📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য রহমত ও মাগফিরাত বিশেষণ সাব্যস্ত করা।
وقوله: {بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} {رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلِّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا} {وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا } { وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ} {كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ} {وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} {فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ “পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্ তা'আলার নামে শুরু করছি” (সূরা ফাতিহা ১:১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلِّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا “হে আমাদের রব! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো”। (সূরা মুমিন ৪০:৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا “এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান”। (সূরা আহযাব ৩৩:৪৩) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ "আর আমার রহমত প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে”। (সূরা আরাফ ৭:১৫৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ “তোমাদের প্রতিপালক রহমত করাকে নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন (সূরা আনআম ৬:৫৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ “আর তিনি ক্ষমাকারী ও দয়ালু (সূরা ইউনুস ১২:১০৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ "অবশ্যই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো হেফাজতকারী এবং তিনি সবচেয়ে বেশী করুণাশীল”। (সূরা ইউসুফ ১২:৬৪)
ব্যাখ্যা: বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম এর ব্যাখ্যা পূর্বে কিতাবের শুরুতেই অতিক্রান্ত হয়েছে। এখানে আবার উল্লেখ করার কারণ হলো তাতে আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সিফাত রহমত সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন পরের আয়াত গুলোতেও আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা বিশেষণ উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, আল্লাহ তা'আলার রহমান নামটি এমন একটি সিফাতের প্রমাণ করে, যা তাঁর পবিত্র সত্তার সাথে সদা প্রতিষ্ঠিত। আর আর রহিম তাঁর নামটি এমন সিফাতের প্রমাণ করে, যার সম্পর্ক হয় রহমত প্রাপ্তদের সাথে।
যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا “এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান"। কুরআনের কোথাও رحمن هم বলা হয়নি। এতে বুঝা যায়, প্রথমটি আল্লাহ তা'আলার وصف )স্থায়ী বিশেষণ) এর জন্য এবং দ্বিতীয়টি তাঁর فعل বা ক্রিয়ার জন্য। রহমান নামটি প্রমাণ করছে যে, রহমত আল্লাহ তা'আলার ওয়াসিফ তথা স্থায়ী বিশেষণ। আর রহীম নামটি প্রমাণ করছে যে, তিনি স্বীয় রহমত দ্বারা সৃষ্টির উপর দয়া করেন।
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلِّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا হে আমাদের রব! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো। এখানে ঐ সব ফেরেশতাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যারা দয়াময় আল্লাহর আরশ বহন করে আছেন এবং যারা আরশের চতুর্দিকে অবস্থান করছেন। তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেন হে আমাদের রব! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো। তোমার রহমত ও ইলম প্রত্যেক বস্তুকে বেষ্টন করে আছে। رَّحْمَةً وَعِلْمًا শব্দদ্বয় ফায়েল হতে পরিবর্তিত হয়ে تمییز হিসাবে মানসুব হয়েছে। এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতা ও প্রশস্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। দুনিয়াতে প্রত্যেক মুমিন ও কাফের আল্লাহর রহমত উপভোগ করছে। আর আখেরাতে শুধু মুমিনগণই আল্লাহর রহমত পাবেন।
وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান: এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি মুমিনদের প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে অত্যন্ত দয়ালু। দুনিয়াতে তাদের উপর আল্লাহর রহমত এভাবে হয়েছে যে, তিনি তাদেরকে সেই সত্যের সন্ধান দিয়েছেন, যা অন্যরা পায়নি এবং তাদেরকে এমন পথ দেখিয়েছেন, যা থেকে অন্যরা গোমরাহ হয়েছে। আর আখেরাতে তাদের উপর এভাবে রহমত করবেন যে, তিনি তাদেরকে ভয়াবহ বিপদের দিন নিরাপদ রাখবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলার রহমত ও ক্ষমার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলিম-কাফির তথা প্রত্যেক সৃষ্টিই আল্লাহর রহমত উপভোগ করছে। কিন্তু আখেরাতে আল্লাহর রহমত শুধু মুমিনদের প্রতিই সীমিত হবে। সে দিন আল্লাহ তা'আলা শুধু তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ তোমাদের প্রতিপালক রহমত করাকে নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন: অর্থাৎ তিনি তাঁর পবিত্র সত্তার উপর রহমত করাকে ওয়াজিব করে নিয়েছেন। এটি তাঁর পক্ষ হতে দয়া ও অনুগ্রহ স্বরূপ। এটি আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও নির্ধারণগত লিখা, তাঁর উপর অন্য কেউ লিখে দেয়নি।
وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ আর তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর পবিত্র সত্তা সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি ক্ষমা ও দয়ার বিশেষণে বিশেষিত। ঐ ব্যক্তির জন্যই কেবল তাঁর ক্ষমা ও রহমত, যে তাঁর নিকট তাওবা করে এবং তাঁর উপরই ভরসা করে। যে কোন গুনাহ থেকেই তাওবা হোক না কেন। আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করেন। যেমন শির্ক বা অন্যসব গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা শির্ককারীর তাওবা কবুল করেন, তাকে ক্ষমা করেন এবং তাঁর উপর রহম করেন।
فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا অবশ্যই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো হেফাযতকারী: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর নাবী ইয়াকুব এর কথা বর্ণনা করেছেন। যখন তাঁর ছেলেরা তাঁর নিকট তাদের ভাই ইউসুফকে পাঠানোর আবেদন করল এবং ইউসুফ কে হেফাযত করার অস্বীকার করলো, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলার হেফাযতই তোমাদের হেফাযতের চেয়ে অধিক উত্তম। ইয়াকুব স্বীয় পুত্রের হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে দিলেন।
আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নাম الحفيظ (হেফাযতকারী)। হেফাযত বিশেষণের মাধ্যমেই তিনি তাঁর সকল বান্দাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তাদের আমলসমূহকে সংরক্ষণ করেন।
আর তিনি মুমিন বান্দাদেরকে ঐসব বিষয় থেকে বিশেষভাবে হেফাযত করেন, যা তাদের ঈমানকে নষ্ট করে দিতে পারে। সেই সাথে তিনি তাদেরকে ঐ বিষয় হতেও হেফাযত করেন, যা তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার জন্য রহমত ও মাগফিরাতের সিফাত (বিশেষণ) সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্যান্য সিফাতের ন্যায় আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই উহা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত। তাতে জাহমীয়া, মুতাযেলা এবং তাদের অনুরূপ অন্যান্য বিদ'আতী সম্প্রদায়ের যে সব লোক সৃষ্টির সাথে আল্লাহর তাশবীহ (তুলনা) হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আল্লাহ তা'আলার রহমত ও মাগফিরাত বিশেষণকে অস্বীকার করে, এখানে তাদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। মুতাযেলা ও জাহমীয়ারা বলে, দয়া করা মাখলুকের বৈশিষ্ট্য। তারা এই আয়াতগুলোকে রূপকার্থে ব্যাখ্যা করেছে। এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বাতিল। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্য এই বিশেষণ সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলার দয়া মানুষের দয়ার মত নয় যে, তাতে তাশবীহ বা সাদৃশ্য আবশ্যক হবে। যেমনটি তারা ধারণা করে থাকে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
অর্থাৎ তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুরা ৪২:১১)।
কোন বস্তুর নাম এক হলেই তার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য এক হওয়া জরুরী নয়। সৃষ্টিকর্তার জন্য রয়েছে এমন সব সিফাত, যা তাঁর জন্য শোভনীয় ও নির্দিষ্ট এবং মাখলুকের রয়েছে এমন সব সিফাত, যা তার জন্য শোভনীয় ও নির্দিষ্ট। আল্লাহই ভালো জানেন।
📄 কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হন, ক্রোধান্বিত হন, তিনি পছন্দ করেন এবং ঘৃণা করেন। সুতরাং তিনি এ সব বিশেষণে ভূষিত।
وقوله : { رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ} وقوله : {وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ} وقوله: ﴿ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ ) وقوله : {فَلَمَّا آسَفُونَا انتَقَمْنَا مِنْهُمْ} وقوله: {وَلَكِن كَرِهَ اللَّهُ انبعَاثَهُمْ فَتَبَّطَهُمْ} وقوله : { كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ}
﴿ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ﴾ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট (সূরা মায়িদা ৫:১১৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ ﴾ “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হলো জাহান্নام, তথায় সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তার উপর লা'নত করেছেন (সূরা নিসা ৪:৯৩)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ وَكَرِهُوا رِضْوَانَهُ ﴾ "এই শাস্তির কারণ হলো, তারা এমন পন্থা অবলম্বন করেছে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ এবং তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে পছন্দ করেনি (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿فَلَمَّا آسَفُونَا انتَقَمْنَا مِنْهُمْ ﴾
"অবশেষে তারা যখন আমাকে ক্রোধান্বিত করলো তখন আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম (সূরা যুখরুফ ৪৩: ৫৫)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿وَلَكِن كَرِهَ اللَّهُ انبَعَاثَهُمْ فَثَبَّطَهُمْ ﴾
" কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের অংশগ্রহণ অপছন্দ করেছেন। তাই তিনি তাদের শিথিল করে দিলেন (সূরা তাওবা ৯:৪৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ ﴾
"আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত অপছন্দনীয় যে, তোমরা এমন কথা বলো, যা তোমরা নিজেরাই করো না"। (সূরা সাফ ৬১:৩)
ব্যাখ্যা: رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট (সূরা মায়িদা ৫:১১৯): অর্থাৎ খালিসভাবে আল্লাহর জন্য তারা যেই আমল করেছে, তাতে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাদের আমলের কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যেই নিয়ামাত দান করেছেন, তাতে তারা আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিই হচ্ছে সর্বোচ্চ নিয়ামাত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ﴾
"আল্লাহর সন্তুষ্টিই হচ্ছে সর্বাধিক বড়" (সূরা তাওবা ৯:৭২)।
আল্লাহর প্রতি মুমিনদের সন্তুষ্টির ব্যাপারে কথা হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকেই স্বীয় মর্যাদা অনুযায়ী আল্লাহর সন্তুষ্টি পাবে। এমনকি তাদের প্রত্যেকেই ধারণা করবে, তাকে যা দেয়া হয়েছে, অন্য কাউকে তা দেয়া হয়নি।
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا করবে: মুমিনকে হত্যাকারীর ঠিকানা হবে জাহান্নام। ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে, এই কথা দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, ভুলবশতঃ কোন মুমিনকে হত্যা করা হলে উক্ত শাস্তির সম্মুখীন হবে না।
ইচ্ছাকৃত হত্যাকারী তাকেই বলা হয়, যে ব্যক্তি কোন মানুষকে নিরপরাধ জেনেও এমন অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে, যার আঘাতে সাধারণত মৃত্যু সংঘটিত হওয়ার ধারণাই করা হয়।
فَجَزَاؤُهُ তার শাস্তি: অর্থাৎ আখেরাতে তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। জাহান্নাম হচ্ছে পরকালের আগুনের শাস্তির একটি স্তরের নাম।
خَالِدًا فِيهَا তথায় সে চিরকাল থাকবে: অর্থাৎ সে জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। এখানে চিরকাল বলতে দীর্ঘ সময় অবস্থান উদ্দেশ্য।
وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন: এই বাক্যটিকে এমন আরেকটি বাক্যের উপর আতফ করা হয়েছে, যা আয়াতের পূর্বাপর বর্ণনা প্রসঙ্গ থেকেই বুঝা যায়। মূল বাক্যটি এ রকম হতে পারে যে, جعل عليه جزاءه جهنم وغضب করেছেন এবং তার উপর তিনি ক্রোধান্বিত হয়েছেন।
لعنه তার উপর লা'নত করেছেন: অর্থাৎ তাকে তাঁর রহমত থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছেন। আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া এবং বিতাড়িত করাকে লা'নত বলা হয়।
ذَلِكَ بَأَنَّهُمْ এই শাস্তির কারণ হলো: অর্থাৎ এই আয়াতের পূর্বের আয়াতে কঠোরভাবে কাফেরদের জান কবয করার ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, ফেরেশতারা তাদের রূহ কবয করবে এবং তাদের মুখ ও পিঠের উপর আঘাত করবে।
اتَّبَعُوا مَا أَسْخَطَ اللَّهَ তারা এমন পন্থা অবলম্বন করেছে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ: তার কারণ তারা এমন পন্থা অবলম্বন করেছে যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ। তারা এমনসব পাপাচার এবং কুপ্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে লিপ্ত ছিল, যা আল্লাহ তা'আলা হারাম করেছেন।
وَكَرِهُوا رَضْوَانَهُ “তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে পছন্দ করেনি: তারা যেই ঈমান ও সৎ আমল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম, তাকে অপছন্দ করেছে।
فَلَمَّا آسَفُونَا তারা যখন আমাকে ক্রোধান্বিত করলো: অর্থাৎ রাগান্বিত করলো।
انتَقَمْنَا مِنْهُمْ তাদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম: অর্থাৎ তাদেরকে শাস্তি দিলাম। কঠিন শাস্তি দেয়াকে এখানে ইনতিকাম হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
وَلَكِن كَرِهَ اللَّهُ انبعَاثَهُمْ অপছন্দ করেছেন: অর্থাৎ তোমাদের সাথে যোগ দিয়ে যুদ্ধের জন্য তাদের বের হওয়াকে তিনি অপছন্দ করেছেন।
فَتَبَّطَهُمْ তিনি তাদেরকে শিথিল করে দিয়েছেন: অর্থাৎ তোমার সাথে বের হওয়া থেকে তাদেরকে আটকিয়ে দিয়েছেন। এ আটকিয়ে দেয়া ছিল আল্লাহর ফায়সালা ও নির্ধারণগত। যদিও শারীয়াতগত দিক থেকে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন এবং বাহ্যিকভাবে তাদেরকে এ জন্য সক্ষমও করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এমন এক হিকমাতের কারণে বের হওয়ার তাওফীক দেননি, যা কেবল তিনিই অবগত আছেন। আর তা তিনি পরের আয়াতেই উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে,
لَوْ خَرَجُوا فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلَّا خَبَالًا ﴾ "যদি তারা তোমাদের সাথে বের হতো তাহলে তোমাদের মধ্যে ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই বাড়াতো না (সূরা তাওবা ৯:৪৭)।
كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ আল্লাহর কাছে এটা অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ যে: অর্থাৎ ঘৃণার দিক দিয়ে উহা অত্যন্ত ভয়াবহ। المقت অর্থ হচ্ছে البغض তথা ঘৃণা করা। مقتا শব্দটি تمييز হিসাবে মানসুব হয়েছে।
أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ তোমরা এমন কথা বলো যা তোমরা নিজেরাই করো না: অর্থাৎ তোমরা নিজেদের নফস্ থেকে ভাল কাজের অঙ্গীকার প্রদান করে থাকো, কিন্তু তোমরা সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করো না।
এ আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, এক প্রকার লোক জিহাদ ফরয হওয়ার পূর্বে বলতো যে, আমাদের ইচ্ছা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা যদি সর্বাধিক প্রিয় আমল সম্পর্কে আমাদেরকে সংবাদ দিতেন, তাহলে আমরা উহা সম্পাদন করতাম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রিয় নাবী ﷺ কে সংবাদ দিলেন যে, সর্বোত্তম আমল হচ্ছে আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ঐ সমস্ত পাপিষ্টদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, যারা ঈমানের পথ প্রত্যাখ্যান করেছে ও ঈমান আনয়ন করতে অস্বীকার করেছে। অতঃপর যখন জিহাদের আয়াত নাযিল হলো, তখন মুমিনদের কেউ কেউ জিহাদ করাকে অপছন্দ করলো এবং উহা তাদের কাছে খুব কঠিন মনে হলো। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ
"হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা নিজেরাই করো না? (সূরা সাফ ৬১:২)
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, ক্রোধান্বিত হওয়া, সন্তুষ্ট হওয়া, অভিশাপ করা, প্রতিশোধ নেয়া, অপছন্দ করা, ঘৃণা করা আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সিফাত (বিশেষণ)। এই সবগুলোই সিফাতে ফেলিয়া তথা কর্মগত বিশেষণ। এই বিশেষণগুলো আল্লাহ তা'আলা যখন ইচ্ছা এবং যেভাবে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই এগুলোকে নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন। আহলে সুন্নাতের লোকেরা সেভাবেই তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য সাব্যস্ত করেন।
📄 ক্বিয়ামতের দিন বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার উদ্দেশে আল্লাহ তা‘আলা সেভাবেই নেমে আসবেন, যেভাবে নেমে আসা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
وقوله: {هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ وَالْمَلَائِكَةُ وَقُضِيَ الأَمْرُ} وقوله: {هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن تَأْتِيهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ} { كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الأَرْضُ دَكَّا دَكَّا وَجَاء رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا} {وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءِ بِالْغَمَامِ وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَنزِيلًا}
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ وَالْمَلَائِكَةُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ
"তারা কেবল সেই সময়ের অপেক্ষায় বসে আছে, যখন মেঘমালার ছায়াসহ স্বয়ং আল্লাহ তাদের সামনে আগমন করবেন, বিপুল পরিমাণ ফেরেশতাগণও তাদের সামনে আসবেন। তখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে (সূরা বাকারা ২:২১০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَنْ تَأْتِيَهُمُ الْمَلَائِكَةُ أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ
"তারা শুধু এ বিষয়ের দিকে চেয়ে আছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আগমন করবে কিংবা তোমার পালনকর্তা আগমন করবেন। অথবা তোমার পালনকর্তার কোন নিদর্শন আসবে (সূরা আনআম ৬:১৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
كَلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا * وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا )
“কখনই নয়, পৃথিবীকে যখন চূর্ণবিচূর্ণ করে বালুকাময় করে দেয়া হবে এবং তোমার রব এমন অবস্থায় আসবেন, যখন ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে (সূরা ফাজর ৮৯:২১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَنزِيلًا
"সেদিন আকাশ ফুড়ে একটি মেঘমালার উদয় হবে এবং ফেরেশতাদেরকে দলে দলে নামিয়ে দেয়া হবে" (সূরা ফুরকান ২৫: ২৫)।
ব্যাখ্যা: هَلْ يَنظُرُونَ তারা কেবল সেই সময়ের অপেক্ষায় বসে আছে,: শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারী যেসব কাফের ইসলামে প্রবেশ করেনি, এখানে তাদের জন্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ينظرون অর্থ অপেক্ষা করছে। نظر এবং انتظر শব্দদ্বয় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।
إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ যখন আল্লাহ তা'আলা আসবেন: কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা মানুষের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য আগমন করবেন। তারা শুধু সেই দিনের অপেক্ষায় বসে আছে, যেদিন আল্লাহ বিচার করবেন এবং প্রত্যেককে আমল অনুযায়ী বদলা দিবেন।
فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ মেঘমালার ছায়াসহ: ظل শব্দটি ظلة -এর বহুবচন। যা আপনাকে ছায়া দেয়, তাকেই যুল্লাহ বলা হয়। আর হালকা-পাতলা সাখা মেঘমালাকে বলা হয় গামাম। মেঘমালাকে غمام হিসাবে নাম রাখার কারণ হলো, মেঘমালা তার নীচের প্রত্যেক বস্তু বা ব্যক্তিকে ঢেকে ফেলে। মূলতঃ غم يغم অর্থ হচ্ছে ستر پستر অর্থাৎ ঢেকে রাখা।
وَالْمَلائِكَة ফেরেশতাগণ: কিয়ামাতের দিন ফেরেশতাগণ মেঘমালার সাথে আগমন করবেন।
وَقُضِيَ الْأَمْرِ তখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে: অর্থাৎ তাদের ধ্বংসের ব্যাপারটি নিস্পত্তি হয়ে যাবে।
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَنْ تَأْتِيَهُمُ الْمَلَائِكَةُ আছে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আগমন করবে: অর্থাৎ তাদের রূহ কবয করার জন্য ফেরেশতাগণ আগমন করবে। এখানে মৃত্যুর ফেরেশতা উদ্দেশ্য।
أَوْ يَأْتِيَ رَبُّكَ কিংবা তোমার পালনকর্তা আগমন করবেন: অর্থাৎ তোমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য স্বয়ং চলে আসবেন।
أَوْ يَأْتِيَ بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ অথবা তোমার পালনকর্তার কোন নিদর্শন আসবে: এখানে নিদর্শন বলতে আখেরী যামানায় পশ্চিম দিকে সূর্য উদয় উদ্দেশ্য। আখেরী যামানায় সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। এটি কিয়ামাতের অন্যতম একটি বড় আলামত। যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে, তখন তাওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে এবং তখন কারো তাওবা কবুল হবে না।
কല്ലാ কখনই নয়: এটি এমন একটি অব্যয়, যা তার পূর্বে উল্লেখিত বিষয় হতে ধমক দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ ইয়াতীমের সাথে সম্মানজনক ব্যবহার না করা ঠিক নয় এবং মিসকীনকে খাদ্য প্রদান করার উৎসাহ না দেয়া ঠিক নয়। সেই সাথে মীরাসের ধন-সম্পদ সম্পূর্ণরূপে খেয়ে ফেলা এবং মালকে প্রচুর ভালবাসাও ঠিক নয়।
إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكَّا دَكَّا দেয়া হবে: অর্থাৎ যখন পৃথিবীকে প্রকম্পিত করা হবে এবং উহাকে পরপর খুব জোরে ধাক্কা দেয়া হবে। ফলে পৃথিবীর উপরস্থ সকল নির্মিত বস্তু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বালুকণায় পরিণত হবে।
وَجَاءَ رَبُّكَ তোমার রব এমন অবস্থায় আসবেন: আল্লাহ তা'আলা নিজেই বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করার জন্য নেমে আসবেন।
وَالْمَلَكُ ফেরেশতারা: এখানে ফেরেশতা বলতে সকল ফেরেশতা উদ্দেশ্য।
صَفًّا صَفًّا সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে: হাল হিসাবে মানসুব হয়েছে।
অর্থাৎ তারা কাতারের পর কাতারবন্দী অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তারা সকল জিন-ইনসানকে ঘিরে ফেলবে। প্রত্যেক আসমানের ফেরেশতাগণ একেক কাতারে দাঁড়িয়ে পৃথিবী এবং উহার সকল দিক থেকে ঘিরে ফেলবে। কিয়ামাতের দিন সাত আসমানের ফেরেশতাদের মোট সাতটি কাতার হবে।
সদিন আকাশ ফুঁড়ে একটি মেঘমালার উদয় وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ হবে: অর্থাৎ কিয়ামাতের দিন আকাশ ফেটে যাবে। আকাশ ফেটে নূরের এমন একটি বিরাট মেঘমালার উদয় হবে, যা দৃষ্টিসমূহকে ধাঁধিয়ে ফেলবে।
وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَعْرِيلًا ফেরেশাতাদের দলে দলে নামিয়ে দেয়া হবে: ফেরেশতাদেরকে সেদিন দলে দলে পৃথিবীতে নামানো হবে। তারা নেমে এসে হাশরের ময়দানে সমস্ত সৃষ্টিকে ঘিরে ফেলবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য নেমে আসবেন।
উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করছে যে, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সত্তাসহ (নিজেই) আগমন করবেন। যেভাবে আগমন করা তাঁর মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য শোভনীয়, বান্দাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করার জন্য তিনি সেভাবেই নেমে আসবেন। আল্লাহ তা'আলার নেমে আসা তাঁর কর্মগত সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতভাবেই ইহাকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা আবশ্যক। আল্লাহর আগমন করাকে তাঁর আদেশ ও রহমত আসার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা বৈধ নয়। যেমন করে থাকে আল্লাহর সিফাতকে অবিশ্বাসকারী সম্প্রদায়। তারা বলে থাকে وَجَاءَ رَبُّكَ তোমার রব আসবেন অর্থ হচ্ছে তোমার রবের আদেশ আসবে। এই ব্যাখ্যা আল্লাহর আয়াতকে পরিবর্তন করার শামিল।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: আল্লাহ তা'আলার দিকে যেই আগমন ও আসার সম্বন্ধ করা হয়েছে, তা দুই প্রকার। একটি হচ্ছে مطلق (সাধারণ ও কোন কিছু ছাড়াই) আগমন করা। আরেকটি হচ্ছে মুক্বাইয়িদ (কয়েদযুক্ত তথা কোন কিছু নিয়ে) আগমন করা। আল্লাহর আগমন দ্বারা যদি তাঁর রহমত, আযাব এবং অনুরূপ অন্য কিছু আসা উদ্দেশ্য হয়, তখন সেই আগমনকে কয়েদযুক্ত করা হয়। যেমন হাদীসে এসেছে, حتي جاء الله بالرحمة والخير পরিশেষে আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ আগমন করল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَقَدْ جِئْنَاهُم بِكِتَابٍ فَصَّلْنَاهُ عَلَى عِلْمٍ )
"আমি এদের কাছে এমন একটি কিতাব নিয়ে এসেছি, যাকে পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশদ ব্যাখ্যামূলক করেছি (সূরা আরাফ ৭:৫২)।"
আর আল্লাহর দিকে যেই মুতলাক (সাধারণ) আগমনের সম্বন্ধ করা হয়েছে, তা দ্বারা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার আগমন উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
هَلْ يَنظُرُونَ إِلَّا أَن يَأْتِيَهُمُ اللَّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ ﴾
"তারা কেবল সেই সময়ের অপেক্ষায় বসে আছে, যখন মেঘমালার ছায়াসহ স্বয়ং আল্লাহ তাদের সামনে আগমন করবেন? (সূরা বাকারা ২:২১০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا
"তোমার রব এমন অবস্থায় আসবেন, যখন ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে” (সূরা ফাজর ৮৯:২২)।
📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য চেহারা সাব্যস্ত করণ।
وقوله: {وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ} {كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ}
وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"একমাত্র তোমার সেই রবের চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে, যিনি মহিয়ান ও মহানুভব (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: كُلُّ شَيْءٍ هَالِكَ إِلَّا وَجْهَهُ "তাঁর চেহারা ব্যতীত সবকিছুই ধ্বংস হবে" (সূরা কাসাস ২৮:৮৮)।
ব্যাখ্যা: وَيُقى وَجْهُ رَبِّكَ একমাত্র তোমার পালনকর্তার চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে। এ আয়াতের পূর্বে রয়েছে, كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ "ভূপৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংস হবে" (সূরা আর রহমান ৫৫: ২৬)। এখানে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে,
যমীনের সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে এবং সকল বস্তুই ধ্বংস হবে। মহান প্রভুর চেহারা ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ তা'আলার কখনো মৃত্যু হবে না। তিনি সেই চিরঞ্জীবন্ত সত্তা, যার কখনোই মৃত্যু হবে না।
ذُو الْجَلَالِ যিনি মহিমময়: অর্থাৎ বড়ত্ব ও মর্যাদার অধিকারী।
وَالإكرام মহানুভব: অনুগ্রহ ও সম্মানের অধিকারী। অর্থাৎ তিনি নাবী- রসূল এবং তাঁর সৎ বান্দাদের উপর অনুগ্রহ করার মাধ্যমে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: الإكرام অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা এমন প্রত্যেক জিনিসের উর্ধ্বে, যা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
كُلِّ شَيْءٍ هَالِكَ সব জিনিসই ধ্বংস হবে: আসমান ও যমীনে যা আছে, তার প্রত্যেকটিই ধ্বংস হবে এবং মৃত্যু বরণ করবে।
إِلَّا وَجْهَهُ কেবল তাঁর চেহারাই অবশিষ্ট থাকবে: وجهه শব্দটি মুস্তাসনা হিসাবে মানসুব হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পর কেবল তিনিই অবশিষ্ট থাকবেন। সমস্ত মাখলুক মৃত্যু বরণ করার পরও তাঁর মৃত্যু হবে না।
উপরোক্ত দু'টি আয়াতে আল্লাহ তা'আলার চেহারা থাকার কথা প্রমাণিত হলো। আল্লাহর চেহারা আল্লাহর সত্তাগত সিফাত।
প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহর চেহারা রয়েছে। যে রকম চেহারা আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় তাঁর চেহারা ঠিক সে রকমই। তা কোন মাখলুকের চেহারার মত নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই (সূরা শুরা ৪২:১১)
আমরা আল্লাহর সিফাতকে বাতিলকারী সম্প্রদায়ের লোকদের মত কথা বলি না। তারা বলে আল্লাহর চেহারা দ্বারা আসল অর্থ উদ্দেশও নয়; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সত্তা কিংবা ছাওয়াব, অথবা দিক অথবা অন্যান্য উদ্দেশ্য। এই ব্যাখ্যাগুলো একাধিক কারণে বাতিল।
(ক) হাদীসে আল্লাহর চেহারাকে আল্লাহর সত্তার উপর আতফ (যুক্ত) করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে আল্লাহর সত্তাকে উল্লেখ করা হয়েছে। অতঃপর তাঁর চেহারা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহর যাত (সত্তা) এবং তাঁর চেহারা ভিন্ন ভিন্ন জিনিস।
রসূল ﷺ তাঁর দু'আয় বলেছেন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
"আমি মহান আল্লাহর সত্তা, তাঁর সম্মানিত চেহারা এবং তাঁর চিরস্থায়ী ক্ষমতার ওয়াসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা করছি”। ১৫
আতফের অন্যতম দাবী হচ্ছে, তা পরস্পর ভিন্ন জিনিস বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
(খ) উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহর চেহারাকে তাঁর সত্তার দিকে সম্বোধিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَجْهُ رَبِّكَ “তোমার পালনকর্তার চেহারা”। আর চেহারাকে বিশেষিত করা হয়েছে ذُو الْجَلَالِ والإكرام মহিয়ান ও দয়াবান, এই দু'টি বিশেষণের মাধ্যমে। وجه )চেহারা) দ্বারা যদি যাত বা সত্তা উদ্দেশ্য হত, তাহলে উক্ত আয়াতের মধ্যে الوجه শব্দটি সিলা হিসাবে ব্যবহৃত হত। অর্থাৎ তা رب এর সিফাত হিসাবে ব্যবহৃত হত; الوجه -এর সিফাত হতো না। তখন এভাবে বলা হতো, وَجْهُ رَبِّكَ ذي الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ । তা না বলে যখন ذُو الْجَلال والإكرام বলা হয়েছে, তাতে বুঝা গেল যে, উহা চেহারার সিফাত হয়েছে, সত্তার সিফাত হয়নি। ঐদিকে আবার الوجه )চেহারা) আল্লাহর সত্তার সিফাত হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
(গ) কোন জাতির ভাষাতেই এটি পাওয়া যায় না যে, কোন জিনিসের চেহারা বলতে যাত (সত্তা) কিংবা ছাওয়াব বুঝায়। আরবী ভাষায় الوجه বলতে প্রত্যেক বস্তুর অগ্রভাগ ও সামনের অংশ বুঝায়। কেননা কোন বস্তুর দিকে অগ্রসর হলে সর্বপ্রথম অগ্রভাগই সামনে পড়ে। যেসব বস্তুর দিকে চেহারাকে ইযাফত বা সম্বন্ধ করা হবে সেসব বস্তু অনুযায়ীই চেহারার অর্থ হবে। وجه শব্দটিকে যদি কোনা সময়ের দিকে সম্বন্ধ করা হয়, তাহলে ইহার অর্থ হবে প্রথম সময়। যেমন বলা হয়, وجه النهار তথা দিবসের প্রথমাংশ। কোন প্রাণীর দিকে ইযাফত করলে উহার অর্থ হবে সেই প্রাণীর অঙ্গ বিশেষ। যেমন বলা হয়, وجه الفرس তথা ঘোড়ার চেহারা। আর যদি কোন পাহাড় বা দেয়ালের দিকে ইযাফত করা হয়, তাহলে উহার অর্থ হবে পাহাড় বা দেয়ালের চূড়া। যেমন বলা হয়, وجه الجبل তথা পাহাড়ের উপরের অংশ, وجه الجدار দেয়ালের সামনের অংশ ইত্যাদি। আর যখন চেহারাকে আল্লাহর দিকে ইযাফত করা হবে, তখন ইহার অর্থ হবে তাঁর অন্যতম সিফাত, যা কোন মাখলুকের সিফাতের অনুরূপ নয়。
টিকাঃ
১৫. সহীহ: সুনানে আবু দাউদ ৪৬৬।