📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার শ্রবণ ও দর্শন।
وقوله تعالى: {لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ} وقوله: {إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا}
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيْرِ “কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুরা ৪২: ১১)। আল্লাহ আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সর্বোত্তম উপদেশ দান করেন। আর আল্লাহ সবকিছুই শোনেন ও দেখেন”। (সূরা নিসা ৪: ৫৮)
ব্যাখ্যা: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ "কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়”। এ আয়াতের প্রথম অংশ হচ্ছে:
فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجًا "আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তিনি তোমাদের নিজ থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপ অন্যান্য জীব-জন্তুর জোড়া বানিয়েছেন "(সূরা শুরা ৪২: ১১)।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাছীর বলেন: যিনি সকল মানুষকে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন এবং অনুরূপ অন্যান্য জীবজন্তুর জোড়া বানিয়েছেন, তার মত আর কিছুই নেই। কেননা তিনি সেই একক অমুখাপেক্ষী সত্তা, যার কোন নযীর (সদৃশ) নেই। তিনি السميع (সর্বশ্রোতা), যিনি সকল ভাষার সকল আওয়াজই শুনেন। তিনি البصير (সর্বদ্রষ্টা), তিনি সবকিছুই দেখেন। আসমান ও যমীনের কোন কিছুই তাঁর কাছে অস্পষ্ট নয়।
ইমাম শাওকানী তাঁর তাফসীরে বলেন, যে ব্যক্তি ভালভাবে এই আয়াতটি বুঝতে সক্ষম হবে এবং যথাযথভাবে তা নিয়ে গবেষণা করবে, আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে মতভেদকারীদের মতভেদ করা সত্ত্বেও সে উজ্জল ও সুস্পষ্ট পথে চলতে পারবে।
সে যদি আল্লাহর বাণী: وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِير "তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা”: নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার জ্ঞান আরো বৃদ্ধি পাবে। কেননা আল্লাহর অনুরূপ কোন জিনিস হওয়াকে পরিহার করার পর আল্লাহর জন্য উপরোক্ত দু'টি নাম ও সিফাত সাব্যস্ত করার দ্বারা আল্লাহর আসমা ও সিফাতের প্রতি বিশ্বাস মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি আনয়ন করে, অন্তর থেকে সকল ব্যধি সরিয়ে দেয় এবং হৃদয়কে শীতল করে তুলে।
সুতরাং হে সত্যের সন্ধানী! তুমি এই উজ্জল প্রমাণ এবং মজবুত দলীলের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করো। এর মাধ্যমেই তুমি অনেক বিদ'আতকে ভেঙ্গে চুরমার করতে পারবে, গোমরাহীর ইমামদের ভিত্তিকে ধ্বংস করতে পারবে এবং যুক্তিবাদীদের নাকে মাটি লাগাতে পারবে। বিশেষ করে যখন তুমি আল্লাহ তা'আলার এই বাণীকে তার সাথে যুক্ত করবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا
তিনি লোকদের সামনের ও পেছনের সব অবস্থা জানেন। তারা তাদের জ্ঞান দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না (সূরা ত্বহা ২০:১১০)।
إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দান করেন: এটি সূরা নিসার ৫৮ নং আয়াতের শেষাংশ। আয়াতের পূর্বের অংশ হচ্ছে,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ "হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত তার হকদারদের হাতে ফেরত দেবার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর লোকদের মধ্যে ফায়সালা করার সময় আদল বা ন্যায়নীতি সহকারে ফায়সালা করো”।
نعم শব্দটি প্রশংসার জন্য ব্যবহৃত শব্দসমূহের অন্যতম। এর শেষে যুক্ত 3 সম্পর্কে একাধিক কথা রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন এটি হচ্ছে 4 نكرة موصوفة । সম্ভবত বাক্যটি এক রকম ছিল, 4 نعم شيئا يعظكم به উত্তম বিষয় দ্বারা তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন।
কেউ কেউ বলেছেন এখানে 4 মাওসুল হিসাবে এসেছে। আসল বাক্যটি এক রকম ছিল, 4 نعم الشيئ الذي يعظكم به অর্থাৎ যে বিষয়টি দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে, তা কতই না উত্তম! يعظكم (উপদেশ দিচ্ছেন) অর্থ হলো তিনি তোমাদেরকে আমানত আদায় করার এবং মানুষের মাঝে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করার আদেশ দিচ্ছেন।
إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا অর্থাৎ তোমরা যা কিছু বল আল্লাহ তা'আলা তা শুনেন এবং যা কিছু করো, তা তিনি দেখেন। উপরের আয়াত দু'টি থেকে আল্লাহর শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রমাণিত হলো। আয়াত দু'টির প্রথমটিতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মাখলুকের অনুরূপ নন এবং তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। উহাতে আল্লাহ তা'আলার সিফাতের ক্ষেত্রে নাফী ও ইছবাতকে একত্র করা হয়েছে। অর্থাৎ একই সাথে আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তা হতে ত্রুটি ও দোষযুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো পরিহার করা হয়েছে এবং তাঁর যাতে পাকের জন্য অতি উত্তম ও সুউচ্চ গুণাবলী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
📄 আল্লাহ তা‘আলার জন্য মাশিয়াহ (ইচ্ছা) বিশেষণ সাব্যস্ত করা।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে বললে না কেন) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন
وقوله: {وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاء اللَّهُ لا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ} {وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ} وقوله: {أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ)
“তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন মাশা-আল্লাহ (আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে) বললে না কেন? আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই” (সূরা কাহাফ ১৮:৩৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ)
“আল্লাহ ইচ্ছা করলে তারা কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতো না, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন”। (সূরা বাকারা ২:২৫৩) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ)
“তোমাদের জন্য চতুষ্পদ গৃহপালিত সব পশুই হালাল করা হয়েছে। তবে সামনে যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের জানানো হবে সেগুলো ছাড়া। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়ো না। নিঃ সন্দেহে আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন”। (সূরা মায়িদা ৫:১)
ব্যাখ্যা: আল্লাহর বাণী: وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ "তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে” ৯ শব্দটি এখানে ১৯ অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করার সময় مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ বললে না কেন? অর্থাৎ আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার সামনে তোমার নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা প্রকাশ করতে। আল্লাহর জন্য পূর্ণ ক্ষমতার স্বীকৃতি দিয়ে এই কথা বললে না কেন যে, আল্লাহ যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।
কোন কোন সালাফ বলেছেন, যার কাছে কোন জিনিস ভাল লাগে, সে যেন বলে لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مَا شَاءَ اللَّهُ ।
وَ لَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ “আল্লাহ ইচ্ছা করলে তারা কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতো না, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন”: অর্থাৎ আল্লাহু তা'আলা যদি ইচ্ছা করতেন, তারা যুদ্ধ না করুক, তাহলে তারা পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না। কেননা আল্লাহর রাজ্যে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু হওয়া অসম্ভব। আল্লাহর হুকুম প্রতিহত করার মত কেউ নেই এবং তাঁর ফায়সালা ঠেকানোরও কেউ নেই।
أُحِلَّتْ لَكُم তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে: এখানে মুমিনদেরকে লক্ষ্য করে এই কথা বলা হয়েছে।
بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ চতুষ্পদ গৃহপালিত সব পশু: চতুষ্পদ গৃহপালিত পশু বলতে এখানে উট, গরু, ছাগল এবং ভেড়া উদ্দেশ্য।
إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ তবে সামনে যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের জানানো হবে সেগুলো ছাড়া: এই বাক্যটি থেকে স্বতন্ত্র অর্থাৎ যেগুলোর আলোচনা সামনে আসছে, সেগুলোর গোশত খাওয়া তোমাদের জন্য হালাল নয়। ঐ হারাম পশুগুলো উক্ত আয়াতের সামান্য পরেই অর্থাৎ সূরা মায়িদার ৩নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِرِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ، ذَلِكُمْ فِسْقٌ )
"তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে মৃতজীব, রক্ত, শূকরের গোস্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নামে যবেহকৃত প্রাণী এবং কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে, আহত হয়ে, উপর থেকে পড়ে গিয়ে বা ধাক্কা খেয়ে মরা অথবা কোন হিংস্র প্রাণী চিরে ফেলেছে এমন প্রাণী, তবে তোমরা জীবিত পেয়ে যাকে যবেহ করেছ সেটি ছাড়া। আর যা কোন বেদীমূলে (পূজার ঘরে, অলী-আওলীয়ার নামে, কবর ও মাজারের উদ্দেশ্যে) যবেহ করা হয়েছে তাও তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও শুভ-অশুভ নির্দ্ধারনের তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নির্ণয় করাও তোমাদের জন্য জায়েয নয়। এগুলো ফাসেকী তথা আনুগত্য বহির্ভুত কাজ"।
ام غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ
নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়ো না: এই বাক্যটি بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ থেকে আরেকটি স্বতন্ত্র বিষয়। অর্থাৎ গৃহপালিত চতুষ্পদ সব জন্তুই তোমাদের জন্য হালাল। তবে এগুলো থেকে যেগুলো বন্য, সেগুলো শিকার করে ভক্ষণ করাও হালাল। কিন্তু যখন তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাকবে, তখন এগুলো শিকার করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর বাণী: وَأَنتُمْ حُرُمٌ হাল (অবস্থা জ্ঞাপক) হিসাবে নসব বা যবরের স্থানে রয়েছে। যারা হাজ্জ কিংবা উমরাহ অথবা উভয়টির ইহরাম বেঁধেছে, তাদেরকে محرم বলা হয়। ইহা حرم এর বহুবচন।
إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ নিঃসন্দেহে আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন: অর্থাৎ আল্লাহ যা ইচ্ছা হালাল করেন এবং যা ইচ্ছা হারাম করেন। তাঁর ইচ্ছায় ও কর্মে আপত্তি উত্থাপন করার কেউ নেই। উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহর সিফাত হিসাবে ইচ্ছা, শক্তি এবং আদেশ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এগুলো আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সিফাত। আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই এগুলো তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা জরুরী।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার ইচ্ছা করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصْعَدُ فِي السَّمَاءِ )
"আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার ইচ্ছা করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষদেশ খুব সংকীর্ণ করে দেন। যাতে মনে হয় সে কষ্ট করে আকাশের দিকে উঠার চেষ্টা করছে (সূরা আনআম ৬:১২৫)।
ব্যাখ্যা: فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার ইচ্ছা করেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যাকে ঈমান ও তাওহীদ কবুলের তাওফীক দেন এবং তার অন্তরকে সত্য কবুলের জন্য উপযুক্ত করেন, তার অন্তরকে উহার জন্য প্রশস্ত করে দেন। ১৪ من শব্দটি فعل مضارع কে জযমদাতা এবং ইসমে শর্ত। يُرِدْ ফেলে (ক্রিয়া) মুযারেটি (ভবিষ্যত কালীন ক্রিয়া) শর্ত হিসাবে জযম যুক্ত।
আর يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلإِسْلَامِ "তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন”। বাক্যটি শর্তের জবাব হিসাবে مجزوم (জযম যুক্ত)। الشرح অর্থ হচ্ছে।
التوسعة (আল্-উসআতু) (বিদীর্ণ করা, চেরা, ফাটানো ইত্যাদি)। এর মূল অর্থ হচ্ছে شرحت الأمر (আশ্-শারহু) (প্রশস্ত করা)। বলা হয়ে থাকে তথা বিষয়টিকে প্রশস্ত করলাম। এই কথা আপনি ঠিক ঐ সময় বলেন, যখন আপনি তা প্রশস্ত করে বর্ণনা করেন এবং খোলাখুলি বয়ান করেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যাকে ঈমান ও তাওহীদ কবুলের তাওফীক দেন এবং তার অন্তরকে সত্য কবুলের জন্য উপযুক্ত করেন, তার অন্তরকে আল্লাহ তা'আলা সত্য দ্বীন ইসলামের জন্য উন্মুক্ত ও প্রশস্ত করে দেন। এর ফলে সে উন্মুক্ত হৃদয়ে ইসলাম কবুল করে নেয়।
وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেন। অর্থাৎ যাকে আল্লাহ তা'আলা সত্য কবুল করা হতে ফিরিয়ে রাখতে চান, يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا তার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেন। ফলে তা সত্য কবুল করার জন্য উন্মুক্ত হয় না। حَرَجً অর্থাৎ একদম সংকীর্ণ করে দেন, যার ফলে অন্তরে ঈমান ও হেদায়াত প্রবেশের কোন রাস্তাই থাকে না। ضيق শব্দের অর্থকে জোরালো করার জন্য حَرَجً শব্দটি আনয়ন করা হয়েছে।
كَأَنَّمَا يَصْعَّدُ فِي السَّمَاءِ মনে হয় সে কষ্ট করে আকাশের দিকে উঠার চেষ্টা করছে: يصعد শব্দটি মূলত يتصعد ছিল। তা-কে সোয়াদ দ্বারা পরিবর্তন করে সোয়াদের মধ্যে ইদগام করা হয়েছে। অর্থাৎ যার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেয়া হয়েছে, তার জন্য হেদায়াত কবুল করে নেয়ার বিষয়টি ঠিক ঐ ব্যক্তির ন্যায় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে কোন অসম্ভব কাজ সম্পাদন করার জন্য বার বার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে তা সম্পাদন করতে পারছে না। যেমন কেউ আকাশে উঠার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। যেই কাফেরের উপর ঈমান কবুল করে নেয়া খুব ভারী অনুভব হয়, তাকে ঐ ব্যক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে আকাশে উঠার মত সাধ্যাতীত কাজ সম্পাদন করতে চায়। উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলার জন্য ইরাদাহ সাব্যস্ত হলো। কাউকে হেদায়াত করা আবার কাউকে গোমরাহ করা উভয়টিই আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
ইরাদাহ এর প্রকারভেদ:
আল্লাহ তা'আলার إرادة ইরাদাহ (ইচ্ছা) দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার: إرادة كونية قدرية ইরাদায়ে কাওনীয়া কাদারীয়া বা ক্ষমতাগত ইচ্ছা। অর্থাৎ ভাল-মন্দ এমনকি পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা অনুপাতেই সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্ধারিত হয়েছে। এই প্রকার ইরাদাহ এবং المشيئة একই জিনিস। উভয়টি পরস্পর সমার্থবোধক। এই প্রকার ইরাদাহ্র উদাহরণ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَن نُّهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا ﴾
"আমি যখন কোনো জনবসতিকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তার সমৃদ্ধিশালী লোকদেরকে নির্দেশ দেই, ফলে তারা সেখানে নাফরমানী করতে থাকে (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ ﴾
"আর আল্লাহ যখন কোন জাতিকে দুর্ভাগ্য কবলিত করার ফায়সালা করেন তখন তা প্রতিহত হয় না (সূরা রা'দ ১৩:১১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا ﴾
"আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষদেশ খুব সংকীর্ণ করে দেন"।
দ্বিতীয় প্রকার: ইরাদাহ হচ্ছে إراداة دينية شرعية ইরাদায়ে দ্বীনিয়া শারঈয়া অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার শারীয়াতগত ইচ্ছা। এই প্রকার ইচ্ছার মাধ্যমেই তিনি তাঁর বান্দাদের উপর শারীয়াতের সকল হুকুম-আহকাম বিধিবদ্ধ করেছেন। এর উদাহরণ হলো আল্লাহর বাণী:
﴿وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ ﴾
"আল্লাহ তোমাদের তাওবা কবুল করার ইচ্ছা করেন (সূরা নিসা ৪: ২৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ ﴾
"আল্লাহ তোমাদের উপর সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করেন না। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করেন তোমাদেরকে পাক-পবিত্র করতে (সূরা মায়িদা ৫:৬)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ ﴾
"আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের নাবী পরিবার থেকে ময়লা দূর করতে”। (সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)
ইরাদায়ে কাওনীয়া এবং ইরাদায়ে শারঈয়ার মধ্যে পার্থক্য:
(১) ইরাদায়ে কাওনীয়া তথা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারণগত ইচ্ছার মাধ্যমে যা হয়, আল্লাহ কখনো তাকে ভালবাসেন ও তাতে সন্তুষ্ট থাকেন আবার কখনো তা তিনি ভালবাসেন না এবং উহার প্রতি সন্তুষ্টও থাকেন না।
আর ইরাদায়ে শারঈয়ার মাধ্যমে যা সংঘটিত হয়, তাকে তিনি অবশ্যই ভালবাসেন এবং উহার প্রতি সন্তুষ্টও থাকেন। সুতরাং সকল প্রকার পাপকাজ এবং অকল্যাণও আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে শামিল। সে হিসাবে সৃষ্টি ও বিধানগত দিক থেকে তিনি পাপাচার সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা পাপ কাজকে ভালবাসেন না এবং উহার প্রতি সন্তুষ্টও থাকেন না। তিনি তাতে লিপ্ত হওয়ার আদেশও করেননি; বরং তা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
(২) ইরাদায়ে কাওনীয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তা সৃষ্টি করা মূল উদ্দেশ্য হয় না; বরং তা অন্য এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইবলীস এবং সকল প্রকার পাপাচার ও অকল্যাণ সৃষ্টি করেছেন। যাতে করে মুমিন বান্দাগণ নক্সে আম্মারা ও শয়তানের সাথে সর্বদা জিহাদে লিপ্ত থাকে। শয়তানের প্ররোচনা ও ধোঁকায় নিপতিত হয়ে মানুষ পাপকাজে লিপ্ত হয়ে গেলেও আল্লাহর কাছে তারা তাওবা করে এবং ক্ষমা চায়। এমনি আরো ভালো উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা অন্যায় ও অকল্যাণ সৃষ্টি করেছেন।
ঐদিকে শারঈ ইচ্ছার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তা মূলতঃই উদ্দেশ্য হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি ও শারীয়াতগত এই উভয় দিক থেকেই ইচ্ছা করেছেন যে, বান্দারা তাঁর আনুগত্য করুক। কেননা তিনি আনুগত্যের কাজকে ভালবাসেন এবং উহার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
(৩) আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও নির্ধারণগত ইচ্ছা অবশ্যই সংঘটিত হয়। অর্থাৎ এর মাধ্যমে তিনি যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, সাথে সাথে তা সৃষ্টি হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ﴾
"আল্লাহ তা'আলা যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তিনি শুধু বলেন যে, হয়ে যাও। সাথে সাথেই তা হয়ে যায়”। (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮২-৮৩)
আর শারঈ ইচ্ছার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা সকল ক্ষেত্রে সংঘটিত হওয়া আবশ্যক নয়। কখনো তা সংঘটিত হয়, আবার কখনো হয় না।
একটি জ্ঞাতব্য বিষয়:
অনুগত একনিষ্ঠ মুমিন মুখলিস বান্দার মধ্যে ইরাদায়ে কাওনীয়া এবং ইরাদায়ে শারঈয়াহ উভয়টিই একত্রে বাস্তবায়ন হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিগত ও নির্ধারণের দিক থেকে সৎকাজ সংঘটিত হওয়ার ইচ্ছা করেছেন এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য ইরাদায়ে শারঈয়ার মাধ্যমে আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহর যেই বান্দা আল্লাহর এই হুকুম কবুল করে নিয়েছে, তার মধ্যে আল্লাহর দু'টি ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে।
আর অপরাধীর অপরাধের মধ্যে শুধু ইরাদায়ে কাওনীয়াই বাস্তবায়ন হয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের পথ বর্জন করে, তার দ্বারা অপরাধটি হয় শুধু এই হিসাবে যে, আল্লাহ তা'আলা উক্ত অপরাধের স্রষ্টা; তাতে আদৌ আল্লাহর আদেশ ও সন্তুষ্টি থাকে না।
আরেকটি জ্ঞাতব্য বিষয়:
যারা আল্লাহ তা'আলার উপরোক্ত উভয় প্রকার ইরাদাহ সাব্যস্ত করেনি এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেনি, তারা পথভ্রষ্ঠ হয়েছে। যেমন জাবরীয়া এবং কাদরীয়া (মুতাযেলা) সম্প্রদায়ের লোকেরা। জাবরীয়ারা শুধু আল্লাহর ইরাদায়ে কাওনীয়া সাব্যস্ত করেছে। কাদরীয়ারা শুধু আল্লাহ তা'আলার ইরাদায়ে শারঈয়া সাব্যস্ত করেছে। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উভয় প্রকার ইরাদাই আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছে এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্যও করেছে。
টিকাঃ
১৪. অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈমান ও হেদায়াতকে ভালবাসে এবং সেদিকে স্বীয় ইচ্ছাকে ধাবিত করে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য ঈমানের পথ সহজ করে দেন ও তাকে সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর চলতে সাহায্য করেন। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও আনুগত্যের কাজকে পছন্দ করে না, কুরআন-হাদীসের কথা যার কাছে ভাল লাগে না এবং জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনার প্রতিও যে কর্ণপাত করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে সৎপথে চলার তাওফীক দেন না এবং তাকে সাহায্যও করেন না।
📄 আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অলীদেরকে ঠিক সেভাবেই ভালবাসেন, যেভাবে তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
وقوله: {وَأَحْسَنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ} {وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ} {فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ} {إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ}، وقوله: {قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ} . وقوله: {إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنِيَانٌ مَّرْصُوصٌ} وقوله: {وَهُوَ الْغَفُورُ الْوَدُودُ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَأَحْسَنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
"আর তোমরা ইহসান (অনুগ্রহ) করো, কেননা আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালোবাসেন”। (সূরা বাকারা ২:১৯৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
"সুবিচার করো। আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন” (সূরা হুজুরাত ৪৯: ৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ
"কাজেই যতক্ষণ তারা তোমাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি রক্ষা করে চলবে ততক্ষণ তোমরাও তাদের জন্য সোজা-সরল থাকো। কারণ আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন”। (সূরা তাওবা ৯:৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
"নিশ্চয়ই যারা তাওবা করে এবং পবিত্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন”। (সূরা বাকারা ২:২২২) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ ﴾
"বলো! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাক তাহলে আমাকে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন (সূরা আল-ইমরান ৩:৩১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ ﴾
"আল্লাহ এমন বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন। আর তারাও আল্লাহকে ভালবাসবেন (সূরা মায়িদা ৫:৫৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوصٌ
"আল্লাহ সেসব লোকদের ভালবাসেন, যারা তাঁর পথে এমনভাবে কাতারবন্দী হয়ে লড়াই করে যেন তারা সিসা গলিয়ে ঢালাই করা এক মজবুত দেয়াল” (সূরা সাফ ৬১:৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَهُوَ الْغَفُورُ الْوَدُودُ
"তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু"। (সূরা বুরুজ ৮৫: ১৪)
ব্যাখ্যা: যেসব আয়াত আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সিফাত (إراده) ইচ্ছা সাব্যস্ত করেছে, তা উল্লেখ করার পর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে ঐসব আয়াত উল্লেখ করেছেন, যা আল্লাহ তা'আলার আরেকটি সিফাত (المحبة) ভালবাসা সাব্যস্ত করে। যারা বলে আল্লাহর ইচ্ছা ও ভালবাসা একই সমান এবং তারা এই উভয় সিফাতের মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য করে না, এই অধ্যায়ে শাইখুল ইসলাম তাদেরও প্রতিবাদ করেছেন। তারা বলে থাকে, আল্লাহর ইচ্ছা ও ভালবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং উভয়ের প্রত্যেকটির জন্য অন্যটি আবশ্যক। সে হিসাবে আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা অবশ্যই ভালবাসেন। পূর্বে এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সেখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা এমন জিনিসেরও ইচ্ছা করেন, যা তিনি ভালবাসেন না এবং উহাকে পছন্দও করেন না। যেমন কাফিরের কুফরী এবং সমস্ত পাপাচার। এগুলোকে তিনি স্বীয় ইচ্ছায় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু তা বান্দার দ্বারা সংঘটিত হওয়া তিনি পছন্দ করেন না। আর তিনি এমন বিষয়েরও ইচ্ছা করেন, যা তিনি ভালবাসেন ও পছন্দ করেন। যেমন ঈমান আনয়ন করা এবং সকল প্রকার আনুগত্যের কাজকে তিনি ভালবাসেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَأَحْسَنُواْ অর্থাৎ তোমরা ইহসান করো। এটি হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ হতে আদেশ। তিনি তার বান্দাদেরকে ইহসান করার আদেশ করেছেন। পূর্ণরূপে এবং সর্বোত্তমভাবে কর্ম সম্পাদন করাকে ইহসান বলা হয়। ইহসান হচ্ছে আনুগত্যের সর্বোচ্চ পর্যায়।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ নশ্চয়ই আল্লাহ ইহসানকারীদেরকে ভালবাসেন: এটি হচ্ছে ইহসানের আদেশ করার কারণ। আল্লাহ তা'আলা ইহসান করার আদেশ করেছেন। কেননা তিনি ইহসান করাকে এবং যারা ইহসান করে, তাদেরকে ভালবাসেন। বান্দারা যখন জানতে পারবে যে, আল্লাহ তা'আলা ইহসান কারীদেরকে ভালবাসেন, তখন তারা আদেশ পালনের জন্য উৎসাহ পাবে।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وَأَقْسِطُوا অর্থাৎ তোমরা ন্যায় বিচার করো। এখানে আল্লাহ তা'আলা ইকুসাত করার আদেশ দিয়েছেন। ইকুসাত হচ্ছে লেনদেন ও বিচার-ফায়সালা করার সময় নিকটবর্তী ও দূরবর্তীর মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য না করে সকলের প্রতি ইনসাফ করার নাম।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقسطين নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন: এটি হচ্ছে ইনসাফের আদেশ করার কারণ। তিনি ইনসাফ করাকে ভালবাসেন বলেই বান্দাদেরকে তা করার আদেশ দিয়েছেন। বান্দাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার ভালবাসার দাবী হচ্ছে তিনি তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করবেন।
فَمَا اسْتَقَامُوا لَكُمْ فَاسْتَقِيمُوا لَهُمْ কাজেই যতক্ষণ তারা তোমাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি রক্ষা করে চলবে ততক্ষণ তোমরাও তাদের জন্য সোজা-সরল থাকো: অর্থাৎ মুশরিকরা যতক্ষণ তোমাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করে চলবে এবং চুক্তির বরখেলাফ করবে না, তোমরাও ততক্ষণ তাদের সাথে সম্পাদিত অঙ্গীকার পূর্ণ করে চলবে। এই সময়ের মধ্যে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ-বিবাদে লিপ্ত হবে না।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন: এটি অঙ্গীকার ও চুক্তি ঠিক রাখার আদেশ করার কারণ। তিনি ওয়াদা-অঙ্গীকার ও চুক্তি রক্ষা করার আদেশ করেছেন। কেননা এটি ঐ সমস্ত মুত্তাকীদের আমলের অন্তর্ভুক্ত, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, চুক্তি রক্ষা করা এবং তা ঠিক রাখা মুত্তাকীদের কাজ। ছাওয়াবের আশায় এবং শাস্তির ভয়ে আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করার সাথে সাথে পাপাচার থেকে বিরত থাকার নাম التقوى ।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালবাসেন: تواب এর বহুবচন হচ্ছে التوابين । التوبة ক্রিয়ামূল থেকে এটি صيغة المبالغة তথা আধিক্য বাচক শব্দ। তাওবা শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা। শারীয়াতের পরিভাষায় পাপাচার থেকে ফিরে আসা এবং উহা বর্জন করাকে التوبة বলা হয়। তাওবা শব্দটি বান্দার পক্ষ হতে ব্যবহৃত হলে এই অর্থ হবে।
আর যখন উহা আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হবে, তখন التواب আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নাম হিসাবে গণ্য হবে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন বান্দা (توّاب ) (অধিক তাওবাকারী) এবং আল্লাহ তা'আলা التَّوَّاب তথা অধিক হারে বান্দার তাওবা কবুলকারী।
বান্দার তাওবা হচ্ছে তার মালিক ও রবের দিকে ফিরে আসা। আল্লাহর তাওবা দুই প্রকার: (১) বান্দাকে তাওবা করার তাওফীক দেয়া। (২) বান্দার তাওবা কবুল করা।
وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ আল্লাহ তা'আলা পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালবাসেন: مُتَطَهِّر এর বহুবচন الْمُتَطَهِّرِينَ। এটি الطَّهارَة ক্রিয়ামূল থেকে إِسْمٌ فَاعِلٌ। বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীন ময়লা-আবর্জনা থেকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করাকে তাহারাত বলা হয়। এই আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি দুই প্রকার লোককে ভালবাসেন। তারা হচ্ছেন তাওবাকারী এবং পবিত্রতা অর্জনকারী। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ বলো যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাকো তাহলে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন:
এই আয়াতে কারীমা নাযিল হওয়ার শানে নুযুল হচ্ছে, যেমন ইবনে কাছীর এবং অন্যরা বলেছেন, একদল লোক দাবী করলো যে, তারা আল্লাহকে ভালবাসে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে এই আয়াত দ্বারা পরীক্ষা করলেন। কেননা এই আয়াত প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির বিপক্ষে ফায়সালাকারী, যে আল্লাহকে ভালবাসার দাবী করে, কিন্তু সে মুহাম্মাদী তরীকার উপর নয়। বরং সে তার দাবীতে মিথ্যুক।
يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন: মুহাম্মাদী তরীকার অনুসরণ করলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন। অর্থাৎ তোমরা আল্লাহকে যে পরিমাণ ভালবাসতে চাচ্ছ, তার চেয়ে বেশী পরিমাণ আল্লাহর ভালবাসা তোমরা অর্জন করতে পারবে। তোমাদের জন্য আল্লাহর ভালবাসা আল্লাহর প্রতি তোমাদের ভালবাসার চেয়ে অনেক বেশী।
আল্লাহর বাণী: فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ
তাহলে আল্লাহ আরো বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে:
এটি পূর্বোক্ত বাক্যের মধ্যে যেই শর্ত রয়েছে, তার জবাব। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার দ্বীন থেকে সরে পড়বে, তাহলে সে সরে যাক। তার বদলে আল্লাহ তা'আলা এমনসব লোক সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে। আল্লাহ তা'আলা এখানে তার মহান কুদরতের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলছেন, যেসব লোক তার দ্বীনের সাহায্য করা হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং তাঁর শারীয়াত কায়েম করা হতে বিমুখ হবে, তিনি তাদের বদলে তাদের চেয়ে উত্তম লোক সৃষ্টি করবেন। তাদের চরিত্র, বৈশিষ্ট ও মর্যাদা হবে সুউচ্চ। তাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা ভালবাসবেন। তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে আবু বকর এবং তাঁর বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেসব সাহাবী ও তাবেয়ী রিদ্দার যুদ্ধে শরীক ছিলেন। অতঃপর তাদের পরে কিয়ামাত দিবস পর্যন্ত যারা আগমন করবে, তাদের মধ্য হতে যারা মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, তারাও আল্লাহর ভালবাসা অর্জন করে ধন্য হবে।
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ ale of weient :আল্লাহ তা'আলা বলেন
সেইসব লোকদের ভালবাসেন যারা তাঁর পথে লড়াই করে:
এখানে আল্লাহ তা'আলা দৃঢ়তার সাথে সংবাদ দিয়েছেন, যারা এই বৈশিষ্টের অধিকারী, তিনি তাদেরকে ভালবাসেন। যারা জান ও মাল দিয়ে কালেমায়ে তাওহীদকে বিজয়ী করার জন্য তাঁর রাস্তায় জিহাদ করে, তাদেরকে তিনি ভালবাসেন। صفاً অর্থাৎ তারা যুদ্ধের সময় নিজেদেরকে কাতারবন্দী করে নেয় এবং নিজেদের স্থান থেকে সরে যায় না।
كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مَّرْصُوص প্রাচীর: তারা সীসা ঢালা এমন প্রাচীরের ন্যায় পরস্পর কাতারবন্দী থাকে, যার এক অংশ অন্য অংশের সাথে মিলিত থাকে। তাতে কোন প্রকার ছিদ্র এবং ত্রুটি থাকে না।
وهو الغفور তিনি ক্ষমাশীল: আল্লাহ তা'আলা অত্যাধিক ক্ষমাশীল। الغفر শব্দের অর্থ হচ্ছে الستر অর্থাৎ ঢেকে রাখা। গুনাহ করার পর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করে আল্লাহ তা'আলা তার সেই গুনাহ ক্ষমা করে দেন অর্থাৎ তার গুনাসমূহ ঢেকে রাখেন এবং তার অপরাধসমূহ মাফ করে দেন। আল্লাহর الودود নামটি الود থেকে নেওয়া হয়েছে। নির্ভেজাল ও পরিশুদ্ধ ভালবাসাকে উ’দ্দ বলা হয়। আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন ওয়াদুদ। এর অর্থ হচ্ছে, যারা তাঁর আনুগত্য করে, তিনি তাদেরকে খুব বেশী ভালবাসেন।
আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ দু'টি সম্মানিত নাম الغفور এবং الودود -কে একসাথে উল্লেখ করার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে। তা এই যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার গুনাহ মাফ করেই ক্ষ্যান্ত হন না; বরং তিনি প্রথমে বান্দাকে ক্ষমা করেন অতঃপর তাকে ভালবাসেন।
উপরোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ তা'আলার জন্য ভালবাসা সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি কোন কোন ব্যক্তিকে, কোন কোন আমলকে এবং কিছু কিছু স্বভাব-চরিত্রকে ভালবাসেন। তিনি কোন জিনিসকে ভালবাসেন আবার তাঁর হিকমতের দাবী অনুযায়ী কোন বিষয়কে ভালবাসেন না। তিনি ইখলাসের সাথে আমলকারী, মানুষের প্রতি অনুগ্রহকারী, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠাকারী, মুত্তাকী, তাঁর রসূলের আনুগত্যকারী, আল্লাহর পথে জিহাদকারী, তাওবাকারী, পবিত্রতা অর্জনকারী এবং অন্যান্য সৎকর্ম সম্পাদনকারীদেরকে ভালবাসেন। উপরের আয়াতগুলোতে উভয় পক্ষ হতেই ভালবাসা সংঘটিত হয় বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। বান্দার পক্ষ হতে ভালবাসা হয় এবং আল্লাহর পক্ষ হতেও হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ
আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: قُلْ إِنْ كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّه
বলো যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবেসে থাক তাহলে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন।
এখানে ঐ সব লোকের প্রতিবাদ রয়েছে, যারা উভয় পক্ষ হতেই ভালবাসা সংঘটিত হওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। যেমন জাহমীয়া ও মুতাযেলা সম্প্রদায়ের লোকেরা। তারা বলেছে, আল্লাহ ভালবাসেন না। বান্দার পক্ষ হতেও আল্লাহর জন্য ভালবাসা হয় না। আল্লাহর জন্য বান্দাদের ভালবাসার ব্যাখ্যা তারা এইভাবে করেছে যে, বান্দারা আল্লাহকে ভালবাসে, এর মানে হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত ও আনুগত্য করাকে ভালবাসে এবং আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ভালবাসেন, এর মানে হচ্ছে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন ও তাদেরকে ছাওয়াব প্রদান করেন। এমনি আরো অনেক অপব্যাখ্যাই তারা করে থাকে। এই تأویل (অপব্যাখ্যা) সম্পূর্ণ বাতিল। কেননা আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতভাবেই তাঁর বান্দাদেরকে ভালবাসেন। তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার শানে যেরকম ভালবাসা শোভনীয় হয়, তিনি সেভাবেই ভালবাসেন। আল্লাহর ভালবাসা তাঁর অন্যসব সিফাতের (বিশেষণের) মতই। আল্লাহর ভালবাসা মাখলুকের পরস্পরের ভালবাসার মত নয়।
📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য রহমত ও মাগফিরাত বিশেষণ সাব্যস্ত করা।
وقوله: {بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ} {رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلِّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا} {وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا } { وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ} {كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ} {وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} {فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ “পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্ তা'আলার নামে শুরু করছি” (সূরা ফাতিহা ১:১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلِّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا “হে আমাদের রব! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো”। (সূরা মুমিন ৪০:৭) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا “এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান”। (সূরা আহযাব ৩৩:৪৩) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ "আর আমার রহমত প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে”। (সূরা আরাফ ৭:১৫৬) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ “তোমাদের প্রতিপালক রহমত করাকে নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন (সূরা আনআম ৬:৫৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ “আর তিনি ক্ষমাকারী ও দয়ালু (সূরা ইউনুস ১২:১০৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ "অবশ্যই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো হেফাজতকারী এবং তিনি সবচেয়ে বেশী করুণাশীল”। (সূরা ইউসুফ ১২:৬৪)
ব্যাখ্যা: বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম এর ব্যাখ্যা পূর্বে কিতাবের শুরুতেই অতিক্রান্ত হয়েছে। এখানে আবার উল্লেখ করার কারণ হলো তাতে আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সিফাত রহমত সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন পরের আয়াত গুলোতেও আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা বিশেষণ উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, আল্লাহ তা'আলার রহমান নামটি এমন একটি সিফাতের প্রমাণ করে, যা তাঁর পবিত্র সত্তার সাথে সদা প্রতিষ্ঠিত। আর আর রহিম তাঁর নামটি এমন সিফাতের প্রমাণ করে, যার সম্পর্ক হয় রহমত প্রাপ্তদের সাথে।
যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا “এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান"। কুরআনের কোথাও رحمن هم বলা হয়নি। এতে বুঝা যায়, প্রথমটি আল্লাহ তা'আলার وصف )স্থায়ী বিশেষণ) এর জন্য এবং দ্বিতীয়টি তাঁর فعل বা ক্রিয়ার জন্য। রহমান নামটি প্রমাণ করছে যে, রহমত আল্লাহ তা'আলার ওয়াসিফ তথা স্থায়ী বিশেষণ। আর রহীম নামটি প্রমাণ করছে যে, তিনি স্বীয় রহমত দ্বারা সৃষ্টির উপর দয়া করেন।
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلِّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا হে আমাদের রব! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো। এখানে ঐ সব ফেরেশতাদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যারা দয়াময় আল্লাহর আরশ বহন করে আছেন এবং যারা আরশের চতুর্দিকে অবস্থান করছেন। তারা মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে বলেন হে আমাদের রব! তুমি তোমার রহমত ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিবেষ্টন করে আছো। তোমার রহমত ও ইলম প্রত্যেক বস্তুকে বেষ্টন করে আছে। رَّحْمَةً وَعِلْمًا শব্দদ্বয় ফায়েল হতে পরিবর্তিত হয়ে تمییز হিসাবে মানসুব হয়েছে। এই আয়াতের মধ্যে আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতা ও প্রশস্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। দুনিয়াতে প্রত্যেক মুমিন ও কাফের আল্লাহর রহমত উপভোগ করছে। আর আখেরাতে শুধু মুমিনগণই আল্লাহর রহমত পাবেন।
وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান: এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি মুমিনদের প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে অত্যন্ত দয়ালু। দুনিয়াতে তাদের উপর আল্লাহর রহমত এভাবে হয়েছে যে, তিনি তাদেরকে সেই সত্যের সন্ধান দিয়েছেন, যা অন্যরা পায়নি এবং তাদেরকে এমন পথ দেখিয়েছেন, যা থেকে অন্যরা গোমরাহ হয়েছে। আর আখেরাতে তাদের উপর এভাবে রহমত করবেন যে, তিনি তাদেরকে ভয়াবহ বিপদের দিন নিরাপদ রাখবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
অত্র আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা'আলার রহমত ও ক্ষমার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলিম-কাফির তথা প্রত্যেক সৃষ্টিই আল্লাহর রহমত উপভোগ করছে। কিন্তু আখেরাতে আল্লাহর রহমত শুধু মুমিনদের প্রতিই সীমিত হবে। সে দিন আল্লাহ তা'আলা শুধু তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করবেন এবং তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ তোমাদের প্রতিপালক রহমত করাকে নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন: অর্থাৎ তিনি তাঁর পবিত্র সত্তার উপর রহমত করাকে ওয়াজিব করে নিয়েছেন। এটি তাঁর পক্ষ হতে দয়া ও অনুগ্রহ স্বরূপ। এটি আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও নির্ধারণগত লিখা, তাঁর উপর অন্য কেউ লিখে দেয়নি।
وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ আর তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াময়: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর পবিত্র সত্তা সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি ক্ষমা ও দয়ার বিশেষণে বিশেষিত। ঐ ব্যক্তির জন্যই কেবল তাঁর ক্ষমা ও রহমত, যে তাঁর নিকট তাওবা করে এবং তাঁর উপরই ভরসা করে। যে কোন গুনাহ থেকেই তাওবা হোক না কেন। আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করেন। যেমন শির্ক বা অন্যসব গুনাহ। আল্লাহ তা'আলা শির্ককারীর তাওবা কবুল করেন, তাকে ক্ষমা করেন এবং তাঁর উপর রহম করেন।
فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا অবশ্যই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো হেফাযতকারী: আল্লাহ তা'আলা এখানে তাঁর নাবী ইয়াকুব এর কথা বর্ণনা করেছেন। যখন তাঁর ছেলেরা তাঁর নিকট তাদের ভাই ইউসুফকে পাঠানোর আবেদন করল এবং ইউসুফ কে হেফাযত করার অস্বীকার করলো, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলার হেফাযতই তোমাদের হেফাযতের চেয়ে অধিক উত্তম। ইয়াকুব স্বীয় পুত্রের হেফাযতের দায়িত্ব আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে দিলেন।
আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নাম الحفيظ (হেফাযতকারী)। হেফাযত বিশেষণের মাধ্যমেই তিনি তাঁর সকল বান্দাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তাদের আমলসমূহকে সংরক্ষণ করেন।
আর তিনি মুমিন বান্দাদেরকে ঐসব বিষয় থেকে বিশেষভাবে হেফাযত করেন, যা তাদের ঈমানকে নষ্ট করে দিতে পারে। সেই সাথে তিনি তাদেরকে ঐ বিষয় হতেও হেফাযত করেন, যা তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর।
উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তাতে আল্লাহ তা'আলার জন্য রহমত ও মাগফিরাতের সিফাত (বিশেষণ) সাব্যস্ত করা হয়েছে। অন্যান্য সিফাতের ন্যায় আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই উহা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত। তাতে জাহমীয়া, মুতাযেলা এবং তাদের অনুরূপ অন্যান্য বিদ'আতী সম্প্রদায়ের যে সব লোক সৃষ্টির সাথে আল্লাহর তাশবীহ (তুলনা) হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আল্লাহ তা'আলার রহমত ও মাগফিরাত বিশেষণকে অস্বীকার করে, এখানে তাদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। মুতাযেলা ও জাহমীয়ারা বলে, দয়া করা মাখলুকের বৈশিষ্ট্য। তারা এই আয়াতগুলোকে রূপকার্থে ব্যাখ্যা করেছে। এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ বাতিল। কেননা আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্য এই বিশেষণ সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলার দয়া মানুষের দয়ার মত নয় যে, তাতে তাশবীহ বা সাদৃশ্য আবশ্যক হবে। যেমনটি তারা ধারণা করে থাকে। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
অর্থাৎ তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুরা ৪২:১১)।
কোন বস্তুর নাম এক হলেই তার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য এক হওয়া জরুরী নয়। সৃষ্টিকর্তার জন্য রয়েছে এমন সব সিফাত, যা তাঁর জন্য শোভনীয় ও নির্দিষ্ট এবং মাখলুকের রয়েছে এমন সব সিফাত, যা তার জন্য শোভনীয় ও নির্দিষ্ট। আল্লাহই ভালো জানেন।