📄 আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত মাখলূকের (সৃষ্টির) উপর সমুন্নত।
ওয়াক্বওলিহি: {يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ} {بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ} {إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ} {يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَّعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطْلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا} {أَأَمِنْتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ}
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: {يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ} "হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু (নিদ্রা) দান করবো। অতঃপর তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নিবো” (সূরা আল-ইমরান ৩:৫৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ} "বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ প্রবল শক্তিধর ও প্রজ্ঞাবান” (সূরা নিসা ৪:১৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ} "পবিত্র বাক্যসমূহ তাঁরই দিকেই উঠে এবং সৎকর্মকে তিনি উন্নীত করেন”। (সূরা ফাতির ৩৫:১০) আল্লাহ তা'আলা ফেরাউনের উক্তি উল্লেখ করে বলেন:
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطْلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا *
“হে হামান! আমার জন্য একটি সুউচ্চ ইমারাত নির্মাণ করো যাতে আমি রাস্তাসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। অর্থাৎ আসমানের রাস্তা এবং মূসার ইলাহকে উঁকি দিয়ে দেখতে পারি। মুসাকে মিথ্যাবাদী বলেই আমার মনে হয়। এভাবে ফেরাউনের জন্য তার কুকর্মসমূহ সুদৃশ্য বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সোজা পথ থেকে ফিরিয়ে রাখা হয়েছে। ফেরাউনের সমস্ত চক্রান্ত ধ্বংসের পথেই ব্যয়িত হয়েছে”। (সূরা গাফের ৪০:৩৬-৩৭) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَأَمِنتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ
"তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ যে, যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেবেন? অতঃপর ভূপৃষ্ঠ জোরে ঝাঁকুনি খেতে থাকবে, কিংবা যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণ করবেন, এ ব্যাপারেও কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গিয়েছো? তখন তোমরা জানতে পারবে আমার ভীতি প্রদর্শন কেমন? (সূরা মুলক ৬৭:১৬-১৭)।
ব্যাখ্যা: يا عیسی হে ঈসা! আল্লাহ তা'আলা ঈসা ইবনে মারইয়াম কে সম্বোধন করে বলেছেন।
إِنِّي مُتَوَفِّيكَ "আমি তোমাকে ওফাত দিবো”। অধিকাংশ আলেমের মতে এখানে ওফাত বলতে নিদ্রা উদ্দেশ্য। কেননা নিদ্রা মৃত্যুর অন্যতম প্রকার। আল্লাহ তা'আলা সূরা আন'আমের ৬০ নং আয়াতে বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ )
"তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের মৃত্যু ঘটান"। আল্লাহ তা'আলা সূরা ঘুমারের ৪২ নং আয়াতে বলেন:
﴿اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا﴾
"মৃত্যুর সময় আল্লাহই রূহসমূহ কবয করেন। আর যে এখনো মরেনি নিদ্রাবস্থায় তার রূহ কবয করেন"।
وَرَافِعُكَ إِلَيَّ তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নিবো: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আসমানে নিজের দিকে জীবিত অবস্থায় উঠিয়ে নিয়েছেন। আয়াতের এ অংশ থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে এবং আল্লাহর জন্য علو তথা উপরে হওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা উঠিয়ে নেওয়া সাধারণত: উপরের দিকেই হয়।
بَلْ رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। এখানে ঐসব ইহুদীদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা দাবী করে যে, তারা ঈসা মাসীহ ইবনে মারইয়ামকে হত্যা করে ফেলেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ﴾
"মূলতঃ তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করতে পারেনি; বরং তাদেরকে সন্দেহে ফেলা হয়েছে। নিশ্চয়ই যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল তারাই সে বিষয়ে সন্দেহে রয়েছে। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। প্রকৃতপক্ষে তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি। প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন (সূরা নিসা ৪:১৫৭-১৫৮)।
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জীবিত অবস্থায় নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। তিনি নিহত হননি। আয়াতের এ অংশই দলীল গ্রহণের স্থান। কেননা এ অংশে আল্লাহর জন্য মাখলুকের উপর হওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর উঠিয়ে নেওয়া বা উঠানো (নীচ থেকে) উপরের দিকেই হয়।
إِلَيْهِ يَصْعَدُ তাঁর দিকেই উঠে: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দিকেই পবিত্র বাক্যসমূহ উন্নীত হয়; অন্য কারো দিকে নয়।
الْكَلِمُ الطَّيِّبُ পবিত্র বাক্যসমূহ: অর্থাৎ আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং দু'আ উদ্দেশ্য।
وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ সৎ আমল উহাকে উপরে উঠায়: অর্থাৎ উত্তম আমল বাক্যসমূহকে উপরে উঠায়। কেননা সৎ আমল ছাড়া পবিত্র বাক্য কবুল হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার যিকির করে, কিন্তু ফরয ইবাদাতগুলো সম্পাদন করে না, তার পবিত্র বাক্যসমূহ ফেরত দেয়া হয়।
ইয়াস বিন মুআবিয়া বলেন, আমলে সালেহ না থাকলে শুধু উত্তম বাক্য আকাশে উঠে না। হাসান বসরী ও কাতাদাহ বলেন, আমল ছাড়া শুধু মুখের কথা কবুল হয় না।
মোটকথা উপরের আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়ে যে, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির উপরে। কেননা উঠা বা উঠানো নীচ থেকে উপরের দিকেই হয়।
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا হে হামান! আমার জন্য একটি সুউচ্চ ইমারত নির্মাণ করো: ফেরাউন তাঁর মন্ত্রী হামানকে এ কথা বলেছিল। ফেরাউন তাকে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করার আদেশ করেছিল। সে বলেছিল, হে হামান! আমার জন্য একটি সুউচ্চ ও মজবুত প্রাসাদ নির্মাণ করো।
لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ যাতে আমি রাস্তা সমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি অর্থাৎ আসমানের দরজাসমূহ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারি।
فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى এর ইলাহকে উকি দিয়ে দেখতে পারি। فَأَطَّلِعَ ফেলে মুযারেটি فاء السببية এর পরে আসার কারণে উহ্য أن দ্বারা মানসুব হবে। এ কথার মাধ্যমে সে মুসাকে মিথ্যুক বলেছিল। অর্থাৎ ফেরাউনের কথার অর্থ হলো, মূসা যখন দাবী করলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন অথবা তিনি যখন এই দাবী করলেন যে, আকাশে তার মাবুদ রয়েছেন, তখন ফেরাউন তাঁর কথাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا এবং বলেছিল আমি মূসা কে মিথাবাদী বলেই মনে করি অর্থাৎ সে যেই রেসালাতের দাবী করছে অথবা আকাশে তার ইলাহ (মাবুদ) থাকার যেই দাবী করছে, আমি তার দাবীতে তাকে মিথ্যুক মনে করছি।
এ আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সৃষ্টির উপর। মূসা ফেরাউনকে এই সংবাদই দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আসমানের উপর। ফেরাউন তাঁকে এই কথায় মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল। এখান থেকে আরো প্রমাণিত হলো যে, পূর্বের নাবীগণও তাদের উম্মাতদেরকে বলেছিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে।
أَأَمِنتُمْ তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছো? আল্লাহ তা'আলা কাফেরদেরকে ধমক দিয়ে বলছেন, তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছো? নিরাপত্তা হচ্ছে ভয়ের বিপরীত।
مِّن في السَّمَاءِ যিনি আসমানে আছেন। অর্থাৎ যিনি আসমানে আছেন, তোমরা কি তাঁর শাস্তি হতে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করছো? আসমানে যিনি আছেন, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা।
এখানে فِي السَّمَاءِ আসমানে আছেন অর্থ عَلَى السَّمَاءِ আসমানের উপরে আছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন:
وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ "আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের মধ্যে শুলিবিদ্ধ করবো"।
এখানেও এ হারফে জারটি عَلَى অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের উপর ক্রশবিদ্ধ করবো।
উপরোক্ত আয়াতে fi হারফে জারটি তখনই عَلَى (উপরে) অর্থে ব্যবহৃত হবে, যখন আসমান দ্বারা আল্লাহর নির্মিত আসমান উদ্দেশ্য হবে। আর যদি السماء দ্বারা শুধু উপর উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও fi হারফে জারটি ظرفية তথা স্থান বুঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হবে। তখন বাক্যটি এ রকম হবে, أأمنتم من في العلو অর্থাৎ যিনি উপরে আছেন, তোমরা কি তার শাস্তির ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গেছো?
أن يخسف بكم الأرض তিনি তোমাদের মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেবেন। যেমন ধসিয়ে দিয়েছিলেন কারুনকে।
فإذا هي تمور তখন যমীন অকস্মাৎ জোরে ঝাঁকুনি খেতে থাকবে এবং প্রকম্পিত হতে থাকবে।
أَمْ أَمِنْتُم مِّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا আছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণ করবেন এ ব্যাপরেও কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গিয়েছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা লুত এর জাতি এবং হস্তী বাহিনীর উপর আসমান থেকে প্রস্তর বর্ষণ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, তোমাদের উপর মেঘমালা পাঠাবেন। যাতে থাকবে পাথর। আবার কেউ কেউ বলেছেন, বাতাস পাঠাবেন। যাতে থাকবে পাথর।
فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِير তখন তোমরা জানতে পারবে আমার ভীতি প্রদর্শন কেমন? অর্থাৎ যখন তোমরা আযাব দেখতে পাবে, তখন জানতে পারবে আমার ভীতি প্রদর্শন কেমন? কিন্তু তখন এই জানা তোমাদের কোন উপকারে আসবে না।
উপরের দুই আয়াতে আল্লাহ তা'আলার জন্য সৃষ্টির علو (উপরে হওয়া) সাব্যস্ত করা হয়েছে। এখানে সুস্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আসমানের উপরে। সুতরাং শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই আয়াতগুলো আল্লাহ তা'আলার জন্য উলু (উপর) সাব্যস্ত করার জন্য উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতগুলো আল্লাহর পবিত্র সত্তা উপরে হওয়ার কথা প্রমাণ করে, যেমন ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত অধ্যায়ের আয়াতগুলো সাব্যস্ত করেছে যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর।
استواء (আরশের উপর সমুন্নত হওয়া) এবং علو (উপরে হওয়া) এর মধ্যে পার্থক্য:
(১) علو তথা সৃষ্টির উপরে হওয়া আল্লাহর সত্তাগত বিশেষণ। অর্থাৎ এটি কখনো আল্লাহর সত্তা থেকে আলাদা হয় না এবং এটি তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত নয়। অপর দিকে استواء (উপরে উঠা, সমুন্নত হওয়া) আল্লাহর কর্মগত সিফাত, যা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। সৃষ্টির উপরে হওয়া আল্লাহর স্থায়ী বিশেষণ। আর আরশের উপর আল্লাহ সমুন্নত হওয়া হচ্ছে তাঁর কর্মগত বিশেষণ। আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা করেন তখন স্বীয় ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাধ্যমে উপরে উঠেন বা বা আরশের উপর সমুন্নত হন। এই জন্যই আল্লাহ তা'আলা সমুন্নত হওয়ার ব্যাপারে বলেছেন استوی “অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন”। আর এই সমুন্নত হওয়া ছিল আসমান-যমীন সৃষ্টির পর।
(২) সৃষ্টির উপর হওয়া এমন একটি বিশেষণ, যা মানুষের বোধশক্তি, স্বভাব-প্রকৃতি ও কুরআন-সুন্নাহর দলীল দ্বারা প্রমাণিত। আর আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টি শুধু কুরআন ও হাদীসের দলীল দ্বারা প্রমাণিত; যা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও বোধশক্তি দ্বারা প্রমাণিত নয়।
📄 আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন।
وقوله: {هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ} { مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ} وقوله: {لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا} {إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى} {إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ} {وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ} كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
আল্লাহ তা'আলা বলেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنْ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
"তিনিই আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে এবং যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথেই আছেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন” (সূরা হাদীদ ৫৭:৪)। আল্লাহ আরো বলেন,
مَا يَكُونُ مِنْ نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
"তিন ব্যক্তির এমন কোনো পরামর্শ হয় না যাতে তিনি চতুর্থ হিসাবে না থাকেন এবং পাঁচ জনের হয় না, যাতে ষষ্ঠ না থাকেন। তাদের সংখ্যা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক, তারা যেখানেই থাকুক না কেন তিনি তাদের সাথেই, তারা যা করে তিনি কিয়ামাতের দিন তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
"তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, বিষন্ন হয়ো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন (সূরা তাওবা ৯:৪০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
"আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি” (সূরা তোহা ২০:৪৬)। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে আছেন, যারা মুত্তাকী হয়েছে এবং যারা সৎকর্ম করে” (সূরা নাহল ১৬:১২৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَاصْبِرُوا ، إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"তোমরা সবরের পথ অবলম্বন করো, অবশ্যই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন” (সূরা আনফাল ৮:৪৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
كم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
"আল্লাহর হুকুমে কতক ক্ষুদ্র দল অনেক বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন” (সূরা বাকারা ২:২৪৯)।
ব্যাখ্যা: প্রথম আয়াতের هو الذي থেকে শুরু করে وما يعرج فيها ব্যাখ্যা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
﴾ وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ ﴿ তিনি তোমাদের সাথেই, তোমরা যেখানেই থাক না কেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে তোমাদের সাথে আছেন, তোমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তোমরা যেখানে যে অবস্থাতেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের কাজ-কর্ম দেখছেন। তোমরা স্থলভাগে থাকাবস্থায় যা করো, জলভাগে থাকাকালে যা করো, রাতের অন্ধকারে যা করে থাকো, দিবাভাগে যা করো, গৃহাভ্যন্তরে যা করো এবং নির্জন মরুভূমিতে যা করো, তার সবই তিনি অবগত আছেন। তাঁর জ্ঞানে সবকিছুই সমান। অর্থাৎ তিনি সকল সৃষ্টির অবস্থা সম্পর্কে সমানভাবে অবগত আছেন। সবকিছুই তাঁর শ্রবণ ও দৃষ্টির অধীনে। তিনি তোমাদের কথা শ্রবণ করছেন এবং তোমাদের অবস্থান দেখছেন। আয়াতের এ স্থান থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন: তিনি তোমাদের আমল সম্পর্কে দৃষ্টি রাখেন। তোমাদের আমলের কোন কিছুই তাঁর নিকট গোপন নয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, مَا يَكُونُ مِن تَجْوَى ثَلَاثَةِ তিন ব্যক্তির এমন কোন পরামর্শ হয় না: পরামর্শ বলতে গোপন পরামর্শ উদ্দেশ্য। মোটকথা তিনজনের কোন পরামর্শ হয় না।
the fofa Dual Runicat إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ থাকেন এবং পাঁচ জনের হয় না, যাতে ষষ্ঠ না থাকেন: অর্থাৎ আল্লাহ তাঁকে এভাবে চারে পরিণত করে দেন এবং পাঁচজনের গোপন পরামর্শকে এভাবে ছয়জনের পরামর্শে পরিণত করেন যে, তিনি তাদের সেই গোপন পরামর্শে অংশ গ্রহণ করেন এবং তা জেনে ফেলেন। তিন এবং পাঁচ সংখ্যাদ্বয়কে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করার কারণ হলো অধিকাংশ গোপন পরামর্শকারীর সংখ্যা তিন অথবা পাঁচজন হয়ে থাকে। অথবা আয়াতটি তিনজনের কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং পাঁচজনের অন্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়েছে।
অন্যথায় আল্লাহ তা'আলা কমবেশী প্রত্যেক সংখ্যার সাথে আছেন। এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ﴿ "তাদের সংখ্যা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক, তিনি তাদের সাথেই আছেন"। অর্থাৎ উল্লেখিত সংখ্যার কম হোক, যেমন একজন বা দুইজন এবং উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বেশী হোক, যেমন ছয়জন বা সাতজন। ইলমের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথেই আছেন। তারা গোপনে যেই পরামর্শ করে, আল্লাহ তা'আলা তা অবগত হন। ফলে সেই গোপন পরামর্শের কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।
তাফসীরকারগণ বলেন, ইহুদী এবং মুনাফেকরা গোপনে নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করতো। তারা এর মাধ্যমে মুমিনদের মধ্যে এই ধারণা ঢুকিয়ে দিত যে, তারা এমন বিষয়ে পরামর্শ করছে, মুমিনদের জন্য কষ্টদায়ক। এতে করে মুমিনরা চিন্তায় পড়ে যেত। এ বিষয়টি দীর্ঘ দিন চলতে থাকলে এবং তা বৃদ্ধি পেতে থাকলে তারা রসূল ﷺ কাছে অভিযোগ করল। তখন তিনি ইহুদী ও মুনাফেকদেরকে আদেশ দিলেন যে, তারা যেন মুসলিমদের বাদ দিয়ে গোপন বৈঠকে মিলিত না হয়। কিন্তু এতে তারা বিরত থাকল না বরং তারা বারবার গোপন পরামর্শ করতেই থাকল। তখন আল্লাহ তা'আলা উপরোক্ত আয়াতগুলো নাযিল করলেন।
أَيْنَ مَا كَانُوا তারা যেখানেই থাকে না কেন: এর অর্থ হচ্ছে যে স্থানেই তাদের গোপন পরামর্শ হয়, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইলমের মাধ্যমে তা পরিবেষ্টন করে নেন।
ثُمَّ يُنَبِّئُهُم অতঃপর তিনি সংবাদ দিবেন।
بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ কিয়ামাতের দিন তাদের আমল সম্পর্কে: তাদেরকে সে অনুযায়ী বদলা দিবেন। এর মাধ্যমে তাদেরকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং ধমক দেয়া হয়েছে।
إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বিষয়ে পরিজ্ঞাত। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নয়।
এ আয়াত থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির সাথে আছেন। এটি হচ্ছে সাধারণ বা সার্বজনীন সাথে থাকা। এ অর্থে তিনি সকল সৃষ্টির সাথেই রয়েছেন। এ প্রকার সাথে থাকার অত্যাবশ্যকীয় দাবী হচ্ছে, তিনি ক্ষমতার মাধ্যমে এবং ইলমের মাধ্যমে সবকিছুকে ঘিরে আছেন। তিনি সকলের সব অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবগত আছেন। এ জন্যই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বলেছেন, এ আয়াতটি আল্লাহর ইলমের মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং ইলমের মাধ্যমে শেষ হয়েছে।
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا বিষন্ন হয়ো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন: হিজরতের পথে নাবী এবং আবু বকর যখন গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর সাথী আবু বকর কে এই কথা বলেছিলেন। মক্কার মুশরিকরা তাদের নিকটে চলে এসেছিল। আবু বকর তখন নাবী উপর কাফেরদের কষ্টের ভয় করছিলেন। তিনি তখন আবু বকর কে বলেছিলেন, তুমি বিষন্ন হয়ো না। অর্থাৎ তুমি দুঃশ্চিন্তা পরিহার করো।
إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا আল্লাহ তা'আলা আমাদের সাথে রয়েছেন: অর্থাৎ তাঁর সাহায্য, সমর্থন ও শক্তি আমাদের সাথে রয়েছে। সুতরাং যার সাথে আল্লাহ রয়েছেন, সে কখনো পরাজিত হবে না। আর যাকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না, তার চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই।
উপরের আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, তাতে মুমিনদের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ সান্নিধ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। এহেন সাথে থাকার দাবী হচ্ছে মুমিনদেরকে সাহায্য, হেফাজত ও শক্তিশালী করা।
আল্লাহ তা'আলা মুসা ও হারুনকে বলেছেন:
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি: সুতরাং ফেরাউনকে ভয় করো না। ভয় করতে নিষেধ করার কারণ হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী: إنني معكما "নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি"। অর্থাৎ তোমাদের উভয়কে ফেরাউনের বিরুদ্ধে সাহায্য করার মাধ্যমে আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি তোমাদের উভয়ের এবং ফেরাউনের কথা শুনছি। তোমাদের উভয়ের অবস্থান এবং ফেরাউনের অবস্থান দেখছি। তোমাদের কারো কোন অবস্থা আমার কাছে গোপন নয়।
এ আয়াত থেকেও দলীল পাওয়া যাচ্ছে যে, আল্লাহর অলীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ সান্নিধ্য রয়েছে। এটি হচ্ছে সাহায্য, সমর্থন ও শক্তিশালী করার সান্নিধ্য। সেই সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য শ্রবণ ও দৃষ্টি সাব্যস্ত করা হয়েছে।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন: অর্থাৎ যারা হারাম ও সকল প্রকার গুনাহর কাজ ছেড়ে দেয় এবং ইখলাসের সাথে সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে রয়েছেন।
وَالَّذِينَ هُم مُّحْسَنُونَ যারা সৎকর্ম করে (সূরা নাহল ১৬:১২৮): অর্থাৎ যারা আনুগত্যের কাজগুলো সঠিকভাবে আদায় করে এবং আল্লাহর আদেশগুলো পালন করে, সহযোগিতা ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের সান্নিধ্যেই আছেন। এটি হচ্ছে বিশেষ এক প্রকার সান্নিধ্য। আয়াতে কারীমা থেকে গ্রন্থকার এটিই সাব্যস্ত করেছেন।
وَاصْبَرُوا তোমরা সবরের পথ অবলম্বন করো: আল্লাহ তা'আলা এখানে সবরের আদেশ দিয়েছেন। সবরের আসল অর্থ হচ্ছে নফসকে আটকিয়ে রাখা। তবে এখানে সবর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কাফের ও মুসলিমদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধকালে সবর করা ও দৃঢ়পদ থাকা।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ অবশ্যই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন: অতঃপর সবরের এ আদেশ করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সবরকারীদের সাথে আছেন। সুতরাং যেসব কাজে সবর করা দরকার, আল্লাহ তা'আলা ঐসব কাজে সবরকারীদের সাথে আছেন।
এ আয়াতে কারীমা থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, এখানে ঐ সকল সবরকারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার বিশেষ সান্নিধ্য রয়েছে, যারা আনুগত্যের কাজে সবর করে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।
ইমাম শাওকানী বলেন, কতই না সুন্দর এ সান্নিধ্য! যাকে এটি দান করা হয়েছে, কোন শক্তি বা ব্যক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারবে না। কোন দিক থেকেই তার উপর চড়াও হওয়া যাবে না। যদিও শত্রু বাহিনী হয় অগণিত।
كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ দল অনেক বিরাট দলকে পরাজিত করেছে: অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা ও ফায়সালা অনুযায়ী অনেক ছোট দল অনেক বড় দলকে পরাজিত করেছে।
وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন: এ অংশ থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সময় সবর করে, তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। এটি হচ্ছে বিশেষ সান্নিধ্য। যার দাবী হচ্ছে সাহায্য ও শক্তিশালী করা।
উপরের সবগুলো আয়াতের অভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তাতে আল্লাহর সান্নিধ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এ সান্নিধ্য দুই প্রকার।
প্রথম: সাধারণ ও ব্যাপক সান্নিধ্য। যেমন বলা হয়েছে প্রথম দুই আয়াতে। এই প্রকার সান্নিধ্যের তাৎপর্য হলো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টিকে ঘিরে আছেন। সমস্ত মানুষের ভাল-মন্দ সব আমল সম্পর্কেই তিনি অবগত আছেন এবং তাদেরকে আমল অনুযায়ী বিনিময়ও দিবেন।
দ্বিতীয়: আল্লাহর মুমিন বান্দাদের জন্য রয়েছে এক বিশেষ সান্নিধ্য। এই প্রকার সান্নিধ্যের দাবী হচ্ছে মুমিন বান্দাদেরকে সাহায্য করা, শত্রুর মোকাবেলায় তাদেরকে শক্তিশালী করা এবং তাদেরকে হেফাযত করা। সম্মানিত লেখক এই অধ্যায়ে যেসব আয়াত উল্লেখ করেছেন, তার মধ্য হতে শেষের পাঁচটি আয়াতে এই প্রকার সান্নিধ্যের কথাই প্রমাণ করে। আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সান্নিধ্যে থাকা সৃষ্টির উপরে থাকা এবং আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার পরিপন্থী নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটে ও সান্নিধ্যে থাকা এক মাখলুক অন্য মাখলুকের সাথে থাকার মত নয়। কেননা,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ "তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা"।
কেননা সান্নিধ্য সাধারণত কাছে থাকার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। পরস্পর স্পর্শ করা কিংবা পরস্পর সমান হওয়া জরুরী নয়। আরবরা বলে থাকে, مازلنا نمشى والقمر معنا (আমরা চলছিলাম। চলন্ত অবস্থায় চন্দ্র আমাদের সাথেই ছিল। অথচ চন্দ্র তাদের মাথার অনেক উপরে এবং তাদের মাঝে এবং চন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব অনেক। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে হওয়া এবং তাদের সান্নিধ্যে হওয়ার পরিপন্থী নয়। সামনে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইনশা-আল্লাহ。
📄 আল্লাহর জন্য কালাম (কথা বলার বিশেষণ) সাব্যস্ত করা।
وَقَوْلُهُ: {وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا } { وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا} {إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ} { وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا } { وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا} { مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ} { وَلَمَّا جَاء مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ} {وَنَادَيْنَاهُ مِن جَانِبِ الطُّورِ الأَيْمَنِ وَقَرَّبْنَاهُ نَجِيًّا } {وَإِذْ نَادَى رَبُّكَ مُوسَى أَنِ ائْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ} { وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ} {وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ} { وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ} {وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِن بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ} {يُرِيدُونَ أَن يُبَدِّلُوا كَلامَ اللَّهِ قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ} { وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن كِتَابِ رَبِّكَ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ} {إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا “আর আল্লাহর কথার চেয়ে বেশী সত্য আর কার কথা হতে পারে? (সূরা নিসা ৪: ৮৭)। আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ১২২ নং আয়াতে আরো বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا
“আর আল্লাহর চেয়ে বেশী সত্যবাদী আর কে হতে পারে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা মায়িদার ১১৬ নং আয়াতে আরো বলেন:
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ ﴾
“স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা!”। আল্লাহ তা'আলা সূরা আনআমের ১১৫ নং আয়াতে আরো বলেন:
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ ﴾
“সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে তোমার রবের কথা পূর্ণাঙ্গ, তাঁর কালেমাসমূহ পরিবর্তন করার কেউ নেই,”। আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ১৬৪ নং আয়াতে আরো বলেন:
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا
“আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছেন ঠিক যেমনভাবে কথা বলা হয়”। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ২৫৩ নং আয়াতে বলেন:
مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ ﴾
"তাদের কারোর সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা আরাফের ১৪৩ নং আয়াতে বলেন:
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَىٰ لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ ﴾
“অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তাঁর সাথে কথা বললেন”। আল্লাহ তা'আলা সূরা মারইয়ামের ৫২ নং আয়াতে বলেন:
وَنَادَيْنَاهُ مِن جَانِبِ الطُّورِ الْأَيْمَنِ وَقَرَّبْنَاهُ نَجِيًّا
"আমি তাকে তাঁর ডান দিকের তুর পাহাড়ের দিক থেকে ডাকলাম এবং গোপন আলাপের মাধ্যমে তাকে নৈকট্য দান করলাম”। আল্লাহ তা'আলা সূরা শুআরার ১০ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَإِذْ نَادَى رَبُّكَ مُوسَى أَنِ ائْتِ الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ﴾ "যখন তোমার রব মুসা কে ডেকে বলেছিলেন: যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও"। আল্লাহ তা'আলা সূরা আরাফের ২২ নং আয়াতে আরো বলেন:
﴿ وَنَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَن تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ ﴾ "তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, "আমি কি তোমাদের এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি” আল্লাহ তা'আলা সূরা কাসাসের ৬৫ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ ﴾ স্মরণ করো সেদিনের কথা, যেদিন তিনি তাদেরকে ডাকবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে?” আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবার ৬ নং আয়াতে বলেন:
﴿ وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ﴾ "আর যদি মুশরিকদের কোন ব্যক্তি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পারে, তাহলে তাকে আল্লাহর কালাম শ্রবণ করা পর্যন্ত আশ্রয় দাও”। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ৭৫ নং আয়াতে আরো বলেন:
﴿ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِن بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ ﴾ "অথচ তাদের একটি দল এমন ছিল, যারা আল্লাহর কালাম শ্রবণ করতো। অতঃপর তা খুব ভালো করে জেনেবুঝে সজ্ঞানে তার মধ্যে তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন করতো"। আল্লাহ তা'আলা সূরা ফাতাহ এর ১৫ নং আয়াতে বলেন:
يُرِيدُونَ أَن يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللَّهِ ۚ قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَٰلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ
"এরা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে দিতে চায়। এদের বলে দাও, তোমরা কখনই আমাদের সাথে যেতে পারবে না, আল্লাহ তো আগেই এ কথা বলে দিয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা কাহাফের ২৭ নং আয়াতে বলেন:
وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِن كِتَابِ رَبِّكَ ۖ لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ
"হে নাবী! তোমার রবের কিতাবের মধ্য থেকে যাকিছু তোমার উপর অহী করা হয়েছে তা তুমি পাঠ করে শুনিয়ে দাও। তাঁর কালেমা পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই"। আল্লাহ তা'আলা সূরা নামালের ৭৬ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
"যথার্থই এই কুরআন বনী ইসরাইলের জন্য বেশির ভাগ এমনসব কথার স্বরূপ বর্ণনা করে, যেগুলোতে তারা মতভেদ করে"।
ব্যাখ্যাঃ وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ : আর আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে? অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কেউ নেই। আয়াতে যে প্রশ্ন করা হয়েছে তা হচ্ছে ইস্তেফহামে ইনকারী তথা অস্বীকারের প্রশ্ন। আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কেউ থাকাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে।
حديثا কথায়: অর্থাৎ কথায়, সংবাদ প্রদানে, আদেশ করায়, ওয়াদা-অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কেউ নেই।
وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا আল্লাহর চেয়ে বেশী সত্যবাদী আর কে হতে পারে? القيل হচ্ছে قال يقول এর মাসদার। এটি القول এর অনুরূপ। এই আয়াতাংশের অর্থও পূর্বের আয়াতের মতই। আল্লাহর কথার চেয়ে অধিক সত্য আর কারো কথা নেই এবং আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদীও আর কেউ নেই।
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ের মধ্যে আল্লাহ তা'আলার জন্য قيل ও حديث অর্থাৎ কথা বলা বিশেষণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং এতে আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম (কথা বলা) সাব্যস্ত করা হয়েছে।
وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা: অর্থাৎ স্মরণ করো সেই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ তা'আলা বলবেন, হে মারইয়াম পুত্র ঈসা! অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা ঈসা কে এই কথা বলবেন। যেসব নাসারা ঈসা এবং তাঁর মাতা মারইয়ামের ইবাদাত করছে, এই কথার মাধ্যমে তাদেরকে ধমক দেয়া হয়েছে। এটি পূর্বের আয়াতদ্বয়ের মতই। এখানেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কথা বলা সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি যখন ইচ্ছা কথা বলেন।
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا “সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে তোমার রবের কথা পূর্ণাঙ্গ: এখানে কালেমা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কালাম উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সংবাদের ক্ষেত্রে সত্যবাদী এবং হুকুম-আহকামে ইনসাফকারী। صدقا এবং عدلا এই শব্দ দু'টি তামীয হিসাবে মানসুব হয়েছে। এই আয়াতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে।
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছেন ঠিক যেমনভাবে কথা বলা হয়: এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মুসাকে সম্মানিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা মুসার সাথে কথা বলেছেন এবং সেই কথা মুসাকে শুনিয়েছেন। এ জন্যই মুসাকে কালীমুল্লাহ বলা হয়।
মুসার সাথে আল্লাহর কালাম (কথা বলা) থেকে রূপকার্থের সম্ভাবনা দূর করার জন্য تكليما মাসদারকে তাগিদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতেও আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি মুসা এর সাথে কথা বলেছেন।
مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ তাদের কারো সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন: অর্থাৎ রসূলদের কারো কারো সাথে আল্লাহ তা'আলা কথা বলেছেন। বিনা মধ্যস্থতায় সরাসরি কথা বলেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মূসা এবং মুহাম্মাদ এর সাথে কথা বলেছেন। এমনি আদম এর সাথেও কথা বলেছেন। সহীহ ইবনে হিব্বানে এই মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এই আয়াতে আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি কতক রসূলের সাথে অতীতে কথা বলেছেন।
وَلَمَّا جَاءَ مُوسَى لِمِيقَاتِنَا অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুসার আগমণের জন্য যেই সময় নির্ধারণ করলেন, মূসা ঠিক সেই নির্ধারিত সময়েই উপস্থিত হলো।
وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ এবং তাঁর রব তাঁর সাথে কথা বললেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা বিনা মধ্যস্থতায় মুসাকে তাঁর কথা বললেন। সুতরাং এ আয়াতেও আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা কথা বলেন। তিনি বিনা মধ্যস্থতায় মূসার সাথে কথা বলেছেন।
وَنَادَيْنَاهُ আমি তাকে ডাকলাম: আল্লাহ তা'আলা মূসাকে ডাক দিয়েছেন। উঁচু আওয়াজে ডাক দেয়াকে النداء বলা হয়।
مِن جانب الطُّور আল্লাহ তা'আলা তাঁকে তুর পাহাড়ের দিক থেকে ডাক দিয়েছেন। মাদায়েন শহর এবং মিশরের মাঝখানের একটি পাহাড়ের নাম তুর।
الْأَيْمَنِ ডান দিক: মূসা যখন আগুন দেখে তা থেকে একটি জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে গেলেন তখন মূসার ডান দিক থেকে ডাক দেয়া হল। এখানে পাহাড়ের ডান দিক উদ্দেশ্য নয়। কেননা পাহাড়ের কোন ডান-বাম হয় না।
وَقَرَّبْنَاهُ তাকে নৈকট্য দান করলাম: আর আমি মুসা এর সাথে চুপিসারে কথা বলার জন্য তাঁকে নৈকট্য দান করলাম।
نجيا শব্দটি مناجيا অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ চুপিসারে কথার বলার জন্য মূসা কে আমার নৈকট্য দান করলাম। মুনাজাত মুনাদার (উঁচু আওয়াজে আহবানের) বিপরীত।
এই আয়াতে কারীমার মধ্যে আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা উঁচু আওয়াজে ডাক দেন, আহবান করেন এবং চুপিসারেও কথা বলেন। ডাক দেয়া এবং মুনাজাত করা (নীচু আওয়াজে কথা বলা) কালামের (কথা বলার) দু'টি প্রকার। ডাক দেয়া সাধারণত উঁচু আওয়াজে হয় আর মুনাজাত নীচু আওয়াজের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
وَإِذْ نَادَىٰ رَبُّكَ مُوسَى যখন তোমার রব মুসাকে ডেকে বলেছিলেন, যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও: অর্থাৎ তাদেরকে পাঠ করে শুনাও সেই ঘটনা অথবা স্মরণ করো সেই সময়ের ঘটনা, যখন তোমার রব মুসা কে ডেকে বলেছিলেন। আহবান করাকে النداء বলা হয়। أن أنتِ এখানে أن অব্যয়টি أن مفسرة এবং أن مصدرية উভয়ই হতে পারে।
اذهب إلى الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ তুমি যালেম সম্প্রদায়ের কাছে যাও: ফেরাউন সম্প্রদায়কে যালেম বলার কারণ এই যে, তারা কুফুরীর যুলুম এবং পাপাচারের যুলুমকে নিজেদের মধ্যে একত্র করেছিল। কুফুরীর মাধ্যমে তারা নিজেদের নফসের উপর যুলুম করেছিল এবং পাপাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে তারা অন্যদের উপর যুলুম করেছিল। যেমন তারা বনী ইসরাঈলকে দাসে পরিণত করে রেখেছিল এবং তাদের ছেলে সন্তানদেরকে হত্যা করেছিল।
এই আয়াতে কারীমাতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম (কথা) সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যার সাথে ইচ্ছা কথা বলেন এবং তাকে স্বীয় কথা শুনিয়ে দেন।
وَ نَادَاهُمَا رَبُّهُمَا أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি: আল্লাহ তা'আলা আদম ও হাওয়াকে এই বলে ডাক দিলেন যে, আমি কি তোমাদেরকে ঐ গাছটির কাছে যেতে নিষেধ করিনি? অর্থাৎ ঐ গাছের ফল খেতে নিষেধ করিনি? এই কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের দুইজনকে ধমক দিয়েছেন। কেননা তাদেরকে যেই বস্তু হতে সাবধান করা হয়েছিল, তা থেকে তারা বিরত থাকে নি।
এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আরো সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ হতে আদম ও তাঁর স্ত্রী হাওয়ার জন্য ডাক এসেছিল।
وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ সেদিনের কথা, যেদিন তিনি তাদেরকে ডাকবেন এবং জিজ্ঞেস করবেন: তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে? অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা কিয়ামাতের দিন এই মুশরেকদেরকে ডাক দিবেন এবং বলবেন, তোমরা রসূলদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে? যেসব নাবীকে তোমাদের নিকট পাঠানো হয়েছিল, তারা যখন তোমাদের কাছে আমার রিসালাত পৌঁছিয়ে দিয়েছিলো তাদেরকে কী জবাব দিয়েছিলে?
এই আয়াতেও আল্লাহর জন্য কালাম (কথা বলা) সাব্যস্ত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা কিয়ামাতের দিন মানুষকে ডাক দিবেন।
وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! যেসব মুশরেকের সাথে তোমাকে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে, তাদের কেউ যদি আল্লাহর কালাম শ্রবণ করার জন্য তোমার কাছে আসতে চায়, তোমার নিরাপত্তা কামনা করে এবং আশ্রয় চায়, তুমি তাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দান করো।
حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهُ যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়। অর্থাৎ তোমার জবানীতে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং তুমি যে বিষয়ের প্রতি আহবান করছো, তার প্রকৃত অবস্থাও বোধগম্য হয়।
এই আয়াত থেকেও আল্লাহ তা'আলার কালাম (কথা বলা বিশেষণ) রয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ আমরা যা তেলাওয়াত করি, তা আল্লাহর কালাম।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ তাদের মধ্যে একটি দল ছিল: এটি হচ্ছে ইহুদীদের দল। فریق শব্দটি اسم جمع। এই শব্দের কোন একবচন নেই।
يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ তারা আল্লাহর কালাম শ্রবণ করতো। এখানে কালাম দ্বারা তাওরাত উদ্দেশ্য। ইহুদীরা তাওরাতের আয়াত শ্রবণ করতো।
ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ অতঃপর তারা উহার মধ্যে বিকৃতি সাধন করতো। অর্থাৎ তারা আসল ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে অন্য ব্যাখ্যা করতো।
مِن بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ তারা তার মধ্যে তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন করতো: অর্থাৎ ভাল করে জেনে-বুঝে তারা তাওরাতের বিপরীত আমল করতো।
وَهُمْ يَعْلَمُونَ তারা ভাল করেই জানতো যে, তারা যেই তাহরীফ বা পরিবর্তন করছে এবং যেই অপব্যাখ্যা করছে, তাতে তারা অপরাধী।
এই আয়াতে কারীমা থেকেও আল্লাহর কালাম আছে বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তাওরাতও আল্লাহর কালামের অন্তর্ভুক্ত। আর ইহুদীরা তাওরাতের মধ্যে তাহরীফ করেছে, উহার মধ্যে পরিবর্তন ও রদবদল করেছে।
يُرِيدُونَ أَن يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللهِ قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করে দিতে চায়। এদের বলে দাও: তোমরা কখনই আমাদের সাথে যেতে পারবে না, আল্লাহ তো আগেই এ কথা বলে দিয়েছেন।
يُريدُونَ এরা: এখানে পিছনে থেকে যাওয়া ঐ সমস্ত গ্রাম্য লোক উদ্দেশ্য, যারা রসূল ﷺ এর সাথে জিহাদে বের না হয়ে পরিবার-পরিজন ও নিজেদের কাজ-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। হুদায়বিয়ার বছরও তারা রসূল ﷺ এর সাথে বের না হয়ে নিজেদের গৃহেই বসেছিল।
أَن يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللَّهِ তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করতে চায়। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার সেই কথাকে পরিবর্তন করতে চায়, যার মাধ্যমে তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, খায়বারের গণীমত কেবল তারাই পাবে।
قُل لَّن تَتَّبِعُونَا বলো, তোমরা কখনই আমাদের সাথে যেতে পারবে না, এই বাক্যটি না বাচক হলেও তা নিষেধাজ্ঞা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। لا تتبعونا অর্থাৎ আমাদের সাথে তোমরা বের হয়ো না।
كَذَلِكُمْ قَالَ اللَّهُ مِن قَبْلُ আল্লাহ তো আগেই এই কথা বলে দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি হুদায়বিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সাথে আগেই ওয়াদা করেছিলেন যে, পরের বছর খায়বারের যুদ্ধে যেই গণীমত হাসিল হবে, তা কেবল হুদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যই।
উক্ত আয়াতে কারীমা থেকে জানা গেল যে, আল্লাহর জন্য কালাম ও কাওল তথা কথা বলা বিশেষণ সুসাব্যস্ত। ১৯ আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা কথা বলেন। আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করা জায়েয নেই। আল্লাহর কালামের উপর আমল করা আবশ্যক এবং তার অনুসরণ করা জরুরী।
হে নাবী! যা কিছু তোমার উপর অহী করা হয়েছে وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ তা তুমি পাঠ করে শুনিয়ে দাও: আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাবীর উপর অহী স্বরূপ যেই কিতাব নাযিল করেছেন, তা সর্বদা তেলাওয়াত করার আদেশ করেছেন। দ্রুত এবং অতি সংগোপনে জানিয়ে দেয়াকে অহী বলা হয়।২০ উসূলে তাফসীরের কিতাবগুলোতে অহীর বিভিন্ন পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে।
مِن كِتَابِ رَبِّكَ তোমার রবের কিতাবের মধ্য থেকে: এই বাক্যটি ঐ বিষয়ের বর্ণনা স্বরূপ, যা তাঁর নিকট অহী করা হয়েছে।
لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ তাঁর কালেমা (কথা) পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই: অর্থাৎ তাঁর কথার কোন পরিবর্তনকারী, বিকৃতকারী এবং অপসারণকারী নেই। মোট কথা এই আয়াতেও আল্লাহ তা'আলার জন্য কালেমা সাব্যস্ত করা হয়েছে।
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ বেশির ভাগ স্বরূপ বর্ণনা করে: তাওরাত ও ইঞ্জিলের অধিকারীদেরকে বনী ইসরাঈল বলা হয়। তারা হচ্ছে ইহুদী ও নাসারা।
أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ তারা ঈসার ব্যাপারে মতভেদ করেছে। ইহুদীরা ঈসা কে অবৈধ সন্তান বলে অপবাদ দিয়েছে। আর খৃষ্টানরা তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কুরআন তাঁর বিষয়ে মধ্যম পন্থা নিয়ে এসেছে। সত্য কথা হলো তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল এবং আল্লাহর কালেমা, যা তিনি মারইয়াম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি আল্লাহর একটি রূহ। অর্থাৎ আল্লাহর ঐ সমস্ত রূহের অন্তর্ভুক্ত, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন।
এই আয়াতে কারীমা থেকেও প্রমাণ মিলে যে, কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম। কুরআনের মধ্যে পূর্বের সমস্ত কিতাবের খবর রয়েছে এবং আহলে কিতাবদের ফির্কাসমূহের মধ্যে যেসব বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, কুরআন ইনসাফের সাথে সেসব বিষয়ের ফয়সালাকারী। আর এ সব বিষয় আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসা অসম্ভব।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া যে আয়াতগুলো এখানে উল্লেখ করেছেন, সেগুলো আল্লাহর জন্য কালাম সাব্যস্ত করেছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ যেহেতু প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ তা'আলা কথা বলা বিশেষণে বিশেষিত, তাই তারা আল্লাহর জন্য উহা সাব্যস্ত করে। কালাম (কথা বলা) আল্লাহ তা'আলার সিফাতে যাতীয়া বা সত্তাগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা তিনি এর দ্বারা বিশেষিত এবং তাঁর সাথে উহা কায়েম রয়েছে। আরেক দিক থেকে কালাম সিফাতে ফেলিয়া বা কর্মগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তা আল্লাহর ইচ্ছা ও কুদরত অনুযায়ী সংঘটিত হয়। তিনি যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা এবং যে বিষয়ে ইচ্ছা কথা বলেন। তাঁর কালাম আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ তিনি চিরন্তন, চিরস্থায়ী এবং অবিনশ্বর। তিনি কামেল তথা সকল দিক থেকে পরিপূর্ণ। আল্লাহর কালাম তাঁর সিফাতে কামালিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিজের সত্তাকে কালাম (কথা বলা) বিশেষণে বিশেষিত করেছেন এবং রসূল ﷺ এর পবিত্র সুন্নাতে তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলাকে বিশেষিত করেছেন। এই বিষয়ে বিরোধীদের মাযহাব এবং তার জবাব অচিরেই আসবে ইনশা-আল্লাহ。
টিকাঃ
১৯. কুরআন আল্লাহর কালাম; ইহা আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্ট বস্তুর মত নয়। কুরআন আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে এবং আল্লাহর নিকট ফিরে যাবে। উপরে উল্লেখিত দলীলগুলো সে কথারই প্রমাণ করে। সাহাবী, তাবেঈ, সালাফে সালেহীন এবং সম্মানিত ইমামগণের মতও তাই। সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে কুরআন আল্লাহর কালাম।
২০. আল্লাহ তা'আলা নাবী-রসূলদের মাধ্যমে সৃষ্টির জন্য যে দ্বীন ও শারীয়াত পাঠিয়েছেন, তাকে শারীয়াতের পরিভাষায় অহী বলা হয়।
📄 কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
وقوله: {وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ } {لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لِّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ} {وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ قَالُوا إِنَّمَا أَنتَ مُفْتَرٍ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهُدًى وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ}
আল্লাহ তা'আলা সূরা আন'আমের ৯২ ও ১৫৫ নং আয়াতে বলেন: وَهَذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ
"আর এটি একটি বরকতপূর্ণ কিতাব, যা আমি নাযিল করেছি”। আল্লাহ তা'আলা সূরা হাশরের ২১ নং আয়াতে বলেন: لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ﴾
"আমি যদি এই কুরআনকে কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ছে এবং ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে”। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يُنَزِّلُ قَالُوا إِنَّمَا أَنتَ مُفْتَرٍ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهُدًى وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ لِّسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُّبِينٌ
"যখন আমি একটি আয়াতকে অন্য একটি আয়াত দ্বারা বদল করি, আর আল্লাহ ভালো করেই জানেন তিনি কি নাযিল করবেন- তখন এরা বলে, তুমি নিজেই এ কুরআনের রচনাকারী। আসলে এদের অধিকাংশই জানে না। এদেরকে বলো, একে তো রূহুল কুদ্দুস সত্য সহকারে তোমার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করেছে, যাতে মুমিনদের সুদৃঢ় করা যায়। আর এটি মুসলিমদের জন্য হেদায়াত ও সুসংবাদ স্বরূপ। আমি জানি এরা তোমার সম্পর্কে বলে, এ ব্যক্তিকে একজন লোক শিক্ষা দেয়। অথচ এরা যে ব্যক্তির দিকে ইংগিত করে তার ভাষা তো আরবী নয়। আর এটি হচ্ছে পরিষ্কার আরবী ভাষা”। (সূরা নাহাল ১৬:১০১-১০৩)
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া যখন আল্লাহ তা'আলার জন্য কালাম সাব্যস্ত করার দলীলগুলো উল্লেখ করলেন এবং এই কথা সাব্যস্ত করলেন যে, কুরআনুল কারীম আল্লাহ তা'আলার কালাম, তখন ঐসব দলীল বর্ণনা শুরু করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
وَهُدًى এটি: এখানে কুরআনুল কারীমের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এখানে ইসমে ইশারা মুবতাদা। তার খবর হচ্ছে كتاب।
أَنزَلْنَاهُ আমি অবতীর্ণ করেছি এবং مُبَارَكٌ (বরকত সম্পন্ন) এই দু'টি كِتَابٌ এর সিফাত। এখানে অবতীর্ণ করা সিফাতকে مُبَارَكٌ এর আগে উল্লেখ করার কারণ হলো কাফেররা মুহাম্মাদ -এর উপর কুরআন অবতীর্ণ হওয়াকে অস্বীকার করতো। প্রচুর বরকত ওয়ালা বস্তুকে مُبَارَكٌ বলা হয়। কুরআনকে বরকত ওয়ালা বলার কারণ হলো তাতে রয়েছে দ্বীন ও দুনিয়ার প্রচুর বরকত ও কল্যাণ।
لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُتَّصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ যদি এই কুরআনকে কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ছে এবং ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে:
এখানে কুরআনের ফাযীলাত ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন শুনে এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় অন্তর ভীত হওয়া আবশ্যক। কেননা কুরআন যদি পাহাড়ের উপর নাযিল করা হতো, তাহলে পাহাড় এত কঠিন ও মজবুত হওয়া সত্ত্বেও কুরআন বুঝার পর আল্লাহর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হতো এবং আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ফেটে যেত। সুতরাং হে মানব! এটি কিভাবে সম্ভব যে, কুরআন শুনে তোমাদের অন্তর নরম হয় না এবং তা ভীতও হয় না? অথচ তোমরা আল্লাহর আদেশ বুঝতে সক্ষম হয়েছ এবং তাঁর কিতাব অনুধাবন করেছ।
وَإِذَا بَدَّلْنَا آيَةً مَّكَانَ آيَةٍ যখন আমি একটি আয়াতকে অন্য একটি আয়াত দ্বারা বদল করি: এখানে আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীম সম্পর্কে একটি কুফুরী শুবহার (সন্দেহের) বর্ণনা শুরু করেছেন এবং তার জবাব দিয়েছেন। বদল করার অর্থ হলো কোন জিনিসকে নিজ স্থান থেকে উঠিয়ে নিয়ে তার স্থলে অন্য জিনিস স্থাপন করা। আয়াতকে বদল করার তাৎপর্য হচ্ছে তা উঠিয়ে নিয়ে তার স্থলে অন্য একটি আয়াত রাখা। এর নাম হচ্ছে এক আয়াতের মাধ্যমে অন্য আয়াত মানসুখ বা রহিত করা।
قالوا এরা বলে: অর্থাৎ কুরাইশ গোত্রের কাফেররা মানসুখ করার হিকমাত সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে বলে, হে মুহাম্মাদ! নিশ্চয়ই তুমি মিথ্যা রচনাকারী। আল্লাহর উপর জবান লম্বা করছো। তোমার ধারণা এই যে, আল্লাহ তোমাকে একটি বিষয়ে আদেশ করেছেন। পুনরায় ধারণা করো যে, আল্লাহ তোমাকে প্রথম আদেশের বিপরীত অন্য এক আদেশ দিয়েছেন। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার এমন জবাব দিয়েছেন, যাতে তাদের অজ্ঞতার প্রমাণ মিলে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ অধিকাংশই জানে না: অর্থাৎ মূলতঃ তারা কোন জ্ঞানই রাখে না এবং নসখ বা রহিত হওয়ার হিকমাত সম্পর্কেও তারা অবগত নয়। কুরআনের এক আয়াতকে অন্য আয়াত দ্বারা পরিবর্তন করার মধ্যে কী পরিমাণ উপকারিতা রয়েছে, তা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ জানে না। কখনো একটি বিষয় শারীয়াতের অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশেষ একটি স্বার্থ থাকে। অতঃপর সেই সময় পার হওয়ার পর তার বদলে অন্য একটি বিষয় শারীয়াতভূক্ত করার মধ্যেই উপকার লক্ষ্য করা যায়। এই কাফেরদের বিবেক-বুদ্ধির উপর থেকে যদি পর্দা উঠে যেত, তাহলে তারা বুঝতে সক্ষম হতো যে, মানসুখ করাই সঠিক, ইনসাফপূর্ণ এবং সহজ-সরল।
অতঃপর তারা যে ধারণা করেছিল, এই পরিবর্তন মুহাম্মাদ ﷺ এর নিজের পক্ষ হতে এবং এর মাধ্যমে সে মিথ্যা রচনা করেছে, আল্লাহ তা'আলা তাদের ধারণার প্রতিবাদ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, হে মুহাম্মাদ! তুমি বলো যে, এই কুরআন নাযিল করেছেন রূহুল কুদুস তথা জিবরীল এর মাধ্যমে। কুদুস অর্থ পবিত্র। আসল অর্থ হচ্ছে الروح المطهر (পবিত্র আত্মা) এটি নাযিল করেছে। روح القدس এখানে মাওসুফকে (রূহকে) সিফাতের (কুদ্দুসের) দিকে ইযাফত সম্বোধন করা হয়েছে।
مِّن رَّبِّكَ তোমার রবের পক্ষ হতে অর্থাৎ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে। بِالْحَقِّ সত্য সহকারে: এটি হাল হিসাবে নসবের স্থানে পতিত হয়েছে। অর্থাৎ মূল বাক্যটি এ রকম হতে পারে متصفا بكونه حقا অবস্থায় এই কুরআন নাযিল হয়েছে।
لِيُثَبِّتَ الَّذِينَ آمَنُوا যাতে মুমিনদের সুদৃঢ় করা যায়: অর্থাৎ যাতে মুমিনদেরকে ঈমানের উপর মজবুত রাখা যায় সেই জন্য তোমার উপর জিবরীলের মাধ্যমে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। নাসেখ মানসুখও আল্লাহর পক্ষ হতেই এসেছে। যাতে মুমিনগণ বলতে পারে যে, নাসেখ এবং মানসুখের প্রত্যেকটিই আমাদের রব আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে। বিশেষ করে যখন তারা জানতে পারবে যে, নসখ (রহিত) করার মধ্যে অনেক উপকারিতা রয়েছে, তখন তারা ঈমানের উপর সুদৃঢ় থাকবে।
هُدًى وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ সুসংবাদ স্বরূপ: এখানে هدی এবং بشری শব্দ দু'টি ليثبت এর অবস্থানের উপর আতফ (স্থাপন) করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল বাক্যটি এ রকম হতে পারে: تثبيتا لهم وهداية وبشرى । অতঃপর আল্লাহ তা'আলা কাফেরদের সন্দেহগুলো থেকে আরেকটি সন্দেহ বর্ণনা করেছেন এবং জবাব দিয়েছেন।
وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُهُ بَشَرٌ বলে, এ ব্যক্তিকে একজন লোক শিক্ষা দেয়: অর্থাৎ আমি অবশ্যই জানি যে, এই কাফেররা বলে, একজন মানুষ মুহাম্মাদ কে কুরআন শিক্ষা দেয়। আসমানের কোন ফেরেশতা তাঁর নিকট কুরআন নিয়ে আসে না। যেই মানুষটি তাকে কুরআন শিক্ষা দেয়, সে এর আগে তাওরাত, ইঞ্জিল এবং অনারবদের কিতাবাদি পাঠ করেছে। কারণ মুহাম্মাদ একজন অশিক্ষিত মানুষ। কুরআনে অতীতের যেসব খবর উল্লেখ করা হচ্ছে, মুহাম্মাদ দ্বারা তা রচনা করা সম্ভব নয়।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার জবাব এইভাবে দিয়েছেন যে, لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ করে তার ভাষা তো আরবী নয়: অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ ! যেই ব্যক্তি তোমাকে কুরআন শিক্ষা দেয় বলে তারা ধারণা করছে, তার ভাষা আরবী নয়। সে আরবী বলতে পারে না। আর এই কুরআন তো পরিষ্কার আরবী ভাষায়। অর্থাৎ এই কুরআন অলঙ্কারপূর্ণ আরবী ভাষায় এবং এর বর্ণনা সুস্পষ্ট। সুতরাং তোমরা কিভাবে ধারণা করছ যে, একজন অনারব লোক মুহাম্মাদ কে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছে? অথচ তোমরা কুরআনের মোকাবেলা করতে অক্ষম হয়েছ, অক্ষম হয়েছ কুরআনের মত কয়েকটি বা একটি সূরা আনয়ন করতে। তোমরা আরবী ভাষার লোক, সুস্পষ্ট আরবী বলায় পারদর্শী এবং অলঙ্কারপূর্ণ বক্তব্য প্রদানকারীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় হওয়ার পরও তোমরা কুরআনের মোকাবেলা করতে অক্ষম হয়েছ।
উপরোক্ত আয়াতগুলোর শিক্ষা: উপরোক্ত আয়াতে কারীমাগুলো থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, কুরআন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
কুরআন আল্লাহরই কালাম। ফেরেশতা বা কোন মানুষের কালাম নয়। যারা বলে কুরআন আল্লাহর কালাম নয়; সৃষ্টির কালাম, এখানে তাদের কথারও প্রতিবাদ করা হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহর জন্য মাখলুকের উপর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে। কেননা নাযিল কেবল উপর থেকেই হয়。