📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আল্লাহ তা'আলার তাক্বদীরকে অস্বীকার করা

📄 আল্লাহ তা'আলার তাক্বদীরকে অস্বীকার করা


ব্যাখ্যা: সকল বিষয়-বস্তু সম্পর্কে আল্লাহর জ্ঞানই হলো ক্ষমতা। কোন বিষয় বা বস্তুর অস্তিত্ব লাভের পূর্বে আল্লাহ তা'আলা তার ভাগ্যলিপি নির্ধারণ করেন। আর লাওহে মাহফুযে তা লেখা থাকে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তা সৃষ্টি করেন। ঈমানের ছয়টি রুকুনের একটি হলো ভাগ্যের প্রতি বিশ্বাস রাখা। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"الإيمان أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر ، وتؤمن بالقدر خيره وشره"
আল্লাহ, ফেরেস্তামন্ডলী, কিতাবসমূহ, রসূলগণ, আখেরাত এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা হচ্ছে ঈমান। আল্লাহ তা'আলা বলেন,

{إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ} [القمر: ٤٩]
নিশ্চয় আমি সব কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী (সূরা ক্বামার ৫৪:৪৯)।

ভাগ্য নির্ধারণ আল্লাহ তা'আলার কর্মসমূহের একটি। আল্লাহ তা'আলা যা নির্ধারণ করেন ও যা চান তার রাজত্বে কেবল তাই ঘটে। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলাই জানেন, যা ঘটেছে ও ঘটবে। তিনি তার চিরন্তন জ্ঞানের মাধ্যমে সর্বদা গুণান্বিত। যা কিছু ঘটবে এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা তা লাওহে মাহফুযে লিখে রাখেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا } [الحديد: [٢٢
যমীনে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে এমন কোন মুসীবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। (সূরা হাদীদ ৫৭:২২)। অর্থাৎ আমি তা সৃষ্টি করি।
{إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ} [الحديد: ۲۲]
নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ (সূরা হাদীদ ৫৭:২২)।

নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
"واعلم أن ما أصابك لم يكن ليخطأك لم يكن ليصيبك"
তুমি জেনে রাখো তোমার ব্যাপারে যা কিছু ঘটে তা তোমার ভুল কিংবা সঠিকতার কারণে নয়। তিনি আরো বলেন,
"رفعت الأقلام وجفت الصحف"
কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং ছহীফা লিপিবদ্ধ বন্ধ হয়েছে।

তাই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ব্যতীত কিছুই ঘটে না। আল্লাহ তা'আলা যা কিছু সৃষ্টি করেন কেবল তাই ঘটে। তার বাণী:

{اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ} [ الزمر: ৬২] আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা (সূরা যুমার ৩৯:৬২)।

তিনি ভাল-মন্দ উভয়ই সৃষ্টি করেন এবং তার ভাগ্য নির্ধারণ করেন। ভাগ্যের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন নাম করা হয়, এর কতিপয় পর্যায় রয়েছে।
প্রথম: আল্লাহ তা'আলা সবকিছু জানেন এ ব্যাপারে বিশ্বাস রাখা। দ্বিতীয়: আল্লাহ তা'আলা সবকিছু লাওহে মাহফুযে লিখে রেখেছেন। তৃতীয়: আল্লাহ তা'আলা যা কিছু ইচ্ছা করেন তা এ জগতে ঘটে। তার ইচ্ছা ব্যতীরেকে কোন কিছুই ঘটে না
চতুর্থ: আল্লাহ তা'আলা সব কিছুর স্রষ্টা এবং কর্মবিধায়ক।
এটাকেই বলা হয়, ভাগ্যের প্রতি ঈমান। জাহিলরা ভাগ্য বিশ্বাস করতো না। জাহিলদের ভাগ্য অস্বীকার করার ব্যাপারে কুরআনের তিনটি আয়াত রয়েছে। প্রথমত সূরা আন'আমে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ شَيْءٍ} [الأنعام: ، [১৪৮
অচিরেই মুশরিকরা বলবে, আল্লাহ যদি চাইতেন, আমরা শিরক করতাম না এবং আমাদের পিত-পুরুষরাও না এবং আমরা কোন কিছু হারাম করতাম না (সূরা আন'আম ৬:১৪৮)। তিনি সূরা নাহলে বলেন,
{وَقَالَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا عَبَدْنَا مِنْ دُونِهِ مِنْ شَيْءٍ نَحْنُ وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِنْ دُونِهِ مِنْ شَيْءٍ} [النحل: ৩৫] ،
আর যারা শিরক করেছে, তারা বলল, যদি আল্লাহ চাইতেন তবে আমরা তাকে ছাড়া কোন কিছুর ইবাদত করতাম না এবং আমাদের পিতৃ-পুরুষরাও না (সূরা নাহাল ১৬:৩৫)। তিনি সূরা যুখরুফে আরো বলেন,
{وَقَالُوا لَوْ شَاءَ الرَّحْمَنُ مَا عَبَدْنَاهُمْ} [الزخرف: ২০]
তারা আরো বলে, পরম করুণাময় আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমরা এদের ইবাদত করতাম না, এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই (সূরা যুখরুফ ৪৩:২০)।

দু'টি কথার উপর ভিত্তি করে আলিমগণ এ আয়াত তিনটির তাফসির করেছেন।
প্রথমত: জাহিলদের এ কথার উদ্দেশ্য হলো ভাগ্য অস্বীকার করা। তারা বলতো, আল্লাহ তা'আলার যদি ইচ্ছাই থাকতো, তাহলে আমরা এসব কর্ম ছেড়ে দিতাম। তাদের উদ্দেশ্যেই হলো ভাগ্যকে অস্বীকার করা। আর যারা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ব্যতিরেকে এসব কর্ম করে তারা ভাগ্যকে অস্বীকার করে। তারা নিজেদেরকে এ কর্মসমূহের দিকে সম্পৃক্ত করে এবং নিজেদেরকে স্বাধীন মনে করে। এটা সম্পূর্ণরূপে মু'তাযিলা মতের দৃষ্টান্ত। কেননা তারা বলে: কুফরী, ঈমান, ভাল ও মন্দের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার কোন ইচ্ছা নেই, এসব বান্দারই কর্ম। সুতরাং মু'তাযিলারা জাহিলদের মতই কথা বলে।
দ্বিতীয়ত: তাদের কথা ( "لَوْ شَاء اللهُ مَا أَشْرَكْنَا") অর্থ আল্লাহ তা'আলা চাইলে আমরা শিরক করতাম না। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা আমাদের এসব কর্মের ব্যাপারে সন্তুষ্ট আছেন। তিনি যদি সন্তুষ্ট না হতেন তাহলে এসব শিরকী আমল করার জন্য তিনি আমাদেরকে ছেড়ে দিতেন না। এভাবে তারা ভাগ্যে বিশ্বাস করে। তাদের কুফরীকে সঠিক বলে প্রমাণ করার জন্য তারা ভাগ্যে বিশ্বাস প্রয়োজন মনে করে।
তাদের ভাগ্যে বিশ্বাস এমন পর্যায় পৌঁছেছে; যার কারণে তারা বলে, এ শিরকী কর্ম আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য সমতুল্য। কেননা, তিনি চান যে, আমরা তার ইচ্ছার আনুগত্য করি ও ভাগ্যকে মেনে নেই।
দ্বিতীয় কথায় তাদের মন্দ কর্মের উপর তারা ভাগ্যকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করে। আর জাবরিয়‍্যাদের কথা হলো তাদের মধ্যে থেকে আল্লাহ তা'আলা এ মন্দ কর্ম চান। আর তাদের মন্দ কর্মকে ভাল সাব্যস্ত করার উপর ভাগ্যকে তারা দলীল হিসাবে পেশ করে বলে, বান্দা তার কর্মের জন্য বাধ্য। এ ব্যাপারে তারাও জাহিলদের উত্তরসূরী। (তাদের কথা) ভাগ্যকে অস্বীকার অথবা বিশ্বাস করা দু'টি অর্থের কোন একটির উপর আয়াতটি প্রমাণ করে। এর মাধ্যমে তারা আল্লাহ তা'আলার কথাকে দলীল হিসাবে পেশ করে। আল্লাহ তা'আলা তাদের কথাকে প্রত্যাখান করে বলেন,
{ قُلْ هَلْ عِنْدَكُمْ مِنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا} [الأنعام: ١٤٨] ،
বল, তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে? (সূরা আন'আম ৬:১৪৮)।
আল্লাহ তা'আলা কুফরীর ইচ্ছা করেননি এ কথার প্রমাণ কি?

দ্বিতীয় ব্যাখ্যার কথা: আল্লাহ তা'আলা জাহিলদের এসব মন্দ কর্ম, কুফরী, শিরক ও অশ্লীলতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন এ কথার দলীল কি? কোথাও কি দলীল আছে? আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{هَلْ عِنْدَكُمْ مِنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِنْ تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنْتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ قُلْ فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ فَلَوْ شَاءَ هَدَاكُمْ أَجْمَعِينَ} [الأنعام: ١٤٨، ١٤٩] ،
তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে? তোমরা তো শুধু ধারণার অনুসরণ করছ এবং তোমরা তো কেবল অনুমান করছ। বল, 'চূড়ান্ত প্রমাণ আল্লাহরই। সুতরাং যদি তিনি চান অবশ্যই তোমাদের সবাইকে হিদায়াত দেবেন (সূরা আন'আম ৬:১৪৮,১৪৯)।

আল্লাহ তা'আলা যাকে চান হেদায়াত দান করেন এবং যাকে চান পথভ্রষ্ট করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার হেকমত রয়েছে, তিনি জানেন কে হেদায়াত লাভের উপযুক্ত আর কে উপযুক্ত নয়। অধিক উপযুক্ত ব্যক্তিকেই তিনি হেদায়াত দান করেন। আর জাহিলদের কথাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন এভাবে যে, তিনি যদি তাদের মন্দ কর্মের প্রতি সন্তুষ্টই হতেন, তাহলে শিরক অস্বীকার করা ও তাওহীদ মেনে নেয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি রসূলগণকে পাঠাতেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ} [النحل: ٣٦] ،
আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং পরিহার কর তাগুতকে (সূরা নাহাল ১৬:৩৬)।

ত্বাগুতের ইবাদত, শিরক ও কুফরী যা তারা ধারণা অনুযায়ী করে যদি তিনি এসবের প্রতি সন্তুষ্ট হতেন তাহলে তা নিষেধ করার জন্য তিনি রসূলগণকে পাঠাতেন না। তাই এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি যদি কুফরী, শিরক, অবাধ্যতা ও মতানৈক্য পছন্দ করতেন তাহলে রসূলগণকে পাঠাতেন না। বরং এসবের প্রতি আল্লাহ তা'আলা শত্রুতা পোষণ করেন এবং তা প্রত্যাখ্যান করেন। সূরা যুখরূফে আল্লাহ তা'আলা জাহিলদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন,
{مَا لَهُمْ بِذَلِكَ مِنْ عِلْمٍ إِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ} [الزخرف: ٢٠]
তারা আরো বলে, পরম করুনাময় আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমরা এদের ইবাদাত করতাম না, এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু মনগড়া কথা বলছে (সূরা যুখরুফ ৪৩:২০)।

{هَلْ عِنْدَكُمْ مِنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا} [الأنعام: ١٤٨] ،
বল, তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে? (সূরা আন'আম ৬:১৪৮)।

তারা যা জানে না সে ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার প্রতি তারা মিথ্যা আরোপ করে। এসব ব্যাপারে শরী'আত, কিতাব ও সুন্নাহর দলীল ছাড়া কথা বলা ঠিক নয়। এ বিষয়ে বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তা-ভাবনা ও রায়ের (সিন্ধান্তের) উপর নির্ভর করাও যাবে না。

টিকাঃ
৪১. ছহীহ বুখারী ৫০, জ্বহীহ মুসলিম ১০。
৪২. আবূ দাউদ, হা/৪৬৯৯-৪৭০০, ইবনে মাজাহ, হা/৭৭।
৪৩. জ্বহীহ: মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৬৯, জ্বহীহ জামে, হা/৭৯৫৭।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আল্লাহ তা'আলা ভাগ্যে কুফরী নির্ধারণ করেছেন বলে অজুহাত পেশ করা

📄 আল্লাহ তা'আলা ভাগ্যে কুফরী নির্ধারণ করেছেন বলে অজুহাত পেশ করা


কুফরীর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার কথার দলীল পেশ করা。
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ ভাগ্যের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার কথার উপর এভাবে প্রমাণ পেশ করা যে, কুফরী ও অবাধ্যতায় জাহিলরা ওযর গ্রন্থ; আল্লাহ তা'আলাই তাদের জন্য এসবের ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য কোন দলীল পেশ করেননি। বরং তাদেরকে তিনি স্বাধীনতা, শক্তিমত্তা ও ইচ্ছাশক্তি দান করেছেন। আর তাদের জন্য বর্ণনা করেছেন ভাল-মন্দ উভয় পন্থা। আর তাদেরকে তিনি দান করেছেন ক্ষমতা, এর মাধ্যমে তারা কিছু করা বা না করার সক্ষমতা রাখে। তারা যা বলে তাতে তারা বাধ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা এটাও বর্ণনা করেন, তিনি তার বান্দার কুফরীকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ} [الزمر: ٧]
আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না (সূরা যুমার ৩৯:৭)।
তিনি যদি কুফরীকে নির্ধারণই করতেন এবং তা চাইতেন তাহলে তার সন্তুষ্টি অর্জন আবশ্যক হত না। আল্লাহ তা'আলা কুফরীর প্রতি শত্রুতা রেখে এর পরিণাম নির্ধারণ করেন। যাতে তিনি কতিপয় মানুষ থেকে কতিপয়কে যাচাই করতে পারেন, মিথ্যাবাদী হতে সত্যবাদী এবং কাফির হতে মুমিন বাছাই করতে পারেন। আর খাঁটি মুমিন হতে মুনাফিককে স্পষ্ট করতে পারেন। আল্লাহ তা'আলা হিকমতের জন্য এসব অপছন্দনীয় বিষয়ের নিয়তি নির্ধারণ করেন। তিনি অনর্থক এসব পরিণাম নির্ধারণ করেননি। স্বাধীনভাবে এসব কৃত কর্মের উপর জাহিলদের জন্য তিনি মন্দ প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন।
এ কারণে পাগল, নির্বোধ, নিরুপায় ও অচেতন ব্যক্তিকে পাঁকড়াও করা হবে না। কেননা তাদের কোন স্বাধীনতা নেই এবং বিবেক-বুদ্ধিও নেই। তাদের মাধ্যমে কুফরী সংঘটিত হলে তাদেরকে পাঁকড়াও করা হবে না। তাই আল্লাহ তা'আলা যাকে বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি দান করেছেন এবং কুফরী করতে বাধ্য করা হয়নি, তাকে জবাবদিহী করা হবে। কেননা স্বাধীনভাবে সে মন্দ গ্রহণে অগ্রগামী। সুতরাং ব্যভিচারী তার ইচ্ছায় ব্যভিচার করে, জ্বলাত পরিত্যাগকারী তার ইচ্ছায় জ্বলাত পরিত্যাগ করে অথচ তার সক্ষমতা আছে যে, সে জ্বলাত প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
এরূপই ব্যভিচারীর জন্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, ব্যভিচার হারাম। এর জন্য শান্তি ও লাঞ্ছনা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা ব্যভিচারের সুনির্দিষ্ট শান্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন। আর শিরক ও কুফরী হতে নিষেধ করার জন্য তিনি রসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং অবাধ্যতা, কুফরী, শিরক ও ভ্রষ্টতার মাধ্যমে জাহিলরা কিভাবে আল্লাহ তা'আলার উপর দলীল পেশ করে? অথচ তাদের নিকট কোন দলীলই নেই। বরং তাদের বিরূদ্ধে আল্লাহ তা'আলারই দলীল রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {قُلْ فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ} [الأنعام: ١٤٩] .
সুতরাং যদি তিনি চান অবশ্যই তোমাদের সবাইকে হিদায়াত দেবেন (সূরা আন'আম ৬:১৪৮ ১৪৯)।
কেবল বালা-মুছীবত, বিপদাপদে তাক্বদীরকে দলীল হিসাবে পেশ করা যাবে। কেউ বিপদগ্রস্থ হলে যেন ধৈর্য না হারায়। বরং মেনে নিবে, বিপদাপদ আল্লাহরই ক্ষমতা, তিনি যা চান তাই করেন। তাই বিপদে ধৈর্য ধারণ ও ছওয়াবের প্রত্যাশা করবে। আর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে ভাগ্যের কৈফিয়ত পেশ করা যাবে না। বরং আল্লাহ তা'আলার নিকট তাওবাহ করা, পাপাচারীতা ও মন্দকর্ম হতে বিরত থাকাই বান্দার উপর আবশ্যক। আর অন্যায় কাজের উপর ভাগ্যের মাধ্যমে দলীল পেশ করাই জাহিলী কর্ম।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আল্লাহ তা'আলার শরী'আত ও তাক্বদীরের মাঝে বৈপরীত্যের অভিযোগ করা

📄 আল্লাহ তা'আলার শরী'আত ও তাক্বদীরের মাঝে বৈপরীত্যের অভিযোগ করা


ভাগ্যের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার শরী'আতের বিরোধিতা করা。
ব্যাখ্যা: এ বিষয়টিও ভাগ্য সম্পর্কিত। কেননা ভাগ্যের মাধ্যমে যারা আল্লাহর শরী'আতের বিরোধিতা করে বলে, আল্লাহ তা'আলা কুফরী ও ঈমানকে কিভাবে নির্ধারণ করতে পারেন? অতঃপর আল্লাহর আদেশাবলী পালন ও নিষেধসমূহ বর্জনকে বান্দার জন্য তিনি বিধিবদ্ধ করে দেন অথচ সকল বিষয় ফায়ছালা ও নির্ধারণ হওয়ার পর আদেশ-নিষেধ পালন করায় কোন উপকার থাকে না। মানুষ কি এরূপ ভাগ্যের উপর নির্ভর করবে? এটি জাহিলদের একটি মারাত্মক সমস্যা।
যারা ধারণা করে, শরী'আত ও ভাগ্যের মাঝে বৈপরীত্য আছে তাদের প্রত্যেকেই কিয়ামত পর্যন্ত এ বিতর্কের পদ্ধতিই অনুসরণ করবে। এটিই হলো বাতিল পদ্ধতি। শরী'আত ও ভাগ্যের মাঝে কখনোই বৈপরীত্য নেই। আল্লাহ তা'আলা শিরক, পাপ এবং কুফরী নির্ধারণ করেছেন এবং তা নিষেধও করেছেন। আর ঈমান, প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং সংশোধন হওয়াকে তিনি বিধিবদ্ধ করেছেন। শরী'আত ও ভাগ্যের মাঝে কোন বিরোধ নেই। কেননা বান্দা স্বাধীনভাবে তার উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা অনুযায়ী এসব কর্ম করে। তাই কর্ম বান্দার দিকেই সম্পৃক্ত হবে। আর একারণেই বান্দার পাপের কারণে তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং আনুগত্যের কারণে ছওয়াব দেয়া হবে। যদিও ভাগ্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়, তবুও বান্দার কর্মের উপর তাকে প্রতিদান দেয়া হয়, ভাগ্যের উপর নয়। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাহাবীদের উদ্দেশে বর্ণনা করে বলেন,
مَا مِنْكُمْ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا وَمَقْعَدُهُ مَعْلُومٌ مِنَ الْجَنَّةِ أَوِ النَّارِ" قَالُوا: يَا رَسُولَ الله، أَلَا نَتَّكِلُ عَلَى كِتَابِنَا وَنَتْرُكُ الْعَمَلَ؟ قَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "اعْمَلُوا، فَكُلٌّ مُيَسِّرٌ لِمَا خُلِقَ لَهُ
তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই যার স্থান জান্নাত বা জাহান্নামে নির্ধারিত হয়নি। একথা শুনে সকলেই বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তাহলে কি আমরা ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকবো? উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা আমল করতে থাক। কারণ যাকে যে আমলের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে আমল সহজ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন,
{فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى وَأَمَّا مَنْ bَخِلَ وَاسْتَغْنَى وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى} [الليل: ٥-١٠]
সুতরাং যে দান করেছে এবং তাকওয়াহ অবলম্বন করেছে এবং উত্তম কে সত্য বলে বিশ্বাস স্থাপন করেছে আমি তার জন্যে সুগম করে দিব সহজ পথ। আর যে কার্পন্য করেছে এবং নিজেকে স্বয়ং সম্পূর্ণ মনে করে, এবং উত্তম কে মিথ্যা বলে মনে করেছে, আমি তার জন্যে সুগম করে দিব কঠিন পথ (সূরা লাইল ৯২:৫-১০)।
নেক বান্দা ভাল আমল করে এবং মন্দ পরিহার করে। আর ভাগ্য আল্লাহ তা'আলার একটি গোপনীয় বিষয়। এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক না করাই ভাল। কারণ তাতে লাভ হবে না এবং এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাবে না।
ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয়ের সার-সংক্ষেপ: উদাহরণস্বরূপ, ভাগ্য বিষয়ে মানুষ চার ভাগে বিভক্ত:
প্রথম: জাবরিয়‍্যাগণ (الجبرية) ভাগ্যকে মেনে নেয় ও শরী'আতকে অস্বীকার করে।
দ্বিতীয়: কাদরিয়‍্যাগণ (القدرية) শরী'আত মেনে নেয় এবং ভাগ্যকে অস্বীকার করে।
তৃতীয়: মুশরিকরা (المشركون) শরী'আত ও ভাগ্যকে সাব্যস্ত করে এবং তারা মনে করে যে উভয়ের মাঝে বৈপরীত্য আছে।
চতুর্থ: আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের (أهل السنة والجماعة) অনুসারীরা শরী'আত ও ভাগ্য উভয়টি স্বীকার করে এবং তারা উভয়টির মাঝে বৈপরীত্য অস্বীকার করে。

টিকাঃ
৪৪. জ্বহীহ বুখারী, হা/৪৯৪৫, ৪৯৪৭, জ্বহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৭。

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 ঘটমান ঘটনাকে সময় ও যুগের দিকে সম্পর্কিত করা এবং তাকে গালি দেয়া

📄 ঘটমান ঘটনাকে সময় ও যুগের দিকে সম্পর্কিত করা এবং তাকে গালি দেয়া


যুগকে গালি দেয়া সম্পর্কে জাহিলদের কথা, {وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ} [الجاثية: ٢٤] . আর কালই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে (সূরা জাছিয়া ৪৫:২৪)।
ব্যাখ্যা: নাস্তিকরা (الدهرية) ঘটমান অবস্থাকে যুগের সাথে সম্পৃক্ত করে। জাহিলদের নিকট কোন বিষয় অপছন্দ হলে তারা সেটাকে যুগের দিকে সম্পৃক্ত করে। আর পছন্দ না হওয়ার কারণে যুগকে তিরস্কার করে, অথচ সকল বিষয়-বস্তু মহান স্রষ্টার দিকেই সম্পৃক্ত করা আবশ্যক। আর যুগ হলো সময়, যা আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি সমূহের অন্তর্ভুক্ত। আর যুগের কোন পরিবর্তন নেই। চলমান অবস্থাকে যারা যুগের সাথে সম্পৃক্ত করে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, { وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ} [الجاثية: ٢٤ আর তারা বলে, 'দুনিয়ার জীবনই আমাদের একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর কালই কেবল আমাদেরকে ধ্বংস করে (সূরা জাছিয়া ৪৫:২৪)।

আর গালির মাধ্যমে আখেরাত ও পুনরুত্থানকে অস্বীকার হয়। }نموتُ وَنَحْيًا আমরা মরবো ও জীবিত হবো। অর্থাৎ মানুষ মরে ও জীবিত থাকে। আর জাহিলরা বলে, দয়াকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আর জমিনকে গ্রাস করা হয়েছে। আর তারা বলে, এটাই জীবনের স্বভাব। }وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ{ যুগই আমাদের ধ্বংস করে দিল।
জাহিলরা ধ্বংস হওয়াকে যুগের সাথে সম্পৃক্ত করে তাই দিন-রাত্রির অতিক্রম তাদের নিকট মৃত্যুর কারণ বলে গণ্য হয়। এখানে কোন নির্দিষ্ট কাল এবং নির্দিষ্ট ফেরেস্তাও নেই যে, যুগের সময় শেষ হলে প্রাণ হরণ করবে। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুগকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, "لا تسبوا الدهر، فإن الله هو الدهر" তোমরা যুগকে গালি দিও না। কেননা আল্লাহ তা'আলাই যুগ।
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলাই যুগের স্রষ্টা। আর যুগের মাঝে যা কিছু বিরাজমান তা আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত। হাদীছে কুদছিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "يؤذيني ابن آدم، يسب الدهر، وأنا الدهر، بيدي الأمر أقلب الليل والنهار" আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যুগকে গালি দেয়; অথচ আমিই যুগ। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা; রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি।
আর যুগকে গালি দেয়া হলে মূলতঃ যুগের স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলাকেই গালি দেয়া হয়। এভাবেই আদম সন্তান পবিত্র মহান রবকে কষ্ট দেয়। কেননা, যুগের তিরস্কার আল্লাহর উপর আরোপিত হয়। কারণ আল্লাহ তা'আলাই সকল বিষয়ের পরিবর্তনকারী আর সময়, বিপদাপদ এবং সবকিছু নির্ধারণকারী। যুগ আল্লাহ তা'আলারই সৃষ্টি। গালি ও তিরস্কার থেকে বিরত থাকা মুসলিমদের উপর আবশ্যক। মুসলিমরা কোন বিপদের সম্মুখ হলে তারা নিজেদের ব্যাপারে ভেবে দেখবে আর তাদের পাপকে তারা স্বীকার করে নেবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ} [الشورى: ٣٠]
আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃত কর্মেরই ফল। আর তোমাদের অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন (সূরা শুরা ৪২:৩০)। মানুষের উচিত নিজেদেরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা, যুগকে নয়。

টিকাঃ
৪৫. ইমাম বুখারী কিতাবুল আদাবে জ্বহীহ সূত্রে "باب "لا تسبوا الدهر নামক পরিচ্ছেদ বর্ণনা করেছেন। ছহীহ মুসলিম হা/২২৪৬।
৪৬. ছহীহ বুখারী হা/৪৮২৬, ৬১৮১,৭৪৯১ ছহীহ মুসলিম হা/ ২২৪৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00