📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য চেহারা সাব্যস্ত করণ।

📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য চেহারা সাব্যস্ত করণ।


وقوله: {وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ} {كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ}
وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"একমাত্র তোমার সেই রবের চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে, যিনি মহিয়ান ও মহানুভব (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: كُلُّ شَيْءٍ هَالِكَ إِلَّا وَجْهَهُ "তাঁর চেহারা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংস হবে" (সূরা কাসাস ২৮:৮৮)।
ব্যাখ্যা: وَيُقى وَجْهُ رَبِّكَ একমাত্র তোমার পালনকর্তার চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে। এ আয়াতের পূর্বে রয়েছে, كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ "ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংস হবে" (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৬)। এখানে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে,
যমীনের সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে এবং সকল বস্তুই ধ্বংস হবে। মহান প্রভুর চেহারা ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ তা'আলার কখনো মৃত্যু হবে না। তিনি সেই চিরঞ্জীবন্ত সত্তা, যার কখনোই মৃত্যু হবে না।
ذُو الْجَلَالِ যিনি মহিমময়: অর্থাৎ বড়ত্ব ও মর্যাদার অধিকারী।
وَالإكرام মহানুভব: অনুগ্রহ ও সম্মানের অধিকারী। অর্থাৎ তিনি নাবী- রসূল এবং তাঁর সৎ বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করার মাধ্যমে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: الإكرام অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা এমন প্রত্যেক জিনিসের উর্ধ্বে, যা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
كُلِّ شَيْءٍ هَالِكَ সব জিনিসই ধ্বংস হবে: আসমান ও যমীনে যা আছে, তার প্রত্যেকটিই ধ্বংস হবে এবং মৃত্যু বরণ করবে।
إِلَّا وَجْهَهُ কেবল তাঁর চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে: وجهه শব্দটি মুস্তাসনা হিসাবে মানসুব হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পর কেবল তিনিই অবশিষ্ট থাকবেন। সমস্ত মাখলুক মৃত্যু বরণ করার পরও তাঁর মৃত্যু হবে না।
উপরোক্ত দু'টি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার চেহারা থাকার কথা প্রমাণিত হলো। আল্লাহর চেহারা আল্লাহর সত্তাগত সিফাত।
প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর চেহারা রয়েছে। যে রকম চেহারা আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় তাঁর চেহারা ঠিক সে রকমই। তা কোন মাখলুকের চেহারার মত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই (সূরা শুরা ৪২:১১)
আমরা আল্লাহর সিফাতকে বাতিলকারী সম্প্রদায়ের লোকদের মত কথা বলি না। তারা বলে আল্লাহর চেহারা দ্বারা আসল অর্থ উদ্দেশও নয়; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সত্তা কিংবা ছাওয়াব, অথবা দিক অথবা অন্যান্য উদ্দেশ্য। এই ব্যাখ্যাগুলো একাধিক কারণে বাতিল।
(ক) হাদীসে আল্লাহর চেহারাকে আল্লাহর সত্তার উপর আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে আল্লাহর সত্তাকে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর তাঁর চেহারা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহর যাত (সত্তা) এবং তাঁর চেহারা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস।
রসূল ﷺ তাঁর দু'আয় বলেছেন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
"আমি মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর সম্মানিত চেহারা এবং তাঁর চিরস্থায়ী ক্ষমতার ওয়াসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা করছি”। ১৫
আতফের অন্যতম দাবী হচ্ছে, তা পরস্পর ভিন্ন জিনিস বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
(খ) উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহর চেহারাকে তাঁর সত্তার দিকে সম্বোধিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَجْهُ رَبِّكَ “তোমার পালনকর্তার চেহারা”। আর চেহারাকে বিশেষিত করা হয়েছে ذُو الْجَلَالِ والإكرام মহিয়ান ও দয়াবান, এই দু'টি বিশেষণের মাধ্যমে। وجه )চেহারা) দ্বারা যদি যাত বা সত্তা উদ্দেশ্য হত, তাহলে উক্ত আয়াতের মধ্যে الوجه শব্দটি সিলা হিসাবে ব্যবহৃত হত। অর্থাৎ তা رب এর সিফাত হিসাবে ব্যবহৃত হত; الوجه -এর সিফাত হতো না। তখন এভাবে বলা হতো, وَجْهُ رَبِّكَ ذي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ । তা না বলে যখন ذُو الْجَلال والإكرام বলা হয়েছে, তাতে বুঝা গেল যে, উহা চেহারার সিফাত হয়েছে, সত্তার সিফাত হয়নি। ঐদিকে আবার الوجه )চেহারা) আল্লাহর সত্তার সিফাত হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
(গ) কোন জাতির ভাষাতেই এটি পাওয়া যায় না যে, কোন জিনিসের চেহারা বলতে যাত (সত্তা) কিংবা ছাওয়াব বুঝায়। আরবী ভাষায় الوجه বলতে প্রত্যেক বস্তুর অগ্রভাগ ও সামনের অংশ বুঝায়। কেননা কোন বস্তুর দিকে অগ্রসর হলে সর্বপ্রথম অগ্রভাগই সামনে পড়ে। যেসব বস্তুর দিকে চেহারাকে ইযাফত বা সম্বন্ধ করা হবে সেসব বস্তু অনুযায়ীই চেহারার অর্থ হবে। وجه শব্দটিকে যদি কোনা সময়ের দিকে সম্বন্ধ করা হয়, তাহলে ইহার অর্থ হবে প্রথম সময়। যেমন বলা হয়, وجه النهار তথা দিবসের প্রথমাংশ। কোন প্রাণীর দিকে ইযাফত করলে উহার অর্থ হবে সেই প্রাণীর অঙ্গ বিশেষ। যেমন বলা হয়, وجه الفرس তথা ঘোড়ার চেহারা। আর যদি কোন পাহাড় বা দেয়ালের দিকে ইযাফত করা হয়, তাহলে উহার অর্থ হবে পাহাড় বা দেয়ালের চূড়া। যেমন বলা হয়, وجه الجبل তথা পাহাড়ের উপরের অংশ, وجه الجدار দেয়ালের সামনের অংশ ইত্যাদি। আর যখন চেহারাকে আল্লাহর দিকে ইযাফত করা হবে, তখন ইহার অর্থ হবে তাঁর অন্যতম সিফাত, যা কোন মাখলুকের সিফাতের অনুরূপ নয়。

টিকাঃ
১৫. সহীহ: সুনানে আবু দাউদ ৪৬৬।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি হাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।

📄 কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি হাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।


وقوله: {مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ وقوله {وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُواْ بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاء}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ )
"যাকে আমি নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি তাঁর সম্মুখে সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৫) আল্লাহ আরো বলেন: وَقَالَتْ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ
"আর ইহুদীরা বলে: আল্লাহর হাত বাঁধা হয়ে গেছে। তাদের হাতই বাঁধা হয়ে গেছে। এ কথা বলার কারণে তাদের উপর অভিসম্পাত করা হয়েছে; বরং তাঁর উভয় হস্ত সদা উন্মুক্ত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করেন” (সূরা মায়িদা ৫:৬৪)।
ব্যাখ্যা: مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ " সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৫) আয়াতে ইবলীসকে সম্বোধন করে ধমক দেয়া হয়েছে। অভিশপ্ত ইবলীস যখন আদম কে সাজদা করা হতে বিরত রইল তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় রহমত থেকে বিতাড়িত করলেন এবং বললেন: لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ “যাকে আমি নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি: অর্থাৎ আমি যাকে কোন কিছুর মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি নিজের দুই হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছি, তাকে সাজদা করা হতে কোন জিনিস তোমাকে ফিরিয়ে রাখল? এ থেকে আদম এর জন্য সম্মান ও মর্যাদা সাব্যস্ত হয়।
وَقَالَتِ الْيَهُودُ আর ইহুদীরা বলে: ইহুদীদের কথা,﴾ هُدْنَا إِلَيْكَ "আমরা তোমার নিকট ফিরে আসলাম বা তাওবা করলাম" থেকে ইয়াহুদ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তখন তাদের জন্য এটি একটি সম্মানজনক নাম ছিল। তাদের শারীয়াত মানসুখ হয়ে যাওয়ার পর যদিও তাতে এখন সম্মানের কোন অর্থ নেই, তথাপিও এই নামটি তাদের জন্য লাযেম হয়ে আছে।
আবার কেউ কেউ বলেছেন ইয়াকুব এর অন্যতম পুত্র ইয়াহুদা বিন ইয়াকুবের দিকে নিসবত (সম্বন্ধ) করেই তাদেরকে ইহুদী বলা হয়েছে।
يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ আল্লাহর হাত বাঁধা হয়ে গেছে: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা এখানে ইহুদীদের সম্পর্কে বলছেন, তারা আল্লাহকে কৃপণ বলে আখ্যায়িত করেছে। যেমন তারা আরো বলেছিল, আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন ফকীর এবং তারা হলো ধনী। আল্লাহর হাত বাঁধা হয়ে গেছে, তাদের এই কথা দ্বারা মূলতঃ তারা এটি উদ্দেশ্য করেনি যে, আল্লাহর হাতে বেড়ী লাগিয়ে বেঁধে দেয়া হয়েছে।
غُلَتْ أَيْدِيهِمْ তাদের হাতই বাঁধা হয়ে গেছে: আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এ কথার মাধ্যমে তাদের কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে এবং তারা যেই মিথ্যা রচনা করেছে, তার মোকাবেলায় উপরোক্ত কথা বলা হয়েছে। আসলে তাদের এরূপই হয়েছিল। তাদের মধ্যে রয়েছে প্রচুর কৃপণতা এবং মারাত্মক হিংসা। আপনি ইহুদীদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক কৃপণ হিসাবে দেখতে পাবেন।
وَلُعِنُوا بِمَا قَالُو তাদের এই কথা বলার কারণে তাদের উপর অভিসম্পাত করা হয়েছে: এ বাক্যকে পূর্বের বাক্যের সাথে আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। এখানে ৺ হরফে জারটি সববিয়া কারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এই কথার কারণে তারাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতিবাদে আরো বলেছেন: بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ বরং তাঁর উভয় হস্ত সদা উন্মুক্ত: অর্থাৎ দান করার ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন। দানের মাধ্যমে তাঁর দুই হাত সদা প্রসারিত।
يُنْفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করেন: এটি স্বতন্ত্র বাক্য। এ বাক্যটি আল্লাহর পূর্ণ বদান্যতার বিষয়টি জোরালোভাবে বর্ণনা করেছে। তাঁর ইচ্ছা অনুপাতেই তিনি ব্যয় করেন। তিনি যখন ইচ্ছা করেন, তখন ব্যয়ের হাত সম্প্রসারিত করেন এবং যখন ইচ্ছা করেন, তখন উহা সংকুচিত করেন। সুতরাং তাঁর হিকমতের দাবী অনুসারে তিনিই সম্প্রসারণকারী এবং তিনিই সংকোচনকারী।
উপরোক্ত দু'টি আয়াতে কারীমা হতে মহান আল্লাহর দু'টি হাত থাকার কথা প্রমাণিত হলো। প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের জন্য শোভনীয় তাঁর দু'টি হাত রয়েছে। এই হাত দু'টি কোন মাখলুকের দুই হাতের মত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
অর্থাৎ তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই (সূরা শুরা ৪২: ১১)।
যারা আল্লাহর প্রকৃত দুই হাতকে অস্বীকার করে, এখানে তাদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সেই সাথে যারা ধারণা করে, হাত দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কুদরত অথবা নিয়ামত উদ্দেশ্য তাদেরও প্রতিবাদ রয়েছে। কেননা হাত দ্বারা যদি কুদরতী হাত উদ্দেশ্য হতো, যেমন বাতিলপন্থীরা ধারণা করে থাকে, তাহলে আল্লাহর উভয় কুদরতী হাত দ্বারা আদমকে খাসভাবে সৃষ্টি করার মধ্যে কোন আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকার কথা বাতিল বলে প্রমাণিত হতো। অর্থাৎ আদমের জন্য কোন আলাদা বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হতো না। কেননা আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুককে এমনকি ইবলীসকেও স্বীয় কুদরতের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আদমকেও যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরত দ্বারাই সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তা'আলার এই বাণী:
لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ )
"যাকে আমি নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি"
এর মধ্যে আদমের জন্য ইবলীসের উপর কী ফাযীলত থাকতে পারে? হাত দ্বারা যদি কুদরত উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ইবলীসের জন্যও এই কথা বলার সুযোগ থাকতো যে, আমাকেও তো তোমার দুই হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছো।
আরো বলা যেতে পারে যে, হাত দ্বারা যদি কুদরত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলার কুদরত মাত্র দু'টি হওয়া আবশ্যক হয়। অথচ মুসলিমদের ঐক্যমতে এ কথা বাতিল বলে প্রমাণিত। কেননা আয়াতের মধ্যে আল্লাহর দুই হাত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সেই সাথে আরো বলা যেতে পারে যে, হাত দ্বারা যদি নিয়ামত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ তা'আলা আদমকে মাত্র দু'টি নিয়ামত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এটি সম্পূর্ণ বাতিল। কেননা আল্লাহর নিয়ামত অসংখ্য, মাত্র দু'টি নয়。

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি চোখের কথা উল্লেখ আছে।

📄 আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি চোখের কথা উল্লেখ আছে।


وَقَوْلُهُ: {وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا } { وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاء لِّمَن كَانَ كُفِرَ} {وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةٌ مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي}
وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا আল্লাহ তা'আলা নাবী কে লক্ষ্য করে বলেন:
“হে নাবী! তোমার রবের ফায়সালা ও হুকুম আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই তুমি আমার চোখে চোখেই আছো (সূরা আত-তুর ৫২:৪৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِّمَن كَانَ كُفِرَ "আর নূহকে আমি কাষ্ঠফলক ও পেরেক সম্বলিত বাহনে আরোহন করিয়ে দিলাম, যা আমার চোখের সামনেই চলছিলো। এ ছিলো সেই ব্যক্তির জন্য প্রতিশোধ, যাকে অস্বীকার করা হয়েছিলো” (সূরা কামার ৫৪:১৩-১৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي "আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও”। (সূরা ত্বহা ২০: ৩৯)
ব্যাখ্যা: الصبر শব্দের আভিধানিক অর্থ বাধা দেয়া ও আটকিয়ে রাখা। দুঃখ- বেদনায় পড়ে বিরক্তি ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা থেকে নফসকে আটকিয়ে রাখা, জবান দিয়ে অভিযোগ করা ও বিরক্তি প্রকাশ করা হতে জবানকে আটকিয়ে রাখা এবং হাত দিয়ে গালে চপেটাঘাত করা ও পরিহিত জামা বুকের দিক থেকে ছিড়ে ফেলা থেকে হাতকে আটকিয়ে রাখাকে শারীয়াতের পরিভাষায় সবর বলা হয়।
لِحُكُم رَبِّكَ তোমার রবের ফায়সালা ও হুকুম আসা পর্যন্ত সবর করো। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত ফায়সালা ও শারীয়াতের ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।
فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا নিশ্চয়ই তুমি আমার চোখে চোখেই আছো: অর্থাৎ আমার দৃষ্টির সামনে এবং আমার হেফাযতের অধীনেই আছো। সুতরাং কাফেররা তোমাকে কষ্ট দিবে, এই পরোয়া করো না। কষ্ট দেয়ার জন্য তারা কখনোই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না।
وَحَمَلْنَاهُ আরোহন করিয়ে দিলাম: নূহ আলাইহিস সালামকে।
عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحِ وَدُسُرٍ কাঠফলক ও পেরেক সম্বলিত: অর্থাৎ লম্বা ও প্রশস্ত কাঠ দিয়ে তৈরী নৌকার মধ্যে তাকে উঠালাম। সেই কাষ্ঠগুলোতে অনেকগুলো পেরেক মেরে দেয়া হয়েছিল। دسر )পেরেক) শব্দটি دسار এর বহুবচন।
تَجْرِي بأَعْيُنِنَا আমার চোখের সামনে দিয়েই চলছিল: অর্থাৎ আমার দৃষ্টি পড়ার স্থান দিয়ে এবং আমার হেফাযতেই চলছিল।
جَزَاءً لِّمَن كَانَ كُفِرَ করা হয়েছিলো: অর্থাৎ আমি নূহ ️ ও তাঁর অনুসারীদেরকে নাজাত দিয়ে তাঁর জাতির অবিশ্বাসী লোকদের সাথে যেই আচরণ করেছিলাম এবং মহাপ্লাবনের পানিতে ডুবিয়ে মেরে যেই শাস্তি তাদেরকে দিয়েছিলাম তা মূলতঃ নূহ এর সাথে কুফুরী করার কারণে ও তাঁর আদেশ অমান্য করার কারণেই।
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম: এখানে মুসাকে সম্বোধন করে এই কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি তোমার উপর আমার ভালবাসা স্থাপন করলাম এবং তোমাকে ভালবাসলাম। সেই সাথে আমার সৃষ্টির কাছেও তোমাকে প্রিয় করে দিলাম।
وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও: অর্থাৎ আমার দৃষ্টির সামনেই যাতে তুমি প্রতিপালিত হও এবং ফিরআউনের ঘরে তোমাকে যেন খাওয়ানো হয়, আমি তোমার জন্য সেই ব্যবস্থা করলাম। সেই সাথে সর্বদা আমি তোমাকে দেখছি, তোমার প্রতি আমার দৃষ্টি রাখছি এবং তোমাকে হেফাজত করছি।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে জানা গেল যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য যেমন দু'টি চোখ শোভনীয়, তাঁর জন্য ঠিক সেরকমই দু'টি চোখ রয়েছে। কুরআনুল কারীমে العين (চোখ) শব্দটি আল্লাহর প্রতি একবচন ও বহুবচন এই উভয়ভাবেই مضاف (সম্বোধিত) হয়েছে। হাদীসেও এটিকে আল্লাহর প্রতি দ্বি-বচন হিসাবে সম্বোধিত হয়েছে। দাজ্জালের হাদীসে নাবী বলেন:
أَنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ)
"নিশ্চয়ই তোমাদের রব অন্ধ নন"। ১৬
এ কথা বলে নাবী তাঁর চোখের দিকে ইঙ্গিত করলেন। এখানে সুস্পষ্ট যে, এই হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহর জন্য একচোখ সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। যার চোখ মাত্র একটি সে তো প্রকাশ্য কানা। আল্লাহ তা'আলা এই দোষের অনেক উর্ধ্বে।
আরবদের ভাষায় مضاف إليه এর অবস্থা অনুপাতে مضاف কখনো একবচন, কখনো দ্বি-বচন আবার কখনো বহুবচন হয়। একবচনের বা বিশেষ্যকে যদি একবচনের ضمير এর (সর্বনামের) দিকে ইযাফত (সম্বন্ধ) করা হয়, তাহলে সেই ইসমকেও একবচন ব্যবহার করতে হয়। যেমন: هذا قلمك এটি তোমার কলম। আর যদি বহুবচনের শব্দের দিকে ইযাফত করা হয়, চাই সে বহুবচন ইসমে যাহের হোক কিংবা সর্বনাম হোক, তাহলে শাব্দিক মিল রাখার জন্য সেই مضاف বা সম্বোধিত পদকে বহুবচন ব্যবহার করাই উত্তম। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَجْرِي بأَعْيُنِنَا আমাদের চোখসমূহের সামনেই নৌকাটি চলছিল।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُم مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا )
"এরা কি দেখে না, আমাদের নিজের হাতসমূহের তৈরী জিনিসের মধ্য থেকে এদের জন্য সৃষ্টি করেছি গবাদি পশু?" (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭১)।
আর যখন আরবরা তাদের ভাষায় দ্বি-বচনের শব্দকে অপর কোন দ্বি-বচনের শব্দের দিকে ইযাফত করে, তখন তারা বাক্যকে অধিকতর ফাসীহ (সুস্পষ্ট) করার জন্য দ্বি-বচনকেও (মুযাফকেও) বহুবচন ব্যবহার করে থাকে। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا )
"তোমাদের দু'জনের মন সরল-সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে" (সূরা তাহরীম ৬৬:৪)।
নাবী এর দুইজন স্ত্রীর অন্তর মাত্র দু'টি। দ্বি-বচনের শব্দকে দ্বি-বচনের দিকে ইযাফত করার কারণে দ্বি-বচন মুযাফকে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং আমরা তোমাকে চোখ দিয়ে দেখছি এবং হাত দিয়ে ধরে রাখছি, এ কথা কোন শ্রোতারই বুঝতে অসুবিধা হয় না। এ থেকে পৃথিবীর কোন মানুষই এ কথা থেকে বুঝে না যে, একটি চেহারায় অনেকগুলো (দুই এর অধিক) চোখ থাকে。

টিকাঃ
১৬. সহীহ: সহীহ বুখারী ৪৪০২, আবু দাউদ ৪৩২০, তিরমিযী ২২৪১。

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তির কথা সাব্যস্ত হয়েছে।

📄 আল্লাহ তা‘আলার শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তির কথা সাব্যস্ত হয়েছে।


وقوله: {قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ} وقوله: {لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاء} {أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لا تَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُم بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ} وقوله: {إِنَّني مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى} وقوله: {أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى} { الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ} {وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَسْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ
"যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করছে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ তোমাদের উভয়ের কথা শুনেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশ্রোতা" (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:০১)। আল্লাহ তা'আলা ইহুদীদের প্রতিবাদ করে বলেন:
لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ
"নিসন্দেহে আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, আল্লাহ হচ্ছেন অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান (সূরা আল-ইমরান ৩:১৮১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ
"তারা কি মনে করে যে আমি তাদের গোপন বিষয় এবং গোপন পরামর্শ শুনিনা? হ্যাঁ, শুনি। আমার প্রেরিত দূতগণ তাদের নিকটে থেকে লিপিবদ্ধ করে” (যুখরুফ ৪৩:৮০)। আল্লাহ তা'আলা মুসা ও তাঁর ভাই হারূন কে লক্ষ্য করে বলেন:
إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى
"আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি শুনি ও দেখি (সূরা তোহা ২০: ৪৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
أَلَمْ يَعْلَم بِأَنَّ اللَّهَ يَرَى
“সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখছেন?” (সূরা আলাক ৯৬:১৪) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ * وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ * إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
"যিনি তোমাকে দেখেন যখন তুমি উঠো এবং সিজদাকারীদের মধ্যে তোমার ওঠা-বসা ও নড়া-চড়ার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুআরা ২৬:২১৮-২২০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ ﴾
"হে নাবী! তাদেরকে বলে দাও, তোমরা আমল করতে থাকো। আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনগণ তোমাদের আমল দেখবেন (সূরা সূরা তাওবা ৯: ১০৫)
ব্যাখ্যা: قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي "আল্লাহ তার কথা শুনেছেন: খাওলা বিনতে ছা'লাবার কথা বলা হয়েছে।
تُجَادِلُكَ তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে: হে নাবী! সে তোমার সাথে তার স্বামীর ব্যাপারে বারবার কথা বলছিল। খাওলার স্বামীর নাম ছিল আওস বিন সামেত। আর এটি ছিল ঐ সময়ের ঘটনা, যখন সে তার স্ত্রীর সাথে যিহার (যাদের সাথে বিবাহ বন্ধন হারাম, নিজের স্ত্রীকে তাদের কারো সাথে তুলনা করাকে যিহার বলা হয়) করেছিল।
وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهُ সে আল্লাহর নিকট অভিযোগ পেশ করছে: এ বাক্যটিকে এর সাথে আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, রসূল যখন আওসের স্ত্রী খাওলাকে বললেন, قد (حرمت عليه তুমি তোমার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে গিয়েছো, তখন খাওলা বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! তিনি তো তালাক শব্দ উচ্চারণ করেননি। অতঃপর খাওলা বলতে লাগল, আমি আল্লাহর কাছেই আমার অভাব-অনটনের অভিযোগ করছি এবং আমার নিঃসঙ্গের কথা তাঁকেই জানাচ্ছি। জেনে রাখুন: আমার রয়েছে আওসের পক্ষ হতে কয়েকটি শিশু সন্তান। আমি যদি সন্তানগুলোকে তার নিকট সোপর্দ করি, তাহলে তারা ধ্বংস হবে এবং আমার কাছে নিয়ে আসলেও ক্ষুধায় মরবে। এই বলে সে আকাশের দিকে মাথা উঠাচ্ছিল এবং বলছিল: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট অভিযোগ করছি।
وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا অর্থাৎ তিনি তোমাদের কথার পুনরাবৃত্তি শ্রবণ করেন।
إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা: তিনি সব আওয়াজ শ্রবণ করেন এবং সব মাখলুকের প্রতিই রয়েছে তাঁর দৃষ্টি। এই মহিলাটি তোমার সাথে যেই বাদানুবাদ করছে এবং একই কথার পুনরাবৃত্তি করছে, তাও আল্লাহর শ্রুত আওয়াজ সমূহের অন্তর্ভুক্ত।
لَقَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ আল্লাহ ঐসব লোকদের কথা শুনেছেন, যারা বলেছে, আল্লাহ হচ্ছেন অভাবগ্রস্ত আর আমরা বিত্তবান: এরা হচ্ছে ইহুদীদের একটি দল। আল্লাহ তা'আলা যখন এই আয়াত নাযিল করলেন:
﴿مَّن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا ﴾
"তোমাদের মধ্যে কে আল্লাহকে করযে হাসানা দিতে প্রস্তুত?” (সূরা বাকারা ২:২৪৫)।
তখন ইহুদীরা উপরোক্ত কথাটি বলেছিল। দুর্বল ও দরিদ্র লোকদের সাথে ছলনা করার জন্যই তারা উক্ত কথা বলেছিল। আসলে তারা বিশ্বাস করতো না যে, আল্লাহ ফকীর আর তারা ধনী। কেননা তারা আসমানী কিতাবের অধিকারী ছিল। দ্বীন ইসলামের মধ্যে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয়ার জন্যই তারা এই ধরণের কথা বলেছিল।
أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ তারা কি মনে করে যে আমি তাদের গোপন বিষয় শুনি না? তারা তাদের মনের মধ্যে যেই বিষয় গোপন করে অথবা নির্জন স্থানে একত্রিত হয়ে পরস্পর যেই আলোচনা করে আল্লাহ তা'আলা তা জানেন।
وَنَجْوَاهُمْ গোপন পরামর্শ: অর্থাৎ তিনি তাদের গোপন পরামর্শও জেনে ফেলেন। তারা নিজেদের পরস্পরের মধ্যে যেই গোপন পরামর্শ করে আল্লাহ তা'আলা তাও জানেন। মানুষ তার ঘনিষ্ট বন্ধুর সাথে গোপনে যেই আলাপ করে এবং অন্যদের থেকে তা ছাপিয়ে রাখে, তাকেই নাজওয়া বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: হ্যাঁ, আমি সেই গোপন আলাপ সম্পর্কে জানতে পারি এবং তা শুনে ফেলি।
وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ আমার প্রেরিত দূতগণ তাদের নিকটে থাকে ও লিপিবদ্ধ করে: অর্থাৎ সম্মানিত লেখকগণ তাদের নিকট অবস্থান করে তাদের থেকে যেসব কথা ও কাজ প্রকাশিত হয়, তার সবই লিখে ফেলেন।
إِنَّنِي مَعَكُمَا আমি তোমাদের সাথে আছি: আল্লাহ তা'আলা যখন মুসা ও হারুনকে ফেরআউনের নিকট পাঠিয়েছিলেন তখন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, إِنَّنِي مَعَكُمَا আমি তোমাদের সাথে আছি। এই কথার অর্থ হচ্ছে তোমাদেরকে হেফাযত করার মাধ্যমে এবং তোমাদেরকে সাহায্য করার মাধ্যমে তোমাদের সাথে আছি।
أَسْمَعُ وَأَرَى আমি শুনি এবং দেখি: অর্থাৎ আমি তোমাদের উভয়ের কথা শুনছি এবং তোমাদের শত্রুর কথাও শুনছি। সে সাথে তোমরা দু'জন যে স্থানে অবস্থান করছো তা আমি দেখছি এবং তোমাদের শত্রু যে স্থানে আছে, সে স্থানও দেখছি। তোমরা দুইজন যা করছো এবং সে যা করছে, তাও দেখছি। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, لا تخف তোমরা ভয় করো না।
أَلَمْ يَعْلَم সে কি জানে না? এখানে আবু জাহেলের দিকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলা হয়েছে। সে যখন রসূল ﷺ কে কাবার চত্বরে সলাত পড়তে নিষেধ করেছিল।
بَأَنَّ اللَّهَ يَرَى আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখছেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাকে দেখছেন এবং তার কথা শুনছেন? আল্লাহ তা'আলা অচিরেই তাকে তার কাজের পূর্ণ সাজা দিবেন। এই প্রশ্নের মাধ্যমে তাকে ভয় দেখানো হয়েছে এবং ধমক দেয়া হয়েছে।
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ তিনি তোমাকে দেখতে থাকেন যখন তুমি উঠো: অর্থাৎ যখন তুমি একাকী সলাতের জন্য উঠো ও সলাত পড়ো তখন আল্লাহ তা'আলা তোমাকে দেখেন।
وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ সিজদাকারীদের মধ্যে তোমার ওঠা-বসা এবং নড়া-চড়ার প্রতিও তিনি দৃষ্টি রাখেন: অর্থাৎ তুমি যখন জামা'আতের সাথে সলাত আদায় করার সময় রুকুতে থাকো কিংবা সাজদায় থাকো অথবা দাঁড়ানো থাকো, তখনও আল্লাহ তোমাকে দেখেন।
إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ তুমি যা বলো, তিনি অবশ্যই উহা শুনেন এবং তা জানতে পারেন।
وَقُلِ اعْمَلُوا হে নাবী! তাদেরকে বলে দাও, তোমরা আমল করতে থাকো: আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ ﷺ কে উদ্দেশ্য করে বলছেন, হে মুহাম্মাদ! তুমি এইসব মুনাফেকদেরকে বলে দাও যে, তোমরা যা ইচ্ছা আমল করতে থাকো এবং তোমরা তোমাদের বাতিল পথেই চলতে থাকো। কিন্তু তোমরা এই কথা মনে করো না যে, তোমাদের আমলসমূহ গোপন থাকবে।
فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মুমিনগণ! তোমাদের কাজ দেখবেন: অর্থাৎ মানুষের সামনে তোমাদের আমলসমূহ প্রকাশিত হবে এবং দুনিয়াতেই তা দেখা যাবে।
মৃত্যুর পর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে এমন এক সত্তার দিকে, إِلَى عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ 'যিনি প্রকাশ্য ও গুপ্ত সবকিছুই জানেন এবং তোমরা কি করতে তা তিনি তোমাদের বলে দেবেন।' অতঃপর তিনি সেই আমলগুলোর বদলা দিবেন।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ মিলে যে, তাতে আল্লাহ তা'আলাকে শ্রবণ করা ও দেখা বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ শ্রবণ করেন ও দেখেন। তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য যেভাবে শ্রবণ করা ও দেখা শোভনীয়, তিনি সেভাবেই দেখেন ও শুনেন। তবে তিনি সৃষ্টির সিফাতসমূহ থেকে এবং সৃষ্টির সাদৃশ্য হওয়া থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।
উপরের আয়াতগুলো আল্লাহর জন্য শ্রবণ করা এবং দেখা সাব্যস্ত করার ব্যাপারে একদম সুস্পষ্ট। তাতে فعل ماضي তথা অতীত কালের জন্য তৈরী শব্দ قد سمع (অবশ্যই শুনেছেন) এর মাধ্যমে, فعل مضارع তথা বর্তমান-ভবিষ্যতের জন্য গঠিত শব্দ يسمع (শুনছেন) এর মাধ্যমে এবং اسم فاعل তথা কর্তৃবাচক বিশেষ্যের জন্য গঠিত শব্দ سمیع (শ্রবণকারী) এর মাধ্যমে আল্লাহর জন্য শ্রবণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। মোট কথা سمع, يسمع, سمیع এই তিনটি শব্দ আল্লাহর জন্য শ্রবণ করা বিশেষণ অত্যন্ত জোরালোভাবেই সাব্যস্ত করেছে। যে বস্তু বা প্রাণী শুনতে পায় না আরবদের ভাষায় তাকে শ্রবণকারী ও দ্রষ্টা বলা সঠিক নয়। যে প্রাণী বা বস্তু শুনতে পায় এবং দেখতে পায়, শুধু তার ক্ষেত্রেই বলা হয় যে, يسمع ويصر। এটিই হচ্ছে এ ক্ষেত্রে মূলনীতি। আরবীতে এ কথা বলা হয় না الجبل سميع بصير পাহাড় শুনে ও দেখে। যে শুনে এবং দেখে তাকে ছাড়া অন্য কারো জন্য এই কথা বলা অসম্ভব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00