📄 বাতিল গ্রহণের উদ্দেশ্যে মিথ্যা সাথে সত্যের মিশ্রণ ঘটানো
বাতিলের সাথে হক্বের মিশ্রণ।
ব্যাখ্যা: বাতিলের সাথে হক্বের মিশ্রণ ঘটানোই কাফির, জাহিল ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ও অন্যান্যদের অভ্যাস। এখানে (الن) এর অর্থ হলো মিশানো। বাতিল প্রচারের উদ্দেশ্যে জাহিলরা এর সাথে হক্বের মিশ্রণ ঘটাতো। কেননা, শুধু বাতিল প্রচার করলে কেউ তা গ্রহণ করবে না। কিন্তু বাতিলের সাথে হক্ব মিশালে তা মু'মিনদেরকে ধোঁকা দেয়া যায়, যাতে এক নযরেই তারা বাতিল গ্রহণ করে বলতে পারে, এখানে হকু আছে। অতঃপর তারা হকু-বাতিল সম্পূর্ণটাই গ্রহণ করবে। মানুষ যদি হকুকেই গ্রহণ করতো আর বাতিল প্রত্যাখ্যান করতো তাহলেই উত্তম হতো। কিন্তু হক্ক-বাতিল সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করাটাই তাদের ভুল। কোন জিনিসের বাহ্যিক অবস্থার উপর ভিত্তি না করে তা যাচাই-বাছাই ও পরখ করে গ্রহণ করা চিন্তাশীল ও সুস্থবিবেক-বুদ্ধিসম্পন্নদের উপর আবশ্যক। তাতে হক্ব পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করবে এবং বাতিল পেলে তা বর্জন করবে。
কাফেরেরা কখনো হক্বের আলোচনা করে, তা হক্বের প্রতি আগ্রহ ও ভালবাসার কারণে নয়। বরং বাতিল প্রচারের উদ্দেশ্যেই তারা তা করে থাকে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা ওয়াজীব। আরো আবশ্যক যে, বিভিন্ন বিষয়ে পর্যালোচনা করা এবং প্রকাশ্যে হক্বের চাকচিক্য দেখেই তা কবুল করার জন্য ত্বরান্বিত না হওয়া যতক্ষণ না হকু যাচাই-বাছাই ও পরখ করা হয়। তাতে হকু পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করে বাতিলকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। বিদ্বান ও দূরদর্শীরা এটাই শিক্ষা দিয়ে থাকেন。
অপরদিকে সাধারণ, জাহিল ও কম বুদ্ধিসম্পন্নরা এসব বিষয়ে প্রতারিত হয় ও ধোঁকায় পড়ে। তাই বিদ্বানদের নিকট থেকে হকু জেনে নেয়া এবং তা গ্রহণের পূর্বে দূরদর্শীদের কাছে পরামর্শ চাওয়া তাদের উপর আবশ্যক; যাতে মিথ্যা-ভেজাল থেকে মুক্ত থাকা যায়।
📄 জেনে-বুঝে হক্ গোপন করা
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, মূর্তিপূজক ও অন্যান্য কাফির গোষ্ঠির জাহিলী নীতি হচ্ছে হকু জানা সত্ত্বেও তা গোপন করা। আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান) মাঝে এ সমস্যা প্রবল। তারা হকু জানে অথচ তা গোপন করে। আর পার্থিব স্বার্থ লাভ অথবা মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তারা তা প্রচার করে না। সর্বত্তোম হকু গোপনের বিষয় হচ্ছে তাওরাত ও ইনজিলে বর্ণিত মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলী যা তারা জানে, তার রিসালাতের বিশুদ্ধতা এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন সেটাও জানে, এ সত্ত্বেও তারা তা গোপন করে এবং মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রিসালাত অস্বীকার করে。
আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারে তাদের সম্পর্কে উল্লেখ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقاً مِنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ} [البقرة: ١٤٦، ١٤٧]
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদেরকে। আর নিশ্চয় তাদের মধ্য হতে একটি দল সত্যকে অবশ্যই গোপন করে, অথচ তারা জানে। সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং তুমি কখনো সন্দেহ পোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না (সূরা আল-বাক্বারাহ ২:১৫৬-১৫৭)।
এ আয়াতটি বাইতুল মুকাদ্দাস হতে কেবলা পরিবর্তন করে কাবা শরীফকে কেবলা নির্ধারণ প্রসঙ্গে নাযিল হয়। তারা জানতো, অচিরেই ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর কেবলা কাবা শরীফই হবে রসুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কেবলা। এটা তাদের কিতাব থেকে জানার পরও তারা কাবা শরীফকে কেবলা মেনে নিতে অস্বীকার করে। আর এ প্রসঙ্গে তাদের জানা ইলম-জ্ঞান তারা গোপন করে। অনুরূপভাবে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ছাড়াও মুসলিমদের মধ্যে যারা জেনে-বুঝে হকু গোপন করে, মানুষের মাঝে তা বর্ণনা করে না, তারাও ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের রীতির উপরই বহাল আছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَناً قَلِيلاً} [آل عمران: ۱۸۷]
আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ কিতাবপ্রাপ্তদের অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, অবশ্যই তোমরা তা মানুষের নিকট স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না। কিন্তু তারা তা তাদের পেছনে ফেলে দেয় এবং তা বিক্রি করে তুচ্ছ মূল্যে (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৮-৭)। তিনি আরো বলেন,
{إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ} [البقرة: ١٥٩، ١٦٠]
নিশ্চয় যারা গোপন করে সু-স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও হেদায়াত যা আমি অবতীর্ণ করেছি, কিতাবে মানুষের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর, তাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেন এবং লা'nতকারীগণও তাদেরকে লা'নত করে। তারা ব্যতীত, যারা তাওবা করেছে, শুধরে নিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। অতএব, আমি তাদের তাওবা কবুল করব। আর আমি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু (সূরা আল- বাক্বারাহ ২:১৫৯, ১৬০)।
তাদের তাওবাহ কবুলের শর্ত হচ্ছে তারা যা কিছু গোপন করেছে তা বর্ণনা করা। সংক্ষিপ্ত তাওবাহ যথেষ্ট নয়। তাই হক্ব বর্ণনা করা আবশ্যক। যে হক্ব জানে তা মানুষের নিকট বর্ণনা করা তার উপর ওয়াজীব। আর তুচ্ছমূল্যে সে তা বিক্রয় করবে না। অতঃপর পার্থিব স্বার্থ লাভ অথবা মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে সে তা গোপন করবে না। আল্লাহ আ'আলাকে ভয় করা এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনই অধিক যুক্তিযুক্ত। সুতরাং হক্ব বর্ণনা ও তা প্রচারে সক্ষম ব্যক্তির উপর তা গোপন করা বৈধ নয়。
পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি হকু প্রচারে অক্ষম অথবা তা বর্ণনা করতে মারাত্মক ফিতনার আশঙ্কা করে; তা ওজর-কৈফিয়ত হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু হক্ব প্রচারে যার কোন প্রতিবন্ধকতা নেই, বরং উৎসাহিত হয়ে এবং কোন স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে তা গোপন করে, আল্লাহ তা'আলা এবং অভিশম্পাতকারীরা তাকে অভিশাপ দেন। এটাই হলো ইয়াহুদীদের বৈশিষ্ট্য। আর যারা কু-প্রবৃত্তির অনুসরণে হকু গোপন করে, মানুষের নিকট তা প্রচার করে না; এ বৈশিষ্ট্য তাদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাদের নিকট কোন বিষয়ের বিধান জানতে চাওয়া হলে হক্ব ছাড়াই তারা জবাব দেয়। অথচ তারা সঠিক জবাব জানে। এটাকেই বলে হক্ব গোপন করা। আল্লাহ তা'আলা হকু বলার আদেশ দেন যদিও তা নিজের ক্ষেত্রেও হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ} [النساء: [١٣٥
হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে। যদিও তা তোমাদের নিজদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা কাছে আত্মীয়দের বিরূদ্ধে হয় (সূরা আন নিসা ৪:১৩৫)।
তাই প্রকাশ্যে ও যে কোন অবস্থায় হক্ব-সত্য প্রচার করা ওয়াজীব। সত্য সাক্ষ্য গোপন করা মারাত্মক অপরাধ। মানুষের জীবন পরিচালনা ও সঠিক পথ নির্দেশনার জন্য ওয়াজীব ইলম-বিদ্যা গোপন করাও অপরাধ। সুতরাং কোন তোষামদ ছাড়াই হকু-সত্য প্রচার করা ওয়াজীব-আবশ্যক。
তাই মানুষ যখন কোন বাতিল, কুসংস্কার ও শিরক দেখতে পাবে তখন নিরব থাকবে না; বরং তা প্রকাশ করে দেয়া তার উপর ওয়াজীব। আর কবর ও প্রতিমাপূজা এবং ভ্রান্ত বিদ'আত চালু করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে না। যে নিরব থেকে বলে যে, মানুষের প্রতি আমার করার কিছুই নেই অথবা মানুষকে হারামে লিপ্ত হতে দেখেও চুপ থাকে, তাহলে এটাই হবে তার বিদ্যা গোপন করা এবং নসিহতের (কল্যাণ কামনা) খেয়ানত করা। নিরব থাকার জন্য আল্লাহ মানুষকে ইলম-জ্ঞান দান করেননি。
মানুষকে সতর্ক করা, প্রমাণসহ আল্লাহর দিকে আহবান করা এবং অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে。
সুতরাং হক্বের ব্যাপারে আলেমদের নিরব থাকা বৈধ নয়। যেহেতু তারা হকু প্রচারে সক্ষম, বিশেষত ভ্রষ্টতা, শিরক, বিদ'আত ও কুসংস্কারে যখন মানুষকে লিপ্ত দেখবে তখন তারা নিরব থাকবে না। যদি তারা এক্ষেত্রে নিরব থাকে তাহলে এটাই হবে ইলম-বিদ্যা গোপন করা, যে বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদেরকে দোষারোপ করেছেন। তাই জানা সত্ত্বেও আলেম কিভাবে হক্বের বিরোধিতা করতে পারেন এবং মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন অথবা হক্ব বিরোধী কর্ম-কান্ড চলতে দেয়া অথবা মানুষ যে রীতির উপর বহাল আছে সেক্ষেত্রে তাল মিলানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে হক্বের বিরূদ্ধে ফাতওয়া দিতে পারেন কি?!
সুতরাং হক্বের অনুসরণই বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে; অধিকাংশ মানুষ বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই তাদের সন্তুষ্টি অর্জন কাম্য নয়। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,
من التمس رضا الله بسخط الناس رضي الله عنه وأرضى عنه الناس، ومن التمس رضا الناس بسخط الله، سخط الله عليه وأسخط عليه الناس
মানুষের ক্রোধেও যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং মানুষকে তার উপর তুষ্ট রাখেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধে মানুষের সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তা'আলা তার উপর রাগান্বিত হন এবং মানুষকে তার উপর ক্রোধান্বিত করেন।৭০
টিকাঃ
৭০. ছহীহ তিরমিযী ২৪১৯, ছহীহ জামে ৬০৯৭।
📄 জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বলা
ভ্রান্তনীতি হচ্ছে ইলম-জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহর বিরূদ্ধে কথা বলা।
ব্যাখ্যা: ভ্রান্তনীতি অর্থাৎ ভ্রষ্ট আলেমের মূলনীতি হলো জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ বিরোধী কথা বলা। আর ইলম-জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর বিরূদ্ধে কথা বলা শিরকের চেয়েও মারাত্মক। এজন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ৩৩]
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ-যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আল-আরাফ ৭:৩৩)।
সুতরাং আল্লাহ বিরোধী কথাকে শিরকের চেয়েও মারাত্মক গণ্য করা হয়েছে। তাই ইলম-জ্ঞান ছাড়া আল্লাহ বিরোধী কথা বলা কারো জন্য বৈধ নয়। যেমন এভাবে বলা যে, আল্লাহ এটা হারাম করেছেন (যদিও তা হারাম নয়) অথবা আল্লাহ এটা বৈধ করেছেন (যদিও তা বৈধ নয়), অথবা আল্লাহ তা'আলা এটা শরী'আত সম্মত করেছেন কিন্তু তা শরী'আত সম্মত নয়। এসবই জ্ঞানহীন আল্লাহ বিরোধী কথা-বার্তা। আমরা এ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি। অথবা না জেনেই ফাতওয়া দেয়া ও শিথিলতা দেখানো যা আরো বেশি মারাত্মক। এসবই হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ। আমরা এ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوى لِلْكَافِرِينَ} [الزمر : ৩২]
তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে? যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং তার কাছে সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে। জাহান্নামই কি কাফিরদের আবাসস্থল নয়? (সূরা আল যুমার ৩৯:৩২)।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার বিরূদ্ধে জ্ঞানহীন কথা বলা বৈধ নয়। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে সে ব্যাপারে অহী অবতীর্ণ না হয়ে থাকলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে অহী অবতীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জবাব দানে তিনি বিলম্ব করতেন। তাই কিভাবে জ্ঞান ছাড়াই কথা বলা যায়? ভ্রষ্ট আলেমরা অনেক বিষয় গোপন করে। কারো নিকট কোন বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও কুরআন-সুন্নাহর দলীল-প্রমাণ জানা না থাকলে তার বলা উচিত; আমি জানি না। এতে তার ইলম-জ্ঞান ও সম্মানের ঘাটতি হবে না। বরং এভাবে বলার কারণে আল্লাহ তা'আলার নিকট তার সম্মান বৃদ্ধি পাবে। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহকে চল্লিশটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি মাত্র কয়েকটির জবাব দেন। অধিকাংশ মাসআলার ব্যাপারে তিনি বলতেন, আমি জানি না। একজন প্রশ্নকারী তাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি অনেক দূর দেশ হতে সফর করে আপনার নিকট এসেছি; অথচ আমাকে জবাব না দিয়ে আপনি বলছেন, আমি এটা জানি না। ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, তুমি তোমার বাহনে উঠ এবং যেখান থেকে এসেছ সেখানে চলে যাও। আর পৌঁছার পর মানুষকে বলবে, আমি ইমাম মালেক রহিমাহুল্লাহকে এরূপ এরূপ বিষয় জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি বলেছিলেন, আমি এটা জানি না। আসলে আল্লাহ ভীরু বিদ্বানগণ এরূপই হন。
কিতাব রচনায় সতর্কতা হচ্ছে কিতাব রচনার যোগ্যতা না থাকলে তা রচনা করবে না। হায়! আমরা যদি অনেক ভুল কিতাব-পুস্তিকা থেকে মুক্ত থাকতে পারতাম। আর কুরআন-সুন্নাহ অনুসারে লিখিত ছহীহ গ্রন্থ ছাড়া অন্য কিতাব না থাকতো তাহলে কতই না ভাল হতো! সমস্যা হচ্ছে ভুল কিতাবাদী অবশিষ্ট থাকবে, আর পরবর্তী অনেক প্রজন্মই এর মাধ্যমে বিভ্রান্ত হবে। এ কিতাবাদী থেকেই মানুষের কাছে বিষয় জানতে চাওয়া হবে। তাই ফাতাওয়া, কিতাবে লিপিবদ্ধ কোন বিষয়, কথা, হাদীছ ও বক্তব্যে দানে মানুষ আল্লাহকে ভয় করবে। এজন্য কোন বিষয়ে ধারণা করে দৃঢ়তার সাথে বলবে না যে, এটাই সঠিক। তা কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হতে হবে।
📄 বক্তব্য একটি অপরটির বিরোধী
হক্ককে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে স্পষ্ট দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
بَلْ كَذَّبُوا بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُمْ فَهُمْ فِي أَمْرٍ مَرِيجٍ} [ق: ٥]
বরং তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে, যখনই তাদের কাছে সত্য এসেছে। অতএব তারা সংশয়যুক্ত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে (সূরা ক্বাফ ৫০:৫)।
ব্যাখ্যা: এখানে দ্বন্দ্ব বলতে হক্ববিহীন কথা-বার্তা নিয়ে বিবাদ ও মতানৈক্য করা। যে হক্ব পরিত্যাগ করে, সে মিথ্যা কথা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও বিবাদে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়ে। কেননা, বিভিন্নভাবে ভ্রষ্টতার শাখা-প্রশাখা বিস্তারলাভ করে, আর শাখার কোন পরিসীমা নেই। পক্ষান্তরে, হক্ব হচ্ছে একটিই যার ভিন্নতা নেই এবং মতানৈক্যও নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ} [يونس: ٣২]
অতএব, তিনিই আল্লাহ, তোমাদের প্রকৃত রব। অতঃপর সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া কী থাকে? অতএব কোথায় তোমাদেরকে ফেরানো হচ্ছে? (সূরা ইউনূছ ১০:৩২)।
যে হক্ব বর্জন করে সে ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়। আর ভ্রষ্টতা হলো গোলকধাঁধা; এ থেকে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ভ্রষ্টরা নিজেদের মাঝে বিভিন্ন মতানৈক্যে লিপ্ত থাকে। তাদের প্রত্যেকেই ভিন্ন মতের উপর বহাল থাকে। তাদের নিকট হেদায়াত নেই; যার উপর তারা পরিচালিত হবে। কেবল তারা বিপথেই পরিচালিত হয়। কখনো বলে এটা ঠিক আবার কখনো বলে ঐটাই ঠিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
بَلْ كَذَّبُوا بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُمْ فَهُمْ فِي أَمْرِمَرِيجٍ} [ق: ٥]
বরং তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে, যখনই তাদের কাছে সত্য এসেছে। অতএব তারা সংশয়যুক্ত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে (সূরা ক্বাফ ৫০:৫)।
অর্থাৎ ভ্রষ্টতায় ডুবে থাকে। তাই বাতিলপন্থীরা নিজেদের মাঝে মতানৈক্যে লিপ্ত হয়। তারা পরস্পর শত্রুতা করে, একে অপরকে ভ্রান্ত পথ দেখায় এবং পরস্পরকে কাফির বলে আখ্যা দেয়。
পক্ষান্তরে, হক্বপন্থীরা হক্ব আঁকড়ে ধরে, নিজেদের মাঝে মতানৈক্য সৃষ্টি করে না। ইজতেহাদের ব্যাপারে যদিও মতানৈক্য হয়; তবুও পরস্পরে শত্রুতা করে না এবং বিচ্ছিন্ন হয় না। হক্ব স্পষ্ট হলে তারা সেদিকেই প্রত্যাবর্তন করে এবং নিজেদের কথা বর্জন করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ} [الشورى: ١٠]
যে বিষয়েই তোমরা মতবিরোধ কর না কেন, তার ফায়সালা আল্লাহর কাছে; তিনিই আল্লাহ, আমার রব; তাঁরই ওপর আমি তাওয়াক্কুল করি এবং তাঁরই অভিমুখী হই (সূরা আশ-শূরা ৪২:১০)। {فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ} [النساء: ٥٩]
কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রসূলের দিকে প্রত্যার্পণ কর (সূরা আন নিসা ৪:৫৯)।
চার ইমাম ও ফকীহগণের মাঝে মতানৈক্য হলেও তাদের কেউ কাউকে ভ্রষ্ট ও কাফির বলে আখ্যা দেয়নি। তাদের প্রত্যেকের দলীল অনুযায়ী তারা আমল করে। আর দলীল বিরোধী কোন বিষয় প্রকাশ পেলে তারা হক্বের দিকে প্রত্যাবর্তন করে。
অপরদিকে ভ্রষ্টরা প্রত্যাবর্তনের সুযোগ কাজে লাগায় না। তাদের প্রত্যেকে কু-প্রবৃত্তির দিকেই ফিরে যায়। আর কু-প্রবৃত্তি বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।