📄 বিদ্বান ও নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
আলিম ও নেকলোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা জাহিলিয়্যাত। আল্লাহর বাণী: {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ} [النساء: ١٧١] হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া বলো না (সূরা আন নিসা ৪:১৭১)।
ব্যাখ্যা: এটি একটি মারাত্মক বিষয়। (الغلو) এর আভিধানিক অর্থ: সীমা অতিক্রম করা (الزيادة عن الحد) । যেমন উদাহরণ স্বরূপ: যখন হাড়িতে পানিপূর্ণ হয়ে উথলিয়ে যায় তখন বলা হয় (غلا القدر) হাড়ি উথলিয়ে গেছে। (غلا السعر) অর্থাৎ ভালো কাজের সীমা অতিক্রম করা। সুতরাং বাড়াবাড়ি (الغلو) হচ্ছে কোন জিনিসের الزيادة والارتفاع عن الحد المعروف । অতিরিক্ততা ও ভাল বিষয়েরও সীমা অতিক্রম করা।
শরীয়তের পরিভাষায় তা হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে তার যথোপযুক্ত অবস্থান থেকে উপরের অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। যেমন নাবীগণ অথবা নেকলোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা, তাদের ক্ষমতাকে রব অথবা উপাস্যের পর্যায়ে তুলে ধরা। জাহিলরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে বাড়াবাড়ি মূলক ক্ষমতাবান মনে করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার সাথে রব হিসাবে গ্রহণ করে। যেমন ইয়াহুদীরা উযাইর আলাইহিস সালাম এর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করে তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছে। আর মানুষের মধ্যে থেকে মারইয়ামের পুত্র ও তার রিসালাতের ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহর পুত্র হিসাবে রবের পর্যায়ে নির্ধারণ করেছে। অনুরূপভাবে নূহ আলাইহিস সালামএর জাতি নেক লোকদের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা নেক লোকদের মূর্তি তৈরি করার পর আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে রবের মর্যাদা স্বরূপ তাদের ইবাদত করতো।
{ وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهِتَكُمْ وَلا تَذَرُنَّ وَدَا وَلا سُوَاعاً وَلا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْراً} [نوح: ٢٣]
আর তারা বলে, 'তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগূছ, ইয়া'উক ও নাসরকে' (সূরা নূহ ৭১:২৩)।
অর্থাৎ তাদেরকে তারা উপাস্য নির্ধারণ করতো। অনুরূপভাবে নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতি ছাড়াও বর্তমানে মুশরিকদের বিভিন্ন সম্প্রদায় নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে। আর তারা নেক লোকদের কবর তাওয়াফ করে তাদের জন্য পশু উৎসর্গ করে, মানত করে, মৃতদের নিকট সাহায্য কামনা করে, সাহায্যের আবেদন তুলে ধরে ও তাদের নিকট অভাব অভিযোগের জন্য সমাধান তালাশ করে। তাই যারা ধৃষ্টতা দেখায় তারা এরূপ শিরকের দিকে ধাবিত হয়।
এ জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لا تُطروني كما أطرت النصارى ابن مريم والإطراء هو الغلو في المدح "إنما أنالا عبد، فقولوا: عبد الله ورسوله
তোমরা আমার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করিও না যেমন খ্রিষ্টানরা মারইয়ামের পুত্রকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আর এখানে ধৃষ্টতা বলতে প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা। আমি কেবল বান্দা নই বরং তোমরা বলো আল্লাহর বান্দা ও রসূল।
নাবী ও নেকলোকদের বাড়াবাড়ি কিতাবধারী ও উম্মি (নিরক্ষর) লোকদেরকে শিরকে আকবারে (বড় শিরকে) লিপ্ত করে। মানুষদের জানা আবশ্যক নাবী ও নেকলোকদের ক্ষমতা কতটুকুন। তাহলে রসূলগণের রিসালাত সম্পর্কে জানা যাবে, নেকলোকদের সঠিক পন্থা ও আলেমদের ইলম সম্পর্কেও জানা যাবে যে তারা অন্যদের থেকে উত্তম। তারকারাজীর উপর চন্দ্রের যেমন মর্যাদা আবেদের উপর আলেমের মর্যাদা তেমনই। ফলে মানুষ তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দিবে, তাদের মর্যাদার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ} [النساء: [۱۷۱
হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রসূল এবং তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি ও তাঁর পক্ষ হতে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বল না, তিন (সূরা আন নিসা ৪:১৭১)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيراً وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ} [المائدة: ٧٧]
বল, হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৭)। নাবী দ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إياكم والغلو في الدين، فإنما أهلك من كان قبلكم الغلو في الدين তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকো। কেননা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির কারণে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তাই সৃষ্টির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বৈধ নয়। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে অবস্থানে রেখেছেন তার উপর অতিরঞ্জন করাও বৈধ নয়। কেননা এটা আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরকের দিকে ধাবিত করে। অনুরূপভাবে আলেম এবং আবেদের ব্যাপারেও ধৃষ্টতা বৈধ নয়। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ} [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)।
তাদের আলেম ও ইবাদতকারীদের নিয়ে তারা বাড়াবাড়ি করে। আর হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ব্যাপারে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদেরকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে। আর পবিত্র শরী'আত বিকৃত করে।
টিকাঃ
২৬. জ্বহীহ বুখারী হা/৩৪৪৫।
২৭. ছহীহ: নাসাঈ ৩০৫৭, ইবনে মাজাহ ৩০২৯, মুসনাদে আহমাদ ৪৩৭, ছহীহ জা ে২৬৮০।
📄 হক্ অস্বীকার করা এবং বাতিল সাব্যস্ত করা
পূর্বে যা আলোচনা হয়েছে তা নেতিবাচক ও ইতিবাচক নিয়মের উপর নির্ভরশীল। জাহিলরা কু-প্রবৃত্তি ও ধারণার অনুসরণ করে। রসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়。
ব্যাখ্যা: জাহিলদের সম্পর্কে শাইখ রহিমাহুল্লাহ যে সব বিষয় পূর্বে আলোচনা করেছেন, তা ইতিবাচক ও নেতিবাচকতার ভিত্তিতে হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যা নিষেধ করেন জাহিলরা তা সঠিক সাব্যস্ত করে এবং তিনি যা সঠিক সাব্যস্ত করেন তারা সেটাকে নিষিদ্ধ মনে করে। এ কারণে তারা ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।
আল্লাহ তা'আলা শিরককে নিষিদ্ধ করেছেন, তাওহীদকে সাব্যস্ত করেছেন, একত্বের নির্দেশ দিয়েছেন অথচ জাহিলরা এর বিরোধিতা করে। জাহিলরা শিরক সাব্যস্ত করে ও তাওহীদকে নাকোচ করে। আবার (لَا إِلٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবুদ নেই এ কালেমার পূর্ণ অর্থেরও বিরোধিতা করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَالَّذِينَ آمَنُوا بِالْبَاطِلِ وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} [العنكبوت: ٥٢]
আর যারা বাতিলে বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্থ (সূরা আনকাবূত ২৯:৫৩)।
বাতিলকে বিশ্বাস করা নেতিবাচক দিক। অথচ বাতিলকে অস্বীকার করার বদলে এর প্রতি বিশ্বাস রেখে তারা তা সঠিক সাব্যস্ত করে। আর আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা ইতিবাচক দিক। অথচ তারা আল্লাহকে অস্বীকার করে। তারা বাতিলকে বিশ্বাসের কারণে আল্লাহর একত্বকে নাকোচ করে। আর নেতিবাচক তথা বাতিলকে তারা সাব্যস্ত করে ও ইতিবাচক তথা একত্বকে নাকোচ করে সর্বোপরি আল্লাহকে অস্বীকার করে।
এটাই জাহিলী রীতি যার উপর তারা পরিচালিত হয় ও ভ্রষ্টতায় ডুবে থাকে। তাদের অবস্থাদি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারা কখনো জাহিলী রীতি থেকে বের হবে না।
যে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে সে মূলতঃ আল্লাহ যা সাব্যস্ত করেন তা অস্বীকার করে। আর আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেন সে তা সাব্যস্ত করে। আর যে হারামকে হালাল ও হালালকে হারামে পরিনত করে, সে এ শ্রেণীর জাহিলদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা যা হালাল করেন যে তা নাকোচ করে ও হারামকে সাব্যস্ত করে সে জাহিলী রীতিরই অনুসারী বলে গণ্য। কোন জাহিলী কর্মকান্ড থেকে সে মুক্ত হতে পারে না। আর যে আল্লাহর একত্ববাদীদের বিরুদ্ধে শত্রুতা রাখে ও মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব করে, সে আল্লাহ তা'আলার সাব্যস্তকৃত বিষয়কে নাকোচ করে ও আল্লাহ তা'আলা যা নাকোচ করেছেন তা সাব্যস্ত করে। কেননা আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের সাথে বন্ধুত্বের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ করেছেন।
📄 মিথ্যা অজুহাত পেশ করে হক্ গ্রহণ না করা
আল্লাহ তা'আলা যা দিয়েছেন তা না বুঝেই তার অনুসরণ থেকে বিরত থাকার অজুহাত পেশ করা। আল্লাহর বাণী: {وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ } [ البقرة: ৮৮ ] ، {يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيراً مِمَّا تَقُولُ} [هود: ৯১] ،
আর তারা বলল, আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত (সূরা বাক্বারাহ ২:৮৮)। তারা বলল, হে শু'আইব, তুমি যা বল, তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না (সূরা হুদ ১১:৯১)।
আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের কুফরীর কারণেই তারা বিমুখ হয়েছে。
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ তারা হকু না বুঝার কারণে তা কবুল করতে অজুহাত পেশ করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে উল্লেখ করেন, যখন তাদেরকে রসূল ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন তখন তারা বলেছিল, {قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلاً مَا يُؤْمِنُونَ} [البقرة: ৮৮] ،
আর তারা বলল, আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত। বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন। অতঃপর তারা খুব কমই ঈমান আনে (সূরা বাক্বারাহ ২:৮৮)।
)غُلْفٌ( অর্থাৎ অন্তরে আবরণ রয়েছে, তাতে রসূলের কথা পৌঁছবে না এবং তার কথায় তাদের অন্তর শান্তিও পাবে না। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে এ অজুহাতকে দলীল হিসাবে তারা গ্রহণ করেছে। এটিই আয়াতের প্রসিদ্ধ অর্থ।
আর দ্বিতীয় অর্থ হলো )وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ( অর্থাৎ অন্তর জ্ঞানে পূর্ণ তাই কারো কথার প্রয়োজন নেই। তাদের ধারণায় রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যে, তারা যা বলে তা নিষ্প্রয়োজন। বরং প্রয়োজনীয়তা হলো আল্লাহ তা'আলা তাদের কুফরীর কারণে তাদেরকে ভর্ৎসনা করেন। অর্থাৎ কুফরীর কারণে তাদেরকে তার রহমত থেকে বিতাড়িত করে দূরে সরিয়ে দেন। কুফরীর কারণে তারা হক্ব গ্রহণ করতে পারে না। এখানে '' পদটি সাবাব তথা 'কারণ' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা তারা বুঝবে না কেননা তাকে তারা ভ্রূক্ষেপ করে না এবং তার কথায় মনোনিবেশও করে না। বিমুখতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য শান্তি নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ} [الصف: ٥]
অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়গুলোকে বক্র করে দিলেন। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না (সূরা জ্বাফ ৬১:৫)।
তাই যে হক্ব গ্রহণ করবে না আল্লাহ তা'আলা তাকে বাতিলে নিমজ্জিত করে পরীক্ষা করেন। এরপর অন্তর বিকৃত হওয়ার কারণে সে আর হক্ব গ্রহণ করে না। আমরা এ থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلاً مَا يُؤْمِنُونَ} [البقرة: ٨٨]
বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন। অতঃপর তারা খুব কমই ঈমান আনে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮৮)।
{فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيراً وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ} [النساء: ١٦٠، ١٦١]
সুতরাং ইয়াহুদীদের যুলমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে। আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ খাওয়ার কারণে (সূরা আন নিসা ৪:১৬০, ১৬১)।
ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অন্তর বিমুখতার কথা এসেছে। তাদের কথা )قُلُوبُنَا غُلْفٌ( অর্থাৎ আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত, কথাটি শুদ্ধ নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলাই তাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ অন্তরকে পরিবর্তন করেন। আর অন্তরের মৌলিকত্ব হলো তা পরিবর্তনের স্বভাব বজায় থাকা। স্বভাব অনুযায়ী তা হক্ব গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। আর ফিতরাত (স্বভাব) বিকৃত হলে অন্তর হকু গ্রহণ করে না। অন্তর যেন জমিনের মতই, জমিন অকেজো হলে তা বিলে পরিণত হয়। তাতে ফসল উৎপন্ন হয় না। অনুরূপ অন্তরও অকেজো হলে তা হক্ব গ্রহণ করে না।
অনুরূপভাবে শুয়াইব আ. এর জাতিও বিকৃত। শুয়াইব আ. নাবীগণের মধ্যে বাগ্মীতায় পারদর্শি ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। তার স্পষ্টভাষণ ও অলংকারপূর্ণ বক্তব্যে ও প্রভাবসম্পন্ন কথার জন্য তাকে নাবীগণের খতিব উপাধি দেয়া হয়। এ সত্ত্বেও তার জাতি বলতো, আল্লাহর বাণী:
{قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيراً مِمَّا تَقُولُ وَإِنَّا لَنَرَاكَ فِينَا ضَعِيفاً وَلَوْلا رَهْطُكَ لَرَجَمْنَاكَ وَمَا أَنْتَ عَلَيْنَا بِعَزِيزِ } [هود: ٩١]
তারা বলল, হে শু'আইব, তুমি যা বল, তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না। আর তোমাকে তো আমরা আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখতে পাচ্ছি। যদি তোমার আত্মীয়- স্বজন না থাকত, তবে আমরা তোমাকে অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করতাম। আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও (সূরা হূদ ১১:৯১)।
তারা শুয়াইব আলাইহিস সালাম এর কথা বুঝতো না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বনী ইসরাঈলের মত তাদের অন্তর মহরাঙ্কিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলার রীতি হলো যারা হক্ব থেকে অহংকার বশতঃ মুখ ফিরিয়ে নিবে, হক্ব পৌঁছার পরও তা গ্রহণ করবে না, আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর বিকৃত করার মাধ্যমে শান্তি স্বরূপ তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলবেন।
অনুরূপভাবে কুরাইশ কাফিররা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কি বলেছিল?
{ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ} [فصلت: ٥]
আর তারা বলে, তুমি আমাদেরকে যার প্রতি আহ্বান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত, আমাদের কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মাঝে রয়েছে অন্তরায়, অতএব তুমি তোমার কাজ কর, নিশ্চয় আমরা (আমাদের) কাজ করব (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৫)।
কাফিরদের পন্থা একই। রসূলগণের কথা না বুঝার কারণে তারা তাদের দাওয়াতের বিরোধিতা করে। এটা কি রসূলগণের দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যর্থতা? না বরং কাফিরদের কুফরীর প্রবণতা, হক্ব থেকে বিমুখতা, হক্বের প্রতি মনোনিবেশ না করা ও কল্যাণ মূলক কাজে আগ্রহ না থাকারই ব্যর্থতা।
📄 ইয়াহুদী কর্তৃক তাওরাতের পরিবর্তে যাদর পুস্তক গ্রহণ করা
আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদেরকে যে কিতাব দিয়েছেন তা থেকে তারা যাদু পুস্তক রচনার মাধ্যমে বিনিময় গ্রহণ করে। আল্লাহ তা'আলা তা'আলা তা উল্লেখ করে বলেন,
{وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ}
আর যখন তাদের নিকট আল্লাহর কাছ থেকে একজন রসূল এল, তাদের সাথে যা আছে তা সমর্থন করে, আহলে কিতাবের একটি দল আল্লাহর কিতাবকে তাদের পেছনে ফেলে দেয়, (এভাবে যে) মনে হয় যেন তারা জানে না। আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেননি। বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১০১,১০২)।
ব্যাখ্যা: তাওরাতে মুহাম্মাদ এর গুণাবলী বর্ণিত আছে এবং তাকে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ইয়াহুদীরা তা অস্বীকার করতো।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْأَنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ} [الأعراف: ١٥٧]
যারা অনুসরণ করে রসূলের যে উম্মী নাবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল যা তাদের উপরে ছিল অপসারণ করে (সূরা আল আরাফ ৭:১৫৭)।
এমনিভাবে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ইনজিলে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقاً لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّراً بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ} [الصف: ٦]
'হে বনী ইসরাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রসূল। আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং একজন রসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ'। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, 'এটাতো স্পষ্ট যাদু' (সূরা আছ ছুফ ৬১:৬)।
রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম, তার রিসালাত ও তার গুণাবলীর কথা তাওরাত ও ইনজিলে উল্লেখ আছে, এমনকি ইয়াহুদীরা তাদের সন্তানদের মতই রসূল সা. কে চিনলেও আল্লাহর কিতাব তাওরাতকে অস্বীকার করলো ও তাকে বর্জন করলো। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে পরীক্ষায় ফেললেন এভাবে যে, তারা শয়তানের কর্ম যাদুর কিতাব গ্রহণ করলো।
তারা শয়তানের কর্ম দ্বারা বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার অহীর পরিবর্তন ঘটালো, যা তাদের শাস্তি হিসাবে নির্ধারিত। যারা হক্ব থেকে বিমুখ হয়, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বাতিলে নিমজ্জিত করেন।
যারাই হক্ব পরিত্যাগ করে তাদেরকে বাতিলের পরীক্ষায় পড়তে হয়। আল্লাহর একত্ব ও একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতের ব্যাপারে যারা রসূলগণের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে, তাদের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা হলো তারা শিরক ও কুসংস্কারে লিপ্ত থাকার মাধ্যমে পরীক্ষায় পড়ে। আর শিরক ও কুসংস্কারের পক্ষে দলীল পেশ করে বাতিলকে হকু হিসাবে মানুষের মাঝে প্রচার করে।
কুসংস্কারে নিমজ্জিত ও কবর পূজারী অনেক আলেম আল্লাহর একত্ব, আল্লাহর কিতাব ও রসূল সা. এর সুন্নাতের দিকে দাওয়াতের পরিবর্তে বাতিলের দিকে আহবান করে এবং আল্লাহ, কবর পূজা এবং মৃতদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের দিকে মানুষকে দাওয়াত দেয়। তারা মানুষের মাঝে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং বাতিল কর্মে ব্যস্ত থাকে। এ থেকে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।