📄 যাদুকর্ম ও ভাগ্য গণনাকে অলী-আউলিয়ার কারামাত গণ্য করে তা বিশ্বাস করা
যাদুকর ও তাদের মত লোকদের প্রবঞ্চনাকে নেকলোকদের কারামাত বলে জাহিলদের বিশ্বাস করা ও যাদুকর্মকে নাবীগণের কারামাত গণ্য করা। যেমন জাহিলরা সুলাইমান আ. কে যাদুকর বলে গণ্য করে。
ব্যাখ্যা: মাখারিক )المخاريق(: হলো অলৌকিক বিষয়। আল্লাহ তা'আলা ছাড়া এর উপর কেউ ক্ষমতা রাখে না। নাবীগণ থেকে অলৌকিক বিষয় প্রকাশিত হলে তা মু'জিযা বলে গণ্য। যেমন মুসা আ. এর লাঠি সাপে পরিণত হওয়া মু'জিযা এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগ ভাল হওয়া এবং আল্লাহ তা'আলার হুকুমে মৃতকে জীবিত করা ঈসা আ. এর মু'জিযা।
আর মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে বড় মু'জিযা আল-কুরআন দেয়া হয়েছে যা গোটামানব জাতিকে বিস্মিত করে এবং কুরআনের মত অনুরূপ কিছু রচনা করতে জিন ও মানুষ অপারগতা প্রকাশ করে।
নেক, মুত্তাকী ও মু'মিন ব্যক্তির নিকট থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেলে তা কারামাত )كرامة( নামে খ্যাত। তা দীনের জন্য দলীল অথবা মুসলিমদের প্রয়োজনে সংঘটিত হয়। যেমন মুহাম্মাদ এর কাছ থেকে দীনের দলীল হিসাবে অথবা মুসলিমদের প্রয়োজনে কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। এমনিভাবে মারইয়াম আ. এর জন্য কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। মারইয়াম আলাইহিস সালাম এর কুঠুরিতে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম প্রবেশ করলে তার নিকট রিযিক (খাদ্য ফলমূল) দেখতে পান। ঐ কুঠুরিতে মারইয়াম আ. আলাদাভাবে ইবাদত করতেন, তা ছিল ইবাদাতের জায়গা। অনুরূপভাবে আসহাবে কাহাফের দীর্ঘ সময় যাবত ঘুমানো তাদের জন্য কারামাত ছিল। তারা নিজেদের অবস্থায় বহাল ছিল, মাটিতে তাদের শরীর নষ্ট হয়নি। তাদের জীবনে কোন সময়কালের (অনুভূতি) অর্জন হয়নি। এটা ওলীদের কারামাত।
অপরপক্ষে কাফিরদের হাতে অলৌকিক সাদৃশ্য যা প্রকাশ পায় তা শয়তানের কর্ম বলে গণ্য। এটাকে ভেলকিবাজি, ফন্দিবাজি ও কাল্পনিক যাদু বলে গণ্য করা হয় অথবা এটা শয়তানের কর্ম যার মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করা ও তাদের ক্ষতি সাধনের জন্য শয়তান যাদুকরদের খাদেম নির্ধারণ করে। এটা কারামাত নয়। আর যে শূন্যে ভেসে বেড়ায় অথবা পানিতে হাঁটে সে পাপাচারী। এটা শয়তানের কর্ম। কেননা যখন শিরক ও কুফরীর মাধ্যমে যাদুকররা শয়তানের নৈকট্য লাভ করে তখন শয়তানেরা তাদের খাদেম হয়ে যায়। শয়তানেরা তাদেরকে শূন্যে ভাসায় ও পানিতে হাঁটায়。
ঐ সকল পাপাচারীদের হাতে ভেলকিবাজি ও শিরক হতে যা কিছু প্রকাশ পায় তা শয়তানের কর্ম অথবা মানুষের সাথে তাদের ফন্দিবাজি ও ধোঁকা দেওয়ার কৌশল মাত্র। এগুলো এমন কর্ম যা জাহিলদের মাঝে আছে তা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। এ জন্য ইয়াহুদীরা সুলাইমান নাবীকে যাদুকর্মের সাথে সম্পৃক্ত করলে আল্লাহ তা'আলা যাদুকর্মকে কুফরী ঘোষণা করে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। নাবীগণের সাথে যাদুকর্মকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। নাবীগণের মধ্যে সুলাইমান আলাইহিস সালাম অন্যতম। তার জন্য যাদুকর্ম সমীচিন নয়।
📄 শিস্ দেয়া ও করতালির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করা
ব্যাখ্যা: যেসব বিষয়য় রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিলদের বিরোধিতা করেছেন: জাহিলরা শিষ বাজানো ও হাত-তালির মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতো অর্থাৎ তার নৈকট্য লাভ করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً} [الأنفال: ٣٥]
আর কা'বার নিকট তাদের সালাত শিষ ও হাত-তালি ছাড়া কিছু ছিল না (সূরা আনফাল ৮:৩৫)।
কাবা শরীফের নিকটে মুশরিকরা কেবল শিষ বাজিয়ে ও হাত-তালি দিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতো। শিষ দেয়া অর্থ হলো মুখে শব্দ করা। আর করতালি অর্থ দু'হাতের তালু একত্র করে শব্দ করা। জাহিলরা বাইতুল্লাহর নিকটে এ আমল করতো। এটাকে তারা জ্বালাত মনে করে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করতে চাইতো। আর যারা মানুষ ও জিনদের মধ্য থেকে শয়তান, তারা এ কর্মকে সৌন্দর্যময় করে তুলতো। কেননা আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত (توقيفية) নিয়ম ছাড়া ইবাদত হয় না।
মানুষ নিজ থেকে কোন বিধান আবিষ্কার করতে পারে না অথবা অন্য কিছুর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাত পেতে চাওয়া যা তিনি বিধিবদ্ধ করেননি তা আল্লাহর ইবাদত বলে গণ্য করতে পারে না অথচ শরীয়তে এর কোন মৌলিকত্ব নেই। একারণে শিষ দেয়া ও তালি বাজানো এ দু'টি নিষিদ্ধ অভ্যাসকে ইসলামে হারাম গণ্য করা হয়, যদিও এ দু'টির মাধ্যমে ইবাদত করা মানুষের উদ্দেশ্য থাকে না। কেননা তাতে মুশরিকদের আত্মতৃপ্তিই আছে বটে। আর নাবী সা. বিশেষত মহিলাদের জন্য প্রয়োজনে তালি বাজানোকে বৈধ করেছেন। যেমন ইমাম জ্বলাতে ভুল করলে তাকে সতর্ক করার জন্য মহিলাদের তালি বাজানো বৈধ। উপস্থিত পুরুষ মুক্তাদিদের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য মহিলাদের জন্য এ পদ্ধতি নির্ধারিত। আর তালি বাজানোর ক্ষেত্রে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বৈধ নয়。
টিকাঃ
২৮. আবূ হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «التَّسْبِيحُ لِلرِّجَالِ، وَالتَّصْفِيقُ لِلنِّسَاءِ» পুরুষদের জন্য তাসবিহ-সুবহানাল্লাহ ও মহিলাদের জন্য তাছুফিক-হাত তালি দেয়া। ছহীহ বুখারী হা/১২০৩, ছহীহ মুসলিম হা/৪২২।
📄 দ্বীনকে খেল-তামাশা হিসাবে গ্রহণ করা
দীনকে খেল-তামাশা হিসাবে গ্রহণ করেছে。
ব্যাখ্যা: প্রমোদ )اللهو( হলো প্রত্যেক এমন বাতিল বিষয় যা হক্ব থেকে মানুষকে বিরত রাখে। আর তামাশা )للعب।) হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিপরীত যাতে কোন উপকারীতা নেই। সুতরাং খেল-তামাশাকে দীন হিসাবে গ্রহণ করে তার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা জাহিলী দীন। সূফীদের মাঝেও এটা বিদ্যমান আছে। দ্বফ বা তবলা বাজানো ও গান করাকে সূফীরা আল্লাহর ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করেছে। এসবের মাধ্যমে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চায়। আর গান ও বাদ্যযন্ত্র খেল-তামাশা যা নির্দিষ্ট সীমা রেখা ছাড়া হারাম। তাহলে কিভাবে এটাকে আল্লাহর ইবাদত হিসাবে গ্রহণ করা হয়? বর্তমানে সূফীরা সঙ্গীতকে ইসলামী গানের সাথে তুলনা করে তা গ্রহণ করে। তারা এটাকে আল্লাহর দিকে দাওয়াতের মাধ্যম নির্ধারণ করেছে। যেমন তারা বলে, এভাবে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া দীনের মধ্যে গণ্য। (তাদের ধারণা) এটা গান, গুঞ্জন ও শব্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না যা দ্বারা আত্মা মজা পায়।
মানুষ আল্লাহর স্বরণ ও কুরআন তেলাওয়াত ছেড়ে দিয়ে তাতে ব্যস্ত থাকে। এটা দলীয় পদ্ধতির নিদর্শন মাত্র যা দাওয়াতের মাধ্যম নয়। কেননা দা'ওয়াত দেয়ার বিধান নির্ধারিত। আর নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিতাব ও সুন্নাহর মাধ্যমে মানুষকে দা'ওয়াত দিতেন, উপদেশ দিতেন ও সঠিক পথ দেখাতেন। তিনি উত্তম পন্থায় মানুষের সাথে তর্ক করতেন। কোন দলের সঙ্গীতকে তিনি দা'ওয়াতের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেননি।
মুশরিকদের প্রতিহত করা ও ইসলামকে রক্ষা করার জন্য উত্তম কবিতা রচনা করা হতো, যা দোষনীয় নয়। যেমন হাসান ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর রচিত কবিতা দোষমুক্ত ছিল অথবা ভাল আমলের প্রতি উৎসাহিত করা এবং সফরে বের হওয়ার জন্য কবিতা রচনা করা হত, যা বর্তমানে ব্যবহৃত দলীয় সঙ্গীতের মত ছিল না। তাই কবিতার সাথে সঙ্গীতকে তুলনা করা যাবে না। কেননা দু'টির মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান।
📄 দুনিয়ার মাধ্যমে ধোঁকায় পড়া
পার্থিব জীবন জাহিলদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারা ধারণা করে যে, পার্থিব চাকচিক্যতা আল্লাহর দান যা তার সন্তুষ্টি প্রমাণিত হয়। যেমন জাহিলরা বলে, আল্লাহর বাণী:
{نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالاً وَأَوْلاداً وَمَا نَحْنُ بِمُعَذِّبِينَ} [سبأ: ٣٥]
আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অধিক সমৃদ্ধশালী। আর তাই আমরা শান্তি প্রাপ্ত হবো না (সূরা সাবা ৩৪:৩৫)।
ব্যাখ্যা: জাহিলরা তাদের সন্তান-সন্ততি ও ধন-সম্পদকে নিজেদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান মনে করতো। তাদের ধারণা, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে শাস্তি দিবেন না। আল্লাহর বাণী:
{ وَقَالُوا نَحْنُ أَكْثَرُ أَمْوَالاً وَأَوْلاداً وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ وَمَا أَمْوَالُكُمْ وَلا أَوْلادُكُمْ بِالَّتِي تُقَرِّبُكُمْ عِنْدَنَا زُلْفَى} [سبأ: [٣٥,৩৭
আমরা ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অধিক সমৃদ্ধশালী। আর তাই আমরা শান্তি প্রাপ্ত হবো না বল, 'আমার রব যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন অথবা সঙ্কুচিত করেন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।' আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি এমন বস্তু নয় যা তোমাদেরকে আমার নিকটবর্তী করে (সূরা সাবা ৩৪:৩৫-৩৭)।
{ قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ} [سبأ : ৩৯]
বল, 'নিশ্চয় আমার রব তার বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিযিকদাতা' (সূরা সাবা ৩৪:৩৯)।
বেশি ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও প্রাচুর্য বান্দার জন্য আল্লাহর ভালবাসার দলীল নয়। বরং তিনি কাফিরকে ধীরে ধীরে পাঁকড়াও করার জন্য তাদেরকে পার্থিব ধন-সম্পদ দিয়ে থাকেন। হাদীছে বর্ণিত:
"إن الله يعطي الدنيا من يحب ومن لا يحب، وأما الدين فلا يعطيه إلا من يحب"
আল্লাহ তা'আলা যাকে ভালবাসেন অথবা অপছন্দ করেন উভয়কে তিনি পার্থিব প্রাচুর্যতা দান করে থাকেন। আর আল্লাহ তা'আলা যাকে ভালবাসেন তাকে দীনের জ্ঞান দান করেন। অন্য হাদীছে এসেছে:
"لو كانت الدنيا تعدل عند الله جناح بعوضة ما سقى منها كافراً شربة ماء"
আল্লাহ তা'আলার নিকট যদি মশার পাখা পরিমাণ দুনিয়ার মূল্য থাকতো, তাহলে কোন কাফিরকে তিনি একফোটা পানিও পান করতে দিতেন না।
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অভাবী ছিলেন। অনুরূপভাবে তার ছাহাবীগণেরও অভাব-অনটন ছিল। অথচ নাবীগণের পরে তারা সৃষ্টির মাঝে উত্তম মানুষ। আর কাফিররা অবাধে বিচরণ করে এবং নাবীগণের পরে তারা আল্লাহ তা'আলার নেআ'মত পেয়ে উল্লসিত হয়। কাফিরদেরকে ধীরে ধীরে পাঁকড়াও করা হবে একারণে তারা আল্লাহর নেআ'মত পেয়ে উল্লসিত হয় ও অবাধে চলাফেরা করে। তাই দুনিয়ার চাকচিক্য আল্লাহর নিকট দুনিয়াবাসীর সম্মান প্রমাণ করে না বরং আমলকারী ধনী হোক বা গরিব হোক সৎ আমলের মাধ্যমেই আল্লাহর নিকট বান্দার সম্মান প্রমাণিত হয়।
দুনিয়াপ্রেমিক, সম্পদশালী ও প্রাচুর্যের অধিকারীরাই আল্লাহ তা'আলার নিকট সম্মানিত বলে মানুষ ধারণা করে, আর বলে অভাব-অনটনে নিপতিত লোকজন আল্লাহর নিকট লাঞ্ছিত, তাদের এ ধারণা ভুল。
টিকাঃ
২৯. জ্বহীহ: মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাক হাকীম।
৩০. জ্বহীহ: তিরমিযী ২৩২৫।