📄 হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করা
জাহিলরা শিরকের মাধ্যমে যেমন ইবাদত করে তেমনি হালালকে হারাম করার মাধ্যমেও ইবাদত করে。
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যা: আল্লাহ তা'আলা যা আবশ্যকীয়ভাবে হারাম করেছেন, তার মাধ্যমে জাহিলদের ইবাদত করা তথা নৈকট্য লাভ করা। তাওয়াফের সময় তারা লজ্জাস্থান আবৃত রাখাকে হারাম করেছে যেমন মুশরিকদের এ অবস্থা সম্পর্কে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরাও এরূপ করেছে। খ্রিষ্টানরা অনেক পবিত্র জিনিসকে নিজেদের উপর হারাম করেছে। অপরদিকে, আল্লাহ তা'আলা যা কিছু হারাম করেছেন ইয়াহুদীরা তা নিজেদের জন্য বৈধ করে নিয়েছে, যেমন সুদ। অথচ হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে ও মানুষের সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।
আর মুশরিকরা বিভিন্ন প্রকার চতুষ্পদ জন্তু হারাম করেছে। এর মধ্যে (البحيرة) বাহিরাহ তথা ঝুলন্ত কান বিশিষ্ট উষ্ট্রী, (السائبة) সায়িবাহ তথা মুক্ত উষ্ট্রী ও (الوصيلة) ওয়াসিলাহ বা দু'বার বাচ্চা প্রসব করেছে এমন উষ্ট্রী উল্লেখ যোগ্য। এ চতুষ্পদ জন্তুকে তারা এসব নামকরণ করেছে। আর মূর্তির কারণে পশুগুলোকে তারা হারাম করেছে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদেরকে এসব থেকে নিষেধ করে বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ} [المائدة: ۸۷] ،
হে মুমিনগণ, আল্লাহ যে সব পবিত্র বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম করো না এবং তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না (সূরা আল মায়িদা ৫:৮-৭)।
আল্লাহ তা'আলা যা হালাল করেছেন, মু'মিনগণ তা হারাম করতে কঠোর হবে না, সহজেই হারাম হোক তাও চাইবে না এবং হারামকে বৈধও মনে করবে না। বরং ন্যায়নীতি অবলম্বন করবে।
সুতরাং হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিনত করা জাহিলী দীনের অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহর কিতাবের দলীল-প্রমাণ ছাড়া কারো জন্য হালাল ও হারাম পরিবর্তন করে তা ইবাদত গণ্য করা বৈধ নয়। যেমন খ্রিষ্টানদের বৈরাগ্যতা ও মুশরিকদের বাইতুল্লাহ তাওয়াফের মাধ্যমে যে ইবাদত হয় তা আল্লাহ তা'আলা শরী'আত সম্মত করেননি। আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে তার ইবাদত ও নৈকট্য লাভ করা বিধিসম্মত নয়। আল্লাহ তা'আলা এ ধরণের শরী'আতের অনুমোদন দেননি।
এটি অত্যান্ত মারাত্মক সমস্যা। যেমনভাবে জাহিলরা শিরকের মাধ্যমে ইবাদত করতো, যা মহা অন্যায়। পূর্বযুগের শিরক, বর্তমানেও বিদ্যমান। তাই যারা কবর প্রদক্ষিণ করে, সেখানে প্রাণী উৎসর্গ ও মান্নত করে বলে, এগুলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম; তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, {مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى} [الزمر: 3] ،
'আমরা কেবল এজন্যই তাদের 'ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে (সূরা আয যুমার ৩৯:৩)।' هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ} [يونس: ١٨]
এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী (সূরা ইউনূস ১০:১৮)।
প্রাচীন কালের মুশরিক ও বর্তমানে নিজেকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্তকারী মুশরিকরাও এসব শিরকে লিপ্ত। তারা বলে, ঐ সকল নেক লোকদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। তারা আমাদের জন্য সুপারিশ করবে ও আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে。
📄 আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত ধর্মগুরু ও সংসারবিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করা
আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত তাদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করে ইবাদত করা。
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ ত'আলা বলেন, {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا واحداً} [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ব্যতীত কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র (সূরা তাওবা ৯:৩১)।
এখানে পন্ডিত বলতে আলেম ও সংসারবিরাগী বলতে ইবাদতকারী বুঝানো হয়েছে। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদেরকে অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা সত্ত্বেও তাদের ইবাদত করে। তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত করে। তারা তাদের আনুগত্যকে ইবাদত বলে গণ্য করে।
যেমন তারা বলে আলেমদের আনুগত্য করা ওয়াজীব। আমরা বলবো আল্লাহর আনুগত্যে তাদের আনুগত্য ওয়াজীব। আর আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের আনুগত্য নেই। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق
স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কোন আনুগত্য নেই।
যদিও আলিম বা ইবাদতকারীরা মানুষের মাঝে বেশি ইবাদতে লিপ্ত থাকে। তারা হক্বের উপর অটল না থাকলে তাদের আনুগত্য করা বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা যা হারাম করেছেন তারা তা হালাল করে ও হালাল কে হারাম করে এটা জানা সত্বেও যারা তাদের আনুগত্য করে, তারা মূলতঃ তাদেরকে রব হিসাবেই মেনে নেয়। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে তাদেরকে শরীক করে। কেননা হালাল-হারাম নির্ধারণ করা আল্লাহর অধিকার। আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ছাড়া হালাল-হারামের পরিবর্তন ও শরী'আত নির্ধারণ করা কারো জন্য বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لا يُفْلِحُونَ مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} [النحل: ١١٦ - [۱۱۷
আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না। সামান্য ভোগ এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব (সূরা নাহাল ১৬:১১৬ ১১৭)।
আলেমের সঠিক অথবা ভুল যা-ই হোক, আমরা সাধারণভাবে তাদের অনুসরণ করবো না। তারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হলে তবেই আমরা তাদের অনুসরণ করবো। আর তাদের দ্বারা সংঘটিত ভুল থেকে বিরত থাকবো। তাই যারা আল্লাহর আনুগত্য করে আমরা তাদের অনুসরণ করবো। পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হয়, তাদেরকে অমান্য করবো এবং তাদের ভুলের বিরোধিতা করবো。
এটাই সঠিক দীন। আর আলেমের ভুল বুঝতে না পারলে তা অজুহাত হিসাবে গণ্য হবে। আর যারা বলে, আলেমদের ভুল তাদের উপরই বর্তাবে, আমরা বলবো, এটা বলা বৈধ নয়। কিয়ামতের দিন তা কোন কাজে আসবে না। নিজ দায়িত্ব নিজের উপর ও তাদের দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে। আর আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ব্যতিরেকে কোন ফাতওয়ার উপর নির্ভর করা যাবে না। ফাতওয়া দলীল সম্মত নয় জানা গেলে তা গ্রহণ করা হারাম, অন্যথায় অজুহাত বলে গণ্য হবে। তবে সঠিক বিষয় অনুসন্ধান করা ও বেশি নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক。
টিকাঃ
৩৭. ছহীহ তিরমিযী ১৭০৭।
📄 আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলী অবিশ্বাস করা
গুণাবলী অবিশ্বাস করার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللَّهَ لا يَعْلَمُ كَثِيراً مِمَّا تَعْمَلُونَ} [فصلت: ۲۲] .
তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানেন না (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২২)।
ব্যাখ্যা: (الصفات) আস-সিফাত তথা গুণসমূহ: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার এমন গুণাবলী যা তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর (الإلحاد) ইলহাদ তথা অবিশ্বাস এর আভিধানিক অর্থ হলো কোন বিষয় সাব্যস্ত করা হতে বিচ্যুত হওয়া। এখানে উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর গুণাবলী থেকে সরে যাওয়া। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা তার গুণাবলী অস্বীকার করাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই আল্লাহর গুণাবলী অবিশ্বাস করা নাস্তিকতা। কেননা তা হক্ক থেকে দুরে সরিয়ে দেয় এবং হকু বিমুখ করে। জাহিলরা আল্লাহর গুণাবলী অবিশ্বাস করে অর্থাৎ তারা অস্বীকার করে এবং আল্লাহর গুণাবলী প্রত্যাখ্যান করে। এ বিষয়ে দলীল-প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন,
{ وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلَا أَبْصَارُكُمْ وَلَا جُلُودُكُمْ وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللَّهَ لا يَعْلَمُ كَثِيراً مِمَّا تَعْمَلُونَ} [فصلت: ۲۲]
তোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষুসমূহ ও চর্মসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। বরং তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানেন না (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২২)।
জাহিলরা মনে করে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে বেশি কিছু জানেন না। তাই আল্লাহ তা'আলার ( الْعِلْمُ ) ইলম তথা জানার গুণকে তারা প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী হতে ( الْعِلْمُ ) ইলম তথা 'সর্বজ্ঞাত' একটি গুরুত্বপূর্ণ সিফাত বা গুণ যা এ আয়াতটি দ্বারা প্রমাণিত। তাই আল্লাহ তা'আলা সব কিছুই জানেন। বান্দার কর্মসমূহ ও অন্যান্য বিষয় তার নিকট গোপন থাকে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعْلِنُونَ} [التغابن: ٤] আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তিনি তা জানেন এবং তিনি জানেন যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর। (সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৪)।
যা সংঘটিত হয় এবং হয় না তিনি তা সবই জানেন। যা সংঘটিত হয়নি তা কিভাবে হবে তিনি সেটাও জানেন। আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান সব কিছুকে অন্তর্ভুক্ত ও বেষ্টন করে রয়েছে। তাই যারা ধারণা করে যে, কতিপয় আমল সম্পর্কে তিনি জানেন না, তারা আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে নাস্তিক ও তার ( الْعِلْمُ ) ইলম-সর্বজ্ঞাত সিফাতকে প্রত্যাখ্যানকারী। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنْتُمْ بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ} [فصلت: ۲۳] আর তোমাদের এ ধারণা যা তোমরা তোমাদের রব সম্পর্কে পোষণ করতে, তাই তোমাদের ধ্বংস করেছে (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২৩)। অর্থাৎ তোমাদেরকে যা ক্ষতির মাঝে রেখেছে, সেটাই হলো ধ্বংস সাধন।
{ فَأَصْبَحْتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ} [فصلت: ۲۳] ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২৩)।
আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যারা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর মধ্যে হতে কোন গুণকে প্রত্যাখ্যান করে তারা জাহিলদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির হুমকি। জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশআ'রীয়া ও মাতুরিদীয়্যা সম্প্রদায় আল্লাহর গুণাবলীকে প্রত্যাখ্যান করে। জাহিলদের এ নিকৃষ্ট স্বভাবে তারা অভ্যস্ত। তারা কঠিন ভীতিপ্রদর্শনকে পরোয়া করে না। তারা আল্লাহর প্রতি জঘন্য খারাপ ধারণা পোষণ করে। আল্লাহর গুণাবলীর সঠিক অর্থকে (বাতিল) ভুল অর্থের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা ও শুদ্ধ অর্থ গ্রহণ হতে বিরত থাকা নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলার আরশে 'সমুন্নত' হওয়া অর্থটিকে 'কর্তৃত্ব' অর্থে ব্যাখ্যা করা ও আল্লাহর 'হাত' অর্থকে 'ক্ষমতা' অর্থে ব্যবহার করা ইত্যাদি। আর গুণাবলীর ভুল অর্থকে আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা ও দলীল ভিত্তিক সঠিক অর্থকে অস্বীকার করা নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত。
📄 আল্লাহ তা'আলার নামসমূহ অবিশ্বাস করা
আল্লাহ তা'আলার নাম সমূহ অবিশ্বাস করার ব্যাপারে তিনি বলেন, { وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَنِ} [الرعد: ٣٠] তারা রহমানকে অস্বীকার করে (সূরা রা'দ ১৩:৩০)।
ব্যাখ্যা: জাহিলরা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী ও তার নাম সমূহকে অবিশ্বাস করে। তাই এগুলোকে তারা প্রত্যাখ্যান করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَنِ} তারা রহমানকে অস্বীকার করে (সূরা রা'দ ১৩:৩০)। )الرحمن( আর-রহমান শব্দটি আল্লাহ তা'আলার নাম সমূহের একটি।
أن الرسول صلى الله عليه وسلم لما أراد أن يكتب الصلح بينه وبين المشركين في الحديبية فجاء سهيل بن عمرو فقال هات اكتب بيننا وبينكم كتاباً. فدعا النبي صلى الله عليه وسلم الكاتب، فقال النبي صلى الله عليه وسلم: "بسم الله الرحمن الرحيم"، قال سهيل: أما الرحمن فوالله ما أدري ما هو
এজন্য রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুশরিকদের সাথে হুদাইবিয়ার সন্ধি লিখতে চাইলে সুহাইল ইবনে আমর এসে বললো, আসেন আমরা উভয়ের মাঝে একটি সন্ধিনামা লিখি। অতঃপর লেখককে ডেকে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম "بسم الله الرحمن الرحيم" লিখতে বললেন, সুহাইল বললো, আল্লাহর কসম! 'রহমান' কে আমি তা জানি না।
তারা বললো, ইয়ামামার রহমান অর্থাৎ মুসাইলামাহ ছাড়া আমরা কোন রহমানকে চিনি না। কেননা, মুসাইলামাকে রহমান নামে ডাকা হতো। এমর্মে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ كَذَلِكَ أَرْسَلْنَاكَ فِي أُمَّةٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهَا أُمَمٌ لِتَبْلُوَ عَلَيْهِمُ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَهُمْ يَكْفُرُونَ بِالرَّحْمَنِ قُلْ هُوَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ مَتَابِ} [الرعد: ٣٠]
এমনিভাবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির নিকট, যার পূর্বে অনেক জাতি গত হয়েছে, যেন আমি তোমার প্রতি যে ওহী প্রেরণ করেছি, তা তাদের নিকট তিলাওয়াত কর। অথচ তারা রহমানকে অস্বীকার করে। বল, তিনি আমার রব, তিনি ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই, তাঁরই উপর আমি তাওয়াক্কুল করেছি এবং তাঁরই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন (সূরা রা'দ ১৩:৩০)।
এমনিভাবে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় জ্বলাত আদায় করতেন আর (يا الله) হে আল্লাহ! (يا رحمن) হে দয়াময়! এভাবে আল্লাহকে ডাকতেন। আর মুশরিকরা বলতো, এ লোকের দিকে খেয়াল কর, মনে হয় সে এক উপাস্যের ইবাদত করে। অথচ সে (يا الله) হে আল্লাহ! (يا رحمن) হে দয়াময়! বলে ডাকে, এতে দু' উপাস্যের ইবাদত করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ أَيَّا مَا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ} [الإسراء: ١١٠]
বল, 'তোমরা '(তোমাদের রবকে) আল্লাহ' নামে ডাক অথবা 'রাহমান' নামে ডাক, যে নামেই তোমরা ডাক না কেন, তার জন্যই তো রয়েছে সুন্দর নামসমূহ (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১১০)।
আল্লাহ তা'আলার অনেক নাম রয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ তা প্রমাণিত নয়। আল্লাহর নামগুলো মহানত্বের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
মোদ্দাকথা, মুশরিকরা আল্লাহর নাম সমূহকে অস্বীকার করে। ভ্রষ্ট দলের মধ্যে জাহমিয়ারা (الجهمية) আল্লাহর নাম সমূহকে প্রত্যাখ্যান করে অথবা মু'তাযিলারা (المعتزلة) নামের অর্থ প্রত্যাখ্যান করে এবং নামের শব্দগুলোকে সমর্থন করে অথবা আশআরী (الأشاعرة) সম্প্রদায় কতিপয় গুণকে অস্বীকার করে এবং কতিপয়কে সমর্থন করে। জাহিলদের উত্তরাধিকারী হওয়ার কারণে তারা এসব করে অথচ আল্লাহ তা'আলা তার নামসমূহকে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِمَا} [الأعراف: ১৮০]
আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাকে সেসব নামের মাধ্যমে ডাক (সূরা আল আরাফ ৭:১৮০)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى} [طه: ৮]
আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন (সত্য) ইলাহ নেই; সুন্দর নামসমূহ তাঁরই (সূরা ত্বা-হা ২০:৮)। তিনি আরো বলেন, {لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى}
সুন্দর নামসমূহ তারই (সূরা ত্বা-হা ২০:৮)।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, أسألك بكل اسم هو لك سميت به نفسك أو علمته أحداً من خلقك، أو أنزلته في كتابك أو استأثرت به في علم الغيب عندك
আমি তোমার প্রত্যেক নামের মাধ্যমে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। যে নাম তুমি নিজেই রেখেছ অথবা সৃষ্টির কাউকে তা শিক্ষা দিয়েছে অথবা তোমার কিতাবে ঐ নাম সমূহ বর্ণনা করেছ অথবা যে নামের মাধ্যমে তোমার অদৃশ্য জ্ঞানের কর্তৃত্ব রয়েছে।
সুতরাং জানা গেল আল্লাহ তা'আলার অনেক নাম রয়েছে। পবিত্র কুরআনে তার অনেক নাম তিনি বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ، الْعَزِيزُ، الْحَكِيمُ، الرَّؤُوفُ التَّوَّابُ، الْغَفَّارُ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সূরা হাশরের শেষে আল্লাহ তা'আলা বলেন, {هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى} [الحشر: ٢٢،٢٤]
তিনিই আল্লাহ, যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই; দৃশ্য-অদৃশ্যের জ্ঞাতা; তিনিই পরম করুণাময়, দয়ালু। তিনিই আল্লাহ; যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, মহাপবিত্র, ত্রুটিমুক্ত, নিরাপত্তাদানকারী, রক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রতাপশালী, অতীব মহিমান্বিত, তারা যা শরিক করে তা হতে পবিত্র মহান। তিনিই আল্লাহ, স্রষ্টা, উদ্ভাবনকর্তা, আকৃতিদানকারী; তার রয়েছে সুন্দর নামসমূহ; (সূরা আল হাশর ৫৯:২২-২৪)।
আল্লাহ তা'আলার নাম সমূহের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছুহীহ হাদীছে বলেন,
"إن لله تسعة وتسعين اسماً، من أحصاها دخل الجنة"
আল্লাহ তা'আলার নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, যে তা মুখস্থ করবে সে জান্নাত লাভ করবে।
আল্লাহ তা'আলার নাম সমূহের অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে। যে আল্লাহর নাম বিশ্বাস করে না সে আল্লাহকেও বিশ্বাস করে না。
টিকাঃ
৩৮. জ্বহীহ বুখারী ২৭৩১-২৭৩২।
৩৯. ছহীহ মুসনাদ আহমাদ, ১/৩৯১ হাকীম, হা/১৯২০; ছহীহ ইবনে হিব্বان, হা/৯৬৮।
৪০. ছহীহ বুখারী, হা/২৭৩৬, ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৭৭。