📄 ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল
অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: أَمَّا بَعْدُ فَهَذَا اعْتِقَادُ الْفِرْقَةِ النَّاحِيَةِ الْمَنْصُورَةِ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ
অতঃপর এই হচ্ছে কিয়ামাত পর্যন্ত আগমনকারী মানুষদের মধ্য হতে নাজাত ও সাহায্য প্রাপ্ত দল
ব্যাখ্যা: বাক্যের এক রীতি থেকে অন্য রীতিতে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় আরবী ভাষায় أما بعد ব্যবহার করা হয়। ভাষণ দেয়ার সময় এবং চিঠি লিখার সময় রসূল এর সুন্নাতের অনুসরণ করে أما بعد ব্যবহার করা সুন্নাত। নাবী খুতবা দেয়া এবং চিঠি লিখার সময় 'আম্মা বা'দ' ব্যবহার করতেন।
এই কিতাবটি সংক্ষিপ্তভাবে ইসলামী আক্বীদা ও ঈমানের যেসব বিষয়কে শামিল করেছে, শাইখুল ইসলাম ইসমে ইশারার মাধ্যমে সে দিকেই ইংগিত করেছেন। শাইখুল ইসলাম هو الإيمان بالله..... الخ দ্বারা আক্বীদার বিষয়গুলোর বর্ণনা শুরু করেছেন।
اعتقاد শব্দটি বাবে ইফতিআলের মাসদার (ক্রিয়ামূল)। বলা হয় اعتقد کذا সে এ রকম আক্বীদা গ্রহণ করেছে। ইহা ঠিক ঐ সময়ই বলা হয়, যখন কেউ কোন বিষয়কে তার নিজের আক্বীদা হিসাবে গ্রহণ করে। আর যে বিষয়ের সাথে মানুষ তার অন্তরের বন্ধন তৈরী করে উহাকে আক্বীদা বলা হয়। যেমন আপনি বলে থাকেন اعتقدت عليه القلب والضمير "আমি এই বিশ্বাসের উপর অন্তর-মনকে বেধে দিয়েছি। আক্বীদা শব্দটি আরবদের কথা عقد الحبل إذا ربطه থেকে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সে তাকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখল। এই কথা ঠিক ঐ সময় বলা হয়, যখন সে কোন জিনিসকে রশি দিয়ে বেধে রাখে। অতঃপর এই শব্দটি অন্তরের বিশ্বাস ও সুদৃঢ় সংকল্পের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
ফিকাহ অর্থ হচ্ছে দল ও জামা'আত। নাজী ফির্কা ঐ জামা'আতকে বলা হয়, যারা দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংস ও অকল্যাণ থেকে রেহাই পাবে। তাদের বৈশিষ্ট্য রসূল ﷺ এর এই হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন:
وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ عَزَّ وَجَل
"আমার উম্মাতের একটি দল সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যে সমস্ত লোক তাদেরকে পরিত্যাগ করবে তারা কিয়ামাত পর্যন্ত সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না”।৫
المنصورة সাহায্যপ্রাপ্ত: অর্থাৎ তারা কিয়ামাত পর্যন্ত তাদের বিরোধীদের উপর আল্লাহর সাহায্য ও মদদ পেয়ে শক্তিশালী থাকবে। এখানে 'কিয়ামাত পর্যন্ত' কথাটির মর্ম হচ্ছে কিয়ামাতের আগে যেই বাতাস এসে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তির রূহ কবয করবে, সেই বাতাস থেকে উদ্দেশ্য হল এ বাতাসই হবে সেই সময়ের মুমিনদের জন্য কিয়ামাত স্বরূপ।
আর যেই কিয়ামাতের দিন দুনিয়ার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে, তা কেবল নিকৃষ্টতম লোকদের উপরই কায়েম হবে। যেমন সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নাবী বলেন:
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ اللَّهُ اللَّهُ যতদিন পৃথিবীতে আল্লাহ আল্লাহ বলা হবে, ততদিন কিয়ামত হবে না।৬
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ হাকিম আব্দুল্লাহ ইবনে আমর হতে বর্ণনা করেন যে, রসূল বলেছেন:
يَبْعَثُ اللَّهُ رِيحًا كَرِيحِ الْمِسْكِ مَسُّهَا مَسَّ الْحَرِيرِ ، فَلَا تَتْرُكُ نَفْسًا فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنَ الْإِيمَانِ إِلَّا قَبَضَتْهُ ، ثُمَّ يَبْقَى شِرَارُ النَّاسِ عَلَيْهِمْ تَقُومُ السَّاعَةُ "কিয়ামাতের পূর্বে আল্লাহ তা'আলা সুন্দর একটি বাতাস প্রেরণ করবেন। এই বাতাসের সুঘ্রাণ হবে কস্তুরীর সুঘ্রাণের মত এবং রেশমের মত নরম। সেদিন যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে সেও এই বাতাসের কারণে মৃত্যু বরণ করবে। এরপর কেবল খারাপ লোকেরাই বেঁচে থাকবে। এই নিকৃষ্ট লোকদের উপরই কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হবে।'৭
টিকাঃ
৫. সহীহ বুখারী ৩৬৪১, সহীহ মুসলিম ১৯২০, তিরমিযী ২২২৯, আবুদাউদ ৪২৫২, ইবনে মাজাহ ৩৯৫২, মুসনাদে আহমাদ।
৬. সহীহ মুসলিম ১৪৮, অধ্যায়: কিতাবুল ফিতান, তিরমিযী ২২০৭, মুসনাদে আহমাদ।
৭. সহীহ মুসলিম ১৯২৪।
📄 আহ্লুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মূলনীতি হচ্ছে রসূলগণ আক্বীদা ও অন্যান্য বিষয়ে যা নিয়ে এসেছেন তাই সঠিক পথ।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: صِرَاطُ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصَّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ
"ঐ সব লোকের পথ, যাদের উপর আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন। তারা হলেন নাবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ এবং সৎকর্মশীলগণ”।
ব্যাখ্যা: আক্বীদা এবং অন্যান্য বিষয়ে নাবী-রসূলগণ আল্লাহর পক্ষ হতে যা নিয়ে এসেছে এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা যে পথে চলেছে, তাই হচ্ছে সীরাতুল মুস্তাকীম। এটিই হচ্ছে সেই সব লোকের পথ, যাদের উপর আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন। তিনি তাদেরকে সর্বপ্রকার নেয়ামত পূর্ণরূপে দান করেছেন, যা তাদেরকে চিরকাল সুখ ও সৌভাগ্যের মধ্যে রাখবে। এই নিয়ামাতপ্রাপ্ত লোকেরাই ঐ সব লোক, যাদের পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে তাঁর কাছে দু'আ করার আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং এই চার প্রকার লোকেরাই আল্লাহর সর্বপ্রকার ও পূর্ণ নেয়ামাত পেয়ে ধন্য হবে। তারা হলো:
এক. النَّبِيُّون نাবীগণ : النبي এর বহুবচন হচ্ছে النَّبِيُّون। তারা হলো ঐসব মহাপুরুষ, যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা নবুওয়াত ও রেসালাতের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। নাবী ও রসূলের সংজ্ঞা এবং উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে।
দুই. الصِّدِّيقُون সত্যবাদীগণ: الصِّدِّيق এর বহুবচন الصِّدِّيقُون। যে ব্যক্তি সত্য বলায় এবং সত্যকে সত্যায়ন করার ক্ষেত্রে অগ্রগামী, তাকে সিদ্দীক বলা হয়। অর্থাৎ আল্লাহর জন্য পূর্ণ মুখলিস (নিবেদিত ও নিষ্ঠাবান) হওয়ার সাথে সাথে যে ব্যক্তি রসূল ﷺ এর পূর্ণ অনুসরণ করে, সেই সিদ্দীক।
তিন. وَالشُّهَدَاء শহীদগণ: شهيد এর বহুবচন الشُّهَدَاء। আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার জন্য কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যে ব্যক্তি নিহত হয়, তাকে শহীদ বলা হয়। শহীদ শব্দটি شهادة থেকে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে সাক্ষ্য দেয়া, উপস্থিত হওয়া। শহীদকে শহীদ বলার কারণ হলো, তাঁর জন্য জান্নাত ওয়াজিব হওয়ার সাক্ষ্য দেয়া হয়েছে এবং রহমতের ফেরেশতাগণ তার সাথে উপস্থিত থাকেন।
চার. الصَّالِحِين সৎকর্মশীলগণ: صالح এর বহুবচন الصالحون। সালেহ (সৎকর্মশীল) ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে আল্লাহর হকসমূহ এবং আল্লাহর সৃষ্টির হকসমূহ আদায় করে।
صراط শব্দটিকে কখনো আল্লাহর দিকে ইযাফত (সম্বন্ধিত) করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَأَنْ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ “এটিই আমার সঠিক পথ। সুতরাং তোমরা এই সঠিক পথের অনুসরণ কর (সূরা আনআম ৬:১৫৩)। সীরাতকে আল্লাহর দিকে ইযাফত করার কারণ হলো, আল্লাহই এই পথকে মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন এবং উহাকে তাদের জন্য ঠিক করেছেন। আর মানুষ যেহেতু সীরাতুল মুস্তাকীমের উপর চলে, তাই সীরাতকে মানুষের দিকেও ইযাফত করা হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ "আমাদেরকে ঐসব লোকের পথ দেখাও, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছো" (সূরা ফাতিহা ১:৭)। যারা এ পথে চলে আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে তাদের ফাযীলত ও সম্মানের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। আরো জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা হলো ঐ সব লোক, যাদের উপর আল্লাহ তা'আলা অনুগ্রহ করেছেন। তারা হলেন নাবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎকর্মপরায়ণ লোকগণ (সূরা নিসা ৪:৬৯)। এই পথের পথিক যখন জানতে পারবে যে, তাতে রয়েছে নাবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সৎকর্মপরায়ণ, তখন তার অন্তর থেকে সমসাময়িক লোকদের থেকে একাকীত্বের অনুভূতি দূর হয়ে যাবে।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এমন কিছু নমুনা ও দলীল উল্লেখ করেছেন, যা আল্লাহ তা'আলার জন্য আসমা ও সিফাত সাব্যস্ত করে। বিভিন্ন অধ্যায় ও শিরোনামে তিনি সেই দলীলগুলো বর্ণনা করেছেন।
📄 এই বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা‘আলা আরশের উপরে সমুন্নত, আরো বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, তিনি সমস্ত মাখলূকের উপরে এবং সকল মাখলূকের সাথে। মাখলূকের উপরে হওয়া এবং তাদের সাথে থাকা পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: فصل: وَقَدْ دَخَلَ فِيمَا ذَكَرْنَاهُ مِنَ الإِيمَانِ بالله الإِيمَانُ بِمَا أَخْبَرَ اللَّهُ بِهِ فِي كِتَابِهِ، وَتَوَاتَرَ عَن رَّسُولِهِ، وَأَجْمَعَ عَلَيْهِ سَلَفُ الأُمَّةِ مِنْ أَنَّهُ سُبْحَانَهُ فَوْقَ سَمَاوَاتِهِ، عَلَى عَرْشِهِ، عَلِيٌّ عَلَى خَلْقِهِ، وَهُوَ سُبْحَانَهُ مَعَهُمْ أَيْنَمَا كَانُوا، يَعْلَمُ مَا هُمْ عَامِلُونَ؛ كَمَا جَمَعَ بَيْنَ ذَلِكَ فِي قَوْلِهِ هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنْ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَلَيْسَ مَعْنَى قَوْلِهِ: (وَهُوَ مَعَكُمْ أَنَّهُ مُخْتَلِطٌ بِالْخَلْقِ؛ فَإِنَّ هَذَا لَا تُوجِبُهُ، اللَّغَةُ، بَلِ الْقَمَرُ آيَةٌ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ مِنْ أَصْغَرِ مَخْلُوقَاتِهِ، وَهُوَ مَوْضُوعٌ فِي السَّمَاءِ، وَهُوَ مَعَ الْمُسَافِرِ وَغَيْرُ الْمُسَافِرِ أَيْنَمَا كَانَ. وَهُوَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ ، رَقِيبٌ عَلَى خَلْقِهِ، مُهَيْمِنٌ عَلَيْهِمْ، مُطَّلِعُ عَلَيْهِم... إلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِن مَّعَانِي رُبُوبَيَّتِهِ.
অনুচ্ছেদ: ইতিপূর্বে আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের বিষয়টি উল্লেখ করেছি। আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে যেসব বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন, রসূল থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে (প্রচুর সংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে) যা বর্ণিত হয়েছে এবং এই উম্মতের সালাফগণ যেসব বিষয়ের উপর একমত হয়েছে, তাতে বিশ্বাস করাও আল্লাহর প্রতি ঈমানের মধ্যে শামিল। তার মধ্যে এও রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানসমূহের উপরে অবস্থিত আরশের উপর এবং সকল মাখলুকের উপর। সেই সাথে তিনি মাখলুকের সাথেও। তারা যেখানেই থাকে না কেন, আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথেই। তারা যা আমল করে, আল্লাহ তা'আলা তা জানেন। আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতে মাখলুকের উপরে থাকা এবং তাদের সাথে থাকাকে একসাথে একত্র করেছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াতে বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
"আল্লাহই আসমান-যমীনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। যা কিছু মাটির মধ্যে প্রবেশ করে, যা কিছু তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং যা কিছু আসমান থেকে অবতীর্ণ হয় আর যা কিছু আসমানে উঠে, তা তিনি জানেন। তোমরা যেখানেই থাকনা কেন তিনি তোমাদের সাথেই"।
وَهُوَ مَعَكُمْ 'তিনি তোমাদের সাথেই' এ কথার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথে মিশে রয়েছেন। আরবী ভাষা এই অর্থকে আবশ্যক করেনা। আল্লাহ মাখলুকের সাথে মিশে আছেন, এই ধারণা এই উম্মাতের সালাফদের ইজমার পরিপন্থী এবং আল্লাহ তা'আলা মানুষকে যেই ফিতরাত (স্বভাব) দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তারও খেলাফ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অথচ আল্লাহর জন্যই সর্বোত্তম উদাহরণ, চন্দ্র আল্লাহর অন্যতম একটি নিদর্শন, আল্লাহর সৃষ্টিরাজির মধ্য হতে ক্ষুদ্র সৃষ্টিসমূহের অন্যতম। ইহাকে রাখা হয়েছে আসমানে। তারপরও চাঁদ ভ্রমণকারীর সাথেও থাকে এবং গৃহে অবস্থানকারীর সাথেও থাকে। ভ্রমণকারী যেখানে অবতরণ করে এবং যেখানেই চলে চাঁদ তার সাথেই থাকে।
আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে থেকেও মাখলুকের নিকটে। তাদের রক্ষক, তাদের সম্পর্কে অবগত এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁর রুবুবীয়াতের অন্যান্য সিফাতের মাধ্যমে তিনি মাখলুকের উপরে এবং তাদের অতি নিকটে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বিশেষভাবে দু'টি মাস'আলা বর্ণনা করেছেন।
(১) আরশের উপর আল্লাহ তা'আলার সমুন্নত হওয়া এবং
(২) তাঁর মাখলুকের সাথে থাকা।
শাইখুল ইসলাম একটি সন্দেহ দূর করার জন্য বিশেষভাবে এ দু'টি মাস'আলার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কেননা আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে থাকা এবং সৃষ্টির সাথে থাকার বিষয়টিকে কেউ কেউ পরস্পর সাংঘর্ষিক মনে করতে পারে। আবার কেউ এই ধারণাও করতে পারে যে, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথেই, এর মানে হচ্ছে আল্লাহর সিফাতগুলো মাখলুকদের সিফাতের মতই এবং তিনি আমাদের সাথে একদম মিশে আছেন। যেমন এক মাখলুক অন্য মাখলুকের সাথে মিশে থাকে। সুতরাং প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সমস্ত সৃষ্টির উপরে আরশের উপর সমুন্নত হয়ে আবার সৃষ্টির সাথে না মিশে তাদের অতি নিকটবর্তী হন কিভাবে?
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই সন্দেহের একাধিক জবাব দিয়েছেন:
প্রথম জবাব: আরবদের যেই ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে তা এই অর্থকে আবশ্যক করে না। কেননা শব্দটি ভাষাগত দিক থেকে সাধারণ সান্নিধ্য ও নিকটত্ব অর্থ প্রদান করে; সহাবস্থান, সংমিশ্রণ, লাগালাগি এবং সংস্পর্শ ইত্যাদি অর্থ প্রদান করে না। কেননা আপনি বলে থাকেন, زوجتي معي আমার স্ত্রী আমার সাথেই। অথচ এই কথা বলার সময় আপনি থাকেন একস্থানে, আপনার স্ত্রী থাকে অন্য স্থানে। আপনারা আরো বলে থাকেন, مازلنا نسير والقمر معنا আমরা পথ চলছিলাম, চাঁদ আমাদের সাথেই ছিল।
অথচ চাঁদ থাকে আসমানে, থাকে মুসাফিরের সাথে এবং থাকে স্বদেশে অবস্থানকারীর সাথেও। সাধারণ একটি সৃষ্টি চাঁদের ব্যাপারে যদি এটি বলা সঠিক হয়, তাহলে যেই মহান স্রষ্টা সবচেয়ে বড় তাঁর শানে এটি বলা কেন জায়েয হবে না যে, তিনি আসমানের উপরে আরশের উপর থেকেও আমাদের সাথে?
দ্বিতীয় জবাব: আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথে একদম মিশে আছেন, এই কথা উম্মতের সালাফে সালেহীন তথা সাহাবী, তাবেঈ এবং তাদের অনুসারীদের ইজমার পরিপন্থী। অথচ তারা সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ এবং উত্তম আদর্শ। তারা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের উপর সমুন্নত, সকল সৃষ্টির উপরে এবং তাদের থেকে আলাদা। তারা আরো একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা ইলমের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সাথে রয়েছেন। তারা আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَهُوَ مَّعَكُمۡ এর ব্যাখ্যা এভাবেই করেছেন। অর্থাৎ জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের সাথেই।
তৃতীয় জবাব: আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে নন বরং তাদের সাথে মিশে আছেন, এই কথা মানুষের ঐ স্বভাব-প্রকৃতির দাবীর পরিপন্থী, যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাদের মধ্যে যেই স্বভাব স্থাপন করেছেন, এই বিশ্বাস তার বিপরীত। কেননা আল্লাহ তা'আলা যে মাখলুকের উপরে, সৃষ্টিগত স্বভাব অনুযায়ী মাখলুক এই কথার স্বীকৃতি প্রদান করে। মানুষ বিপদাপদ ও সঙ্কটময় মুহূর্তে আল্লাহর স্মরণাপন্ন হওয়ার সময় উপরের দিকে অন্তরকে ধাবিত করে। ডান দিকে কিংবা বাম দিকে দৃষ্টিপাত করেনা। এ বিষয়ে কারো দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয় না। এটি কেবল ঐ সৃষ্টিগত স্বভাবের দাবীতেই করে থাকে, যা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।
চতুর্থত জবাব: আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে যে সংবাদ দিয়েছেন এবং রসূল ﷺ মুতাওয়াতির সূত্রে যা বর্ণিত হয়েছে, এই ধারণা তার বিপরীত। কুরআন ও হাদীসে রয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা সমস্ত সৃষ্টির উপরে এবং আরশেরও উপরে। সেই সাথে তিনি সৃষ্টির সাথেও তারা যেখানেই থাকুক না কেন। মুতাওয়াতির হাদীস,
هو ما رواه جماعة تحيل العادة تواطؤهم على الكذب عن مثلهم من الابتداء إلى الانتهاء
যার সনদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এমন একদল রাবী তাদের অনুরূপ আরেক দল রাবী থেকে বর্ণনা করেছেন, মিথ্যার উপর যাদের একমত হওয়া সাধারণত অসম্ভব হয়।
আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের উপরে এবং তাদের সাথে, এ বিষয়ে অনেক আয়াত এবং বহু হাদীস রয়েছে। সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াত তার মধ্যে অন্যতম, যা শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উপরে উল্লেখ করেছেন।
وَهُوَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ عَرْشِهِ رَقِيبٌ عَلَى خَلْقِهِ، مُهَيْمِنٌ عَلَيْهِمْ مُطَّلِعٌ عَلَيْهِم আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে থেকেও মাখলুকের নিকটে। তাদের পর্যবেক্ষক এবং তাদের সম্পর্কে অবগত: এখানে তিনি পূর্বের কথাকেই পুনরায় জোর দিয়ে বলেছেন। এর পূর্বে তিনি বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরশের উপরে এবং মাখলুকের সাথে। এখানেও তিনি আল্লাহ তা'আলার অতি সুন্দর নাম সমূহের মধ্য হতে الرقيب (পর্যবেক্ষক) এবং المهيمن (সংরক্ষক)-এই নাম দু'টি উল্লেখ করে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা মাখলুকের নিকটেই। আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ১ নং আয়াতে বলেন:
إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর কড়া নজর রাখেন"।
এখানে رقيب অর্থ হচ্ছে তিনি তাঁর বান্দাদের সকল অবস্থার পর্যবেক্ষণ করেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটে।
আল্লাহ তা'আলা সূরা হাশরের ২৩ নং আয়াতে আরো বলেন:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ
"আল্লাহই সেই মহান সত্তা, যিনি ছাড়া কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি বাদশাহ, অতীব পবিত্র, সকল দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, হেফাযতকারী, পরাক্রমশালী, প্রবলশক্তিধর (শক্তির মাধ্যমে সবকিছুকে সংশোধনকারী) এবং অতীব মহিমান্বিত"।
إلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِن مَّعَانِي رُبُوبَيَّتِهِ আল্লাহ তা'আলা তাঁর রুবুবীয়াতের অন্যান্য সিফাতের মাধ্যমে তিনি মাখলুকের উপরে এবং তাদের অতি নিকটে:
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার রুবুবীয়াতের দাবী হচ্ছে তিনি স্বীয় সত্তাসহ সব সৃষ্টির উপরে, তিনি বান্দাদের সকল কাজ-কর্ম সম্পর্কে অবগত। সেই সাথে তিনি তাঁর ইলমের মাধ্যমে তাদের অতি নিকটে এবং তিনি তাদেরকে সকল দিক থেকে পরিবেষ্টন করে আছেন। তিনি তাদের সকল বিষয় পরিচালনা করেন, তাদের আমলসমূহ সংরক্ষণ করেন এবং তার বিনিময় প্রদান করেন。
📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৃষ্টির উপরে এবং মাখলূকের সাথে থাকার ব্যাপারে যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তাঁর আসমানে থাকার অর্থ ও তার দলীলসমূহ।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَكُلُّ هَذَا الْكَلَامِ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ مِنْ أَنَّهُ فَوْقَ الْعَرْشِ وَأَنَّهُ مَعَنَا حَقٌّ عَلَى حَقِيقَتِهِ لَا يَحْتَاجُ إِلَى تَحْرِيفِ وَلَكِنْ يُصَانُ عَنِ الظُّنُونِ الْكَاذِبَةِ مِثْل أَنْ يُظَنَّ أَنْ ظَاهِرَ قَوْلِهِ : (فِي السَّمَاءِ أَنَّ السَّمَاءَ تُظِلُّهُ أَوْ تُقِلُّهُ ، وَهَذَا بَاطِلٌ بِإِجْمَاعِ أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْإِيمَانِ فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَهُوَ الَّذِي ( يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولَا وَيُمْسِكُ السَّمَاءَ أَنْ تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ) (وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ)
আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন, তিনি আরশের উপরে। আরো বলেছেন যে, তিনি আমাদের সাথে। প্রকৃতপক্ষেই তিনি আরশের উপরে এবং প্রকৃতপক্ষেই তিনি আমাদের সাথে। এইসব কথার তাহরীফ (পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন) করার প্রয়োজন নেই। তবে আল্লাহ তা'আলার কালামকে বাতিল ধারণা থেকে সংরক্ষণ করতে হবে। যেমন في السماء অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমানে, এই কথা থেকে কেউ ধারণা করতে পারে যে, আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করে আছে অথবা আসমান আল্লাহকে ঢেকে রেখেছে ও ছায়া দিচ্ছে। আলেম ও মুমিনদের সর্ব সম্মতিক্রমে এই কথা বাতিল। কেননা আল্লাহ তা'আলার কুরসী সমস্ত আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। (সূরা বাকারা ২:২৫৫)
তিনি (আল্লাহ) সেই সত্তা, যিনি আকাশ ও পৃথিবীকে অনড় রেখেছেন, যাতে ওরা স্থানচ্যুত না হয়। (সূরা ফাতির ৩৫:৪১)
আর তিনিই আকাশকে এমনভাবে ধরে রেখেছেন, যার ফলে তাঁর হুকুম ছাড়া তা পৃথিবীর উপর পতিত হয় না”। (সূরা হজ্জ ২২:৬৫)
"তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী তাঁর হুকুমেই সুপ্রতিষ্ঠিত”। (সূরা রূম ৩০:২৫)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সম্পর্কে যেই সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আরশের উপরে এবং তিনি আমাদের সাথেও, এ বিষয়ে যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, শাইখুল ইসলাম এখানে তা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যেমন সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আরশের উপরে এবং তিনি আমাদের সাথেও, উহার উপর ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব। এই কথার তাবীল (ব্যাখ্যা) করা জায়েয নয় এবং উহার বাহ্যিক অর্থকে পরিবর্তন করাও বৈধ নয়। যেমন ব্যাখ্যা করে থাকে জাহমীয়াদের মুআত্তিলা সম্প্রদায় এবং মুতাযেলা ও তাদের অনুরূপ ফির্কার লোকেরা। তারা ধারণা করে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রকৃতপক্ষে আরশের উপরে সমুন্নত নন; বরং আরশের উপর সমুন্নত হওয়া মাজায তথা রূপকার্থবোধক। তাই তারা الاستواء على العرش আরশের উপর আল্লাহ তা'আলার সমুন্নত হওয়ার ব্যাখ্যা এভাবে করে থাকে যে, الاستيلاء على الملك অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাজত্ব দখল করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে রয়েছেন, এই কথার ব্যাখ্যায় তারা বলে যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে علو القهر والقدرة অর্থাৎ আল্লাহর প্রতাপ, শক্তি ও তাঁর ক্ষমতা সকলের উপরে। তারা অনুরূপ আরো এমন বাতিল ব্যাখ্যা করে থাকে, যা আল্লাহ তা'আলার কালামকে তার আসল অর্থ থেকে স্থানান্তরের শামিল।
বিদ'আতীদের কেউ কেউ বলে থাকে যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের সাথে, এই কথার অর্থ হচ্ছে তিনি সর্বত্র বিরাজমান, উপস্থিত এবং তিনি প্রত্যেক স্থানেই রয়েছেন। যেমন বলে থাকে জাহমীয়াদের সর্বেশ্বরবাদী সম্প্রদায় এবং অন্যরা। আল্লাহ তা'আলা তাদের কথার অনেক উর্ধ্বে।
আল্লাহ তা'আলার এ সম্পর্কিত কালামকে বাতিল ধারণা থেকে সংরক্ষণ করতে হবে। যেমন فى السماء অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আসমানে, এই কথা থেকে কেউ ধারণা করতে পারে যে, আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করে আছে অথবা আসমান আল্লাহকে ঢেকে রাখছে ও ছায়া দিচ্ছে: এখানে تقله অর্থ হচ্ছে تحمله 'তাকে বহন করছে'। আর نظله মানে تستره 'তাকে ঢেকে রেখেছে'। 'ছায়া' বলা হয় ঐ জিনিসকে, যা তোমাকে উপরের দিক থেকে ঢেকে রাখে। আল্লাহ তা'আলা আসমানে থাকার অর্থ এই নয় যে, আসমান তাঁকে বহন করছে, (নাউযুবিল্লাহ) এবং আসমান তাঁকে ঢেকে রেখেছে ও ছায়া দিচ্ছে। যে ব্যক্তি এই ধারণা পোষণ করবে, সে দুই কারণে মারাত্মক ভুলের মধ্যে পতিত হবে।
প্রথম কারণ: আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করছে অথবা আল্লাহ তা'আলাকে ঢেকে রেখেছে, এই ধারণা আলেমদের ও ঈমানদারদের ইজমার পরিপন্থী। আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে এবং তাঁর সৃষ্টির বাইরে বা তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। তাঁর পবিত্র সত্তার মধ্যে মাখলুকের কোন স্বভাব নেই এবং সৃষ্টির মধ্যেও তাঁর যাতের কিছুই নেই। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ
"তোমরা কি নিরাপত্তা পেয়েছ যে, আসমানে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরসহ ভূমিকে ধসিয়ে দিবেন না? (সূরা মুলক ৬৭:১৬-১৭)
এই আয়াতের ব্যাখ্যা পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে যে, এখানে আসমান দ্বারা যদি আমাদের উপরে নির্মিত আসমান উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এখানেও হরফে জারটি على অর্থে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ على السماء তা'আলা আসমানের উপরে'। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ
"এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের মধ্যে শুলিবিদ্ধ করবো"। এখানেও فى হারফে জারটি على অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কান্ডের উপর শুলিবিদ্ধ করবো।
আর যদি السماء দ্বারা العلو (উপর) উদ্দেশ্য হয়, তাহলে فى السماء অর্থ হবে فى العلو অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা উপরে। (আল্লাহই সর্বাধিক জানেন)
দ্বিতীয় কারণ: আসমান আল্লাহ তা'আলাকে বহন করছে এবং আসমান তাঁকে ঢেকে রেখেছে, এই ধারণা কুরআনের ঐসব সুস্পষ্ট দলীলের পরিপন্থী, যা আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও সৃষ্টির প্রতি তাঁর অমুখাপেক্ষীতার প্রমাণ করে। বরং সকল সৃষ্টিই আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ)
"আল্লাহ তা'আলার কুরসী সমস্ত আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে” (সূরা বাকারা ২:২৫৫)।
আরশের মধ্যে কুরসী একটি বিশাল সৃষ্টি। ইহা আসমান ও যমীনের চেয়ে বড়। আরশ কুরসীর চেয়েও অনেক বড়। আসমান ও যমীনসমূহ যদি কুরসীর চেয়ে ছোট হয়, কুরসী যদি আরশের চেয়ে ছোট হয় এবং আল্লাহ তা'আলা যেহেতু সবকিছু থেকে বড়, তাহলে আসমান কিভাবে আল্লাহকে তার নিজের মধ্যে পুরে রাখবে বা তাঁকে বহন করবে অথবা ছায়া দিবে কিংবা ঢেকে রাখবে? আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ أَن تَزُولَا، وَلَئِن زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِّن بَعْدِهِ ﴾
"আসলে আল্লাহই আকাশ ও পৃথিবীকে অটল ও অনড় রেখেছেন। আসমান ও যমীন যদি স্বীয় স্থান থেকে সরে যায়, তাহলে আল্লাহর পরে আর কেউ তাদেরকে স্থির রাখার ক্ষমতা রাখে না"। (সূরা ফাতির ৩৫:৪১) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَيُمْسِكُ السَّمَاءَ أَن تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ
"আর তিনিই আকাশকে এমনভাবে ধরে রেখেছেন, যার ফলে তাঁর হুকুম ছাড়া তা পৃথিবীর উপর পড়ে যায় না”। (সূরা হাজ্জ ২২:৬৫) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَن تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ﴾
"আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এও রয়েছে যে, আকাশ ও পৃথিবী তাঁর হুকুমেই সুপ্রতিষ্ঠিত” (সূরা রূম ৩০: ২৫)।
উপরোক্ত আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আসমান ও যমীন আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আল্লাহই আসমানকে ধরে রেখেছেন, যাতে উহা স্বীয় স্থান থেকে সরে না যেতে পারে এবং তিনি আসমানকে আটকিয়ে রেখেছেন, যাতে উহা যমীনের উপর পড়ে না যায়। একমাত্র আল্লাহর আদেশেই আসমান দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং ইহা জানার পর এই কথা বোধগম্য নয় যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের প্রতি মুখাপেক্ষী এবং আসমান তাঁকে বহন করছে কিংবা ছায়া দিচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা এ বাতিল ধারণার অনেক উর্ধ্বে।