📄 আল্লাহর কিতাবের ভাষ্য বিকৃতি ও পরিবর্তন করা
আল্লাহর কিতাবের কথা স্ব-স্থান হতে বিকৃতি ও ভাষা পরিবর্তন করা।
ব্যাখ্যা: কিতাবের কথা স্ব-স্থান হতে পরিবর্তন করা বলতে ভাষার বর্ণের পরিবর্তন অথবা অর্থের বিকৃতি সাধন। আহলে কিতাবদের জঘন্য স্বভাব হলো তারা কিতাবের কথাকে স্ব-স্থান হতে পরিবর্তন করে। ফলে শব্দাবলী ও অর্থের পরিবর্তন এবং অপব্যাখ্যার মাধ্যমে এ বিকৃতি ঘটে। তাই যারাই আল্লাহর কালামের বিকৃতি সাধন করে, তারাই জাহিলী রীতির উপর বিদ্যমান। আর ইসলামের দিকে সম্পৃক্তকারী বাতিলপন্থী ও ইসলাম বিরোধী ভ্রষ্টদল তাদের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন ও মাযহাবের অনুসরণের জন্য আল্লাহর কিতাবের (نص) নজ্ব-মূল অংশ পরিবর্তন করে। আর শব্দের পরিবর্তন অথবা অর্থের বিকৃতি সাধন অথবা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে যাই তারা তা করুক না কেন তা জাহিলদের উত্তরাধীকার হিসাবে গণ্য হবে。
আল্লাহ তা'আলা শব্দ-অর্থসহ যা নাযিল করেছেন তার প্রতি ঈমান আনা এবং কোন পরিবর্তন ও বিকৃতি ছাড়াই বিধান অনুসারে আমল করা ওয়াজীব। চাই তা প্রবৃত্তি ও আকাঙ্খার অনুকূল অথবা প্রতিকূলে হোক। (তা মেনে নেয়া আবশ্যক)।
বর্তমানে নিকৃষ্ট পথ অবলম্বনকারী ও মিথ্যা মাযহাবীরা কুরআনের )نص( নজ্ব-মূল রচনা ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত ছহীহ হাদীছের )متن( মতন-মূলপাঠ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা প্রতিহত ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে অক্ষম হয়ে পরিবর্তন করেছে এবং মূল তাফসীর বাদ দিয়ে অপব্যাখ্যা করছে। এটাই হলো জাহিলী ও ইয়াহুদীদের রীতি।
আল্লাহর কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহকে সম্মান করা মুমিনের উপর ওয়াজীব। তাই আল্লাহ তা'আলা ও তার রসূল যেভাবে চেয়েছেন সেরূপেই শব্দ ও অর্থ উভয় দিক থেকে মুমিন এ দু'টিকে বিশ্বাস করবে। আর )نص( নজ্ব-মূল অংশের অর্থ পরিবর্তন করবে না এবং শব্দের সাথে অতিরিক্ত সংযোজন অথবা বিয়োজনের মাধ্যমে পরিবর্তনও করবে না, অথবা মিথ্যা কিছু যোগও করবে না。
📄 হক্ পন্থীদেরকে মন্দ উপাধি দেয়া
হিদায়াত ও সঠিক পথের অনুসারীদেরকে সাবয়ী-দীনত্যাগী ও মন্দ উপাধী দেয়া。
ব্যাখ্যা: জাহিলদের রীতি হলো হেদায়াত পন্থীদেরকে অবজ্ঞা করা এবং তাদেরকে নোংরা মন্দ শব্দের মাধ্যমে উপাধী দেয়া। তারা হক্বপন্থীদেরকে সাবয়ী-দীনত্যাগী নামে ডাকে। আর )الصابئ( সাবয়ী হলো যে দীন থেকে বেরিয়ে যায়। তাই জাহিলরা হকুপন্থীদেরকে সাবয়ী-দীনত্যাগী নামে ডাকে, যেন হকু থেকে বেরিয়ে গিয়েছে! কেননা, জাহিলরা যে কুফরী ও ভ্রষ্টতার উপর আছে তাদের পরিভাষায় সেটাই হক্ব। আর যারা রসূলের আনুগত্য করে, তারা সাবয়ী-দীনত্যাগী অর্থাৎ জাহিলদের অভ্যাস, অন্ধঅনুকরণ, পদ্ধতি, প্রথা এবং তাদের বাপ-দাদাদের রীতি থেকে তারা বেরিয়ে গেছে। আর জাহিলরা তাদেরকে )شوية) হাশাবীয়া তথা অনর্থক কর্মকারী নামেও ডাকে। )الحشوية( আল-হাশাবীয়া শব্দটি )الحشو( আল- হাশবু থেকে উদ্ভুত। আর হাশবু হলো অনর্থক বিষয় যাতে কোন উপকারীতা নেই।
আর হাশবুল কালাম অনর্থক কথা হলো যাতে কোন কল্যাণ নেই। জাহিলরা তাদেরকে অদক্ষ, পশ্চাদমুখী, স্থুলবুদ্ধি সম্পন্ন এবং এরূপ অন্যান্য শব্দাবলীর মাধ্যমে নাম দেয়। কিন্তু এসব হক্বপন্থীদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতি বলেছিল,
{وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْي} [হুদ: ২৭]
আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে (সূরা হুদ ১১:২৭)। অর্থাৎ হক্বপন্থীরা অদক্ষ, তাদের চিন্তা-চেতনা নেই। হে নূহ! চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই তারা তোমার অনুসরণ করে। বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্নদের চিন্তা-চেতনা আছে তাই তারা তোমার অনুসরণ করেনি。
📄 আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করা এবং হক্কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা
ব্যাখ্যা: আল্লাহ, তার রসূল এবং হক্বের প্রতি মিথ্যারোপ করা জাহিলী রীতির অন্তর্ভুক্ত। যেমন জাহিলরা নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফের সময় বলতো,
{وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِمَا} [আল-আ'রাফ: ২৮]
আমরা এতে আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি এবং আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আল আরাফ ৭:২৮)। এটাই আল্লাহ তা'আলার প্রতি মিথ্যারোপ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِباً} [আল-আন'আম: ২১]
আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে (সূরা আন'আম ৬:২১)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ} [آل عمران: ۷৮]
তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা বলে, অথচ তারা জানে (সূরা আল ইমরান, ৩:৭৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْكَاذِبُونَ} [النحل: ١٠٥]
একমাত্র তারাই মিথ্যা রটায়, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে না। আর তারাই মিথ্যাবাদী (সূরা আন নাহল, ১৬:১০৫)।
{ وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لا يُفْلِحُونَ} [النحل: ١১৬]
তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না (সূরা আন নাহল ১৬:১১৬)।
অনুরূপভাবে যারা রসূলের উপর মিথ্যারোপ করে, (তারা বলে) তিনি যে হাদীছ বর্ণনা করেন, তা মিথ্যা। আর যে, বিশ্বস্ততা ও প্রমাণ ছাড়া হাদীছ বর্ণনা করে, সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ কারণে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من حدث عني بحديث وهو يرى أنه كذب فهو أحد الكاذبين"
যে আমার পক্ষ থেকে এমন হাদীছ বর্ণনা করে অথচ সে জানে তা মিথ্যা, সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করাই জাহিলদের অভ্যাস। যেমন তারা ধারণা করে, আল্লাহ তাদেরকে নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফ করতে আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা যা হালাল করেছেন তারা তা হারাম করে। তারা আরো ধারণা করে যে, আল্লাহ তা'আলা এটা তাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَقَالَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا عَبَدْنَا مِنْ دُونِهِ مِنْ شَيْءٍ ... } [النحل: ৩৫] ،
আর যারা শির্ক করেছে, তারা বলল, যদি আল্লাহ চাইতেন তবে আমরা তাকে ছাড়া কোন কিছুর ইবাদত করতাম না (সূরা নাহাল ১৬:৩৫)। {لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا} [الأنعام: ১৪৮]
আল্লাহ যদি চাইতেন, আমরা শিরক করতাম না (সূরা আন'আম ৬:১৪৮)। {لَوْ شَاءَ الرَّحْمَنُ مَا عَبَدْنَاهُمْ} [الزخرف: ২০] ,
পরম করনাময় আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমরা এদের ইবাদাত করতাম না (সূরা যুখরুফ ৪৩:২০)।
এসবই আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ। কেননা, জাহিলরা যে রীতির উপর আছে তা অস্বীকার করার জন্য আল্লাহ তা'আলা রসূলগণকে প্রেরণ করেছেন।
সার কথা হলো আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি মিথ্যারোপ করা জাহিলী কর্ম। সুতরাং এ নিকৃষ্ট কর্ম থেকে মুসলিমদের সতর্ক থাকা আবশ্যক। মুসলিম কখনো আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে না। আর সে আল্লাহ ও তার রসূলের নির্দেশ ও ফাতওয়া পরিবর্তনের চেষ্টা করে না। আর যে ব্যক্তি কোন কিছু বর্ণনা করে, যা ভুল ও দলীলবিহীন, আর তা মানুষের মাঝে প্রচার করে, সে হবে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর এরূপ বর্ণনা ও প্রচারের মাধ্যমে সে মানুষের ক্ষতি সাধন করে।
আবশ্যক-ওয়াজীব হলো মিথ্যা-জাল হাদীছ যেন প্রচার ও বর্ণনা করা না হয়, বরং প্রচারণার পথ বন্ধ করা ও তাতে কঠোরতা আরোপ করা হবে। আর উপদেশ দাতা ও দা'ঈগণ আল্লাহ ও রসূল সম্পর্কে যা বলেন সে ব্যাপারে যেন তারা সাবধানতা অবলম্বন করেন। অনুরূপভাবে হালাল, হারাম ও ফাতওয়া সম্পর্কেও তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে যেন তারা তাড়াহুড়া না করেন। কেননা, ইলম-জ্ঞান ছাড়া আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে ভুল বলার সম্ভাবনা আছে। অনুরূপভাবে আল্লাহ ও রসূল থেকে প্রমাণিত হক্ব সম্পর্কে মিথ্যারোপ করা থেকেও তারা সতর্ক হবে। আর আল্লাহ ও রসূল সম্পর্কে অন্যায়ভাবে মিথ্যারোপ করে তারা যেন কোন কিছু বর্ণনা না করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَبَ عَلَى اللَّهِ وَكَذَّبَ بِالصِّدْقِ إِذْ جَاءَهُ} [الزمر: ৩২]
সুতরাং তার চেয়ে অধিক যালিম আর কে? যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে এবং তার কাছে সত্য আসার পর তা অস্বীকার করে। জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাসস্থল নয়? (সূরা যুমার ৩৯:৩২)।
আল্লাহ ও তার রসূলের কথা যখন কু-প্রবৃত্তির অনুকূলে না হয়, তখন প্রবৃত্তি পূজারীদের মত আল্লাহ ও রসূলের কথা মিথ্যা দ্বারা পরিবর্তন করে তাতে তারা সন্দেহ সৃষ্টি করে。
টিকাঃ
৪৯. মুসলিম হা/১, বিশস্ত রাবী হতে হাদীছ বর্ণনা করা ওয়াজীব এবং মিথ্যুক রাবীদের হাদীছ পরিত্যাজ্য। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি মিথ্যারোপে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।
📄 হক্ পন্থীদের বিরুদ্ধে শাসক শ্রেণীকে ক্ষেপিয়ে তোলা
জাহিলরা দলীল-প্রমাণে পরাজিত হলে শাসকের নিকট অভিযোগ করে। যেমন জাহিলরা বলেছিল, আল্লাহ তা'আলা বলেন, {أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ} [الأعراف: ۱২৭] আপনি কি মূসা ও তার জাতিকে ছেড়ে দেবেন যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে (সূরা আরাফ ৭:১২৭)।
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যা হলো দলীল প্রমাণে পরাজিত হলে, তারা শাসকের নিকট আশ্রয় গ্রহণের দাবি পেশ করে। আর এখানে )"غلبوا بالحجة"( গুলিবু বিল হুজ্জাহ তথা দলীলের মাধ্যমে পরাভূত হওয়া বলতে জাহিলরা যে বাতিল-মিথ্যা রীতির উপর বহাল ছিল তার বিরূদ্ধে দলীল পেশ করা হয়েছে। জাহিলদের নিকট এমন কোন দলীল নেই, যা তারা পেশ করবে। বরং হক্ব প্রতিষ্ঠায় বাধাদানের জন্য তারা শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে। যেমন মূসা আলাইহিস সালামকে ফেরআউন বলেছিল,
{لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَهَا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ} [الشعراء: ২৯] ফের'আউন বলল, 'যদি তুমি আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাকে কয়েদীদের অন্তর্ভুক্ত করব (সূরা শু'আরা ২৬:২৯)।
فإنهم يلجأون إلى القوة لمنع القائم بالحق، كما قال فرعون لموسى عليه السلام {لَئِنِ اتَّخَذْتَ إِلَهَا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ} [الشعراء: ২৯] আল্লাহর নাবীকে পরাভূত করার জন্য তার নিকট যখন কোন দলীল ছিল না, তখন রাজত্বের শক্তিকে আশ্রয় করে সে বলেছিল,
{لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ} [الشعراء: ২৯] অবশ্যই আমি তোমাকে কয়েদীদের অন্তর্ভুক্ত করব (সূরা শু'আরা ২৬:২৯)।
এটাই পরাজিত দলের পন্থা। অনুরূপভাবে ফেরআউনের অনুসারী সম্প্রদায়ের বিরূদ্ধে তাদের চুক্তিকৃত মহা সমাবেশে মূসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করেছিলেন। আর মূসা আলাইহিস সালাম এর নিকট যে নিদর্শন ছিল তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য ফেরআউন পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের সব যাদুকরকে একত্রিত করে। কেননা, ফেরআউন ধারণা করেছিল মূসা আলাইহিস সালাম একজন যাদুকর। তাই সে সব যাদুকরদের ডেকেছিল। আর ফেরআউন মূসা আলাইহিস সালাম এর নিকট থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিল, যাতে মূসা আলাইহিস সালাম যাদুকরদের সামনে তার নিদর্শন তুলে ধরে এবং যাদুকররাও তাদের যাদু প্রদর্শন করে। তার উদ্দেশ্যে ছিল, যাদুকররা যেন মূসা আ. কে জনগণের সামনে পরাজিত করে এবং তার নিকট যে মু'জিযা আছে তা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে।
অতঃপর অঙ্গীকার পূরণের সময় হলো এবং যা ঘটবে তা প্রত্যেক্ষ করার জন্য জনগণ একত্রিত হয়। যাদুকররা তাদের যাদু প্রদর্শন করলে তা দ্বারা প্রাঙ্গণ পূর্ণ হয়, আর তাদের নিকট যে লাঠি, দড়ি ছিল তা তন্ত্র দিয়ে প্রদর্শন করলে কিছুক্ষণ পর অনেক সাপে পরিনত হয়ে নড়াচড়া করতে আরম্ভ করে। আর যাদুকররা মূসা আলাইহিস সালাম এর মু'জিযার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে চায়। এমতবস্থায় মূসা আলাইহিস সালামএর লাঠি সাপে পরিণত হয়। অতঃপর তারা বড় বড় যাদু প্রদর্শন করে যেমনভাবে আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, মূসা আলাইহিস সালাম ভীত হয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَأَوْجَسَ فِي نَفْسِهِ خِيفَةً مُوسَى} [طه: ٦٧]
মূসা তার অন্তরে কিছুটা ভীতি অনুভব করল (সূরা ত্ব-হা ২০:৬২)।
যাদুকররা জনগণের সামনে ধূম্রজাল তৈরি করতে পারে এ ব্যাপারে তিনি শঙ্কিত ছিলেন। যেহেতু মূসা আলাইহিস সালাম মু'জিযা ও আল্লাহর সাহায্য পাবেন বলে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু আশঙ্কাবোধ করছিলেন যে, যাদুকররা জনগণের সামনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। কেননা, যাদুকররাও ভীত ছিল যে, মূসার মু'জিযা তাদের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَوَقَعَ الْحَقُّ وَبَطَلَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانْقَلَبُوا صَاغِرِينَ وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ} [الأعراف: ۱۱৮-১২২]
ফলে সত্য প্রকাশ হয়ে গেল এবং তারা যা কিছু করছিল তা বাতিল হয়ে গেল। তাই সেখানে তারা পরাজিত হল এবং লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে গেল। আর যাদুকররা সিজদায় পড়ে গেল। তারা বলল, 'আমরা সকল সৃষ্টির রবের প্রতি ঈমান আনলাম, মূসা ও হারূনের রবের প্রতি (সূরা আরাফ ৭:১২২-১১৮)।
কেননা, তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মূসা আলাইহিস সালাম এর নিকট যা আছে তা যাদু নয়। অবশেষে যখন যাদুকররা ঈমান আনয়ন করলো এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট সিজদায় অবনত হলো, তখন ফেরআউন তাদেরকে হত্যা করা ও শুলে চড়ানোর হুমকি দেয়। পরিশেষে ঈমানদার ও তাওবাকারী যাদুকরদেরকে সে হত্যা করে এবং শুলে চড়ায়। আর বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা ঈমান আনে তাদের দিকে তারা মনোযোগ দিল এবং ফেরআউনকে তারা বললো, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآلِهَتَكَ قَالَ سَنُقَتِلُ أَبْنَاءَهُمْ وَنَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ} [الأعراف: ۱۲৭-১২৮]
'আপনি কি মূসা ও তার জাতিকে ছেড়ে দেবেন যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' সে বলল, 'আমরা অতিসত্বর তাদের ছেলেদেরকে হত্যা করব আর মেয়েদেরকে জীবিত রাখব। আর নিশ্চয় আমরা তাদের উপর ক্ষমতাবান।' মূসা তার কওমকে বলল, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয় যমীন আল্লাহর। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে তিনি চান তাকে তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য (সূরা আল আরাফ ৭:১২৭-১২৮)।
এখান থেকে বুঝা গেল যে, তারা রাষ্ট্রশক্তির নিকট আশ্রয় চেয়েছিল এবং তারা ফেরআউনের নিকট অভিযোগ পেশ করেছিল যাতে হক্ব ও ঈমান পরাভূত হয়। আর জাহিলদের মত এহেন কর্মকান্ড সবযুগেই ঘটে চলছে।