📄 আল্লাহর বিধান সংশোধন করা ও কর্তৃত্ব লাভ করতে চাওয়া
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَتَ رَبِّكَ} [الزخرف: ٣٢]
তারা কি তোমার রবের রহমত ভাগ-বন্টন করে? (সূরা যুখরুফ ৪৩:৩২)। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার ক্রিয়া-কর্মে তারা সম্পৃক্ত হতে চায়। আর আল্লাহ তা'আলার রহমতকে তারা বন্টন করতে চায়। তাই আল্লাহ তা'আলার বন্টন নীতিকে তারা বিশ্বাস করে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رِسَالَتَهُ} [الأنعام: ١٢٤] আল্লাহ ভালো জানেন, তিনি কোথায় তাঁর রিসালাত অর্পণ করবেন (সূরা আন'আম ৬:১২৪)।
আল্লাহ তা'আলার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাওয়া। যেমন পূর্বের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাখ্যা: আল্লাহর উপর প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া। অর্থাৎ পরামর্শ দিতে চাওয়া। আল্লাহ তা'আলা এ প্রসঙ্গে বলেন,
{لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً} [الفرقان: ٣২] তার উপর পুরো কুরআন একসাথে নাযিল হলো না কেন? (সূরা যুখরুফ ২৫:৩২)।
তারা আল্লাহ তা'আলাকে পরামর্শ দিতে চায় আর বলে, আল্লাহ তা'আলা কেন পৃথকভাবে কুরআন নাযিল করেন, তিনি একত্রে কুরআন নাযিল করেননি কেন? জাহিলরা যা বুঝে না এবং যে বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই সে ব্যাপারে তারা হস্তক্ষেপ করতে চায়। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা পৃথকভাবে কুরআন নাযিলের তাৎপর্য বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
{كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلاً وَلاَ يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلاَّ جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيراً} [الفرقان: ৩৩]
আর তারা তোমার কাছে যে কোন বিষয়ই নিয়ে আসুক না কেন, আমি এর সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা তোমাকে কাছে নিয়ে এসেছি (সূরা যুখরুফ ২৫:৩২)। তিনি আরো বলেন,
{وَقُرْآناً فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنْزِيلاً} [الإسراء : ১০৬]
আর কুরআন নাযিল করেছি কিছু কিছু করে, যেন তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ধীরে ধীরে এবং আমি তা নাযিল করেছি পর্যায়ক্রমে (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১০৬)।
সময়োপযোগী আমলের সহজতার জন্যও তিনি কুরআন ধীরে ধীরে নাযিল করেন। যদি তিনি কুরআন একত্রে নাযিল করতেন তাহলে মানুষ আমল করতে অপারগ হতো। অনুরূপভাবে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি একটু একটু করে কুরআন নাযিল করেছেন। প্রত্যেক আকস্মিক ঘটনা অথবা কোন প্রেক্ষাপটে হুকুম বর্ণনার জন্য কুরআন পর্যায়ক্রমে নাযিল হয়েছে। এটাই পৃথকভাবে কুরআন নাযিলের তাৎপর্য। যুগে যুগে এরূপ অবান্তর পরামর্শের লোক বিদ্যমান রয়েছে। তারা বিধানের মূল রচনায় হস্তক্ষেপ করতে চায়। আল্লাহ ও তার রসূলের উপর অবান্তর প্রস্তাবনা তুলে ধরে বলে, যদি বিধানের মূল রচনা এরূপ হতো, যদি হাদীছ এরূপ এরূপ হতো। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ} [الحجرات: ১]
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে অগ্রবতী হয়ো না (সূরা হুজরাত ৪৯:১)।
তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের উপর প্রস্তাবনা দিবে না। বরং তোমাদের উপর আবশ্যক হলো আল্লাহর উপর ঈমান আনা এবং তিনি যা নাযিল করেছেন পরামর্শ ও প্রস্তাবনা ছাড়াই তদনুযায়ী আমল করা।
📄 অভাবগ্রস্তদেরকে অবজ্ঞা করা
অভাবীদেরকে ঘৃণা করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ} [الأنعام: ৫২]
তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে সকাল সন্ধ্যায় ডাকে (সূরা আন'আম ৬:৫২)।
ব্যাখ্যা: এ বিষয়ের দৃষ্টান্ত পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। জাহিলরা রসূলগণের অনুসরণ পরিত্যাগ করে। তাদের ধারণা, অভাবীরাই রসূলগণের অনুসরণ করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ} [الشعراء: ১১১]
তারা বলল, 'আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে? (সূরা আশ-শু'আরা ২৬:১১১)।
অভাবী ও সমাজে যাদের কোন মর্যাদা নেই তারাই কেবল রসূলের অনুসরণ করে। এরূপ ধারণা পোষণ করাই জাহিলী দীনের রীতি। জাহিলরা অহংকার বশতঃ নাবী জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আবেদন জানায় যে, ঐসব অভাবীরা যেন তার মজলিশে না বসে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বলেন, { وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ} [الأنعام: ৫২]
আর তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে সকাল সন্ধ্যায় ডাকে, তারা তার সন্তুষ্টি চায়। তাদের কোন হিসাব তোমার উপর নেই এবং তোমার কোন হিসাব তাদের উপর নেই, ফলে তুমি তাদেরকে তাড়িয়ে দিবে এবং তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে (সূরা আন'আম ৬:৫২)।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তাদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, তাহলে তিনি যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হতেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَكَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لِيَقُولُو أَهَؤُلاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّاكِرِينَ وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلامٌ عَلَيْكُمْ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءاً بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ} [الأنعام: ٥٣،٥٤]
আর এভাবেই আমি এককে অপর দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা বলে, 'এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত নয়? আর যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, যখন তারা তোমার কাছে আসে, তখন তুমি বল, 'তোমাদের উপর সালাম। তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর লিখে নিয়েছেন দয়া, নিশ্চয় যে তোমাদের মধ্য থেকে না জেনে খারাপ কাজ করে তারপর তাওবা করে এরপরে শুধরে নেয়, তবে তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু (সূরা আন'আম ৬: ৫৩,৫৪)।
যে হকের অনুসরণ করে, অভাবী হলেও সে আল্লাহ তা'আলার নিকট তিনি সম্মানিত। যে ভালকাজের উপযুক্ত তার জন্য মজলিশে জায়গা করে দিতে হবে। আর যে হক্ব থেকে বিমুখ ও অহংকারী সে এ সম্মানের উপযুক্ত নয়। কেননা, সে নিজেই নিজেকে অপমানিত করেছে। তাই সে দুরিভূত, বরখাস্ত ও পরিত্যাজ্য।
📄 নিয়্যত ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে ঈমানদারকে অপবাদ দেয়া
রসূলের অনুসারীরা একনিষ্ঠ নয়, দুনিয়া প্রেমিক এ কথা বলে জাহিলরা ঈমানদারদের অপবাদ দেয়। আল্লাহ তা'আলা জাহিলদের জবাবে বলেন, {مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ} [الأنعام: ٥২] তাদের কোন হিসাব তোমার উপর নেই (সূরা আল-আন'আম ৬:৫২)। এরূপ আরো আয়াত আছে।
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যা: অভাবীরা দুনিয়া উপভোগের জন্যই ঈমান এনেছে এ বলে জাহিলরা তাদেরকে অপবাদ দেয়। যেমন ফেরআউনের সম্প্রদায় মূসা আলাইহিস সালাম ও তার ভাই হারুন আলাইহিস সালামকে অপবাদ দিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ} [المؤمنون: ٢٤] এতো তোমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই না। সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায় (সূরা আল-মু'মিনূন ২৩:২৪)।
সম্মান ও নেতৃত্বের মোহে জাহিলরা নাবীগণকে অপবাদ দিতো। আর অভাবী মু'মিনদেরকে তারা দোষারোপ করতো এ কারণে যে, তারা নাকি রসূলের অনুসরণের মাধ্যমে ধনাঢ্যতা ও প্রাচুর্যতা অর্জন করতে চায়。
আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ} [الأنعام: ٥২]
আর তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে সকাল সন্ধ্যায় ডাকে, তারা তার সন্তুষ্টি চায় (সূরা আল-আন'আম ৬:৫২)।
মু'মিনরা দুনিয়া চায় জাহিলদের এ অপবাদের কথা আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন )يُرِيدُونَ وَجْهَهُ( অর্থাৎ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়। অতঃপর তিনি মু'মিনদের একনিষ্ঠতাকে প্রমাণ করেছেন。
📄 ঈমানের মূলনীতিসমূহ অস্বীকার করা
ফেরেস্তামন্ডলী, নাবী-রসূল ও আসমানী কিতাব সমূহকে অস্বীকার করা এবং আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, আখেরাত অবিশ্বাস করা এবং আল্লাহর সাক্ষাতকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করা
ব্যাখ্যা: এ সব মেনে না নেয়াই জাহিলী সমস্যা। আসমানী কিতাব, নাবী-রসূল, ফেরেস্তামন্ডলী, আখেরাত ও আল্লাহর সাক্ষাতকে জাহিলরা বিশ্বাস করে না। এসব অদৃশ্য বিষয় যা তারা বিশ্বাস করে না। যারা অদৃশ্যে বিষয়ে বিশ্বাসী তারাই কেবল এসবের প্রতি ঈমান আনে। অদৃশ্যে বিশ্বাস না করার কারণেই জাহিলরা ফেরেস্তামন্ডলী, কিতাব, নাবী-রসূল ও আখেরাতের প্রতি ঈমান আনে না। এ জন্য যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস রাখে কুরআনের শুরুতেই আল্লাহ তা'আলা তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ ... هُدًى لِلْمُتَّقِينَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ ... } [البقرة: ٢، ٣]
আল্লাহ, ফেরেস্তা, আসমানী কিতাব, অহী এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান সবই অদৃশ্যে বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। আর জাহিলরা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে না। এ কারণে তারা কুফুরী করে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাক্ষাতকেও তারা অস্বীকার করে।