📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ক্ষমা, রহমত, মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রসঙ্গ।
وقوله تعالى: { إن تُبْدُواْ خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَن سُوَءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا} {وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} وقوله: {وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ} وقوله عن إبليس: {فَبِعِزَّتِكَ لأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: إن تُبْدُوا خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَن سُوءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا “তোমরা যদি প্রকাশ্যে ও গোপনে সৎকাজ করে যাও অথবা যদি কারো মন্দ ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো, তাহলে আল্লাহ বড়ই ক্ষমাকারী ও ক্ষমতাবান”। (সূরা নিসা ৪:১৪৯) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ “তাদের উচিৎ ক্ষমা করা ও তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াকারী”। (সূরা নূর ২৪: ২২) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَّسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَ عَلْمُونَ এরা (মুনাফেকরা) বলে, আমরা মদীনায় ফিরে যেতে পারলে মর্যাদাবান লোকেরা অপদস্ত লোকদেরকে সেখান থেকে বের করে দেবে। অথচ সম্মান ও মর্যাদা তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফেকরা তা জানে না (সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৮)। আল্লাহ তা'আলা ইবলীস সম্পর্কে বলেন:
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ﴾
"সে (ইবলীস) বললো, তোমার ইজ্জতের কসম, আমি এদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবোই (সূরা সোয়াদ ৩৮:৮২-৮৩)।
ব্যাখ্যা: إِن تُبْدُوا خَيْرًا তোমরা যদি প্রকাশ্যে সৎকাজ করে যাও: অর্থাৎ তোমাদের সৎকর্মগুলোকে মানুষের জন্য প্রকাশ করো।
أَوْ تُخْفُوهُ অথবা গোপনে সৎকাজ করে যাও: অর্থাৎ যদি গোপনে সৎকাজ করতে থাকো।
أَوْ تَعْفُوا عَن سُوء অথবা যদি কারো মন্দ ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো: অর্থাৎ যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করল কিংবা অন্য কোনভাবে কষ্ট দিল, তা যদি তোমরা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো, তাহলে জেনে রাখো,
فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوا قَدِيرًا নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা বড়ই ক্ষমা গুণের অধিকারী অথচ তিনি শাস্তি দেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন: তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন এবং তাদেরকে মাফ করে দেন। অথচ তারা নিজ হাতে যে অন্যায় কাজ করে, তার কারণে তিনি শাস্তি দিতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। সুতরাং হে মুসলিমগণ! তোমরাও আল্লাহ তা'আলার গুণে গুণান্বিত হও। কেননা তিনি শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেন। সুতরাং তোমাদেরও তাই করা উচিৎ।
وَلْيَعْفُوا তাদের উচিৎ ক্ষমা করা: অর্থাৎ আয়াতের প্রথম দিকে সম্মান ও ফাযীলাতের অধিকারী যেসব মুমিনের আলোচনা করা হয়েছে, তাদের উচিৎ মানুষের অপরাধ ঢেকে রাখা এবং ক্ষমা করে দেয়া।
وَلْيَصْفَحُوا তাদের উচিৎ দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা: সম্মান ও ফাযীলাতের অধিকারীদের উচিৎ দোষ-ত্রুটি ও অপরাধে লিপ্তদের এড়িয়ে চলা এবং তাদের থেকে চোখ বন্ধ করে রাখা। ১৭
আল্লাহ তা'আলা বলেন: أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? তোমরা কি চাওনা যে, তোমাদের ক্ষমার কারণে এবং যারা তোমাদের সাথে খারাপ আচরণ করে, তাদের থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে নেয়ার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন? দয়াবান। وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং প্রচুর
وَلِلهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ সম্মান-মর্যাদা ও শক্তি তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনদের জন্য: এখানে ঐসব মুনাফেকদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা মনে করেছিল মুমিনদের উপর কেবল তাদেরই রয়েছে শক্তি ও সম্মান-মর্যাদা। العزة শব্দের অর্থ শক্তি ও বিজয়। শক্তি ও বিজয় কেবল আল্লাহ তা'আলার জন্য এবং তাঁর রসূল ও তাঁর সৎ বান্দাদের মধ্য হতে যাদেরকে দান করেছেন, কেবল তাদের জন্যই। তারা ব্যতীত অন্য কারো জন্য নয়।
আল্লাহ তা'আলা ইবলীস সম্পর্কে বলেন যে, সে বলেছে: فَبْعِزَّتِكَ তোমার ইজ্জতের কসম: অর্থাৎ ইবলীস আল্লাহ তা'আলার ইয্যতের শপথ করে বলেছে।
لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ আমি এদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবোই: সে বনী আদমের সামনে প্রবৃত্তির কাম্য বস্তুগুলোকে সুসজ্জিত করে দিয়ে এবং তাদের মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়ে তাদেরকে গোমরাহ না করে ছাড়বো না। এর ফলে তারা সকলেই গোমরাহ হয়ে যাবে। অতঃপর ইবলীস যখন জানতে পারলো যে, কাফের ও পাপিষ্ঠদের মধ্য হতে যারা তার অনুসারী তার চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র শুধু তাদের মধ্যেই সফল হবে, তখন তার কথার মধ্যে স্বতন্ত্র বক্তব্য প্রয়োগ করল। অর্থাৎ আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে গোমরাহীর আওতামুক্ত করে বললেন: إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ তবে একমাত্র তোমার একনিষ্ঠ বান্দাগণ ছাড়া।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ হয় যে আল্লাহ তা'আলার জন্য মাফ করা, ক্ষমা করা, রহম করা, ক্ষমতা বিশেষণ রয়েছে। আল্লাহর মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য যেভাবে শোভনীয় ঠিক সেভাবেই এই বিশেষণগুলো সাব্যস্ত করতে হবে。
টিকাঃ
১৭. মূলতঃ এখানে এমন দোষ-ত্রুটি ও অপরাধ গোপন রাখা ও ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যা গোপন রাখলে ও ক্ষমা করে দিলে তেমন কোন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে অপরাধ যদি মারাত্যক হয় এবং যা গোপন রাখলে ও শাস্তি না দিলে সমাজে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে সমাজ থেকে অন্যায় কাজের মূলোৎপাটন করার জন্য তাতে অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। (আল্লাহই অধিক জানেন)
📄 আল্লাহ তা‘আলার জন্য নাম সাব্যস্ত করা এবং কেউ তাঁর সাদৃশ্য হওয়া অস্বীকার করা।
وقوله: {تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلالِ وَالإِكْرَام } وقوله: {فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا } { وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ} {فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ} {وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: ۞تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ ذِي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ ۞ "তোমার রবের নাম বরকত সম্পন্ন, যিনি বড়ত্ব ও সম্মানের অধিকারী"। (সূরা আর রাহমান ৫৫:৭৮) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: ۞فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ ، هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا۞
"কাজেই তুমি তার ইবাদাত করো এবং তার ইবাদতের উপর অবিচল থাকো। তোমার জানা মতে তাঁর সমকক্ষ কোন সত্তা আছে কি? (সূরা মারইয়াম ১৯:৬৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: ۞وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ۞
"এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই”। (সূরা ইখলাস ১১২:৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: ۞فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ۞
"অতএব জেনে-বুঝে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক ও সমকক্ষ নির্ধারণ করো না” (সূরা বাকারা ২:২২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ
“মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে আল্লাহর অংশীদার বা সমতুল্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালোবাসার মতই তাদেরকে ভালবাসে। অথচ ঈমানদাররা সবচেয়ে বেশী আল্লাহকেই ভালোবাসে” (সূরা বাকারা ২:১৬৫)।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ﴾ “তোমার রবের নাম বরকত সম্পন্ন। البركة শব্দের আভিধানিক অর্থ বড় হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। আর কারো জন্য বরকতের দু'আ করাকে تبريك বলা হয়। সেই হিসাবে ﴿تَبَارَكَ اسْمُ رَبِّكَ﴾ অর্থ হলো, তোমার রবের মর্যাদা মহান ও সমুন্নত হয়েছে। تبارك শব্দটি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য ব্যবহৃত হয় না।
যে আয়াতগুলোতে আল্লাহর জন্য চেহারা সাব্যস্ত করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যার সাথে ﴿ذُو الْجَلال والإكرام﴾ এর ব্যাখ্যা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
﴿فَاعْبُدْهُ﴾ কাজেই তুমি তার ইবাদাত করো: অর্থাৎ এককভাবে তাঁর ইবাদাত করো। তাঁর ইবাদতের সাথে অন্য কারো ইবাদাত করো না। العبادة শব্দের আভিধানিক অর্থ নত ও বিনয়ী হওয়া।
আর শারীয়াতের পরিভাষায় ﴿العبادة اسم جامع لما يحبه الله ويرضاه من الأعمال والأقوال الظاهرة والباطة﴾ অর্থাৎ মানুষের এমন সব প্রকাশ্য, অপ্রকাশ্য কথা ও কাজের নাম ইবাদাত, যেগুলোকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন এবং পছন্দ করেন।
وَاصْطَبَرْ لِعِبَادَتِهِ তার ইবাদতের উপর অবিচল থাকো: অর্থাৎ তাঁর ইবাদতের উপর সুদৃঢ় থাকো, সবসময় উহা সম্পাদন করতে থাকো এবং এবাদতের পথে যেসব কষ্ট আসে, তাতে ধৈর্য ধারণ করো।
هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا তোমার জানা মতে তাঁর সমকক্ষ কোন সত্তা আছে কি? এটি হচ্ছে ইস্তেফহামে ইনকারী (অস্বীকার প্রশ্নবোধক প্রশ্নের) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার এমন কোন সদৃশ ও সমক্ষক নেই, যে তাঁর এবাদতে শরীক হতে পারে।
وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٍ এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই: আরবদের ভাষায় সমতুল্য বস্তুকে الكفء বলা হয়। অর্থাৎ সৃষ্টিজগতে আল্লাহ তা'আলার কোন সমতুল্য, সমকক্ষ, সদৃশ এবং শরীক নেই।
فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক ও সমকক্ষ নির্ধারণ করো না। শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অনুরূপ, সদৃশ ও সমতুল্য। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর জন্য এমনসব সমকক্ষ ও সমতুল্য নির্ধারণ করো না, যাদেরকে তোমরা আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে শরীক করবে এবং ভালবাসা ও সম্মানের ক্ষেত্রে তাদেরকেও আল্লাহ তা'আলার সমান করে ফেলবে।
وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ তোমরা জেনে-বুঝে: বিশেষ করে যখন তোমরা জানতে পারলে যে, একমাত্র আল্লাহই তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তী সকল মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং অন্যান্য সকল জিনিসের সৃষ্টিকর্তা। এক কথায় বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলার এমন কোন সমকক্ষ নেই, যে সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে আল্লাহর শরীক হতে পারে।
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا আছে, যারা আল্লাহর সাথে অন্যদেরকে আল্লাহর অংশীদার বা সমতুল্য হিসেবে গ্রহণ করে: এ আয়াতের পূর্বের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা তাঁর একত্বের অনেকগুলো দলীল উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারা ১৬৪ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَالْفُلْكِ الَّتِي تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِمَا يَنفَعُ النَّاسَ وَمَا أَنزَلَ اللَّهُ مِنَ السَّمَاءِ مِن مَّاءٍ فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَبَثَّ فِيهَا مِن كُلِّ دَابَّةٍ وَتَصْرِيفِ الرِّيَاحِ وَالسَّحَابِ الْمُسَخَّرِ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
"আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবা-রাত্রির অনবরত আবর্তনে, মানুষের উপকারী সামগ্রী নিয়ে সাগরে চলমান জলযানসমূহে, বৃষ্টিধারার মধ্যে, আল্লাহ যা উপর থেকে বর্ষণ করেন, অতঃপর তার মাধ্যমে মৃত ভূমিকে জীবন দান করার মধ্যে, পৃথিবীতে সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়ার মধ্যে, আর বায়ুর প্রবাহে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালার মধ্যে বিবেকবানদের জন্য অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে"।
আল্লাহ তা'আলা উপরোক্ত আয়াতে একত্বের এ নিদর্শন ও দলীল-প্রমাণ বর্ণনা করার পর সংবাদ দিয়েছেন যে, আল্লাহর বিরাট শক্তি, মহান ক্ষমতা এবং একাই সকল মাখলুক সৃষ্টি করার এ উজ্জ্বল প্রমাণ বিদ্যমান থাকার পরও মানুষের মধ্যে এমন লোকও দেখা যাচ্ছে, যারা অক্ষম-অপারগ মূর্তিগুলোকে তাঁর সমকক্ষ নির্ধারণ করে এবং সেগুলোর ইবাদাত করে।
يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ الله আল্লাহকে ভালবাসার মতই তারা তাদেরকে ভালবাসে: অর্থাৎ ই কাফিররা এ মূর্তিগুলোর ইবাদাত করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা এগুলোকে অত্যন্ত ভালবাসে। মূর্তিগুলোর প্রতি ভালবাসায় তারা এত বাড়াবাড়ি করেছে যে, তারা এগুলোকে আল্লাহর ভালবাসার মতই ভালবাসতে শুরু করেছে। তারা ভালবাসার ক্ষেত্রে তাদেরকে আল্লাহর সমান করে ফেলেছে। অথচ সৃষ্টি করা, রিযিক দান করা এবং সৃষ্টির কার্যাদি পরিচালনা করার মধ্যে তারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক নির্ধারণ করেনি। উপরোক্ত আয়াতগুলোতে আল্লাহর জন্য অতি সুন্দর নাম, তাঁর বড়ত্ব ও সম্মান সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই সাথে আল্লাহর সমতুল্য, সমকক্ষ এবং শরীক থাকার কথাও অস্বীকার করা হয়েছে। যেসব বিষয় আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা শোভনীয় নয়, সেগুলো গৌণ এবং সংক্ষিপ্ত আকারে অস্বীকার করার পদ্ধতিই কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত হয়েছে।
📄 আল্লাহ তা‘আলার কোন শরীক নেই।
{وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا } {يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} { تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا} {مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ} {فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} {قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا
"আর বলো, সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি। তাঁর সার্বভৌমত্বে কোনো অংশীদার নেই। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোনো সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর যথাযথ বড়ত্ব বর্ণনা করো” (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১১১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছে। একচ্ছত্র সাম্রাজ্য তাঁরই এবং তাঁরই জন্য সকল প্রশংসা। তিনিই সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান” (সূরা তাগাবুন ৬৪:১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا * الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
"যিনি (আল্লাহ) তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন, তিনি বড়ই বরকত সম্পন্ন, যাতে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হন। তিনিই আল্লাহ, যিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক, যিনি কাউকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন নি, যার রাজত্বে তাঁর কোন শরীক নেই এবং যিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তার একটি তাকদীর নির্ধারণ করে দিয়েছেন” (সূরা ফুরকান ২৫:১-২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ * عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ
"আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন মাবুদও নেই। আল্লাহর সাথে যদি আর কোন মাবুদ থাকতো তাহলে প্রত্যেক মাবুদ নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেতো এবং একজন অন্যজনের উপর চড়াও হতো। এরা যেসব কথা তৈরী করে তা থেকে আল্লাহ পাক-পবিত্র। প্রকাশ্য ও গুপ্ত সবকিছুই তিনি জানেন। এরা আল্লাহর জন্য যে শরীক নির্ধারণ করে, তিনি তার অনেক উর্ধ্বে” (সূরা মুমিনুন ২৩:৯১-৯২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "কাজেই আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করো না। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না” (সূরা নাহাল ১৬:৭৪)। আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
(قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنزِلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ "তুমি বলে দাও, আমার প্রতিপালক কেবল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন এবং হারাম করেছেন গুনাহ্, অন্যায় বাড়াবাড়ি, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, যার কোন দলীল-প্রমাণ তিনি অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা বলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, যা তোমরা জানো না” (সূরা আরাফ ৭:৩৩)।
ব্যাখ্যা: وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ বলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য: প্রশংসাকে হামদ বলা হয়। الحمد এর মধ্যে যেই Ji রয়েছে উহা ইস্তেগরাকের জন্য। অর্থাৎ এ কথা বুঝনোর জন্য যে, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি: অর্থাৎ তাঁর কোন সন্তান নেই। যেমন ধারণা করে থাকে ইহুদী, খৃষ্টান এবং আরবের কতিপয় মুশরিক।
وَلَم يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ তাঁর বাদশাহীতে কোন শরীক নেই: অর্থাৎ তাঁর রাজত্বে ও প্রভুত্বে অংশীদার নেই। যেমন ধারণা করে থাকে অগ্নিপূজক এবং তাদের অনুরূপ সম্প্রদায়। তারা একাধিক মাবুদে বিশ্বাসী।
وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ নন যে, তাঁর কোন সাহায্যকারীর প্রয়োজন হয়: অর্থাৎ তিনি এমন দুর্বল নন, যাতে তার কোন সাহায্যকারী কিংবা কোন মন্ত্রী অথবা কোন পরামর্শদাতার দরকার হয়। সুতরাং তিনি কারো সাথে বন্ধুত্ব রচনা করেন নি এবং কারো সাহায্যও গ্রহণ করেন নি।
وَكَبَرَّهُ تَكْبِيرًا আর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করো, চূড়ান্ত পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব: যালেমরা যা বলে, তা থেকে আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্ব ঘোষণা করো।
يُسَبِّحُ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ আছে তার সবই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করছে: আল্লাহর আসমান ও যমীনে যত মাখলুক রয়েছে, তারা সকলেই সব দোষ-ত্রুটি হতে আল্লাহর তাসবীহ বা পবিত্রতা বর্ণনা করছে।
لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সকল প্রশংসাও তাঁর জন্য: এ দু'টিতে অন্য কারো কোন অংশ নেই। তাঁর বান্দারা পৃথিবীর রাজত্বের যেই অংশ লাভ করে থাকে, তা আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দান করেন বলেই লাভ করে থাকে। তা মূলতঃ আল্লাহর রাজত্বেরই অংশবিশেষ।
وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ তিনি সবকিছুর উপরই ক্ষমতাবান: কোন কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না।
البركة শব্দটি (فعل ماضي ) অতীতকালের অর্থবোধক ক্রিয়া)। এটি تبارك থেকে গৃহীত। কল্যাণের প্রাচুর্য, বৃদ্ধি, সুদৃঢ় ও স্থায়ী হওয়াকে البركة (বরকত) বলা হয়। تبارك শব্দটি শুধু আল্লাহ তা'আলার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং শুধু অতীত কালের শব্দ দ্বারাই ব্যবহৃত হয়।
الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ তিনি তার বান্দার উপর ফুরকান নাযিল করেছেন: এখানে কুরআনকে ফুরকান হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা তা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করে দেয়।
عَلَى عَبْدِهِ বান্দার উপর: এখানে বান্দা বলতে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্য। আল্লাহর বান্দা হওয়া একটি প্রশংসনীয় বিশেষণ। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাকে নিজের দিকে ইযাফত (সম্বন্ধিত) করেছেন। এটি হচ্ছে তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ করার সাথে সাথে সম্মান ও মর্যাদার সম্বন্ধ।
لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ যাতে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য: তিনি সমস্ত জিন ও মানুষের জন্য। এটি হচ্ছে নাবী এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
نذيرا শব্দটি الإنذار ক্রিয়ামূল থেকে منذر অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ভয়ের কারণগুলো সম্পর্কে জানিয়ে দেয়াকে إنذار বলা হয়। ليكون (যাতে তিনি হতে পারেন), এ বাক্যটি মুহাম্মাদ এর উপর ফুরকান অবতীর্ণ করার কারণ। অর্থাৎ যাতে করে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বিশ্বজনীন রিসালাতের মাধ্যমে সম্মানিত করতে পারেন।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সত্তাকে চারটি গুণের মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন।
প্রথম গুণ: الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ তিনি পৃথিবী ও আকাশের রাজত্বের মালিক: তিনি একাই আসমান-যমীনের সকল বিষয়ের মালিক এবং এতদুভয়ের সবকিছু পরিচালনাকারী।
দ্বিতীয় গুণ: وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا তিনি কাউকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেননি: যেমন ইহুদী, খৃষ্টান এবং আরবের মুশরেকরা ধারণা করতো। আল্লাহ যেহেতু স্বয়ং সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী এবং সমস্ত মাখলুক তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী। কারো প্রতি তাঁর প্রয়োজন নেই বলেই তিনি কাউকে সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেননি।
তৃতীয় গুণ: وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكَ فِي الْمُلْكِ তাঁর রাজত্বে কোন শরীক নেই: এতে মূর্তিপূজক, অগ্নিপূজক এবং তাদের অনুরূপ আরো অনেক মুশরেক সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ করা হয়েছে।
চতুর্থ গুণ: وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন: যত মাখলুক রয়েছে, তার সবগুলোই তিনি সৃষ্টি করেছেন। বান্দাদের কর্মগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। বান্দাদের কর্মগুলো আল্লাহর সৃষ্টি। বান্দারা তা সম্পাদন ও বাস্তবায়ন করে। অতঃপর তার জন্য একটি তাকদীর নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য বয়স নির্ধারণ করেছেন এবং তার রিযিক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সে সৌভাগ্যবান হবে? না হতভাগ্য হবে? তাও তিনি অবগত আছেন। তিনি প্রত্যেক বস্তুকে যথাযথভাবেই প্রস্তুত করেছেন।
ইমাম ইবনে কাছীর এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর নিজের সত্তাকে সন্তান গ্রহণ করা থেকে পবিত্র করেছেন এবং তাঁর কোন শরীক নেই বলেও ঘোষণা করেছেন। অতঃপর তিনি সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত সব বস্তুই তাঁর সৃষ্টি এবং তাঁর প্রতিপালনাধীন। তিনিই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা, প্রত্যেক বস্তুর প্রভু, সবকিছুর মালিক এবং সকলের মাবুদ। প্রত্যেক বস্তুই তাঁর ক্ষমতাধীন, তাঁরই পরিচালনাধীন, তাঁরই বশীভূত এবং তাঁরই তাকদীরের অধীনস্ত।
مَا اتَّخَذَ اللَّهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهِ পরিণত করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন মাবুদও নেই:
এ আয়াতেও আল্লাহ তা'আলা নিজের সত্তাকে সন্তান থেকে পবিত্র করেছেন। তাঁর রাজত্বে, পরিচলনায় এবং তাঁর এবাদতে কোন শরীক হওয়াকেও সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন। আল্লাহর সন্তান থাকার ধারণাকে এবং শরীক নির্ধারণ করার বিষয়কে জোরালোভাবে অস্বীকার করার জন্য উপরোক্ত আয়াতের দুই জায়গায় من হরফে জার ব্যবহার করা হয়েছে।
إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهِ بِمَا خَلَقَ থাকতো তাহলে প্রত্যেক মাবুদ নিজের সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেতো:
আয়াতের প্রথমাংশে বলা হয়েছে আল্লাহর কোন সন্তান নেই এবং তাঁর ইবাদতে কোন শরীক নেই। এটি হচ্ছে তার পক্ষে একটি বিরাট দলীল। অর্থাৎ যদি ধরে নেওয়া হয় যে, একাধিক মাবুদ রয়েছে, তাহলে প্রত্যেক মাবুদই নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো এবং দলাদলি ও ভাগাভাগির কারণে সৃষ্টিজগতের শান্তি-শৃংখলা নষ্ট হয়ে যেতো। বাস্তবে আমরা দেখছি যে, সৃষ্টিজগত পূর্ণ শৃঙ্খলার সাথেই রয়েছে এবং সুনিয়ন্ত্রিতভাবেই চলছে। তাতে একাধিক মাবুদ দেখা যায়নি এবং মাবুদদের দলাদলিও সৃষ্টি হয়নি।
وَلَعَلَا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ এবং একজন অন্যজনের উপর চড়াও হতো: অর্থাৎ আল্লাহর সাথে যদি আরেকজন মাবুদ থাকতো, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই অন্যের বিরোধীতা করতো। ফলে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের মতই একজন অন্যজনের উপর জয়লাভ করতো। ফলে যে পরাজিত এবং দুর্বল প্রমাণিত হতো, সে ইলাহ (মাবুদ) হওয়ার যোগ্যতা হারাতো। সুতরাং যখন সমপর্যায়ের একাধিক মাবুদ থাকার বিষয়টি বাতিল সাব্যস্ত হলো, তখন সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, মাবুদ মাত্র এক। তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ। তিনি এক ও অদ্বিতীয়।
এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ যেসব কথা তৈরী করে তা থেকে আল্লাহ তা'আলা পাক-পবিত্র: অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার জন্য যেই শরীক ও সন্তান নির্ধারণ করে থাকে, তা থেকে আল্লাহ তা'আলা পবিত্র।
عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ অর্থাৎ যেসব বিষয় বান্দাদের অদৃশ্য এবং বান্দারা যা জানে না, কেবল তিনিই তা জানেন। বান্দারা যা দেখে ও জানে, তিনি তাও জানেন। সুতরাং আল্লাহ ব্যতীত অন্যরা যদিও তাদের সামনে দৃশ্যমান বস্তুগুলো সম্পর্কে জানতে পারে, কিন্তু তারা গায়েবের খবর জানে না। সুতরাং এরা আল্লাহর জন্য যে শরীক নির্ধারণ করে, তিনি তার অনেক উর্ধ্বে।
فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ কাজেই আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করো না: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর জন্য উদাহরণ ও দৃষ্টান্ত পেশ করতে নিষেধ করেছেন। এক অবস্থাকে অন্য অবস্থার সাথে তুলনা করার নাম ضرب المثل তথা উপমা পেশ করা। আরবের মুশরেকরা বলতো, আমরা শুধু এক আল্লাহর ইবাদাত করবো, এর প্রতি আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং আল্লাহর এবং আমাদের মাঝে মাধ্যম স্থাপন করার প্রয়োজন রয়েছে। তাই তারা বহু সংখ্যক মূর্তি এবং অন্যান্য বস্তুকে আল্লাহ এবং তাদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী বানাতো। আল্লাহ তা'আলাকে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহদের সাথে তুলনা করেই তারা এই কাজ করতো। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এই কাজ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা আল্লাহর সদৃশ কেউ নেই। সুতরাং আল্লাহর জন্য উপমা পেশ করা চলে না এবং তাঁর সাথে কোন সৃষ্টির তুলনাও চলে না। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সম্পর্কে ভাল করেই জানেন যে, তাঁর অনুরূপ সত্তা আর কেউ নেই।
إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ আল্লাহ তা'আলা তাঁর পবিত্র সত্তা সম্পর্কে যা জানেন, তোমরা তা জানো না। সুতরাং তোমাদের এই কাজ তথা আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত এবং উপমা পেশ করা তোমাদের ভ্রান্ত ধারণা এবং বাতিল কল্পনা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। সেই সাথে মূর্তিগুলোকে আল্লাহর সাথে তুলনা করা এবং সেগুলোর ইবাদাত করার ভয়াবহ ও মন্দ পরিণাম সম্পর্কেও তোমরা অবগত নও।
فُلْ তুমি বলে দাও: এখানে নাবী কে সম্বোধন করা হয়েছে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম এবং নাবী আল্লাহর পক্ষ হতে মুবাল্লিগ (দাঈ ও প্রচারক)। إِلَّا এটি সীমিত কারক অব্যয়।
حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ “আমার প্রতিপালক অশ্লীল কাজসমূহ হারাম করেছেন: অর্থাৎ অশ্লীল বিষয়সমূহকে হারাম হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। الفواحش শব্দটি فاحشة-এর বহুবচন। যেই পাপাচার অত্যন্ত নিকৃষ্ট, তাকে ফাহেশা বলা হয়।
مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য: অর্থাৎ ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে যেই অপরাধ করা হয় এবং যা গোপনে করা হয় এই উভয় প্রকার গুনাহকেই আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন।
والإثم )পাপাচার) প্রত্যেক এমন অপরাধকে বলা হয়, যাতে গুনাহ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন: শুধু মদ পান করাকে বলা হয়।
وَالْبَعْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ অন্যায় বাড়াবাড়ি: অর্থাৎ সীমাহীন যুলুম করা এবং মানুষের উপর অত্যাচার করা তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে।
وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللهِ আল্লাহ্র সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা: অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে তোমরা কোন শরীক সাব্যস্ত করো না।
مَا لَمْ يُزِلْ بِهِ سُلْطَانًا যার কোন প্রমাণ আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেননি: আয়াতের এ অংশ থেকেই শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া দলীল গ্রহণ করেছেন।
وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ তোমাদের উপর হারাম করেছেন, যা তোমরা জানো না:
আল্লাহর ব্যাপারে বানোয়াট ও মিথ্যা কথা বলা। যেমন আল্লাহর সন্তান আছে বলে দাবী করা কিংবা অনুরূপ এমন বিষয়ে কথা বলা, যে সম্পর্কে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই। অনুরূপ আল্লাহর অনুমতি ছাড়াই মুশরিকরা নিজেদের পক্ষ হতে অনেক বস্তুকে হালাল করে এবং বহু জিনিসকে হারাম করে আল্লাহর দিকে সম্বধিত করতো এবং বলতো আল্লাহ এগুলো হালাল করেছেন কিংবা এগুলোকে তিনি হারাম করেছেন।
উপরোক্ত আয়াতে কারীমা হতে প্রমাণ মিলে যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার শরীক হওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং একমাত্র তাঁর জন্যই পরিপূর্ণ গুণাবলী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য সন্তান ও সদৃশ থাকার দাবী খন্ডন করা হয়েছে। সমস্ত মাখলুকই এ জাতীয় দোষ-ত্রুটি হতে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। অনুরূপ উপরোক্ত আয়াতগুলো শির্ক করাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দিয়েছে। মূর্খতা ও কল্পনার উপর ভিত্তি করেই শির্কের সূচনা হয়েছে। আল্লাহু তা'আলার কোন সদৃশ ও সমকক্ষ নেই। (আল্লাহই অধিক জানেন)
📄 আল্লাহ তা‘আলার আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করা।
وقوله: {الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى في سبعة مواضع: في سورة الأعراف قوله: إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ وقال في سورة يونس - عليه السلام -: {إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} وقال في سورة الرعد: اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} وقال في سورة طه: { الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى} وقال في سورة الفرقان: {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ} وقال في سورة الم السجدة: {اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} وقال في سورة الحديد: هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ} .
আল্লাহ তা'আলা বলেন: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত (সূরা ত্বহা ২০:৫)।
এ কথা কুরআনের সাত জায়গায় বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা সূরা আরাফের ৫৪ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ
“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা ইউনূসের ৩ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)
"নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন”। আল্লাহ তা'আলা সূরা রা'দের ২ নং আয়াতে বলেন:
اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)
"আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন বিনা স্তম্ভে। তোমরা এটা দেখছো। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা তোহার ৫নং আয়াতে বলেন:
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
"দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা ফুরকানের ৫৯ নং আয়াতে বলেন:
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ )
"অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন তিনি পরম দয়াময়"। আল্লাহ তা'আলা সূরা সাজদার ৪ নং আয়াতে বলেন:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)
"আল্লাহই আসমান-যমীন এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সকল বস্তু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন"। আল্লাহ তা'আলা সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াতে বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ )
"আল্লাহই আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।
ব্যাখ্যা: আল্লাহর কিতাবের সাতটি স্থানে আল্লাহ তা'আলা সাব্যস্ত করেছেন যে তিনি আরশের উপরে সমুন্নত। প্রত্যেক স্থানেই মাত্র একটি শব্দ তথা (استواء) সমুন্নত হওয়া) দ্বারা আরশের উপর সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে استوى على العرش "তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন"। ইস্তিওয়া শব্দটি এখানে আসল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। অন্য অর্থ দ্বারা ব্যাখ্যা করার কোন সুযোগ নেই। ইস্তিওয়া (সমুন্নত হওয়া) আল্লাহ তা'আলার একটি কর্মগত সিফাত। এটি তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য সুসাব্যস্ত। অন্যান্য সিফাতের মতই আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই এ সুউচ্চ সিফাতটি তাঁর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। আরবদের ভাষায় চারটি শব্দের মাধ্যমে ইস্তিওয়ার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যথা: علا وارتفع وصعد واستقر এ চারটি শব্দের প্রথম তিনটির অর্থ উপরে উঠলেন এবং সমুন্নত হলেন। চতুর্থ শব্দটির অর্থ হচ্ছে স্থির হলেন।
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে বর্ণিত استواء শব্দের অর্থে সালাফদের থেকে যা বর্ণিত হয়েছে, তার ভিত্তি এ চারটি অর্থের উপরেই। আসলে ঘুরেফিরে অর্থ একটিই। তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে।
إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন: "নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। অর্থাৎ তিনি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর নেয়ামতরাজি দ্বারা প্রতিপালনকারী। সুতরাং তোমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে তোমরা এককভাবে তাঁরই ইবাদাত করবে।
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন: তিনি সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা, আসমান-যমীনসমূহের সৃষ্টিকারী এবং আসমান ও যমীনের মাঝখানে যা আছে, তার সবই তিনি সৃষ্টি করেছেন।
فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ তিনি ছয়দিনে এগুলো সৃষ্টি করেছেন: এ দিনগুলো হচ্ছে রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার। শুক্রবার দিন সকল সৃষ্টি সম্পন্ন হয়েছে। এতেই আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন।
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ: অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন: অর্থাৎ যেভাবে আরশের উপর সমুন্নত হওয়া তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়, তিনি আরশের উপর সেভাবেই সমুন্নত হয়েছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতের এ অংশ থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
আভিধানিক অর্থে বাদশার সিংহাসনকে আরশ বলা হয়। তবে এখানে সবগুলো দলীল দ্বারা সেই সিংহাসন উদ্দেশ্য, যার রয়েছে একাধিক খুঁটি এবং যাকে আল্লাহর ফেরেশতাগণ বহন করে আছেন। সেটি সমস্ত সৃষ্টিজগতের উপর তাঁবু বা গম্বুজ স্বরূপ। এক কথায় আরশ হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টিজগতের ছাদ।
তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ আল্লাহই ঊর্ধ্বদেশে আকাশমন্ডলী স্থাপন করেছেন বিনা স্তম্ভে: অর্থাৎ যমীনের অনেক উপরে আসমানকে এমনভাবে স্থাপন করেছেন যে, তাকে স্পর্শ করা এবং সে পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়।
بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا তিনি আসমানকে বিনা খুঁটিতে উপরে স্থাপন করেছেন, যা তোমরা দেখতে পাচ্ছ: খুঁটি ও স্তম্ভকে عمد বলা হয়। عمد শব্দটি عماد -এর বহুবচন। আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহকে এমন কোন খুঁটি ও স্তম্ভের উপর দাঁড় করান নি যে, উহা সেই খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বরং আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরতের মাধ্যমে আসমানসমূহকে খুঁটি ছাড়াই সুউচ্চে স্থাপন করেছেন। আকাশের খুঁটি নেই, এই কথাকে শক্তিশালী করার জন্য عمد এর পর ترونها (তোমরা দেখতে পাচ্ছ) বাক্যটি আনয়ন করা হয়েছে।
কেউ কেউ বলেছেন, আসমানের খুঁটি আছে। কিন্তু আমরা তা দেখি না। তবে প্রথম কথাটিই অধিক বিশুদ্ধ।
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ : অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন: তৃতীয় আয়াতের এ অংশ থেকেই আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার দলীল নেয়া হয়েছে। বাকী আয়াতগুলোর ক্ষেত্রেও কথা একই। আয়াতগুলোর যেখানে ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ রয়েছে, সেখান থেকেই দলীল গ্রহণ করা হয়েছে।
সবগুলো আয়াত থেকে যা সাব্যস্ত হচ্ছে, তা হলো আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের জন্য যেভাবে আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া শোভনীয়, আল্লাহর জন্য সেভাবেই আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করতে হবে। এ আয়াতগুলোতে ঐসব লোকদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা ইস্তিওয়াকে (الاستيلاء )দখল করা, অধিকারী হওয়া) ও القهر (পরাজিত করা) এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে এবং আল্লাহর আরশকে ব্যাখ্যা করে আল্লাহ রাজত্বের মাধ্যমে। তারা বলে আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন এর অর্থ হচ্ছে استولى على الملك وقهر غيره “তিনি তাঁর রাজত্বের অধিকারী হলেন এবং অন্যদেরকে পরাজিত করলেন"। একাধিক কারণে এ ব্যাখ্যা বাতিল।
প্রথম: এটি একটি বিদ'আতী ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা সাহাবী, তাবেঈ এবং তাদের অনুসারী সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যার সুস্পষ্ট বিরোধী। জাহমীয়া ও মুতাযেলারাই সর্বপ্রথম ইস্তিওয়ার এই ব্যাখ্যা করেছে। সুতরাং এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যাত।
দ্বিতীয়: استولى على الملك استوى على العرش এর ব্যাখ্যা যদি হতো, তাহলে আরশ এবং নিম্নজগতের সাত যমীন, যমীনে বিচরণকারী জীব-জন্তু এবং সমস্ত মাখলুকের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে কোন পার্থক্য থাকতো না। কেননা তিনি সমস্ত মাখলুকের উপর আধিপত্য বিস্তারকারী এবং তিনি সবকিছুর মালিক। সুতরাং استوى এর দ্বারা ইস্তিওলা উদ্দেশ্য করা হলে আরশের উল্লেখ করা নিরর্থক হতো। আল্লাহর কালামে নিরর্থক কিছু নেই।
তৃতীয়: আরশের উপর আল্লাহ তা'আলার সমুন্নত হওয়া সাব্যস্ত করার জন্য কুরআন সুন্নাহয় শুধু اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ (আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন) এ বাক্যটিই উল্লেখিত হয়েছে। একবারও اسْتَوْلَى عَلَى الْعَرْشِ (আরশের অধিকার গ্রহণ করলেন) বাক্যটি আসেনি। একবারও যদি তা আসত, তাহলে অন্য আয়াতগুলোতে উল্লেখিত اسْتَوَى শব্দকে اسْتَوْلَى এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেত। ১৮
চতুর্থ: উপরোক্ত আয়াতগুলোর যেখানেই আসমান-যমীন সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, তার পর সবখানেই ثُمَّ اسْتَوَىٰ আনয়ন করে বলা হয়েছে: عَلَى الْعَرْشِ (অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন), যা বিলম্বের সাথে ধারাবাহিকতার অর্থ প্রদান করে اسْتِوَاء عَلَى الْعَرْش দ্বারা যদি اسْتِيْلَاء عَلَى الْعَرْشِ وَالْقُدْرَةِ عَلَيْهِ (আরশের অধিকারী হওয়া এবং উহার উপর ক্ষমতা লাভ করা) উদ্দেশ্য হতো, তাহলে خَلْقِ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضِ বলার পর ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ বলতেন না।
কেননা আসমান-যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহর আরশ বিদ্যমান ছিল। যেমন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে (২৬৫৩) বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কিভাবে এটি বলা বৈধ হতে পারে যে, আসমান-যমীন সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তা'আলা আরশের অধিকারী ছিলেন না এবং এর উপর তিনি ক্ষমতাবানও ছিলেন না? এই ধরণের কথা সম্পূর্ণ বাতিল。
টিকাঃ
১৮. আল্লাহ তা'আলা সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং সকল বস্তুর মালিক একমাত্র তিনিই। অনন্তকাল থেকেই সকল বস্তুর উপর তাঁর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত এবং সকল বস্তু বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও আল্লাহ এবং তাঁর মালিকানা বহাল থাকবে। আল্লাহর ক্ষেত্রে এমন বিশ্বাস পোষণ করা ঠিক হবে না যে, আল্লাহ পূর্বে অমুক বস্তুর মালিক ছিলেন না। পরে মালিক হয়ে গেছেন। এ ধরণের অর্থ গ্রহণ করা হলে, আল্লাহ যে মহান ক্ষমতাবান তাতে বিশ্বাস পরিপূর্ণ হবে না এবং মহান আল্লাহর সাথে মানুষের সাথে তুলনা হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)