📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি চোখের কথা উল্লেখ আছে।

📄 আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি চোখের কথা উল্লেখ আছে।


وَقَوْلُهُ: {وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا } { وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاء لِّمَن كَانَ كُفِرَ} {وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةٌ مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي}
وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا আল্লাহ তা'আলা নাবী কে লক্ষ্য করে বলেন:
“হে নাবী! তোমার রবের ফায়সালা ও হুকুম আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই তুমি আমার চোখে চোখেই আছো (সূরা আত-তুর ৫২:৪৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِّمَن كَانَ كُفِرَ "আর নূহকে আমি কাষ্ঠফলক ও পেরেক সম্বলিত বাহনে আরোহন করিয়ে দিলাম, যা আমার চোখের সামনেই চলছিলো। এ ছিলো সেই ব্যক্তির জন্য প্রতিশোধ, যাকে অস্বীকার করা হয়েছিলো” (সূরা কামার ৫৪:১৩-১৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي "আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও”। (সূরা ত্বহা ২০: ৩৯)
ব্যাখ্যা: الصبر শব্দের আভিধানিক অর্থ বাধা দেয়া ও আটকিয়ে রাখা। দুঃখ- বেদনায় পড়ে বিরক্তি ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা থেকে নফসকে আটকিয়ে রাখা, জবান দিয়ে অভিযোগ করা ও বিরক্তি প্রকাশ করা হতে জবানকে আটকিয়ে রাখা এবং হাত দিয়ে গালে চপেটাঘাত করা ও পরিহিত জামা বুকের দিক থেকে ছিড়ে ফেলা থেকে হাতকে আটকিয়ে রাখাকে শারীয়াতের পরিভাষায় সবর বলা হয়।
لِحُكُم رَبِّكَ তোমার রবের ফায়সালা ও হুকুম আসা পর্যন্ত সবর করো। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত ফায়সালা ও শারীয়াতের ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।
فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا নিশ্চয়ই তুমি আমার চোখে চোখেই আছো: অর্থাৎ আমার দৃষ্টির সামনে এবং আমার হেফাযতের অধীনেই আছো। সুতরাং কাফেররা তোমাকে কষ্ট দিবে, এই পরোয়া করো না। কষ্ট দেয়ার জন্য তারা কখনোই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না।
وَحَمَلْنَاهُ আরোহন করিয়ে দিলাম: নূহ আলাইহিস সালামকে।
عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحِ وَدُسُرٍ কাঠফলক ও পেরেক সম্বলিত: অর্থাৎ লম্বা ও প্রশস্ত কাঠ দিয়ে তৈরী নৌকার মধ্যে তাকে উঠালাম। সেই কাষ্ঠগুলোতে অনেকগুলো পেরেক মেরে দেয়া হয়েছিল। دسر )পেরেক) শব্দটি دسار এর বহুবচন।
تَجْرِي بأَعْيُنِنَا আমার চোখের সামনে দিয়েই চলছিল: অর্থাৎ আমার দৃষ্টি পড়ার স্থান দিয়ে এবং আমার হেফাযতেই চলছিল।
جَزَاءً لِّمَن كَانَ كُفِرَ করা হয়েছিলো: অর্থাৎ আমি নূহ ️ ও তাঁর অনুসারীদেরকে নাজাত দিয়ে তাঁর জাতির অবিশ্বাসী লোকদের সাথে যেই আচরণ করেছিলাম এবং মহাপ্লাবনের পানিতে ডুবিয়ে মেরে যেই শাস্তি তাদেরকে দিয়েছিলাম তা মূলতঃ নূহ এর সাথে কুফুরী করার কারণে ও তাঁর আদেশ অমান্য করার কারণেই।
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম: এখানে মুসাকে সম্বোধন করে এই কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি তোমার উপর আমার ভালবাসা স্থাপন করলাম এবং তোমাকে ভালবাসলাম। সেই সাথে আমার সৃষ্টির কাছেও তোমাকে প্রিয় করে দিলাম।
وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও: অর্থাৎ আমার দৃষ্টির সামনেই যাতে তুমি প্রতিপালিত হও এবং ফিরআউনের ঘরে তোমাকে যেন খাওয়ানো হয়, আমি তোমার জন্য সেই ব্যবস্থা করলাম। সেই সাথে সর্বদা আমি তোমাকে দেখছি, তোমার প্রতি আমার দৃষ্টি রাখছি এবং তোমাকে হেফাজত করছি।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে জানা গেল যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য যেমন দু'টি চোখ শোভনীয়, তাঁর জন্য ঠিক সেরকমই দু'টি চোখ রয়েছে। কুরআনুল কারীমে العين (চোখ) শব্দটি আল্লাহর প্রতি একবচন ও বহুবচন এই উভয়ভাবেই مضاف (সম্বোধিত) হয়েছে। হাদীসেও এটিকে আল্লাহর প্রতি দ্বি-বচন হিসাবে সম্বোধিত হয়েছে। দাজ্জালের হাদীসে নাবী বলেন:
أَنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ)
"নিশ্চয়ই তোমাদের রব অন্ধ নন"। ১৬
এ কথা বলে নাবী তাঁর চোখের দিকে ইঙ্গিত করলেন। এখানে সুস্পষ্ট যে, এই হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহর জন্য একচোখ সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। যার চোখ মাত্র একটি সে তো প্রকাশ্য কানা। আল্লাহ তা'আলা এই দোষের অনেক উর্ধ্বে।
আরবদের ভাষায় مضاف إليه এর অবস্থা অনুপাতে مضاف কখনো একবচন, কখনো দ্বি-বচন আবার কখনো বহুবচন হয়। একবচনের বা বিশেষ্যকে যদি একবচনের ضمير এর (সর্বনামের) দিকে ইযাফত (সম্বন্ধ) করা হয়, তাহলে সেই ইসমকেও একবচন ব্যবহার করতে হয়। যেমন: هذا قلمك এটি তোমার কলম। আর যদি বহুবচনের শব্দের দিকে ইযাফত করা হয়, চাই সে বহুবচন ইসমে যাহের হোক কিংবা সর্বনাম হোক, তাহলে শাব্দিক মিল রাখার জন্য সেই مضاف বা সম্বোধিত পদকে বহুবচন ব্যবহার করাই উত্তম। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَجْرِي بأَعْيُنِنَا আমাদের চোখসমূহের সামনেই নৌকাটি চলছিল।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُم مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا )
"এরা কি দেখে না, আমাদের নিজের হাতসমূহের তৈরী জিনিসের মধ্য থেকে এদের জন্য সৃষ্টি করেছি গবাদি পশু?" (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭১)।
আর যখন আরবরা তাদের ভাষায় দ্বি-বচনের শব্দকে অপর কোন দ্বি-বচনের শব্দের দিকে ইযাফত করে, তখন তারা বাক্যকে অধিকতর ফাসীহ (সুস্পষ্ট) করার জন্য দ্বি-বচনকেও (মুযাফকেও) বহুবচন ব্যবহার করে থাকে। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا )
"তোমাদের দু'জনের মন সরল-সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে" (সূরা তাহরীম ৬৬:৪)।
নাবী এর দুইজন স্ত্রীর অন্তর মাত্র দু'টি। দ্বি-বচনের শব্দকে দ্বি-বচনের দিকে ইযাফত করার কারণে দ্বি-বচন মুযাফকে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং আমরা তোমাকে চোখ দিয়ে দেখছি এবং হাত দিয়ে ধরে রাখছি, এ কথা কোন শ্রোতারই বুঝতে অসুবিধা হয় না। এ থেকে পৃথিবীর কোন মানুষই এ কথা থেকে বুঝে না যে, একটি চেহারায় অনেকগুলো (দুই এর অধিক) চোখ থাকে。

টিকাঃ
১৬. সহীহ: সহীহ বুখারী ৪৪০২, আবু দাউদ ৪৩২০, তিরমিযী ২২৪১。

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তির কথা সাব্যস্ত হয়েছে।

📄 আল্লাহ তা‘আলার শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তির কথা সাব্যস্ত হয়েছে।


وقوله: {قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ} وقوله: {لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاء} {أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لا تَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُم بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ} وقوله: {إِنَّني مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى} وقوله: {أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى} { الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ} {وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَسْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
"যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করছে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ তোমাদের উভয়ের কথা শুনেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশ্রোতা" (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:০১)। আল্লাহ তা'আলা ইহুদীদের প্রতিবাদ করে বলেন:
لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ
"নিসন্দেহে আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, আল্লাহ হচ্ছেন অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান (সূরা আল-ইমরান ৩:১৮১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ
"তারা কি মনে করে যে আমি তাদের গোপন বিষয় এবং গোপন পরামর্শ শুনিনা? হ্যাঁ, শুনি। আমার প্রেরিত দূতগণ তাদের নিকটে থেকে লিপিবদ্ধ করে” (যুখরুফ ৪৩:৮০)। আল্লাহ তা'আলা মুসা ও তাঁর ভাই হারূন কে লক্ষ্য করে বলেন:
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
"আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনি ও দেখি (সূরা তোহা ২০: ৪৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى
“সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখছেন?” (সূরা আলাক ৯৬:১৪) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ * وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ * إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
"যিনি তোমাকে দেখেন যখন তুমি উঠো এবং সিজদাকারীদের মধ্যে তোমার ওঠা-বসা ও নড়া-চড়ার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুআরা ২৬:২১৮-২২০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ ﴾
"হে নাবী! তাদেরকে বলে দাও, তোমরা আমল করতে থাকো। আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনগণ তোমাদের আমল দেখবেন (সূরা সূরা তাওবা ৯: ১০৫)
ব্যাখ্যা: قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي "আল্লাহ তার কথা শুনেছেন: খাওলা বিনতে ছা'লাবার কথা বলা হয়েছে।
تُجَادِلُكَ তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে: হে নাবী! সে তোমার সাথে তার স্বামীর ব্যাপারে বারবার কথা বলছিল। খাওলার স্বামীর নাম ছিল আওস বিন সামেত। আর এটি ছিল ঐ সময়ের ঘটনা, যখন সে তার স্ত্রীর সাথে যিহার (যাদের সাথে বিবাহ বন্ধন হারাম, নিজের স্ত্রীকে তাদের কারো সাথে তুলনা করাকে যিহার বলা হয়) করেছিল।
وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهُ সে আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করছে: এ বাক্যটিকে এর সাথে আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, রসূল যখন আওসের স্ত্রী খাওলাকে বললেন, قد (حرمت عليه তুমি তোমার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে গিয়েছো, তখন খাওলা বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! তিনি তো তালাক শব্দ উচ্চারণ করেননি। অতঃপর খাওলা বলতে লাগল, আমি আল্লাহর কাছেই আমার অভাব-অনটনের অভিযোগ করছি এবং আমার নিঃসঙ্গের কথা তাঁকেই জানাচ্ছি। জেনে রাখুন: আমার রয়েছে আওসের পক্ষ হতে কয়েকটি শিশু সন্তান। আমি যদি সন্তানগুলোকে তার নিকট সোপর্দ করি, তাহলে তারা ধ্বংস হবে এবং আমার কাছে নিয়ে আসলেও ক্ষুধায় মরবে। এই বলে সে আকাশের দিকে মাথা উঠাচ্ছিল এবং বলছিল: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট অভিযোগ করছি।
وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا অর্থাৎ তিনি তোমাদের কথার পুনরাবৃত্তি শ্রবণ করেন।
إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা: তিনি সব আওয়াজ শ্রবণ করেন এবং সব মাখলুকের প্রতিই রয়েছে তাঁর দৃষ্টি। এই মহিলাটি তোমার সাথে যেই বাদানুবাদ করছে এবং একই কথার পুনরাবৃত্তি করছে, তাও আল্লাহর শ্রুত আওয়াজ সমূহের অন্তর্ভুক্ত।
لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ আল্লাহ ঐসব লোকদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, আল্লাহ হচ্ছেন অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান: এরা হচ্ছে ইহুদীদের একটি দল। আল্লাহ তা'আলা যখন এই আয়াত নাযিল করলেন:
﴿مَّن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا ﴾
"তোমাদের মধ্যে কে আল্লাহকে করযে হাসানা দিতে প্রস্তুত?” (সূরা বাকারা ২:২৪৫)।
তখন ইহুদীরা উপরোক্ত কথাটি বলেছিল। দুর্বল ও দরিদ্র লোকদের সাথে ছলনা করার জন্যই তারা উক্ত কথা বলেছিল। আসলে তারা বিশ্বাস করতো না যে, আল্লাহ ফকীর আর তারা ধনী। কেননা তারা আসমানী কিতাবের অধিকারী ছিল। দ্বীন ইসলামের মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়ার জন্যই তারা এই ধরণের কথা বলেছিল।
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ তারা কি মনে করে যে আমি তাদের গোপন বিষয় শুনি না? তারা তাদের মনের মধ্যে যেই বিষয় গোপন করে অথবা নির্জন স্থানে একত্রিত হয়ে পরস্পর যেই আলোচনা করে আল্লাহ তা'আলা তা জানেন।
وَنَجْوَاهُمْ গোপন পরামর্শ: অর্থাৎ তিনি তাদের গোপন পরামর্শও জেনে ফেলেন। তারা নিজেদের পরস্পরের মধ্যে যেই গোপন পরামর্শ করে আল্লাহ তা'আলা তাও জানেন। মানুষ তার ঘনিষ্ট বন্ধুর সাথে গোপনে যেই আলাপ করে এবং অন্যদের থেকে তা ছাপিয়ে রাখে, তাকেই নাজওয়া বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: হ্যাঁ, আমি সেই গোপন আলাপ সম্পর্কে জানতে পারি এবং তা শুনে ফেলি।
وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ আমার প্রেরিত দূতগণ তাদের নিকটে থাকে ও লিপিবদ্ধ করে: অর্থাৎ সম্মানিত লেখকগণ তাদের নিকট অবস্থান করে তাদের থেকে যেসব কথা ও কাজ প্রকাশিত হয়, তার সবই লিখে ফেলেন।
إِنَّنِي مَعَكُمَا আমি তোমাদের সাথে আছি: আল্লাহ তা'আলা যখন মুসা ও হারুনকে ফেরআউনের নিকট পাঠিয়েছিলেন তখন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, إِنَّنِي مَعَكُمَا আমি তোমাদের সাথে আছি। এই কথার অর্থ হচ্ছে তোমাদেরকে হেফাযত করার মাধ্যমে এবং তোমাদেরকে সাহায্য করার মাধ্যমে তোমাদের সাথে আছি।
أَسْمَعُ وَأَرَى আমি শুনি এবং দেখি: অর্থাৎ আমি তোমাদের উভয়ের কথা শুনছি এবং তোমাদের শত্রুর কথাও শুনছি। সে সাথে তোমরা দু'জন যে স্থানে অবস্থান করছো তা আমি দেখছি এবং তোমাদের শত্রু যে স্থানে আছে, সে স্থানও দেখছি। তোমরা দুইজন যা করছো এবং সে যা করছে, তাও দেখছি। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, لا تخف তোমরা ভয় করো না।
أَلَمْ يَعْلَم সে কি জানে না? এখানে আবু জাহেলের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলা হয়েছে। সে যখন রসূল ﷺ কে কাবার চত্বরে সলাত পড়তে নিষেধ করেছিল।
بَأَنَّ اللَّهَ يَرَى আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখছেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখছেন এবং তার কথা শুনছেন? আল্লাহ তা'আলা অচিরেই তাকে তার কাজের পূর্ণ সাজা দিবেন। এই প্রশ্নের মাধ্যমে তাকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং ধমক দেয়া হয়েছে।
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ তিনি তোমাকে দেখতে থাকেন যখন তুমি উঠো: অর্থাৎ যখন তুমি একাকী সলাতের জন্য উঠো ও সলাত পড়ো তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দেখেন।
وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ সিজদাকারীদের মধ্যে তোমার ওঠা-বসা এবং নড়া-চড়ার প্রতিও তিনি দৃষ্টি রাখেন: অর্থাৎ তুমি যখন জামা'আতের সাথে সলাত আদায় করার সময় রুকুতে থাকো কিংবা সাজদায় থাকো অথবা দাঁড়ানো থাকো, তখনও আল্লাহ তোমাকে দেখেন।
إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ তুমি যা বলো, তিনি অবশ্যই উহা শুনেন এবং তা জানতে পারেন।
وَقُلِ اعْمَلُوا হে নাবী! তাদেরকে বলে দাও, তোমরা আমল করতে থাকো: আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ ﷺ কে উদ্দেশ্য করে বলছেন, হে মুহাম্মাদ! তুমি এইসব মুনাফেকদেরকে বলে দাও যে, তোমরা যা ইচ্ছা আমল করতে থাকো এবং তোমরা তোমাদের বাতিল পথেই চলতে থাকো। কিন্তু তোমরা এই কথা মনে করো না যে, তোমাদের আমলসমূহ গোপন থাকবে।
فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনগণ! তোমাদের কাজ দেখবেন: অর্থাৎ মানুষের সামনে তোমাদের আমলসমূহ প্রকাশিত হবে এবং দুনিয়াতেই তা দেখা যাবে।
মৃত্যুর পর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে এমন এক সত্তার দিকে, إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ 'যিনি প্রকাশ্য ও গুপ্ত সবকিছুই জানেন এবং তোমরা কি করতে তা তিনি তোমাদের বলে দেবেন।' অতঃপর তিনি সেই আমলগুলোর বদলা দিবেন।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ মিলে যে, তাতে আল্লাহ তা'আলাকে শ্রবণ করা ও দেখা বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ শ্রবণ করেন ও দেখেন। তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য যেভাবে শ্রবণ করা ও দেখা শোভনীয়, তিনি সেভাবেই দেখেন ও শুনেন। তবে তিনি সৃষ্টির সিফাতসমূহ থেকে এবং সৃষ্টির সাদৃশ্য হওয়া থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
উপরের আয়াতগুলো আল্লাহর জন্য শ্রবণ করা এবং দেখা সাব্যস্ত করার ব্যাপারে একদম সুস্পষ্ট। তাতে فعل ماضي তথা অতীত কালের জন্য তৈরী শব্দ قد سمع (অবশ্যই শুনেছেন) এর মাধ্যমে, فعل مضارع তথা বর্তমান-ভবিষ্যতের জন্য গঠিত শব্দ يسمع (শুনছেন) এর মাধ্যমে এবং اسم فاعل তথা কর্তৃবাচক বিশেষ্যের জন্য গঠিত শব্দ سمیع (শ্রবণকারী) এর মাধ্যমে আল্লাহর জন্য শ্রবণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। মোট কথা سمع, يسمع, سمیع এই তিনটি শব্দ আল্লাহর জন্য শ্রবণ করা বিশেষণ অত্যন্ত জোরালোভাবেই সাব্যস্ত করেছে। যে বস্তু বা প্রাণী শুনতে পায় না আরবদের ভাষায় তাকে শ্রবণকারী ও দ্রষ্টা বলা সঠিক নয়। যে প্রাণী বা বস্তু শুনতে পায় এবং দেখতে পায়, শুধু তার ক্ষেত্রেই বলা হয় যে, يسمع ويصر। এটিই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে মূলনীতি। আরবীতে এ কথা বলা হয় না الجبل سميع بصير পাহাড় শুনে ও দেখে। যে শুনে এবং দেখে তাকে ছাড়া অন্য কারো জন্য এই কথা বলা অসম্ভব।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতে প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র বিশেষণ সাব্যস্ত করা।

📄 আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতে প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র বিশেষণ সাব্যস্ত করা।


وقوله: {وَهُوَ شَدِيدُ الْمِحَالِ} وقوله : {وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ} وقوله: {وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لا يَشْعُرُونَ} وقوله: {إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا وَأَكِيدُ كَيْدًا}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَهُوَ شَدِيدُ الْمِحَالِ "তিনি মহাশক্তিশালী (সূরা রা'দ ১৩:১৩)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ "তারা (বনী ইসরাঈলের ইহুদী কাফিররা ঈসার বিরুদ্ধে) গোপন ষড়যন্ত্র করলো। জবাবে আল্লাহও তাঁর গোপন কৌশল খাটালেন। আর আল্লাহ ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম” (সূরা আল-ইমরান ৩:৫৪)। আল্লাহ তা'আলা সালেহ এর ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বলেন:
وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ "তারা বড় ধরণের একটি ষড়যন্ত্র করলো এবং আমিও বিরাট একটি কৌশল অবলম্বন করলাম, যার কোন খবর তারা রাখতো না” (সূরা নামল ২৭:৫০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا وَأَكِيدُ كَيْدًا ﴾
“এরা একটি ষড়যন্ত্র করছে এবং তাদের মুকাবেলায় আমিও একটি কৌশল করছি” (সূরা তারিক ৮৬:১৫-১৬)।
ব্যাখ্যা: وَهُوَ তিনি: অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা। شَدِيدُ الْمِحَالِ মহাশক্তিশালী (সূরা রা'দ ১৩:১৩)। اَلْمِحَالِ শব্দের আভিধানিক অর্থ কঠোরতা। অর্থাৎ কঠোর ষড়যন্ত্র।
ভাষাবিদ ইমাম যাজ্জায বলেন, আরবী ভাষায় বলা হয় مَا حَلَّتُهُ مُحَالاَ إِذَا قَاوَيْتُهُ حَتَّى يَتَبَيَّنَ أَيُّكُمَا أَشَدُّ অর্থাৎ তুমি তার সাথে কঠোর হলে। এই কথা ঠিক ঐ সময় বলা হয়, যখন তুমি তার সাথে শক্তি ও কঠোরতা প্রদর্শনে অবতীর্ণ হও। যাতে করে সুস্পষ্ট হয়, কে অধিক কঠোর।
ইবনুল আরাবী বলেন, اَلْمِحَالِ অর্থ ষড়যন্ত্র করা। আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত কঠোর ষড়যন্ত্রকারী এবং মহাকৌশল অবলম্বনকারী। আল্লাহর পক্ষ হতে ষড়যন্ত্র করার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য, তাকে এমনভাবে শাস্তি দেয়া, যাতে সে বুঝতে না পারে।
وَمَكَرُوا তারা গোপনে ষড়যন্ত্র করলো: অর্থাৎ বনী ইসরাঈলের লোকেরা ঈসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করল। এখানে তাদের ঐসব লোক উদ্দেশ্য, যাদের নিকট থেকে ঈসা কুফুরী অনুভব করেছিলেন। তারা ছিল বনী ইসরাঈলের কাফের সম্প্রদায়। তারা ঈসা কে হত্যা করতে এবং তাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে চাইল। اَلْمَكْرُ (ষড়যন্ত্র ও প্রতারণা) বলা হয় এমন কাজ করাকে, যার উদ্দেশ্য হয় সেই কাজের বাহ্যিক অবস্থার বিপরীত।
وَمَكَرَ اللَّهُ আল্লাহ তা'আলাও ষড়যন্ত্র করলেন: এই কথার অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রথমে অবকাশ দিয়ে পরবর্তীতে পাকড়াও করলেন এবং তাদেরকে ষড়যন্ত্রের শাস্তি দিলেন। ঈসা এর সাদৃশ্য ও আকৃতি অন্য এক ব্যক্তিকে প্রদান করলেন এবং ঈসাকে উপরে আল্লাহর দিকে উঠিয়ে নিলেন।
وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম ষড়যন্ত্রকারী: অর্থাৎ তিনি শাস্তি ও কষ্টের যোগ্য ব্যক্তিকে কষ্ট ও শাস্তি প্রদান করতে সর্বাধিক শক্তিশালী ও সক্ষম। তিনি এমনভাবে তা করতে সক্ষম যে, ষড়যন্ত্রকারীরা তা বুঝতেই পারেনা।
وَمَكَرُوا مَكْرًا তারা বড় ধরণের একটি ষড়যন্ত্র করলো: এখানে সালেহ এর সম্প্রদায়ের কাফিরদের ষড়যন্ত্রের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা আল্লাহর নাবী সালেহ এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে হত্যা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। সালেহ এর ওয়ারিস এবং আত্মীয়দের ভয়ে তারা এই ষড়যন্ত্র গোপনে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। যাতে তারা হত্যাকারীদের পরিচয় জানতে পেরে প্রতিশোধ নিতে না পারে।
وَمَكَرْنَا مَكْرًا “আমিও বিরাট একটি কৌশল অবলম্বন করলাম”। অর্থাৎ তাদের এই কর্মের প্রতিফল দিলাম ও তাদেরকে ধ্বংস করলাম এবং আমার নাবী সালেহকে নাজাত দিলাম। অথচ তারা আমার এ কৌশল ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানতেই পারেনি।
ه তারা: এখানে মক্কার কুরাইশ কাফেরদেরকে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহর পক্ষ হতে يَكِيدُونَ كَيْدًا একটি ষড়যন্ত্র করছে: মুহাম্মাদ যেই সত্য দ্বীন নিয়ে এসেছেন, তারা প্রতিহত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল। [শুধু তাই নয়; তারা স্বয়ং রসূল ﷺ কে রাতের অন্ধকারে হত্যা করার জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাও তাদের সাথে কৌশল করেছেন এবং তাদের সেই ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। তিনি তাঁর রসূলকে তাদের চোখের সামনে দিয়ে নিরাপদে বের করে নিয়েছেন। তারা তাঁকে দেখতেই পারেনি।] وَأَكِيدُ كَيْدًا তাদের ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় আমিও একটি কৌশল করছি: অর্থাৎ তাদেরকে ধীরে ধীরে পাকড়াও করি এবং তাদের ষড়যন্ত্রের সাজা দেই। অতঃপর তাদেরকে আকস্মিকভাবে ধরে ফেলি। আমার পাকড়াও সম্পর্কে তারা মোটেই টের পায় না।
উপরের আয়াতগুলো হতে প্রমাণিত হলো, আল্লাহ তা'আলার المكر والكيد ষড়যন্ত্র ও কৌশল রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রকৃতভাবেই ষড়যন্ত্র ও কৌশল সাব্যস্ত করা হয়েছে। গোপনে কারো কাছে কোনো জিনিস পৌঁছিয়ে দেয়াকে المكر বলা হয়। الكيد এবং المخادعة শব্দদ্বয় ষড়যন্ত্র ও কৌশল অর্থেই ব্যবহৃত হয়।
ষড়যন্ত্র ও কৌশল দুই প্রকার। একটি হচ্ছে অন্যায় ষড়যন্ত্র। আরেকটি হচ্ছে ভাল ও ন্যায় ষড়যন্ত্র।
যার সাথে ষড়যন্ত্র করা অনুচিত এবং যে ব্যক্তি অসদাচরণের উপযুক্ত নয়, তার সাথে ষড়যন্ত্র করাকে অন্যায় ও অসৎ ষড়যন্ত্র বলা হয়।
আর ষড়যন্ত্রের শাস্তি স্বরূপ যে ব্যক্তি অসদাচরণ পাওয়ার হকদার তার সাথে ষড়যন্ত্র করা ন্যায়সঙ্গত।
প্রথম প্রকার ষড়যন্ত্র হচ্ছে ঘৃণ্য এবং দ্বিতীয় প্রকার ষড়যন্ত্র হলো প্রশংসাযোগ্য।
আল্লাহ তা'আলা নিজের পক্ষ হতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এবং বিশেষ হিকমাতের কারণে যেই প্রকার ষড়যন্ত্র প্রশংসনীয়, শুধু তাই করেন। তিনি যালেম ও পাপিষ্ঠদেরকে এমন অবস্থায় পাকড়াও করেন, যা তারা কল্পনাও করতে পারে না।
যালেমরা আল্লাহর বান্দাদের সাথে যেরূপ আচরণ করে থাকে, আল্লাহ তা'আলা যালেমদেরকে সেভাবে পাকড়াও করেন না; বরং আল্লাহর পাকড়াও হয় ভিন্ন ধরণের এবং অত্যন্ত কঠোর।
যারা অন্যায়ভাবে ষড়যন্ত্র করে, তাদের শাস্তি স্বরূপই কেবল আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের পবিত্র সত্তার জন্য ষড়যন্ত্র, কৌশল এবং ধোঁকা সাব্যস্ত করেছেন। অর্থাৎ যারা অন্যায়ভাবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আল্লাহর বান্দাদেরকে কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করে তাদের অপকর্মের মোকাবেলায় আল্লাহও তাদের সাথে ষড়যন্ত্র করেন ও ষড়যন্ত্রকারীদেরকে শাস্তি দেন এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করেন।
ইহা জানা কথা যে, মন্দ, যুলুম এবং অন্যায়ের বিনিময়ে শাস্তি দেয়া সকল মানুষের নিকটেই প্রশংসনীয়। সুতরাং মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলার জন্য অন্যায় ও ষড়যন্ত্রমূলক কাজের শাস্তি দেয়া কেন প্রশংসনীয় হবে না?
একটি সতর্কতা ষড়যন্ত্র করা, কৌশল অবলম্বন করা এবং ধোঁকা দেয়া এই বিষয়গুলোর নিসবত (সম্বন্ধ) যখন আল্লাহর দিকে করা হবে, তখন বুঝতে হবে এগুলো আল্লাহ তা'আলার কর্ম বা কর্মগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর নামগুলোর তুলনায় তাঁর কর্মের পরিধি অনেক বিশাল। তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সত্তার জন্য এমনসব আফআল (কর্ম) সাব্যস্ত করেছেন, যেগুলো থেকে তাঁর নিজের জন্য কোন নাম নির্ণয় করেন নি।
উদাহরণ স্বরূপ أراد الله (আল্লাহ ইচ্ছা করেছেন) شاء الله (আল্লাহ চেয়েছেন), এ দু'টি ক্রিয়ার কথা বলা যেতে পারে। এ দু'টি ক্রিয়া থেকে আল্লাহ তা'আলার জন্য নাম বের করে এভাবে বলা যাবে না যে, المريد (ইচ্ছাকারী) এবং الشائی (ইচ্ছা ও পরিকল্পনাকারী)। مکر (ষড়যন্ত্র করা), كيد (কৌশল করা) الخداع (ধোঁকা দেয়া) الاستهزاء (ঠাট্টা-বিদ্রপ করা) ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই কথা।
এগুলো থেকে আল্লাহর জন্য যথাক্রমে ماکر (ষড়যন্ত্রকারী),کائد (চক্রান্তকারী), مخادع (প্রতারণাকারী) এবং مستهزئ (বিদ্রপকারী) নাম নির্ধারণ করা এবং সেগুলো আল্লাহর পবিত্র সত্তার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
কেননা এ নামগুলো যেই অর্থ বহন করে তা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। এক শ্রেণী প্রশংসনীয় এবং অন্য শ্রেণী নিন্দনীয়। এ দুই শ্রেণী হতে কেবল আল্লাহর জন্য প্রশংসনীয়টাই সাব্যস্ত হবে। যেমনটি ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণভাবে এবং বিনা পার্থক্যে এ কর্মগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হলে এবং এগুলো থেকে তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য নাম গ্রহণ করা হলে এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কামালিয়াত (পূর্ণতা) সাব্যস্ত হবে না。

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ক্ষমা, রহমত, মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রসঙ্গ।

📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার ক্ষমা, রহমত, মর্যাদা ও ক্ষমতা প্রসঙ্গ।


وقوله تعالى: { إن تُبْدُواْ خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَن سُوَءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا} {وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ} وقوله: {وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ} وقوله عن إبليس: {فَبِعِزَّتِكَ لأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: إن تُبْدُوا خَيْرًا أَوْ تُخْفُوهُ أَوْ تَعْفُوا عَن سُوءٍ فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا قَدِيرًا “তোমরা যদি প্রকাশ্যে ও গোপনে সৎকাজ করে যাও অথবা যদি কারো মন্দ ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো, তাহলে আল্লাহ বড়ই ক্ষমাকারী ও ক্ষমতাবান”। (সূরা নিসা ৪:১৪৯) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ “তাদের উচিৎ ক্ষমা করা ও তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াকারী”। (সূরা নূর ২৪: ২২) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَّسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَ عَلْمُونَ এরা (মুনাফেকরা) বলে, আমরা মদীনায় ফিরে যেতে পারলে মর্যাদাবান লোকেরা অপদস্ত লোকদেরকে সেখান থেকে বের করে দেবে। অথচ সম্মান ও মর্যাদা তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনদের জন্য। কিন্তু মুনাফেকরা তা জানে না (সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৮)। আল্লাহ তা'আলা ইবলীস সম্পর্কে বলেন:
قَالَ فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ ﴾
"সে (ইবলীস) বললো, তোমার ইজ্জতের কসম, আমি এদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবোই (সূরা সোয়াদ ৩৮:৮২-৮৩)।
ব্যাখ্যা: إِن تُبْدُوا خَيْرًا তোমরা যদি প্রকাশ্যে সৎকাজ করে যাও: অর্থাৎ তোমাদের সৎকর্মগুলোকে মানুষের জন্য প্রকাশ করো।
أَوْ تُخْفُوهُ অথবা গোপনে সৎকাজ করে যাও: অর্থাৎ যদি গোপনে সৎকাজ করতে থাকো।
أَوْ تَعْفُوا عَن سُوء অথবা যদি কারো মন্দ ব্যবহারকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো: অর্থাৎ যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করল কিংবা অন্য কোনভাবে কষ্ট দিল, তা যদি তোমরা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখো, তাহলে জেনে রাখো,
فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوا قَدِيرًا নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা বড়ই ক্ষমা গুণের অধিকারী অথচ তিনি শাস্তি দেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন: তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন এবং তাদেরকে মাফ করে দেন। অথচ তারা নিজ হাতে যে অন্যায় কাজ করে, তার কারণে তিনি শাস্তি দিতে পূর্ণ ক্ষমতাবান। সুতরাং হে মুসলিমগণ! তোমরাও আল্লাহ তা'আলার গুণে গুণান্বিত হও। কেননা তিনি শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেন। সুতরাং তোমাদেরও তাই করা উচিৎ।
وَلْيَعْفُوا তাদের উচিৎ ক্ষমা করা: অর্থাৎ আয়াতের প্রথম দিকে সম্মান ও ফাযীলাতের অধিকারী যেসব মুমিনের আলোচনা করা হয়েছে, তাদের উচিৎ মানুষের অপরাধ ঢেকে রাখা এবং ক্ষমা করে দেয়া।
وَلْيَصْفَحُوا তাদের উচিৎ দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা: সম্মান ও ফাযীলাতের অধিকারীদের উচিৎ দোষ-ত্রুটি ও অপরাধে লিপ্তদের এড়িয়ে চলা এবং তাদের থেকে চোখ বন্ধ করে রাখা। ১৭
আল্লাহ তা'আলা বলেন: أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন? তোমরা কি চাওনা যে, তোমাদের ক্ষমার কারণে এবং যারা তোমাদের সাথে খারাপ আচরণ করে, তাদের থেকে দৃষ্টি এড়িয়ে নেয়ার কারণে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসেন? দয়াবান। وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল এবং প্রচুর
وَلِلهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ সম্মান-মর্যাদা ও শক্তি তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনদের জন্য: এখানে ঐসব মুনাফেকদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা মনে করেছিল মুমিনদের উপর কেবল তাদেরই রয়েছে শক্তি ও সম্মান-মর্যাদা। العزة শব্দের অর্থ শক্তি ও বিজয়। শক্তি ও বিজয় কেবল আল্লাহ তা'আলার জন্য এবং তাঁর রসূল ও তাঁর সৎ বান্দাদের মধ্য হতে যাদেরকে দান করেছেন, কেবল তাদের জন্যই। তারা ব্যতীত অন্য কারো জন্য নয়।
আল্লাহ তা'আলা ইবলীস সম্পর্কে বলেন যে, সে বলেছে: فَبْعِزَّتِكَ তোমার ইজ্জতের কসম: অর্থাৎ ইবলীস আল্লাহ তা'আলার ইয্যতের শপথ করে বলেছে।
لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ আমি এদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করবোই: সে বনী আদমের সামনে প্রবৃত্তির কাম্য বস্তুগুলোকে সুসজ্জিত করে দিয়ে এবং তাদের মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়ে তাদেরকে গোমরাহ না করে ছাড়বো না। এর ফলে তারা সকলেই গোমরাহ হয়ে যাবে। অতঃপর ইবলীস যখন জানতে পারলো যে, কাফের ও পাপিষ্ঠদের মধ্য হতে যারা তার অনুসারী তার চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র শুধু তাদের মধ্যেই সফল হবে, তখন তার কথার মধ্যে স্বতন্ত্র বক্তব্য প্রয়োগ করল। অর্থাৎ আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে গোমরাহীর আওতামুক্ত করে বললেন: إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ তবে একমাত্র তোমার একনিষ্ঠ বান্দাগণ ছাড়া।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ হয় যে আল্লাহ তা'আলার জন্য মাফ করা, ক্ষমা করা, রহম করা, ক্ষমতা বিশেষণ রয়েছে। আল্লাহর মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য যেভাবে শোভনীয় ঠিক সেভাবেই এই বিশেষণগুলো সাব্যস্ত করতে হবে。

টিকাঃ
১৭. মূলতঃ এখানে এমন দোষ-ত্রুটি ও অপরাধ গোপন রাখা ও ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যা গোপন রাখলে ও ক্ষমা করে দিলে তেমন কোন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে অপরাধ যদি মারাত্যক হয় এবং যা গোপন রাখলে ও শাস্তি না দিলে সমাজে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে সমাজ থেকে অন্যায় কাজের মূলোৎপাটন করার জন্য তাতে অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। (আল্লাহই অধিক জানেন)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00