📄 মানুষকে ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান করা
কোন জ্ঞান ছাড়া মানুষকে দাও'আত দেয়াই হচ্ছে ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বান。
ব্যাখ্যা: ইলম-জ্ঞান ছাড়া মানুষকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দেয়া জাহিলী কর্ম। কেননা, আল্লাহ তা'আলা প্রমাণ, প্রজ্ঞা, সুন্দর উপদেশ ও উত্তম পন্থায় তর্কের মাধ্যমে তার পথে দা'ওয়াত দিতে আদেশ দেন। ভ্রষ্টতার দিকে মানুষকে আহবান করা অর্থাৎ হক্বের বিরূদ্ধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা জাহিলী কর্ম। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ} [العنكبوت: ١٢]
আর কাফিররা মু'মিনদেরকে বলে, তোমরা আমাদের পথ অনুসরণ কর, তাহলে আমরা তোমাদের পাপ বহন করতে পারব (সূরা আনকাবূত ২৯:১২)।
কাফিররা মানুষকে শিরকের দিকে আহ্বান করে, দলীল-প্রমাণ ব্যতিরেকেই তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল করণের দিকে আহবান করে, আর তারা এমন বিষয়াদির দিকে দা'ওয়াত দেয়, যে ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, সুতরাং তারাই ভ্রষ্ট দা'ঈ।
আর হক্বপন্থী দা'ঈ তারাই যারা আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান ও শরী'আতের দিকে মানুষকে দা'ওয়াত দেয়। বর্তমানে ভ্রষ্ট দা'ঈ তারাই যারা মানুষকে শিরক, মাযার ও কবর পূজার দিকে আহবান করে; দীনের মধ্যে বিদ'আতী কাজ ও নব আবিষ্কৃত বিষয়ের দিকে দা'ওয়াত দেয়, যে বিষয়ে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। তাদের লিখনী, রচনা ও বক্তব্যের মাধ্যমে বিদ'আত ও নব আবিষ্কৃত বিষয়ই জাগ্রত হয়। তারা মন্দের বৈধতা, ফাসেকী ও অবাধ্যতার দিকে আহবান করে, এরূপ সকল দা'ঈ ভ্রষ্ট。
আল্লাহ তা'আলা ঐ সব দা'ঈ ও তাদের পদ্ধতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ} [آل عمران: ١٤٩]
হে মুমিনগণ, যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য কর, তারা তোমাদেরকে তোমাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ফিরে যাবে (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৪৯)। তিনি আরো বলেন,
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقاً مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ} [آل عمران : ১০০]
হে মুমিনগণ, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, তোমরা যদি তাদের একটি দলের আনুগত্য কর, তারা তোমাদের ঈমানের পর তোমাদেরকে কাফির অবস্থায় ফিরিয়ে নেবে (সূরা আলে-ইমরান ৩:১০০)। তিনি আরো বলেন,
{أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ} [البقرة: ٢٢١]
তারা তোমাদেরকে আগুনের দিকে আহ্বান করে আর আল্লাহ তোমাদেরকে জান্নাতের দিকে আহ্বান করেন (সূরা আল বাক্বারাহ ২:২২১)। তিনি আরো বলেন,
{وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ sَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ} [الأنعام: ١١৬]
আর যদি তুমি যারা যমীনে আছে তাদের অধিকাংশের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা শুধু ধারণারই অনুসরণ করে এবং তারা শুধু অনুমানই করে (সূরা আল আন'আম ৬:১১৬)।
আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেন যে, প্রাচীন ও আধুনিক উভয় যুগে ভ্রান্ত মতাদর্শের উপর কাফিররা মতভেদে লিপ্ত আছে। সর্বযুগে ও স্থানে তারা মানুষকে ভ্রষ্টতার দিকেই আহবানে তৎপর। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءً} [النساء: ٨৯]
তারা কামনা করে, যদি তোমরা কুফরী করতে যেভাবে তারা কুফরী করেছে। অতঃপর তোমরা সমান হয়ে যেতে (সূরা আন নিসা ৪:৮৯)।
📄 জেনে-বুঝে কুফরীর দিকে মানুষকে দা'ওয়াত দেয়া
জানা সত্ত্বেও কুফরীর দিকেই দা'ওয়াত দেয়া。
ব্যাখ্যা: এটি ভ্রষ্ট দা'ঈর আরেকটি শ্রেণীবিভাগ। যারা বাড়াবাড়ি ও বিরোধিতার উদ্দেশ্যে জেনে-বুঝে মানুষকে হক্ব থেকে বিমুখ করার দা'ওয়াত দেয়। আর প্রথম প্রকার দা'ঈ হলো যারা হক্ক না জেনে মানুষকে মিথ্যার দিকে আহবান করে। এ উভয় প্রকার দা'ঈ মানুষের জন্য বিপজ্জনক। অথচ তারা মানুষকে বলে না যে, তোমরা কুফরী কর। কেবল তাদের সাজানো পদ্ধতি তারা মানুষের কাছে প্রচার করে, যা বাহ্যিকভাবে সুন্দর মনে হলেও তা মূলতঃ কুফরী। আর ভ্রষ্ট দা'ঈরা এরূপই হয়। ইবলিশ নূহ আলাইহিস সালাম এর সম্প্রদায়ের নিকট এসে দেখলো যে, নেকলোকদের মৃত্যুতে তারা শোকাহত। সে তখন তাদের নিকট তার দীনি পদ্ধতি উপস্থাপন করে বললো, তোমরা এ সব নেকলোদের প্রতিচ্ছবি তৈরি করো, কারণ তা দেখলে যেন তাদের ইবাদতে তোমরা উদ্যমী হও, তাদের অবস্থা, সততা এবং দীন স্বরণ করতে পার। ফলে তারাও তোমাদের ইবাদতে খুশি হবে। এভাবে সে তাদেরকে উপদেশ দেয় এবং তার দীনি পদ্ধতি তুলে ধরে। আর ছবিগুলো অবশেষে মূর্তিতে পরিণত হবে; ইবলিশের এটাই ছিল ইচ্ছা।
পরে ছবিগুলোকে মূর্তি বানানো হয়। বিদ্বান এবং এ (মূর্তি নির্মাতা) সম্প্রদায় মারা গেলে মূর্খ সম্পদায়ের আগমন ঘটে। তাদের কাছে শয়তান এসে বলে, তোমাদের পূর্বপুরুষরা ইবাদতের জন্যই এসব মূর্তি নির্মাণ করতো। এ সব মূর্তির নামেই তারা বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। অতঃপর তারা আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর ইবাদত করে। ঠিক এরূপই ভ্রষ্ট দা'ঈরা মানুষকে প্রকাশ্যে খারাপ কর্মের দা'ওয়াত দেয় না। বরং তারা মানুষকে সাজানো পদ্ধতির মাধ্যমে দা'ওয়াত দেয়, যা তাদের নিকট উত্তম মনে হয়। ফলে অবশেষে দা'ঈর উদ্দেশ্যে অর্জিত হয়। পথ ভ্রষ্ট দা'ঈরা মানুষকে কবর পূজার মাধ্যমে শিরকের দিকে আহবান করে, তারা মানুষকে বলে না যে, তোমরা কবর পূজা কর। বরং তারা বলে, ঐসব ব্যক্তিরাই ওলী ও সৎ। আল্লাহর নিকট তাদের মর্যাদা রয়েছে। তোমরা তাদের নৈকট্য অর্জন করবে, যাতে তারা তোমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জনে তোমাদের জন্য তারা মাধ্যম ও ওসীলা স্বরূপ। নেকলোকদের ভালবাসা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে তাদেরকে মাধ্যম ও ওসীলা হিসাবে গ্রহণ করার পদ্ধতি নিয়ে ভ্রষ্ট দা'ঈরা মানুষের কাছে আসে। অতঃপর লোকেরা এ শয়তানী ধোঁকায় পড়ে কবর ও ওলী-আউলিয়ার ইবাদত করে, ফলে আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরকে লিপ্ত হয়।
কুফরীর দিকে আহবানকারীরা মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় দা'ওয়াত দেয়। তাদের মাঝে কোন আনুগত্য প্রকাশ পায় না। আর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া তাদেরক কেউ চিনতে পারে না। এ দু'টি বিষয় থেকে স্পষ্ট হলো ভ্রষ্ট দা'ঈ দু'প্রকার:
প্রথম: কোন ইলম-জ্ঞান ছাড়াই মানুষকে দাওয়াত দেয়।
দ্বিতীয়: জেনে-বুঝে হকের বিরূদ্ধে মানুষকে দা'ওয়াত দেয়।
প্রথম প্রকার দা'ঈ হচ্ছে ভ্রষ্ট (ضال), আর দ্বিতীয় প্রকার দাঈ হচ্ছে ফাসিক | (فاسق)
📄 শিরক প্রতিষ্ঠিত করতে ও হক্ দমনে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা
মারাত্মক ষড়যন্ত্র; যেমন নূহ আলাইহিস সালাম এর সম্প্রদায়ের কর্ম。
ব্যাখ্যা: গোপনীয়ভাবে কারো অপছন্দনীয় বিষয় সম্পাদন করাই ষড়যন্ত্র। এটা দু'প্রকার: (ক) ভাল ষড়যন্ত্র (খ) মন্দ ষড়যন্ত্র।
কারও বিরুদ্ধে এমন গোপন প্রতারণা করা যা তার প্রাপ্য নয় তা সম্পাদন করাই হচ্ছে খারাপ ষড়যন্ত্র। আল্লাহ তা'আলা নূহ আলাইহিস সালামএর জাতির ব্যাপারে বলেন,
{وَمَكَرُوا مَكْراً كُبَّاراً وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهِتَكُمْ وَلا تَذَرُنَّ وَدّاً وَلا سُوَاعاً وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْراً وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيراً} [نوح: ۲۲-۲٤]
'আর তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছে।' আর তারা বলে, 'তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগূছ, ইয়া'উক ও নাসরকে।' বস্তুত তারা অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে, আর (হে আল্লাহ) আপনি যালিমদেরকে ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কিছুই বাড়াবেন না (সূরা নূহ ৭১: ২২-২৪)।
ষড়যন্ত্রকারীরা ছল-চাতুরির মাধ্যমে মানুষের ব্যাপারে যে মারাত্মক প্রতারণায় লিপ্ত হয়, তা বৃহৎ ছলনা। এ নিকৃষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে ভ্রষ্ট দা'ঈরা মানুষকে শিরকের দিকে আহবান করে। তাদেরকে একত্বের দা'ওয়াত দেয়া হলে, তারা এ দা'ওয়াত সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করে বলে, তাওহীদ পন্থীরা তোমাদের নেতা হতে চায় এবং তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ইচ্ছা করে। এভাবে তারা নিকৃষ্ট কথাকে উত্তম ও উত্তম কথাকে মন্দ বলে মানুষের নিকট প্রচার করে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক ষড়যন্ত্র যা প্রাচীন ও আধুনিক ভ্রষ্ট দা'ঈদের মাঝে বিদ্যমান, যা মানুষকে হকু থেকে বিমুখ করে বাতিল-মিথ্যা এবং আলো থেকে অন্ধকারের দিকে ধাবিত করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ} [البقرة: ٢٥٧]
যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের বন্ধু, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফুরী করে, তাদের অভিভাবক হল তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারা আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:২৫৭)। তিনি আরো বলেন,
{ وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِي عَدُوّاً شَيَاطِينَ الْأَنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوراً وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ} [الأنعام: ۱۱۲]
আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নাবীর শত্রু করেছি মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে, তারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথার কুমন্ত্রণা দেয় এবং তোমার রব যদি চাইতেন, তবে তারা তা করত না। সুতরাং তুমি তাদেরকে ও তারা যে মিথ্যা রটায়, তা ত্যাগ কর (সূরা আল-আন'আম ৬:১১২)।
অর্থাৎ তুমি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যাকে পরিত্যাগ কর। আর তাদেরকে তুমি ভ্রূক্ষেপ করবে না। এখানে ভ্রষ্ট দা'ঈদের কথা শ্রবণ করা হতে নিষেধ করা হয়েছে, তবে বাতিল-মিথ্যা দমন করার উদ্দেশ্যে তাদের কথা বুঝে নেয়া যেতে পারে।
📄 আদর্শহীন ব্যক্তির অনুসরণ করা
জাহিলদের নেতা হলো পাপাচারী আলিম (عالم فاجر) ও মূর্খ ইবাদতকারী (عابد جاهل)। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلا بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ قَالُوا أَتُحَدِّثُوهُمْ بِمَا فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ لِيُحَاجُّوكُمْ بِهِ عِنْدَ رَبِّكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ أَوَلا يَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ} [البقرة: ٧٥-٧٨]
তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে। আর যখন তারা মুমিনদের সাথে সাক্ষাৎ করে, বলে আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন একে অপরের সাথে একান্তে মিলিত হয়, বলে তোমরা কি তাদের সাথে সে কথা আলোচনা কর, যা আল্লাহ তোমাদের উপর উন্মুক্ত করেছেন, যাতে তারা এর মাধ্যমে তোমাদের রবের নিকট তোমাদের বিরূদ্ধে দলীল পেশ করে? তবে কি তোমরা বুঝ না? তারা কি জানে না যে, তারা যা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে, তা আল্লাহ জানেন? (সূরা আল-বাক্বারাহ ২:৭৫-৭৭)।
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও অন্যান্য জাহিল জাতির আদর্শ ব্যক্তি হলো পাপাচারী আলিম, যারা নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে না, যেমন ইয়াহুদী পন্ডিতগণ। আর যে বিদ্যা ছাড়াই আমল করে, সে হলো মূর্খ ইবাদতকারী। যেমন খ্রিষ্টান সংসার বিরাগীগণ। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ} [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে (সূরা আত-তাওবাহ ৯:৩১)।
অর্থাৎ তারা হারামকে হালাল ও হালালকে হারামে পরিণত করে। এ ব্যাপারে জাহিলরা তাদের অনুসরণ করে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, {أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ} [البقرة: ٧٥]
তোমরা কি এই আশা করছ যে, তারা তোমাদের প্রতি ঈমান আনবে? অথচ তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৭৫)। {أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ}
তোমরা কি এই আশা করছ যে, তারা তোমাদের প্রতি ঈমান আনবে? অথচ তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে অর্থাৎ আল্লাহর কালামের শব্দ ও সঠিক অর্থ জানার পরও কুপ্রবৃত্তি, উদ্দেশ্যে ও আকাঙ্খা চরিতার্থ করার জন্য কালাম পরিবর্তন করে।
যেমন নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মদিনায় ইয়াহুদী ব্যভিচারীর বিচারে ইয়াহুদীরা যা চেয়েছিল (তা নিম্নরূপ)। ইয়াহুদীদের একজন পুরুষ ও একজন মহিলা ব্যভিচার করলে ইয়াহুদীরা বলল, তোমরা এ লোক অর্থাৎ মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট চল, কেননা, তারা জানতো যে, তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার বিধান আছে। তারা প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার বিচার চায় না। মুহাম্মাদ যাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার চেয়ে সহজভাবে বিচার করে দেন (তারা এটা চেয়েছিল)। অতঃপর তারা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে ব্যভিচারী ও ব্যভিচারীনির বিচার চাইল。
রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "ما تجدون في التوراة على من زنى؟ " وفي رواية: "ما تجدون في التوراة في شأن الرجم" قالوا: فيها أننا نُسَوِّدُ وجوههم، وتركبهم على حمير، ونطوف بهم في الأسواق. فسأل النبي صلى الله عليه وسلم عبد الله بن سلام لأنه من أحبارهم، وقد أسلم) قال: كذبوا يا رسول الله، فطلب النبي صلى الله عليه وسلم منهم التوراة، فلما أحضروها وضع ابن صوريا أصبعه على آية الرجم، فقال له عبد الله بن سلام ارفع أصبعك، فلما رفعه إذا آية الرجم تلوح في التوراة، فأمر بهما النبي صلى الله عليه وسلم فرجما بالحجارة حتى ماتا
তোমরা তাওরাতে ব্যভিচারীর কি বিধান পেয়েছ? অন্য রেওয়ায়েতে আছে, তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার বিধান সম্পর্কে কি পেয়েছ? তারা বলল, আমরা তাদেরকে অপমানিত করবো, তাদেরকে গাঁধার পিঠে চড়িয়ে বাজারে ঘুড়াবো। নাবী জ্বহুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে সালামের নিকট তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। (কেননা তিনি তাদের আলেম ছিলেন, পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন)। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তারাতো মিথ্যা বলেছে। তখন রসূল জ্বহুল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওরাত কিতাব খুঁজলেন। অতঃপর তারা তাওরাত পেশ করলো। ইবনু সুরিয়া প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সম্পর্কীয় আয়াতের উপর তার হাত রাখলো। আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম বললেন, তোমার হাত সরাও। সে হাত সরালে দেখা গেল প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সম্পর্কে আয়াত আছে। তখন নাবী প্রস্তর নিক্ষেপে দু'জনকে হত্যার নির্দেশ দিলেন এবং তারা মারা গেল।
এটাই হলো ইয়াহুদী আলেমদের মাধ্যমে আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করা। তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করতো এবং আল্লাহর বিধানকে গোপন করতো। তাদের পরিবর্তনের উদাহরণ: আল্লাহ তা'আলা সেজদারত অবস্থায় তাদেরকে দরজা দিয়ে প্রবেশের নির্দেশ দেন এবং (৬) হিত্তাতুন তথা 'ক্ষমা কর' এ কথা বলতে বলেন। অর্থাৎ আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দাও। অতঃপর তারা )حطة( হিত্তাতুন শব্দকে (abi) হিনতাতুন (গম) শব্দ দ্বারা '১' নুন বর্ণ বৃদ্ধি করে পরিবর্তন করে, যা তার কালাম নয়।
আল্লাহর কিতাবের (তথ্য) কম-বেশি করা অথবা অর্থ ছাড়া অপব্যাখ্যা করাই )التحريف( তাহরিফ বা পরিবর্তন। আর শব্দ ও অর্থগত উভয় দিক থেকেই পরিবর্তন হতে পারে। আর এভাবে যারা সঠিক অর্থ ব্যতীত কুরআন-হাদীছের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে পরিবর্তন করে, তা মূলতঃ নিজের মাযহাব প্রতিষ্ঠা অথবা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ অথবা অর্থ উপার্জনের জন্যই করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا} [البقرة: ৭৬]
আর যখন তারা মুমিনদের সাথে সাক্ষাৎ করে, বলে আমরা ঈমান এনেছি (সূরা বাক্বারাহ ২:৭৬)।
এটাই নেফাকী (কপটতা) হিসাবে গণ্য। আর নেফাকী ও মূল রচনার পরিবর্তন করা ইয়াহুদীদের রীতি। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ} [البقرة: ৭৮] ،
আর তাদের মধ্যে আছে নিরক্ষর, তারা মিথ্যা আকাঙ্খা ব্যতীত কিতাবের কোন জ্ঞান রাখে না এবং তারা শুধুই ধারণা করে থাকে (সূরা বাক্বারাহ ২:৭৮)।
ঐ সবলোকই হলো মূর্খ ইবাদতকারী যারা তাওরাত পড়ে কিন্তু এর অর্থ বুঝে না। অথচ ইয়াহুদীরা তাদেরকে আলেম হিসাবে গ্রহণ করে। তারা তাওরাত পড়ে কিন্তু তার অর্থ বুঝে না। এ সত্ত্বেও ইয়াহুদীরা তাদেরকে ইমাম হিসাবে গ্রহণ করে অথচ তারা মূর্খ। তাই আমলকারী আলেম ব্যতীত কারো অনুসরণ করা বৈধ নয়। অথচ তারাই ধার্মিক বলে গণ্য। অনুরূপভাবে মূর্খ ইবাদতকারীরা তপস্যা ও ইবাদত করলেও তাদের অনুসরণ করা বৈধ নয়। কেননা, তারা সঠিক পদ্ধতি ও হেদায়াতের উপর বহাল নেই。
টিকাঃ
৫১. জ্বহীহ বুখারী, হা/৩৬৩৫, ৪৫৫৬, ৬৮১৯, ৭৫৪৩, জ্বহীহ মুসলিম, হা/১৬৯৯-১৭০০。