📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 শক্তিশালী গোষ্ঠীর রীতিকে হক্ মনে করে তা দলীল হিসাবে গ্রহণ করা

📄 শক্তিশালী গোষ্ঠীর রীতিকে হক্ মনে করে তা দলীল হিসাবে গ্রহণ করা


শক্তিশালী গোষ্ঠীর রীতিকে হক্ব মনে করে তা দলীল হিসাবে গ্রহণ করা: যে সম্প্রদায়কে বোধশক্তি, কর্মক্ষমতা, ধনসম্পদ, সম্মান ও রাজত্ব দান করা হয়েছে তার মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করা। আল্লাহ তা'আলা তার বাণীর মাধ্যমে এটা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন,
{وَلَقَدْ مَكَّنَّاهُمْ فِيمَا إِنْ مَكَّنَّاكُمْ فِيهِ} [الأحقاف : ٢৬]
আর আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, তোমাদেরকে তাতে প্রতিষ্ঠিত করি নি (সূরা আহক্বাফ ৪৬: ২৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ} [البقرة:
[৮৯
আর তারা (এর মাধ্যমে) পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল, যা তারা চিনত, তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লা'নত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮-৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ} [البقرة: ১৪৬]
তারা তাকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদেরকে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১৪৬)।
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যাসমূহ: শক্তি, জ্ঞান ও মর্যাদা সম্পন্ন মানুষেরা যে রীতির উপর থাকে, সেটাকে তারা হক্ মনে করে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে। এটাই ছিল তাদের নিকট হক্ব চেনার পদ্ধতি। তারা মানুষের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং মনে করে সামর্থবান, সম্পদশালী, বিলাসী ও খ্যাতিমানরাই সঠিক পথে আছে। আর দুর্বল ও গরীবদেরকে তারা বাতিল মনে করে। এটাই হলো জাহিলদের অবস্থা, তাদের এ পদ্ধতি পরিত্যাজ্য।

আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী কাফির জাতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন যে, তারা সম্পদশালী ও শক্তিসম্পন্ন ছিল। কুরআনের অনেক আয়াতের মাধ্যমে তাদের গৌরবের কথা জানা যায়। তারা জ্ঞানবান ও বোধশক্তি সম্পন্নও ছিল। কিন্তু এসব কিছুই তাদের কোন কাজে আসেনি। বরং তারা বাতিলের উপরই ছিল। এ বিষয়টি আল্লাহ তা'আলা অনেক আয়াতেই উল্লেখ করেন। আল্লাহর বাণী:

{وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا أَيُّ الْفَرِيقَيْنِ خَيْرٌ مَقَاماً وَأَحْسَنُ نَدِيّاً} [مريم: ٧٣]
আর যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে পাঠ করা হয়, তখন কাফিররা ঈমানদারকে বলে, "দুই দলের মধ্যে কোনটি মর্যাদায় শ্রেষ্ঠতর এবং মজলিস হিসাবে উত্তম?” (সূরা মারইয়াম ১৯:৭৩)।

আল্লাহ তা'আলা তাদের ধ্বংস সাধনের ব্যাপারে বলেন,
{وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنْ قَرْنٍ هُمْ أَحْسَنُ أَثَاثاً وَرِئْياً} [مريم : ٧٤]
আর তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্ম ধ্বংস করে দিয়েছি যারা সাজ-সরঞ্জাম ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল! (সূরা মারইয়াম ১৯:৭৪)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَكَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ عَلِيماً قَدِيراً} [فاطر : ٤٤]
আর তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? তাহলে তারা দেখত, কেমন ছিল তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম। অথচ তারাতো শক্তিতে ছিল এদের চেয়েও প্রবল। আল্লাহ তো এমন নন যে, আসমানসমূহ ও যমীনের কোন কিছু তাকে অক্ষম করে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান (সূরা ফাতির ৩৫:৪৪)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنْ قَرْنٍ هُمْ أَشَدُّ مِنْهُمْ بَطْشاً} [ق: ٣٦]
আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিয়েছি যারা পাকড়াও করার ক্ষেত্রে এদের তুলনায় ছিল প্রবলতর (সূরা ক্বফ ৫০:৩৬)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,

{أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ قَرْنٍ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ مَا لَمْ تُمَكِّنْ لَكُمْ وَأَرْسَلْنَا السَّمَاءَ عَلَيْهِمْ مِدْرَارًا وَجَعَلْنَا الْأَنْهَارَ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَأَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قَرْنَاً آخَرِينَ} [الأنعام: ٦]
তারা কি দেখে না আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের উপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ যা তাদের নীচে প্রবাহিত হত। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি (সূরা আল আন'আম ৬:৬)।

এ সকল আয়াত ও উদাহরণ সমূহের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ধন-সম্পদ ও শক্তিতে কোন শিক্ষা নেই। কেননা সম্পদশালী ও ক্ষমতাবানরা যখন ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল তখন তাদের এ ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রাচুর্য কোন কাজে আসেনি। আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেন যে, কাফিরদেরকে পাঁকড়াও করার জন্য তিনি এগুলো তাদেরকে দান করেন। আল্লাহর বাণী:
{ فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِينَ ظَلَمُوا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} [الأنعام: ٤٤، ٤٥]
অতঃপর তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলে গেল, আমি তাদের উপর সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তাদেরকে যা প্রদান করা হয়েছিল তার কারণে তারা উৎফুল হল, আমি হঠাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা হতাশ হয়ে গেল। অতএব যালিম সম্প্রদায়ের মূল কেটে ফেলা হল। আর সকল প্রশংসা রাব্বুল আলামীন আল্লাহর জন্য (সূরা আল আন'আম ৬:৪৪-৪৫)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{فَذَرْنِي وَمَنْ يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لا يَعْلَمُونَ وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ} [القلم: ٤٤، ٤٥]
অতএব ছেড়ে দাও আমাকে এবং যারা এ বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে। আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতে পারবে না। আর আমি তাদেরকে অবকাশ দেব। অবশ্যই আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ (সূরা আল কুলাম ৬৮:৪৪-৪৫)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, { وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمَا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ} [آل عمران: ۱৭৮]
আর যারা কুফরী করেছে তারা যেন মনে না করে যে, আমি তাদের জন্য যে অবকাশ দেই, তা তাদের নিজেদের জন্য উত্তম। আমি তো তাদেরকে অবকাশ দেই যাতে তারা পাপ বৃদ্ধি করে। আর তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক আযাব (সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৮)।

আল্লাহ তা'আলা কাফিরদেরকে প্রাচুর্য, পৃথিবীতে ক্ষমতা, রাজত্ব ও কর্তৃত্ব দান করেছেন। বিভিন্ন জিনিস আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তিনি তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন। যেমন বর্তমান যুগের কাফিররা এসবের উপরই রয়েছে। এটা প্রমাণ করে না যে, তারা হক্বের উপর আছে। এটাও প্রমাণিত নয় যে, আল্লাহ তা'আলা এসব কিছু তাদেরকে দান করে তাদের উপর সন্তুষ্ট।

এটা কাফিরদেরকে পাঁকড়াও করার অবকাশ ও তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার ক্ষেত্র বিশেষ, যাতে তাদের পাপাচারিতা বৃদ্ধি পায়। জাহিলরা এ সবের মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করে থাকে। পক্ষান্তরে বোধ সম্পন্নরা বিভিন্ন জাতি সম্পর্কে চিন্তা করে, তাদের মাঝে হক্বের সন্ধান পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করে, যদিও তারা অভাবী হয়। আর কোন গোষ্ঠী প্রাচুর্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাতিল হলে জ্ঞানীরা তা প্রত্যাখ্যান করে। এ বিষয়ে অনেক আয়াত আছে। শাইখ রহিমাহুল্লাহ এখানে কতিপয় আয়াত উল্লেখ করেছেন। যে আয়াতে আদ জাতির ধ্বংসের কথা আছে তা তিনি উল্লেখ করেন। আল্লাহ তা'আলার বাণী: {وَلَقَدْ مَكَّنَّاهُمْ فِيمَا إِنْ مَكَّنَّاكُمْ فِيهِ وَجَعَلْنَا لَهُمْ سَمْعاً وَأَبْصَاراً وَأَفْئِدَةً فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلَا أَبْصَارُهُمْ وَلَا أَفْئِدَكُمْ ... } [الأحقاف: ২৬]
আর আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, তোমাদেরকে তাতে প্রতিষ্ঠিত করি নি। আর আমি তাদেরকে কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা যখন আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত তখন তাদের কান, তাদের চোখ ও তাদের হৃদয় সমূহ তাদের কোন উপকারে আসেনি (সূরা আহক্বাফ ৪৬:২৬)।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, {أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ} [الفجر: ৬ - [A
তুমি কি দেখনি তোমার রব 'আদ সম্প্রদায়ের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? ইরাম জাতির প্রতি, যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী (সূরা ফাজর ৮৯: ৬-৮)।

রায় বা সিদ্ধান্ত: ইরাম বলতে ইরাম গোত্র অথবা যে শহরে গোত্রটি বসবাস করতো তার নাম ইরমা।
{إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِ} [الفجر: [৯-৭
ইরাম জাতির প্রতি, যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী। যার সমতুল্য দেশ সমূহে সৃষ্টি করা হয়নি। এবং সামুদ সম্প্রদায়, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে বাড়ি ঘর নির্মাণ করেছিল? (সূরা ফাজর ৮৯:৭-৯)।

গোত্রটি পাহাড় কেটে কারুকাজ করতো ও সেখানে তাদের বাসস্থান নির্মাণ করতো। বর্তমানেও সিরিয়ার পাহাড়ের পাদদেশে তাদের অবস্থান রয়েছে।
{فَتِلْكَ مَسَاكِنُهُمْ لَمْ تُسْكَنْ مِنْ بَعْدِهِمْ إِلَّا قَلِيلًا وَكُنَّا نَحْنُ الْوَارِثِينَ} [القصص: ٥٨]
আর আমি কত জনপদকে ধ্বংস করেছি, যার বাসিন্দারা তাদের জীবন উপকরণ নিয়ে দম্ভ করত। এগুলো তো তাদের বাসস্থান। তাদের পরে (এখানে) সামান্যই বসবাস করা হয়েছে। আর আমি চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী (সূরা ক্বাসাস ২৮: ৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا} [النمل: ৫২]
সুতরাং ঐগুলো তাদের বাড়ীঘর, যা তাদের যুল্মের কারণে বিরান হয়ে আছে। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য যারা জ্ঞান রাখে (সূরা নামল ২৭:৫২)।

আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রচুর শক্তি দান করেছিলেন অথচ তারা ছিল কাফির। তাদের নিকট নাবীগণ আগমন করলে তাদের শক্তি, প্রাচুর্য ও বিলাসিতার কারণে তারা প্রতারিত হন। তারা রসূলগণের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করতো। তাদের শিরকী আমলের উপরই তারা বহাল ছিল এবং তারা হকুকে গ্রহণ করেনি। গোত্রটি নিজেদের শক্তির মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছিল।
আল্লাহ তা'আলা আদ জাতির কথাও উল্লেখ করেন, তাদের শক্তির মাধ্যমে তারাও প্রতারিত হয়েছিল।
{ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً} [فصلت: ١٥]
(আর 'আদ সম্প্রদায়, তারা যমীনে অযথা অহঙ্কার করত এবং) বলত, আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী কে আছে? তবে কি তারা লক্ষ্য করেনি যে, নিশ্চয় আল্লাহ যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? (সূরা ফুসসিলাত ৪১:১৫)।

বনী ইসরাঈল ও ইয়াহুদীদের জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করা হয় এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জ্ঞান ও বুঝশক্তি দান করেছিলেন। তারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলী সম্পর্কে জানতো যে, অচিরেই তিনি প্রেরিত হবেন, যা তাদের তাওরাত ও ইনজিলে বর্ণিত হয়েছে। আর একথাও বর্ণিত হয়েছে, তিনি শেষ নাবী হিসাবে প্রেরিত হবেন এবং তার বিভিন্ন গুণাবলীরও বর্ণনা আছে। মদিনায় আরবের আউস ও খাযরাজ গোত্রের সাথে তাদের যুদ্ধের বর্ণনাও আছে।
{ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا} [البقرة: ٨٩]
আর তারা (এর মাধ্যমে) পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮৯)।

তারা বলতো, শেষ যুগে অচিরেই একজন নাবী প্রেরিত হবেন। আমরা তার অনুসরণ করবো ও তার সাথে তোমাদেরকে হত্যা করবো।
{فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ} [البقرة: ٨٩]
সুতরাং যখন তাদের নিকট এল, যা তারা চিনত, তারা তা অস্বীকার করল (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮-৯)।

অর্থাৎ মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী ইসমাঈল বংশে প্রেরিত হন। ইয়াহুদীরা তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। কারণ বনী ইসরাঈলের মধ্যে থেকে নাবী হোক তারা এটা কামনা করতো। যাতে তারা নিজেদের জন্য তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করতে পারে। ইসমাঈলী বংশে নাবী হওয়ায় রসূল মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তারা ঈর্ষান্বিত হয়। তারা জানতো যে, তিনি আল্লাহর রসূল। এ সত্ত্বেও তাদের জ্ঞান ও বোধগম্যতা কোন কাজে আসেনি।

মূলতঃ যারা হক্ব বুঝে, তদনুযায়ী আমল করে। আর হক্ব থেকে বিমুখ করে এমন বিষয় হলো: হিংসা, অহংকার ও দুনিয়া প্রীতি অথবা নেতৃত্বের লোভ। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে মানুষ জেনে বুঝে হক্ব থেকে বিরত থাকে। হেদায়াত ও অনুগ্রহ আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। শিক্ষা, জ্ঞান ও বুঝের মাধ্যমে হেদায়াত লাভ হয় না। তাই যে কোন বিষয় আল্লাহ তা'আলার দিকেই অভিমুখী হয়। একারণে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নোক্ত দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করতেন, يا مقلب القلوب والأبصار، ثبت قلبي على دينك হে অন্তর ও চক্ষুর পরিবর্তনকারী! তোমার দীনের উপর আমার অন্তরকে অটল রাখো।

শিক্ষা, জ্ঞান, বুঝ ও ফিক্বহ এসবই ভাল উপকরণ, তবে তা যথেষ্ট নয়। মু'মিনের সতর্কতার জন্য এসব তাকে দান করা হয়। যাতে মু'মিন তার জ্ঞান ও বুঝের মাধ্যমে প্রতারিত না হয়। আর সর্বদা হক্বের উপর অটল থাকা ও সঠিক পথের হিদায়াত লাভের জন্য রবের নিকট দু'আ করবে। এমনিভাবে মু'মিন তার শক্তির মাধ্যমেও প্রতারিত হয় না। যেমন বলা হয়ে থাকে, এটা শক্তিশালী রাষ্ট্র, কেউ এর উপর বিজয় লাভ করতে পারবে না। কেননা এ রাষ্ট্র অস্ত্রাদী, ধ্বংসাত্মক গোলাবারুদ ও পারমাণবিক বোমার সমারোহে সমৃদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئاً وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ} [التوبة: ٢٥]
হুনাইনের দিনে যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে (সূরা আত তাওবা ৯:২৫)।

এটা হলো বৃহত্তর বিষয় যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই সচেতন নয়। শক্তি, প্রাচুর্য, খ্যাতি ও অহংকারের মাধ্যমে জাহিলরা যুক্তি দেখিয়ে বলে, এটা উন্নত জাতি, যাতে প্রমাণিত হয় এ জাতি হক্বের উপর আছে। তাদের ধারণা হকু ছাড়া কেউ এ সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না, কেননা তাদের রয়েছে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান। কতিপয় জনসমষ্টি প্রতারিত হয়ে তাদের বিষয়ে এরূপ ধারণাই করে থাকে, অথচ তারা কুফরীর উপর প্রতিষ্ঠিত, সেদিকে তারা দৃষ্টি দেয় না।

টিকাঃ
২৪. ছহীহ তিরমিযী ৩৫৯৬, হাকিম ১৯৭০, ইবনে মাজাহ ১৯৯, ছহীহ জামে ৭৯৮৭-৮৮।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 দুর্বলরা যে নীতির উপর রয়েছে, সেটাকে হক্ মনে না করা

📄 দুর্বলরা যে নীতির উপর রয়েছে, সেটাকে হক্ মনে না করা


দুর্বলরা ছাড়া কেউ বাতিলের অনুসরণ করে না বলে প্রমাণ পেশ করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,

{أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ} [الشعراء: ১১১]
তারা বলল, 'আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে? (সূরা আশ শু'আরা ২৬:১১১)।

{أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا} [الأنعام: ৫৩]
এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।

কিন্তু আল্লাহ তা'আলা (দুর্বলদের প্রতি উপস্থাপিত অভিযোগ) প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
{أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّاكِرِينَ} [الأنعام: ৫৩]
আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত নয়? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।
ব্যাখ্যা: এটা পূর্ববর্তী মাসআলার বিপরীত। মাসআলাটি ছিল শক্তিশালীরা হক্বের উপর রয়েছে বলে প্রমাণ পেশ করা। আর এ বিষয়কে তারা দুর্বলতাকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করে যে, দুর্বলরা হক্বের উপর নেই। যদি তারা হক্বের উপরই থাকতো তাহলে তারা দুর্বল হতো না। হক্ব ও বাতিল বুঝার জাহিলদের মাপকাঠি এটাই। তারা জানে না যে, শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা আল্লাহ তা'আলার হাতেই আছে। দুর্বলতা সত্ত্বেও দুর্বলরা কখনো হক্বের উপর থাকে এবং শক্তিসম্পন্নরা কখনো বাতিলের উপর থাকে। নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে দাওয়াত দিলে তারা বলে,
{قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ} [الشعراء: ১১১]
তারা বলল, 'আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে? (সূরা আশ শু'আরা ২৬:১১১)। অর্থাৎ আমাদের মাঝে যারা দুর্বল তারা (অনুসরণ করবে)। আপনি যদি হক্বের উপর থাকতেন তাহলে শক্তিসম্পন্নরা আপনার অনুসরণ করতো। অন্য আয়াতে আছে,
{وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِي الرَّأْي}

আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে। (সূরা হুদ ১১:২৭)

অর্থাৎ যাদের কোন রায় বা সিদ্ধান্ত নেই, তারাই আপনার অনুসরণ করে। আর তারা এ ব্যাপারে অন্য কোন চিন্তা-ভাবনা করে না।

অনুরূপভাবে রসূল এর যুগে মুশরিকরা দুর্বল মু'মিনদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো। যেমন বিলাল, সালমান, আম্মার ইবনে ইয়াসার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ও তার মাতা-পিতা এবং দুর্বল ছাহাবীগণকে তারা উপহাস করতো। তারা বলতো, ঐসব দুর্বলরা আপনার নিকটে থাকার কারণে আমরা আপনার সাথে বসবো না। তাদের মজলিশ ভিন্ন অন্যত্র আমাদের বসার ব্যবস্থা করেন। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য নির্দিষ্ট মজলিশ নির্ধারণ করার ইচ্ছা করলে আল্লাহ তা'আলা ভর্ৎসনা করে বলেন,
{ وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ وَكَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لِيَقُولُوا أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا} [الأنعام: ٥٢، ٥٣]
আর তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে সকাল সন্ধ্যায় ডাকে, তারা তার সন্তুষ্টি চায়। তাদের কোন হিসাব তোমার উপর নেই এবং তোমার কোন হিসাব তাদের উপর নেই, ফলে তুমি তাদেরকে তাড়িয়ে দিবে এবং তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে (সূরা আল আন'আম ৬:৫২-৫৩)।

আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا }
এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।

ঐ সব লোকেরা অর্থাৎ দুর্বল ছাহাবীরা। কল্যাণ অর্জনে আমাদের চেয়ে অগ্রগামী হওয়া তাদের সম্ভব নয়।
{ لَوْ كَانَ خَيْراً مَا سَبَقُونَا إِلَيْهِ}
যদি এটা ভাল হত তবে তারা আমাদের থেকে অগ্রণী হতে পারত না। (সূরা আহক্বাফ ৪৬:১১)

জাহিলদের মত বর্তমানেও অজ্ঞরা আলিমদেরকে আখ্যা দেয় যে, তাদের কোন রায় (সিদ্ধান্ত) ও চিন্তা ভাবনা নেই, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ, তারা পাথরে পরিণত হয়েছে, তারা জটিলতা সৃষ্টি করে, শেষ পর্যন্ত এভাবেই বলতে থাকে।

শাইখ রহিমাহুল্লাহ যে ঐতিহাসিক বিষয় লিপিবদ্ধ করেছেন তা কেবল সর্তকতার উদ্দেশ্যেই করেছেন। যাতে এ বিষয়সমূহের ব্যাপারে তিনি সতর্ক করতে পারেন। কেননা তা জাহিলী বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। জাহিলরা তো ফাসেক আলেম ও অজ্ঞ ইবাদতকারীদের অনুসরণ করে।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 ফাসিক আলিম ও মূর্খ ইবাদতকারীদের অনুসরণ করা

📄 ফাসিক আলিম ও মূর্খ ইবাদতকারীদের অনুসরণ করা


আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণী:

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيراً مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ} [التوبة: ٣٤]
হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয় পন্ডিতগণ ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন- সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, আর তারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাহে খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও (সূরা আত-তাওবা ৯:৩৪)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, {لا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيراً وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيل [المائدة: ৭७]
বল, হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৭)।
ব্যাখ্যা: জাহিলী বিষয়সমূহ: আলেমদের পাপাচারীতার মাধ্যমে দলীল পেশ করা। ফাসেক হলো জ্ঞান ও আমলগত দিক থেকে যে আল্লাহর আনুগত্য থেকে বের হয়ে যায়। ফাসেক আলেম হচ্ছে যারা জ্ঞানানুযায়ী আমল করে না অথবা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করে, যদিও জানে তারাই মিথ্যাবাদী। নিজেদের খেয়ালখুশি ও কু-প্রবৃত্তির অনুসরণের জন্য তারা আলেমের বেশ ধারণ করে, মানুষ তাদের বিশ্বাস করে। আর ইলম-জ্ঞান ছাড়া আমল করাই হচ্ছে ইবাদতকারীদের পাপাচারীতা। মানুষ ইবাদতকারীদের বিশ্বাস করে বলে থাকে তারাতো নেকলোক।
আলেম ও ইবাদতকারীর দ্বারা প্রতারিত হওয়া যাবে না যতক্ষণ না তাদের প্রত্যেকে সঠিক দীনে বহাল থাকে। ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيراً مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ} [التوبة: ٣٤]

হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয় পন্ডিতগণ ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন- সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, আর তারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় (সূরা আত- তাওবা ৯:৩৪)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, { اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ ... } [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)।

তারা হারামকে হালাল ও হালালকে হারাম সাব্যস্ত করে, অতঃপর তার অনুসরণ করে। একারণে আল্লাহ তা'আলা ছাড়াই তারা নিজেদেরকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছে। এ থেকে আমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
হালাল ও হারাম নির্ধারণ করা আল্লাহরই অধিকার। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ও কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করে হারাম অথবা হালাল নির্ধারণ করার অধিকার কারো নেই। তাতে মানুষ খুশি হয় ও তাল মিলিয়ে চলে। বর্তমানেও মানুষ শরী'আতের পরিবর্তন করছে। মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ও মানুষকে খুশি করার জন্য অনুমান করে হারামকে হালাল করা হচ্ছে। তারা ফন্দি তালাশ করে অনুমোদন চায় অথবা আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যারোপ করে। কেননা আল্লাহ তা'আলা মানুষের স্বার্থেই হালাল ও হারাম নির্ধারণ করেন। (দীনের পরিবর্তনকারী) ঐসব লোকই পাপাচারী আলেম। আর যে আল্লাহর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যায় সে ফাসেক। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيراً مِنَ الْأَحْبَارِ} [التوبة: ٣٤
হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয় পন্ডিতগণ ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন- সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩৪)।

মু'মিনদেরকে সতর্ক করার জন্য এ আহবান করা হয়েছে। আর আহবার )الأحبار( হলো আলেমগণ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইয়াহুদী আলেমদেরকে বুঝানো হয়ে থাকে। আর রূহবান )الرهبان( তথা ইবাদতকারীগণ। এটাও অধিকাংশ সময় খ্রিষ্টান ইবাদতকারীগণকে বুঝানো হয়।

খ্রিষ্টানদের মাঝে বৈরাগ্যবাদ রয়েছে। আর ইয়াহুদীদের মাঝে বিদ্বান আছে। যদিও ইয়াহুদীরা অভিশপ্ত ও খ্রিষ্টানরা পথভ্রষ্ট। আল্লাহ তা'আলা ছালাতের প্রত্যেক রাক'আতে আমাদেরকে নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করার নির্দেশ দেন:
{ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ} [الفاتحة: ٦ ، ٧]
আমাদেরকে সরল পথের হিদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদেরকে নি'মাত দিয়েছেন (নাবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ, সৎকর্মপরায়ণ): যাদের উপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয় নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয় (সূরা ফাতিহা ১:৬,৭)।
{ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ} যাদের উপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয়নি
আর খ্রিষ্টানরা আমল ছাড়াই ইলমের অধিকারী। তারাই হলো পাপাচারী আলেম। }وَلَا الضَّالِّينَ{ অর্থাৎ যারা পথভ্রষ্টও নয়
খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য জাতির মাঝে বৈরাগ্যবাদী আছে, যারা দলীল-প্রমাণ ছাড়াই আল্লাহর ইবাদত করে। তারা কেবল বিদ'আত, নবাবিষ্কৃত বিষয়ের অনুসরণ ও নির্বুদ্ধিতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে নিষেধ করেন পাপাচারী আলেম ও পথভ্রষ্ট ইবাদতকারীর নিকট যেতে। আর আদেশ করেন কুরআন ও সুন্নাহর দলীলসহ হক্ক গ্রহণ করতে।
বর্তমানে কোন বিষয়ে কারো জানার আকাঙ্খা হলে সে বলে, অমুক আমাকে এ ফাতওয়া দিয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর দলীলের দিকে ভ্রূক্ষেপ করা ছাড়াই এটা করা হয়। তাই ফাতওয়া দানকারীকে যখন বলা হয়, এটা ভুল ফাতওয়া। তখন সে বলে, আমার কি করার আছে! অমুকতো এর উপর অটল থেকেই ফাতওয়া দিয়েছেন।
যখন কোন ফাতওয়া তার ইচ্ছা বিরোধী হয় তখন সে বলে, এ ফাতওয়া ঠিক নয় অথবা এটা কঠিন ফাতওয়া। আর মিথ্যা ও আলেমদের ভুল-ত্রুটি একত্রিত করে তারা কিতাব আকারে মানুষের মাঝে প্রকাশ করে। মানুষের সামনে তাদের অনুমান ব্যাপক পরিসরে তুলে ধরে বলে, ইসলাম উদার। তোমরা মানুষকে বাধ্য করো না।

তাদেরকে যখন বলা হয়, এসব ফাতওয়া কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে পেশ করুন। তখন তারা বলে, এগুলোতো আলেমদের কথা।
কুরআন ও সুন্নাহর চেয়ে কি আলেম বড় হতে পারে! কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে তারা পেশ করে না কেন?! এরূপ কাজ কু-প্রবৃত্তির অনুসারীরাই করতে পারে। এ থেকে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যারা বলে: { اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَاباً مِنْ دُونِ اللَّهِ} [التوبة: ٣١]
তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করেছে (সূরা আত-তাওবা ৯:৩১)।
যখন তাদেরকে বিদআ'ত থেকে নিষেধ করা হয় যে ব্যাপারে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন, তখন তারা বলে, অমুক ব্যক্তি এরূপ আমল করে, তিনিতো আলেম অথবা নেকলোক। আর অমুক দেশে এ আমলের প্রচলন আছে। তাদের মাঝেও সৎকর্ম ও তাক্বওয়া আছে। এক্ষেত্রে আমরা বলবো, সৎকর্ম ও তাক্বওয়া যথেষ্ট নয়। কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক হওয়া আবশ্যক।
সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহর দলীল ছাড়াই আলিম ও ইবাদতকারীদের কথাকে তারা সঠিক সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করে। এটাই জাহিলদের পদ্ধতি যারা তাদের আলেম ও ইবাদতকারীদেরকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করেছে।

📘 শারহু মাসাইলিল জাহিলিয়্যাহ > 📄 দ্বীনদারদেরকে অহেতুক বৃক্ষের স্বল্পতা এবং মৃগয় না করার দোষে দোষী করা

📄 দ্বীনদারদেরকে অহেতুক বৃক্ষের স্বল্পতা এবং মৃগয় না করার দোষে দোষী করা


দীনের অনুসারীদের বুদ্ধিমত্তার কমতি ও মুখস্থ শক্তি না থাকার অজুহাতে দীনকে বাতিল হিসাবে প্রমাণ করা। আল্লাহ তা'আলার বাণী: {بَادِيَ الرَّأْيِ} [هود : ২৭] অর্থাৎ বিবেচনাহীনভাবে (সূরা হুদ: ২৭)
ব্যাখ্যা: আল্লাহ তা'আলা নূহ আ. এর জাতির কথা উল্লেখ করে বলেন, {وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا} [هود : ২৭]
আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে। আর আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব আমরা দেখছি না। বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করছি (সূরা হুদ ১১: ২৭)। অর্থাৎ দুর্বলরা। {بَادِي الرَّأْيِ} তথা যাদের কোন বুঝশক্তি নেই-নির্বোধ। রসূল জ্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসারীদের বোধশক্তি, দক্ষতা ও চিন্তা-চেতনা নেই বলে তাদেরকে তারা তিরস্কার করে। বর্তমানে অনেক বিপথগামী ও আল্লাহর শত্রুরা এ ব্যাপারে দাম্ভিকতার সাথে চলছে। আর মুসলিম ও তাদের আলেমদেরকে নিয়ে তারা তামাশা করে। কারণ তাদের নাকি বুঝশক্তি ও দুরদর্শন নেই। তাই মুসলিমদের আলেমগণ বিচক্ষণ সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে এ অপবাদ দিয়ে তারা নিন্দা জ্ঞাপন করে। কেননা আলেমরা আল্লাহর কিতাবের মাধ্যমেই চিন্তা গবেষণা করে। তারা আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে বলেন এবং আল্লাহ তা'আলা যা নিষেধ করেন তা থেকে দুরে থাকতে বলেন।
সন্দেহ নেই যে, রসূলগণের পরে নেক আমলকারী আলেমগণ উত্তম মানুষ হিসাবে বিবেচিত। তারকারাজীর উপর চাঁদের মর্যাদা যেমন ইবাদতকারীর উপর আলেমের মর্যাদা তেমনই। সুতরাং যারা জাহিলদের সমকক্ষ তারা ব্যতীত আলেমদের বোধশক্তি না থাকা ও চিন্তা-চেতনার স্বল্পতার অভিযোগে তাদেরকে নিন্দা ও তিরস্কার করা যাবে না। নুহ আ. এর জাতি রসূলগণের অনুসারীদেরকে অনুরূপভাবে তিরস্কার করতো। যাতে মানুষ রসূলগণের নিকট থেকে পলায়ন করে। বর্তমানেও কিছু মানুষের মুখ থেকে তিরস্কারমূলক কথা প্রকাশ পায়। তারা বলে, ঐ সকল আলেমগণ কেবল হায়েয ও নেফাসের মাসআলা এবং জামরায় পাথর নিক্ষেপের বিধান নিয়ে আলোচনা করে। তাদের ধারণায় এসব আলেম স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী, তাদের আধুনিক কোন জ্ঞান নেই। জাহিলদের নিকট রাজনীতির জ্ঞান ও নেতৃত্বের মোহই আধুনিকতা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00