📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই।

📄 আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই।


{وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا } {يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} { تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا} {مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ} {فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} {قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا
"আর বলো, সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি। তাঁর সার্বভৌমত্বে কোনো অংশীদার নেই। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোনো সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর যথাযথ বড়ত্ব বর্ণনা করো” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১১১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছে। একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তাঁরই এবং তাঁরই জন্য সকল প্রশংসা। তিনিই সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান” (সূরা তাগাবুন ৬৪:১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا * الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
"যিনি (আল্লাহ) তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, তিনি বড়ই বরকত সম্পন্ন, যাতে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হন। তিনিই আল্লাহ, যিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক, যিনি কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন নি, যার রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই এবং যিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তার একটি তাকদীর নির্ধারণ করে দিয়েছেন” (সূরা ফুরকান ২৫:১-২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ * عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
"আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন মাবুদও নেই। আল্লাহর সাথে যদি আর কোন মাবুদ থাকতো তাহলে প্রত্যেক মাবুদ নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেতো এবং একজন অন্যজনের উপর চড়াও হতো। এরা যেসব কথা তৈরী করে তা থেকে আল্লাহ পাক-পবিত্র। প্রকাশ্য ও গুপ্ত সবকিছুই তিনি জানেন। এরা আল্লাহর জন্য যে শরীক নির্ধারণ করে, তিনি তার অনেক উর্ধ্বে” (সূরা মুমিনুন ২৩:৯১-৯২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "কাজেই আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করো না। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না” (সূরা নাহাল ১৬:৭৪)। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنزِلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ "তুমি বলে দাও, আমার প্রতিপালক কেবল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন এবং হারাম করেছেন গুনাহ্, অন্যায় বাড়াবাড়ি, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, যার কোন দলীল-প্রমাণ তিনি অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা বলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, যা তোমরা জানো না” (সূরা আরাফ ৭:৩৩)।
ব্যাখ্যা: وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ বলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য: প্রশংসাকে হামদ বলা হয়। الحمد এর মধ্যে যেই Ji রয়েছে উহা ইস্তেগরাকের জন্য। অর্থাৎ এ কথা বুঝনোর জন্য যে, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি: অর্থাৎ তাঁর কোন সন্তান নেই। যেমন ধারণা করে থাকে ইহুদী, খৃষ্টান এবং আরবের কতিপয় মুশরিক।
وَلَم يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ তাঁর বাদশাহীতে কোন শরীক নেই: অর্থাৎ তাঁর রাজত্বে ও প্রভুত্বে অংশীদার নেই। যেমন ধারণা করে থাকে অগ্নিপূজক এবং তাদের অনুরূপ সম্প্রদায়। তারা একাধিক মাবুদে বিশ্বাসী।
وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ নন যে, তাঁর কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন হয়: অর্থাৎ তিনি এমন দুর্বল নন, যাতে তার কোন সাহায্যকারী কিংবা কোন মন্ত্রী অথবা কোন পরামর্শদাতার দরকার হয়। সুতরাং তিনি কারো সাথে বন্ধুত্ব রচনা করেন নি এবং কারো সাহায্যও গ্রহণ করেন নি।
وَكَبَرَّهُ تَكْبِيرًا আর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করো, চূড়ান্ত পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব: যালেমরা যা বলে, তা থেকে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব ঘোষণা করো।
يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ আছে তার সবই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছে: আল্লাহর আসমান ও যমীনে যত মাখলুক রয়েছে, তারা সকলেই সব দোষ-ত্রুটি হতে আল্লাহর তাসবীহ বা পবিত্রতা বর্ণনা করছে।
لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সকল প্রশংসাও তাঁর জন্য: এ দু'টিতে অন্য কারো কোন অংশ নেই। তাঁর বান্দারা পৃথিবীর রাজত্বের যেই অংশ লাভ করে থাকে, তা আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দান করেন বলেই লাভ করে থাকে। তা মূলতঃ আল্লাহর রাজত্বেরই অংশবিশেষ।
وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ তিনি সবকিছুর উপরই ক্ষমতাবান: কোন কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না।
البركة শব্দটি (فعل ماضي ) অতীতকালের অর্থবোধক ক্রিয়া)। এটি تبارك থেকে গৃহীত। কল্যাণের প্রাচুর্য, বৃদ্ধি, সুদৃঢ় ও স্থায়ী হওয়াকে البركة (বরকত) বলা হয়। تبارك শব্দটি শুধু আল্লাহ তা'আলার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং শুধু অতীত কালের শব্দ দ্বারাই ব্যবহৃত হয়।
الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ তিনি তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন: এখানে কুরআনকে ফুরকান হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা তা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে দেয়।
عَلَى عَبْدِهِ বান্দার উপর: এখানে বান্দা বলতে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্য। আল্লাহর বান্দা হওয়া একটি প্রশংসনীয় বিশেষণ। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাকে নিজের দিকে ইযাফত (সম্বন্ধিত) করেছেন। এটি হচ্ছে তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ করার সাথে সাথে সম্মান ও মর্যাদার সম্বন্ধ।
لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ যাতে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য: তিনি সমস্ত জিন ও মানুষের জন্য। এটি হচ্ছে নাবী এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
نذيرا শব্দটি الإنذار ক্রিয়ামূল থেকে منذر অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ভয়ের কারণগুলো সম্পর্কে জানিয়ে দেয়াকে إنذار বলা হয়। ليكون (যাতে তিনি হতে পারেন), এ বাক্যটি মুহাম্মাদ এর উপর ফুরকান অবতীর্ণ করার কারণ। অর্থাৎ যাতে করে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বিশ্বজনীন রিসালাতের মাধ্যমে সম্মানিত করতে পারেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সত্তাকে চারটি গুণের মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন।
প্রথম গুণ: الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ তিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক: তিনি একাই আসমান-যমীনের সকল বিষয়ের মালিক এবং এতদুভয়ের সবকিছু পরিচালনাকারী।
দ্বিতীয় গুণ: وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا তিনি কাউকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেননি: যেমন ইহুদী, খৃষ্টান এবং আরবের মুশরেকরা ধারণা করতো। আল্লাহ যেহেতু স্বয়ং সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং সমস্ত মাখলুক তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। কারো প্রতি তাঁর প্রয়োজন নেই বলেই তিনি কাউকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেননি।
তৃতীয় গুণ: وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ তাঁর রাজত্বে কোন শরীক নেই: এতে মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক এবং তাদের অনুরূপ আরো অনেক মুশরেক সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ করা হয়েছে।
চতুর্থ গুণ: وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন: যত মাখলুক রয়েছে, তার সবগুলোই তিনি সৃষ্টি করেছেন। বান্দাদের কর্মগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। বান্দাদের কর্মগুলো আল্লাহর সৃষ্টি। বান্দারা তা সম্পাদন ও বাস্তবায়ন করে। অতঃপর তার জন্য একটি তাকদীর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য বয়স নির্ধারণ করেছেন এবং তার রিযিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সে সৌভাগ্যবান হবে? না হতভাগ্য হবে? তাও তিনি অবগত আছেন। তিনি প্রত্যেক বস্তুকে যথাযথভাবেই প্রস্তুত করেছেন।
ইমাম ইবনে কাছীর এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর নিজের সত্তাকে সন্তান গ্রহণ করা থেকে পবিত্র করেছেন এবং তাঁর কোন শরীক নেই বলেও ঘোষণা করেছেন। অতঃপর তিনি সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত সব বস্তুই তাঁর সৃষ্টি এবং তাঁর প্রতিপালনাধীন। তিনিই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা, প্রত্যেক বস্তুর প্রভু, সবকিছুর মালিক এবং সকলের মাবুদ। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর ক্ষমতাধীন, তাঁরই পরিচালনাধীন, তাঁরই বশীভূত এবং তাঁরই তাকদীরের অধীনস্ত।
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ পরিণত করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন মাবুদও নেই:
এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা নিজের সত্তাকে সন্তান থেকে পবিত্র করেছেন। তাঁর রাজত্বে, পরিচলনায় এবং তাঁর এবাদতে কোন শরীক হওয়াকেও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন। আল্লাহর সন্তান থাকার ধারণাকে এবং শরীক নির্ধারণ করার বিষয়কে জোরালোভাবে অস্বীকার করার জন্য উপরোক্ত আয়াতের দুই জায়গায় من হরফে জার ব্যবহার করা হয়েছে।
إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ থাকতো তাহলে প্রত্যেক মাবুদ নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেতো:
আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং তাঁর ইবাদতে কোন শরীক নেই। এটি হচ্ছে তার পক্ষে একটি বিরাট দলীল। অর্থাৎ যদি ধরে নেওয়া হয় যে, একাধিক মাবুদ রয়েছে, তাহলে প্রত্যেক মাবুদই নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো এবং দলাদলি ও ভাগাভাগির কারণে সৃষ্টিজগতের শান্তি-শৃংখলা নষ্ট হয়ে যেতো। বাস্তবে আমরা দেখছি যে, সৃষ্টিজগত পূর্ণ শৃঙ্খলার সাথেই রয়েছে এবং সুনিয়ন্ত্রিতভাবেই চলছে। তাতে একাধিক মাবুদ দেখা যায়নি এবং মাবুদদের দলাদলিও সৃষ্টি হয়নি।
وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ এবং একজন অন্যজনের উপর চড়াও হতো: অর্থাৎ আল্লাহর সাথে যদি আরেকজন মাবুদ থাকতো, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই অন্যের বিরোধীতা করতো। ফলে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের মতই একজন অন্যজনের উপর জয়লাভ করতো। ফলে যে পরাজিত এবং দুর্বল প্রমাণিত হতো, সে ইলাহ (মাবুদ) হওয়ার যোগ্যতা হারাতো। সুতরাং যখন সমপর্যায়ের একাধিক মাবুদ থাকার বিষয়টি বাতিল সাব্যস্ত হলো, তখন সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, মাবুদ মাত্র এক। তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ। তিনি এক ও অদ্বিতীয়।
এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ যেসব কথা তৈরী করে তা থেকে আল্লাহ তা'আলা পাক-পবিত্র: অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার জন্য যেই শরীক ও সন্তান নির্ধারণ করে থাকে, তা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র।
عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ অর্থাৎ যেসব বিষয় বান্দাদের অদৃশ্য এবং বান্দারা যা জানে না, কেবল তিনিই তা জানেন। বান্দারা যা দেখে ও জানে, তিনি তাও জানেন। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্যরা যদিও তাদের সামনে দৃশ্যমান বস্তুগুলো সম্পর্কে জানতে পারে, কিন্তু তারা গায়েবের খবর জানে না। সুতরাং এরা আল্লাহর জন্য যে শরীক নির্ধারণ করে, তিনি তার অনেক উর্ধ্বে।
فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ কাজেই আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করো না: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর জন্য উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত পেশ করতে নিষেধ করেছেন। এক অবস্থাকে অন্য অবস্থার সাথে তুলনা করার নাম ضرب المثل তথা উপমা পেশ করা। আরবের মুশরেকরা বলতো, আমরা শুধু এক আল্লাহর ইবাদাত করবো, এর প্রতি আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং আল্লাহর এবং আমাদের মাঝে মাধ্যম স্থাপন করার প্রয়োজন রয়েছে। তাই তারা বহু সংখ্যক মূর্তি এবং অন্যান্য বস্তুকে আল্লাহ এবং তাদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী বানাতো। আল্লাহ তা'আলাকে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে তুলনা করেই তারা এই কাজ করতো। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এই কাজ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা আল্লাহর সদৃশ কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর জন্য উপমা পেশ করা চলে না এবং তাঁর সাথে কোন সৃষ্টির তুলনাও চলে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সম্পর্কে ভাল করেই জানেন যে, তাঁর অনুরূপ সত্তা আর কেউ নেই।
إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ আল্লাহ তা'আলা তাঁর পবিত্র সত্তা সম্পর্কে যা জানেন, তোমরা তা জানো না। সুতরাং তোমাদের এই কাজ তথা আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত এবং উপমা পেশ করা তোমাদের ভ্রান্ত ধারণা এবং বাতিল কল্পনা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। সেই সাথে মূর্তিগুলোকে আল্লাহর সাথে তুলনা করা এবং সেগুলোর ইবাদাত করার ভয়াবহ ও মন্দ পরিণাম সম্পর্কেও তোমরা অবগত নও।
فُلْ তুমি বলে দাও: এখানে নাবী কে সম্বোধন করা হয়েছে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম এবং নাবী আল্লাহর পক্ষ হতে মুবাল্লিগ (দাঈ ও প্রচারক)। إِلَّا এটি সীমিত কারক অব্যয়।
حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ “আমার প্রতিপালক অশ্লীল কাজসমূহ হারাম করেছেন: অর্থাৎ অশ্লীল বিষয়সমূহকে হারাম হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। الفواحش শব্দটি فاحشة-এর বহুবচন। যেই পাপাচার অত্যন্ত নিকৃষ্ট, তাকে ফাহেশা বলা হয়।
مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য: অর্থাৎ ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে যেই অপরাধ করা হয় এবং যা গোপনে করা হয় এই উভয় প্রকার গুনাহকেই আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন।
والإثم )পাপাচার) প্রত্যেক এমন অপরাধকে বলা হয়, যাতে গুনাহ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন: শুধু মদ পান করাকে বলা হয়।
وَالْبَعْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ অন্যায় বাড়াবাড়ি: অর্থাৎ সীমাহীন যুলুম করা এবং মানুষের উপর অত্যাচার করা তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে।
وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللهِ আল্লাহ্র সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা: অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে তোমরা কোন শরীক সাব্যস্ত করো না।
مَا لَمْ يُزِلْ بِهِ سُلْطَانًا যার কোন প্রমাণ আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেননি: আয়াতের এ অংশ থেকেই শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া দলীল গ্রহণ করেছেন।
وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ তোমাদের উপর হারাম করেছেন, যা তোমরা জানো না:
আল্লাহর ব্যাপারে বানোয়াট ও মিথ্যা কথা বলা। যেমন আল্লাহর সন্তান আছে বলে দাবী করা কিংবা অনুরূপ এমন বিষয়ে কথা বলা, যে সম্পর্কে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই। অনুরূপ আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই মুশরিকরা নিজেদের পক্ষ হতে অনেক বস্তুকে হালাল করে এবং বহু জিনিসকে হারাম করে আল্লাহর দিকে সম্বধিত করতো এবং বলতো আল্লাহ এগুলো হালাল করেছেন কিংবা এগুলোকে তিনি হারাম করেছেন।
উপরোক্ত আয়াতে কারীমা হতে প্রমাণ মিলে যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার শরীক হওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং একমাত্র তাঁর জন্যই পরিপূর্ণ গুণাবলী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য সন্তান ও সদৃশ থাকার দাবী খন্ডন করা হয়েছে। সমস্ত মাখলুকই এ জাতীয় দোষ-ত্রুটি হতে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। অনুরূপ উপরোক্ত আয়াতগুলো শির্ক করাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দিয়েছে। মূর্খতা ও কল্পনার উপর ভিত্তি করেই শির্কের সূচনা হয়েছে। আল্লাহু তা'আলার কোন সদৃশ ও সমকক্ষ নেই। (আল্লাহই অধিক জানেন)

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করা।

📄 আল্লাহ তা‘আলার আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করা।


وقوله: {الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى في سبعة مواضع: في سورة الأعراف قوله: إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وقال في سورة يونس - عليه السلام -: {إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} وقال في سورة الرعد: اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} وقال في سورة طه: { الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى} وقال في سورة الفرقان: {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ} وقال في سورة الم السجدة: {اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} وقال في سورة الحديد: هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} .
আল্লাহ তা'আলা বলেন: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত (সূরা ত্বহা ২০:৫)।
এ কথা কুরআনের সাত জায়গায় বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা সূরা আরাফের ৫৪ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ
“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউনূসের ৩ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)
"নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন”। আল্লাহ তা'আলা সূরা রা'দের ২ নং আয়াতে বলেন:
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)
"আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন বিনা স্তম্ভে। তোমরা এটা দেখছো। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা তোহার ৫নং আয়াতে বলেন:
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
"দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা ফুরকানের ৫৯ নং আয়াতে বলেন:
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ )
"অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন তিনি পরম দয়াময়"। আল্লাহ তা'আলা সূরা সাজদার ৪ নং আয়াতে বলেন:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)
"আল্লাহই আসমান-যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল বস্তু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াতে বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ )
"আল্লাহই আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।
ব্যাখ্যা: আল্লাহর কিতাবের সাতটি স্থানে আল্লাহ তা'আলা সাব্যস্ত করেছেন যে তিনি আরশের উপরে সমুন্নত। প্রত্যেক স্থানেই মাত্র একটি শব্দ তথা (استواء) সমুন্নত হওয়া) দ্বারা আরশের উপর সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে استوى على العرش "তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন"। ইস্তিওয়া শব্দটি এখানে আসল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য অর্থ দ্বারা ব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ নেই। ইস্তিওয়া (সমুন্নত হওয়া) আল্লাহ তা'আলার একটি কর্মগত সিফাত। এটি তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য সুসাব্যস্ত। অন্যান্য সিফাতের মতই আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই এ সুউচ্চ সিফাতটি তাঁর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। আরবদের ভাষায় চারটি শব্দের মাধ্যমে ইস্তিওয়ার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যথা: علا وارتفع وصعد واستقر এ চারটি শব্দের প্রথম তিনটির অর্থ উপরে উঠলেন এবং সমুন্নত হলেন। চতুর্থ শব্দটির অর্থ হচ্ছে স্থির হলেন।
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে বর্ণিত استواء শব্দের অর্থে সালাফদের থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, তার ভিত্তি এ চারটি অর্থের উপরেই। আসলে ঘুরেফিরে অর্থ একটিই। তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে।
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: "নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। অর্থাৎ তিনি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর নেয়ামতরাজি দ্বারা প্রতিপালনকারী। সুতরাং তোমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে তোমরা এককভাবে তাঁরই ইবাদাত করবে।
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন: তিনি সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা, আসমান-যমীনসমূহের সৃষ্টিকারী এবং আসমান ও যমীনের মাঝখানে যা আছে, তার সবই তিনি সৃষ্টি করেছেন।
فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ তিনি ছয়দিনে এগুলো সৃষ্টি করেছেন: এ দিনগুলো হচ্ছে রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার। শুক্রবার দিন সকল সৃষ্টি সম্পন্ন হয়েছে। এতেই আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন।
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ: অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন: অর্থাৎ যেভাবে আরশের উপর সমুন্নত হওয়া তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়, তিনি আরশের উপর সেভাবেই সমুন্নত হয়েছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতের এ অংশ থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
আভিধানিক অর্থে বাদশার সিংহাসনকে আরশ বলা হয়। তবে এখানে সবগুলো দলীল দ্বারা সেই সিংহাসন উদ্দেশ্য, যার রয়েছে একাধিক খুঁটি এবং যাকে আল্লাহর ফেরেশতাগণ বহন করে আছেন। সেটি সমস্ত সৃষ্টিজগতের উপর তাঁবু বা গম্বুজ স্বরূপ। এক কথায় আরশ হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টিজগতের ছাদ।
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন বিনা স্তম্ভে: অর্থাৎ যমীনের অনেক উপরে আসমানকে এমনভাবে স্থাপন করেছেন যে, তাকে স্পর্শ করা এবং সে পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়।
بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا তিনি আসমানকে বিনা খুঁটিতে উপরে স্থাপন করেছেন, যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ: খুঁটি ও স্তম্ভকে عمد বলা হয়। عمد শব্দটি عماد -এর বহুবচন। আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহকে এমন কোন খুঁটি ও স্তম্ভের উপর দাঁড় করান নি যে, উহা সেই খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বরং আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতের মাধ্যমে আসমানসমূহকে খুঁটি ছাড়াই সুউচ্চে স্থাপন করেছেন। আকাশের খুঁটি নেই, এই কথাকে শক্তিশালী করার জন্য عمد এর পর ترونها (তোমরা দেখতে পাচ্ছ) বাক্যটি আনয়ন করা হয়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, আসমানের খুঁটি আছে। কিন্তু আমরা তা দেখি না। তবে প্রথম কথাটিই অধিক বিশুদ্ধ।
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ : অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন: তৃতীয় আয়াতের এ অংশ থেকেই আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার দলীল নেয়া হয়েছে। বাকী আয়াতগুলোর ক্ষেত্রেও কথা একই। আয়াতগুলোর যেখানে ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ রয়েছে, সেখান থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
সবগুলো আয়াত থেকে যা সাব্যস্ত হচ্ছে, তা হলো আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের জন্য যেভাবে আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া শোভনীয়, আল্লাহর জন্য সেভাবেই আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করতে হবে। এ আয়াতগুলোতে ঐসব লোকদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা ইস্তিওয়াকে (الاستيلاء )দখল করা, অধিকারী হওয়া) ও القهر (পরাজিত করা) এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে এবং আল্লাহর আরশকে ব্যাখ্যা করে আল্লাহ রাজত্বের মাধ্যমে। তারা বলে আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন এর অর্থ হচ্ছে استولى على الملك وقهر غيره “তিনি তাঁর রাজত্বের অধিকারী হলেন এবং অন্যদেরকে পরাজিত করলেন"। একাধিক কারণে এ ব্যাখ্যা বাতিল।
প্রথম: এটি একটি বিদ'আতী ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা সাহাবী, তাবেঈ এবং তাদের অনুসারী সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যার সুস্পষ্ট বিরোধী। জাহমীয়া ও মুতাযেলারাই সর্বপ্রথম ইস্তিওয়ার এই ব্যাখ্যা করেছে। সুতরাং এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যাত।
দ্বিতীয়: استولى على الملك استوى على العرش এর ব্যাখ্যা যদি হতো, তাহলে আরশ এবং নিম্নজগতের সাত যমীন, যমীনে বিচরণকারী জীব-জন্তু এবং সমস্ত মাখলুকের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে কোন পার্থক্য থাকতো না। কেননা তিনি সমস্ত মাখলুকের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী এবং তিনি সবকিছুর মালিক। সুতরাং استوى এর দ্বারা ইস্তিওলা উদ্দেশ্য করা হলে আরশের উল্লেখ করা নিরর্থক হতো। আল্লাহর কালামে নিরর্থক কিছু নেই।
তৃতীয়: আরশের উপর আল্লাহ তা'আলার সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করার জন্য কুরআন সুন্নাহয় শুধু اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ (আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন) এ বাক্যটিই উল্লেখিত হয়েছে। একবারও اسْتَوْلَى عَلَى الْعَرْشِ (আরশের অধিকার গ্রহণ করলেন) বাক্যটি আসেনি। একবারও যদি তা আসত, তাহলে অন্য আয়াতগুলোতে উল্লেখিত اسْتَوَى শব্দকে اسْتَوْلَى এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেত। ১৮
চতুর্থ: উপরোক্ত আয়াতগুলোর যেখানেই আসমান-যমীন সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, তার পর সবখানেই ثُمَّ اسْتَوَىٰ আনয়ন করে বলা হয়েছে: عَلَى الْعَرْشِ (অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন), যা বিলম্বের সাথে ধারাবাহিকতার অর্থ প্রদান করে اسْتِوَاء عَلَى الْعَرْش দ্বারা যদি اسْتِيْلَاء عَلَى الْعَرْشِ وَالْقُدْرَةِ عَلَيْهِ (আরশের অধিকারী হওয়া এবং উহার উপর ক্ষমতা লাভ করা) উদ্দেশ্য হতো, তাহলে خَلْقِ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضِ বলার পর ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ বলতেন না।
কেননা আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহর আরশ বিদ্যমান ছিল। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে (২৬৫৩) বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কিভাবে এটি বলা বৈধ হতে পারে যে, আসমান-যমীন সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তা'আলা আরশের অধিকারী ছিলেন না এবং এর উপর তিনি ক্ষমতাবানও ছিলেন না? এই ধরণের কথা সম্পূর্ণ বাতিল。

টিকাঃ
১৮. আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং সকল বস্তুর মালিক একমাত্র তিনিই। অনন্তকাল থেকেই সকল বস্তুর উপর তাঁর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত এবং সকল বস্তু বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও আল্লাহ এবং তাঁর মালিকানা বহাল থাকবে। আল্লাহর ক্ষেত্রে এমন বিশ্বাস পোষণ করা ঠিক হবে না যে, আল্লাহ পূর্বে অমুক বস্তুর মালিক ছিলেন না। পরে মালিক হয়ে গেছেন। এ ধরণের অর্থ গ্রহণ করা হলে, আল্লাহ যে মহান ক্ষমতাবান তাতে বিশ্বাস পরিপূর্ণ হবে না এবং মহান আল্লাহর সাথে মানুষের সাথে তুলনা হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত মাখলূকের (সৃষ্টির) উপর সমুন্নত।

📄 আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত মাখলূকের (সৃষ্টির) উপর সমুন্নত।


ওয়াক্বওলিহি: {يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ} {بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ} {إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ} {يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَّعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطْلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا} {أَأَمِنْتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ}
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: {يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ} "হে ঈসা! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু (নিদ্রা) দান করবো। অতঃপর তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নিবো” (সূরা আল-ইমরান ৩:৫৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ} "বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ প্রবল শক্তিধর ও প্রজ্ঞাবান” (সূরা নিসা ৪:১৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ} "পবিত্র বাক্যসমূহ তাঁরই দিকেই উঠে এবং সৎকর্মকে তিনি উন্নীত করেন”। (সূরা ফাতির ৩৫:১০) আল্লাহ তা'আলা ফেরাউনের উক্তি উল্লেখ করে বলেন:
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطْلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا *
“হে হামান! আমার জন্য একটি সুউচ্চ ইমারাত নির্মাণ করো যাতে আমি রাস্তাসমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি। অর্থাৎ আসমানের রাস্তা এবং মূসার ইলাহকে উঁকি দিয়ে দেখতে পারি। মুসাকে মিথ্যাবাদী বলেই আমার মনে হয়। এভাবে ফেরাউনের জন্য তার কুকর্মসমূহ সুদৃশ্য বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সোজা পথ থেকে ফিরিয়ে রাখা হয়েছে। ফেরাউনের সমস্ত চক্রান্ত ধ্বংসের পথেই ব্যয়িত হয়েছে”। (সূরা গাফের ৪০:৩৬-৩৭) আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَأَمِنتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ أَمْ أَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرٍ
"তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ যে, যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেবেন? অতঃপর ভূপৃষ্ঠ জোরে ঝাঁকুনি খেতে থাকবে, কিংবা যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণ করবেন, এ ব্যাপারেও কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গিয়েছো? তখন তোমরা জানতে পারবে আমার ভীতি প্রদর্শন কেমন? (সূরা মুলক ৬৭:১৬-১৭)।
ব্যাখ্যা: يا عیسی হে ঈসা! আল্লাহ তা'আলা ঈসা ইবনে মারইয়াম কে সম্বোধন করে বলেছেন।
إِنِّي مُتَوَفِّيكَ "আমি তোমাকে ওফাত দিবো”। অধিকাংশ আলেমের মতে এখানে ওফাত বলতে নিদ্রা উদ্দেশ্য। কেননা নিদ্রা মৃত্যুর অন্যতম প্রকার। আল্লাহ তা'আলা সূরা আন'আমের ৬০ নং আয়াতে বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُم بِاللَّيْلِ )
"তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের মৃত্যু ঘটান"। আল্লাহ তা'আলা সূরা ঘুমারের ৪২ নং আয়াতে বলেন:
﴿اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا﴾
"মৃত্যুর সময় আল্লাহই রূহসমূহ কবয করেন। আর যে এখনো মরেনি নিদ্রাবস্থায় তার রূহ কবয করেন"।
وَرَافِعُكَ إِلَيَّ তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নিবো: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আসমানে নিজের দিকে জীবিত অবস্থায় উঠিয়ে নিয়েছেন। আয়াতের এ অংশ থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে এবং আল্লাহর জন্য علو তথা উপরে হওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। কেননা উঠিয়ে নেওয়া সাধারণত: উপরের দিকেই হয়।
بَلْ رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। এখানে ঐসব ইহুদীদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা দাবী করে যে, তারা ঈসা মাসীহ ইবনে মারইয়ামকে হত্যা করে ফেলেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ﴾
"মূলতঃ তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করতে পারেনি; বরং তাদেরকে সন্দেহে ফেলা হয়েছে। নিশ্চয়ই যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল তারাই সে বিষয়ে সন্দেহে রয়েছে। কল্পনার অনুসরণ ব্যতীত এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। প্রকৃতপক্ষে তারা তাঁকে হত্যা করতে পারেনি। প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন (সূরা নিসা ৪:১৫৭-১৫৮)।
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জীবিত অবস্থায় নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন। তিনি নিহত হননি। আয়াতের এ অংশই দলীল গ্রহণের স্থান। কেননা এ অংশে আল্লাহর জন্য মাখলুকের উপর হওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর উঠিয়ে নেওয়া বা উঠানো (নীচ থেকে) উপরের দিকেই হয়।
إِلَيْهِ يَصْعَدُ তাঁর দিকেই উঠে: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দিকেই পবিত্র বাক্যসমূহ উন্নীত হয়; অন্য কারো দিকে নয়।
الْكَلِمُ الطَّيِّبُ পবিত্র বাক্যসমূহ: অর্থাৎ আল্লাহর যিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং দু'আ উদ্দেশ্য।
وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ সৎ আমল উহাকে উপরে উঠায়: অর্থাৎ উত্তম আমল বাক্যসমূহকে উপরে উঠায়। কেননা সৎ আমল ছাড়া পবিত্র বাক্য কবুল হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার যিকির করে, কিন্তু ফরয ইবাদাতগুলো সম্পাদন করে না, তার পবিত্র বাক্যসমূহ ফেরত দেয়া হয়।
ইয়াস বিন মুআবিয়া বলেন, আমলে সালেহ না থাকলে শুধু উত্তম বাক্য আকাশে উঠে না। হাসান বসরী ও কাতাদাহ বলেন, আমল ছাড়া শুধু মুখের কথা কবুল হয় না।
মোটকথা উপরের আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়ে যে, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির উপরে। কেননা উঠা বা উঠানো নীচ থেকে উপরের দিকেই হয়।
يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا হে হামান! আমার জন্য একটি সুউচ্চ ইমারত নির্মাণ করো: ফেরাউন তাঁর মন্ত্রী হামানকে এ কথা বলেছিল। ফেরাউন তাকে একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করার আদেশ করেছিল। সে বলেছিল, হে হামান! আমার জন্য একটি সুউচ্চ ও মজবুত প্রাসাদ নির্মাণ করো।
لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ যাতে আমি রাস্তা সমূহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি অর্থাৎ আসমানের দরজাসমূহ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারি।
فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى এর ইলাহকে উকি দিয়ে দেখতে পারি। فَأَطَّلِعَ ফেলে মুযারেটি فاء السببية এর পরে আসার কারণে উহ্য أن দ্বারা মানসুব হবে। এ কথার মাধ্যমে সে মুসাকে মিথ্যুক বলেছিল। অর্থাৎ ফেরাউনের কথার অর্থ হলো, মূসা যখন দাবী করলেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন অথবা তিনি যখন এই দাবী করলেন যে, আকাশে তার মাবুদ রয়েছেন, তখন ফেরাউন তাঁর কথাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا এবং বলেছিল আমি মূসা কে মিথাবাদী বলেই মনে করি অর্থাৎ সে যেই রেসালাতের দাবী করছে অথবা আকাশে তার ইলাহ (মাবুদ) থাকার যেই দাবী করছে, আমি তার দাবীতে তাকে মিথ্যুক মনে করছি।
এ আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সৃষ্টির উপর। মূসা ফেরাউনকে এই সংবাদই দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আসমানের উপর। ফেরাউন তাঁকে এই কথায় মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল। এখান থেকে আরো প্রমাণিত হলো যে, পূর্বের নাবীগণও তাদের উম্মাতদেরকে বলেছিলেন যে, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে।
أَأَمِنتُمْ তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছো? আল্লাহ তা'আলা কাফেরদেরকে ধমক দিয়ে বলছেন, তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছো? নিরাপত্তা হচ্ছে ভয়ের বিপরীত।
مِّن في السَّمَاءِ যিনি আসমানে আছেন। অর্থাৎ যিনি আসমানে আছেন, তোমরা কি তাঁর শাস্তি হতে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করছো? আসমানে যিনি আছেন, তিনি হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা।
এখানে فِي السَّمَاءِ আসমানে আছেন অর্থ عَلَى السَّمَاءِ আসমানের উপরে আছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন:
وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ "আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের মধ্যে শুলিবিদ্ধ করবো"।
এখানেও এ হারফে জারটি عَلَى অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের উপর ক্রশবিদ্ধ করবো।
উপরোক্ত আয়াতে fi হারফে জারটি তখনই عَلَى (উপরে) অর্থে ব্যবহৃত হবে, যখন আসমান দ্বারা আল্লাহর নির্মিত আসমান উদ্দেশ্য হবে। আর যদি السماء দ্বারা শুধু উপর উদ্দেশ্য হয়, তাহলেও fi হারফে জারটি ظرفية তথা স্থান বুঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হবে। তখন বাক্যটি এ রকম হবে, أأمنتم من في العلو অর্থাৎ যিনি উপরে আছেন, তোমরা কি তার শাস্তির ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গেছো?
أن يخسف بكم الأرض তিনি তোমাদের মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেবেন। যেমন ধসিয়ে দিয়েছিলেন কারুনকে।
فإذا هي تمور তখন যমীন অকস্মাৎ জোরে ঝাঁকুনি খেতে থাকবে এবং প্রকম্পিত হতে থাকবে।
أَمْ أَمِنْتُم مِّن فِي السَّمَاءِ أَن يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا আছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণ করবেন এ ব্যাপরেও কি তোমরা নির্ভয় হয়ে গিয়েছো? যেমন আল্লাহ তা'আলা লুত এর জাতি এবং হস্তী বাহিনীর উপর আসমান থেকে প্রস্তর বর্ষণ করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, তোমাদের উপর মেঘমালা পাঠাবেন। যাতে থাকবে পাথর। আবার কেউ কেউ বলেছেন, বাতাস পাঠাবেন। যাতে থাকবে পাথর।
فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِير তখন তোমরা জানতে পারবে আমার ভীতি প্রদর্শন কেমন? অর্থাৎ যখন তোমরা আযাব দেখতে পাবে, তখন জানতে পারবে আমার ভীতি প্রদর্শন কেমন? কিন্তু তখন এই জানা তোমাদের কোন উপকারে আসবে না।
উপরের দুই আয়াতে আল্লাহ তা'আলার জন্য সৃষ্টির علو (উপরে হওয়া) সাব্যস্ত করা হয়েছে। এখানে সুস্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আসমানের উপরে। সুতরাং শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই আয়াতগুলো আল্লাহ তা'আলার জন্য উলু (উপর) সাব্যস্ত করার জন্য উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতগুলো আল্লাহর পবিত্র সত্তা উপরে হওয়ার কথা প্রমাণ করে, যেমন ইতিপূর্বে অতিক্রান্ত অধ্যায়ের আয়াতগুলো সাব্যস্ত করেছে যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর।
استواء (আরশের উপর সমুন্নত হওয়া) এবং علو (উপরে হওয়া) এর মধ্যে পার্থক্য:
(১) علو তথা সৃষ্টির উপরে হওয়া আল্লাহর সত্তাগত বিশেষণ। অর্থাৎ এটি কখনো আল্লাহর সত্তা থেকে আলাদা হয় না এবং এটি তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত নয়। অপর দিকে استواء (উপরে উঠা, সমুন্নত হওয়া) আল্লাহর কর্মগত সিফাত, যা আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। সৃষ্টির উপরে হওয়া আল্লাহর স্থায়ী বিশেষণ। আর আরশের উপর আল্লাহ সমুন্নত হওয়া হচ্ছে তাঁর কর্মগত বিশেষণ। আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা করেন তখন স্বীয় ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাধ্যমে উপরে উঠেন বা বা আরশের উপর সমুন্নত হন। এই জন্যই আল্লাহ তা'আলা সমুন্নত হওয়ার ব্যাপারে বলেছেন استوی “অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন”। আর এই সমুন্নত হওয়া ছিল আসমান-যমীন সৃষ্টির পর।
(২) সৃষ্টির উপর হওয়া এমন একটি বিশেষণ, যা মানুষের বোধশক্তি, স্বভাব-প্রকৃতি ও কুরআন-সুন্নাহর দলীল দ্বারা প্রমাণিত। আর আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টি শুধু কুরআন ও হাদীসের দলীল দ্বারা প্রমাণিত; যা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও বোধশক্তি দ্বারা প্রমাণিত নয়।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন।

📄 আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন।


وقوله: {هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ} { مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ} وقوله: {لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا} {إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى} {إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ} {وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ} كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
আল্লাহ তা'আলা বলেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنْ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
"তিনিই আসমান-যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে এবং যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথেই আছেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন” (সূরা হাদীদ ৫৭:৪)। আল্লাহ আরো বলেন,
مَا يَكُونُ مِنْ نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
"তিন ব্যক্তির এমন কোনো পরামর্শ হয় না যাতে তিনি চতুর্থ হিসাবে না থাকেন এবং পাঁচ জনের হয় না, যাতে ষষ্ঠ না থাকেন। তাদের সংখ্যা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক, তারা যেখানেই থাকুক না কেন তিনি তাদের সাথেই, তারা যা করে তিনি কিয়ামাতের দিন তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত” (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
"তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, বিষন্ন হয়ো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন (সূরা তাওবা ৯:৪০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
"আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি” (সূরা তোহা ২০:৪৬)। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا وَالَّذِينَ هُمْ مُحْسِنُونَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে আছেন, যারা মুত্তাকী হয়েছে এবং যারা সৎকর্ম করে” (সূরা নাহল ১৬:১২৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَاصْبِرُوا ، إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"তোমরা সবরের পথ অবলম্বন করো, অবশ্যই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন” (সূরা আনফাল ৮:৪৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
كم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةٌ كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ
"আল্লাহর হুকুমে কতক ক্ষুদ্র দল অনেক বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন” (সূরা বাকারা ২:২৪৯)।
ব্যাখ্যা: প্রথম আয়াতের هو الذي থেকে শুরু করে وما يعرج فيها ব্যাখ্যা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
﴾ وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ ﴿ তিনি তোমাদের সাথেই, তোমরা যেখানেই থাক না কেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে তোমাদের সাথে আছেন, তোমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তোমরা যেখানে যে অবস্থাতেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের কাজ-কর্ম দেখছেন। তোমরা স্থলভাগে থাকাবস্থায় যা করো, জলভাগে থাকাকালে যা করো, রাতের অন্ধকারে যা করে থাকো, দিবাভাগে যা করো, গৃহাভ্যন্তরে যা করো এবং নির্জন মরুভূমিতে যা করো, তার সবই তিনি অবগত আছেন। তাঁর জ্ঞানে সবকিছুই সমান। অর্থাৎ তিনি সকল সৃষ্টির অবস্থা সম্পর্কে সমানভাবে অবগত আছেন। সবকিছুই তাঁর শ্রবণ ও দৃষ্টির অধীনে। তিনি তোমাদের কথা শ্রবণ করছেন এবং তোমাদের অবস্থান দেখছেন। আয়াতের এ স্থান থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন: তিনি তোমাদের আমল সম্পর্কে দৃষ্টি রাখেন। তোমাদের আমলের কোন কিছুই তাঁর নিকট গোপন নয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, مَا يَكُونُ مِن تَجْوَى ثَلَاثَةِ তিন ব্যক্তির এমন কোন পরামর্শ হয় না: পরামর্শ বলতে গোপন পরামর্শ উদ্দেশ্য। মোটকথা তিনজনের কোন পরামর্শ হয় না।
the fofa Dual Runicat إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ থাকেন এবং পাঁচ জনের হয় না, যাতে ষষ্ঠ না থাকেন: অর্থাৎ আল্লাহ তাঁকে এভাবে চারে পরিণত করে দেন এবং পাঁচজনের গোপন পরামর্শকে এভাবে ছয়জনের পরামর্শে পরিণত করেন যে, তিনি তাদের সেই গোপন পরামর্শে অংশ গ্রহণ করেন এবং তা জেনে ফেলেন। তিন এবং পাঁচ সংখ্যাদ্বয়কে নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করার কারণ হলো অধিকাংশ গোপন পরামর্শকারীর সংখ্যা তিন অথবা পাঁচজন হয়ে থাকে। অথবা আয়াতটি তিনজনের কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং পাঁচজনের অন্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাযিল হয়েছে।
অন্যথায় আল্লাহ তা'আলা কমবেশী প্রত্যেক সংখ্যার সাথে আছেন। এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ﴿ "তাদের সংখ্যা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক, তিনি তাদের সাথেই আছেন"। অর্থাৎ উল্লেখিত সংখ্যার কম হোক, যেমন একজন বা দুইজন এবং উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বেশী হোক, যেমন ছয়জন বা সাতজন। ইলমের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথেই আছেন। তারা গোপনে যেই পরামর্শ করে, আল্লাহ তা'আলা তা অবগত হন। ফলে সেই গোপন পরামর্শের কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।
তাফসীরকারগণ বলেন, ইহুদী এবং মুনাফেকরা গোপনে নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করতো। তারা এর মাধ্যমে মুমিনদের মধ্যে এই ধারণা ঢুকিয়ে দিত যে, তারা এমন বিষয়ে পরামর্শ করছে, মুমিনদের জন্য কষ্টদায়ক। এতে করে মুমিনরা চিন্তায় পড়ে যেত। এ বিষয়টি দীর্ঘ দিন চলতে থাকলে এবং তা বৃদ্ধি পেতে থাকলে তারা রসূল ﷺ কাছে অভিযোগ করল। তখন তিনি ইহুদী ও মুনাফেকদেরকে আদেশ দিলেন যে, তারা যেন মুসলিমদের বাদ দিয়ে গোপন বৈঠকে মিলিত না হয়। কিন্তু এতে তারা বিরত থাকল না বরং তারা বারবার গোপন পরামর্শ করতেই থাকল। তখন আল্লাহ তা'আলা উপরোক্ত আয়াতগুলো নাযিল করলেন।
أَيْنَ مَا كَانُوا তারা যেখানেই থাকে না কেন: এর অর্থ হচ্ছে যে স্থানেই তাদের গোপন পরামর্শ হয়, আল্লাহ তা'আলা স্বীয় ইলমের মাধ্যমে তা পরিবেষ্টন করে নেন।
ثُمَّ يُنَبِّئُهُم অতঃপর তিনি সংবাদ দিবেন।
بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ কিয়ামাতের দিন তাদের আমল সম্পর্কে: তাদেরকে সে অনুযায়ী বদলা দিবেন। এর মাধ্যমে তাদেরকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং ধমক দেয়া হয়েছে।
إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক বিষয়ে পরিজ্ঞাত। তাঁর কাছে কোন কিছুই গোপন নয়।
এ আয়াত থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির সাথে আছেন। এটি হচ্ছে সাধারণ বা সার্বজনীন সাথে থাকা। এ অর্থে তিনি সকল সৃষ্টির সাথেই রয়েছেন। এ প্রকার সাথে থাকার অত্যাবশ্যকীয় দাবী হচ্ছে, তিনি ক্ষমতার মাধ্যমে এবং ইলমের মাধ্যমে সবকিছুকে ঘিরে আছেন। তিনি সকলের সব অবস্থা ও আমল সম্পর্কে অবগত আছেন। এ জন্যই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বলেছেন, এ আয়াতটি আল্লাহর ইলমের মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং ইলমের মাধ্যমে শেষ হয়েছে।
لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا বিষন্ন হয়ো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন: হিজরতের পথে নাবী এবং আবু বকর যখন গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর সাথী আবু বকর কে এই কথা বলেছিলেন। মক্কার মুশরিকরা তাদের নিকটে চলে এসেছিল। আবু বকর তখন নাবী উপর কাফেরদের কষ্টের ভয় করছিলেন। তিনি তখন আবু বকর কে বলেছিলেন, তুমি বিষন্ন হয়ো না। অর্থাৎ তুমি দুঃশ্চিন্তা পরিহার করো।
إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا আল্লাহ তা'আলা আমাদের সাথে রয়েছেন: অর্থাৎ তাঁর সাহায্য, সমর্থন ও শক্তি আমাদের সাথে রয়েছে। সুতরাং যার সাথে আল্লাহ রয়েছেন, সে কখনো পরাজিত হবে না। আর যাকে পরাজিত করা সম্ভব হবে না, তার চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই।
উপরের আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, তাতে মুমিনদের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ সান্নিধ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। এহেন সাথে থাকার দাবী হচ্ছে মুমিনদেরকে সাহায্য, হেফাজত ও শক্তিশালী করা।
আল্লাহ তা'আলা মুসা ও হারুনকে বলেছেন:
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى আমি তোমাদের সাথে আছি, সবকিছু শুনছি ও দেখছি: সুতরাং ফেরাউনকে ভয় করো না। ভয় করতে নিষেধ করার কারণ হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী: إنني معكما "নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি"। অর্থাৎ তোমাদের উভয়কে ফেরাউনের বিরুদ্ধে সাহায্য করার মাধ্যমে আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি তোমাদের উভয়ের এবং ফেরাউনের কথা শুনছি। তোমাদের উভয়ের অবস্থান এবং ফেরাউনের অবস্থান দেখছি। তোমাদের কারো কোন অবস্থা আমার কাছে গোপন নয়।
এ আয়াত থেকেও দলীল পাওয়া যাচ্ছে যে, আল্লাহর অলীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার এক বিশেষ সান্নিধ্য রয়েছে। এটি হচ্ছে সাহায্য, সমর্থন ও শক্তিশালী করার সান্নিধ্য। সেই সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য শ্রবণ ও দৃষ্টি সাব্যস্ত করা হয়েছে।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন: অর্থাৎ যারা হারাম ও সকল প্রকার গুনাহর কাজ ছেড়ে দেয় এবং ইখলাসের সাথে সৎকর্ম সম্পাদন করে, আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে রয়েছেন।
وَالَّذِينَ هُم مُّحْسَنُونَ যারা সৎকর্ম করে (সূরা নাহল ১৬:১২৮): অর্থাৎ যারা আনুগত্যের কাজগুলো সঠিকভাবে আদায় করে এবং আল্লাহর আদেশগুলো পালন করে, সহযোগিতা ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাদের সান্নিধ্যেই আছেন। এটি হচ্ছে বিশেষ এক প্রকার সান্নিধ্য। আয়াতে কারীমা থেকে গ্রন্থকার এটিই সাব্যস্ত করেছেন।
وَاصْبَرُوا তোমরা সবরের পথ অবলম্বন করো: আল্লাহ তা'আলা এখানে সবরের আদেশ দিয়েছেন। সবরের আসল অর্থ হচ্ছে নফসকে আটকিয়ে রাখা। তবে এখানে সবর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কাফের ও মুসলিমদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধকালে সবর করা ও দৃঢ়পদ থাকা।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ অবশ্যই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন: অতঃপর সবরের এ আদেশ করার কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সবরকারীদের সাথে আছেন। সুতরাং যেসব কাজে সবর করা দরকার, আল্লাহ তা'আলা ঐসব কাজে সবরকারীদের সাথে আছেন।
এ আয়াতে কারীমা থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, এখানে ঐ সকল সবরকারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলার বিশেষ সান্নিধ্য রয়েছে, যারা আনুগত্যের কাজে সবর করে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।
ইমাম শাওকানী বলেন, কতই না সুন্দর এ সান্নিধ্য! যাকে এটি দান করা হয়েছে, কোন শক্তি বা ব্যক্তিই তাকে পরাজিত করতে পারবে না। কোন দিক থেকেই তার উপর চড়াও হওয়া যাবে না। যদিও শত্রু বাহিনী হয় অগণিত।
كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ দল অনেক বিরাট দলকে পরাজিত করেছে: অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছা ও ফায়সালা অনুযায়ী অনেক ছোট দল অনেক বড় দলকে পরাজিত করেছে।
وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন: এ অংশ থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সময় সবর করে, তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। এটি হচ্ছে বিশেষ সান্নিধ্য। যার দাবী হচ্ছে সাহায্য ও শক্তিশালী করা।
উপরের সবগুলো আয়াতের অভিন্ন শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তাতে আল্লাহর সান্নিধ্য সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এ সান্নিধ্য দুই প্রকার।
প্রথম: সাধারণ ও ব্যাপক সান্নিধ্য। যেমন বলা হয়েছে প্রথম দুই আয়াতে। এই প্রকার সান্নিধ্যের তাৎপর্য হলো আল্লাহ তা'আলা ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টিকে ঘিরে আছেন। সমস্ত মানুষের ভাল-মন্দ সব আমল সম্পর্কেই তিনি অবগত আছেন এবং তাদেরকে আমল অনুযায়ী বিনিময়ও দিবেন।
দ্বিতীয়: আল্লাহর মুমিন বান্দাদের জন্য রয়েছে এক বিশেষ সান্নিধ্য। এই প্রকার সান্নিধ্যের দাবী হচ্ছে মুমিন বান্দাদেরকে সাহায্য করা, শত্রুর মোকাবেলায় তাদেরকে শক্তিশালী করা এবং তাদেরকে হেফাযত করা। সম্মানিত লেখক এই অধ্যায়ে যেসব আয়াত উল্লেখ করেছেন, তার মধ্য হতে শেষের পাঁচটি আয়াতে এই প্রকার সান্নিধ্যের কথাই প্রমাণ করে। আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সান্নিধ্যে থাকা সৃষ্টির উপরে থাকা এবং আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার পরিপন্থী নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটে ও সান্নিধ্যে থাকা এক মাখলুক অন্য মাখলুকের সাথে থাকার মত নয়। কেননা,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ "তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা"।
কেননা সান্নিধ্য সাধারণত কাছে থাকার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। পরস্পর স্পর্শ করা কিংবা পরস্পর সমান হওয়া জরুরী নয়। আরবরা বলে থাকে, مازلنا نمشى والقمر معنا (আমরা চলছিলাম। চলন্ত অবস্থায় চন্দ্র আমাদের সাথেই ছিল। অথচ চন্দ্র তাদের মাথার অনেক উপরে এবং তাদের মাঝে এবং চন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব অনেক। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে হওয়া এবং তাদের সান্নিধ্যে হওয়ার পরিপন্থী নয়। সামনে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা হবে। ইনশা-আল্লাহ。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00