📄 আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস করা
কোন রকম পরিবর্তন, বর্জন ও সাদৃশ্যকরণ ছাড়াই কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস করা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
ومن الإيمان بالله الإيمان بما وصف به نفسه في كتابه ووصفه به رسوله محمد صلی الله عليه وسلم من غير تحريف ولا تعطيل ومن غير تكييف ولا تمثيل
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কিতাবে নিজেকে যে সুউচ্চ গুণাবলী দ্বারা বিশেষিত করেছেন এবং তাঁর রসূল মুহাম্মাদ তাঁর পবিত্র সুন্নাতে আল্লাহর যে মহান গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, কোন প্রকার تحریف (পরিবর্তন), تعطيل (অস্বীকার ও বাতিল), تکیف (পদ্ধতি ও ধরণ বর্ণনা) এবং কোন প্রকার تمثیل (উদাহরণ, উপমা ও দৃষ্টান্ত পেশ) করা ব্যতীতই সেগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন করাও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের মধ্যে শামিল।
ব্যাখ্যা: যেসব মূলনীতির উপর ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া তা সংক্ষেপে উল্লেখ করার পর এবার সেগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া শুরু করেছেন। মূলনীতিগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সর্বাগ্রে প্রথম মূলনীতি অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনয়নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের মধ্যে আল্লাহর ঐ সুমহান সিফাতগুলোর প্রতি বিশ্বাস করাও শামিল হবে, যদ্বারা তিনি তাঁর কিতাবে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন অথবা যদ্বারা তাঁর সম্মানিত রসূল পবিত্র সুন্নাতে তাঁকে গুণান্বিত করেছেন। ঐ সিফাতগুলো আমরা আল্লাহর জন্য ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করবো, যেভাবে তা আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতে বর্ণিত হয়েছে। এই সিফাতগুলো যে শব্দে বর্ণিত হয়েছে এবং সেগুলো যে অর্থ প্রদান করেছে, তা সহকারেই আমরা আল্লাহর পবিত্র সত্তার জন্য সাব্যস্ত করি।
শব্দগুলোর কোন পরিবর্তন করি না, তার অর্থগুলোও বাদ দেই না এবং আল্লাহর সুমহান সিফাতগুলোকে আমরা মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনাও করি না।
এগুলো সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে আমরা কেবল আল্লাহর কিতাব ও রসূল এর সুন্নাতের উপরই নির্ভর করি। কোন অবস্থাতেই আমরা এতে কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত সীমা অতিক্রম করি না। কেননা আল্লাহর সিফাতগুলো توقيفية তথা অহীর উপর নির্ভরশীল।
التحريف পরিবর্তন: তাহরীফ অর্থ হচ্ছে পরিবর্তন করা এবং কোন জিনিসকে তার আসল অবস্থান থেকে সরিয়ে ফেলা। বলা হয় انحرف عن كذا লোকটি এই অবস্থান থেকে সরে গিয়েছে। এই কথা ঠিক তখনই বলা হয়, যখন লোকটি তার সঠিক অবস্থান থেকে সরে যায়। আল্লাহর সিফাতে তাহরীফ দুইভাবে হতে পারে।
(১) তাহরীফে লাফযী: যে শব্দসমূহের মাধ্যমে আল্লাহর সিফাতগুলো বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে অন্য শব্দ দ্বারা বদল করাকে তাহরীফে লাফযী তথা শাব্দিক পরিবর্তন বলা হয়। এই প্রকার তাহরীফ এক শব্দের সাথে অন্য শব্দ বা অক্ষর যুক্ত করে অথবা অক্ষর কমানোর মাধ্যমে হতে পারে কিংবা শব্দের মধ্যকার অক্ষরের হরকত (জের, যবর ও পেশ) পরিবর্তন করার মাধ্যমেও হতে পারে।
যেমন গোমরাহ সম্প্রদায়ের লোকেরা আল্লাহ তা'আলার বাণী: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
"দয়াময় আল্লাহ আরশে সমুন্নত হয়েছেন" (সূরা ত্বহা ২০:৫)
-এর মধ্যে استوی শব্দকে পরিবর্তন করে استولى বানিয়ে ফেলেছে। আল্লাহর আয়াতের মধ্যে তারা একটি অক্ষর তথা ى এবং واو -এর মাঝখানে লাম অক্ষর বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনি তারা আল্লাহর বাণী:
وَجَاء رَبُّكَ "এবং তোমার রব আগমন করবেন" (সূরা ফাজর ৮৯:২২)
-এর মধ্যে একটি শব্দ বাড়িয়ে বলেছে وَجَاءَ أَمْرُ رَبُّكَ “এবং তোমার রবের আদেশ আগমন করবে”।
এখানে তারা أمر শব্দটি বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর 'আসা' সিফাতকে আল্লাহর আদেশ আসা দ্বারা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এমনি তারা আল্লাহর বাণী:
وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا "আল্লাহ মূসা এর সাথে কথা বলেছেন ঠিক যেমনভাবে কথা বলা হয়”। (সূরা নিসা ৪:১৬৪)
এখানে তারা আল্লাহ তা'আলার সুমহান নাম الله শব্দের 。অক্ষরের পেশকে যবর দ্বারা পাঠ করে থাকে। তখন অর্থ দাঁড়ায় যে, আল্লাহ মূসা এর সাথে কথা বলেননি; বরং মূসা আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। অর্থাৎ অহীর মাধ্যমে কথা বলা যে আল্লাহ তা'আলার গুণসমূহের অন্যতম একটি গুণ, এটিকে অস্বীকার করার জন্য তারা পেশকে যবর দ্বারা বদল করার মাধ্যমে আল্লাহর কালামকে মূসার কালামে পরিণত করতে চাচ্ছে।
(২) তাহরীফে মা'নাবী। আর দ্বিতীয় প্রকার তাহরীফ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার সিফাতসমূহের অর্থকে পরিবর্তন করে ফেলা। যেসব শব্দের মধ্যে আল্লাহর সিফাতের বর্ণনা এসেছে, সেগুলোর আসল অর্থ পরিবর্তন করে অন্য অর্থ প্রদান করাকে تحريف معنوي তথা শব্দগত পরিবর্তন বলা হয়।
যেমন الرحمة (দয়া করা) আল্লাহর সিফাতসমূহের অন্যতম একটি সিফাত। কিন্তু বিদ'আতীরা এটিকে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করে না। তারা বলে রহমত অর্থ হচ্ছে নিয়ামত প্রদানের ইচ্ছা করা। এমনি তাদের মতে আল্লাহ তা'আলা ক্রোধান্বিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে শাস্তি দেয়ার ইচ্ছা করা।
التعطيل বাতিল ও অকর্মন্য করা: তা'তীল শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে খালি করা। যেমন বলা হয় عطله অর্থাৎ উহাকে খালী করে দিল। কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ তা'আলার সিফাতগুলো অস্বীকার করা।
তাহরীফ ও তা'তীলের মধ্যে পার্থক্য হলো কুরআন ও হাদীসের দলীলের মাধ্যমে যে সঠিক অর্থটি সাব্যস্ত হয়, তা অস্বীকার করে তাকে অন্য একটি ভুল অর্থ দ্বারা বদল করাকে تحریف বলা হয়। আর সঠিক অর্থকে অন্য অর্থ দিয়ে বদল না করে সঠিক অর্থকেই অস্বীকার করার নাম تعطيل ।
যেমন 'মুফাওবেযা' সম্প্রদায়ের লোকেরা করে থাকে। এরা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করে; কিন্তু সেগুলোকে অন্য অর্থ দ্বারা বদল করে না। সে হিসাবে প্রত্যেক معرف (রদবদলকারীই) معطل (বাতিল কারী); কিন্তু প্রত্যেক বাতিল কারী রদবদলকারী নয়।
التكييف আল্লাহর সিফাতের ধরণ ও কায়া নির্ধারণ করা: যেমন আরবীতে বলা হয় كيف الشئ সে বস্তুটির ধরণ বর্ণনা করল। এই কথা ঠিক ঐ সময় বলা হয়, যখন সে বস্তুটির জন্য নির্দিষ্ট ও জ্ঞাত ধরণ ও আকার নির্ধারণ করে। আল্লাহর সিফাতের কাইফিয়াত বর্ণনা করার অর্থ হলো উহার জন্য নির্দিষ্ট ধরণ ও কায়া নির্ধারণ করা এবং তার জন্য বিশেষ কোন অবস্থা স্থির করা।
আল্লাহর সিফাতের ধরণ ও কায়া স্থির করা কোন মানুষের জন্য সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহর সিফাতের প্রকৃত অবস্থা ও ধরণ ঐ সব বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত, যার ইলম কেবল আল্লাহ তা'আলার কাছেই রয়েছে। মাখলুকের পক্ষে সেই জ্ঞান অর্জন করা অসম্ভব। আল্লাহর সিফাত তাঁর পবিত্র সত্তার অনুগামী। তাই আল্লাহর পবিত্র সত্তার ধরণ সম্পর্কে মারেফত হাসিল করা যেমন সম্ভব নয়, অনুরূপ সিফাতের প্রকৃত রূপ ও ধরণ সম্পর্কে জানাও সৃষ্টির পক্ষে অসম্ভব।
ইমাম মালিক হলো- কে-আল্লাহ তা'আলার এ বাণী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
"দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন” (সূরা ত্বহা ২০:৫)।
کیف استوی আল্লাহ তা'আলা কিভাবে আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন? জবাবে ইমাম মালেক বললেন: الاستواء معلوم والكيف مجهول والإيمان به واجب والسؤال عنه بدعة 'আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া জানা বিষয়। এর পদ্ধতি কেউ অবগত নয়। তার উপর ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব। তবে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা বিদ'আত'।
আল্লাহ তা'আলার সব সিফাতের ক্ষেত্রে একই বক্তব্য প্রযোজ্য।
التمثيل তামছীল তথা আল্লাহর সিফাতের উপমা ও নমুনা বর্ণনা করা: আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে এই কথা বলা যে, আল্লাহর সিফাতগুলো মানুষের সিফাতসমূহের মতই। যেমন কেউ বলল আল্লাহর হাত আমাদের হাতের মতই এবং আল্লাহর শ্রবণ আমাদের শ্রবণের মতই। আল্লাহ তা'আলা এই ধরণের কথার অনেক উর্ধ্বে। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِير "তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুরার ৪২:১১)। সুতরাং আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যাবে না যে, উহা আমাদের সিফাতের অনুরূপ কিংবা আমাদের সিফাতের সাথে তুলনীয় অথবা হুবহু আমাদের সিফাতের মতই। যেমন বলা জায়েয নয় যে, আল্লাহর সত্তা আমাদের সত্তার অনুরূপ অথবা উহা আমাদের সত্তার সাথে তুলনীয়।
সুতরাং তাওহীদপন্থী মুমিনগণ আল্লাহর সকল সিফাত ঠিক সেভাবেই সাব্যস্ত করেন, যেভাবে সাব্যস্ত করলে তাঁর মর্যাদাও বড়ত্বের জন্য শোভনীয় হয়। অপর পক্ষে মু’আত্তিলা (আল্লাহর সিফাতে অবিশ্বাসী) লোকেরা আল্লাহর সকল সিফাতকে অথবা তাঁর কতক সিফাতকে অস্বীকার করে এবং মুশাব্বেহা (আল্লাহর সিফাতকে মানুষের সিফাতের সাথে তুলনাকারী) সম্প্রদায়ের লোকেরা আল্লাহর সিফাতকে এমনভাবে সাব্যস্ত করে, যা আল্লাহ তা'আলার শান ও মর্যাদার সাথে শোভনীয় নয়; বরং তা কেবল মাখলুকের জন্যই প্রযোজ্য হয়।
📄 আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনয়নের ব্যাপারে আহ্লুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অবস্থান
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
بَلْ يُؤْمِنُونَ بِأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ فَلَا يَنْفُونَ عَنْهُ مَا وَصَفَ بِهِ نَفْسَهُ وَلَا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ
বরং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করেন যে, সৃষ্টি জগতের কোনো কিছুই আল্লাহর মত নয়, অথচ তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। অতএব আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যেই সুউচ্চ গুণে গুণান্বিত করেছেন, উহাকে তারা তাঁর থেকে বাদ দেয়না এবং আল্লাহর কালামকে আসল স্থান থেকে সরিয়ে ফেলে না।
ব্যাখ্যা: কুরআন ও সহীহ হাদীসে আল্লাহ্ তা'আলার যেসব সিফাত (গুণাবলী) রয়েছে, কোন প্রকার تحریف (পরিবর্তন করা), تعطیل (অস্বীকার ও বাতিল করা), تكيف (পদ্ধতি ও ধরণ বর্ণনা করা) এবং কোনো প্রকার تمثیل (উদাহরণ, উপমা ও দৃষ্টান্ত পেশ করা) ব্যতীতই সেগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব।
এ কথা বলার পর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এ বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান কী? তা বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং তিনি বলেছেন, সঠিক ও বিশুদ্ধ পদ্ধতিতেই তারা আল্লাহ তা'আলার সেই সিফাতগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। সিফাতগুলোকে প্রকৃত অর্থসহকারেই তারা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করেন এবং একই সাথে সৃষ্টি জগতের কোন কিছুর সাথেই সেই সিফাতগুলোর সাদৃশ্য ও তুলনা করা থেকে দূরে থাকেন।
সুতরাং আহলে সুন্নাতের লোকেরা সিফাতগুলোকে অস্বীকারও করেন না এবং সেগুলোকে সৃষ্টির মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনাও করেন না। বরং সূরা শুরার ১১ নং আয়াতে যেভাবে আল্লাহর সিফাতের বর্ণনা এসেছে, তারা সেভাবেই বিশ্বাস করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ )
"সৃষ্টি জগতের কোন কিছুই আল্লাহ তা'আলার সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা”।
আল্লাহর বাণী: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ "সৃষ্টি জগতের কোন কিছুই আল্লাহ তা'আলার সদৃশ নয়”-এই কথা দ্বারা ঐ সব লোকের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা আল্লাহকে মাখলুকের সাথে তুলনা করে। অর্থাৎ যারা বলে আল্লাহর সিফাতগুলো মাখলুকের সিফাতের মতই।
আর আল্লাহর বাণী: وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ "তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা" -এর দ্বারা আল্লাহর সিফাতে অবিশ্বাসীদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। কেননা এর মধ্যে আল্লাহর জন্য শ্রবণ ও দৃষ্টি সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সুতরাং এই সম্মানিত আয়াতটি আসমা ওয়াস সিফাতের (আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলীর) অধ্যায়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের একটি সংবিধান ও মূলনীতিতে পরিণত হয়েছে। কেননা এটি একই সাথে আল্লাহর জন্য সিফাত সাব্যস্ত করে এবং মাখলুকের মধ্যে সেই সিফাতগুলোর উপমা ও দৃষ্টান্ত হওয়াকে অস্বীকার করে। সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ আসবে, ইনশা-আল্লাহ।
فَلَا يَنْقُفُونَ عَنْهُ مَا وَصَفَ بِهِ نَفْسَهُ আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যে সুমহান গুণে গুণান্বিত করেছেন, সেটা তারা অস্বীকার করেন না:
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই কথার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করেন যে, সৃষ্টি জগতের কোন কিছুই আল্লাহ তা'আলার সদৃশ নয়। এই বিশ্বাস তাদেরকে আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকারের দিকে নিয়ে যায় না। যেমনটি করে থাকে আল্লাহ তা'আলাকে মাখলুকের সিফাত থেকে পবিত্র করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত এক শ্রেণীর লোক। এমনকি তাদের বাড়াবাড়ি এই পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে যে, তারা আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর সকল উত্তম গুণাবলী থেকে শুন্য করে ফেলেছে। তাদের খোড়া যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহর জন্য সিফাত সাব্যস্ত করলে মাখলুকের সাথে আল্লাহর তুলনা হয়ে যায়। তাই তারা এ থেকে পালানোর জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর সকল সিফাতকে অস্বীকার করেছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বলে আল্লাহ তা'আলার জন্য রয়েছে এমনসব সুউচ্চ গুণাবলী, যা তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য শোভনীয় ও প্রযোজ্য। আর মাখলুকের জন্যও রয়েছে এমন সিফাত ও কাজ, যা তার জন্য প্রযোজ্য ও শোভনীয়। মূলতঃ মহান স্রষ্টার সুউচ্চ সিফাত ও সৃষ্টির সাধারণ ও নগণ্য সিফাতের মধ্যে কোন প্রকার সাদৃশ্যতা নেই। সুতরাং হে মুআত্তেলা (আল্লাহর সিফাতকে বাতিলকারী) সম্প্রদায়! তোমরা যেই আশঙ্কায় (স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির তুলনা হয়ে যাওয়ার ভয়ে) আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করছো, তা মোটেই আবশ্যক নয়।
وَلَا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ তারা আল্লাহর কালামকে আসল স্থান থেকে সরিয়ে ফেলে না:
পূর্বে تحریف এর অর্থ অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ আহলে সুন্নাতের লোকেরা আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করে না। তারা কুরআন ও সুন্নার শব্দসমূহ অন্য শব্দ দিয়ে বদল করে না এবং তার আসল ও প্রকৃত অর্থগুলোকেও অন্য অর্থ দিয়ে পরিবর্তন করে না। অতঃপর তারা তার আসল ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে অন্য ব্যাখ্যাও করে না। যেমন করে থাকে মুআত্তেলা সম্প্রদায়ের লোকেরা। তারা আল্লাহর কালাম استوى (ইস্তাওয়াকে) استولى (ইস্তাওলা) দ্বারা ব্যাখ্যা করে।
এমনি তারা আল্লাহর কালাম: وَجَاء رَبُّكَ "এবং তোমার রব আগমন করবেন" (সূরা ফাজর ৮৯:২২)। এর মধ্যে একটি শব্দ বাড়িয়ে وَجَاءَ أَمْرُ রَبُّكَ “এবং তোমার রবের আদেশ আগমন করবে”-এর দ্বারা ব্যাখ্যা করে। এখানে তারা أمر শব্দটি বাড়িয়ে দিয়ে আল্লাহর ‘আসা’ সিফাতকে ‘আল্লাহর আদেশ আসা’ দ্বারা পরিবর্তন করে ফেলেছে।
তারা আল্লাহর “রহমত তথা সৃষ্টির প্রতি দয়া করা” সিফাতকে নেয়ামত ও ছাওয়াব প্রদানের ইচ্ছা দ্বারা ব্যাখ্যা করে। এমনি আরো অনেক সিফাতকে তারা বাতিল অর্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করে থাকে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَلَا يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَاءِ اللَّهِ وَآيَاتِهِ وَلَا يُكَلِّفُونَ وَلَا يُمَتِّلُونَ صِفَاتِهِ بِصِفَاتِ خلقه
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আল্লাহর নাম ও আয়াতসমূহের বিকৃত করেন না, তারা আল্লাহর সিফাত সমূহের ধরণ ও আকৃতি বর্ণনা করেন না এবং তাঁর সিফাতসমূহকে মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনাও করেন না।
ব্যাখ্যা: وَلَا يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَاءِ اللَّهِ وَآيَاتِهِ তারা আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও আয়াতসমূহের বিকৃতি করেন না: اِلْحَاد (ইলহাদ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বাঁকা হওয়া, একদিকে ঝুকে পড়া, কোন জিনিস থেকে সরে আসা, ইত্যাদি। এখান থেকেই কবরকে লাহাদ বলা হয়। কবরকে লাহাদ বলার কারণ হলো, উহাকে খনন করার সময় গর্ত খননের সাধারণ রীতি ও পদ্ধতির ব্যতিক্রম করে কিবলার দিকে বাঁকা করে দেয়া হয়।
আর আল্লাহর অতি সুন্দর নাম, তাঁর সুউচ্চ গুণাবলী এবং আয়াতসমূহের মধ্যে ইলহাদ হচ্ছে উহার প্রকৃত ও সঠিক অর্থ বাদ দিয়ে বাতিল অর্থের দিকে নিয়ে যাওয়া। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মধ্যে ইলহাদ কয়েক প্রকার।
প্রথম: আল্লাহর নামে দেবতার নাম রাখা: আল্লাহর অন্যতম নাম ইলাহ থেকে মুশরেকরা তাদের এক দেবতার নাম রেখেছে (আল্লাত) (লাত), আল্লাহর নাম আল-আযীয থেকে তারা তাদের আরেক মূর্তির নাম রেখেছে আল-উযযা (উয্যা) এবং আল্লাহর নাম আল-মান্নান থেকে তারা তাদের আরেক বাতিল মাবুদের নাম রেখেছে মানাত (মানাত)।
দ্বিতীয়: আল্লাহ তা'আলার এমন নাম রাখা, যা তাঁর মর্যাদা ও বড়ত্বের শানে শোভনীয় নয়: যেমন খৃষ্টানরা আল্লাহকে আব (Father বা পিতা) বলে। দার্শনিকরা আল্লাহকে মুজীব (আসল সংঘটক) কিংবা 'ইল্লাতে ফা'এলা (প্রভাবশালী উপকরণ) বলে থাকে।
তৃতীয়: আল্লাহ তা'আলাকে এমন ত্রুটিযুক্ত বিশেষণে বিশেষিত করা, যা থেকে তিনি নিজেকে পবিত্র ও মুক্ত রেখেছেন:
যেমন অভিশপ্ত ইহুদীরা বলে থাকে اغنياء ان الله فقير ونحن “নিশ্চয়ই আল্লাহ গরীব আর আমরা ধনী” (সূরা ইমরান ৩:১৮১)। তারা আরো বলে:
يد الله مغلولة غلت ايديهم ولعنوا بما قالوا بل يداه مبسوطتان ينفق كيف يشاء “আল্লাহর হাত বাঁধা। আসলে বাঁধা হয়েছে ওদেরই হাত এবং তারা যে কথা বলছে সে জন্য তাদের উপর অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। আল্লাহর দুই হাত সদা প্রসারিত। যেভাবে চান তিনি খরচ করেন” (সূরা মায়িদা ৫:৬৪)।
তারা আরো বলে থাকে আল্লাহ তা'আলা ছয়দিনে আসমান-যমীন এবং উহার মধ্যকার সকল বস্তু সৃষ্টি করার পর শনিবারে বিশ্রাম নিয়েছেন। মূলতঃ আল্লাহ তাদের কথার অনেক উর্ধ্বে।
চতুর্থ: আল্লাহ তা'আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ সিফাতগুলোর অর্থ ও হাকীকত অস্বীকার করা:
যেমন জাহমীয়ারা বলে আল্লাহর নামগুলো শুধু শব্দের মধ্যেই সীমিত। এগুলো কোন গুণ বা অর্থকে নিজের মধ্যে শামিল করে না। তারা বলে আল্লাহর অন্যতম নাম হচ্ছে, (السميع) (সর্বশ্রোতা), কিন্তু এই নামটি প্রমাণ করে না যে, তিনি শুনেন কিংবা এটি প্রমাণ করে না যে, শ্রবণ করা তাঁর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট। আল্লাহর অন্যতম নাম হচ্ছে (البصير) (সর্বদ্রষ্টা), কিন্তু এই নামটি প্রমাণ করে না যে, তিনি দেখেন কিংবা দেখা তাঁর গুণ এবং আল্লাহ তা'আলার আরেকটি নাম হচ্ছে (الحي) (চিরঞ্জীবন্ত), কিন্তু ইহা প্রমাণ করে না যে, তাঁর হায়াত বা জীবন আছে। আল্লাহর অন্যান্য নাম ও সিফাতের ক্ষেত্রেও তারা একই রকম কথা বলে থাকে।
পঞ্চম: আল্লাহর সিফাতসমূহকে মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনা করা:
যেমন মুশাব্বেহা (আল্লাহর সিফাতকে সৃষ্টির সিফাতের সাথে তুলনাকারী) সম্প্রদায়ের লোকেরা করে থাকে। তারা বলে থাকে, আল্লাহর হাত আমার দুই হাতের মতই। অন্যান্য সিফাতের বেলাতেও তারা একই রকম কথা বলে। আল্লাহ তাদের এই ধরণের কথার অনেক উর্ধ্বে।
যারা আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও আয়াতের মধ্যে ইলহাদ করে, তাদেরকে তিনি কঠোর আযাবের ধমক দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلِلَّهِ ٱلْأَسْمَاءُ ٱلْحُسْنَىٰ فَٱدْعُوهُ بِهَا ۖ وَذَرُوا۟ ٱلَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِىٓ أَسْمَـٰٓئِهِۦ ۚ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ﴾
"আল্লাহ তা'আলার অনেকগুলো সুন্দরতম নাম রয়েছে। সুতরাং তাঁকে সেই নামেই ডাকো এবং তাঁর নামসমূহের মধ্যে যারা বিকৃতি করে, তোমরা তাদেরকে বর্জন করো। তারা যা করে আসছে, তার ফল অবশ্যই তারা পাবে" (সূরা আরাফের ৭:১৮০)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِىٓ ءَايَـٰتِنَا لَا يَخْفَوْنَ عَلَيْنَآ ۗ﴾
"যারা আমার আয়াতসমূহের বিকৃতি (উল্টা অর্থ) করে, তারা আমার অগোচরে নয়" (সূরা ফুসিলাত ৪১:৪০)।
وَلَا يُكَيِّفُونَ وَلَا يُمَثِّلُونَ صِفَاتِهِ بِصِفَاتِ خَلْقِهِ সমূহের ধরণ ও আকৃতি বর্ণনা করেন না এবং তারা তাঁর সিফাতসমূহকে মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনাও করেন না: تكييف এবং تمثيل এর ব্যাখ্যা একটু পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
لِأَنَّهُ سُبْحَانَهُ لَا سَمِيَّ لَهُ وَلَا كُفْءَ لَهُ وَلَا نِدَّ لَهُ وَلَا يُقَاسُ بِخَلْقِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى فَإِنَّهُ أَعْلَمُ بِنَفْسِهِ وَبِغَيْرِهِ وَأَصْدَقُ قِيلًا وَأَحْسَنُ حَدِيثًا مِنْ خَلْقِهِ
"কারণ আল্লাহ তা'আলার সমতুল্য কেউ নেই, তাঁর কোন সমকক্ষও নেই এবং তাঁর কোন শরীকও নেই। আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর সৃষ্টির উপর কিয়াস করা যাবে না। তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং অন্যদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। তাঁর কালাম সর্বাধিক সত্য এবং তাঁর সৃষ্টির কথার চেয়ে তাঁর কথাই সর্বাধিক সুন্দর”।
ব্যাখ্যা: لِأَنَّهُ سُبْحَانَهُ لَا سَمِيَّ لَهُ কারণ আল্লাহ তা'আলার অনুরূপ অন্য কেউ নেই: পূর্বে যে বলা হয়েছে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ সিফাত সমূহের ধরণ, আকৃতি ও কায়া বর্ণনা করে না এবং তাঁর সিফাতগুলোকে মাখলুকের সিফাতের সাথে তুলনা করে না, তার কারণ হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার সমতুল্য কেউ নেই।
سُبْحَانَهُ সুবহানাহু: سبحان শব্দটি غفران শব্দের ন্যায় একটি মাসদার (ক্রিয়ামূল)। বাবে তাফ-ঈলের মাসদার التسبيح থেকে এটিকে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে সকল দোষ-ত্রুটি হতে আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করা।
لَا سَمِيُّ لَهُ তাঁর সমতুল্য কেউ নেই: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার নামের সমপর্যায়ের এমন কোন নাম নেই, যে তাঁর নামের সমান মর্যাদা ও সম্মানের দাবী রাখে। আল্লাহ তা'আলা সূরা মারইয়ামের ৬৫ নং আয়াতে বলেন:
هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا তোমার জানা মতে তাঁর সমতুল্য কেউ আছে কি?
এখানে প্রশ্ন করা হলেও তার অর্থ হচ্ছে নাফী তথা এটি বলা উদ্দেশ্য যে, আল্লাহর সমতুল্য কেউ নেই এবং তাঁর নাম ও সত্তার মত অন্য কোন নাম ও সত্তা নেই।
وَلَا كُفَّءَ لَهُ তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই: কুফু অর্থ সমকক্ষ, অনুরূপ। অর্থাৎ আল্লাহর অনুরূপ অন্য কেউ নেই। যেমন আল্লাহ তা'আলা সূরা ইখলাসের মধ্যে বলেছেন:
وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ) "এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই”।
وَلَا نَدَّ لَهُ তাঁর কোন শরীকও নেই: الند অর্থ হচ্ছে সদৃশ, অনুরূপ, সমকক্ষ, প্রতিপক্ষ, শরীক ইত্যাদি। আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারার ২২নং আয়াতে বলেন:
فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا "কাজেই জেনে-বুঝে তোমরা অন্যদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়ো না”।
وَلَا يُقَاسُ بِخَلْقِهِ আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর সৃষ্টির উপর কিয়াস করা যাবে না: কিয়াস শব্দের অর্থ হচ্ছে তুলনা করা, সদৃশ তৈরি করা ইত্যাদি। অর্থাৎ সৃষ্টির সাথে আল্লাহর তুলনা করা যাবে না এবং মাখলুকের সাথে তাঁকে সাদৃশ্যও করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলা সূরা নাহালের ৭৪ নং আয়াতে বলেন:
فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ "কাজেই তোমরা আল্লাহর জন্য সদৃশ তৈরি করো না।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার যাত (সত্তা), তাঁর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী এবং তাঁর কর্মকে মাখলুকের সত্তা, নাম ও গুণাবলী এবং তাদের কাজ-কর্মের সাথে তুলনা করা যাবে না। সকল দিক থেকে পরিপূর্ণ এবং মহান সৃষ্টিকর্তাকে কিভাবে ত্রুটিপূর্ণ মাখলুকের সাথে তুলনা করা যেতে পারে? আল্লাহ তা'আলা তাঁর মাখলুকের অনুরূপ হওয়ার অনেক উর্ধ্বে।
وَتَعَالَى of فَإِنَّهُ أَعْلَمُ بِنَفْسِهِ وَبَغَيْرِهِ অন্যদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত:
পূর্বে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের জন্য যেসব সিফাত সাব্যস্ত করেছেন, তা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা আমাদের উপর ওয়াজিব এবং তাঁকে যে কোন মাখলুকের সাথে তুলনা করা যাবে না। তার কারণ হিসাবে শাইখুল ইসলাম উপরোক্ত কথা বলেছেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা যেহেতু তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং অন্যদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত, তাই যেসব সিফাত তিনি তাঁর নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রসূল যেসব সিফাত তাঁর প্রভুর জন্য সাব্যস্ত করেছেন, তা সাব্যস্ত করা আমাদের উপর আবশ্যক। কেননা মানুষেরা তাদের জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলাকে পূর্ণরূপে আয়ত্ত ও বেষ্টন করতে অক্ষম। তিনি এমন সিফাতে কামালিয়া তথা সুউচ্চ গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত, যে পর্যন্ত মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি পৌঁছতে পারে না। সুতরাং তিনি নিজের জন্য যেসব সিফাত সাব্যস্ত করে সন্তুষ্ট হয়েছেন, আমাদেরও তাতে সন্তুষ্ট হওয়া আবশ্যক। তাঁর জন্য যা শোভনীয়, সে সম্পর্কে তিনিই অধিক অবগত আছেন, আমরা তা অবগত নই।
وَأَصْدَقُ قِيلًا وَأَحْسَنُ حَدِيثًا مِنْ خَلْقِهِ আল্লাহর কালাম সর্বাধীক সত্য এবং তাঁর কথা সৃষ্টির কথার চেয়ে অধিক সুন্দর:
তিনি যে সংবাদ দিয়েছেন, তা বাস্তব ও সত্য। আমাদের উপর আবশ্যক হচ্ছে আল্লাহর কথাকে সত্যায়ন করা এবং তার বিরোধীতা না করা। তিনি কুরআন মাজীদে যেসব শব্দ নাযিল করেছেন, তা সর্বোত্তম, সর্বাধিক বিশুদ্ধ এবং সর্বাধিক সুস্পষ্ট। তাঁর জন্য যেসব অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী শোভনীয়, তা তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন এবং সুস্পষ্ট ও পূর্ণরূপে তা বর্ণনা করেছেন। আমাদের উপর ওয়াজিব হচ্ছে সেসব নাম ও গুণাবলীর স্বীকৃতি প্রদান করা এবং তা কবুল করে নেওয়া।
📄 সকল রসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করা
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
ثُمَّ رُسُلُهُ صَادِقُونَ مُصَدَّقُونَ بِخِلَافِ الَّذِينَ يَقُولُونَ عَلَيْهِ مَا لَا يَعْلَمُونَ
আল্লাহ তা'আলার রসূলগণ সত্যবাদী এবং সত্যবাদী হিসাবে সমর্থিত। তারা ঐসব লোকদের সম্পূর্ণ বিপরীত, যারা আল্লাহ সম্পর্কে না জেনেই কথা বলে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলামের এই কথাটি তার পূর্বোক্ত উক্তি: তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং অন্যদের সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত, এর সাথে সংযুক্ত। صدق (সিদ্ক) সত্য খবর সেই খবরকে বলা হয়, যা বাস্তবের হুবহু অনুরূপ হয়। অর্থাৎ রসূলগণ আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী এবং অন্যান্য বিষয়ে যেসব খবর দিয়েছেন, তাতে তারা সত্যবাদী।
ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাদের কাছে আল্লাহর নিকট থেকে যে খবর এসেছে, তাতে তারা সত্যায়িত। কেননা তা আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে কোনো কথা বলেন না।
আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর রসূলদের কাছে যে সংবাদ পৌঁছেছে, শাইখুল ইসলাম উপরোক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে উহার সনদকে শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা রসূলদের জন্য যা বলেছেন, তা সত্য। আর রসূলগণ সেই সত্যকে সৃষ্টির নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং রসূলগণ আল্লাহর যেসব সিফাত বর্ণনা করেছেন, তা কবুল করে নেয়া আবশ্যক।
রসূলদের কথা ঐসব লোকদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত, যারা আল্লাহ সম্পর্কে না জেনেই কথা বলে। যারা আল্লাহর শারীয়াত, দ্বীন, তাঁর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে বিনা ইলমে কথা বলে, তাদের কথা রসূলদের কথার সম্পূর্ণ বিপরীত। শুধু তাই নয়; বরং তারা কেবল ধারণা ও কল্পনার বশবর্তী হয়েই আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলে অথবা কেবল উহাই বলে, যা তারা শয়তান থেকে সংগ্রহ করে। যেমন বলে থাকে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবীদার, বিদ'আতী এবং যিন্দীক (অন্তরে কুফরী লুকায়িত রেখে মুখে ইসলাম প্রকাশকারী), যাদুকর, গণক, জ্যোতিষী, স্বার্থান্বেষী ও নিকৃষ্ট আলেমরা। আল্লাহ তা'আলা সূরা শু'আরায় তাদের পরিচয় উল্লেখ করে বলেন:
﴿هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينِ * تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكِ أَثِيمٍ * يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ
"হে লোকেরা! আমি কি তোমাদের জানাবো শয়তানরা কার উপর অবতীর্ণ হয়? তারা প্রত্যেক মিথ্যুক বদকারের উপর অবতীর্ণ হয়। তারা আকাশ থেকে চুরি করে শোনা কথা কানে ঢুকিয়ে দেয় এবং তাদের বেশির ভাগ লোকই মিথ্যুক" (সূরা শু'আরা ২৬:২২১-২২৩)।
আল্লাহ তা'আলা সূরা বাকারায় আরো বলেন:
﴿فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِندِ اللَّهِ
"কাজেই তাদের জন্য ধ্বংস অবধারিত, যারা স্বহস্তে কিতাব লিখে তারপর লোকদের বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে (সূরা বাকারা ২:৭৯)।
সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যেহেতু তাঁর নিজের সম্পর্কে এবং সৃষ্টি সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত, তাঁর কালাম যেহেতু সর্বাধিক সত্য, তাঁর কথা যেহেতু সৃষ্টির কথার চেয়ে অধিক উত্তম, রসূলগণ তাঁর সম্পর্কে যেসব সংবাদ দিয়েছেন, সেসব সংবাদের প্রত্যেকটিতেই যেহেতু তারা সত্যবাদী এবং রসূলদের ও আল্লাহর মাঝে যেই (واسطة) মাধ্যম রয়েছে এবং যে মাধ্যমে রসূলদের কাছে আল্লাহর নিকট থেকে অহী আসে, তা যেহেতু একটি সত্য ও নির্ভুল মাধ্যম, সেটি যেহেতু সম্মানিত ফেরেশতাদের মাধ্যম, তাই আল্লাহ যা বলেছেন এবং তাঁর রসূলগণ আল্লাহর পক্ষ হতে যেসব সংবাদ দিয়েছেন, তার উপর নির্ভর করা ও তা বিশ্বাস করা আবশ্যক। বিশেষ করে আল্লাহর আসমা এবং সিফাতের বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন তা সাব্যস্ত করতে হবে এবং যা নিজের সত্তা হতে সরিয়ে রেখেছেন ও দূর করে দিয়েছেন, তা সরিয়ে ফেলতে হবে। সেই সাথে বিদ'আতী লোকেরা রূপক অর্থের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে আল্লাহর যেসব আসমা ওয়াস সিফাতকে অস্বীকার করেছে, তাদের মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। রসূলগণ আল্লাহর আসমা এবং সিফাতের বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ হতে যেই সংবাদ নিয়ে এসেছেন, বিদ'আতীরা তা থেকে বিমুখ হয়েছে এবং সেগুলোকে অস্বীকার করেছে। এ ক্ষেত্রে তারা নিজেদের প্রবৃত্তির উপর নির্ভর করেছে কিংবা এমন লোকদের অন্ধ অনুসরণ করেছে, যারা গোমরাহীতে লিপ্ত হওয়ার কারণে আদর্শ ও অনুসরণীয় হওয়ার অযোগ্য।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: وَ لِهَذَا قَالَ الله تعالى سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ فَسَبَّحَ نَفْسَهُ عَمَّا وَصَفَهُ بِهِ الْمُخَالِفُونَ لِلرُّسُلِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمُرْسَلِينَ ؛ لِسَلَامَةِ مَا قَالُوهُ مِنَ النَّقْصِ وَالْعَيْبِ
এই কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "কাফের-মুশরিকরা তোমার রব সম্পর্কে যেসব কথা তৈরি করেছে তা থেকে তোমার রব পবিত্র, তিনি ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী। আর সালাম আল্লাহর রসূলদের প্রতি এবং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্যই” (সূরা সাফফাত: ১৮০-১৮২)।
সুতরাং নাবী-রসূলদের বিরুদ্ধাচরণকারীরা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে যেসব অশোভনীয় কথা বলেছে, তা থেকে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন। সেই সাথে রসূলদের উপরও তিনি সালাম পেশ করেছেন। কারণ তারা আল্লাহর যেসব গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ও পবিত্র ছিল।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলামের কথা: فهذا )এই কারণেই....) -এতে তিনি তাঁর পূর্বের কথার কারণ বর্ণনা করেছেন। কারণ তিনি সেখানে বলেছেন আল্লাহর কালাম এবং রসূলদের কথা সর্বাধিক সত্য ও সর্বোত্তম।
سُبْحَان : সুবহান শব্দটি غُفْرَان শব্দের ন্যায় একটি মাসদার (ক্রিয়ামূল)। বাবে তাফ-ঈলের মাসদার التسبيح থেকে এটিকে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে সকল দোষ-ত্রুটি হতে আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি।
رَبُّكَ তোমার রব: যিনি রহমত ও নেয়ামাত দ্বারা তাঁর সৃষ্টিকে প্রতিপালন করেন এবং যিনি সৃষ্টির একমাত্র মালিক ও প্রভু, তিনিই হলেন রব।
رَبُّ الْعِزَّةِ রাব্বুল ইয্যাত: রাব্বুল ইয্যাত অর্থ হচ্ছে ক্ষমতাবান, মর্যাদাবান এবং প্রতাপশালী। এখানে মাওসুফকে (রবকে) সিফাতের দিকে ইযাফত (সম্বোধিত) করা হয়েছে। মূল বাক্যটি এ রকম ছিল: الرب العزيز প্রবল ক্ষমতাধর প্রভু।
يَصِفُونَ তারা আল্লাহর সাথে যেসব ওয়াসফ্ট (দোষ) যুক্ত করে: অর্থাৎ নাবী-রসূলদের বিরোধীরা আল্লাহর সাথে এমনসব দোষ-ত্রুটি যুক্ত করে, যা তাঁর বড়ত্বের জন্য অশোভনীয়।
وَسَلامٌ সালাম: কেউ কেউ বলেছেন سلام )সালাম) শব্দটি السلام থেকে নেওয়া হয়েছে, যা ইসলামের সম্ভাষণ অর্থে ব্যবহৃত। আবার কেউ বলেছেন سلام শব্দটি সালামাত তথা السلامة من النقص والعيب থেকে নেওয়া হয়েছে, যা অপছন্দনীয় বস্তু ও দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়।
عَلَى الْمُرْسَلِينَ রসূলগণের উপর: তারাই রসূল, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির নিকট প্রেরণ করেছেন। তারা তাদের রবের রিসালাত সৃষ্টির নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছে। المرسلون শব্দটি مرسل এর বহুবচন। নাবী ও রসূলের সংজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করার সময় উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
الْعَالَمِينَ সৃষ্টিজগৎ: عالم এর বহুবচন হচ্ছে الْعَالَمِينَ। আল্লাহ ছাড়া বাকী সবই সৃষ্টিজগতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
উপরের আয়াত তিনটির সংক্ষিপ্ত অর্থ: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া তাঁর উক্তি: فسبح بنفسه..الخ দ্বারা আয়াতের সংক্ষিপ্ত অর্থ বর্ণনা করেছেন।
উপরোক্ত আয়াতসমূহে যেসব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে:
(১) গোমরাহ ও অজ্ঞ লোকেরা আল্লাহ তা'আলার মর্যাদা ও বড়ত্বের জন্য অশোভনীয় যেসব দোষ-ত্রুটি যুক্ত করে, তা থেকে আল্লাহ তা'আলার পবিত্রতা বর্ণনা করা।
(২) উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা রসূলদের সত্যতা প্রমাণিত হয়। আল্লাহর পক্ষ হতে তারা যা নিয়ে এসেছে এবং আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে তারা যে সংবাদ দিয়েছে, তা কবুল করে নেওয়া আবশ্যক।
(৩) রসূলদের উপর সালাম ও সলাত (দরুদ) পেশ করা এবং তাদেরকে সম্মান করা ইসলামী শারীয়াতের অন্তর্ভূক্ত।
(৪) রসূলগণ আল্লাহর নিকট থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তার বিরোধী প্রত্যেক বিষয় প্রত্যাখ্যান করা ওয়াজিব। বিশেষ করে আল্লাহর আসমা ওয়াস সিফাতের ব্যাপারে রসূলগণ যে সংবাদ দিয়েছেন, তার বিরোধী হয় এমন প্রত্যেক কথার প্রতিবাদ করা জরুরী।
(৫) আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করা এবং তাঁর নেয়ামাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আবশ্যক। তাওহীদ হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামাত সমূহের মধ্যে সর্ববৃহৎ নেয়ামাত।
📄 আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলার সুউচ্চ গুণাবলী ও বড়ত্বের বৈশিষ্ট্য এবং নিজেকে যে সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র ও মুক্ত করেছেন তার বর্ণনা
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَهُوَ سُبْحَانَهُ قَدْ جَمَعَ فِيمَا وَصَفَ وَسَمَّى بِهِ نَفْسَهُ بَيْنَ النَّفْيِ وَالْإِثْبَاتِ فَلَا عُدُولَ لِأَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ عَمَّا جَاءَ بِهِ الْمُرْسَلُونَ فَإِنَّهُ الصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيمُ
আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যেসব সুউচ্চ গুণে গুণান্বিত করেছেন এবং তিনি নিজেকে যে সুন্দর নামে নামকরণ করেছেন, তাতে তিনি নাফী এবং ইছবাতকে একত্রিত করেছেন। অর্থাৎ তিনি নিজের সত্তার জন্য সিফাতে কামালিয়া সাব্যস্ত করেছেন এবং নিজেকে সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র ও মুক্ত করেছেন। সুতরাং রসূলগণ আল্লাহর আসমা ওয়াস্ সিফাত ও অন্যান্য বিষয়ে যে সংবাদ নিয়ে এসেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তা থেকে সরে যায় না। কেননা সেটিই হচ্ছে সীরাতুল মুস্তাকীম।
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা স্বীয় সত্তার জন্য আসমা ও সিফাত সাব্যস্ত করতে গিয়ে কুরআনের মধ্যে যেই মূলনীতি বর্ণনা করেছেন, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে উহাই বর্ণনা করেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথা আসমা এবং সিফাতের বিষয়ে মুমিনদেরও উক্ত মূলনীতির উপর চলা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল নাম ও গুণের ক্ষেত্রে নাফী ও ইছবাতকে একত্রিত করেছেন। অর্থাৎ একদিকে যেমন তিনি নিজের জন্য আসমা এবং সিফাত সাব্যস্ত করেছেন, অন্যদিকে নিজের পবিত্র সত্তা হতে সকল দোষ-ত্রুটিকে নাফী করেছেন।
এ ক্ষেত্রে নাফী অর্থ হচ্ছে, যেসব দোষ-ত্রুটি আল্লাহ তা'আলার কামালিয়াতের পরিপন্থী, তাঁর সত্তা হতে সেগুলো সরিয়ে ফেলা ও দূর করে দেয়া। যেমন তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য সমকক্ষ, শরীক, তন্দ্রা-নিদ্রা, মৃত্যু এবং ক্লান্তি ইত্যাদির ধারণা হওয়াকে নাফী করেছেন।
আর ইছবাত হচ্ছে, সিফাতে কামালিয়া তথা সুউচ্চ গুণাবলী এবং বড়ত্বের বৈশিষ্টগুলো আল্লাহ তা'আলার জন্য সাব্যস্ত করা। যেমন সূরা হাশরের ২৩-২৪ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ * هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি ملك (মালিক), قدوس (অতি পবিত্র), سلام (পরিপূর্ণ শান্তিদাতা), مؤمن (নিরাপত্তা দানকারী), مُهيمن (রক্ষক), عزیز (মহাপরাক্রমশালী), جبار (প্রতাপশালী) এবং متکبر (অতী মহিমান্বিত)। তারা যাকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করে আল্লাহ তা'আলা তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ, خالق (সৃষ্টিকারী), باري (উদ্ভাবক) এবং مُصوّر (রূপদাতা), তাঁর জন্য রয়েছে অনেক সুন্দরতম নাম। আর তিনিই عزیز (মহাপরাক্রমশালী) ও حکیم (প্রজ্ঞাবান)" (সূরা হাশর ৫৯:২৩-২৪)।
আল্লাহর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলীর বিষয়ে এমনি আরো অনেক আয়াত রয়েছে, যার বেশ কিছু নমুনা সম্মানিত শাইখ সামনে উল্লেখ করবেন।
"فَلَا عُدُولَ لِأَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ عَمَّا جَاءَ بِهِ الْمُرْسَلُونَ" আল্লাহর আসমা ওয়াস্ সিফাত ও অন্যান্য বিষয়ে যেই সংবাদ নিয়ে এসেছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তা থেকে সরে যায় না":
তারা তা থেকে সরে অন্যদিকে ঝুকে পড়ে না এবং তারা তা থেকে বিচ্যুতও হয় না; বরং রসূলদের অনুসরণ করে এবং তাদের নীতির উপরই চলে। আল্লাহ তা'আলার জন্য অতি উত্তম ও সুউচ্চ গুণাবলী সাব্যস্ত করা এবং সমস্ত মন্দ ও অশোভনীয় বৈশিষ্ট্য থেকে তাঁকে মুক্ত ও পবিত্র ঘোষণা করাও রসূলদের আনীত দ্বীনের মধ্যে গণ্য। রসূলগণ উপরোক্ত মহান মূলনীতিটি অর্থাৎ সিফাতে কামালীয়াগুলো আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা এবং অশোভনীয় স্বভাব থেকে আল্লাহকে পবিত্র করার মূলনীতিটি সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু রসূলদের শত্রুরা সেই মূলনীতি থেকে সরে পড়েছে।
فَإِنَّهُ الصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيمُ কেননা সেটিই হচ্ছে সীরাতে মুস্তাকীম:
আসমা এবং সিফাতের বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী-রসূলদের পথ থেকে সরে না যাওয়ার কারণ হলো এ ক্ষেত্রে নাবী-রসূলদের পথই হচ্ছে সীরাতুল মুস্তাকীম।
সীরাতুল মুস্তাকীম বলা হয় ঐ সোজা পথকে, যাতে কোন ভিন্নতা ও দলাদলি নেই। সূরা ফাতিহায় এই সীরাতুল মুস্তাকীমের কথাই আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ “হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সোজা পথ দেখাও” (সূরা ফাতিহা ১:৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ "এটিই আমার সঠিক পথ। সুতরাং তোমরা এই সঠিক পথের অনুসরণ করো। অন্যান্য পথে গমন করো না। কারণ সেসব পথ তোমাদেরকে আল্লাহর পথ হতে সরিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেখে (সূরা আন'আম ৬:১৫৩)।
আমরা সলাতের প্রত্যেক রাক'আতে আল্লাহর কাছে এ দু'আ করি, তিনি যেন আমাদেরকে এই সরল ও সোজা পথে পরিচালিত করেন।