📄 সকল সৃষ্টির উপরে আল্লাহ তা‘আলার অবস্থান ও তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হওয়া এবং সকল সৃষ্টির শুরু ও শেষে বিদ্যমান থাকা।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (তিনিই الأَوَّلُ। প্রথম, তিনিই الآخر সর্বশেষ, তিনিই الظَّاهِرُ। সবকিছুর উপরে, তিনিই الْبَاطِنُ। মাখলুকের অতি নিকটে) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন。
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَقَوْلُهُ سُبْحَانَهُ هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তিনিই الأَوَّلُ। (প্রথম), তিনিই الآخِرُ। (সর্বশেষ), তিনিই الظَّاهِرُ (সবকিছুর উপরে), তিনিই الْبَاطِنُ (মাখলুকের অতি নিকটে), আর তিনি সর্ব বিষয়ে علیم (মহাজ্ঞাণী)" (সূরা হাদীদ ৫৭: ৩)।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলার বাণী: هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ "তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ"- সহীহ মুসলিমে নাবী হতে বর্ণিত দু'আর মাধ্যমে এই আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি তাঁর দু'আয় বলেছেন:
«اللَّهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ»
"হে আল্লাহ! তুমিই أَوَّل (সর্বপ্রথম)। তোমার পূর্বে কেউ ছিলনা। তুমিই آخر (সর্বশেষ), তোমার পর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তুমিই ظاهر (সকল সৃষ্টির উপরে), তোমার উপরে আর কিছুই নেই। তুমিই বাতেন (মাখলুকের অতি নিকটে এবং জ্ঞানের মাধ্যমে সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী), তোমার চেয়ে অধিক নিকটে আর কিছুই নেই”। ১২
নাবী উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর এ চারটি নামের সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন। এ বরকত সম্পন্ন নামগুলোর মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টিকে সকল দিক থেকেই পরিবেষ্টন করে আছেন।
আল্লাহ তা'আলার নাম: هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ “তিনিই প্রথম এবং তিনিই শেষ" দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, তিনি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সমস্ত যামানাকে পরিবেষ্টন করে আছেন। অর্থাৎ তিনি যামানা ও কালসীমার উর্ধ্বে। সবকিছুর আগে তিনি একাই ছিলেন এবং সবকিছু শেষ হওয়ার পরও তিনি থাকবেন।
আর আল্লাহ তা'আলার নাম: وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ "তিনি সকল সৃষ্টির উপরে এবং তিনিই সবকিছুকে পরিবেষ্টনকারী” দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তা'আলা যেমন সকল যামানাকে বেষ্টন করে আছেন তেমনি সকল স্থানকে পরিবেষ্টন করে আছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন: আল্লাহ তা'আলার এই চারটি নাম পরস্পর বিপরীত অর্থবোধক। চারটি নামের মধ্যে الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ এই দু'টি নাম আল্লাহ তা'আলার অবিনশ্বরতা ও চিরস্থায়িত্বের জন্য। আর الظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ এই দু'টি নাম দ্বারা আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে হওয়া ও তাদের নিকটে হওয়া বুঝায়।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত প্রথম থেকেই যেসব বস্তু রয়েছে, তার প্রত্যেকটি বস্তু সৃষ্টি হওয়ার আগে থেকেই আল্লাহ তা'আলা রয়েছেন। অর্থাৎ যেসব বস্তু সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা হয়েছে, তা সৃষ্টি হওয়ার পূর্ব থেকেই আল্লাহ আছেন। আর আল্লাহ ব্যতীত যত বস্তু আছে, তার প্রত্যেকটি শেষ হওয়ার পরেও আল্লাহ তা'আলা থাকবেন। সুতরাং আল্লাহই প্রথম এই কথার অর্থ হচ্ছে সবকিছুর পূর্বে আল্লাহ বিদ্যমান থাকা আর আল্লাহই শেষ এই কথা অর্থ হচ্ছে সবকিছুর পর আল্লাহর অবশিষ্ট থাকা।
আর আল্লাহ তা'আলা الظاهر (প্রকাশমান) হওয়ার অর্থ হচ্ছে তিনি প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তুর উপরে। الظهور থেকে আল্লাহ তা'আলার জন্য الظاهر নামটি গ্রহণ করা হয়েছে। যুহুর শব্দটির ভাষাগত দাবী হচ্ছে উপরে হওয়া। বস্তুর উপরের অংশকেই যাহের বলা হয়।
আল্লাহ তা'আলা বাতেন হওয়ার অর্থ হচ্ছে তিনি নিম্নজগতের (পৃথিবী ও তার মধ্যকার) প্রত্যেক সৃষ্টিকে এমনভাবে বেষ্টন করে আছেন যে, তিনি মাখলুকের আপন নফসের চেয়েও অধিক নিকটে। এটি হচ্ছে সকল সৃষ্টির নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ।
আল্লাহ্ তা'আলার বাণী: وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ আর তিনি সর্ব বিষয়ে অবগত: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার ইলম অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল বিষয়কে পূর্ণরূপে পরিবেষ্টন করে আছে। উর্ধ্ব জগতের এবং নিম্নজগতের কোন কিছুই তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য সবকিছুই তিনি অবহিত। আসমান ও যমীনে একটি সরিষার দানা পরিমাণ জিনিসও তাঁর ইলম থেকে অনুপস্থিত নয়।
উপরের আয়াত থেকে আল্লাহর জন্য এমন চারটি সম্মানিত নাম সাব্যস্ত হলো, যার দাবী হচ্ছে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক সৃষ্টিকে ঘিরে আছেন। তিনি অতীত, বর্তমান, এবং ভবিষ্যৎ তথা সকল যামানা ও তার মধ্যে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার সবকিছুকেই জ্ঞানের মাধ্যমে বেষ্টন করে আছেন। সেই সাথে সকল স্থান ও তাতে ছোট-বড় যত প্রকার মাখলুক রয়েছে, সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (তুমি সেই চিরজীবন্ত সত্তার উপর ভরসা করো, যিনি কখনোই মৃত্যু বরণ করবেন না) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وقوله سبحانه وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وقوله وَهُوَ الْحَكِيمُ الخبير
আল্লাহ বলেন: “তুমি সেই চিরজীবন্ত সত্তার উপর ভরসা করো, যিনি কখনোই মৃত্যু বরণ করবেন না” (সূরা ফুরকান ২৫:৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: তিনি প্রজ্ঞাবান ও সর্বজ্ঞ” (আন'আম ৬: ১৮, সূরা সাবা ৩৪:১)।
ব্যাখ্যা: وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ “তুমি সেই চিরজীবন্ত সত্তার উপর ভরসা করো, যিনি কখনোই মৃত্যু বরণ করবেন না” (সূরা ফুরকান ২৫:৫৮)। অর্থাৎ তোমার সকল বিষয় সেই চিরজীবন্ত সত্তার নিকট সোপর্দ করে দাও, যার কখনোই মৃত্যু হবে না।
( التوكل) (তাওয়াক্কুল) এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে التفويض তথা অন্যের নিকট কোন বস্তু সোপর্দ করা। আরবরা বলে থাকে, وكلت أمري إلى فلان أي فوضته অর্থাৎ আমার বিষয়টি অমুকের নিকট সোপর্দ করলাম।
আর পরিভাষায় উপকারী বস্তু অর্জন করার জন্য এবং ক্ষতিকর জিনিস দূর করার জন্য অন্তর দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করাকে توکل বলা হয়।
অন্তর দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করা ইবাদতের অন্যতম একটি প্রকার।
সুতরাং বান্দার সকল কাজে আল্লাহর উপর ভরসা করা অপরিহার্য।
কল্যাণ অর্জনের জন্য কিংবা অকল্যাণ দূর করার জন্য উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা আল্লাহর উপর ভরসা করার পরিপন্থী নয়; বরং পরিশ্রম ও চেষ্টা করার সাথে আল্লাহর উপর ভরসা করার পূর্ণ মিল রয়েছে। তাওয়াক্কুলের ব্যাপারে আল্লাহর হায়াতকে খাস করার মধ্যে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যিনি চিরজীবন্ত, কল্যাণ লাভের জন্য কেবল তাঁর উপরই ভরসা করা উচিৎ। আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ চিরজীবন্ত নয় কিংবা অন্য কারো হায়াত চিরস্থায়ী নয়। মাখলুকের হায়াত যেহেতু মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়, তাই যে ব্যক্তি মাখলুকের উপর ভরসা করে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মোট কথা, এই আয়াতে আল্লাহু তা'আলার জন্য হায়াতে কামেলা (পূর্ণাঙ্গ জীবন) সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং একই সাথে তাঁর পবিত্র সত্তার মৃত্যু হওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে। সুতরাং এই আয়াতের মধ্যেও আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করার বেলায় নাফী ও ইছবাতকে একত্র করা হয়েছে।
وَهُوَ الْحَكِيمُ الْخَبِيرُ আল্লাহ তা'আলা প্রজ্ঞাবান ও সর্বজ্ঞ: আল্লাহ তা'আলার অন্যতম নাম الحكيم। এর দু'টি অর্থ রয়েছে।
হাকীমের এক অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাখলুকের মধ্যে সৃষ্টিগত ও শারীয়াতগত উভয় প্রকার আদেশের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে ফায়সালাকারী।
আর হাকীমের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে محکم অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ প্রজ্ঞাবান এবং সকল বস্তুকে যথাযথ স্থানে মজবুতভাবে স্থাপনকারী। সে হিসাবে এটি الحكمة থেকে গৃহীত। প্রত্যেক বিষয়কে তার নিজ নিজ স্থানে স্থাপন করাকে হিকমত বলা হয়। সুতরাং আল্লাহু তা'আলাই তাঁর বান্দাদের মধ্যে ফায়সালাকারী। তিনি যা সৃষ্টি করেন এবং তাঁর সৃষ্টিকে তিনি যেই আদেশ করেন, তাতে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ একটি হিকমাত (রহস্য ও উদ্দেশ্য)। আল্লাহ তা'আলা কোন সৃষ্টিকেই অযথা সৃষ্টি করেননি। মানুষের জন্য যা কিছু কল্যাণকর, তিনি কেবল তাই ইসলামী শারীয়াতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
الله تعالى الخبير নামটি الخبرة থেকে গৃহীত। الخبرة অর্থ হলো বস্তুসমূহের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অবস্থা জ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেষ্টন করে থাকা। বলা হয় ام خبرت الشيئ إذا عرفته على حقيقته সম্পর্কে অবগত আছি। ইহা আপনি ঠিক ঐ সময় বলে থাকেন, যখন আপনি উহাকে তার আসল অবস্থাসহ জানতে পারেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা হচ্ছেন الخبير অর্থাৎ তিনি এমন সত্তা, যিনি স্বীয় ইলম ও ক্ষমতার মাধ্যমে সকল বস্তুর অপ্রকাশ্য ও গোপন অবস্থা ঠিক সেভাবেই অবগত আছেন, যেভাবে তিনি সেগুলোর প্রকাশ্য অবস্থা সম্পর্কে অবহিত।
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা'আলার সম্মানিত নামসমূহ থেকে দু'টি নাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। একটি হচ্ছে الحكيم (প্রজ্ঞাবান) অপরটি হচ্ছে الخبير (সর্বজ্ঞ)। একই সাথে এ নাম দু'টি আল্লাহর সিফাতসমূহ থেকে দু'টি সিফাতও সাব্যস্ত করছে। তা হচ্ছে হিকমাত ও খিবরাত তথা আল্লাহ তা'আলার প্রজ্ঞা ও চাক্ষুস জ্ঞান。
টিকাঃ
১২. সহীহ মুসলিম ২৭১৩।
📄 আল্লাহ তা‘আলার ইলম (জ্ঞান) সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (তিনি জানেন যা যমীনে প্রবেশ করে, যা তা হতে বের হয়) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন
﴿يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا ﴾ ﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ﴾
আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا ﴾
"তিনি জানেন যা যমীনে প্রবেশ করে, যা তা হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা অবতীর্ণ হয় ও যা কিছু আকাশে উঠে (সূরা সাবা ৩৪:২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: ﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ﴾
"গায়েব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে। তিনি ছাড়া আর কেউ তা অবগত নয়, জলে ও স্থলের সবকিছুই তিনি অবগত রয়েছেন। তাঁর অবগতি ব্যতীত বৃক্ষ হতে একটি পাতাও ঝরে না এবং ভূ-পৃষ্ঠের অন্ধকারে এমন একটি শস্য দানাও নেই, যে সম্পর্কে তিনি অবগত নন। এমনিভাবে শুষ্ক ও আদ্র সবকিছুই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে (সূরা আন'আম ৬:৫৯)।
ব্যাখ্যা: ﴾يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ﴿ 'যমীনে যা প্রবেশ করে': তার অন্যতম হচ্ছে বৃষ্টির পানি, শস্যের দানাসমূহ, গুপ্ত ধনসমূহ, মৃত ব্যক্তিদের লাশ ইত্যাদি।
আর وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا 'মীন হতে যা বের হয়': তার মধ্যে রয়েছে, উদ্ভিদ, বিভিন্ন খনিজ সম্পদ ইত্যাদি।
وَمَا يَزِلُ مِنَ السَّمَاءِ ‘আসমান থেকে যা নাযিল হয়': তার মধ্যে রয়েছে বৃষ্টি, ফেরেশতা, আল্লাহর হুকুম আহকাম এবং অন্যান্য বিষয়।
আর وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا 'যা কিছু আকাশে উঠে': বনী আদমের আমল ও আল্লাহর ফেরেশতাগণ আকাশে উঠে।
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহ তা'আলার ইলম সাব্যস্ত করা হয়েছে। সব কিছুকেই তিনি জ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেষ্টন করে আছেন।
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ "গায়েব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে: অর্থাৎ অদৃশ্যের ভান্ডারসমূহ অথবা গায়েব সম্পর্কে ইলম অর্জনের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর নিকটেই। لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ তিনি ব্যতীত অন্য কেউ উহা জানে না। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলমে গায়েব থেকে কিছু জানার দাবী করল, সে কুফরী করল।
সহীহ বুখারী মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত হাদীসে গায়েবের চাবিসমূহের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রসূল বলেন:
مفَاتِحُ الْغَيْبِ خَمْسٌ لا يَعْلَمُهَا إِلا اللَّهُ ثم قرأى هذه الآية ﴿إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمٌ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَدًا وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضِ تَمُوتُ)
"গায়েবের চাবি হচ্ছে পাঁচটি। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। কিয়ামাতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন। গর্ভাশয়ে যা থাকে, তা তিনিই জানেন। কেউ জানে না, সে আগামীকাল কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না, সে কোন যমীনে মৃত্যু বরণ করবে” (সূরা লুকমান ৩১:৩৪)। ১০
وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ স্থলভাগে যা আছে তিনি তা জানেন। অর্থাৎ পৃথিবীর বসতী এলাকায় এবং খালী জায়গায় যে সমস্ত বাসিন্দা, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য যেসব রয়েছে, তা তিনি অবগত আছেন। এমনি وَالْبَحْرِ জলভাগে যেসব প্রাণী, মূল্যবান মনি-মুক্তা এবং অনুরূপ মাখলুক রয়েছে, তাও তিনি জানেন।
وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ তাঁর অবগতি ব্যতীত একটি পাতাও ঝরে না: স্থলভাগ, জলভাগ এবং অন্যান্য স্থানের বৃক্ষসমূহের কোন পাতাই إِلَّا يَعْلَمُهَا আল্লাহর অবগতি ছাড়া ঝরে পড়ে না। এমনি বৃক্ষের পাতাসমূহ কখন ও কোথায় পড়ে, তাও তিনি জানেন।
وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ ভূ-পৃষ্ঠের অন্ধকারে এমন একটি দানাও নেই, যে সম্পর্কে তিনি অবগত নন: অর্থাৎ যমীনের অন্ধকারচ্ছন্ন স্থানসমূহে কিংবা মাটির নীচের শস্যদানা বা ক্ষুদ্রতম দানা পরিমাণ বস্তু সম্পর্কে তিনি অবগত।
وَلَا رَطْبِ وَلَا يَا بِسِ শুষ্ক ও আদ্র সবকিছুই: অর্থাৎ সকল সৃষ্টি সম্পর্কেই তিনি অবগত। এটি خاص এর পর عام স্বরূপ। অর্থাৎ প্রথমে কিছু খাস বস্তু উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে যে, শুষ্ক ও আদ্র সকল বস্তু সম্পর্কেই তিনি জানেন।
إِلَّا فِي كِتَاب مبين একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে: এগুলো থেকে যাই হোক না কেন, তার সবই লাওহে মাহফুযে লিখিত রয়েছে।
উপরোক্ত আয়াতে সাব্যস্ত করা হয়েছে গায়েবের ইলম আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে নেই। আল্লাহ তা'আলার ইলম প্রত্যেক বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে। এতে তাকদীর এবং লাওহে মাহফুযে তা লিখার কথাও প্রমাণিত হয়।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং প্রসবও করে না) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন
{وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَى وَلا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ} {لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا} وقوله : {إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ}
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: {وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَى وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ ﴾
"আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং প্রসবও করে না (সূরা ফাতির ৩৫: ১১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا
যাতে তোমরা জানতে পারো, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন এবং আল্লাহর জ্ঞান সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে” (সূরা তালাক ৬৫:১২)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
"আল্লাহ নিজেই রিযিকদাতা, শক্তিধর ও প্রবল ক্ষমতার অধিকারী" (সূরা যারিয়াত ৫১: ৫৭-৫৮)।
ব্যাখ্যা : وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَى وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ “আল্লাহর অজ্ঞাতসারে কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসবও করে না: অর্থাৎ আল্লাহর অবগতি ব্যতীত কোন নারী বা অন্য কোন প্রাণীর গর্ভধারণ এবং প্রসব হয় না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, কোন জিনিসই আল্লাহর ইলম ও তদবীরের বাইরে নয়। কোন দিন কোন নারী বা অন্য কোন প্রাণীর গর্ভে সন্তান ও বাচ্চা আসবে, কোন দিন সে তা প্রসব করবে এবং ছেলে সন্তান প্রসব করবে? না মেয়ে সন্তান? আল্লাহু তাও জানেন।
لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান: এখানে لام এর সম্পর্ক হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার পূর্বোক্ত বাণী: خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتِ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ এর সাথে। অর্থাৎ তিনি সাত আসমান ও সাত যমীন সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা আল্লাহ তা'আলার পূর্ণ ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারো।
وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا এবং যাতে আরো জানতে পারো যে, আল্লাহর জ্ঞান সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে: অর্থাৎ যাতে তোমরা এই কথা জানতে পারো যে, আল্লাহর ইলম সবকিছুকে ঘিরে আছে। সৃষ্টির কোন কিছুই তাঁর ইলমের বাইরে নয়। সেটি যাই হোক না কেন।
علمًا শব্দটি تمیز হিসাবে অথবা مفعول مطلق হিসাবে মানসুব হয়েছে। কেননা أحاط অর্থ علم যার অর্থ তিনি অবগত হয়েছেন।
উপরের দু'টি আয়াত থেকে আল্লাহর এমন ইলম প্রমাণিত হচ্ছে, সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছে। সেই সাথে সকল বস্তুর উপর আল্লাহর ক্ষমতাও প্রমাণিত হলো।
إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ 'আল্লাহ নিজেই রিযিকদাতা': আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন রিযিক দাতা নেই। তিনি সকল সৃষ্টিকেই রিযিক দেন এবং তাদের কল্যাণে সবকিছুই সরবরাহ করেন। তিনি বিনা হিসাবে সকল প্রাণীর রিযিকের ব্যবস্থা করেন। সুতরাং তোমরা তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের ইবাদাত করো না।
ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ প্রবল শক্তিধর ও পরাক্রমশালী: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ শক্তির অধিকারী। তাঁর শক্তিতে কোন প্রকার দুর্বলতা অনুপ্রবেশ করতে পারে না। আর المتين অর্থ হচ্ছে তিনি সর্বোচ্চ শক্তি ও প্রবল ক্ষমতার অধিকারী। সুতরাং তাঁর কাজে কোন কষ্ট, ক্লান্তি এবং দুর্বলতা অনুভব হয় না। আল্লাহ তা'আলার আল-মাতিন নামটি আল-মুতানা ক্রিয়ামূল থেকে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে কঠিন ও শক্তিমান হওয়া।
উপরোক্ত আয়াতে কারীমা থেকে আল্লাহর রায্যাক নামটি প্রমাণিত হলো। সেই সাথে আল্লাহ তা'আলার জন্য এমন সিফাত তথা পূর্ণ শক্তি ও ক্ষমতা প্রমাণিত হলো যাতে কোন প্রকার দুর্বলতা ও ক্লান্তি আসতে পারে না। একই সাথে এই আয়াতগুলো দ্বারা দলীল গ্রহণ করা হয়েছে যে, একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা আবশ্যক। তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই。
টিকাঃ
১৩. সহীহ বুখারী ৪৬২৭, সহীহ মুসলিম ৯-১০, ইবনে মাজাহ ৬৪।
📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার শ্রবণ ও দর্শন।
وقوله تعالى: {لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ} وقوله: {إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا}
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيْرِ “কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুরা ৪২: ১১)। আল্লাহ আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সর্বোত্তম উপদেশ দান করেন। আর আল্লাহ সবকিছুই শোনেন ও দেখেন”। (সূরা নিসা ৪: ৫৮)
ব্যাখ্যা: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ "কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়”। এ আয়াতের প্রথম অংশ হচ্ছে:
فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجًا "আল্লাহ তা'আলা আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, তিনি তোমাদের নিজ থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপ অন্যান্য জীব-জন্তুর জোড়া বানিয়েছেন "(সূরা শুরা ৪২: ১১)।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাছীর বলেন: যিনি সকল মানুষকে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন এবং অনুরূপ অন্যান্য জীবজন্তুর জোড়া বানিয়েছেন, তার মত আর কিছুই নেই। কেননা তিনি সেই একক অমুখাপেক্ষী সত্তা, যার কোন নযীর (সদৃশ) নেই। তিনি السميع (সর্বশ্রোতা), যিনি সকল ভাষার সকল আওয়াজই শুনেন। তিনি البصير (সর্বদ্রষ্টা), তিনি সবকিছুই দেখেন। আসমান ও যমীনের কোন কিছুই তাঁর কাছে অস্পষ্ট নয়।
ইমাম শাওকানী তাঁর তাফসীরে বলেন, যে ব্যক্তি ভালভাবে এই আয়াতটি বুঝতে সক্ষম হবে এবং যথাযথভাবে তা নিয়ে গবেষণা করবে, আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে মতভেদকারীদের মতভেদ করা সত্ত্বেও সে উজ্জল ও সুস্পষ্ট পথে চলতে পারবে।
সে যদি আল্লাহর বাণী: وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِير "তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা”: নিয়ে চিন্তা করে, তাহলে তার জ্ঞান আরো বৃদ্ধি পাবে। কেননা আল্লাহর অনুরূপ কোন জিনিস হওয়াকে পরিহার করার পর আল্লাহর জন্য উপরোক্ত দু'টি নাম ও সিফাত সাব্যস্ত করার দ্বারা আল্লাহর আসমা ও সিফাতের প্রতি বিশ্বাস মুমিনের অন্তরে প্রশান্তি আনয়ন করে, অন্তর থেকে সকল ব্যধি সরিয়ে দেয় এবং হৃদয়কে শীতল করে তুলে।
সুতরাং হে সত্যের সন্ধানী! তুমি এই উজ্জল প্রমাণ এবং মজবুত দলীলের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করো। এর মাধ্যমেই তুমি অনেক বিদ'আতকে ভেঙ্গে চুরমার করতে পারবে, গোমরাহীর ইমামদের ভিত্তিকে ধ্বংস করতে পারবে এবং যুক্তিবাদীদের নাকে মাটি লাগাতে পারবে। বিশেষ করে যখন তুমি আল্লাহ তা'আলার এই বাণীকে তার সাথে যুক্ত করবে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا
তিনি লোকদের সামনের ও পেছনের সব অবস্থা জানেন। তারা তাদের জ্ঞান দ্বারা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না (সূরা ত্বহা ২০:১১০)।
إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপদেশ দান করেন: এটি সূরা নিসার ৫৮ নং আয়াতের শেষাংশ। আয়াতের পূর্বের অংশ হচ্ছে,
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ "হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত তার হকদারদের হাতে ফেরত দেবার নির্দেশ দিচ্ছেন। আর লোকদের মধ্যে ফায়সালা করার সময় আদল বা ন্যায়নীতি সহকারে ফায়সালা করো”।
نعم শব্দটি প্রশংসার জন্য ব্যবহৃত শব্দসমূহের অন্যতম। এর শেষে যুক্ত 3 সম্পর্কে একাধিক কথা রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন এটি হচ্ছে 4 نكرة موصوفة । সম্ভবত বাক্যটি এক রকম ছিল, 4 نعم شيئا يعظكم به উত্তম বিষয় দ্বারা তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন।
কেউ কেউ বলেছেন এখানে 4 মাওসুল হিসাবে এসেছে। আসল বাক্যটি এক রকম ছিল, 4 نعم الشيئ الذي يعظكم به অর্থাৎ যে বিষয়টি দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে, তা কতই না উত্তম! يعظكم (উপদেশ দিচ্ছেন) অর্থ হলো তিনি তোমাদেরকে আমানত আদায় করার এবং মানুষের মাঝে ন্যায়ের সাথে ফায়সালা করার আদেশ দিচ্ছেন।
إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا অর্থাৎ তোমরা যা কিছু বল আল্লাহ তা'আলা তা শুনেন এবং যা কিছু করো, তা তিনি দেখেন। উপরের আয়াত দু'টি থেকে আল্লাহর শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রমাণিত হলো। আয়াত দু'টির প্রথমটিতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা কোন মাখলুকের অনুরূপ নন এবং তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। উহাতে আল্লাহ তা'আলার সিফাতের ক্ষেত্রে নাফী ও ইছবাতকে একত্র করা হয়েছে। অর্থাৎ একই সাথে আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তা হতে ত্রুটি ও দোষযুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো পরিহার করা হয়েছে এবং তাঁর যাতে পাকের জন্য অতি উত্তম ও সুউচ্চ গুণাবলী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
📄 আল্লাহ তা‘আলার জন্য মাশিয়াহ (ইচ্ছা) বিশেষণ সাব্যস্ত করা।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে বললে না কেন) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন
وقوله: {وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاء اللَّهُ لا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ} {وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ} وقوله: {أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ}
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ)
“তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন মাশা-আল্লাহ (আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে) বললে না কেন? আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই” (সূরা কাহাফ ১৮:৩৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ)
“আল্লাহ ইচ্ছা করলে তারা কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতো না, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন”। (সূরা বাকারা ২:২৫৩) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: أُحِلَّتْ لَكُم بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ)
“তোমাদের জন্য চতুষ্পদ গৃহপালিত সব পশুই হালাল করা হয়েছে। তবে সামনে যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের জানানো হবে সেগুলো ছাড়া। কিন্তু ইহরাম অবস্থায় শিকার করা নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়ো না। নিঃ সন্দেহে আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন”। (সূরা মায়িদা ৫:১)
ব্যাখ্যা: আল্লাহর বাণী: وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ "তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে” ৯ শব্দটি এখানে ১৯ অর্থে ব্যবহৃত। অর্থাৎ তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করার সময় مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ বললে না কেন? অর্থাৎ আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার সামনে তোমার নিজের অক্ষমতা ও অপারগতা প্রকাশ করতে। আল্লাহর জন্য পূর্ণ ক্ষমতার স্বীকৃতি দিয়ে এই কথা বললে না কেন যে, আল্লাহ যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।
কোন কোন সালাফ বলেছেন, যার কাছে কোন জিনিস ভাল লাগে, সে যেন বলে لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مَا شَاءَ اللَّهُ ।
وَ لَوْ شَاءَ اللهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ “আল্লাহ ইচ্ছা করলে তারা কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতো না, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন”: অর্থাৎ আল্লাহু তা'আলা যদি ইচ্ছা করতেন, তারা যুদ্ধ না করুক, তাহলে তারা পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ করত না। কেননা আল্লাহর রাজ্যে আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু হওয়া অসম্ভব। আল্লাহর হুকুম প্রতিহত করার মত কেউ নেই এবং তাঁর ফায়সালা ঠেকানোরও কেউ নেই।
أُحِلَّتْ لَكُم তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে: এখানে মুমিনদেরকে লক্ষ্য করে এই কথা বলা হয়েছে।
بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ চতুষ্পদ গৃহপালিত সব পশু: চতুষ্পদ গৃহপালিত পশু বলতে এখানে উট, গরু, ছাগল এবং ভেড়া উদ্দেশ্য।
إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ তবে সামনে যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের জানানো হবে সেগুলো ছাড়া: এই বাক্যটি থেকে স্বতন্ত্র অর্থাৎ যেগুলোর আলোচনা সামনে আসছে, সেগুলোর গোশত খাওয়া তোমাদের জন্য হালাল নয়। ঐ হারাম পশুগুলো উক্ত আয়াতের সামান্য পরেই অর্থাৎ সূরা মায়িদার ৩নং আয়াতে আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِرِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ، ذَلِكُمْ فِسْقٌ )
"তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে মৃতজীব, রক্ত, শূকরের গোস্ত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর নামে যবেহকৃত প্রাণী এবং কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে, আহত হয়ে, উপর থেকে পড়ে গিয়ে বা ধাক্কা খেয়ে মরা অথবা কোন হিংস্র প্রাণী চিরে ফেলেছে এমন প্রাণী, তবে তোমরা জীবিত পেয়ে যাকে যবেহ করেছ সেটি ছাড়া। আর যা কোন বেদীমূলে (পূজার ঘরে, অলী-আওলীয়ার নামে, কবর ও মাজারের উদ্দেশ্যে) যবেহ করা হয়েছে তাও তোমাদের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও শুভ-অশুভ নির্দ্ধারনের তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য নির্ণয় করাও তোমাদের জন্য জায়েয নয়। এগুলো ফাসেকী তথা আনুগত্য বহির্ভুত কাজ"।
ام غَيْرَ مُحِلِّي الصَّيْدِ وَأَنتُمْ حُرُمٌ
নিজেদের জন্য হালাল করে নিয়ো না: এই বাক্যটি بَهِيمَةُ الْأَنْعَامِ থেকে আরেকটি স্বতন্ত্র বিষয়। অর্থাৎ গৃহপালিত চতুষ্পদ সব জন্তুই তোমাদের জন্য হালাল। তবে এগুলো থেকে যেগুলো বন্য, সেগুলো শিকার করে ভক্ষণ করাও হালাল। কিন্তু যখন তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাকবে, তখন এগুলো শিকার করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর বাণী: وَأَنتُمْ حُرُمٌ হাল (অবস্থা জ্ঞাপক) হিসাবে নসব বা যবরের স্থানে রয়েছে। যারা হাজ্জ কিংবা উমরাহ অথবা উভয়টির ইহরাম বেঁধেছে, তাদেরকে محرم বলা হয়। ইহা حرم এর বহুবচন।
إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ নিঃসন্দেহে আল্লাহ যা ইচ্ছা আদেশ করেন: অর্থাৎ আল্লাহ যা ইচ্ছা হালাল করেন এবং যা ইচ্ছা হারাম করেন। তাঁর ইচ্ছায় ও কর্মে আপত্তি উত্থাপন করার কেউ নেই। উপরের আয়াতগুলোতে আল্লাহর সিফাত হিসাবে ইচ্ছা, শক্তি এবং আদেশ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এগুলো আল্লাহ তা'আলার অন্যতম সিফাত। আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই এগুলো তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা জরুরী।
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে তার কথার (আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার ইচ্ছা করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন) মাধ্যমে গুণান্বিত করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصْعَدُ فِي السَّمَاءِ )
"আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার ইচ্ছা করেন তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষদেশ খুব সংকীর্ণ করে দেন। যাতে মনে হয় সে কষ্ট করে আকাশের দিকে উঠার চেষ্টা করছে (সূরা আনআম ৬:১২৫)।
ব্যাখ্যা: فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ আল্লাহ যাকে সত্যপথ দেখাবার ইচ্ছা করেন: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যাকে ঈমান ও তাওহীদ কবুলের তাওফীক দেন এবং তার অন্তরকে সত্য কবুলের জন্য উপযুক্ত করেন, তার অন্তরকে উহার জন্য প্রশস্ত করে দেন। ১৪ من শব্দটি فعل مضارع কে জযমদাতা এবং ইসমে শর্ত। يُرِدْ ফেলে (ক্রিয়া) মুযারেটি (ভবিষ্যত কালীন ক্রিয়া) শর্ত হিসাবে জযম যুক্ত।
আর يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلإِسْلَامِ "তার বক্ষদেশ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন”। বাক্যটি শর্তের জবাব হিসাবে مجزوم (জযম যুক্ত)। الشرح অর্থ হচ্ছে।
التوسعة (আল্-উসআতু) (বিদীর্ণ করা, চেরা, ফাটানো ইত্যাদি)। এর মূল অর্থ হচ্ছে شرحت الأمر (আশ্-শারহু) (প্রশস্ত করা)। বলা হয়ে থাকে তথা বিষয়টিকে প্রশস্ত করলাম। এই কথা আপনি ঠিক ঐ সময় বলেন, যখন আপনি তা প্রশস্ত করে বর্ণনা করেন এবং খোলাখুলি বয়ান করেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যাকে ঈমান ও তাওহীদ কবুলের তাওফীক দেন এবং তার অন্তরকে সত্য কবুলের জন্য উপযুক্ত করেন, তার অন্তরকে আল্লাহ তা'আলা সত্য দ্বীন ইসলামের জন্য উন্মুক্ত ও প্রশস্ত করে দেন। এর ফলে সে উন্মুক্ত হৃদয়ে ইসলাম কবুল করে নেয়।
وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেন। অর্থাৎ যাকে আল্লাহ তা'আলা সত্য কবুল করা হতে ফিরিয়ে রাখতে চান, يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا তার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেন। ফলে তা সত্য কবুল করার জন্য উন্মুক্ত হয় না। حَرَجً অর্থাৎ একদম সংকীর্ণ করে দেন, যার ফলে অন্তরে ঈমান ও হেদায়াত প্রবেশের কোন রাস্তাই থাকে না। ضيق শব্দের অর্থকে জোরালো করার জন্য حَرَجً শব্দটি আনয়ন করা হয়েছে।
كَأَنَّمَا يَصْعَّدُ فِي السَّمَاءِ মনে হয় সে কষ্ট করে আকাশের দিকে উঠার চেষ্টা করছে: يصعد শব্দটি মূলত يتصعد ছিল। তা-কে সোয়াদ দ্বারা পরিবর্তন করে সোয়াদের মধ্যে ইদগام করা হয়েছে। অর্থাৎ যার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেয়া হয়েছে, তার জন্য হেদায়াত কবুল করে নেয়ার বিষয়টি ঠিক ঐ ব্যক্তির ন্যায় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে কোন অসম্ভব কাজ সম্পাদন করার জন্য বার বার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে তা সম্পাদন করতে পারছে না। যেমন কেউ আকাশে উঠার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। যেই কাফেরের উপর ঈমান কবুল করে নেয়া খুব ভারী অনুভব হয়, তাকে ঐ ব্যক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে আকাশে উঠার মত সাধ্যাতীত কাজ সম্পাদন করতে চায়। উপরের আয়াতে আল্লাহ তা'আলার জন্য ইরাদাহ সাব্যস্ত হলো। কাউকে হেদায়াত করা আবার কাউকে গোমরাহ করা উভয়টিই আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
ইরাদাহ এর প্রকারভেদ:
আল্লাহ তা'আলার إرادة ইরাদাহ (ইচ্ছা) দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার: إرادة كونية قدرية ইরাদায়ে কাওনীয়া কাদারীয়া বা ক্ষমতাগত ইচ্ছা। অর্থাৎ ভাল-মন্দ এমনকি পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা অনুপাতেই সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্ধারিত হয়েছে। এই প্রকার ইরাদাহ এবং المشيئة একই জিনিস। উভয়টি পরস্পর সমার্থবোধক। এই প্রকার ইরাদাহ্র উদাহরণ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার বাণী:
﴿وَإِذَا أَرَدْنَا أَن نُّهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا ﴾
"আমি যখন কোনো জনবসতিকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি তখন তার সমৃদ্ধিশালী লোকদেরকে নির্দেশ দেই, ফলে তারা সেখানে নাফরমানী করতে থাকে (সূরা বানী ইসরাঈল ১৭:১৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ ﴾
"আর আল্লাহ যখন কোন জাতিকে দুর্ভাগ্য কবলিত করার ফায়সালা করেন তখন তা প্রতিহত হয় না (সূরা রা'দ ১৩:১১)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا ﴾
"আর যাকে তিনি গোমরাহীতে নিক্ষেপ করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষদেশ খুব সংকীর্ণ করে দেন"।
দ্বিতীয় প্রকার: ইরাদাহ হচ্ছে إراداة دينية شرعية ইরাদায়ে দ্বীনিয়া শারঈয়া অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার শারীয়াতগত ইচ্ছা। এই প্রকার ইচ্ছার মাধ্যমেই তিনি তাঁর বান্দাদের উপর শারীয়াতের সকল হুকুম-আহকাম বিধিবদ্ধ করেছেন। এর উদাহরণ হলো আল্লাহর বাণী:
﴿وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ ﴾
"আল্লাহ তোমাদের তাওবা কবুল করার ইচ্ছা করেন (সূরা নিসা ৪: ২৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَكِن يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ ﴾
"আল্লাহ তোমাদের উপর সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করেন না। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করেন তোমাদেরকে পাক-পবিত্র করতে (সূরা মায়িদা ৫:৬)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ ﴾
"আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের নাবী পরিবার থেকে ময়লা দূর করতে”। (সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)
ইরাদায়ে কাওনীয়া এবং ইরাদায়ে শারঈয়ার মধ্যে পার্থক্য:
(১) ইরাদায়ে কাওনীয়া তথা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারণগত ইচ্ছার মাধ্যমে যা হয়, আল্লাহ কখনো তাকে ভালবাসেন ও তাতে সন্তুষ্ট থাকেন আবার কখনো তা তিনি ভালবাসেন না এবং উহার প্রতি সন্তুষ্টও থাকেন না।
আর ইরাদায়ে শারঈয়ার মাধ্যমে যা সংঘটিত হয়, তাকে তিনি অবশ্যই ভালবাসেন এবং উহার প্রতি সন্তুষ্টও থাকেন। সুতরাং সকল প্রকার পাপকাজ এবং অকল্যাণও আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে শামিল। সে হিসাবে সৃষ্টি ও বিধানগত দিক থেকে তিনি পাপাচার সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা পাপ কাজকে ভালবাসেন না এবং উহার প্রতি সন্তুষ্টও থাকেন না। তিনি তাতে লিপ্ত হওয়ার আদেশও করেননি; বরং তা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
(২) ইরাদায়ে কাওনীয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তা সৃষ্টি করা মূল উদ্দেশ্য হয় না; বরং তা অন্য এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইবলীস এবং সকল প্রকার পাপাচার ও অকল্যাণ সৃষ্টি করেছেন। যাতে করে মুমিন বান্দাগণ নক্সে আম্মারা ও শয়তানের সাথে সর্বদা জিহাদে লিপ্ত থাকে। শয়তানের প্ররোচনা ও ধোঁকায় নিপতিত হয়ে মানুষ পাপকাজে লিপ্ত হয়ে গেলেও আল্লাহর কাছে তারা তাওবা করে এবং ক্ষমা চায়। এমনি আরো ভালো উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা'আলা অন্যায় ও অকল্যাণ সৃষ্টি করেছেন।
ঐদিকে শারঈ ইচ্ছার দ্বারা আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, তা মূলতঃই উদ্দেশ্য হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি ও শারীয়াতগত এই উভয় দিক থেকেই ইচ্ছা করেছেন যে, বান্দারা তাঁর আনুগত্য করুক। কেননা তিনি আনুগত্যের কাজকে ভালবাসেন এবং উহার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
(৩) আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি ও নির্ধারণগত ইচ্ছা অবশ্যই সংঘটিত হয়। অর্থাৎ এর মাধ্যমে তিনি যা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, সাথে সাথে তা সৃষ্টি হয়ে যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ﴾
"আল্লাহ তা'আলা যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন তখন তিনি শুধু বলেন যে, হয়ে যাও। সাথে সাথেই তা হয়ে যায়”। (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮২-৮৩)
আর শারঈ ইচ্ছার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা যা ইচ্ছা করেন, তা সকল ক্ষেত্রে সংঘটিত হওয়া আবশ্যক নয়। কখনো তা সংঘটিত হয়, আবার কখনো হয় না।
একটি জ্ঞাতব্য বিষয়:
অনুগত একনিষ্ঠ মুমিন মুখলিস বান্দার মধ্যে ইরাদায়ে কাওনীয়া এবং ইরাদায়ে শারঈয়াহ উভয়টিই একত্রে বাস্তবায়ন হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিগত ও নির্ধারণের দিক থেকে সৎকাজ সংঘটিত হওয়ার ইচ্ছা করেছেন এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য ইরাদায়ে শারঈয়ার মাধ্যমে আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহর যেই বান্দা আল্লাহর এই হুকুম কবুল করে নিয়েছে, তার মধ্যে আল্লাহর দু'টি ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে।
আর অপরাধীর অপরাধের মধ্যে শুধু ইরাদায়ে কাওনীয়াই বাস্তবায়ন হয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের পথ বর্জন করে, তার দ্বারা অপরাধটি হয় শুধু এই হিসাবে যে, আল্লাহ তা'আলা উক্ত অপরাধের স্রষ্টা; তাতে আদৌ আল্লাহর আদেশ ও সন্তুষ্টি থাকে না।
আরেকটি জ্ঞাতব্য বিষয়:
যারা আল্লাহ তা'আলার উপরোক্ত উভয় প্রকার ইরাদাহ সাব্যস্ত করেনি এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেনি, তারা পথভ্রষ্ঠ হয়েছে। যেমন জাবরীয়া এবং কাদরীয়া (মুতাযেলা) সম্প্রদায়ের লোকেরা। জাবরীয়ারা শুধু আল্লাহর ইরাদায়ে কাওনীয়া সাব্যস্ত করেছে। কাদরীয়ারা শুধু আল্লাহ তা'আলার ইরাদায়ে শারঈয়া সাব্যস্ত করেছে। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উভয় প্রকার ইরাদাই আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেছে এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্যও করেছে。
টিকাঃ
১৪. অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈমান ও হেদায়াতকে ভালবাসে এবং সেদিকে স্বীয় ইচ্ছাকে ধাবিত করে, আল্লাহ তা'আলা তার জন্য ঈমানের পথ সহজ করে দেন ও তাকে সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর চলতে সাহায্য করেন। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও আনুগত্যের কাজকে পছন্দ করে না, কুরআন-হাদীসের কথা যার কাছে ভাল লাগে না এবং জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনার প্রতিও যে কর্ণপাত করে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে সৎপথে চলার তাওফীক দেন না এবং তাকে সাহায্যও করেন না।