📄 হক্ অস্বীকার করা যখন তা অপ্রিয় কারো কাছে থাকে
হকু অস্বীকার করা যখন তা অন্যের নিকট বিদ্যমান, যা তাদের অপছন্দনীয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ} [البقرة: ١١٣]
আর ইয়াহূদীরা বলে, নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই এবং নাসারারা বলে ইয়াহূদীদের কোন ভিত্তি নেই (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১৩)।
ব্যাখ্যা: সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো জাহিলদের হকু অস্বীকার করা যখন তা অন্যের নিকট বিদ্যমান, যা তাদের অপছন্দনীয়। অর্থাৎ পছন্দ করে না। ব্যক্তির পক্ষপাতিত্বের কারণে অপছন্দের সাথে অন্যের হকুকে বর্জন করে। তাদের হক্ব বর্জনের কারণ এটাই। আর যে ব্যক্তিই হকু নিয়ে আসবে তা গ্রহণ করা মুসলিমের উপর ওয়াজীব। কেননা বন্ধু অথবা শত্রু যার নিকট হক্ব পাওয়া যাবে সেখান থেকেই। তা গ্রহণ করা মু'মিনের উদ্দেশ্য। কারণ মু'মিনতো কেবল হকু চায়। কেবল ব্যক্তি কেন্দ্রীক কোন কিছু হলে তা হবে জাহিলী দীন।
আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। তারা আহলে কিতাব ও আহলে ইলম। ইয়াহুদীরা খ্রিষ্টানদের হক্ব বর্জন করে। আর খ্রিষ্টানরাও ইয়াহুদীদের হক্ব বর্জন করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ} [البقرة: ١١٣]
আর ইয়াহূদীরা বলে, নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই এবং নাসারারা বলে ইয়াহূদীদের কোন ভিত্তি নেই (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১৩)।
যারা এরূপ করবে তারা হবে কু-প্রবৃত্তির অনুসারী। ইয়াহুদীরা খ্রিষ্টানদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে তাদের হক্ব অস্বীকার করে। খ্রিষ্টানরাও শত্রুতা বশতঃ ইয়াহুদীদের হক্ব অস্বীকার করে। } وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ{ অথচ তারা কিতাব পাঠ করে, তিনি তাদেরকে হক্ব কবুলের নির্দেশ দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { كَذَلِكَ قَالَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْهِمْ} [البقرة: ١١३]
এভাবেই, যারা কিছু জানে না, তারা তাদের কথার মত কথা বলে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১৩)।
যাদের নিকট কিতাব নেই তারা এ পদ্ধতির উপর পরিচালিত হয়। প্রত্যেক দল অপর দলকে অস্বীকার করে, তৎসঙ্গে তাদের হক্বকেও অস্বীকার করে।
মোদ্দা কথা হলো ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের রীতি থেকে বিরত থাকা মুসলিমের উপর ওয়াজীব। কারণ যাকে তারা পছন্দ করে না, তাদের হকুকে অস্বীকার করাই তাদের রীতি। সমাজে এমন কতিপয় ব্যক্তি রয়েছে যারা কেবল নিজেদের হক্কুকে ধারণ করতে বলে। যেমন বর্তমানে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, কোন দল বা জামা'আত যখন কোন আলেমের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তখন তার নিকট যে হক্ব আছে তা তারা বর্জন করে। ঐ আলেমের সাথে তাদের শত্রুতাই হক্ব বর্জনে তাদেরকে প্ররোচিত করে। আর এ শত্রুতা অন্ধকারে চলতে, আলেমের প্রতি অনাগ্রহীতায় প্ররোচিত করে এবং তার রচিত কিতাবাদী ও পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে। যদিও আলেম হকুপন্থী হয়ে থাকেন। কিন্তু কেন এরূপ করে? তারা ঐ আলেমের হক্ব পছন্দ করে না, এটাই একমাত্র কারণ। হে মুসলিম! তুমি যাকে ভালবাস না যদি তার সাথে হক্ব থাকে, তা কবول করা তোমার উপর ওয়াজীব। আর হক্ব গ্রহণে ব্যক্তিগত শত্রুতা ও নিজের খেয়াল খুশি অন্তরায় হতে পারে না।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এক ইয়াহুদী এসে বললো, إنكم تشركون، تقولون ما شاء الله وشاء محمد أمر أن يقولو : " ماشاء الله وحده " ولا يقولو ماشاء الله وشاء محمد
আপনারাতো শিরক করেন। আপনারা বলে থাকেন, আল্লাহ ও মুহাম্মাদ যা চান। 'একমাত্র আল্লাহ যা চান' ইয়াহুদী এ কথা বলতে বলেন। আর 'আল্লাহ ও মুহাম্মাদ যা চান' একথা বলবে না।
অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হকুকে কবুল করেন। আর তিনি ছাহাবীদের এ ধরণের ভুল কথা ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন।
অনুরূপভাবে ইয়াহুদী আলেমদের থেকে এক আলেম নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললো, আল্লাহ তা'আলা ডান হাতে আসমান পেঁচিয়ে ধরবেন, এক আঙ্গুলের উপর পাহাড়, এক আঙ্গুলের উপর জমিন স্থাপন করবেন.... হাদীছের শেষ পর্যন্ত বলতে থাকলে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সমর্থনে হাসলেন, এমনকি তার সামনের দাঁত প্রকাশ হলো। আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বলেন, {وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعاً قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ} [الزمر: ٦٧]
আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে (সূরা যুমার ৩৯:৬৭)।
এ ইয়াহুদী যাজকের কথা সত্যের অনুকূলে হওয়ায় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথাকে গ্রহণ করলেন এবং আনন্দিত হলেন।
মোদ্দা কথা হলো, হকু গ্রহণ করা মুসলিমের উপর আবশ্যক। ব্যক্তিগত শত্রুতা ও উদ্দেশ্য তাকে প্ররোচিত করতে পারবে না। আর কতিপয় হক্বপন্থীদের ব্যাপারে বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না। হক্বপন্থী আলেম যা বলে তা বর্জনে এ বিষয়গুলো যেন প্ররোচিত না করে। বরং হক্ব গ্রহণের মাধ্যমে যেন উপকার লাভ হয়। এমনকি আলেম যদি সরল পথে না থাকে, তার মাঝে দোষ-ত্রুটি ও নিন্দনীয় কিছু পাওয়া যায়, এমতবস্থায় সে হক্ব প্রচার করলে তার হক্বকে গ্রহণ করা সঠিক হবে। তার ব্যক্তিসত্তার কারণে গ্রহণ করা হতে বিরত হবে না। বরং হক্ব হিসাবেই তা গ্রহণ করা হবে। আর এটাই আবশ্যক। রব প্রদত্ত এ পদ্ধতি অনুসরণ পূর্বক হক্বপন্থীরা যা নিয়ে আসেন তা থেকে হজ্ব গ্রহণ করা শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক।
টিকাঃ
৩৩. জ্বহীহ: নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ, বাইহাকী সুনানুল কুবরা। জুহাইনার স্ত্রী কুতাইলা হতে বর্ণিত, এক ইয়াহুদী নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললো, আপনারাতো অংশীদার স্থাপন করেন, শিরক করেন, আপনারা বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা ও আপনি যা চান। আর কাবার শপথ! এ কথাও বলেন। অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে নির্দেশ দিলেন যে, যখন তারা শপথ করতে ইচ্ছা করবে তখন বলবে, কাবার রবের শপথ! আর বলবে, আল্লাহ তা'আলা যা চান অতঃপর আপনি যা চান।
৩৪. ছহীহ বুখারী ৪৮১১, ছহীহ মুসলিম ২৭৮৬।
📄 তাদের স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির মধ্যে বৈপরীত্য
জাহিলরা তাদের দীনের অনুমোদিত বিষয় অস্বীকার করে। যেমন তারা হজ্জের ক্ষেত্রে করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ} [البقرة: ١٣٠] আর যে নিজকে নির্বোধ বানিয়েছে, সে ব্যতীত কে ইবরাহীমের আদর্শ থেকে বিমুখ হতে পারে? (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১৩০)।
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদীরা দাবি করে যে, তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আদর্শের উপরই রয়েছে। অথচ যখন কিবলা পরিবর্তন করে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দ্বারা নির্মিত কা'বাকে কিবলা নির্ধারণ করা হলো ইয়াহুদীরা তখন চুড়ান্তভাবে কা'বাকে অস্বীকার করলো। আমরা এ থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। কেননা, কা'বা ও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনের বিধান হজ্জকে ইয়াহুদীরা স্বীকৃতি দেয় না। তারা কিবলামুখী হওয়াকে অস্বীকার করে অথচ তারা জানে এটা সত্য-হকু। কাবা এমন ঘর যা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ} [الحج: ٢٦] {وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ} [البقرة: ١٢٧]
আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বায়তুল্লাহ্) স্থাননির্ধারণ করে দিয়েছিলাম (সূরা আল হাজ্জ ২২:২৬)। আর যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তিগুলো উঠাচ্ছিল (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১২৭)।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশে কা'বা নির্মিত হয়। আর কা'বাকে কেবলা হিসাবে কবুল করা হয়েছে অথচ তারা এটাকে অস্বীকার করে। অনুরূপভাবে হজ্জ পালন করা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আদর্শ। এটা জানা সত্ত্বেও তারা তা অস্বীকার করে। কিন্তু মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তাদের শত্রুতাই এসব কিছু অস্বীকার করতে তাদেরকে প্ররোচিত করে। সুতরাং কা'বা হলো ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর মিরাছ বা উত্তরাধীকার। কা'বামুখী হয়ে জ্বলাত আদায় করা এবং সেখানে হজ্জ ও উমরা পালনের ইচ্ছা করা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনের অন্তর্ভুক্ত। আর ইয়াহুদীরা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে অথচ তার বৃহৎ নিদর্শনাবলী তারা অস্বীকার করে। তাই এটা বিস্ময়কর দ্বন্দ্বের অন্তর্ভুক্ত।
এমনিভাবে যে নিজেকে ইসলামের দিকে সম্পৃক্ত করে এবং ইসলামের কতিপয় বিধান পরিত্যাগ করে বলে, আমি মুসলিম। অতঃপর সে কবর পূজা করে, সেখানে প্রার্থনা করে, বরকত কামনা করে ও কবরের মাটি দিয়ে শরীর মুছে। যখন তাকে বলা হয়, এগুলো শিরক। তখন সে তা পরিত্যাগ করে না, বরং এর উপরই অটল থাকে এবং এগুলো থেকে বাধাদানকারীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে। এরূপ সম্পৃক্ততা দ্বন্দ্বের অন্তর্ভুক্ত। আর যদিও ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত হয়, কিন্তু ইসলামের মহা নিদর্শন তাওহীদের বিরোধিতা করে।
📄 প্রত্যেক দল অন্যদের ব্যতিরেকে শুধু নিজেদেরকে হক্ মনে করে
প্রত্যেক দল দাবি করে যে, তারা মুক্তি প্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ} [ البقرة: ١১১] বল, তোমরা তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক (সূরা বাক্বারাহ ২:১১১)।
অতঃপর, আল্লাহ সঠিক বিষয় বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, {بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ} [ البقرة: ১১২] হ্যাঁ, যে নিজকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও, (সূরা বাক্বারাহ ২:১১২)।
ব্যাখ্যা: জাহিলদের সমস্যাবলী হচ্ছে: জাহিলদের প্রত্যেক দল দাবি করে যে, তারা হকের উপর আছে, আর অন্যরা বাতিল। ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও তাদের মত অন্য জাতির মাঝে এ ধারণা বিদ্যমান। আল্লাহ বলেন,
{ وَقَالُوا لَنْ يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ كَانَ هُوداً أَوْ نَصَارَى} [البقرة: ١١١]
আর তারা বলে, ইয়াহূদী কিংবা নাসারা ব্যতীত অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১১)।
ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদের হেদায়াত ও জান্নাত লাভের বিষয়কে সীমায়িত করেছে। ভ্রষ্টদলগুলো তাদের মতই। প্রত্যেকে দাবি করে তারাই মুক্তিপ্রাপ্ত, অন্যরা বাতিল। প্রত্যেক দল দাবি করে তাদের মুক্তি লাভের ব্যাপারে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ستفترق أمتي على ثلاث وسبعين فرقة، كلها في النار، إلا واحدة" ولكن الرسول صلى الله عليه وسلم بين العلامة الفارقة لهذه الفرقة عن غيرها لما قالوا : "من هي يا رسول الله؟ قال: " من كان على ما أنا عليه وأصحابي"
আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। একটি দল ছাড়া প্রত্যেকেই জাহান্নামী। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য দল থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত দলের আলাদা নিদর্শন বর্ণনা করেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! তারা কে? জবাবে তিনি বলেন, যারা আমি ও আমার ছাহাবীগণের রীতির উপর থাকবে। একারণে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ} [البقرة: ١١١]
বল, তোমরা তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১১)।
অর্থাৎ তোমরা যা বল তথা ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ছাড়া কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না, একথার প্রমাণ পেশ করো। কেননা, এটি একটি দাবি। আর প্রমাণ ছাড়া কোন দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন,
}بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ{ [البقرة: ١١٢]
হ্যাঁ, যে নিজকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও, (সূরা বাক্বারাহ ২:১১২)।
}أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ{ অর্থাৎ (১) আল্লাহর দীনের প্রতি আন্তরিক হয় ও শিরক থেকে বেঁচে থাকে। }وَهُوَ مُحْسِنُنٌ{ অর্থাৎ (২) রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্যকারী। এ দু'টি শর্ত যে পূর্ণ করবে সে জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। পক্ষান্তরে, শর্ত দু'টি অথবা এর কোন একটি ভঙ্গ করলে জাহান্নামী হবে, যদিও সে জান্নাতী দাবি করে।
তার বাণী: }بَلَى مَنْ أَسْلَمَ{ এ আয়াতটির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় সঠিক পদ্ধতি, যার উপর মুক্তি প্রাপ্ত দল পরিচালিত হয়। কেননা, নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من كان مثل ما أنا عليه وأصحابي
আমি এবং আমার ছাহাবীগণের পদ্ধতি যারা অনুসরণ করে (তারা ফিরকা নাজিয়া)। এটা সুন্নাহর বিধান। আর আয়াতটি কুরআনের বিধান।
যে জান্নাত লাভ করতে চায় সে যেন আল্লাহর উদ্দেশে নিজেকে সমর্পণ করে এবং সুন্নাহ অনুসারে উত্তমরূপে আমল করে। আর বিদ'আত ও নবাবিষ্কৃত বিষয় থেকে বিরত থাকবে, এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা যুক্তি-প্রমাণ পেশ করেননি。
টিকাঃ
৩৫. জ্বহীহ আবু দাউদ ৪৫৯৬-৪৫৯৭, তিরমিযী ২৬৪৫-২৬৪৬, ইবনে মাজাহ ৩৯৯১-৩৯৯৩, জামে ছহীহ ১০৮২-১০৮৩।।
৩৬. হাসান: তিরমিযী ২৬৪১, মুস্তাদরাক হাকীম ৪৪৪, কিতাবুর ইলম।
📄 হারাম কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা
লজ্জাস্থান প্রকাশের মাধ্যমে ইবাদত করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, : { وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِمَا} [الأعراف: ۲৮] আর যখন তারা কোন অশ্লীল কাজ করে তখন বলে, আমরা এতে আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি এবং আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আরাফ ৭:২৮)।
ব্যাখ্যা: জাহিলরা কা'বা ঘর তাওয়াফের সময় লজ্জাস্থান প্রকাশের মাধ্যমে ইবাদত করতো। তারা আহলে হারামের অন্তর্ভুক্ত নয় এ মর্মে শয়তান এহেন খারাপ কর্মকে তাদের জন্য সৌন্দর্য মন্ডিত করে তুলে ধরে। সে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগমন করতো। শয়তান যে পোশাকে আগমন করতো, একই পোশাকে হারাম এলাকায় প্রবেশ করতো না। এখানে সে আল্লাহর অবাধ্য কর্ম করতো। আহলে হারামের কাউকে পেলে শয়তান তাকে পোশাক দিয়ে দিত, যাতে সে ঐ পোশাকে তাওয়াফ করে নচেৎ শয়তান হারাম এলাকার সীমানায় পোশাক খুলে ফেলতো এবং উলঙ্গ অবস্থায় হারামে প্রবেশ করতো। এমনিভাবে শয়তান তাদের জন্য সৌন্দর্য তুলে ধরতো। এ অশ্লীল কর্মের সময় তারা বলতো, আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে আমরা এর উপরই পেয়েছি।
{وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا} [الأعراف: ۲৮] .
আল্লাহ আমাদেরকে এর নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আরাফ ৭:২৮)।
লক্ষণীয় যে, কাশফুল আওরাহ (উলঙ্গপনার) নাম ফাহিসাহ (অশ্লীলতা)। আর যা কিছু জঘন্যতার শেষ সীমায় পৌঁছে তা ফাহিসাহ বলে গণ্য। অবাধে এমন মন্দ কর্ম সংঘটিত হওয়াকে বর্তমান যুগের অনেক মানুষ সংস্কৃতি ও অগ্রগতি গণ্য করে। আল্লাহ তা'আলা জাহিলদের এরূপ কর্ম প্রত্যাখ্যান করে বলেন, {قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ} [الأعراف: ২৮]
বল, আল্লাহ অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? (সূরা আরাফ ৭:২৮)।
অর্থাৎ বান্দার জন্য উলঙ্গপনা শরী'আত সম্মত নয়। তাদের জন্য আবৃত থাকাকে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে, যাতে ফিতনা মুক্ত থাকা যায়, আর স্বভাবজাত পাপাচার থেকেও দুরে থাকা যায়। তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, জ্ঞান ছাড়াই বিরোধীতা করে। তারা দু'টি বাতিল-মিথ্যা যুক্তি পেশ করে, যার একটি অপরটি থেকে বেশি মিথ্যা।
প্রথমত: {وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا} [الأعراف: ২৮] আমরা আমাদের বাপ-দাদার রীতির উপরই বিদ্যমান (সূরা আল আরাফ ৭:২৮)।
দ্বিতীয়ত: বড়ই মারাত্মক। {وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِمَا} আল্লাহ আমাদেরকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন।
এভাবে তারা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, {قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ২৮]
বল, আল্লাহ অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে এমন কিছু বলছ, যা তোমরা জান না? (সূরা আরাফ ২:২৮)।
জ্ঞান ছাড়া আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধে কথা বলা মারাত্মক জঘন্য অন্যায়।
আল্লাহ তা'আলা যা নিষেধ করেছেন তা তিনি বর্ণনা করেন, {قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ} [الأعراف: ৩৩]
বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, (সূরা আরাফ ৭:৩৩)।
)فاحشة( শব্দটির বহুবচন )فواحش( আর নিষিদ্ধ অন্যায় কর্মই হলো ফাহিসাহ। আর উলঙ্গপনা অন্যায় কর্মের অন্তর্ভুক্ত। }مَا ظَهَرَ مِنْهَا{ এআয়াতাংশ জনসম্মুখে প্রকাশ্যে অশ্লীলতার কথা বুঝায়। আর }وَمَا بَطَنَ{ এ অংশটুকু মানুষের গোপন অপকর্ম বুঝায় যা আল্লাহ ও মানুষের মাঝে সীমায়িত থাকে।
{ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَاناً} [الأعراف: ৩৩]
আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি (সূরা আরাফ ৭:৩৩)
অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের জন্য কখনোই প্রমাণ নাযিল করেননি। তার একত্বের উপরই তিনি দলীল নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা'আলা শিরককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لا تَعْلَمُونَ} [الأعراف: ৩৩]
আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না (সূরা আরাফ ৭:৩৩)।
কোন জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ তা'আলার বিরুদ্ধে কথা বলা শিরকের চেয়েও জঘন্য। আর একারণে জাহিলদের কথা হলো, আল্লাহ আমাদের উলঙ্গপনার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর দলীল ব্যতীরেকে যারা হালাল ও হারামের ব্যাপারে কথা বলে, তারা যেন সতর্ক হয়। আল্লাহর বাণী: {يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ}
হে বনী আদম, তোমরা তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর (সূরা আরাফ ৭:৩১)। অর্থাৎ তোমরা তোমাদের গোপ্তাঙ্গ আবৃত করো।
{ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ} [الأعراف: ٣١] অর্থাৎ প্রত্যেক জ্বলাতে
অর্থাৎ প্রত্যেক জ্বলাতের সময় সাজ-সজ্জা গ্রহণ করতে হয় এবং বাইতুল্লাহ তাওয়াফের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। জাহিলরা উলঙ্গপনার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাইতো, এটাকে তারা আল্লাহর ইবাদত গণ্য করতো। এটা মিথ্যা ও বক্রতার মধ্যে অধিক অশ্লীল। আমরা এ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
জরুরী অবস্থা ছাড়া আমরা উলঙ্গ হওয়াকে হারাম হিসাবেই গ্রহণ করবো। জরুরী অবস্থা: যেমন (মলত্যাগ) ও চিকিৎসা অথবা স্বামী-স্ত্রী পরস্পর মিলনের সময় উলঙ্গ হওয়া। এ দু'টি অবস্থা ছাড়া কঠোরতার সাথে উলঙ্গ হওয়া হারাম। কেননা তা অশ্লীলতা ও পাপাচারীতার দিকে ধাবিত করে। শয়তান জানে; উলঙ্গপনা ব্যভিচারীতা ও সমকামিতার দিকে ঠেলে দেয়। এ কারণে মানুষ উলঙ্গপনায় আগ্রহী হয়। আর এটার নাম রাখা হয়েছে অগ্রগতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি। পক্ষান্তরে শরীর আবৃত রাখা ও মার্জিত পোশাককে অপছন্দ করে বলা হয়, এটা অনগ্রগতি, পশ্চাদগামিতা ও প্রাচীন রীতি। বর্তমানে হিজাবকে ত্যাগ করতে বলা হয়, পুস্তিকায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও সমাবেশে এ ভাল বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়। কিন্তু ঈমানদারগণ দীন আঁকড়ে ধরায় এসব তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না।