📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 শিরক প্রতিষ্ঠিত করতে ও হক্ দমনে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা

📄 শিরক প্রতিষ্ঠিত করতে ও হক্ দমনে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা


মারাত্মক ষড়যন্ত্র; যেমন নূহ আলাইহিস সালাম এর সম্প্রদায়ের কর্ম。
ব্যাখ্যা: গোপনীয়ভাবে কারো অপছন্দনীয় বিষয় সম্পাদন করাই ষড়যন্ত্র। এটা দু'প্রকার: (ক) ভাল ষড়যন্ত্র (খ) মন্দ ষড়যন্ত্র।
কারও বিরুদ্ধে এমন গোপন প্রতারণা করা যা তার প্রাপ্য নয় তা সম্পাদন করাই হচ্ছে খারাপ ষড়যন্ত্র। আল্লাহ তা'আলা নূহ আলাইহিস সালামএর জাতির ব্যাপারে বলেন,
{وَمَكَرُوا مَكْراً كُبَّاراً وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهِتَكُمْ وَلا تَذَرُنَّ وَدّاً وَلا سُوَاعاً وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْراً وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيراً} [نوح: ۲۲-۲٤]
'আর তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছে।' আর তারা বলে, 'তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগূছ, ইয়া'উক ও নাসরকে।' বস্তুত তারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে, আর (হে আল্লাহ) আপনি যালিমদেরকে ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কিছুই বাড়াবেন না (সূরা নূহ ৭১: ২২-২৪)।
ষড়যন্ত্রকারীরা ছল-চাতুরির মাধ্যমে মানুষের ব্যাপারে যে মারাত্মক প্রতারণায় লিপ্ত হয়, তা বৃহৎ ছলনা। এ নিকৃষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে ভ্রষ্ট দা'ঈরা মানুষকে শিরকের দিকে আহবান করে। তাদেরকে একত্বের দা'ওয়াত দেয়া হলে, তারা এ দা'ওয়াত সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে বলে, তাওহীদ পন্থীরা তোমাদের নেতা হতে চায় এবং তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ইচ্ছা করে। এভাবে তারা নিকৃষ্ট কথাকে উত্তম ও উত্তম কথাকে মন্দ বলে মানুষের নিকট প্রচার করে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক ষড়যন্ত্র যা প্রাচীন ও আধুনিক ভ্রষ্ট দা'ঈদের মাঝে বিদ্যমান, যা মানুষকে হকু থেকে বিমুখ করে বাতিল-মিথ্যা এবং আলো থেকে অন্ধকারের দিকে ধাবিত করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} [البقرة: ٢٥٧]
যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের বন্ধু, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফুরী করে, তাদের অভিভাবক হল তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারা আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:২৫৭)। তিনি আরো বলেন,
{ وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوّاً شَيَاطِينَ الْأَنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوراً وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ} [الأنعام: ۱۱۲]
আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নাবীর শত্রু করেছি মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে, তারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথার কুমন্ত্রণা দেয় এবং তোমার রব যদি চাইতেন, তবে তারা তা করত না। সুতরাং তুমি তাদেরকে ও তারা যে মিথ্যা রটায়, তা ত্যাগ কর (সূরা আল-আন'আম ৬:১১২)।
অর্থাৎ তুমি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যাকে পরিত্যাগ কর। আর তাদেরকে তুমি ভ্রূক্ষেপ করবে না। এখানে ভ্রষ্ট দা'ঈদের কথা শ্রবণ করা হতে নিষেধ করা হয়েছে, তবে বাতিল-মিথ্যা দমন করার উদ্দেশ্যে তাদের কথা বুঝে নেয়া যেতে পারে।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আদর্শহীন ব্যক্তির অনুসরণ করা

📄 আদর্শহীন ব্যক্তির অনুসরণ করা


জাহিলদের নেতা হলো পাপাচারী আলিম (عالم فاجر) ও মূর্খ ইবাদতকারী (عابد جاهل)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلا بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ قَالُوا أَتُحَدِّثُوهُمْ بِمَا فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ لِيُحَاجُّوكُمْ بِهِ عِنْدَ رَبِّكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ أَوَلا يَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ} [البقرة: ٧٥-٧٨]
তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে। আর যখন তারা মুমিনদের সাথে সাক্ষাৎ করে, বলে আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন একে অপরের সাথে একান্তে মিলিত হয়, বলে তোমরা কি তাদের সাথে সে কথা আলোচনা কর, যা আল্লাহ তোমাদের উপর উন্মুক্ত করেছেন, যাতে তারা এর মাধ্যমে তোমাদের রবের নিকট তোমাদের বিরূদ্ধে দলীল পেশ করে? তবে কি তোমরা বুঝ না? তারা কি জানে না যে, তারা যা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে, তা আল্লাহ জানেন? (সূরা আল-বাক্বারাহ ২:৭৫-৭৭)।
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও অন্যান্য জাহিল জাতির আদর্শ ব্যক্তি হলো পাপাচারী আলিম, যারা নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে না, যেমন ইয়াহুদী পন্ডিতগণ। আর যে বিদ্যা ছাড়াই আমল করে, সে হলো মূর্খ ইবাদতকারী। যেমন খ্রিষ্টান সংসার বিরাগীগণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ} [التوبة: ٣١]

তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে (সূরা আত-তাওবাহ ৯:৩১)।

অর্থাৎ তারা হারামকে হালাল ও হালালকে হারামে পরিণত করে। এ ব্যাপারে জাহিলরা তাদের অনুসরণ করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, {أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ} [البقرة: ٧٥]
তোমরা কি এই আশা করছ যে, তারা তোমাদের প্রতি ঈমান আনবে? অথচ তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৭৫)। {أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ}
তোমরা কি এই আশা করছ যে, তারা তোমাদের প্রতি ঈমান আনবে? অথচ তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে অর্থাৎ আল্লাহর কালামের শব্দ ও সঠিক অর্থ জানার পরও কুপ্রবৃত্তি, উদ্দেশ্যে ও আকাঙ্খা চরিতার্থ করার জন্য কালাম পরিবর্তন করে।

যেমন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মদিনায় ইয়াহুদী ব্যভিচারীর বিচারে ইয়াহুদীরা যা চেয়েছিল (তা নিম্নরূপ)। ইয়াহুদীদের একজন পুরুষ ও একজন মহিলা ব্যভিচার করলে ইয়াহুদীরা বলল, তোমরা এ লোক অর্থাৎ মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট চল, কেননা, তারা জানতো যে, তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার বিধান আছে। তারা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার বিচার চায় না। মুহাম্মাদ যাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার চেয়ে সহজভাবে বিচার করে দেন (তারা এটা চেয়েছিল)। অতঃপর তারা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে ব্যভিচারী ও ব্যভিচারীনির বিচার চাইল。
রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "ما تجدون في التوراة على من زنى؟ " وفي رواية: "ما تجدون في التوراة في شأن الرجم" قالوا: فيها أننا نُسَوِّدُ وجوههم، وتركبهم على حمير، ونطوف بهم في الأسواق. فسأل النبي صلى الله عليه وسلم عبد الله بن سلام لأنه من أحبارهم، وقد أسلم) قال: كذبوا يا رسول الله، فطلب النبي صلى الله عليه وسلم منهم التوراة، فلما أحضروها وضع ابن صوريا أصبعه على آية الرجم، فقال له عبد الله بن سلام ارفع أصبعك، فلما رفعه إذا آية الرجم تلوح في التوراة، فأمر بهما النبي صلى الله عليه وسلم فرجما بالحجارة حتى ماتا
তোমরা তাওরাতে ব্যভিচারীর কি বিধান পেয়েছ? অন্য রেওয়ায়েতে আছে, তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার বিধান সম্পর্কে কি পেয়েছ? তারা বলল, আমরা তাদেরকে অপমানিত করবো, তাদেরকে গাঁধার পিঠে চড়িয়ে বাজারে ঘুড়াবো। নাবী জ্বহুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে সালামের নিকট তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। (কেননা তিনি তাদের আলেম ছিলেন, পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন)। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তারাতো মিথ্যা বলেছে। তখন রসূল জ্বহুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওরাত কিতাব খুঁজলেন। অতঃপর তারা তাওরাত পেশ করলো। ইবনু সুরিয়া প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সম্পর্কীয় আয়াতের উপর তার হাত রাখলো। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, তোমার হাত সরাও। সে হাত সরালে দেখা গেল প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সম্পর্কে আয়াত আছে। তখন নাবী প্রস্তর নিক্ষেপে দু'জনকে হত্যার নির্দেশ দিলেন এবং তারা মারা গেল।

এটাই হলো ইয়াহুদী আলেমদের মাধ্যমে আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করা। তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করতো এবং আল্লাহর বিধানকে গোপন করতো। তাদের পরিবর্তনের উদাহরণ: আল্লাহ তা'আলা সেজদারত অবস্থায় তাদেরকে দরজা দিয়ে প্রবেশের নির্দেশ দেন এবং (৬) হিত্তাতুন তথা 'ক্ষমা কর' এ কথা বলতে বলেন। অর্থাৎ আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দাও। অতঃপর তারা )حطة( হিত্তাতুন শব্দকে (abi) হিনতাতুন (গম) শব্দ দ্বারা '১' নুন বর্ণ বৃদ্ধি করে পরিবর্তন করে, যা তার কালাম নয়।
আল্লাহর কিতাবের (তথ্য) কম-বেশি করা অথবা অর্থ ছাড়া অপব্যাখ্যা করাই )التحريف( তাহরিফ বা পরিবর্তন। আর শব্দ ও অর্থগত উভয় দিক থেকেই পরিবর্তন হতে পারে। আর এভাবে যারা সঠিক অর্থ ব্যতীত কুরআন-হাদীছের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে পরিবর্তন করে, তা মূলতঃ নিজের মাযহাব প্রতিষ্ঠা অথবা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ অথবা অর্থ উপার্জনের জন্যই করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا} [البقرة: ৭৬]
আর যখন তারা মুমিনদের সাথে সাক্ষাৎ করে, বলে আমরা ঈমান এনেছি (সূরা বাক্বারাহ ২:৭৬)।

এটাই নেফাকী (কপটতা) হিসাবে গণ্য। আর নেফাকী ও মূল রচনার পরিবর্তন করা ইয়াহুদীদের রীতি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ} [البقرة: ৭৮] ،
আর তাদের মধ্যে আছে নিরক্ষর, তারা মিথ্যা আকাঙ্খা ব্যতীত কিতাবের কোন জ্ঞান রাখে না এবং তারা শুধুই ধারণা করে থাকে (সূরা বাক্বারাহ ২:৭৮)।

ঐ সবলোকই হলো মূর্খ ইবাদতকারী যারা তাওরাত পড়ে কিন্তু এর অর্থ বুঝে না। অথচ ইয়াহুদীরা তাদেরকে আলেম হিসাবে গ্রহণ করে। তারা তাওরাত পড়ে কিন্তু তার অর্থ বুঝে না। এ সত্ত্বেও ইয়াহুদীরা তাদেরকে ইমাম হিসাবে গ্রহণ করে অথচ তারা মূর্খ। তাই আমলকারী আলেম ব্যতীত কারো অনুসরণ করা বৈধ নয়। অথচ তারাই ধার্মিক বলে গণ্য। অনুরূপভাবে মূর্খ ইবাদতকারীরা তপস্যা ও ইবাদত করলেও তাদের অনুসরণ করা বৈধ নয়। কেননা, তারা সঠিক পদ্ধতি ও হেদায়াতের উপর বহাল নেই。

টিকাঃ
৫১. জ্বহীহ বুখারী, হা/৩৬৩৫, ৪৫৫৬, ৬৮১৯, ৭৫৪৩, জ্বহীহ মুসলিম, হা/১৬৯৯-১৭০০。

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আল্লাহর ভালোবাসায় বৈপরীত্য সৃষ্টি করা

📄 আল্লাহর ভালোবাসায় বৈপরীত্য সৃষ্টি করা


শরী'আত বর্জন করা সত্ত্বেও আল্লাহকে ভালবাসার দাবি করা। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ভালবাসার আহবান জানান। তিনি বলেন, { قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ } [আল ইমরান: ৩১]
বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)।
ব্যাখ্যা: আল্লাহর আদেশ অমান্য করা সত্ত্বেও ভ্রষ্ট ইয়াহুদী ও তাদের অনুসারী কর্তৃক ভালবাসার দাবি করা。
আল্লাহর ভালবাসার নিদর্শন হচ্ছে: আল্লাহর আদেশ পালন করা। যেমন কবি বলেন, إِنَّ الْمُحِبَّ لِمَنْ يُحِبُّ مُطِيْعُ প্রেমিক অনুগত থাকে * সে ভালবাসে যাকে。
আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ} [আল ইমরান: ৩১]
বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা বলে, {نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ} [আল-মায়েদা: ১৮] ,
আমরা আল্লাহর পুত্র ও তাঁর প্রিয়জন (সূরা আল-মায়েদা ৫:১৮)।

আল্লাহ তা'আলার শরী'আতের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তারা তাকে ভালবাসার দাবি করে। তাই এ বিরোধিতা তাদের দাবি মিথ্যা তা প্রমাণ করে। আল্লাহ তা'আলার ভালবাসার দাবির উপর তাদেরকে তিনি দলীল-প্রমাণ পেশ করার আহবান জানান। আর এ দলীল-প্রমাণই হবে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করা। তাদের মিথ্যা দাবির পক্ষে তারা প্রমাণ পেশ করতে পারেনি। অনুরূপভাবে সূফীরাও আল্লাহ তা'আলাকে ভালবেসে তাদের দীন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর বলে, ইবাদতই ভালবাসা। তাই আমরা জাহান্নামের ভয়ে ও জান্নাতের নি'আমত লাভের আশায় আল্লাহর ইবাদত করবো না। সূফীরা আল্লাহর শরী'আতের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও বলে, আমরা তাকে ভালবেসেই তার ইবাদত করবো। মূলতঃ তারা আল্লাহর রসূলের আনুগত্য করে না।
পীর এবং যে সব তরিকাপন্থীরা শ্রবণ ও আনুগত্যের উপর বাই'আত গ্রহণ করে জাহিলরা কেবল তাদেরই অনুসরণ করে। জাহিলদেরকে কোন বিষয়ে তারা নির্দেশ দিলে তারা সে বিষয়ের বিরোধিতা করে না। বরং জাহিলরা বলে, গোসল দানকারীর হাতে যেমন মৃত লাশ থাকে, তেমনই মুরিদ তার পীরের সাথেই থাকে। পীর সাহেব যা পছন্দ করেন তা ব্যতীত মুরিদের কোন স্বাধীনতা নেই। কোথায় তাদের রসূলের আনুগত্য? তাদের দাবিতে তারা মিথ্যুক। একারণে ঐ সব ভালবাসার দাবিদার লোকদের বিরূদ্ধে আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللهُ} [آل عمران: ৩১]
বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন (সূরা আলে-ইমরান ৩:৩১)।

সুতরাং আল্লাহর রসূলের আনুগত্য করাই আল্লাহকে ভালবাসার নিদর্শন বলে গণ্য। যার মাঝে এ গুণ পাওয়া যাবে, আল্লাহর ভালবাসার দাবিতে সে হবে সত্যবাদী। পক্ষান্তরে যার মাঝে রসূলের আনুগত্যের গুণ পাওয়া যাবে না, সে হবে মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা'আলা ভালবাসার দলীল-প্রমাণ ও ফলাফল উল্লেখ করেছেন। রসূলের আনুগত্য করাই ভালবাসার দলীল-প্রমাণ। আর বান্দার জন্য আল্লাহর ভালবাসা এবং তার পাপরাশি ক্ষমা করাই হলো ফলাফল। অনুরূপভাবে যারা রসূলের ভালবাসার দাবি করে অথচ তার আনুগত্য করে না এমন প্রত্যেকেই এ ফলাফল অর্জন থেকে বঞ্চিত। রসূলের ভালবাসার দাবিদারা তাদের পুস্তিকাদিতে বিভিন্ন বিষয়ে বিকৃতভাবে লেখালেখি করে। যেমন: (তারা বলে), তোমাদের সন্তানাদিকে তোমরা রসূলের ভালবাসা শিক্ষা দাও। অথচ দেখা যায়, তারা সন্তানাদিকে বিদ'আত ও মিলাদের হাদীছ শিক্ষা দেয়। অথচ নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদ'আতী কর্ম নিষিদ্ধ করেছেন। সুতরাং এভাবে তারা রসূলের ভালবাসার দাবি করে অথচ বিদ'আত ও কুসংস্কার সৃষ্টির মাধ্যমে তার ভালবাসার বিরোধিতা করে।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 মিথ্যা আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করা

📄 মিথ্যা আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করা


জাহিল কর্তৃক মিথ্যা আস্থার উপর আকাঙ্খা পোষণ করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ كَانَ هُوداً أَوْ نَصَارَى} [ البقرة: ১১১] .
আর তারা বলে, ইয়াহূদী কিংবা নাসারা ব্যতীত অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না (সূরা আল-বাক্বারাহ ২:১১১)।
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা মিথ্যা আস্থার উপর নির্ভর করে। তারা আল্লাহর নিকট মিথ্যা আকাঙ্খা করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে উল্লেখ করেন যে, তারা বলে, আল্লাহর বাণী: { لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّاماً مَعْدُودَةً} [ البقرة: ৮০]
গোনা-কয়দিন ব্যতীত আগুন আমাদেরকে কখনোই স্পর্শ করবে না (সূরা আল-বাক্বারাহ ২:৮০)।

জাহিলদের ধারণা মতে, গো-বৎস পূজার কারণে কয়েক দিন (জাহান্নামে থাকতে হবে)। আল্লাহ তা'আলা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, {قُلْ أَتَّخَذْتُمْ عِنْدَ اللَّهِ عَهْداً فَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ عَهْدَهُ أَمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ بَلَى مَنْ كَسَبَ سَيِّئَةً وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} [ البقرة: ৮০,

আর তারা বলে, গোনা-কয়দিন ব্যতীত আগুন আমাদেরকে কখনোই স্পর্শ করবে না। বল, তোমরা কি আল্লাহর নিকট ওয়াদা নিয়েছ, ফলে আল্লাহ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করবেন না? নাকি আল্লাহর উপর এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? হাঁ, যে মন্দ উপার্জন করবে এবং তার পাপ তাকে বেষ্টন কওে নেবে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী (সূরা আল-বাক্বারাহ ২:৮০,৮১)। তাদের কথা: {لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّاماً مَعْدُودَةً} [البقرة: ٨٠]
একথাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। যেমন সূরা আলে ইমরানে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيباً مِنَ الْكِتَابِ يُدْعَوْنَ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ يَتَوَلَّى فَرِيقٌ مِنْهُمْ وَهُمْ مُعْرِضُونَ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لَنْ تَمَسَّنَا النَّارُ إِلَّا أَيَّاماً مَعْدُودَاتٍ وَغَرَّهُمْ فِي دِينِهِمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ فَكَيْفَ إِذَا جَمَعْنَاهُمْ لِيَوْمٍ لَا رَيْبَ فِيهِ وَوُفِّيَتْ كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ} [آل عمران : ٢٣ - ٢٥]
তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি? যাদেরকে কিতাবের অংশবিশেষ দেয়া হয়েছে, তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করা হচ্ছে, যাতে তা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে। অতঃপর তাদের একদল ফিরে যাচ্ছে বিমুখ হয়ে। এর কারণ হল, তারা বলে, গুটি কয়েকদিন ব্যতীত আগুন আমাদেরকে কখনই স্পর্শ করবে না। আর তারা যা মিথ্যা রচনা করত, তা তাদেরকে তাদের দীনের ব্যাপারে প্রতারিত করেছে। সুতরাং কি অবস্থা হবে? যখন আমি তাদেরকে এমন দিনে সমবেত করব, যাতে কোন সন্দেহ নেই। আর প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের প্রতিদান পূর্ণভাবে দেয়া হবে এবং তাদেরকে যুলম করা হবে না (সূরা আলে-ইমরান ৩: ২৩-২৫)।

তিনি আরো বলেন, {لَيْسَ بِأَمَانِيكُمْ وَلَا أَمَانِي أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ يَعْمَلْ سُوءاً يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيّاً وَلَا نَصِيراً وَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيراً} [النساء: ١٢٣، ١٢٤]
না তোমাদের আশায় এবং না কিতাবীদের আশায় (কাজ হবে)। যে মন্দকাজ করবে তাকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। আর সে তার জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরবীচির আবরণ পরিমাণ যুলম করা হবে না (সূরা আন নিসা ৪:১২৩-১২৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00