কারীমা থেকে জানা গেল যে, আল্লাহর জন্য কালাম ও কাওল তথা কথা বলা বিশেষণ সুসাব্যস্ত। ১৯ আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা কথা বলেন। আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করা জায়েয নেই। আল্লাহর কালামের উপর আমল করা আবশ্যক এবং তার অনুসরণ করা জরুরী।
হে নাবী! যা কিছু তোমার উপর অহী করা হয়েছে وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ তা তুমি পাঠ করে শুনিয়ে দাও: আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাবীর উপর অহী স্বরূপ যেই কিতাব নাযিল করেছেন, তা সর্বদা তেলাওয়াত করার আদেশ করেছেন। দ্রুত এবং অতি সংগোপনে জানিয়ে দেয়াকে অহী বলা হয়।২০ উসূলে তাফসীরের কিতাবগুলোতে অহীর বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।
مِن كِتَابِ رَبِّكَ তোমার রবের কিতাবের মধ্য থেকে: এই বাক্যটি ঐ বিষয়ের বর্ণনা স্বরূপ, যা তাঁর নিকট অহী করা হয়েছে।
لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ তাঁর কালেমা (কথা) পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই: অর্থাৎ তাঁর কথার কোন পরিবর্তনকারী, বিকৃতকারী এবং অপসারণকারী নেই। মোট কথা এই আয়াতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালেমা সাব্যস্ত করা হয়েছে।
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ বেশির ভাগ স্বরূপ বর্ণনা করে: তাওরাত ও ইঞ্জিলের অধিকারীদেরকে বনী ইসরাঈল বলা হয়। তারা হচ্ছে ইহুদী ও নাসারা।
أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ তারা ঈসার ব্যাপারে মতভেদ করেছে। ইহুদীরা ঈসা কে অবৈধ সন্তান বলে অপবাদ দিয়েছে। আর খৃষ্টানরা তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কুরআন তাঁর বিষয়ে মধ্যম পন্থা নিয়ে এসেছে। সত্য কথা হলো তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল এবং আল্লাহর কালেমা, যা তিনি মারইয়াম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি আল্লাহর একটি রূহ। অর্থাৎ আল্লাহর ঐ সমস্ত রূহের অন্তর্ভুক্ত, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন।
এই আয়াতে কারীমা থেকেও প্রমাণ মিলে যে, কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম। কুরআনের মধ্যে পূর্বের সমস্ত কিতাবের খবর রয়েছে এবং আহলে কিতাবদের ফির্কাসমূহের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, কুরআন ইনসাফের সাথে সেসব বিষয়ের ফয়সালাকারী। আর এ সব বিষয় আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসা অসম্ভব।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া যে আয়াতগুলো এখানে উল্লেখ করেছেন, সেগুলো আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করেছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ যেহেতু প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ তা'আলা কথা বলা বিশেষণে বিশেষিত, তাই তারা আল্লাহর জন্য উহা সাব্যস্ত করে। কালাম (কথা বলা) আল্লাহ তা'আলার সিফাতে যাতীয়া বা সত্তাগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা তিনি এর দ্বারা বিশেষিত এবং তাঁর সাথে উহা কায়েম রয়েছে। আরেক দিক থেকে কালাম সিফাতে ফেলিয়া বা কর্মগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তা আল্লাহর ইচ্ছা ও কুদরত অনুযায়ী সংঘটিত হয়। তিনি যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা এবং যে বিষয়ে ইচ্ছা কথা বলেন। তাঁর কালাম আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ তিনি চিরন্তন, চিরস্থায়ী এবং অবিনশ্বর। তিনি কামেল তথা সকল দিক থেকে পরিপূর্ণ। আল্লাহর কালাম তাঁর সিফাতে কামালিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিজের সত্তাকে কালাম (কথা বলা) বিশেষণে বিশেষিত করেছেন এবং রসূল ﷺ এর পবিত্র সুন্নাতে তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে বিশেষিত করেছেন। এই বিষয়ে বিরোধীদের মাযহাব এবং তার জবাব অচিরেই আসবে ইনশা-আল্লাহ。
টিকাঃ
১৯. কুরআন আল্লাহর কালাম; ইহা আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর মত নয়। কুরআন আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে এবং আল্লাহর নিকট ফিরে যাবে। উপরে উল্লেখিত দলীলগুলো সে কথারই প্রমাণ করে। সাহাবী, তাবেঈ, সালাফে সালেহীন এবং সম্মানিত ইমামগণের মতও তাই। সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে কুরআন আল্লাহর কালাম।
২০. আল্লাহ তা'আলা নাবী-রসূলদের মাধ্যমে সৃষ্টির জন্য যে দ্বীন ও শারীয়াত পাঠিয়েছেন, তাকে শারীয়াতের পরিভাষায় অহী বলা হয়।
📄 কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
وقوله: {وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ } {لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لِّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ} {وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ قَالُوا إِنَّمَا أَنتَ مُفْتَرٍ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهُدًى وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ}
আল্লাহ তা'আলা সূরা আন'আমের ৯২ ও ১৫৫ নং আয়াতে বলেন: وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ
"আর এটি একটি বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি নাযিল করেছি”। আল্লাহ তা'আলা সূরা হাশরের ২১ নং আয়াতে বলেন: لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ﴾
"আমি যদি এই কুরআনকে কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ছে এবং ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে”। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ قَالُوا إِنَّمَا أَنتَ مُفْتَرٍ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهُدًى وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ
"যখন আমি একটি আয়াতকে অন্য একটি আয়াত দ্বারা বদল করি, আর আল্লাহ ভালো করেই জানেন তিনি কি নাযিল করবেন- তখন এরা বলে, তুমি নিজেই এ কুরআনের রচনাকারী। আসলে এদের অধিকাংশই জানে না। এদেরকে বলো, একে তো রূহুল কুদ্দুস সত্য সহকারে তোমার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করেছে, যাতে মুমিনদের সুদৃঢ় করা যায়। আর এটি মুসলিমদের জন্য হেদায়াত ও সুসংবাদ স্বরূপ। আমি জানি এরা তোমার সম্পর্কে বলে, এ ব্যক্তিকে একজন লোক শিক্ষা দেয়। অথচ এরা যে ব্যক্তির দিকে ইংগিত করে তার ভাষা তো আরবী নয়। আর এটি হচ্ছে পরিষ্কার আরবী ভাষা”। (সূরা নাহাল ১৬:১০১-১০৩)
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া যখন আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম সাব্যস্ত করার দলীলগুলো উল্লেখ করলেন এবং এই কথা সাব্যস্ত করলেন যে, কুরআনুল কারীম আল্লাহ তা'আলার কালাম, তখন ঐসব দলীল বর্ণনা শুরু করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
وَهُدًى এটি: এখানে কুরআনুল কারীমের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানে ইসমে ইশারা মুবতাদা। তার খবর হচ্ছে كتاب।
أَنزَلْنَاهُ আমি অবতীর্ণ করেছি এবং مُبَارَكٌ (বরকত সম্পন্ন) এই দু'টি كِتَابٌ এর সিফাত। এখানে অবতীর্ণ করা সিফাতকে مُبَارَكٌ এর আগে উল্লেখ করার কারণ হলো কাফেররা মুহাম্মাদ -এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়াকে অস্বীকার করতো। প্রচুর বরকত ওয়ালা বস্তুকে مُبَارَكٌ বলা হয়। কুরআনকে বরকত ওয়ালা বলার কারণ হলো তাতে রয়েছে দ্বীন ও দুনিয়ার প্রচুর বরকত ও কল্যাণ।
لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَّصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ যদি এই কুরআনকে কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ছে এবং ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে:
এখানে কুরআনের ফাযীলাত ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন শুনে এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় অন্তর ভীত হওয়া আবশ্যক। কেননা কুরআন যদি পাহাড়ের উপর নাযিল করা হতো, তাহলে পাহাড় এত কঠিন ও মজবুত হওয়া সত্ত্বেও কুরআন বুঝার পর আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হতো এবং আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ফেটে যেত। সুতরাং হে মানব! এটি কিভাবে সম্ভব যে, কুরআন শুনে তোমাদের অন্তর নরম হয় না এবং তা ভীতও হয় না? অথচ তোমরা আল্লাহর আদেশ বুঝতে সক্ষম হয়েছ এবং তাঁর কিতাব অনুধাবন করেছ।
وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ যখন আমি একটি আয়াতকে অন্য একটি আয়াত দ্বারা বদল করি: এখানে আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীম সম্পর্কে একটি কুফুরী শুবহার (সন্দেহের) বর্ণনা শুরু করেছেন এবং তার জবাব দিয়েছেন। বদল করার অর্থ হলো কোন জিনিসকে নিজ স্থান থেকে উঠিয়ে নিয়ে তার স্থলে অন্য জিনিস স্থাপন করা। আয়াতকে বদল করার তাৎপর্য হচ্ছে তা উঠিয়ে নিয়ে তার স্থলে অন্য একটি আয়াত রাখা। এর নাম হচ্ছে এক আয়াতের মাধ্যমে অন্য আয়াত মানসুখ বা রহিত করা।
قالوا এরা বলে: অর্থাৎ কুরাইশ গোত্রের কাফেররা মানসুখ করার হিকমাত সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে বলে, হে মুহাম্মাদ! নিশ্চয়ই তুমি মিথ্যা রচনাকারী। আল্লাহর উপর জবান লম্বা করছো। তোমার ধারণা এই যে, আল্লাহ তোমাকে একটি বিষয়ে আদেশ করেছেন। পুনরায় ধারণা করো যে, আল্লাহ তোমাকে প্রথম আদেশের বিপরীত অন্য এক আদেশ দিয়েছেন। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার এমন জবাব দিয়েছেন, যাতে তাদের অজ্ঞতার প্রমাণ মিলে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ অধিকাংশই জানে না: অর্থাৎ মূলতঃ তারা কোন জ্ঞানই রাখে না এবং নসখ বা রহিত হওয়ার হিকমাত সম্পর্কেও তারা অবগত নয়। কুরআনের এক আয়াতকে অন্য আয়াত দ্বারা পরিবর্তন করার মধ্যে কী পরিমাণ উপকারিতা রয়েছে, তা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ জানে না। কখনো একটি বিষয় শারীয়াতের অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশেষ একটি স্বার্থ থাকে। অতঃপর সেই সময় পার হওয়ার পর তার বদলে অন্য একটি বিষয় শারীয়াতভূক্ত করার মধ্যেই উপকার লক্ষ্য করা যায়। এই কাফেরদের বিবেক-বুদ্ধির উপর থেকে যদি পর্দা উঠে যেত, তাহলে তারা বুঝতে সক্ষম হতো যে, মানসুখ করাই সঠিক, ইনসাফপূর্ণ এবং সহজ-সরল।
অতঃপর তারা যে ধারণা করেছিল, এই পরিবর্তন মুহাম্মাদ ﷺ এর নিজের পক্ষ হতে এবং এর মাধ্যমে সে মিথ্যা রচনা করেছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের ধারণার প্রতিবাদ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুহাম্মাদ! তুমি বলো যে, এই কুরআন নাযিল করেছেন রূহুল কুদুস তথা জিবরীল এর মাধ্যমে। কুদুস অর্থ পবিত্র। আসল অর্থ হচ্ছে الروح المطهر (পবিত্র আত্মা) এটি নাযিল করেছে। روح القدس এখানে মাওসুফকে (রূহকে) সিফাতের (কুদ্দুসের) দিকে ইযাফত সম্বোধন করা হয়েছে।
مِّن رَّبِّكَ তোমার রবের পক্ষ হতে অর্থাৎ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে। بِالْحَقِّ সত্য সহকারে: এটি হাল হিসাবে নসবের স্থানে পতিত হয়েছে। অর্থাৎ মূল বাক্যটি এ রকম হতে পারে متصفا بكونه حقا অবস্থায় এই কুরআন নাযিল হয়েছে।
لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا যাতে মুমিনদের সুদৃঢ় করা যায়: অর্থাৎ যাতে মুমিনদেরকে ঈমানের উপর মজবুত রাখা যায় সেই জন্য তোমার উপর জিবরীলের মাধ্যমে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। নাসেখ মানসুখও আল্লাহর পক্ষ হতেই এসেছে। যাতে মুমিনগণ বলতে পারে যে, নাসেখ এবং মানসুখের প্রত্যেকটিই আমাদের রব আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। বিশেষ করে যখন তারা জানতে পারবে যে, নসখ (রহিত) করার মধ্যে অনেক উপকারিতা রয়েছে, তখন তারা ঈমানের উপর সুদৃঢ় থাকবে।
هُدًى وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ সুসংবাদ স্বরূপ: এখানে هدی এবং بشری শব্দ দু'টি ليثبت এর অবস্থানের উপর আতফ (স্থাপন) করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল বাক্যটি এ রকম হতে পারে: تثبيتا لهم وهداية وبشرى । অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কাফেরদের সন্দেহগুলো থেকে আরেকটি সন্দেহ বর্ণনা করেছেন এবং জবাব দিয়েছেন।
وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ বলে, এ ব্যক্তিকে একজন লোক শিক্ষা দেয়: অর্থাৎ আমি অবশ্যই জানি যে, এই কাফেররা বলে, একজন মানুষ মুহাম্মাদ কে কুরআন শিক্ষা দেয়। আসমানের কোন ফেরেশতা তাঁর নিকট কুরআন নিয়ে আসে না। যেই মানুষটি তাকে কুরআন শিক্ষা দেয়, সে এর আগে তাওরাত, ইঞ্জিল এবং অনারবদের কিতাবাদি পাঠ করেছে। কারণ মুহাম্মাদ একজন অশিক্ষিত মানুষ। কুরআনে অতীতের যেসব খবর উল্লেখ করা হচ্ছে, মুহাম্মাদ দ্বারা তা রচনা করা সম্ভব নয়।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার জবাব এইভাবে দিয়েছেন যে, لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ করে তার ভাষা তো আরবী নয়: অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ ! যেই ব্যক্তি তোমাকে কুরআন শিক্ষা দেয় বলে তারা ধারণা করছে, তার ভাষা আরবী নয়। সে আরবী বলতে পারে না। আর এই কুরআন তো পরিষ্কার আরবী ভাষায়। অর্থাৎ এই কুরআন অলঙ্কারপূর্ণ আরবী ভাষায় এবং এর বর্ণনা সুস্পষ্ট। সুতরাং তোমরা কিভাবে ধারণা করছ যে, একজন অনারব লোক মুহাম্মাদ কে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছে? অথচ তোমরা কুরআনের মোকাবেলা করতে অক্ষম হয়েছ, অক্ষম হয়েছ কুরআনের মত কয়েকটি বা একটি সূরা আনয়ন করতে। তোমরা আরবী ভাষার লোক, সুস্পষ্ট আরবী বলায় পারদর্শী এবং অলঙ্কারপূর্ণ বক্তব্য প্রদানকারীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় হওয়ার পরও তোমরা কুরআনের মোকাবেলা করতে অক্ষম হয়েছ।
উপরোক্ত আয়াতগুলোর শিক্ষা: উপরোক্ত আয়াতে কারীমাগুলো থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, কুরআন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
কুরআন আল্লাহরই কালাম। ফেরেশতা বা কোন মানুষের কালাম নয়। যারা বলে কুরআন আল্লাহর কালাম নয়; সৃষ্টির কালাম, এখানে তাদের কথারও প্রতিবাদ করা হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহর জন্য মাখলুকের উপর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা নাযিল কেবল উপর থেকেই হয়。
📄 ক্বিয়ামতের দিন মু‘মিনগণ তাদের রবকে দেখবে।
وقوله: {وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ * إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ} { عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ} {لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ} {لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ} وهذا الباب في كتاب الله كثير. ومن تدبر القرآن طلبًا للهدى تبين له طريق الحق.
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ “সে দিন অনেক মুখ-মন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে” (সূরা কিয়ামাহ ৭৫: ২২-২৩)। আল্লাহ তা'আলা সূরা মুতাফফিফীনের ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ “উঁচু আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউনুসের ২৬ নং আয়াতে আরো বলেন: لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ক্বাফ এর ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ সেখানে তারা যা চাইবে তাই তাদের জন্য প্রস্তুত থাকবে। আর আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে, তার জন্য সত্যের পথ পরিস্কার হবে।
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন মুমিনদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। ناضرة শব্দটি النضارة থেকে যোয়াদ বর্ণ দিয়ে পড়তে হবে। এর অর্থ হচ্ছে উজ্জ্বল ও সুন্দর হওয়া অর্থাৎ আলোকোজ্জল, তরতাজা, সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় হওয়া। সেদিন তারা তাদের প্রভু ও সৃষ্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা তাদের চোখ দ্বারাই তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এ সম্পর্কে রসূল হতে মুতাওয়াতির সূত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈ এবং উম্মতের সালাফগণের ইজমা হয়েছে এবং ইসলামের ইমামগণ তাতে একমত হয়েছেন।
আয়াতে কারীমার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলো যে, মুমিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখতে পাবেন। عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ : الأرائك শব্দটি أريكة এর বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে সিংহাসন বা খাঁট। মুমিনগণ সিংহাসনে বসে তাদের রব আল্লাহ তা'আলার দিকে তাকিয়ে দেখবে। আর কাফেরদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে যেমন এই আয়াতের পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে, তারা عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ নিশ্চয়ই সেদিন তাদের রবের দর্শন থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখা হবে।
এ আয়াত থেকেও কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য তাদের মহান রবকে দেখার বিষয়টি প্রমাণিত হলো। لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব আমল ওয়াজিব করেছেন, উহা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং যেসব পাপাচার থেকে তাদেরকে নিষেধ করেছেন, যারা তা বর্জন করার মাধ্যমে কল্যাণের পথ অবলম্বন করবে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ তথা উত্তম বিনিময়। এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, উহা হচ্ছে জান্নাত। زيادة )আরো বেশী( এর তাফসীরে সহীহ মুসলিম এবং অন্যান্য কিতাবে সহীহ সূত্রে নাবী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে যিয়াদাহ বা বেশী বলতে আল্লাহর মহান চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা। এই উম্মতের সালাফে সালেহীনগণও এই ব্যাখ্যা করেছেন। তাই উপরের আলোচনা হতে প্রমাণ মিলছে যে, মুমিনদের জন্য কিয়ামাতের দিন তাদের রবকে দেখার সুযোগ রয়েছে।
لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তাই থাকবে: জান্নাতে মুমিনদের মন যা চাইবে, তাদের জন্য তাই রয়েছে সেখানে। তাদের চোখ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত এবং অপরিমীত কল্যাণ পেয়ে শীতল হবে।
وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে: অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত ও কল্যাণের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা হলো আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা।
আয়াতে কারীমার এই অংশ থেকেই প্রমাণ নেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে মুমিনদের তাকানো প্রমাণিত হয়েছে।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে যা শিক্ষণীয়: উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য আল্লাহর দিদার প্রমাণিত হলো। আর এটিই হবে মুমিনদের জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার বিষয়ে এটিই হচ্ছে সাহাবী, তাবেঈ এবং মুসলিমদের সম্মানিত ইমামগণের কথা। শিয়াদের রাফেযী সম্প্রদায়, জাহমীয়া এবং মুতাযেলারা এই মাসআলায় খেলাফ করেছে। তারা আল্লাহর দিদারকে অস্বীকার করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং উম্মতের সালাফ ও ইমামগণের বিরোধীতা করেছে। উপরোক্ত বাতিল ফির্কার লোকেরা আল্লাহর দিদার অস্বীকার করার পক্ষে কতিপয় দুর্বল সন্দেহ এবং ভ্রান্ত দলীল পেশ করেছে। তার মধ্যে
(১) আল্লাহকে দেখা যাবে এই কথা সাব্যস্ত করলে আবশ্যক হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন একটি দিকে রয়েছেন। আর তিনি যদি কোন দিকে থাকেন, তাহলে তার জন্য জিসিম (দেহ, কায়া, আকৃতি, শরীর ইত্যাদি) সাব্যস্ত হয়। অথচ আল্লাহ তা'আলা জিসিম বা দেহ ও শরীর থেকে পবিত্র।
এই সন্দেহের জবাব এই যে, দিক শব্দটির মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। এর দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঢুকে আছেন, তাহলে এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল। অসংখ্য দলীল এই কথাকে বাতিল প্রমাণিত করেছে। আল্লাহকে দেখা যাবে বা তাকে দেখা সম্ভব এটা সাব্যস্ত করলে, আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত হয়ে যায় না। আর যদি দিক দ্বারা উপরের দিক উদ্দেশ্য হয় তথা এটি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপরে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপরের দিক সুসাব্যস্ত। এটি অস্বীকার করা অন্যায়। আল্লাহ তা'আলার দিদার অর্জিত হওয়ার সাথে তিনি উপরের দিকে হওয়া সাংঘর্ষিক নয়।
(২) মুতাযেলা এবং আল্লাহর দিদারে অবিশ্বাসী অন্যান্য সম্প্রদায় দলীল হিসাবে আল্লাহর বাণী: لن تراني "তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না"- এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে। তাদের দলীল গ্রহণের জবাবে বলা হয়েছে যে, আয়াতে দুনিয়াতে আল্লাহর দিদার নাকোচ করা হয়েছে। আখেরাতের দিদার নাকোচ করা হয়নি। যেমন অন্যান্য দলীলের মাধ্যমে আখেরাতে আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়েছে। আখেরাতে মানুষের অবস্থা দুনিয়ার অবস্থার চেয়ে ভিন্ন হবে। ২১
(৩) তারা আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারাও দলীল গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ "দৃষ্টিশক্তি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (সূরা আনআম ৬:১০৩)
এর জবাবে বলা হয়েছে যে, এই আয়াতে ইদরাক তথা আল্লাহকে আয়ত্ত করার নাফী এসেছে। আল্লাহর দিদার নফী করা হয়নি। إدراك অর্থ হচ্ছে আয়ত্ত ও বেষ্টন করা।
মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলাকে দেখবে; কিন্তু তাঁকে আয়ত্ত করতে পারবে না। বরং মানুষের দৃষ্টিসমূহ আল্লাহকে বেষ্টন করতে পারবে না, এই কথা থেকেও আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এই আয়াতটি আল্লাহর দর্শন সাব্যস্ত করার অন্যতম দলীল। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জানেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ কুরআনে আল্লাহর জন্য নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করার বিষয়ে অনেক আলোচনা এসেছে। গ্রন্থকার এখানে তা থেকে সামান্য কিছু উল্লেখ করেছেন। কুরআনের অনেক আয়াতে আল্লাহর নাম এবং তাঁর সিফাতের বর্ণনা এসেছে। এগুলো আল্লাহর জন্য ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করতে হবে, যেভাবে সাব্যস্ত করলে আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় হয়।
যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে অর্থাৎ তাতে চিন্তা-গবেষণা করবে এবং কুরআন যেই হেদায়াতের প্রমাণ বহন করে, তার উপর দৃষ্টি দিবে, তার জন্য সত্যের পথ উন্মুক্ত হবে। সত্যের রাস্তা তার জন্য পরিস্কার হবে। কুরআন নিয়ে গবেষণা করাই হচ্ছে উহা পাঠ করার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ "এটি একটি অত্যন্ত বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে এরা তার আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং জ্ঞানী ও চিন্তাশীলরা তা থেকে শিক্ষা নেয়”। (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯) আল্লাহ তা'আলা সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
"তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের হৃদয়ের উপর তালা লাগানো আছে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমিনুনের ৬৮ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ أَمْ جَاءَهُم مَّا لَمْ يَأْتِ آبَاءَهُمُ الْأَوَّلِينَ
"তারা কি কখনো এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা করেনি? না কি সে এমন কথা নিয়ে এসেছে যা কখনো তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে আসেনি?
টিকাঃ
২১. দুনিয়াতে মানুষের চোখ দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে দুনিয়ায় তৈরী করা হয়নি। পাহাড়ের গঠন মানুষ গঠনের চেয়ে অধিক মজবুত ও শক্ত হওয়ার পরও যেহেতু পাহাড় আল্লাহর নূরের সামনে টিকে থাকতে পারেনি এবং আল্লাহ তা'আলা যখন পাহাড়ের উপর স্বীয় জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল, তাই বুঝা গেল যে মানুষ চর্ম চক্ষু দিয়ে দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখতে সক্ষম নয়। (আল্লাহই সর্বাধিক জানেন)
وقوله: {وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ * إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ} { عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ} {لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ} {لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ} وهذا الباب في كتاب الله كثير. ومن تدبر القرآن طلبًا للهدى تبين له طريق الحق.
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَّاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ “সে দিন অনেক মুখ-মন্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে” (সূরা কিয়ামাহ ৭৫: ২২-২৩)। আল্লাহ তা'আলা সূরা মুতাফফিফীনের ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ “উঁচু আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউনুসের ২৬ নং আয়াতে আরো বলেন: لِّلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী”। আল্লাহ তা'আলা সূরা ক্বাফ এর ৩৫ নং আয়াতে আরো বলেন: لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ সেখানে তারা যা চাইবে তাই তাদের জন্য প্রস্তুত থাকবে। আর আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে, তার জন্য সত্যের পথ পরিস্কার হবে।
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন মুমিনদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। ناضرة শব্দটি النضارة থেকে যোয়াদ বর্ণ দিয়ে পড়তে হবে। এর অর্থ হচ্ছে উজ্জ্বল ও সুন্দর হওয়া অর্থাৎ আলোকোজ্জল, তরতাজা, সুন্দর এবং জ্যোতির্ময় হওয়া। সেদিন তারা তাদের প্রভু ও সৃষ্টিকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তারা তাদের চোখ দ্বারাই তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এ সম্পর্কে রসূল হতে মুতাওয়াতির সূত্রে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে সাহাবী, তাবেঈ এবং উম্মতের সালাফগণের ইজমা হয়েছে এবং ইসলামের ইমামগণ তাতে একমত হয়েছেন।
আয়াতে কারীমার মাধ্যমে সাব্যস্ত হলো যে, মুমিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখতে পাবেন। عَلَى الْأَرَائِكِ يَنظُرُونَ : الأرائك শব্দটি أريكة এর বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে সিংহাসন বা খাঁট। মুমিনগণ সিংহাসনে বসে তাদের রব আল্লাহ তা'আলার দিকে তাকিয়ে দেখবে। আর কাফেরদের ব্যাপারে কথা হচ্ছে যেমন এই আয়াতের পূর্বের আয়াতে বলা হয়েছে, তারা عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ নিশ্চয়ই সেদিন তাদের রবের দর্শন থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখা হবে।
এ আয়াত থেকেও কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য তাদের মহান রবকে দেখার বিষয়টি প্রমাণিত হলো। لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ “যারা উত্তম আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং আরো বেশী: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব আমল ওয়াজিব করেছেন, উহা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং যেসব পাপাচার থেকে তাদেরকে নিষেধ করেছেন, যারা তা বর্জন করার মাধ্যমে কল্যাণের পথ অবলম্বন করবে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ তথা উত্তম বিনিময়। এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, উহা হচ্ছে জান্নাত। زيادة )আরো বেশী( এর তাফসীরে সহীহ মুসলিম এবং অন্যান্য কিতাবে সহীহ সূত্রে নাবী হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে যিয়াদাহ বা বেশী বলতে আল্লাহর মহান চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা। এই উম্মতের সালাফে সালেহীনগণও এই ব্যাখ্যা করেছেন। তাই উপরের আলোচনা হতে প্রমাণ মিলছে যে, মুমিনদের জন্য কিয়ামাতের দিন তাদের রবকে দেখার সুযোগ রয়েছে।
لَهُم مَّا يَشَاءُونَ فِيهَا সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তাই থাকবে: জান্নাতে মুমিনদের মন যা চাইবে, তাদের জন্য তাই রয়েছে সেখানে। তাদের চোখ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত এবং অপরিমীত কল্যাণ পেয়ে শীতল হবে।
وَلَدَيْنَا مَزِيدٌ আমার কাছে আরো কিছু অতিরিক্ত জিনিসও থাকবে: অর্থাৎ বিভিন্ন প্রকার নেয়ামাত ও কল্যাণের অতিরিক্ত যা থাকবে, তা হলো আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকা।
আয়াতে কারীমার এই অংশ থেকেই প্রমাণ নেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে জান্নাতে আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত চেহারার দিকে মুমিনদের তাকানো প্রমাণিত হয়েছে।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে যা শিক্ষণীয়: উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে কিয়ামাতের দিন মুমিনদের জন্য আল্লাহর দিদার প্রমাণিত হলো। আর এটিই হবে মুমিনদের জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আল্লাহ তা'আলাকে দেখার বিষয়ে এটিই হচ্ছে সাহাবী, তাবেঈ এবং মুসলিমদের সম্মানিত ইমামগণের কথা। শিয়াদের রাফেযী সম্প্রদায়, জাহমীয়া এবং মুতাযেলারা এই মাসআলায় খেলাফ করেছে। তারা আল্লাহর দিদারকে অস্বীকার করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং উম্মতের সালাফ ও ইমামগণের বিরোধীতা করেছে। উপরোক্ত বাতিল ফির্কার লোকেরা আল্লাহর দিদার অস্বীকার করার পক্ষে কতিপয় দুর্বল সন্দেহ এবং ভ্রান্ত দলীল পেশ করেছে। তার মধ্যে
(১) আল্লাহকে দেখা যাবে এই কথা সাব্যস্ত করলে আবশ্যক হয় যে, আল্লাহ তা'আলা কোন একটি দিকে রয়েছেন। আর তিনি যদি কোন দিকে থাকেন, তাহলে তার জন্য জিসিম (দেহ, কায়া, আকৃতি, শরীর ইত্যাদি) সাব্যস্ত হয়। অথচ আল্লাহ তা'আলা জিসিম বা দেহ ও শরীর থেকে পবিত্র।
এই সন্দেহের জবাব এই যে, দিক শব্দটির মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে। এর দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঢুকে আছেন, তাহলে এই কথা সম্পূর্ণ বাতিল। অসংখ্য দলীল এই কথাকে বাতিল প্রমাণিত করেছে। আল্লাহকে দেখা যাবে বা তাকে দেখা সম্ভব এটা সাব্যস্ত করলে, আল্লাহর জন্য দিক সাব্যস্ত হয়ে যায় না। আর যদি দিক দ্বারা উপরের দিক উদ্দেশ্য হয় তথা এটি উদ্দেশ্য হয় যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপরে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপরের দিক সুসাব্যস্ত। এটি অস্বীকার করা অন্যায়। আল্লাহ তা'আলার দিদার অর্জিত হওয়ার সাথে তিনি উপরের দিকে হওয়া সাংঘর্ষিক নয়।
(২) মুতাযেলা এবং আল্লাহর দিদারে অবিশ্বাসী অন্যান্য সম্প্রদায় দলীল হিসাবে আল্লাহর বাণী: لن تراني "তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না"- এই আয়াত দ্বারা দলীল গ্রহণ করেছে। তাদের দলীল গ্রহণের জবাবে বলা হয়েছে যে, আয়াতে দুনিয়াতে আল্লাহর দিদার নাকোচ করা হয়েছে। আখেরাতের দিদার নাকোচ করা হয়নি। যেমন অন্যান্য দলীলের মাধ্যমে আখেরাতে আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়েছে। আখেরাতে মানুষের অবস্থা দুনিয়ার অবস্থার চেয়ে ভিন্ন হবে। ২১
(৩) তারা আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারাও দলীল গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ "দৃষ্টিশক্তি তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না। (সূরা আনআম ৬:১০৩)
এর জবাবে বলা হয়েছে যে, এই আয়াতে ইদরাক তথা আল্লাহকে আয়ত্ত করার নাফী এসেছে। আল্লাহর দিদার নফী করা হয়নি। إدراك অর্থ হচ্ছে আয়ত্ত ও বেষ্টন করা।
মুমিনগণ আল্লাহ তা'আলাকে দেখবে; কিন্তু তাঁকে আয়ত্ত করতে পারবে না। বরং মানুষের দৃষ্টিসমূহ আল্লাহকে বেষ্টন করতে পারবে না, এই কথা থেকেও আল্লাহর দিদার সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এই আয়াতটি আল্লাহর দর্শন সাব্যস্ত করার অন্যতম দলীল। আল্লাহ তা'আলাই সর্বাধিক জানেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন, আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে আরো অনেক আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ কুরআনে আল্লাহর জন্য নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করার বিষয়ে অনেক আলোচনা এসেছে। গ্রন্থকার এখানে তা থেকে সামান্য কিছু উল্লেখ করেছেন। কুরআনের অনেক আয়াতে আল্লাহর নাম এবং তাঁর সিফাতের বর্ণনা এসেছে। এগুলো আল্লাহর জন্য ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করতে হবে, যেভাবে সাব্যস্ত করলে আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় হয়।
যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে গবেষণা করবে অর্থাৎ তাতে চিন্তা-গবেষণা করবে এবং কুরআন যেই হেদায়াতের প্রমাণ বহন করে, তার উপর দৃষ্টি দিবে, তার জন্য সত্যের পথ উন্মুক্ত হবে। সত্যের রাস্তা তার জন্য পরিস্কার হবে। কুরআন নিয়ে গবেষণা করাই হচ্ছে উহা পাঠ করার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ "এটি একটি অত্যন্ত বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে এরা তার আয়াত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে এবং জ্ঞানী ও চিন্তাশীলরা তা থেকে শিক্ষা নেয়”। (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯) আল্লাহ তা'আলা সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
"তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের হৃদয়ের উপর তালা লাগানো আছে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমিনুনের ৬৮ নং আয়াতে আরো বলেন:
أَفَلَمْ يَدَّبَّرُوا الْقَوْلَ أَمْ جَاءَهُم مَّا لَمْ يَأْتِ آبَاءَهُمُ الْأَوَّلِينَ
"তারা কি কখনো এ বাণী সম্পর্কে চিন্তা করেনি? না কি সে এমন কথা নিয়ে এসেছে যা কখনো তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছে আসেনি?
টিকাঃ
২১. দুনিয়াতে মানুষের চোখ দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহকে দেখার ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে দুনিয়ায় তৈরী করা হয়নি। পাহাড়ের গঠন মানুষ গঠনের চেয়ে অধিক মজবুত ও শক্ত হওয়ার পরও যেহেতু পাহাড় আল্লাহর নূরের সামনে টিকে থাকতে পারেনি এবং আল্লাহ তা'আলা যখন পাহাড়ের উপর স্বীয় জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল, তাই বুঝা গেল যে মানুষ চর্ম চক্ষু দিয়ে দুনিয়াতে আল্লাহকে দেখতে সক্ষম নয়। (আল্লাহই সর্বাধিক জানেন)