📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 হারাম কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা

📄 হারাম কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা


লজ্জাস্থান প্রকাশের মাধ্যমে ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, : { وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِمَا} [الأعراف: ۲৮] আর যখন তারা কোন অশ্লীল কাজ করে তখন বলে, আমরা এতে আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি এবং আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আরাফ ৭:২৮)।
ব্যাখ্যা: জাহিলরা কা'বা ঘর তাওয়াফের সময় লজ্জাস্থান প্রকাশের মাধ্যমে ইবাদত করতো। তারা আহলে হারামের অন্তর্ভুক্ত নয় এ মর্মে শয়তান এহেন খারাপ কর্মকে তাদের জন্য সৌন্দর্য মন্ডিত করে তুলে ধরে। সে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগমন করতো। শয়তান যে পোশাকে আগমন করতো, একই পোশাকে হারাম এলাকায় প্রবেশ করতো না। এখানে সে আল্লাহর অবাধ্য কর্ম করতো। আহলে হারামের কাউকে পেলে শয়তান তাকে পোশাক দিয়ে দিত, যাতে সে ঐ পোশাকে তাওয়াফ করে নচেৎ শয়তান হারাম এলাকার সীমানায় পোশাক খুলে ফেলতো এবং উলঙ্গ অবস্থায় হারামে প্রবেশ করতো। এমনিভাবে শয়তান তাদের জন্য সৌন্দর্য তুলে ধরতো। এ অশ্লীল কর্মের সময় তারা বলতো, আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে আমরা এর উপরই পেয়েছি।
{وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا} [الأعراف: ۲৮] .
আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আরাফ ৭:২৮)।
লক্ষণীয় যে, কাশফুল আওরাহ (উলঙ্গপনার) নাম ফাহিসাহ (অশ্লীলতা)। আর যা কিছু জঘন্যতার শেষ সীমায় পৌঁছে তা ফাহিসাহ বলে গণ্য। অবাধে এমন মন্দ কর্ম সংঘটিত হওয়াকে বর্তমান যুগের অনেক মানুষ সংস্কৃতি ও অগ্রগতি গণ্য করে। আল্লাহ তা'আলা জাহিলদের এরূপ কর্ম প্রত্যাখ্যান করে বলেন, {قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ} [الأعراف: ২৮]
বল, আল্লাহ অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? (সূরা আরাফ ৭:২৮)।
অর্থাৎ বান্দার জন্য উলঙ্গপনা শরী'আত সম্মত নয়। তাদের জন্য আবৃত থাকাকে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে, যাতে ফিতনা মুক্ত থাকা যায়, আর স্বভাবজাত পাপাচার থেকেও দুরে থাকা যায়। তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, জ্ঞান ছাড়াই বিরোধীতা করে। তারা দু'টি বাতিল-মিথ্যা যুক্তি পেশ করে, যার একটি অপরটি থেকে বেশি মিথ্যা।
প্রথমত: {وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا} [الأعراف: ২৮] আমরা আমাদের বাপ-দাদার রীতির উপরই বিদ্যমান (সূরা আল আরাফ ৭:২৮)।
দ্বিতীয়ত: বড়ই মারাত্মক। {وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِمَا} আল্লাহ আমাদেরকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন।
এভাবে তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, {قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ২৮]

বল, আল্লাহ অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? (সূরা আরাফ ২:২৮)।
জ্ঞান ছাড়া আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধে কথা বলা মারাত্মক জঘন্য অন্যায়।
আল্লাহ তা'আলা যা নিষেধ করেছেন তা তিনি বর্ণনা করেন, {قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ} [الأعراف: ৩৩]
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, (সূরা আরাফ ৭:৩৩)।
)فاحشة( শব্দটির বহুবচন )فواحش( আর নিষিদ্ধ অন্যায় কর্মই হলো ফাহিসাহ। আর উলঙ্গপনা অন্যায় কর্মের অন্তর্ভুক্ত। }مَا ظَهَرَ مِنْهَا{ এআয়াতাংশ জনসম্মুখে প্রকাশ্যে অশ্লীলতার কথা বুঝায়। আর }وَمَا بَطَنَ{ এ অংশটুকু মানুষের গোপন অপকর্ম বুঝায় যা আল্লাহ ও মানুষের মাঝে সীমায়িত থাকে।
{ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَاناً} [الأعراف: ৩৩]
আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি (সূরা আরাফ ৭:৩৩)
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের জন্য কখনোই প্রমাণ নাযিল করেননি। তার একত্বের উপরই তিনি দলীল নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা'আলা শিরককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ৩৩]
আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আরাফ ৭:৩৩)।
কোন জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধে কথা বলা শিরকের চেয়েও জঘন্য। আর একারণে জাহিলদের কথা হলো, আল্লাহ আমাদের উলঙ্গপনার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর দলীল ব্যতীরেকে যারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে কথা বলে, তারা যেন সতর্ক হয়। আল্লাহর বাণী: {يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ}

হে বনী আদম, তোমরা তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর (সূরা আরাফ ৭:৩১)। অর্থাৎ তোমরা তোমাদের গোপ্তাঙ্গ আবৃত করো।
{ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ} [الأعراف: ٣١] অর্থাৎ প্রত্যেক জ্বলাতে
অর্থাৎ প্রত্যেক জ্বলাতের সময় সাজ-সজ্জা গ্রহণ করতে হয় এবং বাইতুল্লাহ তাওয়াফের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। জাহিলরা উলঙ্গপনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাইতো, এটাকে তারা আল্লাহর ইবাদত গণ্য করতো। এটা মিথ্যা ও বক্রতার মধ্যে অধিক অশ্লীল। আমরা এ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
জরুরী অবস্থা ছাড়া আমরা উলঙ্গ হওয়াকে হারাম হিসাবেই গ্রহণ করবো। জরুরী অবস্থা: যেমন (মলত্যাগ) ও চিকিৎসা অথবা স্বামী-স্ত্রী পরস্পর মিলনের সময় উলঙ্গ হওয়া। এ দু'টি অবস্থা ছাড়া কঠোরতার সাথে উলঙ্গ হওয়া হারাম। কেননা তা অশ্লীলতা ও পাপাচারীতার দিকে ধাবিত করে। শয়তান জানে; উলঙ্গপনা ব্যভিচারীতা ও সমকামিতার দিকে ঠেলে দেয়। এ কারণে মানুষ উলঙ্গপনায় আগ্রহী হয়। আর এটার নাম রাখা হয়েছে অগ্রগতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি। পক্ষান্তরে শরীর আবৃত রাখা ও মার্জিত পোশাককে অপছন্দ করে বলা হয়, এটা অনগ্রগতি, পশ্চাদগামিতা ও প্রাচীন রীতি। বর্তমানে হিজাবকে ত্যাগ করতে বলা হয়, পুস্তিকায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও সমাবেশে এ ভাল বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়। কিন্তু ঈমানদারগণ দীন আঁকড়ে ধরায় এসব তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করা

📄 হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করা


জাহিলরা শিরকের মাধ্যমে যেমন ইবাদত করে তেমনি হালালকে হারাম করার মাধ্যমেও ইবাদত করে。
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যা: আল্লাহ তা'আলা যা আবশ্যকীয়ভাবে হারাম করেছেন, তার মাধ্যমে জাহিলদের ইবাদত করা তথা নৈকট্য লাভ করা। তাওয়াফের সময় তারা লজ্জাস্থান আবৃত রাখাকে হারাম করেছে যেমন মুশরিকদের এ অবস্থা সম্পর্কে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরাও এরূপ করেছে। খ্রিষ্টানরা অনেক পবিত্র জিনিসকে নিজেদের উপর হারাম করেছে। অপরদিকে, আল্লাহ তা'আলা যা কিছু হারাম করেছেন ইয়াহুদীরা তা নিজেদের জন্য বৈধ করে নিয়েছে, যেমন সুদ। অথচ হারাম কাজ থেকে বিরত থাকতে ও মানুষের সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।

আর মুশরিকরা বিভিন্ন প্রকার চতুষ্পদ জন্তু হারাম করেছে। এর মধ্যে (البحيرة) বাহিরাহ তথা ঝুলন্ত কান বিশিষ্ট উষ্ট্রী, (السائبة) সায়িবাহ তথা মুক্ত উষ্ট্রী ও (الوصيلة) ওয়াসিলাহ বা দু'বার বাচ্চা প্রসব করেছে এমন উষ্ট্রী উল্লেখ যোগ্য। এ চতুষ্পদ জন্তুকে তারা এসব নামকরণ করেছে। আর মূর্তির কারণে পশুগুলোকে তারা হারাম করেছে। আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদেরকে এসব থেকে নিষেধ করে বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ} [المائدة: ۸۷] ،
হে মুমিনগণ, আল্লাহ যে সব পবিত্র বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম করো না এবং তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না (সূরা আল মায়িদা ৫:৮-৭)।

আল্লাহ তা'আলা যা হালাল করেছেন, মু'মিনগণ তা হারাম করতে কঠোর হবে না, সহজেই হারাম হোক তাও চাইবে না এবং হারামকে বৈধও মনে করবে না। বরং ন্যায়নীতি অবলম্বন করবে।
সুতরাং হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিনত করা জাহিলী দীনের অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহর কিতাবের দলীল-প্রমাণ ছাড়া কারো জন্য হালাল ও হারাম পরিবর্তন করে তা ইবাদত গণ্য করা বৈধ নয়। যেমন খ্রিষ্টানদের বৈরাগ্যতা ও মুশরিকদের বাইতুল্লাহ তাওয়াফের মাধ্যমে যে ইবাদত হয় তা আল্লাহ তা'আলা শরী'আত সম্মত করেননি। আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে তার ইবাদত ও নৈকট্য লাভ করা বিধিসম্মত নয়। আল্লাহ তা'আলা এ ধরণের শরী'আতের অনুমোদন দেননি।
এটি অত্যান্ত মারাত্মক সমস্যা। যেমনভাবে জাহিলরা শিরকের মাধ্যমে ইবাদত করতো, যা মহা অন্যায়। পূর্বযুগের শিরক, বর্তমানেও বিদ্যমান। তাই যারা কবর প্রদক্ষিণ করে, সেখানে প্রাণী উৎসর্গ ও মান্নত করে বলে, এগুলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম; তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, {مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى} [الزمر: 3] ،
'আমরা কেবল এজন্যই তাদের 'ইবাদত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে (সূরা আয যুমার ৩৯:৩)।' هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ} [يونس: ١٨]

এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী (সূরা ইউনূস ১০:১৮)।

প্রাচীন কালের মুশরিক ও বর্তমানে নিজেকে ইসলামের সাথে সম্পৃক্তকারী মুশরিকরাও এসব শিরকে লিপ্ত। তারা বলে, ঐ সকল নেক লোকদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। তারা আমাদের জন্য সুপারিশ করবে ও আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে。

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত ধর্মগুরু ও সংসারবিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করা

📄 আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত ধর্মগুরু ও সংসারবিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করা


আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত তাদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করে ইবাদত করা。
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদী খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ ত'আলা বলেন, {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا واحداً} [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ব্যতীত কোন (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র (সূরা তাওবা ৯:৩১)।
এখানে পন্ডিত বলতে আলেম ও সংসারবিরাগী বলতে ইবাদতকারী বুঝানো হয়েছে। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদেরকে অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার অবাধ্যতা সত্ত্বেও তাদের ইবাদত করে। তারা হালালকে হারাম ও হারামকে হালালে পরিণত করে। তারা তাদের আনুগত্যকে ইবাদত বলে গণ্য করে।
যেমন তারা বলে আলেমদের আনুগত্য করা ওয়াজীব। আমরা বলবো আল্লাহর আনুগত্যে তাদের আনুগত্য ওয়াজীব। আর আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের আনুগত্য নেই। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق
স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির কোন আনুগত্য নেই।

যদিও আলিম বা ইবাদতকারীরা মানুষের মাঝে বেশি ইবাদতে লিপ্ত থাকে। তারা হক্বের উপর অটল না থাকলে তাদের আনুগত্য করা বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা যা হারাম করেছেন তারা তা হালাল করে ও হালাল কে হারাম করে এটা জানা সত্বেও যারা তাদের আনুগত্য করে, তারা মূলতঃ তাদেরকে রব হিসাবেই মেনে নেয়। অর্থাৎ তারা আল্লাহ তা'আলার সাথে তাদেরকে শরীক করে। কেননা হালাল-হারাম নির্ধারণ করা আল্লাহর অধিকার। আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ছাড়া হালাল-হারামের পরিবর্তন ও শরী'আত নির্ধারণ করা কারো জন্য বৈধ নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لا يُفْلِحُونَ مَتَاعٌ قَلِيلٌ وَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} [النحل: ١١٦ - [۱۱۷
আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না। সামান্য ভোগ এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব (সূরা নাহাল ১৬:১১৬ ১১৭)।
আলেমের সঠিক অথবা ভুল যা-ই হোক, আমরা সাধারণভাবে তাদের অনুসরণ করবো না। তারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনিত হলে তবেই আমরা তাদের অনুসরণ করবো। আর তাদের দ্বারা সংঘটিত ভুল থেকে বিরত থাকবো। তাই যারা আল্লাহর আনুগত্য করে আমরা তাদের অনুসরণ করবো। পক্ষান্তরে, যারা আল্লাহ তা'আলার অবাধ্য হয়, তাদেরকে অমান্য করবো এবং তাদের ভুলের বিরোধিতা করবো。
এটাই সঠিক দীন। আর আলেমের ভুল বুঝতে না পারলে তা অজুহাত হিসাবে গণ্য হবে। আর যারা বলে, আলেমদের ভুল তাদের উপরই বর্তাবে, আমরা বলবো, এটা বলা বৈধ নয়। কিয়ামতের দিন তা কোন কাজে আসবে না। নিজ দায়িত্ব নিজের উপর ও তাদের দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে। আর আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ ব্যতিরেকে কোন ফাতওয়ার উপর নির্ভর করা যাবে না। ফাতওয়া দলীল সম্মত নয় জানা গেলে তা গ্রহণ করা হারাম, অন্যথায় অজুহাত বলে গণ্য হবে। তবে সঠিক বিষয় অনুসন্ধান করা ও বেশি নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক。

টিকাঃ
৩৭. ছহীহ তিরমিযী ১৭০৭।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলী অবিশ্বাস করা

📄 আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলী অবিশ্বাস করা


গুণাবলী অবিশ্বাস করার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللَّهَ لا يَعْلَمُ كَثِيراً مِمَّا تَعْمَلُونَ} [فصلت: ۲۲] .
তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানেন না (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২২)।
ব্যাখ্যা: (الصفات) আস-সিফাত তথা গুণসমূহ: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার এমন গুণাবলী যা তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর (الإلحاد) ইলহাদ তথা অবিশ্বাস এর আভিধানিক অর্থ হলো কোন বিষয় সাব্যস্ত করা হতে বিচ্যুত হওয়া। এখানে উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর গুণাবলী থেকে সরে যাওয়া। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা তার গুণাবলী অস্বীকার করাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই আল্লাহর গুণাবলী অবিশ্বাস করা নাস্তিকতা। কেননা তা হক্ক থেকে দুরে সরিয়ে দেয় এবং হকু বিমুখ করে। জাহিলরা আল্লাহর গুণাবলী অবিশ্বাস করে অর্থাৎ তারা অস্বীকার করে এবং আল্লাহর গুণাবলী প্রত্যাখ্যান করে। এ বিষয়ে দলীল-প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ বলেন,

{ وَمَا كُنْتُمْ تَسْتَتِرُونَ أَنْ يَشْهَدَ عَلَيْكُمْ سَمْعُكُمْ وَلَا أَبْصَارُكُمْ وَلَا جُلُودُكُمْ وَلَكِنْ ظَنَنْتُمْ أَنَّ اللَّهَ لا يَعْلَمُ كَثِيراً مِمَّا تَعْمَلُونَ} [فصلت: ۲۲]
তোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কর্ণ, চক্ষুসমূহ ও চর্মসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না। বরং তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানেন না (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২২)।

জাহিলরা মনে করে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে বেশি কিছু জানেন না। তাই আল্লাহ তা'আলার ( الْعِلْمُ ) ইলম তথা জানার গুণকে তারা প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহ তা'আলার গুণাবলী হতে ( الْعِلْمُ ) ইলম তথা 'সর্বজ্ঞাত' একটি গুরুত্বপূর্ণ সিফাত বা গুণ যা এ আয়াতটি দ্বারা প্রমাণিত। তাই আল্লাহ তা'আলা সব কিছুই জানেন। বান্দার কর্মসমূহ ও অন্যান্য বিষয় তার নিকট গোপন থাকে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعْلِنُونَ} [التغابن: ٤] আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তিনি তা জানেন এবং তিনি জানেন যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা প্রকাশ কর। (সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৪)।
যা সংঘটিত হয় এবং হয় না তিনি তা সবই জানেন। যা সংঘটিত হয়নি তা কিভাবে হবে তিনি সেটাও জানেন। আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান সব কিছুকে অন্তর্ভুক্ত ও বেষ্টন করে রয়েছে। তাই যারা ধারণা করে যে, কতিপয় আমল সম্পর্কে তিনি জানেন না, তারা আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে নাস্তিক ও তার ( الْعِلْمُ ) ইলম-সর্বজ্ঞাত সিফাতকে প্রত্যাখ্যানকারী। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَذَلِكُمْ ظَنُّكُمُ الَّذِي ظَنَنْتُمْ بِرَبِّكُمْ أَرْدَاكُمْ} [فصلت: ۲۳] আর তোমাদের এ ধারণা যা তোমরা তোমাদের রব সম্পর্কে পোষণ করতে, তাই তোমাদের ধ্বংস করেছে (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২৩)। অর্থাৎ তোমাদেরকে যা ক্ষতির মাঝে রেখেছে, সেটাই হলো ধ্বংস সাধন।
{ فَأَصْبَحْتُمْ مِنَ الْخَاسِرِينَ} [فصلت: ۲۳] ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে (সূরা হা-মিম সাজদা ৪১:২৩)।

আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যারা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলীর মধ্যে হতে কোন গুণকে প্রত্যাখ্যান করে তারা জাহিলদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী এবং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির হুমকি। জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশআ'রীয়া ও মাতুরিদীয়্যা সম্প্রদায় আল্লাহর গুণাবলীকে প্রত্যাখ্যান করে। জাহিলদের এ নিকৃষ্ট স্বভাবে তারা অভ্যস্ত। তারা কঠিন ভীতিপ্রদর্শনকে পরোয়া করে না। তারা আল্লাহর প্রতি জঘন্য খারাপ ধারণা পোষণ করে। আল্লাহর গুণাবলীর সঠিক অর্থকে (বাতিল) ভুল অর্থের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা ও শুদ্ধ অর্থ গ্রহণ হতে বিরত থাকা নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলার আরশে 'সমুন্নত' হওয়া অর্থটিকে 'কর্তৃত্ব' অর্থে ব্যাখ্যা করা ও আল্লাহর 'হাত' অর্থকে 'ক্ষমতা' অর্থে ব্যবহার করা ইত্যাদি। আর গুণাবলীর ভুল অর্থকে আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা ও দলীল ভিত্তিক সঠিক অর্থকে অস্বীকার করা নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00