📄 বাতিল ক্বিয়াসের উপর নির্ভর করা ও ছহীহ ক্বিয়াসকে প্রত্যাখ্যান করা
ভ্রষ্ট ক্বিয়াসের মাধ্যমে দলীল পেশ করা। যেমন আল্লাহর বাণী:
إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا} [إبراهيم: ١০]
তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ (সূরা ইবরাহীম ১৪:১০)।
আর বিশুদ্ধ ক্বিয়াসকে অস্বীকার করা: জামে ও তার পূর্ববর্তী বিষয় অস্বীকার করা। জামে ও ফারেকের জ্ঞান না থাকা।
ব্যাখ্যা: উসূলবিদদের নিকট: ক্বিয়াস (তুলনা) দু'প্রকার:
১. ক্বিয়াসু ইল্লাহ (কারণগত ক্বিয়াস)। একই হুকুমে মূল ও শাখা উভয়টি একত্রিত করার জন্য মৌলিক বিষয়ের সাথে শাখা মিলানো। শর্তসমূহের মধ্যে কোন একটি শর্ত ভঙ্গ হলে তা ভ্রান্ত ক্বিয়াস হিসাবে গণ্য হবে। কোন বিধান সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে এর উপর নির্ভর করা যাবে না। এটি একটি মারাত্মক সমস্যা। ইবনুল কাইয়ুম রহিমাহুল্লাহ বলেন, ভ্রান্ত ক্বিয়াসের কারণে অধিকাংশ মানুষ বিপথগামী হয়। আর প্রথমে ক্বিয়াস চর্চা করে ইবলিশ। আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করার জন্য আল্লাহ তা'আলা তাকে নির্দেশ দিলে সে বলে,
قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ} [الأعراف: ١২]
তিনি বললেন, কিসে তোমাকে বাধা দিয়েছে যে, সিজদা করছ না, যখন আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছি? সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে (সূরা আরাফ ৭:১২)।
সে ধারণা করে মাটি থেকে আগুন উত্তম। তাই সে আদমের চেয়ে নিজেকে উত্তম মনে করে। এটা ছিল ইবলিশের ভ্রান্ত ক্বিয়াস-তুলনা। কেননা আগুন কখনো মাটির চেয়ে উত্তম হতে পারে না। বরং মাটিই আগুনের চেয়ে উত্তম। কারণ আগুন সাধারণত সব জিনিসকে পুড়িয়ে ধ্বংস করে করে দেয়। অথচ মাটি বিভিন্ন জিনিস ও শস্য উৎপন্ন করে, তাতে মানুষের কল্যাণ রয়েছে। আর যদি আমরা ক্বিয়াসের দিকে অগ্রসর হতাম, তাহলে বলতাম আগুন থেকে মাটি উত্তম। এ ধরণের তুলনা করা ক্বিয়াস নয়। বরং আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও অনুগ্রহের উপরই নির্ভর করতে হবে। কারণ আল্লাহ যা চান ও যা ইচ্ছা করেন তাই হয়। আল্লাহ তা'আলার রয়েছে পূর্ণ হেকুমাত। অনুরূপভাবে মুশরিকরাও ক্বিয়াস করে রসূলগণকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে বলতো,
{إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا} [إবراهيم: ১০] তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ (সূরা ইবরাহীম ১৪:১০)।
রসূলগণ মানুষ হওয়ার কারণে তাদের উপর রিসালাত বিশুদ্ধ না হওয়ার উপর মুশরিকরা প্রমাণ পেশ করে। তাদের ধারণায় মানুষের উপর রিসালাত বিশুদ্ধ নয়। রিসালাতের ব্যাপারে এটা তাদের ক্বিয়াস। এ ধরণের ক্বিয়াস বাতিল। কেননা তা বিভেদ সৃষ্টিকারী ক্বিয়াস। আল্লাহ তা'আলা রসূলগণকে অন্যদের উপর মর্যাদা দান করেছেন এবং তাদেরকে পছন্দ করে বাছাই করেছেন। আর তাদের অবস্থা ও রিসালাতের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলাই ভাল জানেন।
{اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ} [الحج: ৭৬,৭৫] আল্লাহ, ফিরিশতা ও মানুষের মধ্য থেকে রসুল মনোনীত করেন। অবশ্যই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্ব দ্রষ্টা (সূরা হাজ্জ ২২:৭৫,৭৬)। এ কারণে তারা রসূলগণকে বলতো,
{إِنْ أَنْتُمْ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا تُرِيدُونَ أَنْ تَصُدُّونَا عَمَّا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا فَأْتُونَا بِسُلْطَانٍ مُبِينٍ قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ} [إبراهيم: ১১] তোমরা তো আমাদের মতই মানুষ, তোমরা আমাদেরকে আমাদের পিতৃ-পুরুষরা যার ইবাদাত করত, তা থেকে ফিরাতে চাও। অতএব তোমরা আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আস। তাদেরকে তাদের রসূলগণ বলল, আমরা তো কেবল তোমাদের মতই মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন (সূরা ইবরাহীম ১৪:১১)।
রসূলগণ বলতেন, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে মর্যাদা দিয়েছেন এবং অনুগ্রহ করে রিসালাতের জন্য আমাদেরকে বাছাই করেছেন। তাই তোমাদের ক্বিয়াস বিভেদ সৃষ্টিকারী। সব মানুষ সমান নয় তাই তারা সমপর্যায়ে থাকতে পারে না। মানুষের মাঝে কাফির, মু'মিন, রসূল, আলেম, সৎলোক, অজ্ঞ ও ফাসেক সবই আছে। তাই মানুষের মাঝে ব্যবধান বিদ্যমান। বিভেদপূর্ণ: ক্বিয়াস পরিত্যাজ্য। কেননা উসূলবিদদের নিকট এ ধরণের: ক্বিয়াস নিকৃষ্ট। মানুষের নিকট তাদের মধ্য থেকে রসূলগণের আগমনই যুক্তিযুক্ত, যাতে তিনি তাদেরকে বুঝাতে পারেন।
{قُلْ لَوْ كَانَ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةٌ يَمْشُونَ مُطْمَئِنِينَ لَنَزَّلْنَا عَلَيْهِمْ مِنَ السَّمَاءِ مَلَكًا رَسُولاً} [الإسراء : ٩٥ ]
বল, 'ফেরেস্তারা যদি যমীনে চলাচল করত নিশ্চিন্তভাবে তাহলে আমি অবশ্যই আসমান হতে তাদের কাছে ফেরেস্তা পাঠাতাম রসূল হিসাবে' (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৯৫)।
তাই মানুষের নিকট রিসালাত পৌঁছে দেয়ার জন্য রসূলগণ দাঈ হিসাবে গণ্য। আর মানুষের মধ্যে থেকে রসূল হওয়া যুক্তিযুক্ত। পৃথিবীতে বসবাসকারীগণ যদি ফেরেস্তা হতো তাহলে তাদের জন্য ফেরেস্তাদের মধ্যে থেকে রসূল আসতেন।
ঐ সব জাহিলদের বিষয় বড়ই আশ্চর্য! মানুষের মধ্যে থেকে রিসালাত প্রাপ্ত হওয়াকে জাহিলরা অসম্ভব মনে করে। অথচ পাথরের ইবাদত করাকে তারা কিভাবে সম্ভব মনে করে! কিন্তু পাথর ও গাছকে প্রভূ ও উপাস্য স্বীকার করাকেই তারা সম্ভব মনে করে। এতদসত্ত্বেও মানুষের রিসালাত প্রাপ্ত হওয়াকে তারা স্বীকার করে না এবং সম্ভব মনে করে না!
নূহ আলাইহিস সালাম এর কাফির সম্প্রদায় ও অন্যান্যরা এ বাতিল ক্বিয়াসের উপরই ছিল। রসূলগণ মানুষ হওয়ায় তারা রিসালাতকে অস্বীকার করতো। রসূলগণ মানুষ হওয়ার কারণে নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতিসহ অন্যরা তাদের রিসালাতকে অস্বীকার করতো। নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতি বলেছিল,
{مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَأَنْزَلَ مَلَائِكَةً مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ إِنْ هُوَ إِلَّا رَجُلٌ بِهِ جِنَّةٌ فَتَرَبَّصُوا بِهِ حَتَّى حِينٍ} [المؤمنون: ٢٤،٢٥]
এতো তোমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই না। সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায়। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে অবশ্যই ফেরেস্তা নাযিল করতেন। এ কথাতো আমরা আমাদের পূর্বতম পিতৃ-পুরুষদের সময়েও শুনিনিসে কেবল এমন এক লোক, যার মধ্যে পাগলামী রয়েছে। অতএব তোমরা তার সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর (সূরা মু'মিনূন ২৩:২৪,২৫)।
অনুরূপভাবে অন্যান্য জাতিরাও বলতো আর কুরাইশরা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যাপারে বলেছিল,
{أَأُلْقِيَ الذِّكْرُ عَلَيْهِ مِنْ بَيْنِنَا} [القمر: ২৫]
আমাদের মধ্য থেকে কি তার ওপরই উপদেশবাণী পাঠানো হয়েছে? বরং সে চরম মিথ্যাবাদী অহংকারী (সূরা আল-ক্বামার ৫৪:২৫)।
কাফিরদের নিকট বহুল প্রচলিত রীতি হলো ভ্রান্ত ক্বিয়াস করা।
২. ক্বিয়াসুস শিবহি (قياس الشبه) বা সাদৃশ্য মূলক ক্বিয়াস।
তা হলো দু'টি মূলের মাঝে শাখাকে পুনরাবৃত্তি করা, তারপর মূল দু'টির সাথে বেশি সাদৃশ্যতা সংযোজন করা। আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য করা যাবে না। সৃষ্টির উপর কোন ক্বিয়াস হয় না। কোন ক্বিয়াসই আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যতায় সমান নয়। একমাত্র আল্লাহ তা'আলার অধিকারের ক্ষেত্রে উত্তম ক্বিয়াস ব্যবহৃত হবে। আর তা হলো এভাবে বলা যে, প্রত্যেক পূর্ণতা সৃষ্টির জন্যই সাব্যস্ত, আর স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলাই তার সৃষ্টি হ্রাস করার প্রয়োজন অনুভব করতে পারেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَلِلَّهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} [النحل: ৬০]
আল্লাহর জন্য রয়েছে মহান উদাহরণ। আর তিনিই পরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী (সূরা আন নাহাল ১৬:৬০)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, {فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ} [النحل: ৭৪]
তোমরা আল্লাহর জন্য কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না (সূরা আন নাহাল ১৬:৭৪)।
পরবর্তী বিষয়: বিশুদ্ধ ক্বিয়াসকে তারা অস্বীকার করে। তা হলো: মানুষের মধ্যে থেকে রসূল হিসাবে তাদের নিকট মানুষই আগমন করা এবং ফেরেস্তাদের মধ্যে থেকে রসূল হিসাবে ফেরেস্তাই আগমন করা। এটা বিশুদ্ধ ক্বিয়াস যা বিচক্ষণতার দাবী রাখে যে, প্রেরিত ব্যক্তিকে যাদের নিকট প্রেরণ করা হবে তিনি তাদের মত। সমজাতীয় হবেন, অন্য কোন জাতের হবেন না। যারা এ দু'টি বিষয়ে মানুষকে প্ররোচিত করে তারা জামি (ক্বিয়াসের ভিত্তি) ও ফারিক (যা দ্বারা ক্বিয়াস শুদ্ধ হয় না) এর ব্যাপারে অজ্ঞ।
জামি (جامع) বলা হয় যার উপর ভিত্তি করে ক্বিয়াস গঠিত হয়।
আর ফারিক (الفارق) হলো যে বিষয়ের মাধ্যমে ক্বিয়াস বিশুদ্ধ হয় না。
টিকাঃ
২৫. জামে (جامع) বলা হয় যার উপর ভিত্তি করে কিয়াস গঠিত হয়। আর ফারেক (الفرق) হলো যে বিষয়ের মাধ্যমে কিয়াস বিশুদ্ধ হয় না।
📄 বিদ্বান ও নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা
আলিম ও নেকলোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা জাহিলিয়্যাত। আল্লাহর বাণী: {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ} [النساء: ١٧١] হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া বলো না (সূরা আন নিসা ৪:১৭১)।
ব্যাখ্যা: এটি একটি মারাত্মক বিষয়। (الغلو) এর আভিধানিক অর্থ: সীমা অতিক্রম করা (الزيادة عن الحد) । যেমন উদাহরণ স্বরূপ: যখন হাড়িতে পানিপূর্ণ হয়ে উথলিয়ে যায় তখন বলা হয় (غلا القدر) হাড়ি উথলিয়ে গেছে। (غلا السعر) অর্থাৎ ভালো কাজের সীমা অতিক্রম করা। সুতরাং বাড়াবাড়ি (الغلو) হচ্ছে কোন জিনিসের الزيادة والارتفاع عن الحد المعروف । অতিরিক্ততা ও ভাল বিষয়েরও সীমা অতিক্রম করা।
শরীয়তের পরিভাষায় তা হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে তার যথোপযুক্ত অবস্থান থেকে উপরের অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। যেমন নাবীগণ অথবা নেকলোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা, তাদের ক্ষমতাকে রব অথবা উপাস্যের পর্যায়ে তুলে ধরা। জাহিলরা বিভিন্ন ব্যক্তিকে বাড়াবাড়ি মূলক ক্ষমতাবান মনে করে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলার সাথে রব হিসাবে গ্রহণ করে। যেমন ইয়াহুদীরা উযাইর আলাইহিস সালাম এর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করে তাকে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করেছে। আর মানুষের মধ্যে থেকে মারইয়ামের পুত্র ও তার রিসালাতের ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা সীমালঙ্ঘন করে আল্লাহর পুত্র হিসাবে রবের পর্যায়ে নির্ধারণ করেছে। অনুরূপভাবে নূহ আলাইহিস সালামএর জাতি নেক লোকদের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা নেক লোকদের মূর্তি তৈরি করার পর আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে রবের মর্যাদা স্বরূপ তাদের ইবাদত করতো।
{ وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهِتَكُمْ وَلا تَذَرُنَّ وَدَا وَلا سُوَاعاً وَلا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْراً} [نوح: ٢٣]
আর তারা বলে, 'তোমরা তোমাদের উপাস্যদের বর্জন করো না; বর্জন করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগূছ, ইয়া'উক ও নাসরকে' (সূরা নূহ ৭১:২৩)।
অর্থাৎ তাদেরকে তারা উপাস্য নির্ধারণ করতো। অনুরূপভাবে নূহ আলাইহিস সালাম এর জাতি ছাড়াও বর্তমানে মুশরিকদের বিভিন্ন সম্প্রদায় নেক লোকদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে। আর তারা নেক লোকদের কবর তাওয়াফ করে তাদের জন্য পশু উৎসর্গ করে, মানত করে, মৃতদের নিকট সাহায্য কামনা করে, সাহায্যের আবেদন তুলে ধরে ও তাদের নিকট অভাব অভিযোগের জন্য সমাধান তালাশ করে। তাই যারা ধৃষ্টতা দেখায় তারা এরূপ শিরকের দিকে ধাবিত হয়।
এ জন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لا تُطروني كما أطرت النصارى ابن مريم والإطراء هو الغلو في المدح "إنما أنالا عبد، فقولوا: عبد الله ورسوله
তোমরা আমার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করিও না যেমন খ্রিষ্টানরা মারইয়ামের পুত্রকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আর এখানে ধৃষ্টতা বলতে প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা। আমি কেবল বান্দা নই বরং তোমরা বলো আল্লাহর বান্দা ও রসূল।
নাবী ও নেকলোকদের বাড়াবাড়ি কিতাবধারী ও উম্মি (নিরক্ষর) লোকদেরকে শিরকে আকবারে (বড় শিরকে) লিপ্ত করে। মানুষদের জানা আবশ্যক নাবী ও নেকলোকদের ক্ষমতা কতটুকুন। তাহলে রসূলগণের রিসালাত সম্পর্কে জানা যাবে, নেকলোকদের সঠিক পন্থা ও আলেমদের ইলম সম্পর্কেও জানা যাবে যে তারা অন্যদের থেকে উত্তম। তারকারাজীর উপর চন্দ্রের যেমন মর্যাদা আবেদের উপর আলেমের মর্যাদা তেমনই। ফলে মানুষ তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দিবে, তাদের মর্যাদার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللَّهِ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوحٌ مِنْهُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلَاثَةٌ} [النساء: [۱۷۱
হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রসূল এবং তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি ও তাঁর পক্ষ হতে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বল না, তিন (সূরা আন নিসা ৪:১৭১)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيراً وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ} [المائدة: ٧٧]
বল, হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৭)। নাবী দ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إياكم والغلو في الدين، فإنما أهلك من كان قبلكم الغلو في الدين তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকো। কেননা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ির কারণে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তাই সৃষ্টির ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বৈধ নয়। আর আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যে অবস্থানে রেখেছেন তার উপর অতিরঞ্জন করাও বৈধ নয়। কেননা এটা আল্লাহ তা'আলার সাথে শিরকের দিকে ধাবিত করে। অনুরূপভাবে আলেম এবং আবেদের ব্যাপারেও ধৃষ্টতা বৈধ নয়। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ} [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)।
তাদের আলেম ও ইবাদতকারীদের নিয়ে তারা বাড়াবাড়ি করে। আর হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম করার ব্যাপারে ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদেরকে সঠিক বলে বিশ্বাস করে। আর পবিত্র শরী'আত বিকৃত করে।
টিকাঃ
২৬. জ্বহীহ বুখারী হা/৩৪৪৫।
২৭. ছহীহ: নাসাঈ ৩০৫৭, ইবনে মাজাহ ৩০২৯, মুসনাদে আহমাদ ৪৩৭, ছহীহ জা ে২৬৮০।
📄 হক্ অস্বীকার করা এবং বাতিল সাব্যস্ত করা
পূর্বে যা আলোচনা হয়েছে তা নেতিবাচক ও ইতিবাচক নিয়মের উপর নির্ভরশীল। জাহিলরা কু-প্রবৃত্তি ও ধারণার অনুসরণ করে। রসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন তা থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়。
ব্যাখ্যা: জাহিলদের সম্পর্কে শাইখ রহিমাহুল্লাহ যে সব বিষয় পূর্বে আলোচনা করেছেন, তা ইতিবাচক ও নেতিবাচকতার ভিত্তিতে হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা যা নিষেধ করেন জাহিলরা তা সঠিক সাব্যস্ত করে এবং তিনি যা সঠিক সাব্যস্ত করেন তারা সেটাকে নিষিদ্ধ মনে করে। এ কারণে তারা ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।
আল্লাহ তা'আলা শিরককে নিষিদ্ধ করেছেন, তাওহীদকে সাব্যস্ত করেছেন, একত্বের নির্দেশ দিয়েছেন অথচ জাহিলরা এর বিরোধিতা করে। জাহিলরা শিরক সাব্যস্ত করে ও তাওহীদকে নাকোচ করে। আবার (لَا إِلٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মাবুদ নেই এ কালেমার পূর্ণ অর্থেরও বিরোধিতা করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَالَّذِينَ آمَنُوا بِالْبَاطِلِ وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} [العنكبوت: ٥٢]
আর যারা বাতিলে বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্থ (সূরা আনকাবূত ২৯:৫৩)।
বাতিলকে বিশ্বাস করা নেতিবাচক দিক। অথচ বাতিলকে অস্বীকার করার বদলে এর প্রতি বিশ্বাস রেখে তারা তা সঠিক সাব্যস্ত করে। আর আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনয়ন করা ইতিবাচক দিক। অথচ তারা আল্লাহকে অস্বীকার করে। তারা বাতিলকে বিশ্বাসের কারণে আল্লাহর একত্বকে নাকোচ করে। আর নেতিবাচক তথা বাতিলকে তারা সাব্যস্ত করে ও ইতিবাচক তথা একত্বকে নাকোচ করে সর্বোপরি আল্লাহকে অস্বীকার করে।
এটাই জাহিলী রীতি যার উপর তারা পরিচালিত হয় ও ভ্রষ্টতায় ডুবে থাকে। তাদের অবস্থাদি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারা কখনো জাহিলী রীতি থেকে বের হবে না।
যে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে সে মূলতঃ আল্লাহ যা সাব্যস্ত করেন তা অস্বীকার করে। আর আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেন সে তা সাব্যস্ত করে। আর যে হারামকে হালাল ও হালালকে হারামে পরিনত করে, সে এ শ্রেণীর জাহিলদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা যা হালাল করেন যে তা নাকোচ করে ও হারামকে সাব্যস্ত করে সে জাহিলী রীতিরই অনুসারী বলে গণ্য। কোন জাহিলী কর্মকান্ড থেকে সে মুক্ত হতে পারে না। আর যে আল্লাহর একত্ববাদীদের বিরুদ্ধে শত্রুতা রাখে ও মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব করে, সে আল্লাহ তা'আলার সাব্যস্তকৃত বিষয়কে নাকোচ করে ও আল্লাহ তা'আলা যা নাকোচ করেছেন তা সাব্যস্ত করে। কেননা আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের সাথে বন্ধুত্বের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব নিষেধ করেছেন।
📄 মিথ্যা অজুহাত পেশ করে হক্ গ্রহণ না করা
আল্লাহ তা'আলা যা দিয়েছেন তা না বুঝেই তার অনুসরণ থেকে বিরত থাকার অজুহাত পেশ করা। আল্লাহর বাণী: {وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ } [ البقرة: ৮৮ ] ، {يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيراً مِمَّا تَقُولُ} [هود: ৯১] ،
আর তারা বলল, আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত (সূরা বাক্বারাহ ২:৮৮)। তারা বলল, হে শু'আইব, তুমি যা বল, তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না (সূরা হুদ ১১:৯১)।
আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছেন। আর আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের কুফরীর কারণেই তারা বিমুখ হয়েছে。
ব্যাখ্যা: অর্থাৎ তারা হকু না বুঝার কারণে তা কবুল করতে অজুহাত পেশ করে। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের ব্যাপারে উল্লেখ করেন, যখন তাদেরকে রসূল ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন তখন তারা বলেছিল, {قُلُوبُنَا غُلْفٌ بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلاً مَا يُؤْمِنُونَ} [البقرة: ৮৮] ،
আর তারা বলল, আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত। বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন। অতঃপর তারা খুব কমই ঈমান আনে (সূরা বাক্বারাহ ২:৮৮)।
)غُلْفٌ( অর্থাৎ অন্তরে আবরণ রয়েছে, তাতে রসূলের কথা পৌঁছবে না এবং তার কথায় তাদের অন্তর শান্তিও পাবে না। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে এ অজুহাতকে দলীল হিসাবে তারা গ্রহণ করেছে। এটিই আয়াতের প্রসিদ্ধ অর্থ।
আর দ্বিতীয় অর্থ হলো )وَقَالُوا قُلُوبُنَا غُلْفٌ( অর্থাৎ অন্তর জ্ঞানে পূর্ণ তাই কারো কথার প্রয়োজন নেই। তাদের ধারণায় রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যে, তারা যা বলে তা নিষ্প্রয়োজন। বরং প্রয়োজনীয়তা হলো আল্লাহ তা'আলা তাদের কুফরীর কারণে তাদেরকে ভর্ৎসনা করেন। অর্থাৎ কুফরীর কারণে তাদেরকে তার রহমত থেকে বিতাড়িত করে দূরে সরিয়ে দেন। কুফরীর কারণে তারা হক্ব গ্রহণ করতে পারে না। এখানে '' পদটি সাবাব তথা 'কারণ' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা তারা বুঝবে না কেননা তাকে তারা ভ্রূক্ষেপ করে না এবং তার কথায় মনোনিবেশও করে না। বিমুখতার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্য শান্তি নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, { فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ} [الصف: ٥]
অতঃপর তারা যখন বক্রপথ অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়গুলোকে বক্র করে দিলেন। আর আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না (সূরা জ্বাফ ৬১:৫)।
তাই যে হক্ব গ্রহণ করবে না আল্লাহ তা'আলা তাকে বাতিলে নিমজ্জিত করে পরীক্ষা করেন। এরপর অন্তর বিকৃত হওয়ার কারণে সে আর হক্ব গ্রহণ করে না। আমরা এ থেকে আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {بَلْ لَعَنَهُمُ اللَّهُ بِكُفْرِهِمْ فَقَلِيلاً مَا يُؤْمِنُونَ} [البقرة: ٨٨]
বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা'নত করেছেন। অতঃপর তারা খুব কমই ঈমান আনে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮৮)।
{فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيراً وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ} [النساء: ١٦٠، ١٦١]
সুতরাং ইয়াহুদীদের যুলমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে। আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ খাওয়ার কারণে (সূরা আন নিসা ৪:১৬০, ১৬১)।
ইয়াহুদীদের ব্যাপারে অন্তর বিমুখতার কথা এসেছে। তাদের কথা )قُلُوبُنَا غُلْفٌ( অর্থাৎ আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত, কথাটি শুদ্ধ নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলাই তাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ অন্তরকে পরিবর্তন করেন। আর অন্তরের মৌলিকত্ব হলো তা পরিবর্তনের স্বভাব বজায় থাকা। স্বভাব অনুযায়ী তা হক্ব গ্রহণের ক্ষমতা রাখে। আর ফিতরাত (স্বভাব) বিকৃত হলে অন্তর হকু গ্রহণ করে না। অন্তর যেন জমিনের মতই, জমিন অকেজো হলে তা বিলে পরিণত হয়। তাতে ফসল উৎপন্ন হয় না। অনুরূপ অন্তরও অকেজো হলে তা হক্ব গ্রহণ করে না।
অনুরূপভাবে শুয়াইব আ. এর জাতিও বিকৃত। শুয়াইব আ. নাবীগণের মধ্যে বাগ্মীতায় পারদর্শি ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। তার স্পষ্টভাষণ ও অলংকারপূর্ণ বক্তব্যে ও প্রভাবসম্পন্ন কথার জন্য তাকে নাবীগণের খতিব উপাধি দেয়া হয়। এ সত্ত্বেও তার জাতি বলতো, আল্লাহর বাণী:
{قَالُوا يَا شُعَيْبُ مَا نَفْقَهُ كَثِيراً مِمَّا تَقُولُ وَإِنَّا لَنَرَاكَ فِينَا ضَعِيفاً وَلَوْلا رَهْطُكَ لَرَجَمْنَاكَ وَمَا أَنْتَ عَلَيْنَا بِعَزِيزِ } [هود: ٩١]
তারা বলল, হে শু'আইব, তুমি যা বল, তার অনেক কিছুই আমরা বুঝি না। আর তোমাকে তো আমরা আমাদের মধ্যে দুর্বলই দেখতে পাচ্ছি। যদি তোমার আত্মীয়- স্বজন না থাকত, তবে আমরা তোমাকে অবশ্যই পাথর মেরে হত্যা করতাম। আর আমাদের উপর তুমি শক্তিশালী নও (সূরা হূদ ১১:৯১)।
তারা শুয়াইব আলাইহিস সালাম এর কথা বুঝতো না। কেননা আল্লাহ তা'আলা বনী ইসরাঈলের মত তাদের অন্তর মহরাঙ্কিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলার রীতি হলো যারা হক্ব থেকে অহংকার বশতঃ মুখ ফিরিয়ে নিবে, হক্ব পৌঁছার পরও তা গ্রহণ করবে না, আল্লাহ তা'আলা তাদের অন্তর বিকৃত করার মাধ্যমে শান্তি স্বরূপ তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলবেন।
অনুরূপভাবে কুরাইশ কাফিররা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কি বলেছিল?
{ وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِنْ بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ} [فصلت: ٥]
আর তারা বলে, তুমি আমাদেরকে যার প্রতি আহ্বান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত, আমাদের কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মাঝে রয়েছে অন্তরায়, অতএব তুমি তোমার কাজ কর, নিশ্চয় আমরা (আমাদের) কাজ করব (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৫)।
কাফিরদের পন্থা একই। রসূলগণের কথা না বুঝার কারণে তারা তাদের দাওয়াতের বিরোধিতা করে। এটা কি রসূলগণের দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যর্থতা? না বরং কাফিরদের কুফরীর প্রবণতা, হক্ব থেকে বিমুখতা, হক্বের প্রতি মনোনিবেশ না করা ও কল্যাণ মূলক কাজে আগ্রহ না থাকারই ব্যর্থতা।