📄 অপরের নিকট বিদ্যমান হক্ বর্জন করা
জাহিলরা তাদের দল ছাড়া অন্যর হক্বকে গ্রহণ করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا} [البقرة: ٩١]
তারা বলে, আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯১)।
ব্যাখ্যা: যখন জাহিলদেরকে বলা হয়, মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর যা নাযিল হয়েছে তার উপর ঈমান আনো তখন তারা বলে,
{قَالُوا نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا} [البقرة: ٩١]
অর্থাৎ মুসা আলাইহিস সালাম এর উপর যা নাযিল হয়েছিল।
{وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ} [البقرة: ٩١]
আর এর বাইরে যা আছে তারা তা অস্বীকার করে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৯১)। অর্থাৎ অন্য কিছু
{ وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقاً لِمَا مَعَهُمْ} [البقرة: ٩١]
তা সত্য, তাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারী (সূরা আল বাক্বরাহ ২:৯১)। তারা বলে, আমরা তাওরাতের উপর ঈমান আনবো যা আমাদের নাবী মূসা আলাইহিস সালাম এর উপর নাযিল হয়েছে।
{وَيَكْفُرُونَ بِمَا وَرَاءَهُ} [البقرة: ٩١]
আর এর বাইরে যা আছে তারা তা অস্বীকার করে (সূরা বাক্বরাহ ২:৯১)। তা হলো ইনজিল যা ঈসা আলাইহিস সালাম এর উপর নাযিল হয়েছে। আর কুরআন নাযিল হয়েছে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর।
{وَهُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَهُمْ}
তা সত্য, তাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারী (সূরা আল বাক্বরাহ ২:৯১)। যা তাওরাতে আছে, ইনজিল ও কুরআন তা সত্যায়নকারী।
আল্লাহ তা'আলা তাদের কথা এভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, মূসা আলাইহিস সালাম এর উপর যা নাযিল হয়েছে তোমরা যদি তার অনুসরণ করেই থাকো, তাহলে নাবীগণকে তোমরা কিভাবে হত্যা করতে পারো? নাবীগণকে হত্যার করার কথা কি মূসা আলাইহিস সালাম এর উপর নাযিল হয়েছিল? জাহিলরা যাকারিয়া ও ইহইয়া আলাইহিমাস সালামকে হত্যা করেছে, ইয়াহুদীরা ঈসা আলাইহিস সালামকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। তাদের চক্রান্ত থেকে তিনি তাকে বাঁচিয়েছেন। আর তারা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। নাবীগণকে হত্যা করাই যেন তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَقْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقاً kَذَّبْتُمْ وَفَرِيقاً تَقْتُلُونَ} [البقرة: [৮৭]
তবে কি তোমাদের নিকট যখনই কোন রসূল এমন কিছু নিয়ে এল, যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখন তোমরা অহঙ্কার করেছ, অতঃপর (নাবীদের) একদলকে মিথ্যাবাদী বলেছে আর একদলকে হত্যা করেছে (সূরা বাক্বরাহ ২:৮-৭)।
তারা কতিপয় রসূলকে মিথ্যাবাদী মনে করেছে, কিছু সংখ্যককে হত্যা করেছে। কিন্তু কেন তারা এরূপ করেছিল? কারণ রসূলগণ তাদের নিকট যা নিয়ে এসেছেন তা তাদের কু-প্রবৃত্তি বিরোধী ছিল। তাহলে তারা কিভাবে বলতে পারে আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার উপর আমরা ঈমান আনবো? তাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান কোথায়? মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বৈশিষ্ট্য, গুণাবলী ও তার রিসালাতের কথা তাওরাতেও বর্ণিত হয়েছে। তাহলে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তারা ঈমান আনয়ন করে না কেন? মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনার অর্থই হলো তাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করা। অথচ তারা তাকে অস্বীকার করে বলে,
{نُؤْمِنُ بِمَا أُنْزِلَ عَلَيْنَا} [البقرة: ٩১]
আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে আমরা তা বিশ্বাস করি (সূরা আল বাক্বরাহ ২:৯১)।
যারা বলে, আমি অমুক আলেম ছাড়া কাউকে অনুসরণ করি না, এ আয়াত তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে অথচ তার উপর হক্ব গ্রহণ করা ওয়াজীব। ইমাম অথবা দারস দানকারী অথবা শাইখের পক্ষপাতিত্ব করা তার জন্য আবশ্যক নয়। যেমন বিভিন্ন পন্থার পীর রয়েছে। তাদের মুরিদ ও অনুসারীরা পীরদের পক্ষপাতিত্ব করে। পীর যা বলে তা ব্যতিরেকে তারা হকুকে গ্রহণ করে না। এটাই বাতিল বিষয়। কেননা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত সুনির্দিষ্টভাবে কারো আনুগত্য করা ওয়াজীব নয়। আর যে বলে, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত অন্যের আনুগত্য করাও ওয়াজীব, তাহলে সে হবে মুরতাদ। তাকে তাওবা করতে হবে নচেৎ তাকে হত্যা করা হবে। যেমন কোন এক ব্যক্তিকে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমজ্ঞানী মনে করা হলে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ তাকে হত্যা করার ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
তাই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত কারো আনুগত্য করা ওয়াজীব নয়। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত ইমাম ও আলেমদের মাঝে হকু পাওয়া গেলে তাদের আনুগত্য করতে হবে। ইজতিহাদে তাদের ভুল পরিলক্ষিত হলে তা গ্রহণ করা বৈধ নয়, যদিও তারা ইমাম হন। ইমামগণ বলেন, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথার সাথে আমাদের কথার মিল হলে তবেই তা গ্রহণ করবে নচেৎ নয়。
📄 তারা (ইয়াহুদীরা) যাদের অনুসরণ করে বলে ধারণা করে, তাদের বক্তব্য অনুযায়ীও আমল করে না
ইয়াহুদীরা যা বলে, সে সম্পর্কে না জানা সত্ত্বেও তা মেনে নেয়। আল্লাহ তা'আলা সতর্ক করে বলেন,
{قُلْ فَلِمَ تَقْتُلُونَ أَنْبِيَاءَ اللَّهِ مِنْ قَبْلُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ} [البقرة: ٩١] : বল, তবে কেন তোমরা আল্লাহর নাবীদেরকে পূর্বে হত্যা করতে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক? (সূরা আল বাক্বরাহ ২:৯১)।
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ তাওরাতে যা নাযিল হয়েছে তার অনুসরণের দিকে ঐ সব ইয়াহুদীরা আহবান করে। দু'ভাবে এ দাবি মিথ্যাপ্রতিপন্ন হয়।
প্রথমত: নাবীগণকে হত্যা করা। অথচ নাবীগণকে হত্যার কথা তাওরাতে উল্লেখ নেই। বরং নাবীগণের প্রতি ঈমান আনা, তাদেরকে সম্মান করা, অনুসরণ ও অনুকরণ করার কথা উল্লেখ আছে।
দ্বিতীয়ত: তাওরাতে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহর বাণী:
{الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَāةِ وَالْأَنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ} [الأعراف: [١٥٧
যারা অনুসরণ করে রসূলের যে উম্মী নাবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে (সূরা আল আরাফ ৭:১৫৭)।
তাওরাতে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলীর কথা উল্লেখ আছে। অথচ তারা তার প্রতি ঈমান আনেনি। নাবীগণ ও আলেমগণ ঈমানের দিকে যে আহবান করতেন, সেকথা তারা বলতো না। বরং নাবীগণ যা বলতেন তা তারা জানতো না।
📄 বিভক্ত হওয়া ও ঐক্য বিনষ্ট করা
আল্লাহ তা'আলার আশ্চর্য জনক নিদর্শন! আল্লাহ তা'আলার একতাবদ্ধ হওয়ার উপদেশকে জাহিলরা পরিত্যাগ করে। অথচ তিনি বিভক্ত হতে তাদেরকে নিষেধ করেন আর সেটাই তারা করে এবং প্রত্যেক দল নিজের অবস্থান নিয়ে উল্লাস করে。
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলার বিস্ময়কর নিদর্শন হলো জাহিলরা যখন আল্লাহর কিতাবের উপর একতাবদ্ধ থাকা ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর অর্পিত শরী'আতকে আঁকড়ে ধরা বর্জন করলো তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা, বিক্ষিপ্ততা ও হানাহানি সৃষ্টি করে তাদেরকে পরীক্ষায় ফেললেন। আর তারা নিজেদের বাতিলকে নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠলো। এটাই তাদের শান্তি। কেননা মানুষ বাতিল নিয়ে আনন্দিত হলে তা আর পরিত্যাগ করে না। অপরদিকে যখন বাতিলের প্রতি আনন্দবোধ থাকে না, সন্দেহ জাগে তখন এক্ষেত্রে তাওবা করা ও ফিরে আসার সম্ভবনা থাকে। কিন্তু যখন বাতিলকে নিয়ে শান্তি পায় ও আনন্দিত হয় তখন ব্যক্তির মাঝে পরিবর্তন ঘটে না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বাতিলপন্থীদের শাস্তি।
কেননা যে হক্ব পরিত্যাগ করে, সে বাতিলের পরীক্ষায় পড়ে। আর যে একতাবদ্ধ থাকা বর্জন করে, সে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত, হানাহানি ও সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার পরীক্ষায় পড়ে। তাই দীন ও দুনিয়াবী বিষয়ে ভিন্নমতের ঐসব মানুষের মাঝে কেবল শত্রুতা, গোঁড়ামী ও বিদ্বেষ পাওয়া যায়। কখনো কখনো নিজেরা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর যারা কুরআন ও সুন্নাহকে একত্রে আঁকড়ে ধরে, তাদের মাঝে হৃদ্যতা ও ভালবাসা সৃষ্টি হয় এবং পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগীতা করতে দেখা যায়। তারা যেন একটি দেহের মত।
তাই কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা ব্যতীত কোন নিরাপত্তা নেই। আর কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ ছাড়া কোন ঐক্যও নেই। এ ছাড়া যা কিছু আছে সবই বিভেদ ও শান্তি। যারা নিজেদের কথা অনুযায়ী মুসলিমদেরকে একতাবদ্ধ দেখতে চায়, তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যদি মুসলিমদের ঐক্য কামনা করেই থাকো, তাহলে আক্বীদার ক্ষেত্রে এক হও। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন সে একত্বে ও আক্বীদার উপর সবাই এক হয়ে যাও। আর এটা আমাদের কবর, এটা আমাদের সূফীমত ও এটা আমাদের শিয়ামত এসব বলে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করো না।
প্রথমেই আক্বীদার উপর এক হও, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত মা'বুদ নেই এ কালেমা আঁকড়ে ধরো। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধানের ক্ষেত্রে এক হও। আর আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাতের দিকে ফিরে আসো। আর যাবতীয় নিয়ম, রীতি ও গোত্রীয় অভ্যাস ইত্যাদি প্রত্যাখ্যান করো এবং কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসো যেহেতু তোমরা মুসলিমদের একতাবদ্ধতা ও ঐক্য কামনা করছো। তাই একই আক্বীদা ও উদ্দেশ্য ছাড়া মুসলিমরা কখনোই এক হতে পারবে না।
এটাই হলো আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত বিধান ও নেতৃত্বের একত্বতা যা মুসলিমদের শাসকের কথা শ্রবণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। মুসলিমদের শাসকের মাধ্যমে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবে। যেমন নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ اللهَ يَرْضَى لَكُمْ ثَلَاثًا: أَنْ تَعْبُدُوهُ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا، وَأَنْ تَعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيعاً وَلَا تَفَرَّقُوا، وَأَنْ تَنَاصَحُوا مَنْ وَلَّاهُ اللهُ أَمْرَكُمْ"
আল্লাহ তা'আলা তোমাদের তিনটি বিষয় পছন্দ করেন, তারই ইবাদত করবে, তার সাথে কাউকে শরীক করবে না ও সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে, দল বিভক্ত হবে না এবং আল্লাহ যাকে তোমাদের শাসক নির্ধারণ করেছেন পরস্পর তোমরা তার কল্যাণ কামনা করবে।
টিকাঃ
৩২. জ্বহীহ: মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ।
📄 সঠিক দ্বীনের প্রতি জাহিলদের শত্রুতা আর বাতিল দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা
এটা আশ্চর্যজনক নিদর্শন যে, জাহিলরা তাদের সম্পর্কিত দীনের সাথেই শত্রুতা করে। কাফিরদের দীনের প্রতি জাহিলদের ভালবাসা রয়েছে, যারা ভালবাসা দেখিয়ে তাদের সাথে শত্রুতা করে, তাদের নাবী ও তার দলের সাথে শত্রুতা করে। যেমনভাবে তারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে শত্রুতা করতো। যখন তিনি তাদের নিকট মূসা আলাইহিস সালাম এর দীন নিয়ে আসলেন, তখন তারা যাদুর কিতাবাদী অনুসরণ করলো অথচ তা ছিল ফেরআউনের বংশধরদের দীন。
ব্যাখ্যা: জাহিলদের যে সব সমস্যায় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিরোধিতা করেছেন: জাহিলদের নিজেদের দীনের প্রতি শত্রুতা রয়েছে, যে দীন তাদেরকে অনুসরণ করতে বলা হয়। জাহিলদের দ্বারা তাদের শত্রুর দীন অনুসরণ করা জাহিলিয়্যাত। জ্ঞাতব্য যে, ইয়াহুদীরা মূসা আলাইহিস সালাম এর দীনের উপর ছিল। আর তাদের শত্রু হলো ফেরআউন ও তার বংশধর যারা তাদের অনুসারীদেরকে কঠিন শাস্তি দিয়েছিল। তাদের পুত্র সন্তানদেরকে তারা হত্যা করতো ও কন্যা সন্তানদেরকে জীবিত রাখতো। আর তারা তাদেরকে হীন কাজে ব্যবহার করতো।
এমতবস্থায় আল্লাহ তা'আলা তার নাবী মূসা কালিমুল্লাহকে প্রেরণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা মূসা আলাইহিস সালাম এর হাতে তাদের শত্রু থেকে তাদেরকে নিষ্কৃতি দেন এবং তিনি তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন, তাদের শত্রুকে পরাভূত করেন, তাদের সম্মুখে ফেরআউনকে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন এবং এভাবে তিনি মূসা আলাইহিস সালাম এর অনুসারীদের চক্ষু শীতল করেন। জাহিলদের নিকট তাওরাতে নাবী আলাইহিস সালাম এর বর্ণনা ছিল। আর তাওরাত কিতাব মূসা আলাইহিস সালাম নিয়ে আসেন, তাতে মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণ বর্ণিত হয়েছে, তাকে অনুসরণের নির্দেশ রয়েছে।
{الَّذِي الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَāةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ} [الأعراف: ١٥٧]
যে উম্মী নাবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল যা তাদের উপরে ছিল অপসারণ করে (সূরা আরাফ ৭:১৫৭)।
তাদের কঠোরতার কারণে আল্লাহ তা'আলাও তাদের প্রতি কঠোর হন। তিনি তাদের কুফরী ও পাপাচারীতার জন্য হালালকে হারাম করে দেন। যদি তারা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনতো তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদের থেকে এ পাপাচারীতা ও বাড়াবাড়ি দূর করে দিতেন। কিন্তু তারা বিদ্বেষ পোষণ করে বললো, এ অঙ্গীকারাবদ্ধ নাবী কিভাবে শেষ যুগে আরব ও ইসমাঈলের বংশধর থেকে আগমন করবে? তিনিতো বনী ইসরাঈলের বংশধরদের থেকে আগমনের উপযুক্ত। ইসমাঈলের বংশধরদের মধ্যে থেকে তিনি আগমন করবেন না। তারা এভাবেই বলতো, অতঃপর তারা মুহাম্মাদ ও তার উম্মতের সাথে হিংসা করতো এবং তাকে অস্বীকার করতো অথচ তারা জানতো তিনি মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হিংসা ও দাম্ভিকতাই তাদেরকে কাফির হতে বাধ্য করে। আমরা আল্লাহর নিকট এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
তারা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করার সাথে মূসা আলাইহিস সালাম ও তার কিতাব তাওরাতকেও অস্বীকার করতো। মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি বিদ্বেষ বশত তাওরাতকে তারা অস্বীকার করতো। আর তাদের শত্রু ফেরআউনের দীন যাদুর কিতাবের মাধ্যমে তারা তাওরাত পরিবর্তন করে। কেননা ফেরআউনের সম্প্রদায়ের মাঝে যাদু বিদ্যা ছড়িয়ে পড়ে। তাই তারা নাযিলকৃত অহীর বিধান পরিত্যাগ করে ও তাদের শত্রুরা যে যাদুকর্ম করতো তারা তা গ্রহণ করে। এটা বিস্ময়কর! আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ} [البقرة: ١٠١]
আর যখন তাদের নিকট আল্লাহর কাছ থেকে একজন রসূল এল, তাদের সাথে যা আছে তা সমর্থন করে, আহলে কিতাবের একটি দল আল্লাহর কিতাবকে তাদের পেছনে ফেলে দেয়, (এভাবে যে) মনে হয় যেন তারা জানে না (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১০১)।
} كَأَنَّكُمْ لَا يَعْلَمُونَ { অর্থাৎ রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার গুণাবলী এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা যেন তারা জানতোই না। যারা তাকে চিনতো না, তারা অহংকার ও ধৃষ্টতার সাথে জাহিলদের মত কর্ম করতো। (لأنهم لا يعلمون আন্নাহুম লা ইয়ালামুনা 'তথা কেননা তারা জানে না' আল্লাহ তা'আলা একথা বলেননি। বরং বলেছেন )كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ(
অর্থাৎ তারা যেন জানেই না। কেননা বিদ্বান তার জ্ঞানানুযায়ী আমল না করলে বুঝতে হবে সে যেন জানেই না। কারণ জ্ঞানের ফলাফল হলো আমল।
আলেম আমল না করলে জাহিল ও আলেম সমান হয়ে যায়। বরং জাহিলের গুনাহ তার চেয়ে হালকা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ} [البقرة: ١٠٢]
আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১০২)।
এটা যাদু। তাই যাদুর মৌলিকত্ব হলো তা শয়তানের কর্ম। বিভিন্ন যুগে কাফিররা যাদু কর্মের উত্তরাধিকারী হতো। ফেরআউন, তার সম্প্রদায় ও ইয়াহুদীরা তাওরাতের পরিবর্তে যাদু কর্মে উত্তরাধিকারী লাভ করে। তাই যাদু প্রাচীন বিষয়। আর এক প্রজন্মের পর পরবর্তী প্রজন্মের কাফিররা যাদু কর্মের উত্তরাধিকারী হয়। এটাই কাফিরদের শান্তি। মানুষ হকু পরিত্যাগ করলে বাতিলের পরীক্ষায় পড়ে।
এটি এমন রীতি যা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয় না। কতিপয় মুসলিম আল্লাহর কিতাব ও রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহকে পরিত্যাগ করে মানুষের কথা, দর্শন বিদ্যা ও কালাম শাস্ত্র গ্রহণ করেছে। তারাও এদেরই সমগোত্রীয়
তারা আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাহ পরিত্যাগ করেছে, অন্যকিছু গ্রহণ করেছে। কেননা, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয়ে এ দু'টির আক্বীদা গ্রহণ করেনি। তাই কুফরী ও নাস্তিক্যবাদের আক্বীদা গ্রহণের মাধ্যমে তারা পরীক্ষায় পড়েছে।
গতরাতের সাদৃশ্য কিরূপ হয়! এরূপ যে হক্ব পরিত্যাগ করবে, সে বাতিলের পরীক্ষায় পড়বে। আর যে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মত পরিত্যাগ করবে, সে ভ্রান্ত দলের মাযহাব গ্রহণের মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়বে। আর কিতাব ও সুন্নাহ এবং আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের বিরূদ্ধে যে ভিন্ন মতের ভ্রষ্ট জামা'আতের পক্ষালম্বন করবে, সে ভ্রষ্ট দলে যোগদানের মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়বে। এটাই আল্লাহ তা'আলার রীতি। এখানে হক্ব বর্জনের ব্যাপারে মুসলিদের সতর্ক করা হয়েছে। কেননা, হক্ব বর্জন করলে বাতিলের পরীক্ষায় পড়বে। আর হক্বপন্থীদের পরিত্যাগ করলে সর্বদা বাতিলপন্থীদের অনুসারী হয়ে যাবে。