📄 শিরোনাম
সূচীপত্র
শিরোনাম পৃষ্ঠা
অনুবাদকের ভূমিকা ০৯
লেখকের ভূমিকা ১৫
লেখকের জীবনী ১৬
ইমাম ইবনে তাইমীয়া এর সংক্ষিপ্ত জীবনী ২২
বিসমিল্লাহর ব্যাখ্যা ৪৫
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়ার প্রাথমিক খুতবা ৪৭
ফিরকাতুন নাজিয়াহ বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল ৫৫
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত ৫৮
ঈমানের রুকনসমূহ। ৬০
আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস করা ৬৫
আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনয়নের ব্যাপারে ৭১
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের অবস্থান
সকল রসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ৮১
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার সুউচ্চ গুণাবলী ও বড়ত্বের ৮৬ বৈশিষ্ট্য এবং নিজেকে যে সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র ও মুক্ত করেছেন তার বর্ণনা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মূলনীতি হচ্ছে রসূলগণ ৮৯ আক্বীদা ও অন্যান্য বিষয়ে যা নিয়ে এসেছেন তাই সঠিক পথ।
কুরআনুল কারীম থেকে আল্লাহ তা'আলার অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী সাব্যস্ত করার প্রমাণ ভিত্তিক পদ্ধতি ৯২
১। একই সাথে নেতিবাচক ও ইতিবাচক বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সিফাত সাব্যস্ত করা অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার পবিত্র সত্তা হতে সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি নাকোচ করা এবং তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য পূর্ণ গুণাবলী সাব্যস্ত ৯২
শিরোনাম পৃষ্ঠা করা।
২। সকল সৃষ্টির উপরে আল্লাহ তা'আলার অবস্থান ও তাঁর ১০৫ সৃষ্টির নিকটবর্তী হওয়া এবং সকল সৃষ্টির শুরু ও শেষে বিদ্যমান থাকা।
৩। আল্লাহ তা'আলার ইলম (জ্ঞান) সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন ১১১ করে রয়েছে।
৪। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার শ্রবণ ও দর্শন। ১১৮
৫। আল্লাহ তা'আলার জন্য মাশিয়াহ (ইচ্ছা) বিশেষণ ১২১ সাব্যস্ত করা।
৬। আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদেরকে ঠিক সেভাবেই ১৩১ ভালবাসেন, যেভাবে তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
৭। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য রহমত ও ১৩৯ মাগফিরাত বিশেষণ সাব্যস্ত করা।
৮। কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহ ১৪৪ তা'আলা সন্তুষ্ট হন, ক্রোধান্বিত হন, তিনি পছন্দ করেন এবং ঘৃণা করেন। সুতরাং তিনি এ সব বিশেষণে ভূষিত।
৯। কিয়ামাতের দিন বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার ১৪৯ উদ্দেশে আল্লাহ তা'আলা সেভাবেই নেমে আসবেন, যেভাবে নেমে আসা তাঁর বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয়।
১০। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য চেহারা সাব্যস্ত ১৫৪ করণ।
১১। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলার দু'টি হাতের কথা ১৫৮ উল্লেখ রয়েছে।
১২। আল্লাহ তা'আলার দু'টি চোখের কথা উল্লেখ আছে। ১৬২
১৩। আল্লাহ তা'আলার শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তির কথা ১৬৬ সাব্যস্ত হয়েছে।
১৪। আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় ১৭৩ পদ্ধতিতেই প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র বিশেষণ সাব্যস্ত করা।
শিরোনাম পৃষ্ঠা ১৫। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ক্ষমা, রহমত, মর্যাদা ১৭৯ ও ক্ষমতা প্রসঙ্গ।
১৬। আল্লাহ তা'আলার জন্য নাম সাব্যস্ত করা এবং কেউ ১৮-৩ তাঁর সাদৃশ্য হওয়া অস্বীকার করা।
১৭। আল্লাহ তা'আলার কোন শরীক নেই। ১৮৭ ১৮। আল্লাহ তা'আলার আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া ১৯৬ সাব্যস্ত করা।
১৯। আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের (সৃষ্টির) উপর ২০২ সমুন্নত।
২০। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন। ২০৯ ২১। আল্লাহর জন্য কালাম (কথা বলার বিশেষণ) সাব্যস্ত ২১৭ করা।
২২। কুরআন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে অবতীর্ণ ২২৯ হয়েছে।
২৩। কিয়ামাতের দিন মুমিনগণ তাদের রবকে দেখবে। ২৩৫ আল্লাহ তা'আলার জন্য সুন্দর নামসমূহ এবং সুউচ্চ ২৪১ গুণাবলীর উপর সুন্নাতের দলীল গ্রহণের পদ্ধতি
সুন্নাহ দ্বারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করণে দলিল ২৪৩ গ্রহণ।
রসূল সহীহ হাদীসসমূহে তাঁর প্রভুকে যে সুউচ্চ ২৪৪ গুণাবলীতে বিশেষিত করেছেন তার প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব-আবশ্যক
১। আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় ২৪৭ পদ্ধতিতে দুনিয়ার আসমানে তাঁর নেমে আসা সাব্যস্ত করণ।
২। আল্লাহ তা'আলা খুশী হন ও হাসেন। ২৫০ ৩। আল্লাহ তা'আলা আশ্চর্য হন এবং হাসেন। ২৫৪ ৪। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য 'পা' সাব্যস্ত ২৫৬ করা।
শিরোনাম পৃষ্ঠা
৫। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আহবান, আওয়াজ এবং কালাম রয়েছে। ২৫৯
৬। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সৃষ্টির উপরে রয়েছেন এবং তিনি তাঁর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। ২৬২
৭। আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির সাথেই আছেন। আরশের উপর তাঁর সমুন্নত হওয়া শারীয়াত পরিপন্থী বিষয় নয়। ২৬৯
৮। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাদের রবকে দেখতে পাবে। ২৭৭
যে সব হাদীসে আল্লাহ তা'আলার সুউচ্চ সিফাতগুলো সাব্যস্ত করা হয়েছে সে ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান। ২৮০
উম্মাতের বিভিন্ন ফির্কার মধ্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মর্যাদা। ২৮২
এই বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা'আলা আরশের উপরে সমুন্নত, আরো বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, তিনি সমস্ত মাখলুকের উপরে এবং সকল মাখলুকের সাথে। মাখলুকের উপরে হওয়া এবং তাদের সাথে থাকা পরস্পর সাংঘর্ষিক নয় ২৯২
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সৃষ্টির উপরে এবং মাখলুকের সাথে থাকার ব্যাপারে যা বিশ্বাস করা আবশ্যক, তাঁর আসমানে থাকার অর্থ ও তার দলীলসমূহ। ২৯৮
এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হওয়া ও সৃষ্টির উপরে থাকা শারীয়াত পরিপন্থী নয়। ৩০৩
এটা বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, কুরআন প্রকৃতপক্ষেই আল্লাহ তা'আলার কালাম। ৩০৭
মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন জান্নাতে প্রবেশের পর তাদের প্রভুকে দেখতে পাবে বিশ্বাস করা। ৩১৩
আখেরাতের প্রতি ঈমান আনয়নের বিষয়সমূহ। ৩১৬
শিরোনাম পৃষ্ঠা ১। কবরে সংঘটিতব্য বিষয় সমুহ। ৩২৩
২। মহাপ্রলয় এবং তাতে সংঘটিতব্য বিষয় সমুহ। ৩২৮ কিয়ামাতের দিন আরো যা সংঘটিত হবে।
নাবী এর হাওয এবং তার স্থান ও বৈশিষ্ট্য। ৩৩৯ সিরাত, তার অর্থ, স্থান এবং এর উপর দিয়ে মানুষের ৩৪১ অতিক্রম।
জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে সেতু। ৩৪৪
সর্বপ্রথম যিনি জান্নাতের দরজা খুলবেন, সর্বপ্রথম তাতে ৩৪৬ প্রবেশ করবেন এবং নাবী শাফাআ'তের বর্ণনা।
কতিপয় পাপীকে শাফাআত ব্যতীত শুধু আল্লাহর রহমতেই ৩৫৪ জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশের পর সেখানে জায়গা খালি থাকলে বা জান্নাতীদের
তুলনায় জান্নাত অধিক প্রশস্ত হলে কী করা হবে? ৩৫৭
তাকদীরের প্রতি ঈমান এবং তাতে যেসব বিষয় শামিল ৩৬১ রয়েছে।
তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়নের স্তর সমূহের ব্যাখ্যা।
প্রথম স্তর ও তাতে অর্ন্তভুক্ত বিষয় সমুহ। তাকদীরের দ্বিতীয় স্তর ও সংশ্লিষ্ট বিষয় ৩৭২ তাকদীর ও শারীয়াত পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয় এবং ৩৭৫ পাপাচার নির্ধারণ করা এবং সেগুলোকে অপছন্দ ও ঘৃণা করাও পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার পক্ষ হতে তাকদীর নির্ধারণ ৩৮০ করা (বান্দাদের কর্ম সৃষ্টি হওয়া) এবং প্রকৃতপক্ষেই বান্দাদের কাজ-কর্ম তাদের প্রতি সম্বন্ধ করার মধ্যে পারস্পারিক কোন বিরোধ নেই। বান্দাই নিজস্ব ইচ্ছা ও এখতিয়ার দ্বারা তাদের কাজ-কর্ম সম্পাদন করে থাকে।
ঈমানের হাকীকত বা পরিচয় এবং কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত ৩৮৬ ব্যক্তির হুকুম।
শিরোনাম পৃষ্ঠা সাহাবীদের প্রতি ভাল ধারণা রাখা এবং তাঁদের মর্যাদা বর্ণনা ৪০১ করা আবশ্যক।
সাহাবীদের ফাযীলাত সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল ৪০৮ জামা'আতের অবস্থান এবং তাদের ফাযীলতের তারতম্য খিলাফতের ক্ষেত্রে আলী ও অন্য চার খলীফার উপর প্রাধন্য ৪২০ দেয়ার হুকুম।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট নাবী ﷺ এর ৪২৩ পরিবারের মর্যাদা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট নাবী ﷺ এর ৪২৮ পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা।
সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে বিদআ'তীরা যা ৪৩৩ বলে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
কারামাতে আওলীয়ার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল ৪৪৫ জামা'আতের মাযহাব।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের বৈশিষ্ট্য, কেনই বা ৪৫০ তাদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত বলা হয়? আক্বীদা'র বিষয়গুলোর পরিপূরক হিসাবে আহলে সুন্নাত ৪৬০ ওয়াল জামা'আত যেসব সুমহান চারিত্রিক গুণাবলী এবং সৎকাজ করে থাকে, সে ব্যাপারে এ অনুচ্ছেদ
📄 অনুবাদকের ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين أما بعد:
সমস্ত প্রশংসা সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নাবী-রসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মুহাম্মাদ এর উপর, তার পরিবার পরিজন ও সাহাবীদের উপর। আর কিয়ামাত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরণ-অনুকরণ করবে তাদের উপরও।
অতঃপর-দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম সঠিক ইসলামী আক্বীদা গ্রহণ অপরিহার্য। এ জন্য নাবী তাঁর মাক্কী জীবনের সম্পূর্ণ সময় মুশরিকদের বাতিল আক্বীদা বর্জন করে নির্ভেজাল তাওহীদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন এবং এ পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। কারণ ইসলামে সঠিক আক্বীদা বিহীন আমলের কোন মূল্য নেই।
আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের উপরই দুনিয়া ও পরকালীন জীবনে সৌভাগ্য অর্জন নির্ভর করে। সুতরাং আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের প্রতিই মানুষের প্রয়োজন সর্বাধিক। বান্দা যতক্ষণ আল্লাহর প্রভুত্ব, উলুহীয়াত, তাঁর অতি সুন্দর নামসমূহ এবং তাঁর সুউচ্চ গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করবে, ততক্ষণ সে প্রকৃত শান্তি অর্জন করতে সক্ষম হবে না।
মানুষের মনে স্রষ্টার অস্তিত্ব, তাঁর পবিত্র সত্তা ও গুণাবলী, তাঁর সৃষ্টি ও কর্মসমূহ, সৃষ্টির সূচনা, তার পরিসমাপ্তি, সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টি, তাদের মধ্যেকার পারস্পারিক সম্পর্ক, তাকদীর এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন ও তাতে সংঘটিতব্য বিষয়াদি সম্পর্কে যেসব সন্দেহ ও প্রশ্ন জাগ্রত হয়, স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ইসলামী আক্বীদাই কেবল সে সব প্রশ্ন ও সন্দেহের জবাব দিতে সক্ষম।
পৃথিবীতে মুসলিমদের বিজয়, সাফল্য, প্রতিপত্তি এবং প্রতিষ্ঠা লাভের মূলে ছিল তাদের নির্ভেজাল ও পরিশুদ্ধ আক্বীদা বিশ্বাস। যতদিন মুসলিমদের আক্বীদা বিশ্বাস সঠিক ও সুদৃঢ় ছিল, ততদিন তারা সমগ্র পৃথিবীর শাসক ছিল।
এ জন্যই কুরআন মানুষের আক্বীদা পরিশুদ্ধ করার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করেছে। নাবী-রসূলদের দাওয়াতের মূল বিষয়ই ছিল আক্বীদার সংশোধন। তারা সর্বপ্রথম যে বিষয়ের প্রতি আহবান জানাতেন, তা হলো এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করা এবং অন্যসকল বস্তুর ইবাদত বর্জন করা। মক্কাতে একটানা তের বছর অবস্থান করে নাবী আক্বীদা সংশোধনের কাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
কুরআন ও সুন্নাতে আল্লাহর সত্তা, তাঁর অতি সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী, ফেরেশতা, আখিরাত ইত্যাদি গায়েবী বিষয়কে অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ইসলামের গৌরবময় যুগে মুসলিমদের তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়নি। রসূল থেকে তারা বিষয়গুলো শুনে তা সহজভাবেই বুঝে নিয়েছেন এবং বিশ্বাস করেছেন। আর এ বিষয়গুলো বোধশক্তি ও যুক্তির মাধ্যমে বুঝার কোন সুযোগ নেই। অহীর উপর নির্ভর করা ব্যতীত অন্য কোন পথ নেই। সেই সাথে কুরআন ও হাদীসে আলোচিত গায়েবী বিষয়গুলো মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিকও নয়।
কিন্তু পরবর্তীতে যখন গ্রীক দর্শনের কিতাবাদি আরবীতে অনুবাদ করা হলো, তখন থেকেই ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারের উপর গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়তে থাকে। আব্বাসী খেলাফতকালে সরকারীভাবে এ কাজে উৎসাহ প্রদান করা হয়। ফলে মুসলিমদের লাইব্রেরীগুলো গ্রীক দর্শনের কিতাবে ভরপুর হয়ে যায়। মুসলিম বিদ্বানগণ গ্রীক দর্শনের দিকে ঝুকে পড়ে। ইসলামী আক্বীদার উপরও গ্রীক দর্শনের প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী, তাঁর কার্যাবলী, সৃষ্টির সূচনা ও পরিসমাপ্তি, পরিণাম, কিয়ামাত, হাশর-নাশর, মানুষের আমলের ফলাফল এবং এ ধরণের অন্যান্য গায়েবী বিষয়গুলো জানার জন্য কুরআন-সুন্নার পথ ছাড়া আর কোন পথ নেই। চিন্তা-ভাবনা, আন্দাজ-অনুমান করে এ বিষয়গুলো জানা অসম্ভব। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীর ধারে কাছে পৌঁছানো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে মানুষের কোন অভিজ্ঞতাও নেই। এসব বিষয় চোখেও দেখা যায়না।
কুরআন সুস্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, ليس كمثله شيئ وهو السميع البصير "তাঁর সদৃশ কোন কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা” (সূরা শুরা ৪২:১১)।
কাজেই এ বিষয়ে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের উপর নির্ভর করাই সঠিক আক্বীদার উপর টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলিম দার্শনিকরা কুরআন ও সুন্নার সহজ সরল উক্তিগুলো বাদ দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর গুণাবলী, আখিরাত এবং অন্যান্য গায়েবী বিষয়গুলোর দার্শনিক ও বুদ্ধিভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান শুরু করে। তাদের জবাব দেয়ার জন্য আরেক শ্রেণীর মুসলিম আলিম দাঁড়িয়ে যায়। এরা হলো মুসলিম কালামশাস্ত্রবিদ। তারাও দার্শনিকদের জবাবে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করতে থাকেন। কিন্তু তাদের উপস্থাপিত যুক্তি-তর্ক দার্শনিকদের জবাব দিতে বহুলাংশে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের যুক্তিগুলো ছিল তুলনামূলক দুর্বল। এগুলো সংশয় দূর করার বদলে নতুন নতুন সংশয় ও সমস্যার সৃষ্টি করেছে এবং এমনসব জটিলতা, দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি করেছে, যার জবাব স্বয়ং কালামশাস্ত্রবিদগণ খুজেঁ না পেয়ে নিজেরাই সংশয়ে পড়েছেন।
ইমাম ফখরন্দ্দীন রাযী শেষ বয়সে উপনীত হয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, তিনি কালামী পদ্ধতি ও দার্শনিক উপস্থাপন প্রক্রিয়ার উপর অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছেন। শেষ জীবনে তিনি এ সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এর ফলে রোগীর রোগ নিরাময় হওয়ার চেয়ে আরো বৃদ্ধি পায় এবং তৃষ্ণার্তের পিপাসা মোটেই নিবারণ হয় না। তিনি বলেন, কুরআন-সুন্নার পদ্ধতিই আমি নিকটতর পেয়েছি।
আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে কালাম শাস্ত্রবিদ ও মুসলিম দার্শনিকগণ বুদ্ধিভিত্তিক যেই যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেছেন, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া তাতে মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ তার মোকাবেলায় কুরআন-সুন্নার যুক্তি-প্রমাণ অনেক সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ, দ্ব্যর্থহীন ও হৃদয়গ্রাহী। তাই ইমাম ইবনে তাইমীয়া আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী এবং ঈমানের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে মুসলিমদের উপর যা আবশ্যক, কুরআন-সুন্নাতের দলীলের আলোকে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয়ে তিনি একাধিক মূল্যবান কিতাব রচনা করেছেন এবং দার্শনিক ও কালামীদের কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেন। এ বিষয়ে তার অন্যতম গ্রন্থ আল-আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বীয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কিতাবে আল্লাহর অতি সুন্দর নাম, তাঁর সুউচ্চ গুণাবলী, আখেরাতের বিভিন্ন বিষয়সহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রায় সকল বিষয়ই অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় উল্লেখ করেছেন।
৬৯৮ হিজরীর কোনো এক দিনে আসরের সলাতের পর এক বৈঠকে শাইখ এই মূল্যবান কিতাবটি লিখে শেষ করেছেন। শাইখ নিজেই এই কিতাব লিখার কারণ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তাতারী শাসনাধীন ইসলামী সাম্রাজের মুসলিমদের মধ্যে যখন অজ্ঞতা ও যুলুম ছড়িয়ে পড়ল, দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা যখন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো, চতুর্দিকে কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ল এবং সঠিক ইসলামী আক্বীদা মুসলিমগণ প্রায় ভুলেই যাচ্ছিল, তখন ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল বসরা ও কূফার মধ্যকার 'ওয়াসেত' শহরের জনৈক কাযী শাইখের কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলামী আক্বীদার বিষয়গুলো এক সাথে উল্লেখ করে একটি কিতাব লিখার অনুরোধ জানালেন। শাইখ জবাবে বললেন, আক্বীদার বিষয়ে লোকেরা তো অনেক কিতাবই রচনা করেছে। কিন্তু ওয়াসেতের কাযী চাপাচাপি করেই বললেন যে, আমি কেবল আপনার পক্ষ হতেই এ বিষয়ে একটি পুস্তক কামনা করছি। তখন তিনি আসরের সলাতের পর এক বৈঠকে এই কিতাবটি লিখে দিলেন। ওয়াসেতের কাযীর অনুরোধে এবং ওয়াসেতের অধিবাসীদের জন্য যেহেতু এই কিতাবটি লিখা হয়েছে, তাই এটিকে আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বীয়া বলা হয়। সেই সাথে واسط অর্থ যেহেতু মধ্যবর্তী এবং এই কিতাবে যেহেতু মধ্যমপন্থী উম্মাতের তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদাগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে, তাই কিতাবটির নাম 'আল আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বীয়া' হওয়া সামঞ্জস্য।
আল আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বীয়ার বিষয়গুলো নিয়ে শাইখের সাথে সমকালীন আলিমদের একাধিক 'মুনাযারা' বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যে মিশরের তদানীন্তন সুলতানের পক্ষ হতে নিযুক্ত দামেস্কের গভর্ণরের উপস্থিতিতে ৭০৫ হিজরী সালের বিতর্ক অনুষ্ঠানটি অন্যতম। শাইখুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আক্বীদা ওয়াসিত্বীয়ার বিষয়গুলোর উপর তিনটি মুনাযারায় অংশ গ্রহণ করেছেন। এতে তিনি দ্বীনের সমস্ত মূলনীতি ও সহীহ আক্বীদার মাস'আলাগুলো সংক্ষিপ্ত ও সহজ ভাষায় উল্লেখ করেছেন। এক কথায় বলতে গেলে, কিতাবটির মধ্যে তিনি আক্বীদার ক্ষেত্রে তর্কশাস্ত্রবিদদের মতামত ও বিদ'আতমুক্ত সালাফে সালেহীনের আক্বীদার বিবরণ দিয়েছেন। বলা হয়েছে যে, আশায়েরা এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা ওয়াসেতীয়ায় সন্নিবেশিত আক্বীদাগুলোর বিষয়ে যখন শাইখের চরম বিরোধিতা শুরু করলো, তখন শাইখুল ইসলাম তাদের সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, তোমরা উহা থেকে এমন একটি মাস'আলা নিয়ে আসো, যাতে আমি কুরআন ও সুন্নার খেলাফ করেছি। শাইখুল ইসলামের মৃত্যু পর্যন্ত তারা ওয়াসেতীয়ার একটি মাস'আলাকেও কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী হিসাবে প্রমাণ করতে পারেনি।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ সমাজের মুসলিমগণ সঠিক আক্বীদা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে তারা বহু সমস্যার সম্মুখীন। মুসলিমদের অধঃপতনের মূল কারণ হল দ্বীনের সঠিক আক্বীদা ও শিক্ষা বর্জন করে শির্ক ও বিদ'আতে জড়িয়ে পড়া। বাংলাভাষী মুসলিম অঞ্চলগুলোতেও বয়ে যাচ্ছে শির্ক-বিদ'আতের সয়লাব। যারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অর্ন্তভুক্ত হওয়ার দাবী করে তারাও সঠিক আক্বীদা হতে অনেক দূরে। শুধু তাই নয়, যারা সুস্পষ্ট কবর পূজা ও নানা রকম শির্ক-বিদ'আতে লিপ্ত তাদেরকেও সুন্নী বলে আখ্যায়িত করা হয়!!! আর এ কারণেই বিভ্রান্ত হচ্ছে আমাদের সমাজের সরল প্রাণ অগণিত মুসলিম। বাংলা ভাষা এখন বাংলাদেশের সীমানা পার হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে কোটি কোটি বাংলাভাষী মুসলিম। বাংলাভাষী মুসলিমদের তুলনায় ইসলামী বই-পুস্তকের সংখ্যা কম বলেই মনে হয়। এখন পর্যন্ত আক্বীদার মৌলিক গ্রন্থগুলোর ব্যাখ্যাসহ সঠিক ও নির্ভুল অনুবাদ না হওয়া বাংলাভাষী মুসলিমদের সহীহ আক্বীদা সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্যতম কারণ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা বর্ণনায় ওয়াসিত্বীয়া যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ কিতাব, তাই মুসলিম উম্মার নিকট এটি বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। এর ছোট-বড় অনেক ব্যাখ্যা রয়েছে। সম্ভবত অনুবাদও হয়েছে অনেক ভাষায়। ওয়াসিতীয়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ সমূহের মধ্য থেকে শাইখ ড. সালেহ ফাওযানের ব্যাখ্যাটি বাংলায় অনুবাদের জন্য বেছে নেয়ার কারণ হলো এটি সংক্ষিপ্ত ও সহজ সরল। বাংলাভাষী মুসলিমগণ যেহেতু এখনো আক্বীদার বড় বড় কিতাবগুলো পড়তে অভ্যস্থ হয়ে উঠেনি, তাই এটিই তাদের জন্য আক্বীদার জগতে প্রবেশের মূল ফটক হতে পারে ভেবে এবং বিশেষ করে জম'ঈয়তে আহলে হাদীস বাংলাদেশ সৌদি আরব শাখার তত্ত্বাবধানে ওয়াসিত্বীয়ার এ ব্যাখ্যাটিই অনুবাদের জন্য নির্বাচন করা হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনুবাদ সম্পন্ন হওয়ায় মহান স্রষ্টার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
এখানে আরেকটি কথা বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, তিন প্রকার তাওহীদের মধ্য থেকে শুধু তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত, তাকদীর, ঈমানের বিভিন্ন মাস'আলা, আখিরাত সম্পর্কিত গায়িবী বিষয়সমূহ, খিলাফাত ও সাহাবীদের ফাযীলাত এবং তদসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোই ওয়াসিত্বীয়ায় স্থান পেয়েছে। তাওহীদুল উলুহীয়ার বিষয়াদি এখানে আলোচিত হয়নি। সে হিসাবে এটি আক্বীদার পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ নয়; বরং তাতে আক্বীদার বিশেষ একটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এখানে আক্বীদার যেসব বিষয় বাদ পড়েছে, তা অবগত হওয়ার জন্য আমাদের অন্যতম কিতাব শারহুল আক্বীদা আত-ত্বহাবী এবং আল্লামা হাফেয বিন আহমাদ আল-হাকামী রচিত 'নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদা' নামক বই দু'টি পড়ার অনুরোধ রইল।
আর তাওহীদুল উলুহীয়ার বিষয়গুলো সঠিকভাবে বুঝার জন্য শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব কর্তৃক রচিত 'কিতাবুত্ তাওহীদ'এর অন্যতম ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'কুররাতুল উয়ুন' সংগ্রহ করা যেতে পারে। কিতাবুত্ তাওহীদের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে 'কুরাতুল উয়ূন'কে বাংলায় অনুবাদের জন্য বাছাই করার অন্যতম কারণ হলো, শাইখের নাতি সুবিখ্যাত আলিম আব্দুর রহমান বিন হাসান হলেন এটির প্রণেতা। তিনি প্রথমে কিতাবুত্ তাওহীদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'ফাতহুল মাজীদ' রচনা করেন। অতঃপর এটিকে আরো সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত করে আরেকটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম দেন قرة عيون الموحدين বা তাওহীদপন্থীদের চক্ষু শীতলকারী।
আল্লাহর অশেষ কৃপায় বইগুলো পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি। এতে যেসব ভুল-ভ্রান্তি রয়েছে, তা আমার ও শয়তানের পক্ষ হতে। সুবিজ্ঞ পাঠক সমাজের প্রতি বিশেষ নিবেদন, অনুবাদ জনিত কোন ভুল-ভ্রান্তি নযরে আসলে আমাদেরকে জানিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন।
হে আল্লাহ! তুমি বইগুলোর লেখক, ভাষ্যকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও ছাপানোর কাজে সহযোগিতাকারী, তত্বাবধানকারী এবং পাঠক-পাঠিকাদের সবাইকে উত্তম বিনিময় দান করো। আমীন৷৷
শাইখ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী ashahed1975@gmail.com মোবাইল: সৌদি আরব +৯৬৬৫০৩০৭৬৩৯০ বাংলাদেশ +৮৮০১৭৩২৩২২১৫
📄 লেখকের ভূমিকা
সকল প্রশংসা মহান রব্বুল আলামীনের জন্য। সলাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত নাবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার এবং সকল সাথীগণের উপর। অতঃপর, ইহা ইমাম ইবনে তাইমীয়ার আক্বীদা ওয়াসেত্বীয়ার একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। যা নিম্নোক্ত বইগুলো থেকে সংকলন করা হয়েছে।
১. আর রওদ্বাতুন নাদিয়াহ শারহু আক্বীদাতিল ওয়াসেত্বীয়া-শাইখ যাইদ বিন আব্দুল আযিয বিন ফাইয়াস
২. আত-তাম্বিহাতু সুন্নিইয়াতু আলাল আক্বীদাতিল ওয়াসেত্বীয়া-শাইখ আব্দুর আযিয বিন নাসির রশিদ
৩. আত-তাম্বিহাতুল লাতিফা ফি মা ইহতাওয়াত আলাইহিল ওয়াসেত্বীয়া মিন মাবাহিসিল মানিফা-শাইখ আবদুর রহমান বিন নাসির সাদী
৪. নুকিলাত মিন ফাওয়াইদি আলক্বাতিহা আলা নুসখাতি ওয়াকৃতিত্বলাব।
৫. আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা তাফসীরের বইসমূহ থেকে নেয়া হয়েছে: যেমন, ফাতহুর কুদীর-ইমাম মুহাম্মাদ বিন আলী আশ শাওকানী, তাফসীরুল কুরআনিল আযিম-শাইখ ইসমাঈল ইবনে কাসীর।
ইমাম মুহাম্মাদ বিন সউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বইটি কয়েকবার প্রকাশ করেছে। বইটি সম্পূর্ণ করার জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। আর যারা সার্বিক সহযোগিতা করেছে আল্লাহ তা'আলা তাদের কল্যাণ বৃদ্ধি করুন, মুসলিমদেরকে সংশোধন করার সামর্থ দিন।
আমি আল্লাহর কাছে এর উপকার কামনা করছি, আক্বীদার এ গুরুত্বপূর্ণ বইটিকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছি। আর ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আর ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। উত্তম প্রতিদান কামনা করছি।
আল্লাহ আমাদের নাবী মুহম্মাদ, তাঁর পরিবার এবং সকল সাথীবর্গের উপর সলাত ও সালাম নাযিল করুন। আমীন।
ড. সালিহ বিন ফাওযান আল ফাওযান
📄 লেখকের জীবনী
শাইখ ড. সালিহ বিন ফাওযান আল ফাওযান হাফিযাহুল্লাহর সংক্ষিপ্ত জীবনী
শাইখ ড. সালিহ বিন ফাওযান আল ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ আলকাসীম অঞ্চলের বুরায়দাহ শহরের নিকটবর্তী শামাসীয়ার অধিবাসী। তিনি ১৯৩৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ তারিখ মোতাবেক ১ রজব ১৩৫৪ হিজরী সালে জন্মগ্রহণ করেন। ছোট থাকতেই তাঁর পিতা ইনতেকাল করেন। অতঃপর তিনি ইয়াতীম অবস্থায় স্বীয় পরিবারে প্রতিপালিত হন। শহরের মসজিদের ইমামের নিকট তিনি কুরআনুল কারীম, কিরাআতের মূলনীতি এবং লিখা শিখেন।
শামাসিয়ায় ১৩৬৯ হিজরী সালে যখন সরকারী মাদরাসা চালু করা হয়, তখন তিনি সেখানে ভর্তি হন। অতঃপর বুরায়দা শহরস্থ ফয়সালীয়া ইবতেদায়ী মাদরাসায় ১৩৭১ হিজরী সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এ সময় তাকে ইবতেদায়ী মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। অতঃপর বুরায়দাতে ১৩৭৩ হিজরী সালে যখন ইসলামিক ইন্সটিটিউট খোলা হয়, তখন তিনি তাতে ভর্তি হন। ১৩৭৩ হিজরী সালে তিনি এখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর তিনি রিয়াদ শহরস্থ কুল্লীয়া শারঈয়া বা শারঈয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি ১৩৮১ হিজরী সালে শিক্ষা সমাপনী ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর তিনি একই প্রতিষ্ঠান থেকে ইসলামী ফিকাহর উপর এম,এ পাস করেন এবং একই বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন。
কর্ম জীবন:
শারঈয়া কলেজ থেকে ডিগ্রী অর্জন করার পর তিনি রিয়াদস্থ ইসলামিক ইন্সটিডিটে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। অতঃপর তাকে শারঈয়া কলেজের শিক্ষক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। অতঃপর তাঁকে ইসলামী আক্বীদা বিভাগের উচ্চতর শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। অতঃপর তাঁকে বিচার বিষয়ক হায়ার ইন্সটিটিউটে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। অতঃপর তাঁকে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মেয়াদ শেষে তাঁকে পুনরায় সেখানে শিক্ষক হিসাবে ফিরে আসেন। অতঃপর তাকে ইসলামী গবেষণা ও ফতোয়া বিভাগের স্থায়ী কমিটির সদস্য নিয়োগ করা হয়। তিনি এখনো এই পদে বহাল রয়েছেন। তিনি আরো যেসব সরকারী দায়িত্ব পালন করেন, তার মধ্যে هيئة كبار العلماء এর সদস্য, মক্কা মুকাররামায় অবস্থিত রাবেতার পরিচালনাধীন ইসলামী ফিকাহ একাডেমীর সদস্য, ইসলামী গবেষণা ও ফতোয়া বিভাগের স্থায়ী কমিটির সদস্য, হজ্জ মৌসুমে দাঈদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সদস্য এবং রিয়াদ শহরের মালায এলাকার আমীর মুতইব বিন আব্দুল আযীয আল-সউদ জামে মসজিদের ইমাম, খতীব ও শিক্ষক। তিনি সৌদি আরব রেডিওতে نور على الدرب নামক প্রোগ্রামে শ্রোতাদের প্রশ্নের নিয়মিত উত্তর প্রদান করেন।
এ ছাড়াও তিনি পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি, গবেষণা, অধ্যায়ন, পুস্তিকা রচনা, ফতোয়া প্রদান করাসহ বিভিন্নভাবে ইলম চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। এগুলো একত্র করে কতিপয় পুস্তকও রচনা করা হয়েছে। তিনি মাস্টার্স ও ডক্টরেক ডিগ্রী অর্জনার্থী অনেক ছাত্রের গবেষণা কর্মে তত্বাবধায়ন করেছেন।
শাইখের উস্তাদবৃন্দ:
১) মান্যবর শাইখ আব্দুর রাহমান বিন সা'দী
২) শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায
৩) আব্দুল্লাহ বিন হুমায়েদ
৪) শাইখ মুহাম্মাদ আলআমীন শানকিতী
৫) শাইখ আব্দুর রায্যাক আফীফী
৬) শাইখ সালেহ বিন আব্দুর রাহমান আসু সুকাইতী
৬) শাইখ সালেহ বিন ইবরাহীম আলবুলাইহী
৭) শাইখ মুহাম্মাদ বিন সুবাইল
৮) শাইখ আব্দুল্লাহ বিন সালেহ আলখুলাইফী
৯) শাইখ ইবরাহীম বিন উবাইদ আলআব্দ আল মুহসিন
১০) শাইখ হামুদ বিন উকালা আশ শুআইবী
১১) শাইখ সালে আলইল্লী আন্ নাসের
এ ছাড়াও আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ধার্মিক শাইখের কাছ থেকে হাদীছ, তাফসীর এবং আরবী ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।
শাইখের ছাত্রগণ:
১) শাইখ ড. আব্দুল আযীয বিন মুহাম্মাদ আলসাদহান
২) শাইখ আলী বিন আব্দুর রাহমান আশ শিবিল
৩) শাইখ সাগীর বিন ফালেহ আলসাগীর
৪) শাইখ ইউসুফ বিন সা'দ আলজারীদ
৫) শাইখ সালেহ বিন আব্দুল্লাহ বিন হামাদ আলউসাইমী
৬) শাইখ সালেহ বিন আব্দুল্লাহ বিন হামাদ আলউসাইমী
৭) মাসজিদুল হারামের ইমাম শাইখ আব্দুর রাহমান বিন সুদাইস
৮) মসজিদে নববীর ইমাম শাইখ আব্দুল মুহসিন আল কাসিম
৯) শাইখ সালেহ বিন ইবরাহীম আলুস শাইখ
১০) শাইখ আয্যাম মুহাম্মাদ আল শুআইর
এ ছাড়াও তাঁর অনেক ছাত্র রয়েছে। তারা নিয়মিত তাঁর মজলিসে এবং নিয়মিত দারসগুলোতে অংশ গ্রহণ করতেন।
শাইখের ইলমী খেদমত:
লেখালেখির কাজে রয়েছে শাইখের অনেক খেদমত। তার মধ্য থেকে নিম্নে কতিপয় গ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হলো।
১) التحقيقات المرضية في المباحث الفرضية এটি ইলমে ফারায়েযের উপর রচিত শাইখের একটি কিতাব। এটি ছিল মাস্টার্স পর্বে তাঁর গবেষণার বিষয়। বইটি এক খন্ডে ছাপানো হয়েছে।
২) أحكام الأطعمة في الشريعة الإسلامية খাদ্যদ্রব্যের বিধিবিধান।
৩) الإرشاد إلى صحيح الاعتقاد আক্বীদা সংশোধন। এটি বাংলায় অনুবাদ হয়েছে। এর বাংলা নাম আমরা দিয়েছি কুরআন ও সহীহ হাদীছের আলোকে আক্বীদা সংশোধন।
৪) شرح العقيدة الواسطية শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়ার আল আক্বীদাতুল ওয়াসিত্বীয়ার ব্যাখ্যা এটি। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।
৫) البيان فيما أخطأ فيه بعض الكتاب এটি একটি বড় মাপের কিতাব। এতে তিনি বিভিন্ন কিতাবের ভুল-ভ্রান্তি তুলে ধরেছেন।
৬) مجموع محاضرات في العقيدة والدعوة আক্বীদা ও দাওওয়া বিষয়ে শাইখের বিভিন্ন লেকচার এখানে জমা করে বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
৭) الخطب المنبرية في المناسبات العصرية অনেক বিষয়কে একত্র করে জুমআর খুৎবা হিসাবে লিখা হয়েছে। এটি দুই খন্ডে ছাপানো হয়েছে।
৮) ইসলামের সংস্কারক ইমামগণ
৯) বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তিকা
১০) বিদ'আত থেকে সাবধান। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।
১১) مجموع فتاوى في العقيدة والفقه ফতোয়া ও আক্বীদা বিষয়ক সংকলন
১২) شرح كتاب التوحيد للإمام محمد بن عبد الوهاب এটি শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব রহিমাহুল্লাহর লিখিত কিতাবুত তাওহীদের ব্যাখ্যা।
১৩) الملخص الفقهى ফিকাহর উপর লিখিত শাইখের এটি একটি বিশাল কিতাব।
১৪) إتحاف أهل الإيمان بدروس شهر رمضان রমাদান মাসের জন্য খাস করে অনেকগুলো দারস এখানে জমা করা হয়েছে।
১৫) হাজ্জ ও উমরাহকারীর জন্য যা করণীয়
১৬) কিতাবুত তাওহীদ। এটি সৌদি আরবের স্কুলসমূহে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।
১৭) কিতাবুদ দাওয়া
১৮) রমাদ্বানুল মুবারকের মজলিস
১৯) আক্বীদাতুত তাওহীদ। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে।
২০) কাশফুশ শুবহাত এর ব্যাখ্যা।
২১) যাদুল মুসতাকনি
২২) আল-মুলাখ্খাস ফী শারহি কিতাবিত তাওহীদ এটি কিতাবুত তাওহীদের ব্যাখ্যা।
২৩) শারহু মাসাইলিল জাহেলিয়া এটি জাহেলী যুগের অনেক শির্ক, কুফর এবং কুসংস্কারের প্রতিবাদে লিখিত হয়েছে।
২৪) হুকুমুল ইহতিফাল বিজিকরিল মাওলিদিন নাবীয়্যি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিবস উপলক্ষে মীলাদ উদ্যাপন করা।
২৫) আল ঈমান বিল মালা-ইকাতি ওয়া আছরুহু ফী হায়াতিল উম্মাহ ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান এবং মানব জীবনে তার প্রভাব।
২৬) আল আক্বীদাতিস সালাফিয়্যাতি ওয়া জামালু আক্বীদাতুস সালাফিস সালিহ
২৭) হাকীকাতুত তাসাউফ সুফীবাদের হাকীকত।
২৮) মিন মুশকিলাতিশ শাবাব যুবকদের সমস্যা
২৯) উজুবুত তাহাক্কুমি ইলা মা আনযালা আল্লাহ আল্লাহর বিধান দিয়ে বিচার-ফয়সালা করা আবশ্যক
৩০) মিন উসুলি আক্বীদাতি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা
৩১) দৌরুল মারআতি ফী তারবিয়াতিল উসরা পরিবার পরিচালনায় নারীর ভূমিকা
(৩২) لا إله إلا الله -এর ব্যাখ্যা
(৩৩) شرح نواقض الإسلام
(৩৪) التوحيد في القران কুরয়ানুল কারীমে তাওহীদ
(৩৫) سلسلة وصايا وتوجيهات للشباب 4-1 যুবকদের জন্য কতিপয় উপদেশ ও নির্দেশনা সিরিজ ১-৪
শাইখের প্রশংসায় বিভিন্ন আলিমের মন্তব্য:
সৌদি আরবে যে সব বিজ্ঞ ও প্রসিদ্ধ আলিম এখনো জীবিত আছেন, তাদের মধ্যে শাইখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, শাইখ বিন বায রহিমাহুল্লাহকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনার পরে আমরা কার কাছে দ্বীনের বিষয়াদি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবো? জবাবে বিন বায রহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনারা সালেহ ফাওযান জিজ্ঞসা করবেন। এমনি শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উছাইমীন রহিমাহুল্লাহকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আমরা আপনার পরে কাকে জিজ্ঞাসা করবো? তিনি জবাব দিলেন যে, আপনারা সালিহ ফাওযানকে জিজ্ঞাসা করবেন। কেননা তিনি একজন ফকীহ এবং ধার্মিক। শাইখ বিন গুদাইয়্যান প্রায়ই বলতেন, আপনারা দ্বীনের ব্যাপারে শাইখ সালেহ ফাওযানকে জিজ্ঞাসা করবেন। আল্লাহ যেন তাঁর আনুগত্যের উপর তাঁর বয়স বৃদ্ধি করেন, তাঁর শেষ পরিণাম যেন ভালো করেন এবং যেন হকের উপর তাঁকে টিকিয়ে রাখেন।
আমরা শাইখের জন্য দু'আ করি, তিনি যেন তাঁর হায়াতে বরকত দান করেন এবং দ্বীনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তা যেন কবুল করেন। আল্লাহুম্মা আমীন।