📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 ক্বিয়ামতের দিন বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার উদ্দেশে আল্লাহ তা‘আলা সেভাবেই নেমে আসবেন, যেভাবে নেমে আসা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।

📄 ক্বিয়ামতের দিন বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার উদ্দেশে আল্লাহ তা‘আলা সেভাবেই নেমে আসবেন, যেভাবে নেমে আসা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।


وقوله: {هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ وَالْمَلَائِكَةُ وَقُضِيَ الأَمْرُ} وقوله: {هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن تَأْتِيهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ} { كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الأَرْضُ دَكَّا دَكَّا وَجَاء رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا} {وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءِ بِالْغَمَامِ وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَنزِيلًا}
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ وَالْمَلَائِكَةُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ
"তারা কেবল সেই সময়ের অপেক্ষায় বসে আছে, যখন মেঘমালার ছায়াসহ স্বয়ং আল্লাহ তাদের সামনে আগমন করবেন, বিপুল পরিমাণ ফেরেশতাগণও তাদের সামনে আসবেন। তখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে (সূরা বাকারা ২:২১০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَنْ تَأْتِيَهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ
"তারা শুধু এ বিষয়ের দিকে চেয়ে আছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আগমন করবে কিংবা তোমার পালনকর্তা আগমন করবেন। অথবা তোমার পালনকর্তার কোন নিদর্শন আসবে (সূরা আনআম ৬:১৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا * وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا )
“কখনই নয়, পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করে বালুকাময় করে দেয়া হবে এবং তোমার রব এমন অবস্থায় আসবেন, যখন ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে (সূরা ফাজর ৮৯:২১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَنزِيلًا
"সেদিন আকাশ ফুড়ে একটি মেঘমালার উদয় হবে এবং ফেরেশতাদেরকে দলে দলে নামিয়ে দেয়া হবে" (সূরা ফুরকান ২৫: ২৫)।
ব্যাখ্যা: هَلْ يَنظُرُونَ তারা কেবল সেই সময়ের অপেক্ষায় বসে আছে,: শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারী যেসব কাফের ইসলামে প্রবেশ করেনি, এখানে তাদের জন্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ينظرون অর্থ অপেক্ষা করছে। نظر এবং انتظر শব্দদ্বয় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।
إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ যখন আল্লাহ তা'আলা আসবেন: কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা মানুষের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য আগমন করবেন। তারা শুধু সেই দিনের অপেক্ষায় বসে আছে, যেদিন আল্লাহ বিচার করবেন এবং প্রত্যেককে আমল অনুযায়ী বদলা দিবেন।
فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ মেঘমালার ছায়াসহ: ظل শব্দটি ظلة -এর বহুবচন। যা আপনাকে ছায়া দেয়, তাকেই যুল্লাহ বলা হয়। আর হালকা-পাতলা সাখা মেঘমালাকে বলা হয় গামাম। মেঘমালাকে غمام হিসাবে নাম রাখার কারণ হলো, মেঘমালা তার নীচের প্রত্যেক বস্তু বা ব্যক্তিকে ঢেকে ফেলে। মূলতঃ غم يغم অর্থ হচ্ছে ستر پستر অর্থাৎ ঢেকে রাখা।
وَالْمَلائِكَة ফেরেশতাগণ: কিয়ামাতের দিন ফেরেশতাগণ মেঘমালার সাথে আগমন করবেন।
وَقُضِيَ الْأَمْرِ তখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে: অর্থাৎ তাদের ধ্বংসের ব্যাপারটি নিস্পত্তি হয়ে যাবে।
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَنْ تَأْتِيَهُمُ الْمَلَائِكَةُ আছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আগমন করবে: অর্থাৎ তাদের রূহ কবয করার জন্য ফেরেশতাগণ আগমন করবে। এখানে মৃত্যুর ফেরেশতা উদ্দেশ্য।
أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ কিংবা তোমার পালনকর্তা আগমন করবেন: অর্থাৎ তোমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য স্বয়ং চলে আসবেন।
أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ অথবা তোমার পালনকর্তার কোন নিদর্শন আসবে: এখানে নিদর্শন বলতে আখেরী যামানায় পশ্চিম দিকে সূর্য উদয় উদ্দেশ্য। আখেরী যামানায় সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। এটি কিয়ামাতের অন্যতম একটি বড় আলামত। যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে, তখন তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তখন কারো তাওবা কবুল হবে না।
কല്ലാ কখনই নয়: এটি এমন একটি অব্যয়, যা তার পূর্বে উল্লেখিত বিষয় হতে ধমক দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ ইয়াতীমের সাথে সম্মানজনক ব্যবহার না করা ঠিক নয় এবং মিসকীনকে খাদ্য প্রদান করার উৎসাহ না দেয়া ঠিক নয়। সেই সাথে মীরাসের ধন-সম্পদ সম্পূর্ণরূপে খেয়ে ফেলা এবং মালকে প্রচুর ভালবাসাও ঠিক নয়।
إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا দেয়া হবে: অর্থাৎ যখন পৃথিবীকে প্রকম্পিত করা হবে এবং উহাকে পরপর খুব জোরে ধাক্কা দেয়া হবে। ফলে পৃথিবীর উপরস্থ সকল নির্মিত বস্তু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বালুকণায় পরিণত হবে।
وَجَاءَ رَبُّكَ তোমার রব এমন অবস্থায় আসবেন: আল্লাহ তা'আলা নিজেই বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করার জন্য নেমে আসবেন।
وَالْمَلَكُ ফেরেশতারা: এখানে ফেরেশতা বলতে সকল ফেরেশতা উদ্দেশ্য।
صَفًّا صَفًّا সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে: হাল হিসাবে মানসুব হয়েছে।
অর্থাৎ তারা কাতারের পর কাতারবন্দী অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তারা সকল জিন-ইনসানকে ঘিরে ফেলবে। প্রত্যেক আসমানের ফেরেশতাগণ একেক কাতারে দাঁড়িয়ে পৃথিবী এবং উহার সকল দিক থেকে ঘিরে ফেলবে। কিয়ামাতের দিন সাত আসমানের ফেরেশতাদের মোট সাতটি কাতার হবে।
সদিন আকাশ ফুঁড়ে একটি মেঘমালার উদয় وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ হবে: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন আকাশ ফেটে যাবে। আকাশ ফেটে নূরের এমন একটি বিরাট মেঘমালার উদয় হবে, যা দৃষ্টিসমূহকে ধাঁধিয়ে ফেলবে।
وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَعْرِيلًا ফেরেশাতাদের দলে দলে নামিয়ে দেয়া হবে: ফেরেশতাদেরকে সেদিন দলে দলে পৃথিবীতে নামানো হবে। তারা নেমে এসে হাশরের ময়দানে সমস্ত সৃষ্টিকে ঘিরে ফেলবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য নেমে আসবেন।
উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করছে যে, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সত্তাসহ (নিজেই) আগমন করবেন। যেভাবে আগমন করা তাঁর মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য শোভনীয়, বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করার জন্য তিনি সেভাবেই নেমে আসবেন। আল্লাহ তা'আলার নেমে আসা তাঁর কর্মগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতভাবেই ইহাকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা আবশ্যক। আল্লাহর আগমন করাকে তাঁর আদেশ ও রহমত আসার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা বৈধ নয়। যেমন করে থাকে আল্লাহর সিফাতকে অবিশ্বাসকারী সম্প্রদায়। তারা বলে থাকে وَجَاءَ رَبُّكَ তোমার রব আসবেন অর্থ হচ্ছে তোমার রবের আদেশ আসবে। এই ব্যাখ্যা আল্লাহর আয়াতকে পরিবর্তন করার শামিল।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: আল্লাহ তা'আলার দিকে যেই আগমন ও আসার সম্বন্ধ করা হয়েছে, তা দুই প্রকার। একটি হচ্ছে مطلق (সাধারণ ও কোন কিছু ছাড়াই) আগমন করা। আরেকটি হচ্ছে মুক্বাইয়িদ (কয়েদযুক্ত তথা কোন কিছু নিয়ে) আগমন করা। আল্লাহর আগমন দ্বারা যদি তাঁর রহমত, আযাব এবং অনুরূপ অন্য কিছু আসা উদ্দেশ্য হয়, তখন সেই আগমনকে কয়েদযুক্ত করা হয়। যেমন হাদীসে এসেছে, حتي جاء الله بالرحمة والخير পরিশেষে আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ আগমন করল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَقَدْ جِئْنَاهُم بِكِتَابٍ فَصَّلْنَاهُ عَلَى عِلْمٍ )
"আমি এদের কাছে এমন একটি কিতাব নিয়ে এসেছি, যাকে পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশদ ব্যাখ্যামূলক করেছি (সূরা আরাফ ৭:৫২)।"
আর আল্লাহর দিকে যেই মুতলাক (সাধারণ) আগমনের সম্বন্ধ করা হয়েছে, তা দ্বারা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার আগমন উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ ﴾
"তারা কেবল সেই সময়ের অপেক্ষায় বসে আছে, যখন মেঘমালার ছায়াসহ স্বয়ং আল্লাহ তাদের সামনে আগমন করবেন? (সূরা বাকারা ২:২১০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
"তোমার রব এমন অবস্থায় আসবেন, যখন ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে” (সূরা ফাজর ৮৯:২২)।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য চেহারা সাব্যস্ত করণ।

📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য চেহারা সাব্যস্ত করণ।


وقوله: {وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ} {كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ}
وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"একমাত্র তোমার সেই রবের চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে, যিনি মহিয়ান ও মহানুভব (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: كُلُّ شَيْءٍ هَالِكَ إِلَّا وَجْهَهُ "তাঁর চেহারা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংস হবে" (সূরা কাসাস ২৮:৮৮)।
ব্যাখ্যা: وَيُقى وَجْهُ رَبِّكَ একমাত্র তোমার পালনকর্তার চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে। এ আয়াতের পূর্বে রয়েছে, كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ "ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংস হবে" (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৬)। এখানে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে,
যমীনের সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে এবং সকল বস্তুই ধ্বংস হবে। মহান প্রভুর চেহারা ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ তা'আলার কখনো মৃত্যু হবে না। তিনি সেই চিরঞ্জীবন্ত সত্তা, যার কখনোই মৃত্যু হবে না।
ذُو الْجَلَالِ যিনি মহিমময়: অর্থাৎ বড়ত্ব ও মর্যাদার অধিকারী।
وَالإكرام মহানুভব: অনুগ্রহ ও সম্মানের অধিকারী। অর্থাৎ তিনি নাবী- রসূল এবং তাঁর সৎ বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করার মাধ্যমে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: الإكرام অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা এমন প্রত্যেক জিনিসের উর্ধ্বে, যা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
كُلِّ شَيْءٍ هَالِكَ সব জিনিসই ধ্বংস হবে: আসমান ও যমীনে যা আছে, তার প্রত্যেকটিই ধ্বংস হবে এবং মৃত্যু বরণ করবে।
إِلَّا وَجْهَهُ কেবল তাঁর চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে: وجهه শব্দটি মুস্তাসনা হিসাবে মানসুব হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পর কেবল তিনিই অবশিষ্ট থাকবেন। সমস্ত মাখলুক মৃত্যু বরণ করার পরও তাঁর মৃত্যু হবে না।
উপরোক্ত দু'টি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার চেহারা থাকার কথা প্রমাণিত হলো। আল্লাহর চেহারা আল্লাহর সত্তাগত সিফাত।
প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর চেহারা রয়েছে। যে রকম চেহারা আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় তাঁর চেহারা ঠিক সে রকমই। তা কোন মাখলুকের চেহারার মত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই (সূরা শুরা ৪২:১১)
আমরা আল্লাহর সিফাতকে বাতিলকারী সম্প্রদায়ের লোকদের মত কথা বলি না। তারা বলে আল্লাহর চেহারা দ্বারা আসল অর্থ উদ্দেশও নয়; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সত্তা কিংবা ছাওয়াব, অথবা দিক অথবা অন্যান্য উদ্দেশ্য। এই ব্যাখ্যাগুলো একাধিক কারণে বাতিল।
(ক) হাদীসে আল্লাহর চেহারাকে আল্লাহর সত্তার উপর আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে আল্লাহর সত্তাকে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর তাঁর চেহারা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহর যাত (সত্তা) এবং তাঁর চেহারা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস।
রসূল ﷺ তাঁর দু'আয় বলেছেন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
"আমি মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর সম্মানিত চেহারা এবং তাঁর চিরস্থায়ী ক্ষমতার ওয়াসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা করছি”। ১৫
আতফের অন্যতম দাবী হচ্ছে, তা পরস্পর ভিন্ন জিনিস বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
(খ) উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহর চেহারাকে তাঁর সত্তার দিকে সম্বোধিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَجْهُ رَبِّكَ “তোমার পালনকর্তার চেহারা”। আর চেহারাকে বিশেষিত করা হয়েছে ذُو الْجَلَالِ والإكرام মহিয়ান ও দয়াবান, এই দু'টি বিশেষণের মাধ্যমে। وجه )চেহারা) দ্বারা যদি যাত বা সত্তা উদ্দেশ্য হত, তাহলে উক্ত আয়াতের মধ্যে الوجه শব্দটি সিলা হিসাবে ব্যবহৃত হত। অর্থাৎ তা رب এর সিফাত হিসাবে ব্যবহৃত হত; الوجه -এর সিফাত হতো না। তখন এভাবে বলা হতো, وَجْهُ رَبِّكَ ذي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ । তা না বলে যখন ذُو الْجَلال والإكرام বলা হয়েছে, তাতে বুঝা গেল যে, উহা চেহারার সিফাত হয়েছে, সত্তার সিফাত হয়নি। ঐদিকে আবার الوجه )চেহারা) আল্লাহর সত্তার সিফাত হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
(গ) কোন জাতির ভাষাতেই এটি পাওয়া যায় না যে, কোন জিনিসের চেহারা বলতে যাত (সত্তা) কিংবা ছাওয়াব বুঝায়। আরবী ভাষায় الوجه বলতে প্রত্যেক বস্তুর অগ্রভাগ ও সামনের অংশ বুঝায়। কেননা কোন বস্তুর দিকে অগ্রসর হলে সর্বপ্রথম অগ্রভাগই সামনে পড়ে। যেসব বস্তুর দিকে চেহারাকে ইযাফত বা সম্বন্ধ করা হবে সেসব বস্তু অনুযায়ীই চেহারার অর্থ হবে। وجه শব্দটিকে যদি কোনা সময়ের দিকে সম্বন্ধ করা হয়, তাহলে ইহার অর্থ হবে প্রথম সময়। যেমন বলা হয়, وجه النهار তথা দিবসের প্রথমাংশ। কোন প্রাণীর দিকে ইযাফত করলে উহার অর্থ হবে সেই প্রাণীর অঙ্গ বিশেষ। যেমন বলা হয়, وجه الفرس তথা ঘোড়ার চেহারা। আর যদি কোন পাহাড় বা দেয়ালের দিকে ইযাফত করা হয়, তাহলে উহার অর্থ হবে পাহাড় বা দেয়ালের চূড়া। যেমন বলা হয়, وجه الجبل তথা পাহাড়ের উপরের অংশ, وجه الجدار দেয়ালের সামনের অংশ ইত্যাদি। আর যখন চেহারাকে আল্লাহর দিকে ইযাফত করা হবে, তখন ইহার অর্থ হবে তাঁর অন্যতম সিফাত, যা কোন মাখলুকের সিফাতের অনুরূপ নয়。

টিকাঃ
১৫. সহীহ: সুনানে আবু দাউদ ৪৬৬।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি হাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।

📄 কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি হাতের কথা উল্লেখ রয়েছে।


وقوله: {مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ وقوله {وَقَالَتِ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُواْ بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاء}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ )
"যাকে আমি নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি তাঁর সম্মুখে সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৫) আল্লাহ আরো বলেন: وَقَالَتْ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ
"আর ইহুদীরা বলে: আল্লাহর হাত বাঁধা হয়ে গেছে। তাদের হাতই বাঁধা হয়ে গেছে। এ কথা বলার কারণে তাদের উপর অভিসম্পাত করা হয়েছে; বরং তাঁর উভয় হস্ত সদা উন্মুক্ত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করেন” (সূরা মায়িদা ৫:৬৪)।
ব্যাখ্যা: مَا مَنَعَكَ أَن تَسْجُدَ " সেজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? (সূরা সোয়াদ ৩৮:৭৫) আয়াতে ইবলীসকে সম্বোধন করে ধমক দেয়া হয়েছে। অভিশপ্ত ইবলীস যখন আদম কে সাজদা করা হতে বিরত রইল তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে স্বীয় রহমত থেকে বিতাড়িত করলেন এবং বললেন: لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ “যাকে আমি নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি: অর্থাৎ আমি যাকে কোন কিছুর মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি নিজের দুই হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছি, তাকে সাজদা করা হতে কোন জিনিস তোমাকে ফিরিয়ে রাখল? এ থেকে আদম এর জন্য সম্মান ও মর্যাদা সাব্যস্ত হয়।
وَقَالَتِ الْيَهُودُ আর ইহুদীরা বলে: ইহুদীদের কথা,﴾ هُدْنَا إِلَيْكَ "আমরা তোমার নিকট ফিরে আসলাম বা তাওবা করলাম" থেকে ইয়াহুদ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তখন তাদের জন্য এটি একটি সম্মানজনক নাম ছিল। তাদের শারীয়াত মানসুখ হয়ে যাওয়ার পর যদিও তাতে এখন সম্মানের কোন অর্থ নেই, তথাপিও এই নামটি তাদের জন্য লাযেম হয়ে আছে।
আবার কেউ কেউ বলেছেন ইয়াকুব এর অন্যতম পুত্র ইয়াহুদা বিন ইয়াকুবের দিকে নিসবত (সম্বন্ধ) করেই তাদেরকে ইহুদী বলা হয়েছে।
يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ আল্লাহর হাত বাঁধা হয়ে গেছে: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা এখানে ইহুদীদের সম্পর্কে বলছেন, তারা আল্লাহকে কৃপণ বলে আখ্যায়িত করেছে। যেমন তারা আরো বলেছিল, আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন ফকীর এবং তারা হলো ধনী। আল্লাহর হাত বাঁধা হয়ে গেছে, তাদের এই কথা দ্বারা মূলতঃ তারা এটি উদ্দেশ্য করেনি যে, আল্লাহর হাতে বেড়ী লাগিয়ে বেঁধে দেয়া হয়েছে।
غُلَتْ أَيْدِيهِمْ তাদের হাতই বাঁধা হয়ে গেছে: আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে এ কথার মাধ্যমে তাদের কথার প্রতিবাদ করা হয়েছে এবং তারা যেই মিথ্যা রচনা করেছে, তার মোকাবেলায় উপরোক্ত কথা বলা হয়েছে। আসলে তাদের এরূপই হয়েছিল। তাদের মধ্যে রয়েছে প্রচুর কৃপণতা এবং মারাত্মক হিংসা। আপনি ইহুদীদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক কৃপণ হিসাবে দেখতে পাবেন।
وَلُعِنُوا بِمَا قَالُو তাদের এই কথা বলার কারণে তাদের উপর অভিসম্পাত করা হয়েছে: এ বাক্যকে পূর্বের বাক্যের সাথে আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। এখানে ৺ হরফে জারটি সববিয়া কারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এই কথার কারণে তারাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতিবাদে আরো বলেছেন: بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ বরং তাঁর উভয় হস্ত সদা উন্মুক্ত: অর্থাৎ দান করার ক্ষেত্রে তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন। দানের মাধ্যমে তাঁর দুই হাত সদা প্রসারিত।
يُنْفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যয় করেন: এটি স্বতন্ত্র বাক্য। এ বাক্যটি আল্লাহর পূর্ণ বদান্যতার বিষয়টি জোরালোভাবে বর্ণনা করেছে। তাঁর ইচ্ছা অনুপাতেই তিনি ব্যয় করেন। তিনি যখন ইচ্ছা করেন, তখন ব্যয়ের হাত সম্প্রসারিত করেন এবং যখন ইচ্ছা করেন, তখন উহা সংকুচিত করেন। সুতরাং তাঁর হিকমতের দাবী অনুসারে তিনিই সম্প্রসারণকারী এবং তিনিই সংকোচনকারী।
উপরোক্ত দু'টি আয়াতে কারীমা হতে মহান আল্লাহর দু'টি হাত থাকার কথা প্রমাণিত হলো। প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের জন্য শোভনীয় তাঁর দু'টি হাত রয়েছে। এই হাত দু'টি কোন মাখলুকের দুই হাতের মত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
অর্থাৎ তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই (সূরা শুরা ৪২: ১১)।
যারা আল্লাহর প্রকৃত দুই হাতকে অস্বীকার করে, এখানে তাদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সেই সাথে যারা ধারণা করে, হাত দ্বারা আল্লাহ তা'আলার কুদরত অথবা নিয়ামত উদ্দেশ্য তাদেরও প্রতিবাদ রয়েছে। কেননা হাত দ্বারা যদি কুদরতী হাত উদ্দেশ্য হতো, যেমন বাতিলপন্থীরা ধারণা করে থাকে, তাহলে আল্লাহর উভয় কুদরতী হাত দ্বারা আদমকে খাসভাবে সৃষ্টি করার মধ্যে কোন আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকার কথা বাতিল বলে প্রমাণিত হতো। অর্থাৎ আদমের জন্য কোন আলাদা বৈশিষ্ট্য প্রমাণিত হতো না। কেননা আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুককে এমনকি ইবলীসকেও স্বীয় কুদরতের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং আদমকেও যদি আল্লাহ তা'আলা স্বীয় কুদরত দ্বারাই সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তা'আলার এই বাণী:
لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ )
"যাকে আমি নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি"
এর মধ্যে আদমের জন্য ইবলীসের উপর কী ফাযীলত থাকতে পারে? হাত দ্বারা যদি কুদরত উদ্দেশ্য হতো, তাহলে ইবলীসের জন্যও এই কথা বলার সুযোগ থাকতো যে, আমাকেও তো তোমার দুই হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছো।
আরো বলা যেতে পারে যে, হাত দ্বারা যদি কুদরত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলার কুদরত মাত্র দু'টি হওয়া আবশ্যক হয়। অথচ মুসলিমদের ঐক্যমতে এ কথা বাতিল বলে প্রমাণিত। কেননা আয়াতের মধ্যে আল্লাহর দুই হাত সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সেই সাথে আরো বলা যেতে পারে যে, হাত দ্বারা যদি নিয়ামত উদ্দেশ্য হয়, তাহলে অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ তা'আলা আদমকে মাত্র দু'টি নিয়ামত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। এটি সম্পূর্ণ বাতিল। কেননা আল্লাহর নিয়ামত অসংখ্য, মাত্র দু'টি নয়。

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি চোখের কথা উল্লেখ আছে।

📄 আল্লাহ তা‘আলার দু‘টি চোখের কথা উল্লেখ আছে।


وَقَوْلُهُ: {وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا } { وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاء لِّمَن كَانَ كُفِرَ} {وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةٌ مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي}
وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا আল্লাহ তা'আলা নাবী কে লক্ষ্য করে বলেন:
“হে নাবী! তোমার রবের ফায়সালা ও হুকুম আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই তুমি আমার চোখে চোখেই আছো (সূরা আত-তুর ৫২:৪৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحٍ وَدُسُرٍ تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا جَزَاءً لِّمَن كَانَ كُفِرَ "আর নূহকে আমি কাষ্ঠফলক ও পেরেক সম্বলিত বাহনে আরোহন করিয়ে দিলাম, যা আমার চোখের সামনেই চলছিলো। এ ছিলো সেই ব্যক্তির জন্য প্রতিশোধ, যাকে অস্বীকার করা হয়েছিলো” (সূরা কামার ৫৪:১৩-১৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي "আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও”। (সূরা ত্বহা ২০: ৩৯)
ব্যাখ্যা: الصبر শব্দের আভিধানিক অর্থ বাধা দেয়া ও আটকিয়ে রাখা। দুঃখ- বেদনায় পড়ে বিরক্তি ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা থেকে নফসকে আটকিয়ে রাখা, জবান দিয়ে অভিযোগ করা ও বিরক্তি প্রকাশ করা হতে জবানকে আটকিয়ে রাখা এবং হাত দিয়ে গালে চপেটাঘাত করা ও পরিহিত জামা বুকের দিক থেকে ছিড়ে ফেলা থেকে হাতকে আটকিয়ে রাখাকে শারীয়াতের পরিভাষায় সবর বলা হয়।
لِحُكُم رَبِّكَ তোমার রবের ফায়সালা ও হুকুম আসা পর্যন্ত সবর করো। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত ফায়সালা ও শারীয়াতের ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।
فَإِنَّكَ بِأَعْيُنِنَا নিশ্চয়ই তুমি আমার চোখে চোখেই আছো: অর্থাৎ আমার দৃষ্টির সামনে এবং আমার হেফাযতের অধীনেই আছো। সুতরাং কাফেররা তোমাকে কষ্ট দিবে, এই পরোয়া করো না। কষ্ট দেয়ার জন্য তারা কখনোই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না।
وَحَمَلْنَاهُ আরোহন করিয়ে দিলাম: নূহ আলাইহিস সালামকে।
عَلَى ذَاتِ أَلْوَاحِ وَدُسُرٍ কাঠফলক ও পেরেক সম্বলিত: অর্থাৎ লম্বা ও প্রশস্ত কাঠ দিয়ে তৈরী নৌকার মধ্যে তাকে উঠালাম। সেই কাষ্ঠগুলোতে অনেকগুলো পেরেক মেরে দেয়া হয়েছিল। دسر )পেরেক) শব্দটি دسار এর বহুবচন।
تَجْرِي بأَعْيُنِنَا আমার চোখের সামনে দিয়েই চলছিল: অর্থাৎ আমার দৃষ্টি পড়ার স্থান দিয়ে এবং আমার হেফাযতেই চলছিল।
جَزَاءً لِّمَن كَانَ كُفِرَ করা হয়েছিলো: অর্থাৎ আমি নূহ ️ ও তাঁর অনুসারীদেরকে নাজাত দিয়ে তাঁর জাতির অবিশ্বাসী লোকদের সাথে যেই আচরণ করেছিলাম এবং মহাপ্লাবনের পানিতে ডুবিয়ে মেরে যেই শাস্তি তাদেরকে দিয়েছিলাম তা মূলতঃ নূহ এর সাথে কুফুরী করার কারণে ও তাঁর আদেশ অমান্য করার কারণেই।
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي আমি নিজের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলাম: এখানে মুসাকে সম্বোধন করে এই কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি তোমার উপর আমার ভালবাসা স্থাপন করলাম এবং তোমাকে ভালবাসলাম। সেই সাথে আমার সৃষ্টির কাছেও তোমাকে প্রিয় করে দিলাম।
وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي এবং এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও: অর্থাৎ আমার দৃষ্টির সামনেই যাতে তুমি প্রতিপালিত হও এবং ফিরআউনের ঘরে তোমাকে যেন খাওয়ানো হয়, আমি তোমার জন্য সেই ব্যবস্থা করলাম। সেই সাথে সর্বদা আমি তোমাকে দেখছি, তোমার প্রতি আমার দৃষ্টি রাখছি এবং তোমাকে হেফাজত করছি।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে জানা গেল যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য যেমন দু'টি চোখ শোভনীয়, তাঁর জন্য ঠিক সেরকমই দু'টি চোখ রয়েছে। কুরআনুল কারীমে العين (চোখ) শব্দটি আল্লাহর প্রতি একবচন ও বহুবচন এই উভয়ভাবেই مضاف (সম্বোধিত) হয়েছে। হাদীসেও এটিকে আল্লাহর প্রতি দ্বি-বচন হিসাবে সম্বোধিত হয়েছে। দাজ্জালের হাদীসে নাবী বলেন:
أَنَّ رَبَّكُمْ لَيْسَ بِأَعْوَرَ)
"নিশ্চয়ই তোমাদের রব অন্ধ নন"। ১৬
এ কথা বলে নাবী তাঁর চোখের দিকে ইঙ্গিত করলেন। এখানে সুস্পষ্ট যে, এই হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহর জন্য একচোখ সাব্যস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। যার চোখ মাত্র একটি সে তো প্রকাশ্য কানা। আল্লাহ তা'আলা এই দোষের অনেক উর্ধ্বে।
আরবদের ভাষায় مضاف إليه এর অবস্থা অনুপাতে مضاف কখনো একবচন, কখনো দ্বি-বচন আবার কখনো বহুবচন হয়। একবচনের বা বিশেষ্যকে যদি একবচনের ضمير এর (সর্বনামের) দিকে ইযাফত (সম্বন্ধ) করা হয়, তাহলে সেই ইসমকেও একবচন ব্যবহার করতে হয়। যেমন: هذا قلمك এটি তোমার কলম। আর যদি বহুবচনের শব্দের দিকে ইযাফত করা হয়, চাই সে বহুবচন ইসমে যাহের হোক কিংবা সর্বনাম হোক, তাহলে শাব্দিক মিল রাখার জন্য সেই مضاف বা সম্বোধিত পদকে বহুবচন ব্যবহার করাই উত্তম। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَجْرِي بأَعْيُنِنَا আমাদের চোখসমূহের সামনেই নৌকাটি চলছিল।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا خَلَقْنَا لَهُم مِّمَّا عَمِلَتْ أَيْدِينَا أَنْعَامًا )
"এরা কি দেখে না, আমাদের নিজের হাতসমূহের তৈরী জিনিসের মধ্য থেকে এদের জন্য সৃষ্টি করেছি গবাদি পশু?" (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৭১)।
আর যখন আরবরা তাদের ভাষায় দ্বি-বচনের শব্দকে অপর কোন দ্বি-বচনের শব্দের দিকে ইযাফত করে, তখন তারা বাক্যকে অধিকতর ফাসীহ (সুস্পষ্ট) করার জন্য দ্বি-বচনকেও (মুযাফকেও) বহুবচন ব্যবহার করে থাকে। যেমন: আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا )
"তোমাদের দু'জনের মন সরল-সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে" (সূরা তাহরীম ৬৬:৪)।
নাবী এর দুইজন স্ত্রীর অন্তর মাত্র দু'টি। দ্বি-বচনের শব্দকে দ্বি-বচনের দিকে ইযাফত করার কারণে দ্বি-বচন মুযাফকে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং আমরা তোমাকে চোখ দিয়ে দেখছি এবং হাত দিয়ে ধরে রাখছি, এ কথা কোন শ্রোতারই বুঝতে অসুবিধা হয় না। এ থেকে পৃথিবীর কোন মানুষই এ কথা থেকে বুঝে না যে, একটি চেহারায় অনেকগুলো (দুই এর অধিক) চোখ থাকে。

টিকাঃ
১৬. সহীহ: সহীহ বুখারী ৪৪০২, আবু দাউদ ৪৩২০, তিরমিযী ২২৪১。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00