📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 বিভক্ত হওয়া ও ঐক্য বিনষ্ট করা

📄 বিভক্ত হওয়া ও ঐক্য বিনষ্ট করা


আল্লাহ তা'আলার আশ্চর্য জনক নিদর্শন! আল্লাহ তা'আলার একতাবদ্ধ হওয়ার উপদেশকে জাহিলরা পরিত্যাগ করে। অথচ তিনি বিভক্ত হতে তাদেরকে নিষেধ করেন আর সেটাই তারা করে এবং প্রত্যেক দল নিজের অবস্থান নিয়ে উল্লাস করে。
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলার বিস্ময়কর নিদর্শন হলো জাহিলরা যখন আল্লাহর কিতাবের উপর একতাবদ্ধ থাকা ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর অর্পিত শরী'আতকে আঁকড়ে ধরা বর্জন করলো তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা, বিক্ষিপ্ততা ও হানাহানি সৃষ্টি করে তাদেরকে পরীক্ষায় ফেললেন। আর তারা নিজেদের বাতিলকে নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠলো। এটাই তাদের শান্তি। কেননা মানুষ বাতিল নিয়ে আনন্দিত হলে তা আর পরিত্যাগ করে না। অপরদিকে যখন বাতিলের প্রতি আনন্দবোধ থাকে না, সন্দেহ জাগে তখন এক্ষেত্রে তাওবা করা ও ফিরে আসার সম্ভবনা থাকে। কিন্তু যখন বাতিলকে নিয়ে শান্তি পায় ও আনন্দিত হয় তখন ব্যক্তির মাঝে পরিবর্তন ঘটে না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বাতিলপন্থীদের শাস্তি।
কেননা যে হক্ব পরিত্যাগ করে, সে বাতিলের পরীক্ষায় পড়ে। আর যে একতাবদ্ধ থাকা বর্জন করে, সে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত, হানাহানি ও সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার পরীক্ষায় পড়ে। তাই দীন ও দুনিয়াবী বিষয়ে ভিন্নমতের ঐসব মানুষের মাঝে কেবল শত্রুতা, গোঁড়ামী ও বিদ্বেষ পাওয়া যায়। কখনো কখনো নিজেরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর যারা কুরআন ও সুন্নাহকে একত্রে আঁকড়ে ধরে, তাদের মাঝে হৃদ্যতা ও ভালবাসা সৃষ্টি হয় এবং পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগীতা করতে দেখা যায়। তারা যেন একটি দেহের মত।
তাই কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা ব্যতীত কোন নিরাপত্তা নেই। আর কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া কোন ঐক্যও নেই। এ ছাড়া যা কিছু আছে সবই বিভেদ ও শান্তি। যারা নিজেদের কথা অনুযায়ী মুসলিমদেরকে একতাবদ্ধ দেখতে চায়, তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যদি মুসলিমদের ঐক্য কামনা করেই থাকো, তাহলে আক্বীদার ক্ষেত্রে এক হও। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন সে একত্বে ও আক্বীদার উপর সবাই এক হয়ে যাও। আর এটা আমাদের কবর, এটা আমাদের সূফীমত ও এটা আমাদের শিয়ামত এসব বলে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করো না।
প্রথমেই আক্বীদার উপর এক হও, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত মা'বুদ নেই এ কালেমা আঁকড়ে ধরো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধানের ক্ষেত্রে এক হও। আর আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাতের দিকে ফিরে আসো। আর যাবতীয় নিয়ম, রীতি ও গোত্রীয় অভ্যাস ইত্যাদি প্রত্যাখ্যান করো এবং কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসো যেহেতু তোমরা মুসলিমদের একতাবদ্ধতা ও ঐক্য কামনা করছো। তাই একই আক্বীদা ও উদ্দেশ্য ছাড়া মুসলিমরা কখনোই এক হতে পারবে না।
এটাই হলো আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান ও নেতৃত্বের একত্বতা যা মুসলিমদের শাসকের কথা শ্রবণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। মুসলিমদের শাসকের মাধ্যমে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে। যেমন নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا: أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعاً وَلَا تَفَرَّقُوا، وَأَنْ تَنَاصَحُوا مَنْ وَلَّاهُ اللهُ أَمْرَكُمْ"
আল্লাহ তা'আলা তোমাদের তিনটি বিষয় পছন্দ করেন, তারই ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না ও সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে, দল বিভক্ত হবে না এবং আল্লাহ যাকে তোমাদের শাসক নির্ধারণ করেছেন পরস্পর তোমরা তার কল্যাণ কামনা করবে।

টিকাঃ
৩২. জ্বহীহ: মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 সঠিক দ্বীনের প্রতি জাহিলদের শত্রুতা আর বাতিল দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা

📄 সঠিক দ্বীনের প্রতি জাহিলদের শত্রুতা আর বাতিল দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা


এটা আশ্চর্যজনক নিদর্শন যে, জাহিলরা তাদের সম্পর্কিত দীনের সাথেই শত্রুতা করে। কাফিরদের দীনের প্রতি জাহিলদের ভালবাসা রয়েছে, যারা ভালবাসা দেখিয়ে তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদের নাবী ও তার দলের সাথে শত্রুতা করে। যেমনভাবে তারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে শত্রুতা করতো। যখন তিনি তাদের নিকট মূসা আলাইহিস সালাম এর দীন নিয়ে আসলেন, তখন তারা যাদুর কিতাবাদী অনুসরণ করলো অথচ তা ছিল ফেরআউনের বংশধরদের দীন。
ব্যাখ্যা: জাহিলদের যে সব সমস্যায় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরোধিতা করেছেন: জাহিলদের নিজেদের দীনের প্রতি শত্রুতা রয়েছে, যে দীন তাদেরকে অনুসরণ করতে বলা হয়। জাহিলদের দ্বারা তাদের শত্রুর দীন অনুসরণ করা জাহিলিয়্যাত। জ্ঞাতব্য যে, ইয়াহুদীরা মূসা আলাইহিস সালাম এর দীনের উপর ছিল। আর তাদের শত্রু হলো ফেরআউন ও তার বংশধর যারা তাদের অনুসারীদেরকে কঠিন শাস্তি দিয়েছিল। তাদের পুত্র সন্তানদেরকে তারা হত্যা করতো ও কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখতো। আর তারা তাদেরকে হীন কাজে ব্যবহার করতো।
এমতবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তার নাবী মূসা কালিমুল্লাহকে প্রেরণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মূসা আলাইহিস সালাম এর হাতে তাদের শত্রু থেকে তাদেরকে নিষ্কৃতি দেন এবং তিনি তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন, তাদের শত্রুকে পরাভূত করেন, তাদের সম্মুখে ফেরআউনকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন এবং এভাবে তিনি মূসা আলাইহিস সালাম এর অনুসারীদের চক্ষু শীতল করেন। জাহিলদের নিকট তাওরাতে নাবী আলাইহিস সালাম এর বর্ণনা ছিল। আর তাওরাত কিতাব মূসা আলাইহিস সালাম নিয়ে আসেন, তাতে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণ বর্ণিত হয়েছে, তাকে অনুসরণের নির্দেশ রয়েছে।
{الَّذِي الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَāةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ} [الأعراف: ١٥٧]
যে উম্মী নাবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল যা তাদের উপরে ছিল অপসারণ করে (সূরা আরাফ ৭:১৫৭)।

তাদের কঠোরতার কারণে আল্লাহ তা'আলাও তাদের প্রতি কঠোর হন। তিনি তাদের কুফরী ও পাপাচারীতার জন্য হালালকে হারাম করে দেন। যদি তারা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনতো তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদের থেকে এ পাপাচারীতা ও বাড়াবাড়ি দূর করে দিতেন। কিন্তু তারা বিদ্বেষ পোষণ করে বললো, এ অঙ্গীকারাবদ্ধ নাবী কিভাবে শেষ যুগে আরব ও ইসমাঈলের বংশধর থেকে আগমন করবে? তিনিতো বনী ইসরাঈলের বংশধরদের থেকে আগমনের উপযুক্ত। ইসমাঈলের বংশধরদের মধ্যে থেকে তিনি আগমন করবেন না। তারা এভাবেই বলতো, অতঃপর তারা মুহাম্মাদ ও তার উম্মতের সাথে হিংসা করতো এবং তাকে অস্বীকার করতো অথচ তারা জানতো তিনি মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হিংসা ও দাম্ভিকতাই তাদেরকে কাফির হতে বাধ্য করে। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

তারা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করার সাথে মূসা আলাইহিস সালাম ও তার কিতাব তাওরাতকেও অস্বীকার করতো। মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বিদ্বেষ বশত তাওরাতকে তারা অস্বীকার করতো। আর তাদের শত্রু ফেরআউনের দীন যাদুর কিতাবের মাধ্যমে তারা তাওরাত পরিবর্তন করে। কেননা ফেরআউনের সম্প্রদায়ের মাঝে যাদু বিদ্যা ছড়িয়ে পড়ে। তাই তারা নাযিলকৃত অহীর বিধান পরিত্যাগ করে ও তাদের শত্রুরা যে যাদুকর্ম করতো তারা তা গ্রহণ করে। এটা বিস্ময়কর! আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ} [البقرة: ١٠١]
আর যখন তাদের নিকট আল্লাহর কাছ থেকে একজন রসূল এল, তাদের সাথে যা আছে তা সমর্থন করে, আহলে কিতাবের একটি দল আল্লাহর কিতাবকে তাদের পেছনে ফেলে দেয়, (এভাবে যে) মনে হয় যেন তারা জানে না (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১০১)।

} كَأَنَّكُمْ لَا يَعْلَمُونَ { অর্থাৎ রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার গুণাবলী এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা যেন তারা জানতোই না। যারা তাকে চিনতো না, তারা অহংকার ও ধৃষ্টতার সাথে জাহিলদের মত কর্ম করতো। (لأنهم لا يعلمون আন্নাহুম লা ইয়ালামুনা 'তথা কেননা তারা জানে না' আল্লাহ তা'আলা একথা বলেননি। বরং বলেছেন )كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ(
অর্থাৎ তারা যেন জানেই না। কেননা বিদ্বান তার জ্ঞানানুযায়ী আমল না করলে বুঝতে হবে সে যেন জানেই না। কারণ জ্ঞানের ফলাফল হলো আমল।
আলেম আমল না করলে জাহিল ও আলেম সমান হয়ে যায়। বরং জাহিলের গুনাহ তার চেয়ে হালকা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ} [البقرة: ١٠٢]

আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১০২)।

এটা যাদু। তাই যাদুর মৌলিকত্ব হলো তা শয়তানের কর্ম। বিভিন্ন যুগে কাফিররা যাদু কর্মের উত্তরাধিকারী হতো। ফেরআউন, তার সম্প্রদায় ও ইয়াহুদীরা তাওরাতের পরিবর্তে যাদু কর্মে উত্তরাধিকারী লাভ করে। তাই যাদু প্রাচীন বিষয়। আর এক প্রজন্মের পর পরবর্তী প্রজন্মের কাফিররা যাদু কর্মের উত্তরাধিকারী হয়। এটাই কাফিরদের শান্তি। মানুষ হকু পরিত্যাগ করলে বাতিলের পরীক্ষায় পড়ে।
এটি এমন রীতি যা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয় না। কতিপয় মুসলিম আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহকে পরিত্যাগ করে মানুষের কথা, দর্শন বিদ্যা ও কালাম শাস্ত্র গ্রহণ করেছে। তারাও এদেরই সমগোত্রীয়
তারা আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাহ পরিত্যাগ করেছে, অন্যকিছু গ্রহণ করেছে। কেননা, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয়ে এ দু'টির আক্বীদা গ্রহণ করেনি। তাই কুফরী ও নাস্তিক্যবাদের আক্বীদা গ্রহণের মাধ্যমে তারা পরীক্ষায় পড়েছে।
গতরাতের সাদৃশ্য কিরূপ হয়! এরূপ যে হক্ব পরিত্যাগ করবে, সে বাতিলের পরীক্ষায় পড়বে। আর যে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মত পরিত্যাগ করবে, সে ভ্রান্ত দলের মাযহাব গ্রহণের মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়বে। আর কিতাব ও সুন্নাহ এবং আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের বিরূদ্ধে যে ভিন্ন মতের ভ্রষ্ট জামা'আতের পক্ষালম্বন করবে, সে ভ্রষ্ট দলে যোগদানের মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়বে। এটাই আল্লাহ তা'আলার রীতি। এখানে হক্ব বর্জনের ব্যাপারে মুসলিদের সতর্ক করা হয়েছে। কেননা, হক্ব বর্জন করলে বাতিলের পরীক্ষায় পড়বে। আর হক্বপন্থীদের পরিত্যাগ করলে সর্বদা বাতিলপন্থীদের অনুসারী হয়ে যাবে。

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 হক্ অস্বীকার করা যখন তা অপ্রিয় কারো কাছে থাকে

📄 হক্ অস্বীকার করা যখন তা অপ্রিয় কারো কাছে থাকে


হকু অস্বীকার করা যখন তা অন্যের নিকট বিদ্যমান, যা তাদের অপছন্দনীয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ} [البقرة: ١١٣]
আর ইয়াহূদীরা বলে, নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই এবং নাসারারা বলে ইয়াহূদীদের কোন ভিত্তি নেই (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১৩)।
ব্যাখ্যা: সবচেয়ে মারাত্মক সমস্যা হলো জাহিলদের হকু অস্বীকার করা যখন তা অন্যের নিকট বিদ্যমান, যা তাদের অপছন্দনীয়। অর্থাৎ পছন্দ করে না। ব্যক্তির পক্ষপাতিত্বের কারণে অপছন্দের সাথে অন্যের হকুকে বর্জন করে। তাদের হক্ব বর্জনের কারণ এটাই। আর যে ব্যক্তিই হকু নিয়ে আসবে তা গ্রহণ করা মুসলিমের উপর ওয়াজীব। কেননা বন্ধু অথবা শত্রু যার নিকট হক্ব পাওয়া যাবে সেখান থেকেই। তা গ্রহণ করা মু'মিনের উদ্দেশ্য। কারণ মু'মিনতো কেবল হকু চায়। কেবল ব্যক্তি কেন্দ্রীক কোন কিছু হলে তা হবে জাহিলী দীন।
আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। তারা আহলে কিতাব ও আহলে ইলম। ইয়াহুদীরা খ্রিষ্টানদের হক্ব বর্জন করে। আর খ্রিষ্টানরাও ইয়াহুদীদের হক্ব বর্জন করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَى شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ} [البقرة: ١١٣]
আর ইয়াহূদীরা বলে, নাসারাদের কোন ভিত্তি নেই এবং নাসারারা বলে ইয়াহূদীদের কোন ভিত্তি নেই (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১৩)।
যারা এরূপ করবে তারা হবে কু-প্রবৃত্তির অনুসারী। ইয়াহুদীরা খ্রিষ্টানদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে তাদের হক্ব অস্বীকার করে। খ্রিষ্টানরাও শত্রুতা বশতঃ ইয়াহুদীদের হক্ব অস্বীকার করে। } وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ{ অথচ তারা কিতাব পাঠ করে, তিনি তাদেরকে হক্ব কবুলের নির্দেশ দেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { كَذَلِكَ قَالَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْهِمْ} [البقرة: ١١३]
এভাবেই, যারা কিছু জানে না, তারা তাদের কথার মত কথা বলে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১১৩)।
যাদের নিকট কিতাব নেই তারা এ পদ্ধতির উপর পরিচালিত হয়। প্রত্যেক দল অপর দলকে অস্বীকার করে, তৎসঙ্গে তাদের হক্বকেও অস্বীকার করে।
মোদ্দা কথা হলো ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের রীতি থেকে বিরত থাকা মুসলিমের উপর ওয়াজীব। কারণ যাকে তারা পছন্দ করে না, তাদের হকুকে অস্বীকার করাই তাদের রীতি। সমাজে এমন কতিপয় ব্যক্তি রয়েছে যারা কেবল নিজেদের হক্কুকে ধারণ করতে বলে। যেমন বর্তমানে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, কোন দল বা জামা'আত যখন কোন আলেমের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তখন তার নিকট যে হক্ব আছে তা তারা বর্জন করে। ঐ আলেমের সাথে তাদের শত্রুতাই হক্ব বর্জনে তাদেরকে প্ররোচিত করে। আর এ শত্রুতা অন্ধকারে চলতে, আলেমের প্রতি অনাগ্রহীতায় প্ররোচিত করে এবং তার রচিত কিতাবাদী ও পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে। যদিও আলেম হকুপন্থী হয়ে থাকেন। কিন্তু কেন এরূপ করে? তারা ঐ আলেমের হক্ব পছন্দ করে না, এটাই একমাত্র কারণ। হে মুসলিম! তুমি যাকে ভালবাস না যদি তার সাথে হক্ব থাকে, তা কবول করা তোমার উপর ওয়াজীব। আর হক্ব গ্রহণে ব্যক্তিগত শত্রুতা ও নিজের খেয়াল খুশি অন্তরায় হতে পারে না।
নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এক ইয়াহুদী এসে বললো, إنكم تشركون، تقولون ما شاء الله وشاء محمد أمر أن يقولو : " ماشاء الله وحده " ولا يقولو ماشاء الله وشاء محمد
আপনারাতো শিরক করেন। আপনারা বলে থাকেন, আল্লাহ ও মুহাম্মাদ যা চান। 'একমাত্র আল্লাহ যা চান' ইয়াহুদী এ কথা বলতে বলেন। আর 'আল্লাহ ও মুহাম্মাদ যা চান' একথা বলবে না।

অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ হকুকে কবুল করেন। আর তিনি ছাহাবীদের এ ধরণের ভুল কথা ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন।
অনুরূপভাবে ইয়াহুদী আলেমদের থেকে এক আলেম নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললো, আল্লাহ তা'আলা ডান হাতে আসমান পেঁচিয়ে ধরবেন, এক আঙ্গুলের উপর পাহাড়, এক আঙ্গুলের উপর জমিন স্থাপন করবেন.... হাদীছের শেষ পর্যন্ত বলতে থাকলে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সমর্থনে হাসলেন, এমনকি তার সামনের দাঁত প্রকাশ হলো। আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বলেন, {وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعاً قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ} [الزمر: ٦٧]
আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে (সূরা যুমার ৩৯:৬৭)।
এ ইয়াহুদী যাজকের কথা সত্যের অনুকূলে হওয়ায় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কথাকে গ্রহণ করলেন এবং আনন্দিত হলেন।
মোদ্দা কথা হলো, হকু গ্রহণ করা মুসলিমের উপর আবশ্যক। ব্যক্তিগত শত্রুতা ও উদ্দেশ্য তাকে প্ররোচিত করতে পারবে না। আর কতিপয় হক্বপন্থীদের ব্যাপারে বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না। হক্বপন্থী আলেম যা বলে তা বর্জনে এ বিষয়গুলো যেন প্ররোচিত না করে। বরং হক্ব গ্রহণের মাধ্যমে যেন উপকার লাভ হয়। এমনকি আলেম যদি সরল পথে না থাকে, তার মাঝে দোষ-ত্রুটি ও নিন্দনীয় কিছু পাওয়া যায়, এমতবস্থায় সে হক্ব প্রচার করলে তার হক্বকে গ্রহণ করা সঠিক হবে। তার ব্যক্তিসত্তার কারণে গ্রহণ করা হতে বিরত হবে না। বরং হক্ব হিসাবেই তা গ্রহণ করা হবে। আর এটাই আবশ্যক। রব প্রদত্ত এ পদ্ধতি অনুসরণ পূর্বক হক্বপন্থীরা যা নিয়ে আসেন তা থেকে হজ্ব গ্রহণ করা শিক্ষার্থীর উপর আবশ্যক।

টিকাঃ
৩৩. জ্বহীহ: নাসাঈ, মুসনাদে আহমাদ, বাইহাকী সুনানুল কুবরা। জুহাইনার স্ত্রী কুতাইলা হতে বর্ণিত, এক ইয়াহুদী নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললো, আপনারাতো অংশীদার স্থাপন করেন, শিরক করেন, আপনারা বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা ও আপনি যা চান। আর কাবার শপথ! এ কথাও বলেন। অতঃপর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে নির্দেশ দিলেন যে, যখন তারা শপথ করতে ইচ্ছা করবে তখন বলবে, কাবার রবের শপথ! আর বলবে, আল্লাহ তা'আলা যা চান অতঃপর আপনি যা চান।
৩৪. ছহীহ বুখারী ৪৮১১, ছহীহ মুসলিম ২৭৮৬।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 তাদের স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির মধ্যে বৈপরীত্য

📄 তাদের স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতির মধ্যে বৈপরীত্য


জাহিলরা তাদের দীনের অনুমোদিত বিষয় অস্বীকার করে। যেমন তারা হজ্জের ক্ষেত্রে করে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ} [البقرة: ١٣٠] আর যে নিজকে নির্বোধ বানিয়েছে, সে ব্যতীত কে ইবরাহীমের আদর্শ থেকে বিমুখ হতে পারে? (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১৩০)।
ব্যাখ্যা: ইয়াহুদীরা দাবি করে যে, তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আদর্শের উপরই রয়েছে। অথচ যখন কিবলা পরিবর্তন করে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দ্বারা নির্মিত কা'বাকে কিবলা নির্ধারণ করা হলো ইয়াহুদীরা তখন চুড়ান্তভাবে কা'বাকে অস্বীকার করলো। আমরা এ থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। কেননা, কা'বা ও ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনের বিধান হজ্জকে ইয়াহুদীরা স্বীকৃতি দেয় না। তারা কিবলামুখী হওয়াকে অস্বীকার করে অথচ তারা জানে এটা সত্য-হকু। কাবা এমন ঘর যা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নির্মাণ করেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ} [الحج: ٢٦] {وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ} [البقرة: ١٢٧]
আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বায়তুল্লাহ্) স্থাননির্ধারণ করে দিয়েছিলাম (সূরা আল হাজ্জ ২২:২৬)। আর যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তিগুলো উঠাচ্ছিল (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১২৭)।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশে কা'বা নির্মিত হয়। আর কা'বাকে কেবলা হিসাবে কবুল করা হয়েছে অথচ তারা এটাকে অস্বীকার করে। অনুরূপভাবে হজ্জ পালন করা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আদর্শ। এটা জানা সত্ত্বেও তারা তা অস্বীকার করে। কিন্তু মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তাদের শত্রুতাই এসব কিছু অস্বীকার করতে তাদেরকে প্ররোচিত করে। সুতরাং কা'বা হলো ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর মিরাছ বা উত্তরাধীকার। কা'বামুখী হয়ে জ্বলাত আদায় করা এবং সেখানে হজ্জ ও উমরা পালনের ইচ্ছা করা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনের অন্তর্ভুক্ত। আর ইয়াহুদীরা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে অথচ তার বৃহৎ নিদর্শনাবলী তারা অস্বীকার করে। তাই এটা বিস্ময়কর দ্বন্দ্বের অন্তর্ভুক্ত।
এমনিভাবে যে নিজেকে ইসলামের দিকে সম্পৃক্ত করে এবং ইসলামের কতিপয় বিধান পরিত্যাগ করে বলে, আমি মুসলিম। অতঃপর সে কবর পূজা করে, সেখানে প্রার্থনা করে, বরকত কামনা করে ও কবরের মাটি দিয়ে শরীর মুছে। যখন তাকে বলা হয়, এগুলো শিরক। তখন সে তা পরিত্যাগ করে না, বরং এর উপরই অটল থাকে এবং এগুলো থেকে বাধাদানকারীর সাথে শত্রুতা পোষণ করে। এরূপ সম্পৃক্ততা দ্বন্দ্বের অন্তর্ভুক্ত। আর যদিও ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত হয়, কিন্তু ইসলামের মহা নিদর্শন তাওহীদের বিরোধিতা করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00