📄 দ্বীনকে খেল-তামাশা হিসাবে গ্রহণ করা
দীনকে খেল-তামাশা হিসাবে গ্রহণ করেছে。
ব্যাখ্যা: প্রমোদ )اللهو( হলো প্রত্যেক এমন বাতিল বিষয় যা হক্ব থেকে মানুষকে বিরত রাখে। আর তামাশা )للعب।) হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিপরীত যাতে কোন উপকারীতা নেই। সুতরাং খেল-তামাশাকে দীন হিসাবে গ্রহণ করে তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা জাহিলী দীন। সূফীদের মাঝেও এটা বিদ্যমান আছে। দ্বফ বা তবলা বাজানো ও গান করাকে সূফীরা আল্লাহর ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করেছে। এসবের মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চায়। আর গান ও বাদ্যযন্ত্র খেল-তামাশা যা নির্দিষ্ট সীমা রেখা ছাড়া হারাম। তাহলে কিভাবে এটাকে আল্লাহর ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করা হয়? বর্তমানে সূফীরা সঙ্গীতকে ইসলামী গানের সাথে তুলনা করে তা গ্রহণ করে। তারা এটাকে আল্লাহর দিকে দাওয়াতের মাধ্যম নির্ধারণ করেছে। যেমন তারা বলে, এভাবে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া দীনের মধ্যে গণ্য। (তাদের ধারণা) এটা গান, গুঞ্জন ও শব্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না যা দ্বারা আত্মা মজা পায়।
মানুষ আল্লাহর স্বরণ ও কুরআন তেলাওয়াত ছেড়ে দিয়ে তাতে ব্যস্ত থাকে। এটা দলীয় পদ্ধতির নিদর্শন মাত্র যা দাওয়াতের মাধ্যম নয়। কেননা দা'ওয়াত দেয়ার বিধান নির্ধারিত। আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিতাব ও সুন্নাহর মাধ্যমে মানুষকে দা'ওয়াত দিতেন, উপদেশ দিতেন ও সঠিক পথ দেখাতেন। তিনি উত্তম পন্থায় মানুষের সাথে তর্ক করতেন। কোন দলের সঙ্গীতকে তিনি দা'ওয়াতের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেননি।
মুশরিকদের প্রতিহত করা ও ইসলামকে রক্ষা করার জন্য উত্তম কবিতা রচনা করা হতো, যা দোষনীয় নয়। যেমন হাসান ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর রচিত কবিতা দোষমুক্ত ছিল অথবা ভাল আমলের প্রতি উৎসাহিত করা এবং সফরে বের হওয়ার জন্য কবিতা রচনা করা হত, যা বর্তমানে ব্যবহৃত দলীয় সঙ্গীতের মত ছিল না। তাই কবিতার সাথে সঙ্গীতকে তুলনা করা যাবে না। কেননা দু'টির মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।
📄 দুনিয়ার মাধ্যমে ধোঁকায় পড়া
পার্থিব জীবন জাহিলদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারা ধারণা করে যে, পার্থিব চাকচিক্যতা আল্লাহর দান যা তার সন্তুষ্টি প্রমাণিত হয়। যেমন জাহিলরা বলে, আল্লাহর বাণী:
{نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالاً وَأَوْلاداً وَمَا نَحْنُ بِمُعَذِّبِينَ} [سبأ: ٣٥]
আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অধিক সমৃদ্ধশালী। আর তাই আমরা শান্তি প্রাপ্ত হবো না (সূরা সাবা ৩৪:৩৫)।
ব্যাখ্যা: জাহিলরা তাদের সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদকে নিজেদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান মনে করতো। তাদের ধারণা, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে শাস্তি দিবেন না। আল্লাহর বাণী:
{ وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالاً وَأَوْلاداً وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلا أَوْلادُكُمْ بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفَى} [سبأ: [٣٥,৩৭
আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অধিক সমৃদ্ধশালী। আর তাই আমরা শান্তি প্রাপ্ত হবো না বল, 'আমার রব যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন অথবা সঙ্কুচিত করেন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।' আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন বস্তু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে (সূরা সাবা ৩৪:৩৫-৩৭)।
{ قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ} [سبأ : ৩৯]
বল, 'নিশ্চয় আমার রব তার বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিযিকদাতা' (সূরা সাবা ৩৪:৩৯)।
বেশি ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও প্রাচুর্য বান্দার জন্য আল্লাহর ভালবাসার দলীল নয়। বরং তিনি কাফিরকে ধীরে ধীরে পাঁকড়াও করার জন্য তাদেরকে পার্থিব ধন-সম্পদ দিয়ে থাকেন। হাদীছে বর্ণিত:
"إن الله يعطي الدنيا من يحب ومن لا يحب، وأما الدين فلا يعطيه إلا من يحب"
আল্লাহ তা'আলা যাকে ভালবাসেন অথবা অপছন্দ করেন উভয়কে তিনি পার্থিব প্রাচুর্যতা দান করে থাকেন। আর আল্লাহ তা'আলা যাকে ভালবাসেন তাকে দীনের জ্ঞান দান করেন। অন্য হাদীছে এসেছে:
"لو كانت الدنيا تعدل عند الله جناح بعوضة ما سقى منها كافراً شربة ماء"
আল্লাহ তা'আলার নিকট যদি মশার পাখা পরিমাণ দুনিয়ার মূল্য থাকতো, তাহলে কোন কাফিরকে তিনি একফোটা পানিও পান করতে দিতেন না।
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অভাবী ছিলেন। অনুরূপভাবে তার ছাহাবীগণেরও অভাব-অনটন ছিল। অথচ নাবীগণের পরে তারা সৃষ্টির মাঝে উত্তম মানুষ। আর কাফিররা অবাধে বিচরণ করে এবং নাবীগণের পরে তারা আল্লাহ তা'আলার নেআ'মত পেয়ে উল্লসিত হয়। কাফিরদেরকে ধীরে ধীরে পাঁকড়াও করা হবে একারণে তারা আল্লাহর নেআ'মত পেয়ে উল্লসিত হয় ও অবাধে চলাফেরা করে। তাই দুনিয়ার চাকচিক্য আল্লাহর নিকট দুনিয়াবাসীর সম্মান প্রমাণ করে না বরং আমলকারী ধনী হোক বা গরিব হোক সৎ আমলের মাধ্যমেই আল্লাহর নিকট বান্দার সম্মান প্রমাণিত হয়।
দুনিয়াপ্রেমিক, সম্পদশালী ও প্রাচুর্যের অধিকারীরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট সম্মানিত বলে মানুষ ধারণা করে, আর বলে অভাব-অনটনে নিপতিত লোকজন আল্লাহর নিকট লাঞ্ছিত, তাদের এ ধারণা ভুল。
টিকাঃ
২৯. জ্বহীহ: মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাক হাকীম।
৩০. জ্বহীহ: তিরমিযী ২৩২৫।
📄 যখন দুর্বলরা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত, তখন জাহিল কর্তৃক হক্ প্রত্যাখ্যান করা
দুর্বলরা হকু গ্রহণে অগ্রবর্তী হলে জাহিলরা তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। অহংকারের সাথে তারা ধৃষ্টতা দেখায়। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে আয়াত নাযিল করে বলেন,
{ وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ ... } [الأنعام: ٥২]
আর তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে ডাকে (সূরা আল আন'আম ৫:৫২)
ব্যাখ্যা: দুর্বলরা হক্বের উপর অবিচল থাকলে জাহিলরা তা প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণে তারা বলে,
{ أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ bَيْنِنَا} [الأنعام: ৫৩]
'এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? (সূরা আন'আম ৬:৫৩)। অর্থাৎ তারা আমাদের চেয়ে জান্নাতে প্রবেশের দিক থেকে উত্তম নয়। আমরাই দুর্বলদের চেয়ে অগ্রগামী ও আমরা তাদের চেয়ে সম্মানিত। সমাজে ঐ সব দুর্বলদের কোন মূল্য নেই ও তাদের কোন অংশও নেই। আল্লাহ তা'আলা ঐ সব জাহিলদের কথাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
{أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّاكِرِينَ} [الأنعام: ৫৩]
আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত নয়? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।
আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে ভালবাসেন কেবল তাদেরকে সঠিক দীন দান করেন। অপরপক্ষে যাদের প্রতি আল্লাহর ভালবাসা ও শত্রুতা রয়েছে উভয়কে তিনি দুনিয়ার প্রাচুর্যতা দান করেন।
📄 কোন বিষয়ে দুর্বলদের অগ্রগামিতার কারণে সেটাকে বাতিল বলে প্রমাণ করা
হকু গ্রহণে দুর্বলদের অগ্রগামীতার কারণে হকুকে বাতিল বলে প্রমাণ করা। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ لَوْ كَانَ خَيْراً مَا سَبَقُونَا إِلَيْهِ} [الأحقاف: ১১]
যদি এটা ভাল হত তবে তারা আমাদের থেকে অগ্রণী হতে পারত না (সূরা আল আহক্বাফ ৪৬:১১)।
ব্যাখ্যা: জাহিলদের অভ্যাস: হক্বের ক্ষেত্রে দুর্বলদের অগ্রগামীতার কারণে হক্ব বিষয়কে বাতিল বলে প্রমাণ করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের ব্যাপারে বর্ণনা করেন, তারা বলে, { لَوْ كَانَ خَيْراً مَا سَبَقُونَا إِلَيْهِ} [الأحقاف: ١১]
'যদি এটা ভাল হত তবে তারা আমাদের থেকে অগ্রণী হতে পারত না (সূরা আহক্বাফ ৪৬:১১)।
তারা বলে, আমরা বুদ্ধিমান, দক্ষ ও চিন্তাশীল তাই আমরা সব বুঝি। কোন বিষয় মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে এসেছে জানতে পারলে আমরা তা সঠিক বলে মনে করি না, তাই প্রত্যাখ্যান করি। যদি তা হক্ব হতো তাহলে আমরাই তার চেয়ে অগ্রগামী হতাম। আর তা হক্ব নয় মনে করে তাকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। এটাই জাহিলদের জঘন্য বাতিল পন্থা।
কেননা, মানুষের মর্যাদার উপর ভিত্তি করে হক্বের অনুসরণ নির্ধারিত নয়। বরং আল্লাহ তা'আলা তার বান্দার মধ্যে থেকে যাকে হক্ব দান করে অনুগ্রহ করেন, সেটাই নির্ধারিত অনুসরণীয়। আর নাবী-রসূলগণের অনুসারীরা অধিকাংশই দুর্বল। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, {أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ} [الشعراء: ১১১]
তারা বলল, 'আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে? (সূরা শু'আরা ২৬:১১১)। তিনি আরো বলেন, {وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِيَ الرَّأْي} [هود: ২৭]
আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে (সূরা হুদ ১১:২৬)।
অর্থাৎ তাদের কোন চিন্তা-ভাবনা নেই। জাহিলরা মনে করে, তারা বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল। আর নূহ আলাইহিস সালাম যা নিয়ে এসেছেন তা যদি হক্ব হতো, তাহলে আহলে রায় ও অধিকাংশ মানুষ তার অনুসরণ করতো। তাই নূহ আলাইহিস সালাম হকু পথে ছিলেন না বলে প্রমাণ করে তারা তাকে বর্জন করে।
জাহিলদের এ পদ্ধতি বাতিল। কেননা, মানুষের মধ্যে অধিকাংশ হক্ অস্বীকারকারীরা প্রাচুর্যের অধিকারী হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَمَا أَرْسَلْنَا فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ} [سبأ: ٣٤]
অপরপক্ষে অধিকাংশ দুর্বল ও অভাবীরা হক্বের অনুসরণ করে। কেননা তারা অহংকারী নন। তাই কোন বিষয়ে প্রাচুর্যের অধিকারী ও মর্যাদাবানরা অনুসরণ করলে তা হক্ব হিসাবে প্রমাণ করা এবং দুর্বল ও অভাবীরা অনুসরণ করলে তা বাতিল প্রমাণ করা জাহিলদের মাপকাঠি। এভাবে বাতিল থেকে হকু বুঝার মাপকাঠি গ্রহণ করা বৈধ নয়। একারণে আলেমগণ বলেন, ব্যক্তির দ্বারা হক্ব চেনা য়ায় না বরং হক্বের মাধ্যমে ব্যক্তিকে চেনা যায়।