📄 বিদেশি হক্ পন্থীদেরকে অপরাধ দেয়া
পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা সৃষ্টি করছে মনে করে মন্দ গুণাবলীর মাধ্যমে হক্বপন্থীদেরকে অপবাদ দেয়া। যেমনভাবে আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর শাসকের দীন ও তার উপাস্যের অনুসারীদের অসম্মান করা এবং দীনের বিকৃতী সাধনের জন্য তাদেরকে অপবাদ দেয়া。
ব্যাখ্যা: (৬৩) জাহিলদের রীতি হলো শক্তিসম্পন্ন ও প্রতিশোধ গ্রহণকারীদের নিকট (হক্বপন্থীদের বিরূদ্ধে) অভিযোগ পেশ করেই ক্ষান্ত না হওয়া। বরং ঈমানদারদেরকে তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বলে দোষারোপ করে। যেমন ফেরআউন সম্প্রদায় তাকে বলেছিল,
{أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ} [الأعراف: ۱۲৭]
'আপনি কি মূসা ও তার জাতিকে ছেড়ে দেবেন যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' (সূরা আল আরাফ ৭:১২৭- ১২৮)।
(৬৪) জাহিলরা হকুকে ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা) মনে করতো অথচ ফাসাদের বিপরীত হচ্ছে হকু। আর হক্ব হলো ঈমান ও তাওহীদ যার মাধ্যমে মানুষ সংশোধন হতে পারে। পক্ষান্তরে কুফরী, অবাধ্যতা, ফাসেকী, যুলুম এবং সীমা লঙ্ঘনের মাধ্যমে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই মূসা ও তার সম্প্রদায় যে রীতির উপর ছিলেন তা ছিল হক্ব।
অপরদিকে ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় যে রীতি অনুসরণ করতো তা ছিল ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা)। তারা হক্বের বিরোধিতা করতো আর হক্বকে ফাসাদ মনে করতো। এটা কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের চিরাচরিত স্বভাব। আর নেকলোক ও প্রমাণসহ আল্লাহর দিকে আহবানকারীদেরকে জাহিলরা মন্দ নামে ডাকতো। আর আল্লাহর একত্ব ও ইবাদতের দিকে আহবানকারী তাওহীদপন্থী মুমিনদেরকে তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বলে আখ্যা দিত। জাহিল লোকদের মাঝে মন্দ নামে ডাকার প্রবণতা কিয়ামত অবধি চালু থাকবে। কাফির, অত্যাচারী ও সীমালঙ্ঘনকারীরা নেকলোকদেরকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করতেই থাকবে।
ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের শাসনামলের প্রথম যুগ থেকে মন্দ নামে ডাকা বর্তমানেও চালু আছে। ঈমানদার ও হক্বপন্থীদেরকে মন্দ নামের উপাধী দেয়া হলে তা কখনোই তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। আর হক্বপন্থী ও দা'ঈদেরকে অনেক মন্দ নামের উপাধী দেয়া হতো। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাকে খারাপ উপাধী দেয়া হয়েছিল এবং মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহবকে খারাপ উপাধী 'খারেজী' বলে আখ্যা দেয়া হয়েছিল। তারা বলেছিল, তিনি মানুষের আক্বীদা পরিবর্তন করে তাদেরকে কাফির বানাতে চেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত জাহিলরা বলে শাইখদের কিতাবে তাদের সংশোধনীয় নীতির নামে অপবাদ, মিথ্যাচারীতা ও মন্দ বিষয় আছে। আর শাসকের দীনের অনুসারীদের মর্যাদাহানীর কারণে জাহিলরা হকুপন্থীদের বিরুদ্ধে যে অপবাদ দিতো সে প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَيَذَرَكَ وَأَهْتَكَ} [الأعراف: ۱۲৭]
আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' (সূরা আরাফ ৭:১২৭-১২৮)। তিনি আরো বলেন,
{إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُبَدِّلَ دِينَكُمْ} [غافر: ٢٦]
নিশ্চয় আমি আশঙ্কা করি সে তোমাদের দীন পাল্টে দেবে অথবা সে যমিনে বিপর্যয় ছড়িয়ে দেবে (সূরা মু'মিন ৪০:২৬)।
(৬৫) জাহিল ও তাদের অনুসারীদের রীতি হলো মুমিন এবং যারা আল্লাহর দিকে দলীল-প্রমাণসহ এবং সঠিক পন্থায় মানুষকে আহবান করে, তাদের বিরুদ্ধে শাসকদেরকে এভাবে উদ্বুদ্ধ করা যে, শাসকশ্রেণী, তাদের দীন ও রাজনীতির বিরুদ্ধে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অথচ মুমিন ও দাঈগণ তাদেরকে এমন বিষয়ে সদুপদেশ দেন ও সঠিক পথপ্রদর্শন করেন, যাতে তাদের ও রাজত্বের কল্যাণ রয়েছে। যেমনভাবে আল্লাহ তা'আলা ফেরআউনের কাহিনীতে বর্ণনা করেছেন। আর তারা ফেরআউন সম্পর্কে কুৎসা রটনা করতো না।
ফেরআউনের সংশোধন, তার রাজত্বের সংস্কার এবং প্রজাদের সংশোধনের জন্য মূসা আলাইহিস সালাম শরীকহীন একক আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলে প্রজা সাধারণ ফেরআউনকে বলে: অচিরেই মূসা আলাইহিস সালাম ও তার দলবল আপনার বিরুদ্ধে জনসম্মুখে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। ফলে জনসাধারণের উপর আপনার কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব থাকবে না। তারা আপনার ইবাদত করা হতে আল্লাহর ইবাদতের দিকে জনগণকে ধাবিত করছে। এসব কথার মাধ্যমে ফেরআউন প্ররোচিত হয়। কেননা, ফেরআউনের ধারণা যদি মূসা আ. ও তার দলবলকে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে তারা জনগণকে তার প্রভুত্বে স্বীকৃতি দেয়া ও ইবাদত করা থেকে ফিরিয়ে রাখবে। একারণে জনসাধারণকে সে বলেছিল, {أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى} [النازعات: ٢٤] 'আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ রব' (সূরা নাযি'আত ৭৯:২৪)। অন্য আয়াতে আছে, {مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرِي} [القصص: ٣٨] আমি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না (সূরা কুছাছ ২৮:৩৮)।
তাই রসূলগণের দাওয়াতকে বিশৃঙ্খলা বলে ও কুফরীকে সঠিক মনে করে জাহিলরা অপব্যাখ্যা করতো। এটিই মূলতঃ বাস্তব বিষয়াদির পরিবর্তন এবং শাসক ও প্রজার প্রতারিত হওয়ার অন্তর্ভুক্ত বিষয়। বর্তমানে অধিকাংশ শ্রেণীই এ নিকৃষ্ট শয়তানী কর্মে তৎপর, যারা মানুষকে হাবিয়া নামক জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর তারা সৎলোকদের বিরোধিতা করছে, বাস্তবতাকে মিথ্যায় পরিণত করছে এবং ক্ষমতার মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে। এরাই হলো নিকৃষ্ট ব্যক্তিবর্গ যারা দায়িত্বশীলদের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং সদুপদেশ গ্রহণে বাঁধা দেয়।
হে আল্লাহ! তুমি মুসলিমদের শাসক ও তাদের দায়িত্বশীলদের সংশোধন করো। আর তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করো।
(৬৬) শাসকের উপাস্যের মর্যাদাহানীর কারণে জাহিল কর্তৃক হক্বপন্থীদেরকে পরিত্যাগ করার বিষয়টি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি সে বিষয় যা ফেরআউন সম্প্রদায়ের ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আয়াতে উল্লেখ করেছেন। যেমন ফেরআউনের সম্প্রদায় বলেছিল, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآلِهِتَكَ} [الأعراف: ۱۲৭] 'আপনি কি মূসা ও তার জাতিকে ছেড়ে দেবেন যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' (সূরা আরাফ ৭: ১২৭)।
অর্থাৎ জনগণের সামনে আপনার প্রভুত্ব ও আপনার জন্য তাদের ইবাদত সাব্যস্ত হবে। তারা বলতো, পৃথিবীতে আপনার মর্যাদা ও মহানত্ব আছে। যদি আপনি তাদেরকে ছেড়ে দেন তাহলে তারা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করবে। ফলে তারা আপনার মর্যাদাহানী করে জনগণের সম্মুখে আপনাকে হেয় প্রতিপন্ন করবে। তাই আপনার প্রভাব ও ক্ষমতা বহাল থাকার কারণে আপনি তাদের বিরূদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নিন। এটাই ফেরআউনের জন্য প্রতারণা ও তার ধ্বংসের কারণ।
হায় সুবহানাল্লাহ! জাহিলরা আকাশ ও পৃথিবীর প্রভু আল্লাহ তা'আলার মর্যাদাহানী করছে, অথচ তারা নিজেদেরকে দোষী মনে করছে না। বরং মূসা আলাইহিস সালাম ও তার জাতি ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়কে সদুপদেশ দিলে তারাই তাদেরকেই দোষারোপ করে। অথচ মূসা আলাইহিস সালাম ও তার দলবল তাদেরকে কল্যাণ ও মুক্তির পথ দেখিয়েছেন।
শাসক ফেরআউনের ক্ষমতা কি বহাল ছিল, সে কি সংশোধন হয়েছিল?! নিকৃষ্ট শ্রেণীর দায়িত্বশীলরা সর্বদা এরকমই করে থাকে। এ জন্য কল্যাণকামী নেক ব্যক্তিবর্গদের গ্রহণ করা ও নিকৃষ্ট দায়িত্বশীল, ধ্বংসের নীতিনির্ধারক এবং ভ্রান্ত চিন্তাশীলদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া শাসকদের উপর আবশ্যক। তারা কেবল হাবিয়া নামক জাহান্নামের দিকেই তাদেরকে পথ দেখায়। যেমনভাবে ফেরআউনের দায়িত্বশীলদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। তারা ফেরআউনকে ধ্বংস ও বিনাশের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আর ফেরআউন ও তার হক্ব গ্রহণের মাঝে তারা অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল।
অন্যদিকে দীন পরিবর্তনের আশঙ্কায় জাহিলরা হক্বপন্থীদেরকে পরিত্যাগ করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা ফেরআউন সম্পর্কে বলেন,
{إِنِّي أَخَافُ أَنْ يُبَدِّلَ دِينَكُمْ أَوْ أَنْ يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ} [غافر : ٢٦] निश्चय আমি আশঙ্কা করি সে তোমাদের দীন পাল্টে দেবে অথবা সে যমিনে বিপর্যয় ছড়িয়ে দেবে (সূরা মু'মিন ৪০:২৬)।
শাসকের দীনের মর্যাদাহানীর কারণেও তারা হক্বপন্থীদেরকে পরিত্যাগ করতো। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَيَذَرَكَ وَالِهِتَكَ} [الأعراف : ۱۲۷] 'আপনাকে ও আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' (সূরা আরাফ ৭: ১২৭)।
মূসা আলাইহিস সালামও তার দাওয়াতের ব্যাপারে এ দু'টি সমস্যা ফেরআউনের মাঝে বিদ্যমান ছিল। ফেরআউন মূসা আলাইহিস সালাম এর দাওয়াত কবুল করা হতে জনগণকে সতর্ক করে এবং সে প্রজাদের উপদেশের জন্য বিক্ষোভ সমাবেশ করে। দীন ও দুনিয়ার )صلاح( ছালাহ তথা শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জনগণকে সে উপদেশ দেয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{أَوْ أَنْ يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ} [غافر : ٢٦] সে যমিনে বিপর্যয় ছড়িয়ে দেবে (সূরা মুমিন ৪০:২৬)। যেমন ফেরআউনের অনুসারীরা বলেছিল,
{أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ} [الأعراف : ۱۲۷] ، 'আপনি কি মূসা ও তার জাতিকে ছেড়ে দেবেন যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে (সূরা আরাফ ৭:১২৭)।
(৬৭) সৎলোকদেরকে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করতো। ফাসাদ সৃষ্টি করাই জাহিলদের নিকট তাওহীদ এবং এক আল্লাহর ইবাদত হিসাবে স্বীকৃত। আর এখানে )صلاح( ছালাহ তথা সংশোধন বলতে শিরককে বুঝানো হয়েছে। কেননা, যখন ফাসাদ সৃষ্টি হতো, তখন জাহিলরা হকুকে বাতিল এবং বাতিলকে হক্ক মনে করতো। কে দীনকে পরিবর্তন করে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করেছিল? জবাব হলো ফেরআউনই কুফরী ও শিরকের মাধ্যমে তাওহীদের দীনকে পরিবর্তন করেছিল।
পক্ষান্তরে মূসা আলাইহিস সালাম এমন সঠিক দীনের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতেন, যে দীনের জন্য আল্লাহ তা'আলা জিন ও মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তা মানুষের জন্য শৃঙ্খলাপূর্ণ। কেননা, শরীকহীন এক আল্লাহর ইবাদত ছাড়া পৃথিবীতে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে না। এটাই পৃথিবীবাসীর জন্য শৃঙ্খলার মাধ্যম। অপরদিকে, শিরক, কুফরী এবং পাপাচারীতার মাধ্যমে পৃথিবীতে অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
📄 নিজেদেরকে এমন বিষয়ে প্রশংসা করা, যা তাদের মাঝে নেই
জাহিলদের নিকট হকের আমল আছে বলে দাবি করা। যেমন আল্লাহর বাণী: {نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا} [البقرة: ٩১]
আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি (সূরা বাক্বারাহ ২:৯১)। হকুকে পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও তারা এ দাবি করে。
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যা হলো হকুকে পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও ইয়াহুদীদের এ দাবি করা যে, তাদের নিকট হকের আমল আছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا} [البقرة: ٩১]
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার প্রতি ঈমান আন। তারা বলে, আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯১)।
আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯১)। এর অর্থ: বনী ইসরাঈল বংশের নাবীগণের মধ্যে হতে আমাদের রসূলগণের উপর যা নাযিল হয়েছে (আমরা তার উপর আমল করি)। কেননা, এ আয়াত ইয়াহুদীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا} [البقرة: ٩١]
আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি (সূরা বাক্বারাহ ২:৯১)। অর্থাৎ বনী ইসরাইলের উপর যা নাযিল হয়েছে তথা তাদের রসূলগণ যা কিছু নিয়ে এসেছেন, মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিয়ে আসা বিধান তার বিরোধী না হওয়া সত্ত্বেও তারা (অন্য নাবীগণকে অস্বীকার করে)। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ}
এর বাইরে যা আছে তারা তা অস্বীকার করে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯১)। অর্থাৎ ঈসা ও মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল তা ব্যতীত (অন্যকে বিশ্বাস করে)। আল্লাহর বাণী:
{ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقاً لِمَا مَعَهُمْ} [البقرة: ٩١]
তা সত্য, তাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারী (সূরা বাক্বারাহ ২:৯১)। ঈসা আলাইহিস সালাম ও মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা তাদের নাবীগণের নিয়ে আসা হকের অনুকূল এবং তারা তাদের কিতাবে যে বিকৃতি, মিথ্যা ও ভ্রান্ত মতবাদ যোগ করেছে (তাদের দীন) তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে। এটি একটি দিক।
দ্বিতীয় দিক হলো এ কথায় (নাযিলকৃত বিষয়ে বিশ্বাস করার ব্যাপারে) তারা সত্যবাদী নয়। এর প্রমাণ হলো যে, তাদের দ্বারা পাপাচারীতা ঘটেছিল যা আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। (তথা নাবীগণকে তারা হত্যা করেছিল)। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন,
{ قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ وَلَقَدْ جَاءَكُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ} [البقرة: ۹۱،৯২) ]
বল, তবে কেন তোমরা আল্লাহর নাবীদেরকে পূর্বে হত্যা করতে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক? (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯১-৯২)।
তারা প্রত্যাখ্যাত, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে দু'বার প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রথমত: মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তা মূসা আলাইহিস সালাম এর নিয়ে আসা আল্লাহর একত্ব, একমাত্র তার ইবাদত করা এবং অন্যের ইবাদত না করার বিধানের বিরোধী নয়। বরং তা এসব বিষয়ের সত্যায়ণকারী।
দ্বিতীয়ত: তারা যে, নাবীগণকে বিশ্বাস করার দাবি তুলে এ ব্যাপারে তারা সত্যবাদী নয়। যেহেতু তারা বাছুর পূজা করতো এবং নাবীগণকে তারা হত্যা করেছিল। তাদের কথা: {سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا} [البقرة: ٩٣]
আমরা শুনলাম এবং অমান্য করলাম (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯৩)।
আল্লাহ তা'আলা তাদের নিকট থেকে যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন তারা তা পূর্ণ করেনি। আমার অথবা ইমামের মাযহাবে যা আছে আমি তার উপরই আমল করবো, মানুষের এ ধরণের কথা বলাই নিকৃষ্ট পক্ষপাতিত্ব বলে গণ্য। কেননা, নিজ অথবা অন্য ইমামের মাযহাবে যে হক্ব আছে তা অনুসরণ করা মুসলিমের উপর আবশ্যক। সে কেবল হকুকেই গ্রহণ করবে এবং নিকৃষ্ট পক্ষপাতিত্ব করবে না。
📄 আল্লাহর বিধিবিধান ইবাদত কম-বেশি করা
ইবাদতে বৃদ্ধি করা যেমন আশুরার দিনের কর্মকান্ড আর ইবাদতে কম করা যেমন আরাফার ময়দানে অবস্থান ত্যাগ করা。
ব্যাখ্যা: ইবাদতে বৃদ্ধি করা: যেমন জাহিলরা আশুরার দিনে তথা মুহাররম মাসের দশম দিনে বাড়াবাড়ি মূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় অথচ এ দিনে এক বড় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে, তা হলো ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়।
অপরদিকে মূসা আলাইহিস সালাম ও তার জাতি মুক্তি লাভ করেন। আর এ দিনেই মিথ্যার বিরূদ্ধে হকুকে সাহায্য করা হয় এবং আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা আদায় স্বরূপ মূসা আলাইহিস সালাম এ দিনে সিয়াম পালন করতেন। আর এ সিয়াম পালন করার রীতি মুসলিমদের জন্য শরী'আত সম্মত। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর তিনি ইয়াহুদীদেরকে এ দিনে সিয়াম পালন করতে দেখে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, এ দিনে তোমরা কেন সিয়াম পালন করো? জবাবে তারা বলে, এটি এমন দিন যে দিনে মূসা আলাইহিস সালাম ও তার জাতি মুক্তি লাভ করেন এবং ফেরআউন ও তার সম্প্রদায় ধ্বংস হয়। মূসা আলাইহিস সালাম সিয়াম পালন করতেন তাই আমরাও তার সিয়াম পালন করি। তখন নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"نحن أحق بموسى منكم"
মূসা আলাইহিস সালাম এর ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরাই বেশি হক্বদার। অতঃপর তিনি এ সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন এবং ইয়াহুদীদের বিপরীতে এ সিয়ামের পূর্বে (৯ম, ১০ম) অথবা পরের একদিন (১০ম, ১১শ) মোট দু'টি সিয়াম পালনের আদেশ করেন।
তাই আশুরার দিনে সিয়াম পালন করা শরী'আত সম্মত। কিন্তু জাহিলরা এ দিনে সিয়াম পালনের ব্যাপারে অতিরিক্ত কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। তাই ইয়াহুদীরা এ দিনকে ঈদের দিন হিসাবে নির্ধারণ করে তাদের ঘড়-বাড়ি, সন্তানাদি ও স্ত্রীদেরকে সজ্জিত করে তুলে এবং দিনটিকে ঈদের দিন গণ্য করে। এভাবে তারা শরী'আতের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে। তাই আশুরার দিনে সিয়াম পালনের সাথে অতিরিক্ত কিছু করা জাহিলী কর্ম। অনুরূপভাবে রাফেযীরাও এ দিনকে শোক, মাতম ও বিলাপের দিন হিসাবে গণ্য করে অতিরিক্ত কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। কেননা, এ দিনে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে হত্যা করা হয়েছে।
অপরদিকে জাহিলদের ইবাদতের কমতি হলো যেমন হজ্জের ক্ষেত্রে তাদের দ্বারা যা কিছু ঘটে। জাহিলী যুগে তারা হজ্জ পালন করতো, এজন্য যে, এটা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু হজ্জ পালনের সময় তারা অনেক পরিবর্তন করে এবং শিরকী কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। কেননা, আল্লাহ তা'আলা আরাফায় অবস্থান করা বিধিবদ্ধ করেছেন। কিন্তু তারা আরাফায় অবস্থান করতো না বরং মুযদালিফায় অবস্থান করতো। এটাই ইবাদতের কমতি। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হাজ্জ পালন করতেন তারা ধারণা করতো যে, তিনি তাদের সাথে মুযদালিফায় অবস্থান করবেন। অতঃপর নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফা অতিক্রম করে সেখানে অবস্থান করেন। আর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আদর্শের উপর হজ্জ পালন করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ} [البقرة: ١٩৯]
অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তন কর, যেখান থেকে মানুষেরা প্রত্যাবর্তন করে (সূরা বাক্বারাহ ২:৯৯)।
অর্থাৎ আরাফা হতে (প্রত্যাবর্তন করো)। মুশরিকদের মুযদালিফায় অবস্থানের ব্যাপারে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অনুরূপভাবে তারা তালবিয়া পাঠেও অতিরিক্ত কথা যোগ করতো, তাদের তালবিয়া হলো:
إلا شريكاً هو لك. تملكه وما ملك)
ইল্লা শারীকান হুয়া লাকা, তামাল্লাকুহু ওয়ামা মুলক।
এ সবই হচ্ছে ইবাদতের মাঝে কমতি। এ সব কিছু জাহিলী দীনের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে যারা দীনের মাঝে অতিরিক্ত কিছু সংযোজন করে তারাও জাহিলী দীনের উপরই রয়েছে। তাই বিদ'আত ও কুসংস্কার সবই জাহিলী দীনের অন্তর্ভুক্ত。
টিকাঃ
৪৮. জ্বহীহ বুখারী হা/২০০৪,৩৯৪২,৩৯৪৩ মুসলিম হা/১১৩০।
📄 আল্লাহভীরিতার দোহাই দিয়ে আল্লাহর ওয়াজিব বিষয়গুলো বর্জন করা
আল্লাহ ভীতির অন্তর্ভুক্ত ওয়াজীব পরিত্যাগ করা。
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ ওয়াজিব ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাইতো। যেমন আরাফায় অবস্থানের পরিবর্তে মুযদালিফায় অবস্থান করা। তারা ধারণা করতো যে, এটাই আল্লাহ ভীতি। কেননা, তারা ছিল হেরেমের অধিবাসী, তাই আরাফার দিকে তারা গমন করতো না। কারণ আরাফা হলো তাদের ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জায়গা। তাই সতর্ক হয়ে এ হকুকে তারা বর্জন করতো। এটাও জাহিলী কর্ম। আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
এরূপই সতর্কতা স্বরূপ জাহিল কর্তৃক হক্ব বর্জন করার আরো দৃষ্টান্ত হলো যে, তারা নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফ করতো এবং লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার হক্বকে তারা বর্জন করতো, যা (ঢেকে রাখা) আল্লাহ ভীতির অন্তর্ভুক্ত। তারা বলতো,
لا نطوف بثياب عصينا الله فيها
আমরা পোষাক পরিহিত অবস্থায় তাওয়াফ করবো না, তাতে আমরা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে যাব।
অনুরূপ যে কেউ ইবাদতের কোন অংশ সতর্কতা স্বরূপ বর্জন করে, সে ঐ ব্যক্তির মতই যে লোকদের ইবাদত দেখা এবং ইবাদতের কথা শ্রবণের ভয়ে যাকাত দেয় না এবং জামা'আতের সাথে মসজিদে জ্বালাত আদায় করে না। যেমন আমরা তাদের কতিপয়ের নিকট থেকে শুনে থাকি। অথবা তারা দীনি জ্ঞান অর্জন করে না অথবা লোক দেখার শঙ্কায় ইবাদতের বিভিন্ন বিষয় ছেড়ে দেয়。
টিকাঃ
৪৯. উরওয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, জাহিলী যুগে হুমস ব্যতীত মানুষেরা নগ্ন হয়ে (বাইতুল্লাহ) তাওয়াফ করতো। আর হুমস হলো কুরাইশ ও তাদের ঔরসজাত সন্তান-সন্ততি। হুমসরা লোকদের সেবা করে সওয়াবের আশায় পুরুষ পুরুষকে কাপড় দিতো এবং সে তা পরিধান করে তাওয়াফ করতো। আর স্ত্রীলোক স্ত্রীলোককে কাপড় দিতো এবং এ কাপড়ে সে তাওয়াফ করতো। হুমসরা যাকে কাপড় দিতো না সে নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফ করতো....। ছহীহ বুখারী হা/১৬৬৫, ছহীহ মুসলিম হা/১৫২/১২১৯। বুখারী কিতাবুছ ছালাতে ২ নং বাবে-পরিচ্ছেদে উল্লেখ করেন। নগ্ন না হয়ে কাবা তাওয়াফ করতে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করেন। ছহীহ মুসলিম হা/১৩৪৭。