📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 ইমাম ইবনে তাইমীয়া رحمة الله عليه এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

📄 ইমাম ইবনে তাইমীয়া رحمة الله عليه এর সংক্ষিপ্ত জীবনী


আল্লাহ তা'আলা মানব জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য সত্য দ্বীনসহ যুগে যুগে অগণিত নাবী রসূল প্রেরণ করেছেন। নির্ভেজাল তাওহীদই ছিল নাবী-রসূলদের দ্বীনের মূল বিষয়। পৃথিবীর মানুষেরা এই তাওহীদকে যখনই ভুলে গেছে, তখনই তা পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন নতুন নাবী-রসূল পাঠিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আগমন করেন সর্বশেষ নাবী মুহাম্মাদ এর দাওয়াতের মূল বিষয়ও ছিল এই তাওহীদ। মক্কায় অবস্থান করে একটানা ১৩ বছর তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। অতঃপর মদীনায় হিজরত করে তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন। উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানগণ তাঁর এই দাওয়াত গ্রহণ করলো এবং তারা তাঁর সাহায্য করলো। আল্লাহ তা'আলা অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করলেন। আরব উপদ্বীপসহ পৃথিবীর সর্বত্রই এই দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে গেল। তাওহীদের মাধ্যমে তারা সমগ্র জাতির উপর যে গৌরব, সম্মান, শক্তি, প্রতিপত্তি এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে মুসলিমগণ দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসলিমদের শক্তির মূলভিত্তি এই নির্ভেজাল তাওহীদের উপর শির্ক ও কুসংস্কারের আবর্জনা পড়ে যাওয়াই মুসলিমদের বিপর্যয়ের প্রধান ও মূল কারণ।
ইসলামের এই মূলভিত্তি নির্ভেজাল তাওহীদ থেকে যখনই মুসলিম জাতি দূরে চলে গেছে, দ্বীনি লেবাসে বিভিন্ন সময় শির্ক, বিদআত, কুসংস্কার ও বিজাতীয় আচার-আচরণ মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছে, তখনই নির্ভেজাল তাওহীদের দিকে জাতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং সকল প্রকার আবর্জনা থেকে তাওহীদকে পরিস্কার ও পরিশুদ্ধ করার জন্য ইসলামের স্বর্ণযুগের পরে আল্লাহ তা'আলা বহু মর্দে মুজাহিদ প্রেরণ করেছেন। তারা পথহারা জাতিকে সুপথে ফিরিয়ে এনেছেন, তাওহীদের দাওয়াতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং দ্বীনকে সকল প্রকার শির্ক-বিদ'আত থেকে সংস্কার ও সংশোধন করেছেন। তাদেরই ধারাবাহিকতায় হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতকে আগমন করেন বিপ্লবী সংস্কারক শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া। বহু প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং জেল-যুলুম সহ্য করে তাওহীদ পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে তিনি যে অতুলনীয় অবদান ও খেদমত রেখে গেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম জাতির জন্য তা দিশারী হয়ে থাকবে। তাঁর বরকতময় জীবনী, দাওয়াত ও সংস্কারের সকল দিক উল্লেখ করতে গেলে বড় মাপের একটি গ্রন্থ রচনা করা দরকার। তাই আমরা স্বল্প পরিসরে শাইখের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, জীবনী ও সংস্কার আন্দোলনের কিছু দিক এখানে উল্লেখ করেছি।
নাম, জন্ম ও বংশ পরিচয়:
তিনি হলেন আবুল আব্বাস তকীউদ্দীন شাইখুল ইসলাম ইমাম আহমাদ বিন আব্দুল হালীম বিন আব্দুস সালাম ইবনে তাইমীয়া । ৬৬১ হিজরী সালের ১০ রবীউল আওয়াল মাসে তিনি বর্তমান সিরিয়ার হারান এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আব্দুল হালীম ইবনে তাইমীয়া এবং দাদা আবুল বারাকাত মাজদুদ্দীন আব্দুস সালাম বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও হাম্বলী ফিকাহবিদ ছিলেন। সে হিসাবে তিনি এমন একটি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যার সকল সদস্যই ছিলেন আলিম ও দ্বীনদার। আলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে শিশুকালেই তিনি ইলম অর্জনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। উল্লেখ্য যে, আলিমদের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী তাইমীয়া ছিলেন শাইখের নানী। তিনি ওয়াজ-নাসীহত ও ভাষণ-বক্তৃতা দানে খুবই পারদর্শী ছিলেন।
শৈশবকাল ও প্রাথমিক শিক্ষা:
ইমামের বয়স যখন সাত বছর, তখন মুসলিম অঞ্চলগুলো তাতারীদের আক্রমণের শিকার হয়। শাইখের জন্মস্থান হারান এলাকা তাতারীদের আক্রমণের কবলে পড়লে মানুষ জানের ভয়ে সবকিছু পানির দামে বিক্রি করে পালাচ্ছিল। এই ভীতি ও আতঙ্কের দিনে ইমামের পরিবারবর্গ ও দেশ ত্যাগের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। তারা প্রয়োজনীয় সবকিছু ফেলে দিয়ে শুধু পারিবারিক লাইব্রেরীর বই-পুস্তকগুলো গাড়ী বোঝাই করলেন। শুধু কিতাবেই কয়েকটি গাড়ি পরিপূর্ণ হয়ে গেল। গাড়ীগুলো টানার জন্য প্রয়োজনীয় ঘোড়া ও গাধাও ছিলনা। তাই গাধার পাশাপাশি পরিবারের যুবক সদস্যদেরও মাঝে মাঝে কিতাবের গাড়ী টানতে হতো।
দামেস্কে পৌঁছার পর তথাকার লোকেরা শাইখের পরিবারকে অভ্যর্থনা জানালো। দামেস্কবাসীরা শাইখের পিতা ও দাদার জ্ঞান ও পান্ডিত্যের খ্যাতির কথা আগে থেকেই অবহিত ছিল। পিতা আব্দুল হালীম দামেস্কের বড় মসজিদ জামে উমুবীতে দারস দেয়ার দায়িত্ব লাভ করলেন। শীঘ্রই তাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এলো।
কিশোর ইবনে তাইমীয়া অল্প সময়ের মধ্যেই কুরআন মাজীদ মুখস্থ করে হাদীস, ফিক্হ ও আরবী ভাষা চর্চায় মশগুল হলেন। সেই সাথে তিনি পিতার সাথে বিভিন্ন ইলমী মজলিসে শরীক হতে লাগলেন।
ইমামের মেধা ও স্মরণশক্তি:
ইমামের খান্দানের সবাই মেধাবী ছিলেন। কিন্তু তাদের তুলনায় ইমামের স্মরণ শক্তি ছিল অসাধারণ। শিশুকাল থেকে তাঁর অসাধারণ স্মরণশক্তি শিক্ষকদের অবাক করে দিয়েছিল। দামেস্কের লোকদের মুখে মুখে তাঁর স্মরণশক্তির কথা আলোচনা হতো।
একদা আলেপ্পো নগরীর একজন বিখ্যাত আলেম দামেস্কে আসেন। তিনি কিশোর ইবনে তাইমীয়ার স্মরণশক্তির কথা লোকমুখে আগেই শুনেছিলেন। ইমামের স্মরণশক্তি পরীক্ষা করার জন্য তিনি একটি দর্জির দোকানে বসে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে একদল ছেলেকে আসতে দেখা গেলো। দর্জি ইঙ্গিতের মাধ্যমে ইমামকে দেখিয়ে দিল। তিনি ইমামকে ডাকলেন। ইমামের খাতায় হাদীসের তের-চৌদ্দটি মতন লিখে দিয়ে বললেন, পড়ো। কিশোর ইমাম ইবনে তাইমীয়া গভীর মনোযোগের সাথে হাদীসগুলো একবার পড়লেন। তিনি এবার খাতা উঠিয়ে নিয়ে বললেন, মুখস্থ শুনিয়ে দাও। ইবনে তাইমীয়া তা মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। এবার একগাদা সনদ লিখে দিয়ে পড়তে বললেন। পড়া হলে মুখস্থ বলতে বললেন। ইমাম সনদগুলোও মুখস্থ বললেন। শাইখ এতে অবাক হয়ে বললেন, বড় হয়ে এই ছেলে অসাধ্য সাধন করবে।
ইমামের জ্ঞান অর্জন ও চর্চা:
ইমাম ইবনে তাইমীয়া মাত্র সাত বছর বয়সে শিক্ষালয়ে প্রবেশ করেন এবং মাত্র বাইশ বছর বয়সে তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার পরিপূর্ণ করে তুলেন। কুরআন, হাদীস, ফিকহ এবং উসূলের সাথে সাথে তিনি আরবী ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি দুই শতাধিক উস্তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। কুরআনের তাফসীরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল সবচেয়ে বেশী। যে সব উস্তাদদের কাছ থেকে তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে ইবনে কুদামা, ইবনে আসাকেরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একটানা সাত থেকে বাইশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান লাভের পর শিক্ষকতা ও জ্ঞান বিস্তারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। বাইশ বছর বয়সে উপনীত হলে তার পিতা আব্দুল হালীম ইবনে তাইমীয়া মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন দামেস্কের সর্ববৃহৎ দারুল হাদীসের প্রধান মুহাদ্দিস। আব্দুল হালীমের মৃত্যুর পর এই পদটি শুন্য হয়ে যায়। সুযোগ্য পুত্র ইমাম ইবনে তাইমীয়া সেই পদ পূরণ করেন। তাঁর দারসে যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও আলেমগণ উপস্থিত হতে শুরু করেন। যুবক আলেমের জ্ঞান ও পান্ডিত্য সবাইকে মুগ্ধ ও চমৎকৃত করে। কিছু দিন পরেই দামেস্কের প্রধান মসজিদ জামে উমুবীতে তিনি পিতার স্থানে কুরআনের তাফসীর করার দায়িত্বে নিযুক্ত হন। তাঁর জন্য বিশেষভাবে মিম্বার তৈরী করা হয়। প্রতি সপ্তাহেই তাঁর তাফসীরের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ছাত্রের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। কুরআনের তাফসীরের সাথে সাথে সমকালীন সব সমস্যার কুরআনিক সমাধান বর্ণনা করতেন।
তাঁর হাতে তৈরী হয় যুগশ্রেষ্ঠ অসংখ্য আলেম। তাদের মধ্য হতে স্বনামধন্য লেখক ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, ইমাম ইবনে কাছীর এবং ইমাম যাহাবীর নাম সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।
ইমামের মাযহাব:
তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, তারা সকলেই ছিলেন আলিম। তারা ফিক্সের ক্ষেত্রে হাম্বলী মাযহাবের অনুসরণ করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নির্দিষ্ট কোন মাযহাবের তাকলীদ করতেন না। কুরআন ও সুন্নাহর দলীলের অনুসরণ করতেন, সুন্নাতের সাহায্য করতেন এবং সালাফী নীতি গ্রহণ করতেন। সুন্নাত ও সালাফী নীতির পক্ষে তিনি এমন যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতেন, যা তাঁর পূর্বে অন্য কেউ পেশ করার সাহসিকতা প্রদর্শন করতেন না।
সত্য প্রকাশে ইমামের সাহসকিতা:
তাতারীদের আক্রমণের খবর যখন সিরিয়ায় পৌঁছল, তখন সিরিয়ার বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। তাতারীদের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে মুসলিমগণ আগেই অবহিত ছিল। তাই তাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আশপাশের সকল এলাকা ছেড়ে লোকেরা রাজধানী দামেস্কের দিকে চলে আসতে লাগল। দামেস্কের লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে গেল। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে খবর আসলো যে, মিশরের বাদশাহ প্রচুর সেনাবাহিনীসহ দামেস্কের মুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসছেন। এই খবর শুনে নগরীতে প্রাণের সাড়া জাগল। মুসলিমগণ নতুন উদ্যমে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগল।
৬৯৯ হিজরীর ২৭ রবীউল আওয়াল মাসে তাতারী সম্রাট কাজানের সাথে মিশরের সুলতানের সংঘর্ষ হলো। অনেক চেষ্টা করেও এবং অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করেও মুসলিমরা শেষ রক্ষা করতে পারলো না। মুসলিমরা হেরে গেল। মিশরের সুলতান পরাজিত সেনাবাহিনী নিয়ে কায়রোর পথে রওয়ানা হলেন।
এবার দামেস্কবাসীরা পড়লো মহাসংকটে। তাতারী সম্রাট সেনাদলসহ এবার বিজয়ী বেশে নগরে প্রবেশ করবে। তাতারী বিভীষিকার কথা চিন্তা করে বড় বড় আলেম ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা শহর ত্যাগ করতে লাগল। এর আগেই শহরের বিচারক, পরিচিত আলেম-উলামা, সরকারী অফিসার, বড় বড় ব্যবসায়ী এমনকি দামেস্কের গভর্ণর নিজের শহরের মায়া ত্যাগ করে মিশরের পথে পাড়ি জমালেন। জনগণের এক অংশও তাতারীদের হত্যাযজ্ঞের ভয়ে দামেস্ক ছেড়ে দিল। এখন কেবল সাধারণ জনগণের একটি অংশই দামেস্কে রয়ে গেল।
এদিকে কাজানের সেনাদল দামেস্কে প্রবেশের সময় ঘনিয়ে আসছিল। এই ভয়ানক পরিস্থিতিতে ইমাম ইবনে তাইমীয়া এবং শহরের নেতৃস্থানীয় লোকেরা বসে একটা সিদ্বান্ত গ্রহণ করলেন। তারা সিদ্বান্ত নিলেন, ইমাম ইবনে তাইমীয়া এর নেতৃত্বে নগরবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল কাজানের নিকট যাবে। তারা নগরবাসীদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার একটি ফরমান লিখে আনবে।
এ উদ্দেশ্যে তাতারী সম্রাট কাজানের সামনে দলবল নিয়ে উপস্থিত হলেন ইসলামের অগ্রদূত ইমাম ইবনে তাইমীয়া। কাজানের সম্মুখে ইমাম কুরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে এবং যুলুম নির্যাতনের বিপক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ভাষণ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নির্ভয়ে কথা বলে যাচ্ছিলেন এবং কাজানের কাছাকাছি হচ্ছিলেন। তাঁর আওয়াজ ধীরে ধীরে উঁচু ও গুরুগম্ভীর হচ্ছিল। কুরআনের আয়াত ও হাদীস শুনাতে শুনাতে তিনি কাজানের অতি নিকটবর্তী হচ্ছিলে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো পরাক্রমশালী কাজান এতে মোটেই বিরক্তিবোধ করছিলেন না। বরং তিনি কান লাগিয়ে কথাগুলো শুনছিলেন। ইতিমধ্যেই কাজান ইমামের ভাষণে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে গেলেন। ইমামের ভাষণ কাজানকে অনুবাদ করে শুনানো হলে তিনি লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই আলেমটি কে? আমি এমন সাহসী ও দৃঢ় সংকল্প লোক আজকের পূর্বে আর কখনো দেখিনি। ইতিপূর্বে আমাকে অন্য কেউ এমন প্রভাবিত করতে পারেনি।
লোকেরা ইবনে তাইমীয়া সম্পর্কে কাজানকে জানালো এবং ইমামের ইলম ও কার্যাবলী সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলো।
ইমাম ইবনে তাইমীয়া কাজানকে সেদিন বলেছিলেন, হে কাজান! আপনি নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করেন। আমি জানতে পেরেছি, আপনার সাথে রয়েছেন কাযী, শাইখ, মুয়াযযিন এবং ইমামগণ। এসব সত্ত্বেও আপনি মুসলিমদের উপর আক্রমণ করেছেন, তাদেরকে হত্যা করেছেন, তাদের নারীদেরকে বন্দী করেছেন এবং মুসলিমদের মালামাল লুণ্ঠন করেছেন। অথচ আপনার পিতা ও দাদা কাফের হওয়া সত্ত্বেও এ ধরণের কাজ করতে ইতস্ত করতেন। তারা নিজেদের ওয়াদা-অঙ্গীকার পালন করেছেন। আর আপনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আপনি আল্লাহর বান্দাদের উপর মারাত্মক যুলুম করেছেন।
সে সময় ইমামের সাথে ছিলেন প্রধান বিচারপতি নাজমুদ্দীন আবুল আব্বাস। তিনি লিখেছেন, ইবনে তাইমীয়া ️ যখন কাজানের সাথে কথা শেষ করলেন, তখন তাঁর ও সাথীদের সামনে খাবার রাখা হলো। সবাই খেতে লাগলেন। কিন্তু ইমাম হাত গুটিয়ে নিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন, এ খাবার হালাল নয়। কারণ গরীব মুসলিমদের থেকে লুট করা ছাগল ও ভেড়ার গোশত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মযলুম মানুষের কাছ থেকে জোর করে কাঠ সংগ্রহ করে তা পাকানো হয়েছে।
অতঃপর কাজান ইমামকে দু'আ করার আবেদন করলেন। ইমাম দু'আ করতে লাগলেন। দু'আতে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! এই যুদ্ধের পিছনে কাজানের উদ্দেশ্য যদি হয় তোমার দ্বীনকে সাহায্য করা, তোমার কালেমাকে বুলন্দ করা এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা, তাহলে তুমি তাঁকে সাহায্য করো। আর যদি দুনিয়ার রাজত্ব লাভ এবং লোভ-লালসা চরিতার্থ করাই তার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তুমিই তাকে ধ্বংস করো। আশ্চর্যের বিষয় হলো ইমাম দু'আ করছিলেন, আর কাযান আমীন আমীন বলে যাচ্ছিলেন।
কাযী আবুল আব্বাস নাজমুদ্দীন বলেন, ইমাম যখন কাযানের সামনে বক্তৃতা করছিলেন, তখন আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং নিজেদের জামা-কাপড় গুটিয়ে নিচ্ছিলাম। কি জানি কখন ইমামের উপর জল্লাদের তরবারী ঝলসে উঠবে এবং তার রক্তে আমাদের বস্ত্র রঞ্জিত হবে। কাযী নিযাম উদ্দীন আরো বলেন, কাযানের দরবার থেকে বের হয়ে এসে আমরা ইমামকে বললাম, আমরা আপনার সাথে যাবো না। আপনি তো আমাদেরকে প্রায় মেরে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন এবং আপনার কারণে আমাদের উপর বিরাট মসীবত চলে আসার উপক্রম হয়েছিল। ইমাম তখন ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, বরং আমিই তোমাদের সাথে যাবো না। অতঃপর আমরা সকলেই তাঁকে রেখে চলে আসলাম। ইমাম একাই রওয়ানা দিলেন। রওয়ানা দেয়ার সময় কাযান আবার দু'আ করার আবেদন করলেন। ইমাম পূর্বের দু'আর পুনরাবৃত্তি করলেন।
ইমামকে একাকী চলতে দেখে স্বয়ং কাযান একদল সৈন্য পাঠিয়ে ইমামের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেন। ইমামের একাকীত্বের খবর শুনে শহরের একদল লোক বের হয়ে এসে ইমামকে সঙ্গ দেয়ার কথাও জানা যায়। কাযী নাজমুদ্দীন আবুল আব্বাস বলেন, ইমাম নিরাপদে দামেস্কে ফিরে এলেন। ঐদিকে আমাদের অবস্থা এতই শোচনীয় হলো যে, রাস্তায় একদল লুটেরা বাহিনী আমাদের উপর আক্রমণ করলো এবং সর্বস্ব খুইয়ে নিল। আমরা একদম উলঙ্গ হয়ে শহরে ফিরলাম।
অত্যন্ত মর্যাদার সাথে ইমাম তাতারীর দরবার থেকে ফিরে আসলেন এবং নগরবাসীর জন্য নিরাপত্তার পরোয়ানা লিখিয়ে আনলেন। তাতারীরা যাদেরকে বন্দী করেছিল, তাদেরকেও ছাড়িয়ে আনলেন। তাতারীদের বর্বরতার কাহিনী তিনি যেমন শুনেছিলেন, তেমনি নিজ চোখেও তাদের তান্ডব দেখেছিলেন। তারপরও তিনি একটুও বিচলিত হননি। তাতারী সম্রাটের মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে এবং তাতারী সেনাদের মধ্যে অবাধে চলাফেরা করতে তিনি একটুও ভীতি অনুভব করেন নি। তিনি বলতেন, যার অন্তরে রোগ আছে সেই কেবল আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ভয় করতে পারে।
জিহাদের ময়দানে ইমাম:
আল্লাহর দ্বীনকে সকল প্রকার কুসংস্কার-আবর্জনা ও শির্ক-বিদ'আত হতে পরিস্কার করার জন্য শাইখ যেমন আমরণ কলম ও জবান দ্বারা জিহাদ করেছেন, ঠিক তেমনি শাইখুল ইসলাম তাতারীদের বিরুদ্ধে স্বসস্ত্র সংগ্রাম করে ময়দানে বিশেষ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। মুসলিম উম্মার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে তাতারীদের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য মুসলিমদেরকে তিনি যেমন উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি নিজেও ময়দানে নেমে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ইতিপূর্বে সম্রাট কাযানের নিকট প্রবেশ করে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তার সাহসিকতা দেখে উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ হয়েছিল। ৭০২ হিজরী সালের রামাযান মাসে তাতারীদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার শাকহ্ব নামক অঞ্চলে যেই যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে তিনি মুজাহিদদের কাতারের সর্বাগ্রে ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা এই যুদ্ধে তাতারীদের বিরুদ্ধে মুসলিমদেরকে বিজয় দান করেন। এমনি আরো অনেক যুদ্ধেই তিনি বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন। মিশরের সুলতান যখন তাতারীদের হাতে দেশ সমর্পন করে দিতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি সুলতানকে ধমক দিয়েছিলেন। জিহাদের প্রতি মুসলিমদেরকে উৎসাহ প্রদান এবং নিজে ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার ফলে মুসলিমদের অন্তর থেকে তাতারী আতঙ্ক দূরিভূত করে। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি মুসলিমদের অবহেলার কারণে তাদের কপালে যে দুর্দশা নেমে এসেছিল, কুরআন ও সুন্নার পথ বর্জন করার ফলে তারা রাজনৈতিকভাবে তারা যে দুর্বলতা ও বিপর্যয়ের কবলে পড়েছিল, ইমাম ইবনে তাইমীয়া এর সংস্কার ও জিহাদী আন্দোলনে মুসলিমরা নতুন করে জেগে উঠেছিল। মুসলিমগণ নতুন করে জিহাদী চেতনা ফিরে পায়। তাতারীরা ইসলামী সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র বাগদাদ দখল করে খলীফাকে যবাই করে এবং লক্ষ লক্ষ মুসলিমের রক্তে রাজপথ রক্তাক্ত করে তাতারীরা যেভাবে একের পর এক অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সিরিয়ার দামেস্ক এবং মিশরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন ইবনে তাইমীয়া মুসলিমদেরকে সুসংগঠিত করে সিরিয়া ও মিশরের দিকে তাতারীদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে না দিলে মুসলিমদের ভাগ্যাকাশ কেমন হতো, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।
অন্যায় ও অপকর্ম নির্মূলে ইবনে তাইমীয়া:
তাতারীরা দামেস্ক ছেড়ে চলে যাওয়ার পর শহরে প্রকাশ্যে মদ পানসহ নানা অপকর্ম ব্যাপকতা লাভ করে। কারণ তখন সিরিয়া এক সরকারী নিয়ন্ত্রণহীন ছিল। তাই ইমাম ইবনে তাইমীয়া একদল ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে শহরে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন এবং মদের দোকানগুলোতে ঢুকে পড়েন। মদের পেয়ালা ও কুঁজো ভেঙ্গে ফেলতে লাগলেন এবং দোকানের মদ নালায় ঢেলে দিলেন। অন্যায় ও অপকর্মের আস্তানায় প্রবেশ করে লোকদেরকে উপদেশ দিতেন, ইসলামের নির্দেশ বুঝাতেন এবং তাওবা করাতেন। প্রয়োজনে শাস্তি দিতেন। ইমামের অভিযানে সারা দামেস্ক শহর পুনরায় দ্বীনি পরিবেশ ফিরে পেল।
ভ্রান্ত তাসাউফের কবল থেকে ইসলামী আক্বীদার সংস্কারে ইবনে তাইমীয়া :
সাহাবী ও তাবেঈদের যুগ থেকে খালেস ইসলামী তাসাউফের একটি ধারা চলে আসছিল। ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনই ছিল এর একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। কিন্তু পরবর্তীতে এর কর্মধারায় নানা আবর্জনা এমনভাবে মিশ্রিত হয়ে গেল যে, মুসলিমদের এক বিরাট গোষ্ঠিও এই আবর্জনা ধোয়া পানি পান করেই আত্মতৃপ্তি লাভ করতে লাগল। হিজরী অষ্টম শতকে এসে সুফীবাদ এক গোমরাহী ও ভ্রান্ত মতবাদে পরিণত হয়। তাসাউফের লেবাস ধরে নির্ভেজাল ইসলামী আক্বীদার বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রীক দর্শন, সর্বেশ্বরবাদ, অদ্বৈত্ববাদ ইত্যাদির অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। আবর্জনা মিশ্রিত সুফীবাদের দাবীদাররা ইলমকে যাহেরী-বাতেনীতে বিভক্ত করতে থাকে, একজনের বক্ষদেশ থেকে অন্যজনের বক্ষদেশে জ্ঞানের গোপন বিস্তার হয় বলে প্রচার করতে থাকে এবং কামেল পীর-মুরশিদ ও আল্লাহর প্রেমে পাগল ভক্তের জন্য শারীয়তের বিধি-বিধান মেনে চলার প্রয়োজন নেই ইত্যাদি ভ্রান্ত চিন্তা- বিশ্বাস তাসাউফের নামে মুসলিমদের বিরাট এক অংশের উপর চেপে বসে।
আল্লাহর অলী ও তাঁর নেক বান্দাদের ব্যাপারে অমুসলিমদের ন্যায় মুসলিমরাও বাড়াবাড়ি শুরু করে। তাদের কাছে ফরিয়াদ জানাতে এবং নিজেদের দিলের মাকসুদ পূরা করতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আলেমগণও অলীদের কবরে ধরণা দিত।
ইসলামের নামে এই সব জাহেলীয়াতের অন্ধকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করে খালেস তাওহীদের দিকে মুসলিমদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য এমন একজন মর্দে মুজাহিদের প্রয়োজন ছিল, যিনি তাওহীদ ও শির্কের পার্থক্য সম্পর্কে সুস্পষ্টরূপে অবগত, জাহেলীয়াতের সকল চেহারা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে যিনি অবগত এবং যিনি জাহেলীয়াতের মূলোৎপাটন করে মুসলিমদের জন্য সরাসরি কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবী ও তাবেঈদের আমল থেকে নির্ভেজাল আক্বীদা ও আমল তুলে ধরবেন। এই গুরু দায়িত্বটি পালন করার জন্য হিজরী অষ্টম শতকে আল্লাহ তা'আলা ইমাম ইবনে তাইমীয়া চয়ন করেন। তিনি মুসলিমদের সামনে ইসলামের পরিচ্ছন্ন আক্বীদা বিশ্বাস তুলে ধরেন এবং সকল প্রকার শির্ক-বিদআত থেকে ইসলামকে পরিশুদ্ধ করেন।
মুসলিমদের আক্বীদাকে শির্কমুক্ত করা ও তার মূলোৎপাটনে ইমাম ইবনে তাইমীয়া এর প্রচেষ্টা:
মানুষের রক্ত-মাংসের দেহটার স্রষ্টা যেমন আল্লাহ, ঠিক তেমনি তার মধ্যে যেসব বিমূর্ত এবং অলৌকিক গুণাবলী রয়েছে, সেগুলোও আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং এগুলোর জন্য কোন কৃতিত্ব মানুষের প্রাপ্য নয়। প্রাপ্য একমাত্র আল্লাহ তা'আলার। কিন্তু মানুষের গোমরাহীর ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় থেকেই মানুষ মানুষের পূজা করে আসছে। এটা জীবিত ও মৃত উভয় পর্যায়েই স্থান করে নিয়েছে। পীর পূজা, আওলীয়া পূজা, কবর পূজা, মাযার পূজা প্রভৃতি ছড়িয়ে পড়েছে মানব সমাজে। রসূল বলেন, মুসলিমগণ কোন দিন প্রকাশ্যে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হবেনা। রসূল ﷺ এর মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিমরা অবশ্য প্রকাশ্য শির্ক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়নি। কিন্তু শির্ক মিশ্রিত কার্যকলাপ তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। মূর্তিপূজার পরিবর্তে তাদের একটি গ্রুপ আওলীয়া পূজা ও কবর পূজায় লিপ্ত রয়েছে। কবরের মধ্যে আবার বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে শহীদদের মাযার। এগুলোকে 'মাশহাদ' বলা হয়।
আওলীয়াদের মাযার ও শহীদের মাশহাদ কিছু কিছু জাহেল মুসলিমদের কাছে মসজিদের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা মসজিদের বদলে এগুলোতেই দান-খয়রাত করে, বাতি জ্বালায়, ধন-সম্পদ ওয়াক্ফ করে, এগুলোর উপর দালান-কোঠা ও গম্বুজ নির্মাণ করে। অনেক মাযারের চাকচিক্য ও গম্বুজ মসজিদের সৌন্দর্যকেও হার মানায়।
লোকেরা জাঁকজমকের সাথে বরকতের আশায় এগুলোর উদ্দেশ্যে সফর করে, গরু-ছাগল নিয়ে যায়। আল্লাহর ঘর যিয়ারতকারী হাজীদের কাফেলার মতই দেখা যায় তাদের কাফেলা। এভাবে মসজিদের পরিবর্তে মাযার ও মাশহাদের দিকেই বিরাট এক শ্রেণীর মানুষের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়।
সপ্তম ও অষ্টম হিজরীতে এই অবস্থা ব্যাপক আকার ধারণ করে। এ ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুসলিমদেরকে উদ্ধার করার জন্য ইমাম ইবনে তাইমীয়ার মত একজন মর্দে মুজাহিদের প্রয়োজন ছিল। তিনি অজ্ঞ ও জাহেল মুসলিমদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, এগুলো ইসলাম নয়; বরং ভিন্ন নামে মূর্তি পূজারই নামান্তর। তার রচনার বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে মুসলিমদের গোমরাহীর আলোচনা এবং কবর ও মাযার পূজার প্রতিবাদ।
৭০২ হিজরীতে সিরিয়া তাতারী আক্রমণ থেকে মুক্ত হবার পর ইমাম ইবনে তাইমীয়া পুনরায় তাঁর সংস্কারমূলক কার্যাবলী শুরু করেন। অধ্যাপনা, তাফসীর ও হাদীসের দাস দান, ইসলামের নামে প্রচলিত শির্ক ও বিদ'আত বর্জনের আহবান করেন। সেই সাথে শির্ক, বিদআত ও জাহেলীয়াতের বিরুদ্ধে অভিযানও পরিচালনা করেন। এ যুগে ইহুদী- খৃষ্টানদের সাথে বসবাস করার কারণে ইসলাম বিরোধী অনেক আক্বীদা মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে। সে সময় দামেস্কের অদূরে একটি বেদী ছিল। বেদীটি সম্পর্কে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলিমদের মধ্যে অদ্ভুত ধরণের বিভিন্ন কাহিনী প্রচলিত ছিল। এটি মুসলিমদের জন্য বিরাট ফিতনায় পরিণত হয়েছিল। মুসলিমরা সেখানে মানত করতো।
৭০৪ হিজরীতে ইবনে তাইমীয়া একদল মজুর ও পাথর কাটা মিস্ত্রি নিয়ে সেখানে হাযির হন। তাদের সহায়তায় বেদীটি কেটে টুকরা টুকরা করে নদীতে নিক্ষেপ করে শির্ক-বিদ'আতের এই আস্তানাটির মূলোৎপাটন করেন। মুসলিমরা বিরাট একটি ফিতনা থেকে মুক্তি পায়।
ওয়াহদাতুল উজুদ ও সর্বেশ্বরবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম:
অষ্টম হিজরী শতকে দু'টি দার্শনিক মতবাদ মুসলিম সুফী ও দার্শনিকদের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠে। ইমাম ইবনে তাইমীয়া কে এ ভ্রান্ত মতবাদ দু'টির বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করতে হয়। একটি হলো ওয়াহদাতুল উজুদ এবং অন্যটি হুলুল ও ইত্তেহাদ। আমাদের ভারতবর্ষের দার্শনিক পরিভাষায় এ মতবাদ দু'টিকে বলা হয় অদ্বৈতবাদ ও সর্বেশ্বরবাদ। পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশের সুফীদের মধ্যেও এ মতবাদ দু'টি প্রবেশ করে। আনন্দের বিষয় হলো, মুজাদ্দেদ আলফেসানী এই মতবাদ দু'টির বিরুদ্ধে প্রচন্ড সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। তবে অতি দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, ভারতবর্ষের সুফীদের মধ্যে আজও এই মতবাদ দু'টির উপস্থিতি প্রকটভাবে লক্ষ্য করা যায়।
এখন পাঠকগণ প্রশ্ন করতে পারেন, আসলে এই মতবাদ দু'টির ব্যাখ্যা কী? ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই মতবাদ দু'টির প্রধান প্রবক্তা মুহীউদ্দীন ইবনে আরাবীর উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন, অস্তিত্ব মাত্র একটি। সৃষ্টির অস্তিত্বই স্রষ্টার অস্তিত্ব। (নাউযুবিল্লাহ) তারা স্রষ্টা ও সৃষ্টি, এ দু'টো পৃথক সত্তা হিসাবে তারা স্বীকার করেনা। বরং তাদের মতে স্রষ্টাই হলো সৃষ্টি আর সৃষ্টিই হলো স্রষ্টা। তাদের মতে বনী ইসরাঈলের যারা বাছুর পূজা করেছিল, তারা আসলে আল্লাহকেই পূজা করেছিল (নাউযুবিল্লাহ)। তারা আরো বলে, ফেরাউনের "আনা রাব্বুকুমুল আ'লা” অর্থাৎ আমি তোমাদের মহান প্রভু, এই দাবীতে সত্যবাদী ছিল। ইবনে আরাবী নূহ আলাইহিস সাল্লামের সমালোচনা করে বলে যে, তার কাওমের লোকেরা মূর্তি পূজার মাধ্যমে আসলে আল্লাহকেই পূজা করেছিল (নাউযুবিল্লাহ)। আর তাঁর সময়ের মহাপ্লাবন ছিল মারেফতে ইলাহীর প্লাবন। এ প্লাবনে তারা ডুবে গিয়েছিল।
ইমাম ইবনে তাইমীয়া ওয়াহদাতুল উজুদ ও সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাসী মতবাদের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করাকে তাতারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
সৃষ্টি এবং স্রষ্টা কখনই এক হতে পারে না। আমরা মস্তিস্কের মধ্যে যা কল্পনা করি তার সবগুলোর অস্তিত্ব মস্তিস্কের বাইরে খুঁজে পাওয়া যায়না। আমার মাথায় দশহাত বিশিষ্ট এবং তিন মুখ বিশিষ্ট মানুষের কল্পনা জাগতে পারে। তার অর্থ এই নয় যে, বাস্তবে এই ধরণের মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। মস্তিস্কের বাইরে যেসব বস্তুর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলতঃ দুই প্রকার।
(১) সৃষ্টি ও (২) স্রষ্টা।
পৃথিবীতে এমন কোন জিনিস খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা এমনিতেই হয়ে গেছে। প্রত্যেক জিনিসের একজন উদ্ভাবক ও কারিগর রয়েছে। তাদের উভয়ের স্বভাব এবং বৈশিষ্ট এক ও অভিন্ন নয়। বরং কম্পিউটারের বৈশিষ্ট এবং যে উহা তৈরী করেছে, তার স্বভাব ও বৈশিষ্ট একরকম নয়। মহান আল্লাহ স্বীয় জ্ঞান, কুদরত এবং ইচ্ছা দ্বারা এই আসমান-যমীন ও এতোদুভয়ের মধ্যকার সকল বস্তু তৈরী করেছেন। সুতরাং তিনি এবং তাঁর তৈরী মাখলুক এক হয় কিভাবে? তাঁর সুউচ্চ সিফাত এবং সৃষ্টির সাধারণ স্বভাব ও বৈশিষ্ট এক রকম হয় কিভাবে?
আল্লাহ্ ব্যতীত বাকী সকল বস্তু হচ্ছে আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ “আল্লাহই আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবী এবং এ দুইয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে সব সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে এবং এরপর আরশে সমাসীন হয়েছেন তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবেনা?” (সূরা সাজদাহ ৩২:৪)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: ﴿بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنَّى يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ وَلَمْ تَكُنْ لَهُ صَاحِبَةٌ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ "তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। কিরূপে আল্লাহ্ পুত্র হতে পারে, অথচ তাঁর কোন সঙ্গিনী নেই? তিনি যাবতীয় কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সব বস্তু সম্পর্কে সুবিজ্ঞ। (সূরা আন'আম ৬:১০১)
বাস্তব কথা হচ্ছে, অস্তিত্ব একটি নয়; বরং দু'টি। একটি স্রষ্টার (আল্লাহর) অস্তিত্ব, আরেকটি সৃষ্টির অস্তিত্ব।
কুরআন ও সহীহ হাদীসে দিবালোকের মত পরিস্কার করে বলা আছে যে, মহান আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা, তিনি আরশের উপরে সমুন্নত, তার সুউচ্চ গুণাবলী সৃষ্টি জীবের গুণাগুণ, স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির সাথে মিশ্রিত নন, কোন সৃষ্টির ভিতরে নন; যেমন সুফীরা ধারণা করে থাকে। বরং তিনি সৃষ্টির বহু উপরে, সকল সৃষ্টি তার নীচে, তিনি আসমানের উপরে, আরশের উপর সমুন্নত। উপরে থাকাই আল্লাহর সত্তাগত সিফাত বা বিশেষণ।
দর্শন ও কালাম শাস্ত্রের প্রতিবাদ, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী এবং সমস্ত গায়েবী বিষয়ের উপস্থাপন:
কুরআন ও সুন্নাহয় আল্লাহর সত্তা, তাঁর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী, ফেরেশতা, আখেরাত ইত্যাদি গায়েবী বিষয়কে যে সহজ-সরল ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে, তা ইসলামের গৌরবময় যুগে মুসলিমদের বুঝতে কোন অসুবিধা হয়নি। রসূল ﷺ থেকে তারা বিষয়গুলো শুনে তা সহজভাবেই বুঝে নিয়েছেন এবং বিশ্বাস করেছেন। আর এ বিষয়গুলো বোধশক্তি ও যুক্তির মাধ্যমে বুঝার কোন সুযোগ নেই। অহীর উপর নির্ভর করা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই। সেই সাথে গায়েবী বিষয়গুলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
কিন্তু পরবর্তীতে যখন গ্রীক দর্শনের কিতাবাদি আরবীতে অনুবাদ করা হলো, তখন থেকেই ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারের উপর গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়তে থাকে। আব্বাসী খেলাফতকালে সরকারীভাবে এ কাজে উৎসাহ প্রদান করা হয়। ফলে মুসলিমদের লাইব্রেরীগুলো গ্রীক দর্শনের কিতাবে ভরপুর হয়ে যায়। মুসলিম বিদ্বানগণের গ্রীক দর্শনের দিকে ঝুকে পড়ে। ইসলামী আক্বীদার উপরও গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী, তাঁর কার্যাবলী, সৃষ্টির সূচনা ও সমাপ্তি, পরিণাম, কিয়ামাত, হাশর-নাশর, মানুষের আমলের ফলাফল এবং এ ধরণের অন্যান্য গায়েবী বিষয়গুলো জানার জন্য কুরআন-সুন্নাহর পথ ছাড়া আর কোন পথ নেই। চিন্তা-ভাবনা, আন্দাজ-অনুমান করে এ বিষয়গুলো জানা অসম্ভব। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর ধারে কাছে পৌঁছানো মানুষের বিবেক-বুদ্ধির পক্ষে সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মানুষের কোন অভিজ্ঞতাও নেই। এসব চোখেও দেখা যায়না। কুরআন সুস্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে,
ليس كمثله شيئ وهو السميع البصير
"কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা (সূরা শূরা ৪২:১১)"।
কাজেই এ বিষয়ে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম দার্শনিকরা কুরআন ও সুন্নাহর সহজ সরল উক্তিগুলো বাদ দিয়ে গায়েবী বিষয়গুলোর দার্শনিক ও বুদ্ধিভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান শুরু করে। তাদের জবাব দেয়ার জন্য আরেক শ্রেণীর মুসলিম আলেম দাঁড়িয়ে যান। তারাও দার্শনিকদের জবাবে বিভিন্ন যুক্তি- তর্ক উপস্থাপন করতে থাকেন। কিন্তু তাদের উপস্থাপিত যুক্তি-তর্ক দার্শনিকদের জবাবে বহুলাংশে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ তাদের যুক্তিগুলো ছিল দুর্বল। এগুলো সংশয় দূর করার বদলে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে এবং এমনসব জটিলতা, দুর্বোধ্যতা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার জবাব কালামশাস্ত্রবিদগণ খুজেঁ না পেয়ে তারা নিজেরাই সংশয়ে পড়েছে।
ইমাম রাযী শেষ বয়সে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, তিনি ইলমে কালাম, দর্শন শাস্ত্রের উপর অনেক চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করেছেন। শেষে তিনি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এর ফলে রোগীর রোগ নিরাময় হওয়ার চেয়ে আরো বৃদ্ধি পায়, এবং পিপাসার্তের পিপাসা মোটেই নিবারণ হয়না। তিনি বলেন, কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতিই আমি নিকটতর পেয়েছি।
আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর সত্তা ও গুনাবলী সম্পর্কে কালাম শাস্ত্রবিদ ও মুসলিম দার্শনিকগণ যে বুদ্ধিভিত্তিক যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন, ইমাম ইবনে তাইমীয়া তাতে মোটেই সন্তুষ্টি ছিলেন না। কারণ তার মোকাবেলায় কুরআন-সুন্নাহর যুক্তি-প্রমাণ অনেক সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ, দ্ব্যর্থহীন ও হৃদয়গ্রাহী।
তাই ইমাম ইবনে তাইমীয়া আল্লাহর সত্তা ও গুনাবলী এবং ঈমানের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে মুসলিমদের উপর যা আবশ্যক, কুরআন-সুন্নাহর দলীলের আলোকে তিনি অত্যন্ত পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয়ে তিনি একাধিক মূল্যবান কিতাব রচনা করেছেন এবং দার্শনিক কালামীদের কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেন। ওয়াসেতীয়া, তাদমুরীয়া এবং হাম্বলীয়া এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইমামের কারাবরণ:
যুগে যুগে যারা সত্য দ্বীনের খেদমতে নিজেদের জীবন ও যৌবন ব্যয় করেছেন, তাদের কেউই যুলুম-নির্যাতন থেকে রেহাই পান নি। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলামের নামে প্রচলিত ভ্রান্ত মতবাদের কঠোর প্রতিবাদ করার কারণে স্বার্থবাদী ও বিদ্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের স্বীকার হন। সর্বেশ্বর ও অদ্বৈতবাদীদের লোকেরা তাদের মতবাদ প্রচার করার সাথে সাথে প্রকাশ্যে মদ পান এবং সমস্ত হারাম কাজেই লিপ্ত হতো। কারণ তাদের মতানুযায়ী অস্তিত্ব যখন মাত্র একটি তখন হালাল হারামের পার্থক্য থাকবে কেন? শরীয়তেরই বাধ্যবাধকতা থাকবে কেন? তাদেরকে যখন বলা হলো এই বক্তব্য তো কুরআন-হাদীসের বিরোধী, তখন তারা বলল, কুরআন-হাদীসের দলীলের মাধ্যমে নয়; বরং কাশফের মাধ্যমে আমাদের বক্তব্য প্রমাণিত। মোটকথা কবরের উদ্দেশ্যে সফর করা, অলী-আওলীয়াদের উসীলা ধরা, তিন তালাকের মাসআ'লাসহ আরো অনেক কারণে ইমাম ইবনে তাইমিয়া হিংসুকদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। কুচক্রীরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। এক পর্যায়ে তারা সরকারের সহায়তা লাভে সমর্থ হয়। মিশরের তদানীন্তন শাসককে তারা ইমামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। আর তখন সিরিয়া ও মিশর ছিল একই রাষ্ট্রভূক্ত। রাজধানী ছিল মিশরের কায়রোতে। সিরিয়া ছিল মিশরের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ। তাই ষড়যন্ত্রকারীরা সহজেই সরকারকে প্রভাবিত করে ফেলে। তাদের প্ররোচনার ফলে শাহী ফরমানের মাধ্যমে ইমামকে কায়রোতে চলে যাবার নির্দেশ দেয়া হয়। ২২ রামাযান জুমু'আর দিন তিনি মিশরে পৌঁছেন। সেখানে পৌঁছে কেল্লার জামে মাসজিদে সলাত পড়ার পর তিনি আলোচনা শুরু করতে চান। কিন্তু তাঁর কিছু কিছু আক্বীদা-চিন্তা ইসলাম বিরোধী হওয়ার অভিযোগে তাকে কথা বলার অনুমতি না দিয়ে জনতাকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর কাযী ইবনে মাখলুফের নির্দেশে তাঁকে কেল্লার বরুজে কয়েকদিন আটক রাখার পর ঈদের রাতে মিশরের বিখ্যাত জুব কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
তাঁর কারাবরণের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ইতিহাসের কিতাবসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি বিভিন্ন মেয়াদে ২১বার কারা বরণ করেছেন। যতবারই তাঁর উপর চাপ প্রয়োগ করে অন্যায় স্বীকৃতি আদায় করার চেষ্টা করা হয়েছে ততবারই তিনি সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। শর্তসাপেক্ষ কারাগার থেকে বের হওয়ার সুযোগ তিনি একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জেলখানার ভিতরে তিনি দেখলেন কয়েদীরা নিজেদের মন ভুলাবার ও সময় কাটানোর জন্য আজে বাজে কাজ করছে। তাদের একদল তাস খেলছে। আরেকদল দাবা খেলায় মত্ত হয়ে পড়েছে। সলাতের দিকে তাদের কোন খেয়াল নেই। খেলার ঝোকে সলাত কাযা হয়ে যাচ্ছে। ইমাম এতে আপত্তি জানালেন, তাদেরকে সলাতের প্রতি আহবান জানালেন এবং আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশগুলো তাদের সামনে তুলে ধরলেন। তাদের পাপকাজগুলো সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করেন এবং তাদেরকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার উপদেশ দেন। কিছুদিনের মধ্যেই জেলখানার মধ্যে দ্বীনি ইলমের এমন চর্চা শুরু হয়ে গেল যে, সমগ্র জেলখানাটি একটি মাদরাসায় পরিণত হলো। অবস্থা এমন হলো অনেক কয়েদী মুক্তির ঘোষনা শুনেও আরো কিছুদিন শাইখের সংস্পর্শে থেকে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো।
মূলতঃ সুফীদের কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ করা, কবর ও মাযারের উদ্দেশ্যে সফর করা, তালাকের মাসআ'লা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি মাসআ'লা নিয়ে ইমামের সাথে বিরোধীদের দ্বন্ধের কারণেই তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়।
কারাগারে থেকেও ইমামের কর্মতৎপরতা:
সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকে যারা নিজেদের জীবনের লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করেছেন, তারা দুনিয়ার কোন বাধাকে বাধা মনে করেন না। অনুকূল- প্রতিকূল যে কোন পরিবেশেই তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। অনুকূল পরিবেশের আশায় তারা কাজ ও প্রোগ্রাম স্থগিত রেখে চুপচাপ বসে থাকেন না। দামেস্কের কারাগারে ইমাম ইবনে তাইমীয়া একই পন্থা অবলম্বন করলেন। ইবাদাত-বন্দেগী ও কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি তিনি কলমযুদ্ধ অব্যাহত রাখলেন। বিশেষ করে নিজের লেখা বইগুলোতে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি দিতে থাকলেন। জেলখানার ভিতরে তিনি যা লিখতেন এবং লোকদের প্রশ্নের যেসব জবাব দিতেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই কারাগারের দেয়াল ভেদ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তো। আস্তে আস্তে জেলের পরিবেশ তাঁর কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠলো। তিনি নিয়মিত লিখে যাচ্ছিলেন অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে। এক সময় তার কাছ থেকে দোয়াত-কলম, খাতাপত্র ও বই-পুস্তক ছিনিয়ে নেয়া হলো। এগুলো ছিনিয়ে নেয়ার পর জেলখানার ভিতর থেকে ছেড়া কাগজ সংগ্রহ করে কয়লা দিয়ে তার উপরই লিখা শুরু করলেন। এতেই বেশ কয়েকটি পুস্তিকা লিখা হয়ে গেল।
ইমামের উপর মিথ্যারোপ:
ইমামের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ ছিল, তার সবগুলোই ছিল মিথ্যা ও বানায়োট। সমকালীন স্বার্থান্বেষী মহল, এক শ্রেণীর সুফী সম্প্রদায়, কালামশাস্ত্রবিদ এবং বিদ'আতীরা শত্রুতার বশবর্তী হয়ে মনের জ্বালা মেটানোর জন্য এবং পার্থিব ফায়দা হাসিল করার জন্যই অভিযোগগুলো করেছিল। হকপন্থীদের বিরুদ্ধে বাতিলপন্থীদের মিথ্যা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। আজও চলছে সেই ধারাবাহিকতা। কিন্তু বিরোধী ও বিদ'আতীরা তাঁর উপর যেসব মিথ্যারোপ করেছে, তার মধ্যে আশ্চর্যজনক হলো বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার মিথ্যাচার। তিনি লিখেছেন, আমি ৭২৬ হিজরীর রামাযান মাসের নয় তারিখ বৃহস্পতিবার দিন দামেস্ক শহরে পৌঁছলাম। তখন দামেস্ক শহরে হাম্বলী আলেমদের মধ্যে তকীউদ্দীন ইবনে তাইমীয়া ছিলেন অন্যতম। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন, তবে তার মস্তিস্কে কিছু সমস্যা ছিল!! দামেস্কবাসীরা তাঁকে খুব সম্মান করতো। তিনি জামে উমুবীর মিম্বারে লোকদেরকে উপদেশ দিতেন। পরের দিন (জুমু'আর দিন) আমি মাসজিদে গিয়ে দেখি, তিনি আলোচনা করছেন। সেদিন তাঁর আলোচনার মধ্যে এটাও ছিল যে, তিনি বলে যাচ্ছিলেন, إن الله يتزل إلى سماء الدنيا كترولي هذا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন আমার এই নামার মতই"। এই কথা বলে তিনি মিম্বারের সিঁড়িসমূহের একটি সিঁড়িতে নেমে আসলেন। তখন মালেকী মাযহাবের ফকীহ ইবনে যাহরা তার বিরোধীতা করলেন। এতে জনগণ উত্তেজিত হয়ে মালেকী ফকীহকে প্রচুর মারপিট করলো। মারপিটের কারণে ফকীহর মাথার পাগড়ী পড়ে গেল......। এই ছিল ইবনে বতুতার মিথ্যাচার।
ইবনে বতুতার এই কথা যে মিথ্যা, তার প্রমাণ হলো, সে উল্লেখ করেছে, ৭২৬ হিজরীর রামাযান মাসের নয় তারিখে দামেস্কে প্রবেশ করল। ঐতিহাসিকদের ঐক্যমতে শাইখুল ইসলাম তখন দামেস্কের কারাগারে বন্ধী ছিলেন। নির্ভরযোগ্য আলেমগণ উল্লেখ করেছেন, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া ৭২৬ হিজরীর শাবান মাসে কারাগারে প্রবেশ করেছেন। আর ৭২৮ হিজরী সালের যুলকাদ মাসে লাশ হয়ে সেখান থেকে বের হয়েছেন। (দেখুন: তাবাকাতুল হানাবেলা, বিদায়া ওয়ান নিহায়া ইত্যাদি)
প্রিয় পাঠক বৃন্দ! লক্ষ্য করুন এই মিথ্যুকের প্রতি। সে বলছে যে, রামাযান মাসের কোন এক জুমু'আর দিন ইমামকে জামে উমুবীর মিম্বারে আলোচনা করতে দেখল। এখন প্রশ্ন হলো জামে উমুবীর মিম্বার কি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছিল? বিশাল জামে উমুবী কি উপস্থিত সকল মানুষসহ কারাগারে প্রবেশ করেছিল? যাতে করে ইমাম সেখানে ভাষণ দিতে পারেন?
এখন কথা হলো, যারা বলে ইমাম ইবনে তাইমীয়া আল্লাহর সিফাতকে মানুষের সিফাতের সাথে তুলনা করেছেন এবং তিনি ছিলেন মুশাব্বেহা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত তারা কি ইবনে বতুতার সেই মিথ্যা তথ্যের উপর নির্ভর করেছে?
আসল কথা হলো ইমাম কখনোই আল্লাহর কোন সিফাতকে মানুষের সিফাতের সাথে তুলনা করেন নি; বরং তিনি মুশাব্বেহাসহ অন্যান্য সকল বাতিল ফির্কার জোরালো প্রতিবাদ করেছেন। তার লেখনীগুলোই এর উজ্জল প্রমাণ। তিনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন তাঁর সুউচ্চ সিফাতগুলো সৃষ্টির সিফাতের মত নয়। দুনিয়ার আকাশে তাঁর নেমে আসা মাখলুকের নামার মত নয়। তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার শানে যেভাবে নেমে আসা শোভনীয়, তিনি সেভাবেই নেমে আসেন। এটিই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা। আক্বীদা আল ওয়াসেতীয়ার বহু স্থানে তিনি এই মূলনীতিটি সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْئٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِير "তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা"।
ইমামের সুপরিসরে ইলমী খেদমত:
ইমাম ইবনে তাইমীয়া এর স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি স্মরণশক্তির উপর নির্ভর করেই লিখতেন। জেলখানায় ঢুকিয়েও যখন তাঁকে লেখালেখি থেকে বিরত রাখা সম্ভব হলোনা, তখন তাঁর নিকট থেকে দোয়াত-কলম ও বই-পুস্তক ছিনিয়ে নেয়া হলো। বই-পুস্তক ছিনিয়ে নেয়ার পর তিনি স্মরণশক্তির উপর ভিত্তি করেই লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর লিখিত গ্রন্থাদির সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা অসম্ভব। নিম্নে আমরা তাঁর কয়েকটি বহুল প্রসিদ্ধ কিতাবের নাম উল্লেখ করছি।
(১) মাজমু'আয়ে ফাতাওয়া ইবনে তাইমীয়া, এটি শাইখের সর্ববৃহৎ সংকলন, সৌদি আরব সরকার ৩৭ খন্ডে এটিকে ছাপিয়েছে,
(২) আল আক্বীদাতুল ওয়াসেত্বীয়া,
(৩) আল-ফুরকানু বাইনা আওলিয়াইর রহমান ওয়া আওলিয়াইশ শাইতান,
(৪) আলকালিমুত তাইয়্যিব, (৫) মিনহাজুস সুন্নাহ আন নাবুবীয়াহ, (৬) যিয়ারাতুল কুবুর, (৭) শরহুল উমদাহ, (৮) আল জাওয়াবুস সহীহ, (৯) রিসালাতুদ তাদমুরীয়াহ, (১০) রিসালাতুল হামবীয়া, (১১) মুকাদ্দিমাহ ফীত্ তাফসীর, (১২) ইক্তেযাউস্ সিরাতিল মুস্তাকীম, (১৩) আর্ রাদ্দু আলা ইবনে আরাবী, (১৪) আস্ সিয়াসা আশ্ শারঈয়াহ এবং (১৫) আলউ-বুদীয়াহ। এছাড়া দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আরো অনেক মূল্যবান কিতাব রয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে পাঠকদেরকে মাকতাবাতুস শামেলার দ্বারস্থ হওয়ার অনুরোধ করা হলো।
পরলোকের পথে যাত্রা:
ইমামের বয়স শেষ হয়ে আসছিল। এমন সময় একদিন দামেস্কের গভর্ণর কারাগারে ইমামকে দেখতে আসলেন। গভর্ণর তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলেন। জবাবে ইমাম বললেন: আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি তাদেরকেও ক্ষমা করে দিয়েছি, যারা আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করেছে। সুলতানের বিরুদ্ধেও আমার কোন অভিযোগ নেই। কারণ তিনি স্বেচ্ছায় নয়; বরং উলামায়ে কেরামের ফতোয়ার কারণেই আমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছেন। কিন্তু আমি ঐসব লোকদেরকে ক্ষমা করতে পারিনা, যারা আল্লাহ ও রাসূলের শত্রু। সত্য দ্বীনের প্রতি আক্রোশের কারণে যারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে এবং আমাকে কারারুদ্ধ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করেছে।
৭২৮ হিজরীর ২২ যুলকাদ মাসে ৬৭ বছর বয়সে উপনীত হয়ে দামেস্কের কারাগারে মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এ সময় তাঁর কাছেই ছিলেন। দুর্গের মুআযযিন মাসজিদের মিনারে উঠে ইমামের মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করেন। মুহূর্তের মধ্যে শহরের সমস্ত মাসজিদে অলিতে-গলিতে, রাজপথে এবং সর্বত্রই ইমামের মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হলো। শেষবারের মত ইমামকে দেখার জন্য দুর্গের পথে জনতার ঢল নামলো। দুর্গের দরজা খুলে দেয়া হলো। গোসলের পর তাঁর জানাযা শহরের বৃহত্তম মাসজিদ জামে উমুবীতে আনা হয়। জামে উমুবী এবং রাজপথ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। ঐতিহাসিকদের মতে ইতিপূর্বে ইসলামী বিশ্বে আর কোথাও এত বড় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়নি।
সালাফদের মানহাজের পক্ষে দীর্ঘ সংগ্রাম, যুক্তি-তর্ক, লেখালেখি, ফতোয়া দান, শিক্ষকতা, দাওয়াত এবং আল্লাহর রাস্তায় সর্বোত্তম জিহাদ করে এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এভাবেই চলে গেলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। দ্বীনের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে পার্থিব জীবনের স্বাদ উপভোগ করার সুযোগ পান নি। এমনকি বিবাহ করার সুযোগও পাননি।
ইমাম ইবনে তাইমীয়া চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর চরিত্র, বৈশিষ্ট এবং দ্বীনের পথে তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা আমাদের আজকের আলেম সমাজকে সজাগ করবে, প্রেরণা যোগাবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। দ্বীনের ব্যাপারে যাতে কোন বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়, এজন্য তিনি নিজের ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধা ও আরাম-আয়েশ বিসর্জন দেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন সয়ে যেতে প্রস্তুত হন, দ্বীনের উপর কোন প্রকার যুলুম বরদাশত করতে তিনি মুহূর্তকালের জন্যও প্রস্তুত হননি।
হে আল্লাহ! তুমি তোমাদের দ্বীনের অতন্ত্র প্রহরী, সেবক ও মর্দে মুজাহিদ আমাদের প্রাণের শাইখকে তোমার রহমতের প্রশস্ত চাদর দ্বারা ঢেকে নাও, তোমার সুবিশাল জান্নাতে তাঁর ঠাই করে দাও এবং নাবী, সিদ্দীক, শুহাদা ও সালেহীনদের সংশ্রবে জান্নাতুল ফিরদাউসে পৌঁছে দাও। আমাদেরকেও তাদের সাথে কবুল করে নাও। আমীন

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 বিসমিল্লাহর ব্যাখ্যা

📄 বিসমিল্লাহর ব্যাখ্যা


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পরম করুণাময় এবং দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া আল্লাহ তা'আলার কিতাবের অনুসরণ করে বিস্মিল্লাহ দ্বারা পুস্তকটি লিখা শুরু করেছেন। সূরা তাওবা ব্যতীত প্রত্যেক সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ লিখা রয়েছে। বিসমিল্লাহ দ্বারা শুরু করার মাধ্যমে নাবী ﷺ এর সুন্নাতেরও অনুসরণ করা হয়েছে। নাবী যখন রাজা-বাদশাহদের কাছে পত্র লিখতেন তখন শুরুতে বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম লিখতেন।
বিস্মিল্লাহ )بسم الله( : এখানে با হরফে জারটি استعانة )ইস্তেআনা) তথা সাহায্য প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। আভিধানিক অর্থে যে শব্দ কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রদান করে, তাকে ইসম বলা হয়। আরবী ব্যাকরণ বিদদের পরিভাষায় যে শব্দ কোন কালের সাথে যুক্ত না হয়েই সরাসরি নিজের অর্থ প্রকাশ করে, তাকে اسم )ইসম) বলা হয়।
حر )জার) এবং محرور মাজরুর মিলে একটি উহ্য বিষয়ের সাথে متعلق (সম্পৃক্ত) হয়েছে। সেই উহ্য বিষয়টি 'আল্লাহ' শব্দের পরে হওয়া উচিত। যাতে করে এটি 'হাসর' তথা সীমিত অর্থ প্রদান করে। অর্থাৎ অর্থটি যেন এমন হয় যে, আমি আল্লাহর নামেই শুরু করছি, অন্য কারো নামে নয় এবং তাঁর কাছেই কাজটি সম্পাদনের ব্যাপারে সাহায্য চাচ্ছি, অন্য কারো কাছে নয়।
কেউ কেউ বলেছেন: এখানে উহ্য শব্দটি হচ্ছে فعل বা ক্রিয়া। অর্থাৎ بسم الله أقرأ أو أكتب "আমি আল্লাহর নামে পড়ছি বা লিখছি। এমনি যখন যে কাজ শুরু করা হবে, তখন সেই কাজের অর্থবোধক একটি فعل )ক্রিয়া( উহ্য থাকবে।
আবার কেউ কেউ মাসদার উহ্য মেনে থাকেন। অথাৎ بسم الله ابتدائي তথা আল্লাহ তা'আলার নামেই আমার শুরু।
আল্লাহ (الله) : শব্দটি মহান পবিত্র সত্তার জন্য নির্দিষ্ট একটি নাম। এর অর্থ হচ্ছে, তিনিই সমস্ত মাখলুকের ইবাদাত ও উলুহীয়াতের একমাত্র অধিকারী ও হকদার। এই মহান নামটি أله يأله ألوهة থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে عُبَدَ يُعْبَدُ عبادة অর্থাৎ তার ইবাদাত ও দাসত্ব করা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহই একমাত্র সত্য ইলাহ বা মাবুদ।
আর্ রহমান আর রহীম (الرَّحْمَنِ الرَّحِيم): আল্লাহ্ তা'আলার পবিত্র ও অতি সুন্দর নাম সমূহের মধ্য হতে রহমান ও রহীম দু'টি সম্মানিত নাম। এই নাম দু'টি প্রমাণ করে, যেমন রহমত আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়, তিনি তেমন রহমত ও দয়ার গুণেই গুণান্বিত।
আল্লাহ্ তা'আলার الرحمن 'রহমান' নামটি সমস্ত সৃষ্টির উপর তাঁর ব্যাপক রহমতের প্রমাণ বহন করে। আর الرحيم 'রহীম' নামটির মধ্যে এমন রহমত রয়েছে, যা শুধু মুমিনদের জন্যই নির্দিষ্ট। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا “এবং তিনি মুমিনদের প্রতি খুবই দয়াবান” (সূরা আহযাব ৩৩:৪৩)।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়ার প্রাথমিক খুতবা

📄 শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়ার প্রাথমিক খুতবা


ভূমিকা শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
الحمد لله الذي أرسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له إقرارا به وتوحيدا وأشهد أن محمدا عبده ورسوله صلى الله عليه وعلى آله وصحبه وسلم تسليما مزيدا
“সেই আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা, যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন। যেন তাকে সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন। আর এ সম্পর্কে আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য মাবুদ নেই। তাঁর কোন শরীক নেই। আমি তাওহীদের এই স্বীকৃতি প্রদান করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি।
আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহ তা'আলার বান্দা এবং তাঁর রসূল। আল্লাহ তাঁর উপর, তাঁর পরিবার এবং তাঁর সাহাবীদের উপর অপরিমিত সালাত ও শান্তির ধারা বর্ষণ করুন।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া º এই মূল্যবান কিতাবটি আল্লাহর প্রশংসা, তাওহীদ, রেসালাতের সাক্ষ্য এবং রসূল ﷺ উপর সালাত ও সালাম পেশ করার মাধ্যমে শুরু করেছেন।
এর মাধ্যমে তিনি রসূল ﷺ সুন্নাতের অনুসরণ করেছেন। কেননা রসূল ﷺ তাঁর সকল আলোচনা ও ভাষণ আল্লাহর প্রশংসা, তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য এবং তাঁর নিজের প্রতি সলাত ও সালাম পেশ করার মাধ্যমেই শুরু করতেন। সেই সাথে শাইখুল ইসলাম নাবী ﷺ ঐ হাদীসের উপরও আমল করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন:
كُلُّ أَمْرِ ذِي بَالِ لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِحَمْدِ اللَّهِ، فَهُوَ أَقْطَعُ »
"প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ যেই কাজ আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা দিয়ে শুরু করা হয় না, তা বরকতশূণ্য।
ইমাম আবু দাউদ এবং অন্যান্য ইমামগণ এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।১
অন্য বর্ণনায় আল্লাহর প্রশংসার স্থলে বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম এসেছে।২
أقطع শব্দের অর্থ হচ্ছে বরকতশূণ্য হওয়া ও বরকত থেকে খালী হওয়া। হাদীসের এই উভয় বর্ণনাকে এইভাবে একত্রিত করা যেতে পারে যে, বিসমিল্লাহ দ্বারা শুরু করা হচ্ছে হাকীকী। আর আল-হামদুলিল্লাহ দ্বারা শুরু করা হচ্ছে নিসবী ইযাফী।৩
الحمد لله: এখানে আলিফ লাম ইস্তেগরাক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সকল প্রশংসার একমাত্র মালিক এবং হকদার হচ্ছেন আল্লাহ তা'আলা।
الحمد প্রশংসা: শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, উত্তম গুণাবলী ও ভাল কর্মের প্রশংসা করা। আর ইসলামের পরিভাষায় হামদ এমন কাজের নাম, যার মাধ্যমে নিয়ামত প্রদানকারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ঘোষণা করে। এটি ০১ (নিন্দার) বিপরীত অর্থবোধক শব্দ।
لله আল্লাহ: একটু পূর্বে আল্লাহর সম্মানিত এই নামের ব্যাখ্যা সংক্ষিপ্তভাবে অতিক্রান্ত হয়েছে।
الذي أرسل رسوله যিনি তাঁর রসূলকে পাঠিয়েছেন: অগণিত নেয়ামতের কারণে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করা আবশ্যক। আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলা যত নেয়ামত দিয়েছেন, তার মধ্যে সর্বাধিক বড় নেয়ামত হচ্ছে তিনি তাঁর রসূল মুহাম্মাদ আমাদের জন্য প্রেরণ করেছেন।
الرسول রসূল: আভিধানিক অর্থে রসূল এমন পুরুষ ব্যক্তিকে বলা হয়, যাকে রিসালাত তথা বার্তাসহ পাঠানো হয়। আর ইসলামী শারীয়াতের পরিভাষায় এমন পুরুষকে রসূল বলা হয়, যার প্রতি কোন একটি আসমানী শারীয়াতের অহী পাঠানো হয়েছে এবং তাকে সেই শারীয়াতের তাবলীগ করার আদেশ প্রদান করা হয়েছে।
الهدى হেদায়াত: হেদায়াত হচ্ছে উপকারী ইলম। আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে নাবী যেসব সত্য খবর, কল্যাণকর আদেশ-নিষেধ এবং অন্যান্য উপকারী বিধানমালা নিয়ে এসেছেন, তার সবগুলোই হেদায়াতের মধ্যে শামিল।
হেদায়াতের প্রকারভেদ: হেদায়াত শব্দটি দেখিয়ে দেয়া ও বর্ণনা করা অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থেই আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَأَمَّا ثَمُودُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمَى عَلَى الْهُدَى ﴾ "আর আমি সামূদ জাতির সামনে হেদায়াত পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা পথ দেখার চেয়ে অন্ধ হয়ে থাকা পছন্দ করলো" (সূরা হামীম সাজদাহ ৪১:১৭)। সুতরাং এই কাজ অর্থাৎ সঠিক রাস্তা দেখানো রসূলদের কাজ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ निश्चयই তুমি সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করো”। (সূরা শুরা ৪২:৫২)
হেদায়াতের দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে সঠিক পথ কবুল করার তাওফীক দেয়া এবং ইলহাম করা। এটি কোন রসূল করতে পারেন না। বরং আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কেউ এটি করতে সক্ষমও নয়। নিম্নের আয়াতে এই প্রকার হেদায়াতের বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ﴾ "হে নাবী! তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়াত দান করতে পারবে না; কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত করেন (সূরা কাসাস: ৫৬)।
دین الحق সত্য দ্বীন: এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সৎ আমল। দ্বীন শব্দটি কখনো সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়; কিন্তু এর দ্বারা প্রতিদান ও বিনিময় উদ্দেশ্য হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ "প্রতিদান দিবসের মালিক" (সূরা ফাতিহা ১:৪)।
আবার কখনো সাধারণভাবে ব্যবহৃত হলেও এর দ্বারা ইবাদাত করা (বশ্যতা স্বীকার ও নত হওয়া) উদ্দেশ্য হয়। দ্বীনকে হকের দিকে সম্বোধিত করা মাওসুফকে সিফাতের দিকে এযাফতের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ মূলতঃ الدين الحق ছিল। الحق শব্দটি حق يحق -এর মাসদার। এর অর্থ সুসাব্যস্ত হয়েছে, সত্যে পরিণত হয়েছে, আবশ্যক হয়েছে। হকের বিপরীত হচ্ছে বাতিল।
لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ যাতে তিনি সকল দ্বীনের উপর সত্য দ্বীনকে বিজয়ী করেন: অর্থাৎ যাতে আল্লাহ তা'আলা দলীল-প্রমাণ, সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং জিহাদের মাধ্যমে এই দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর সমুন্নত করেন এবং পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্য হতে যারা এই দ্বীনের বিরোধীতা করবে, তাদের উপর তিনি এই দ্বীনকে বিজয়ী করবেন। চাই তারা আরব হোক কিংবা অনারব হোক অথবা অন্য কোন দ্বীনের অনুসারী হোক। আল্লাহর এই ওয়াদা বাস্তবায়ন হয়েছে। মুসলিমগণ আল্লাহর রাস্তায় উত্তমভাবে জিহাদ করেছেন। এতে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিজয় দান করেছেন। এর মাধ্যমে ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমানা সুপ্রশস্ত হয়েছে। পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমসহ সকল দিকেই এই দ্বীন ছড়িয়ে পড়েছে।
وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا সাক্ষ্য হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তাঁর রসূলকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন। আল্লাহই এর সাক্ষী। তিনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল। তিনি তাঁর রসূলের সকল অবস্থা ও কর্ম সম্পর্কে অবগত এবং শত্রুদের মোকাবেলায় তিনি তার সাহায্যকারী। আল্লাহ তাঁর রসূলকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দাওয়াতকে শক্তিশালী করে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এতে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মুহাম্মাদ ছিলেন আল্লাহর সত্য রসূল। তিনি যদি মিথ্যুক হতেন, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে পৃথিবীতেই তাড়াতাড়ি কঠিন শাস্তি দিতেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيل * لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ * ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ
"যদি এ নাবী নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম”। (সূরা আল হাক্কাহ ৬৯:৪৪-৪৬)
وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য মাবুদ নেই: অর্থাৎ আমি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করার পর জবান দিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদান করছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সত্য মাবুদ নেই।
وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই: 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র সাক্ষ্য প্রদানের মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক যে অর্থ রয়েছে, এই শব্দ দু'টির মধ্যে তারই তাগীদ (গুরুত্ব) রয়েছে। অর্থাৎ وَحْدَهُ لَا شَريكَ لَهُ -এর মাধ্যমে তাওহীদের সাক্ষ্য প্রদানের মর্মার্থকে শক্তিশালী করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সকল মাবুদ হতে উলুহীয়াতকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং শুধু আল্লাহর জন্যই তাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং وحده )তিনি এক) এটি হচ্ছে ইছবাত তথা ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্যই, এই কথার তাগীদ। لا شريك له তাঁর কোন শরীক নেই, এটি হচ্ছে নাফীর জন্য তাগীদ স্বরূপ।
إِقْرَارًا بِهِ وَتَوْحِيدًا এ শব্দ দু'টি হলো মাসদার। এ দু'টি শব্দ পূর্বোক্ত তাওহীদের সাক্ষ্য وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ -এর মর্মার্থকে শক্তিশালী করেছে।
অর্থাৎ আমি জবানের মাধ্যমে বলিষ্ঠ ভাষায় তাওহীদের স্বীকারোক্তি প্রদান করছি এবং আমার প্রতিটি ইবাদাতকে আল্লাহর জন্য খালেস (আন্তরিকতার সাথে) করছি। চাই সে ইবাদাত মুখের কথার মাধ্যমে হোক কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলের মাধ্যমে হোক অথবা অন্তরের বিশ্বাসের মাধ্যমে হোক।
وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসূল:
অর্থাৎ আমি অন্তর দ্বারা বিশ্বাস করছি এবং জবানের মাধ্যমে স্বীকার করছি যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দা মুহাম্মাদ ﷺ সমস্ত মানুষের নিকট রসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। রসূলের রেসালাতের এই সাক্ষ্যকে আল্লাহ তা'আলার তাওহীদের সাক্ষ্য প্রদানের সাথে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন। এ দু'টি সাক্ষ্য প্রদানের একটি অন্যটির পক্ষ হতে যথেষ্ট নয়। মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসূল, এই কথার দ্বারা আহলে ইফরাত তথা রসূলকে নিয়ে বাড়াবাড়িতে লিপ্তদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সেই সাথে আহলে তাফরীত অর্থাৎ রসূল ﷺ দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান কারীদের এবং তা থেকে যারা এমনভাবে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, যাতে মনে হয় তিনি আল্লাহর রসূলই নন, এর মাধ্যমে তাদেরও প্রতিবাদ করা হয়েছে। সুতরাং তিনি আল্লাহর বান্দা, এই সাক্ষ্য তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করাকে এবং তাঁর নিজস্ব মর্যাদার উপরে উঠানোকে অস্বীকার করেছে।
মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রসূল, এই সাক্ষ্য দেয়ার দাবী হচ্ছে, তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করা, তিনি যে আদেশ করেছেন, তাতে তাঁর আনুগত্য করা, তিনি যেই সংবাদ দিয়েছেন তা সত্যায়ন করা, তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর পক্ষ হতে তিনি যেই শারীয়ত নিয়ে এসেছেন, তাতে কেবল তাঁরই অনুসরণ করা।
صلى الله عليه وعلى آله وسلم تسليما مزيدًا পরিবার এবং সাহাবীদের উপর অপরিমিত শান্তির ধারা বর্ষণ করুন: সলাত শব্দের আভিধানিক অর্থ দু'আ। আল্লাহর পক্ষ হতে রসূল ﷺ এর উপর সলাত পেশ করার অর্থ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ হলো, যা ইমাম বুখারী আবুল আলীয়া হতে স্বীয় সহীতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আল্লাহ তা'আলা তাঁর রসূল ﷺ এর উপর দুরূদ পেশ করেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ তা'আলা নৈকট্যশীল ফেরেশতাদের কাছে রসূলের প্রশংসা করেন।
وعلى آله তাঁর পরিবারের উপর: কোন ব্যক্তির 'আল' বলতে ঐ সমস্ত লোককে বুঝানো হয়, যারা তার সাথে আত্মীয়তার মজবুত বন্ধনে বা অন্য কোন গভীর সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ। রসূল ﷺ এর'আল' দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? এ বিষয়ে একাধিক মত রয়েছে। তার মধ্যে সর্বোত্তম মত হচ্ছে, এখানে 'আল' দ্বারা ঐ সমস্ত লোক উদ্দেশ্য, যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ করে।
وأصحابه এবং তাঁর সাহাবীগণের উপর: أصحاب শব্দটি صاحب শব্দের বহুবচন। অর্থাৎ সাহাবীগণ। এখানে আমের (ব্যাপকার্থবোধক শব্দের) উপর খাসকে (নির্দিষ্ট অর্থবোধক শব্দকে) আতফ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে 'আল' উল্লেখ করা হয়েছে। 'আলে'র মধ্যে রসূল ﷺ এর সাহাবী এবং পরবর্তীতে যারা আগমন করবে ও তাঁর দ্বীন পালন করবে তারাও শামিল।
যেই মুসলিম ঈমানদার অবস্থায় নাবী ﷺ কে দেখেছেন এবং ঈমানদার অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন, তিনিই হলেন সাহাবী।
وسلم تسليمًا مزيدًا আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাবীর উপর অগণিত সালাম বর্ষণ করুন: سلام (সালাম) শব্দটি ইসলামের অভিবাদন, সম্মান, শ্রদ্ধা এবং শুভেচ্ছা প্রদান অর্থে ব্যবহৃত হয়। অথবা সালাম অর্থ মুক্ত ও নিরাপদ হওয়া। অর্থাৎ সকল ত্রুটি ও মন্দ স্বভাব থেকে মুক্ত হওয়া। مزيدا শব্দটি زيادة ক্রিয়ামূল হতে ইসমে মাফউল। 'যিয়াদাহ' অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি হওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا )
"আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নাবীর প্রতি সলাত পেশ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সলাত ও সালাম পাঠাও (সূরা আহযাব ৩৩:৫৬)।" ৪ আল্লাহ তা'আলার এ বাণীর অনুসরণ করতে গিয়ে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে সলাত ও সালামকে একসাথে উল্লেখ করেছেন।

টিকাঃ
১. তবে হাদীসের সনদ দুর্বল। দেখুন: সুনানে আবু দাউদ ৪৮৪০।
২. তবে হাদীসের সনদ খুবই দুর্বল। দেখুন: ইরওয়াউল গালীল ১।
৩. কিতাব লিখার শুরুতে সর্বপ্রথম যা দিয়ে শুরু করা হয় এবং যার পূর্বে অন্য কিছু থাকে না তাকে ইবতেদায়ে হাকীকী প্রকৃত প্রথম বা শুরু বলা হয়। আর যার পূর্বে অন্য কিছু থাকে, তাকে ইবতেদায়ে নিসবী ইযাফী বা তুলনামূলক প্রথম বা শুরু বলা হয়।
৪. আভিধানিক দিক থেকে সলাত শব্দটি দু'আ অর্থে ব্যবহৃত হলেও ব্যবহারের স্থান অনুযায়ী সলাতের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। আল্লাহর পক্ষ হতে নাবী-রসূল কিংবা সৎ বান্দাদের প্রতি সলাত অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের নিকট তাঁর নাবীর ও সৎবান্দাদের প্রশংসা করেন, তাদের নাম বুলন্দ করেন, তাদের কাজে বরকত দেন এবং তাদের প্রতি নিজের রহমত বর্ষণ করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا
"তিনিই তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতারা তোমাদের জন্য দু'আ করেন, যাতে তিনি তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর মধ্যে নিয়ে আসেন, তিনি মুমিনদের প্রতি বড়ই মেহেরবান" (সূরা আহযাব ৩৩:৪৩)।
সলাত শব্দটি ফেরেশতাদের পক্ষ হতে আল্লাহর নাবীর জন্য ব্যবহৃত হলে অর্থ হবে তারা আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দু'আ করেন। আল্লাহ যেন তাকে সর্বাধিক উচ্চ মর্যাদা দান করেন, তার শারীয়াতকে প্রসার ও বিস্তৃতি দান করেন এবং একমাত্র তাকে মাকামে মাহমুদ তথা সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থানে পৌঁছিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নাবীর প্রতি দুরূদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দুরূদ ও সালাম পাঠাও” (সূরা আহযাব: ৫৬)।
আর ফেরেশতাদের পক্ষ হতে সাধারণ মুমিনদের জন্য যখন সলাত শব্দটি ব্যবহৃত হবে, তখনও এর দ্বারা মুমিনদের জন্য ফেরেশতাদের দু'আ ও মাগফিরাত কামনা উদ্দেশ্য।
আর সলাত শব্দটি যদি এক মুমিনের পক্ষ হতে অন্য মুমিনের জন্য ব্যবহৃত হয়, তখনও এর দ্বারা দু'আ উদ্দেশ্য হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنَّ لَّهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"হে নাবী! তাদের ধন-সম্পদ থেকে যাকাত নিয়ে তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করো এবং তাদের জন্য রহমতের দু'আ করো। তোমার দু'আ তাদের সান্তনার কারণ হবে। আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন" (সূরা তাওবা: ১০৩)।
আর সলাত শব্দটি যখন বান্দার পক্ষ হতে আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হবে তখন এর দ্বারা মুসলিমদের নিকট পরিচিত সেই ইবাদাত উদ্দেশ্য হবে, যা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়মে কতিপয় কাজ ও কথার মাধ্যমে সম্পদিত হয়। এর শুরু তাকবীরে তাহরীমাহ দ্বারা এবং শেষ হয়। সালামের দ্বারা। আল্লাহ তা'আলা বলেন فَصَلِّ يُربِّكَ والحر "কাজেই তুমি নিজের রবের জন্যই সলাت সম্পাদন করো এবং তাঁর জন্যই কুরবানী করো” (সূরা কাওছার: ২)।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল

📄 ফিরক্বাতুন নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল


অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: أَمَّا بَعْدُ فَهَذَا اعْتِقَادُ الْفِرْقَةِ النَّاحِيَةِ الْمَنْصُورَةِ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ
অতঃপর এই হচ্ছে কিয়ামাত পর্যন্ত আগমনকারী মানুষদের মধ্য হতে নাজাত ও সাহায্য প্রাপ্ত দল
ব্যাখ্যা: বাক্যের এক রীতি থেকে অন্য রীতিতে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় আরবী ভাষায় أما بعد ব্যবহার করা হয়। ভাষণ দেয়ার সময় এবং চিঠি লিখার সময় রসূল এর সুন্নাতের অনুসরণ করে أما بعد ব্যবহার করা সুন্নাত। নাবী খুতবা দেয়া এবং চিঠি লিখার সময় 'আম্মা বা'দ' ব্যবহার করতেন।
এই কিতাবটি সংক্ষিপ্তভাবে ইসলামী আক্বীদা ও ঈমানের যেসব বিষয়কে শামিল করেছে, শাইখুল ইসলাম ইসমে ইশারার মাধ্যমে সে দিকেই ইংগিত করেছেন। শাইখুল ইসলাম هو الإيمان بالله..... الخ দ্বারা আক্বীদার বিষয়গুলোর বর্ণনা শুরু করেছেন।
اعتقاد শব্দটি বাবে ইফতিআলের মাসদার (ক্রিয়ামূল)। বলা হয় اعتقد کذا সে এ রকম আক্বীদা গ্রহণ করেছে। ইহা ঠিক ঐ সময়ই বলা হয়, যখন কেউ কোন বিষয়কে তার নিজের আক্বীদা হিসাবে গ্রহণ করে। আর যে বিষয়ের সাথে মানুষ তার অন্তরের বন্ধন তৈরী করে উহাকে আক্বীদা বলা হয়। যেমন আপনি বলে থাকেন اعتقدت عليه القلب والضمير "আমি এই বিশ্বাসের উপর অন্তর-মনকে বেধে দিয়েছি। আক্বীদা শব্দটি আরবদের কথা عقد الحبل إذا ربطه থেকে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সে তাকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখল। এই কথা ঠিক ঐ সময় বলা হয়, যখন সে কোন জিনিসকে রশি দিয়ে বেধে রাখে। অতঃপর এই শব্দটি অন্তরের বিশ্বাস ও সুদৃঢ় সংকল্পের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
ফিকাহ অর্থ হচ্ছে দল ও জামা'আত। নাজী ফির্কা ঐ জামা'আতকে বলা হয়, যারা দুনিয়া ও আখেরাতে ধ্বংস ও অকল্যাণ থেকে রেহাই পাবে। তাদের বৈশিষ্ট্য রসূল ﷺ এর এই হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন:
وَلَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لَا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ عَزَّ وَجَل
"আমার উম্মাতের একটি দল সব সময় হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যে সমস্ত লোক তাদেরকে পরিত্যাগ করবে তারা কিয়ামাত পর্যন্ত সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না”।৫
المنصورة সাহায্যপ্রাপ্ত: অর্থাৎ তারা কিয়ামাত পর্যন্ত তাদের বিরোধীদের উপর আল্লাহর সাহায্য ও মদদ পেয়ে শক্তিশালী থাকবে। এখানে 'কিয়ামাত পর্যন্ত' কথাটির মর্ম হচ্ছে কিয়ামাতের আগে যেই বাতাস এসে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তির রূহ কবয করবে, সেই বাতাস থেকে উদ্দেশ্য হল এ বাতাসই হবে সেই সময়ের মুমিনদের জন্য কিয়ামাত স্বরূপ।
আর যেই কিয়ামাতের দিন দুনিয়ার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে, তা কেবল নিকৃষ্টতম লোকদের উপরই কায়েম হবে। যেমন সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নাবী বলেন:
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ اللَّهُ اللَّهُ যতদিন পৃথিবীতে আল্লাহ আল্লাহ বলা হবে, ততদিন কিয়ামত হবে না।৬
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ হাকিম আব্দুল্লাহ ইবনে আমর হতে বর্ণনা করেন যে, রসূল বলেছেন:
يَبْعَثُ اللَّهُ رِيحًا كَرِيحِ الْمِسْكِ مَسُّهَا مَسَّ الْحَرِيرِ ، فَلَا تَتْرُكُ نَفْسًا فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنَ الْإِيمَانِ إِلَّا قَبَضَتْهُ ، ثُمَّ يَبْقَى شِرَارُ النَّاسِ عَلَيْهِمْ تَقُومُ السَّاعَةُ "কিয়ামাতের পূর্বে আল্লাহ তা'আলা সুন্দর একটি বাতাস প্রেরণ করবেন। এই বাতাসের সুঘ্রাণ হবে কস্তুরীর সুঘ্রাণের মত এবং রেশমের মত নরম। সেদিন যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে সেও এই বাতাসের কারণে মৃত্যু বরণ করবে। এরপর কেবল খারাপ লোকেরাই বেঁচে থাকবে। এই নিকৃষ্ট লোকদের উপরই কিয়ামাত প্রতিষ্ঠিত হবে।'৭

টিকাঃ
৫. সহীহ বুখারী ৩৬৪১, সহীহ মুসলিম ১৯২০, তিরমিযী ২২২৯, আবুদাউদ ৪২৫২, ইবনে মাজাহ ৩৯৫২, মুসনাদে আহমাদ।
৬. সহীহ মুসলিম ১৪৮, অধ্যায়: কিতাবুল ফিতান, তিরমিযী ২২০৭, মুসনাদে আহমাদ।
৭. সহীহ মুসলিম ১৯২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00