📄 নাবী-রসূলগণের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তাদের দিকে নিজেদেরকে সম্পর্কিত করা
নাবীগণের সাথে সম্পৃক্ততার ব্যাপারে বিরোধিতা করা। জাহিলরা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর আনুগত্য ত্যাগ করে প্রকাশ্যে তার বিরোধিতায় লিপ্ত হয়。
ব্যাখ্যা: পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়ে সম্পৃক্ত করা: ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এমন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত করা যা তার (আদর্শ) বিরোধী। এ ধরণের সম্পৃক্ততা বাতিল ও মিথ্যা। পক্ষান্তরে তার আদর্শ বিরোধী নয় এমন বিষয়ের সাথে তাকে সম্পৃক্ত করাই (الانتساب الصحيح) আল-ইনতেসাবুস ছহীহ (সঠিক সম্পৃক্ততা) হিসাবে গণ্য। আল্লাহর একত্বতা, তার ইবাদতের একনিষ্ঠতা ও মুশরিকদের থেকে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর মুক্ত থাকার বিষয়ে তিনি যে আদর্শ নিয়ে এসেছেন তার সাথে তাকে সম্পৃক্ত করা যুক্তিযুক্ত, যা তার বিরোধী নয়। ইয়াহুদীদের হজ্জ পালন থেকে বিরত থাকা এবং কাবাকে কেবলা মেনে না নেয়া সত্ত্বেও তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর সাথে (নিজেদেরকে) সম্পৃক্ত করে। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكاً وَهُدىً لِلْعَالَمِينَ فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِناً وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ} [آل عمران: ٩٦,٩٧]
নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হেদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী (সূরা আলে-ইমরান ৩:৯৬,৯৭)
অনুরূপভাবে, যারা চার ইমামের আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত, তারা জাহমিয়াহ, মু'তাযিলা ও আশআ'রিয়াদের আক্বীদা গ্রহণ করা ছাড়াই ইমামদের আক্বীদা গ্রহণ করা তাদের জন্য ওয়াজীব হবে。
📄 নেককারদের সাথে সম্পর্ককারীদের কর্মকাণ্ড দ্বারা নেককারদের দোষারোপ করা
নেক লোকদের সাথে সম্পৃক্ত কতিপয়ের কর্মের মাধ্যমে কতেক নেক লোকদের নিন্দাচর্চা করা। যেমন ইয়াহুদীরা ঈসা আলাইহিস সালাম এর ব্যাপারে মন্দ কথা বলে এবং ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে নিন্দা জ্ঞাপন করে。
ব্যাখ্যা: নেক লোকদের সাথে সম্পৃক্ততার দাবিদার কতিপয়ের খারাপ কর্মের মাধ্যমে নেকলোকদের দোষ বর্ণনা করা। আর অনুসারীদের মন্দ কর্মের সাথে নেক লোকদের সম্পৃক্ত করা, যা থেকে তারা মুক্ত।
যেমন ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ইয়াহুদীদের মন্দ কথা বলা যা ধর্মযোদ্ধা অনুসারীদের বিকৃত করে। তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলা তিন উপাস্যের একজন অথবা মাসীহই আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ)।
অনুরূপভাবে কতিপয় কবর পূজারী, জাহমিয়াহ, মু'তাযিলা ও খারেজীরা তাদের কর্মের দ্বারা তার দীনের দিকে সম্পৃক্ত করে মুহাম্মাদ সম্পর্কে মন্দ কথা বলে।
তাই আমরা বলবো নাবীগণের ব্যাপারে যারা মন্দ কথা বলে, তারা মূসা, ঈসা আলাইহিমাস সালাম ও মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন দীনেরই অন্তর্ভুক্ত নয়। আর অনুসারীদের বিমুখ হওয়ার কারণে তাদেরকে মূল দীনের প্রতি সম্পৃক্ত করা যায় না। দীনের মূল থেকে যারা বেরিয়ে যায় কেবল তাদের দিকেই তাদেরকে সম্পৃক্ত করা যায়।
মূসা আ. এর রিসালাতের নিন্দা করা যাবে না। কেননা ইয়াহুদীরা তাদের দীনকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বিকৃত করেছে। আর খ্রিষ্টানদের শিরক, ধর্মযুদ্ধ ও নিকৃষ্ট কুফরীর কারণে তাদেরকেও ঈসা আ. এর দীনের দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। আর কবর পূজারীরা যেসব কর্মকান্ড করে নিজেদেরকে ইসলামপন্থী মনে করে ঐ কারণে মুহাম্মাদ এর দীনের দিকে তাদেরকেও সম্পৃক্ত করা যাবে না। আর রাফেযী নাস্তিক ও বাতিনপন্থীরা ইসলামের নাম ব্যবহার করলেও মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দীনের দিকে তাদেরকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। যারা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করে ও তার প্রতি ঈমান আনে কেবল তাদেরকেই মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দীনের দিকে তাদেরকে সম্পৃক্ত করা যাবে। আর যারা নেকলোকদের অনুসরণ ও অনুকরণ করে তারা নেকলোকদের সাথে সম্পৃক্ত হবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار والذين اتبعوهم بإحسان رضي الله عنهم ورضو} ..عنه
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী ও প্রথম এবং যারা, তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে (সূরা আত-তাওবা ৯:১০০)। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَذَا النَّبِيُّ} [آل عمران: ٦৮]
নিশ্চয় মানুষের মধ্যে ইব্রাহীমের সবচেয়ে নিকটবর্তী তারা, যারা তার অনুসরণ করেছে, আর এই নাবী ও মুমিনগণ (সূরা আলে-ইমরান ৩:৬৮)।
অনুরূপভাবে চার মাযহাবে সম্পৃক্ত অনুসারীদের সঠিক আক্বীদা থেকে বিচ্যুত হওয়া ও দলীল বিরোধিতার কারণে তাদেরকেও চার ইমামের দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না।
📄 যাদুকর্ম ও ভাগ্য গণনাকে অলী-আউলিয়ার কারামাত গণ্য করে তা বিশ্বাস করা
যাদুকর ও তাদের মত লোকদের প্রবঞ্চনাকে নেকলোকদের কারামাত বলে জাহিলদের বিশ্বাস করা ও যাদুকর্মকে নাবীগণের কারামাত গণ্য করা। যেমন জাহিলরা সুলাইমান আ. কে যাদুকর বলে গণ্য করে。
ব্যাখ্যা: মাখারিক )المخاريق(: হলো অলৌকিক বিষয়। আল্লাহ তা'আলা ছাড়া এর উপর কেউ ক্ষমতা রাখে না। নাবীগণ থেকে অলৌকিক বিষয় প্রকাশিত হলে তা মু'জিযা বলে গণ্য। যেমন মুসা আ. এর লাঠি সাপে পরিণত হওয়া মু'জিযা এবং জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগ ভাল হওয়া এবং আল্লাহ তা'আলার হুকুমে মৃতকে জীবিত করা ঈসা আ. এর মু'জিযা।
আর মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে বড় মু'জিযা আল-কুরআন দেয়া হয়েছে যা গোটামানব জাতিকে বিস্মিত করে এবং কুরআনের মত অনুরূপ কিছু রচনা করতে জিন ও মানুষ অপারগতা প্রকাশ করে।
নেক, মুত্তাকী ও মু'মিন ব্যক্তির নিকট থেকে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেলে তা কারামাত )كرامة( নামে খ্যাত। তা দীনের জন্য দলীল অথবা মুসলিমদের প্রয়োজনে সংঘটিত হয়। যেমন মুহাম্মাদ এর কাছ থেকে দীনের দলীল হিসাবে অথবা মুসলিমদের প্রয়োজনে কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। এমনিভাবে মারইয়াম আ. এর জন্য কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। মারইয়াম আলাইহিস সালাম এর কুঠুরিতে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম প্রবেশ করলে তার নিকট রিযিক (খাদ্য ফলমূল) দেখতে পান। ঐ কুঠুরিতে মারইয়াম আ. আলাদাভাবে ইবাদত করতেন, তা ছিল ইবাদাতের জায়গা। অনুরূপভাবে আসহাবে কাহাফের দীর্ঘ সময় যাবত ঘুমানো তাদের জন্য কারামাত ছিল। তারা নিজেদের অবস্থায় বহাল ছিল, মাটিতে তাদের শরীর নষ্ট হয়নি। তাদের জীবনে কোন সময়কালের (অনুভূতি) অর্জন হয়নি। এটা ওলীদের কারামাত।
অপরপক্ষে কাফিরদের হাতে অলৌকিক সাদৃশ্য যা প্রকাশ পায় তা শয়তানের কর্ম বলে গণ্য। এটাকে ভেলকিবাজি, ফন্দিবাজি ও কাল্পনিক যাদু বলে গণ্য করা হয় অথবা এটা শয়তানের কর্ম যার মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করা ও তাদের ক্ষতি সাধনের জন্য শয়তান যাদুকরদের খাদেম নির্ধারণ করে। এটা কারামাত নয়। আর যে শূন্যে ভেসে বেড়ায় অথবা পানিতে হাঁটে সে পাপাচারী। এটা শয়তানের কর্ম। কেননা যখন শিরক ও কুফরীর মাধ্যমে যাদুকররা শয়তানের নৈকট্য লাভ করে তখন শয়তানেরা তাদের খাদেম হয়ে যায়। শয়তানেরা তাদেরকে শূন্যে ভাসায় ও পানিতে হাঁটায়。
ঐ সকল পাপাচারীদের হাতে ভেলকিবাজি ও শিরক হতে যা কিছু প্রকাশ পায় তা শয়তানের কর্ম অথবা মানুষের সাথে তাদের ফন্দিবাজি ও ধোঁকা দেওয়ার কৌশল মাত্র। এগুলো এমন কর্ম যা জাহিলদের মাঝে আছে তা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। এ জন্য ইয়াহুদীরা সুলাইমান নাবীকে যাদুকর্মের সাথে সম্পৃক্ত করলে আল্লাহ তা'আলা যাদুকর্মকে কুফরী ঘোষণা করে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেন। নাবীগণের সাথে যাদুকর্মকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। নাবীগণের মধ্যে সুলাইমান আলাইহিস সালাম অন্যতম। তার জন্য যাদুকর্ম সমীচিন নয়।
📄 শিস্ দেয়া ও করতালির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করা
ব্যাখ্যা: যেসব বিষয়য় রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিলদের বিরোধিতা করেছেন: জাহিলরা শিষ বাজানো ও হাত-তালির মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতো অর্থাৎ তার নৈকট্য লাভ করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ إِلَّا مُكَاءً وَتَصْدِيَةً} [الأنفال: ٣٥]
আর কা'বার নিকট তাদের সালাত শিষ ও হাত-তালি ছাড়া কিছু ছিল না (সূরা আনফাল ৮:৩৫)।
কাবা শরীফের নিকটে মুশরিকরা কেবল শিষ বাজিয়ে ও হাত-তালি দিয়ে আল্লাহ তা'আলার ইবাদত করতো। শিষ দেয়া অর্থ হলো মুখে শব্দ করা। আর করতালি অর্থ দু'হাতের তালু একত্র করে শব্দ করা। জাহিলরা বাইতুল্লাহর নিকটে এ আমল করতো। এটাকে তারা জ্বালাত মনে করে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য লাভ করতে চাইতো। আর যারা মানুষ ও জিনদের মধ্য থেকে শয়তান, তারা এ কর্মকে সৌন্দর্যময় করে তুলতো। কেননা আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত (توقيفية) নিয়ম ছাড়া ইবাদত হয় না।
মানুষ নিজ থেকে কোন বিধান আবিষ্কার করতে পারে না অথবা অন্য কিছুর দ্বারা আল্লাহ তা'আলার সাক্ষাত পেতে চাওয়া যা তিনি বিধিবদ্ধ করেননি তা আল্লাহর ইবাদত বলে গণ্য করতে পারে না অথচ শরীয়তে এর কোন মৌলিকত্ব নেই। একারণে শিষ দেয়া ও তালি বাজানো এ দু'টি নিষিদ্ধ অভ্যাসকে ইসলামে হারাম গণ্য করা হয়, যদিও এ দু'টির মাধ্যমে ইবাদত করা মানুষের উদ্দেশ্য থাকে না। কেননা তাতে মুশরিকদের আত্মতৃপ্তিই আছে বটে। আর নাবী সা. বিশেষত মহিলাদের জন্য প্রয়োজনে তালি বাজানোকে বৈধ করেছেন। যেমন ইমাম জ্বলাতে ভুল করলে তাকে সতর্ক করার জন্য মহিলাদের তালি বাজানো বৈধ। উপস্থিত পুরুষ মুক্তাদিদের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য মহিলাদের জন্য এ পদ্ধতি নির্ধারিত। আর তালি বাজানোর ক্ষেত্রে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বৈধ নয়。
টিকাঃ
২৮. আবূ হুরাইরা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, «التَّسْبِيحُ لِلرِّجَالِ، وَالتَّصْفِيقُ لِلنِّسَاءِ» পুরুষদের জন্য তাসবিহ-সুবহানাল্লাহ ও মহিলাদের জন্য তাছুফিক-হাত তালি দেয়া। ছহীহ বুখারী হা/১২০৩, ছহীহ মুসলিম হা/৪২২।