📄 দলীলের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে অধিকাংশের নিয়ম-নীতি-আমলকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করা
তাদের বৃহৎ কর্মপদ্ধতি: অধিকাংশের উপর ভিত্তির কারণে প্রবঞ্চিত হওয়া, কোন বিষয়ের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য অধিকাংশকে দলীল গণ্য করা, আর কোন বিষয় বাতিল করার জন্য তা অপরিচিত হওয়া ও কম সংখ্যক সম্প্রদায়ের কর্মকে দলীল গণ্য করা। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ নীতির বিপরীতে তাদের নিকট দলীল পেশ করেন। কুরআন বিরোধী এ নীতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন。
ব্যাখ্যা: জাহিলী বিষয় সমূহ: হক্ব প্রমাণের জন্য তারা অধিকাংশের দোহাই দিয়ে থাকে। আর কোন কিছু বাতিল করার জন্য কম সংখ্যকের মাধ্যমে দলীল পেশ করে। অধিকাংশরা যে বিষয়ের উপর বহাল থাকে, সেটাকেই তারা হক্ব মনে করে। কম সংখ্যকরা যার উপর বহাল থাকে, সেটা বিশুদ্ধ মনে করে না। এটাই হলো তাদের হক্ব ও বাতিল বুঝার মাপকাঠি। এটা তাদের ভুল কর্মপদ্ধতি। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ} [الأنعام: ١١٦]
আর যদি তুমি যারা যমীনে আছে তাদের অধিকাংশের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা শুধু ধারণারই অনুসরণ করে এবং তারা শুধু অনুমানই করে (সূরা আল আন'আম ৬:১১৬)। তিনি আরো বলেন, { وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ} [الأعراف: ۱۸۷]
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না (সূরা আল 'আরাফ ৭:১৮৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{وَمَا وَجَدْنَا لِأَكْثَرِهِمْ مِنْ عَهْدٍ وَإِنْ وَجَدْنَا أَكْثَرَهُمْ لَفَاسِقِينَ} [الأعراف: ١٠٢]
আর তাদের অধিকাংশ লোককে আমি অঙ্গীকার রক্ষাকারী পাইনি। বরং তাদের অধিকাংশকে আমি ফাসিক-ই পেয়েছি (সূরা আল 'আরাফ ৭: ১০৬)।
সংখ্যায় কম বা বেশি হওয়া কোন পরিমাপ নয়। বরং হকুই হলো পরিমাপ। যদি একজনও হক্বের উপর বহাল থাকে তাহলে তিনিই সঠিক বলে গণ্য হবেন, তার অনুসরণ করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে অধিকাংশই বাতিলের উপর বহাল থাকলে, তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা ও তাদের প্রবঞ্চনা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। হজ্বের শিক্ষারাই গ্রহণ করা জরুরী। একারণে বিদ্বানগণ বলেন, ব্যক্তির সংখ্যা দ্বারা হক্ব চেনা যায় না, বরং হক্বের মাধ্যমেই ব্যক্তি চেনা যায়। তাই কেউ হজ্বের উপর থাকলে, তার আনুগত্য করা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন জাতির কাহিনী বর্ণনা করে জানিয়ে দেন যে, কম সংখ্যকও কখনো হত্ত্বের উপর বহাল থাকে। তিনি বলেন, {وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ} [هود: ٤٠] আর তার সাথে অল্পসংখ্যকই ঈমান এনেছিল (সূরা হুদ ১১:৪০)।
আর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, عُرِضَتْ عَلَيَّ الْأُمَمُ، فَرَأَيْتُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ الرُّهَيْطُ، وَالنَّبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلَانِ، وَالنَّبِيَّ لَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে উম্মতদের পেশ করা হলে তিনি দেখতে পান, একজন নাবীর সাথে একটি দল, অন্য একজন নাবীর সাথে একজন অথবা দু'জন লোক রয়েছে এবং কোন নাবীর সাথে একজন লোকও নেই।
তাই কোন মতামত বা কথার উপর অধিকাংশের অনুসরণের মাধ্যমে কোন শিক্ষা নেই, বরং হক্ব ও বাতিল নির্ণয়ের মাধ্যমেই শিক্ষা রয়েছে। তাই যদি হক্ব প্রমাণিত হয় এবং ঐ হক্বের উপর অল্প সংখ্যক মানুষ বহাল থাকে অথবা কেউই বহাল না থাকে, যতক্ষণ তা হক্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ঐ হক্বকেই আঁকড়ে ধরতে হবে। কেননা হকুই হলো মুক্তির কারণ। বহু সংখ্যক মানুষের মাধ্যমে বাতিল কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। সুতরাং সর্বদাই হজ্বের মাপকাঠি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, بدأ الإسلام غريباً وسيعود غريباً كما بدأ
অপরিচিত অবস্থায় ইসলামের সূচনা হয় এবং অপরিচিত অবস্থায় তা ফিরে যাবে। মন্দকর্ম, ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) ও ভ্রষ্টতা বৃদ্ধি পেলে তখন অল্পসংখ্যক মানুষ ও কিছু গোত্র ছাড়া কেউ হক্বের উপর বহাল থাকবে না। অল্পসংখ্যকই সমাজে অবস্থান করবে। সমগ্র পৃথিবী যখন কুফরী ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল তখন রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিলে একজন, দু'জন করে তার দাওয়াত গ্রহণ করে, ক্রমান্বয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কুরাইশ ও বেদুঈনসহ পৃথিবীর সবাই ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাই মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। পৃথিবীর অল্প সংখ্যক মানুষই তার অনুসারী হয়। সুতরাং সংখ্যায় বেশি হওয়া শিক্ষণীয় নয়। সঠিক ও হক্ব অর্জনে শিক্ষা নিহিত আছে। তবে হ্যাঁ বেশি সংখ্যক হক্বের উপর বহাল থাকলে তা ভাল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়মানুযায়ী অধিকাংশই বাতিলের অনুসারী হয়ে থাকে, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ} [يوسف: ١٠٣]
আর তুমি আকাঙ্খা করলেও অধিকাংশ মানুষ মুমিন নয় (সূরা ইউসূফ ১২:১০৩)। তিনি আরো বলেন,
{وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ} [الأنعام: ١١٦]
আর যদি তুমি যারা যমীনে আছে তাদের অধিকাংশের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। (সূরা আল আন'আম ৬:১১৬)।
টিকাঃ
২২. ছহীহ মুসলিম হা/২২০।
২৩. জ্বহীহ মুসলিম হা/১৪৬।
📄 দলীলের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে পূর্ববর্তীদের নিয়ম-নীতি-আমলকে দলীল হিসাবে পেশ করা
পূর্ববর্তীদের দলীল গ্রহণ করা সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
{قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى} [طه: ٥١]
ফিরআউন বলল, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী? (সূরা ত্বহা ২০:৫১)। তিনি আরো বলেন,
{مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ} [المؤمنون: ٢٤]
এ কথাতো আমরা আমাদের পূর্বতম পিতৃ-পুরুষদের সময়েও শুনিনি (সূরা মুমিনুন ২৩:২৪)।
ব্যাখ্যা: রসূলগণ জাহিলদের নিকট হক্ক পেশ করলে তাদের পূর্ব-পুরুষদের রীতিকে তারা দলীল হিসাবে পেশ করতো। মুসা আলাইহিস সালাম ফেরআউনকে ঈমানের দাওয়াত দিলে সে পূর্ববর্তীদেরকে দলীল হিসাবে পেশ করেছিল। আল্লাহর বাণী:
{قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى} [طه: ٥١]
ফিরআউন বলল, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী? (সূরা ত্বহা ২০:৫১)। ফেরআউন পূর্ববর্তী যুগের কাফিরদেরকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করতো। এটাই হলো বাতিল ও জাহিলী যুক্তি। নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিলে তারা বলেছিল,
{مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَأَنْزَلَ مَلَائِكَةً مَا سَمِعْنَا بِهَذَا في آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ} [المؤمنون: ٢٤]
এতো তোমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই না। সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায়। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে অবশ্যই ফেরেস্তা নাযিল করতেন। এ কথাতো আমরা আমাদের পূর্বতম পিতৃ-পুরুষদের সময়েও শুনিনি (সূরা মুমিনুন ২৩:২৪)।
তারা আল্লাহর নাবী নূহ আলাইহিস সালাম এর দা'ওয়াতের বিরোধিতা করেছিল এবং পূর্ব পুরুষরা যে রীতির উপর ছিল তা হক্ব বলে প্রমাণ পেশ করতো। তারা মনে করতো নূহ আলাইহিস সালাম যা নিয়ে এসেছেন তা বাতিল। কেননা তা ছিল পূর্ব-পুরুষদের বিরোধী। অপর দিকে কুরাইশ কাফিররা বলতো,
{مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلاقُ} [ص: ٧]
আমরা তো সর্বশেষ ধর্মে এমন কথা শুনিনি। এটা তো বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয় (সূরা জ্বদ ৩৮ঃ ৭)।
অর্থাৎ )مَا سَمِعْنَا هَذَا( তথা আমরা এটা শুনিনি যা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন。
)فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ( তথা শেষ ধর্মে অর্থাৎ তাদের পূর্বপুরুষ ও বাপদাদার ধর্মে। )إنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقُ তথা এটা মিথ্যা। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তারা তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো। কিন্তু কেন? কেননা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রাপ্ত দীন ছিল তাদের পূর্ব-পুরুষ বিরোধী। আর পূর্ব পুরুষদের রীতি ছিল মূর্তি পূজা করা।
তাদের পিতা ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমাস সালাম এর দীনের দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করেনি। বরং তাদের নিকটতম পূর্ব পুরুষদের রীতির দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করেছিল। মক্কার কাফির কুরাইশরা ছিল তাদের বাপদাদা ও পূর্ব পুরুষদের অনুসারী। এটাই ছিল কাফির ও জাহিলদের রীতি। এভাবে পূর্ববর্তী জাতিদেরকে তারা দলীল হিসাবে গ্রহণ করতো।
রসূলগণের সাথে যা ছিল সে ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা বিবেকবানদের উপর আবশ্যক। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ ও পূর্ব পুরুষদের রীতির মাঝে তাদের তুলনা করে দেখা আবশ্যক, যাতে তাদের নিকট বাতিল থেকে হকু স্পষ্ট হয়ে যায়। বিবেকহীনরা নিজেরা বলে,
ما نقبل إلا ما عليه آباؤنا، ولا نقبل ما يخالفه
আমরা পূর্ব পুরুষদের রীতিই গ্রহণ করবো, এর বিপরীত কিছু মেনে নিবো না। এটা অধিকন্তু বিবেকবানদের মর্যাদা পরিপন্থী বিষয়, যারা নিজেদের মুক্তি চায়। বর্তমানে কবরের ইবাদত করা হতে কবর পূজারীদের নিষেধ করা হলে তারা বলে, অমুক দেশে এটার প্রচলন আছে, অমুক গোষ্ঠিী এটা করে ও যুগযুগ ধরে তা পালন করা হয়।
রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম দিন পালন করা থেকে যখন মিলাদপন্থীদের নিষেধ করতঃ বলা হয়, এটা বিদ'আত। তখন তারা বলে, আমাদের পূর্ব থেকেই এর উপর আমল চালু আছে। যদি এটা বাতিলই হতো তাহলে পূর্ববর্তীরা এর উপর আমল করতো না। এটাই হলো জাহিলদের দলীল গ্রহণের স্বরূপ।
মানুষ যা পালন করে তাতে কোন শিক্ষা নেই। বরং রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তাতেই শিক্ষা নিহিত আছে। কেননা মানুষ ভুল ও সঠিক উভয়টি করতে পারে। কিন্তু রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন, তা অকাট্যভাবে সঠিক।
তাই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা আমাদের বাপদাদা ও পূর্ব পুরুষদের উপর নির্ভর করতে বলেন নাই। বাপদাদা ও পূর্ব পুরুষদের রীতি যদি যথেষ্ট হতো, তাহলে রসূলগণের প্রয়োজন হতো না। এরূপভাবে সূফীগণ বলেন, রসূলের আনুগত্য করার চেয়ে আমরা যে অবস্থায় আছি সেটাই যথেষ্ট। আর আমাদের স্বীয় অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। ফলে আমরা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে দীন গ্রহণ করি।
সূফীরা বলে, সুন্নাতের অনুসারীরা মৃতদের কাছ থেকে তাদের দীন গ্রহণ করে, তারা হাদীছের সনদের রাবীগণকে বুঝাতে চায়। আর তাদের কথা হলো আমরা চিরঞ্জীব আল্লাহর কাছ থেকে আমাদের দীন গ্রহণ করি।
তারা বলে, জন সাধারণের জন্য রসূলগণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে বিশেষ ব্যক্তি বর্গের জন্য রসূলের প্রয়োজন নেই। কেননা বিশেষ ব্যক্তিগণ আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেন। তারা বুঝতে পারেন যে, তাদের জন্য রসূলগণ প্রয়োজনহীন। এভাবে শয়তান তাদেরকে বলে, পথ প্রাপ্তদের জন্য রসূলগণের দরকার নেই। কেননা তারা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে দীন গ্রহণ করে। এটাই জাহিলী দীন। অনেক মানুষই এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
📄 শক্তিশালী গোষ্ঠীর রীতিকে হক্ মনে করে তা দলীল হিসাবে গ্রহণ করা
শক্তিশালী গোষ্ঠীর রীতিকে হক্ব মনে করে তা দলীল হিসাবে গ্রহণ করা: যে সম্প্রদায়কে বোধশক্তি, কর্মক্ষমতা, ধনসম্পদ, সম্মান ও রাজত্ব দান করা হয়েছে তার মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করা। আল্লাহ তা'আলা তার বাণীর মাধ্যমে এটা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন,
{وَلَقَدْ مَكَّنَّاهُمْ فِيمَا إِنْ مَكَّنَّاكُمْ فِيهِ} [الأحقاف : ٢৬]
আর আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, তোমাদেরকে তাতে প্রতিষ্ঠিত করি নি (সূরা আহক্বাফ ৪৬: ২৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ} [البقرة:
[৮৯
আর তারা (এর মাধ্যমে) পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল, যা তারা চিনত, তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লা'নত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮-৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
{يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ} [البقرة: ১৪৬]
তারা তাকে চিনে, যেমন চিনে তাদের সন্তানদেরকে (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১৪৬)।
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যাসমূহ: শক্তি, জ্ঞান ও মর্যাদা সম্পন্ন মানুষেরা যে রীতির উপর থাকে, সেটাকে তারা হক্ মনে করে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে। এটাই ছিল তাদের নিকট হক্ব চেনার পদ্ধতি। তারা মানুষের দিকে দৃষ্টি দেয় এবং মনে করে সামর্থবান, সম্পদশালী, বিলাসী ও খ্যাতিমানরাই সঠিক পথে আছে। আর দুর্বল ও গরীবদেরকে তারা বাতিল মনে করে। এটাই হলো জাহিলদের অবস্থা, তাদের এ পদ্ধতি পরিত্যাজ্য।
আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী কাফির জাতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন যে, তারা সম্পদশালী ও শক্তিসম্পন্ন ছিল। কুরআনের অনেক আয়াতের মাধ্যমে তাদের গৌরবের কথা জানা যায়। তারা জ্ঞানবান ও বোধশক্তি সম্পন্নও ছিল। কিন্তু এসব কিছুই তাদের কোন কাজে আসেনি। বরং তারা বাতিলের উপরই ছিল। এ বিষয়টি আল্লাহ তা'আলা অনেক আয়াতেই উল্লেখ করেন। আল্লাহর বাণী:
{وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا أَيُّ الْفَرِيقَيْنِ خَيْرٌ مَقَاماً وَأَحْسَنُ نَدِيّاً} [مريم: ٧٣]
আর যখন তাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে পাঠ করা হয়, তখন কাফিররা ঈমানদারকে বলে, "দুই দলের মধ্যে কোনটি মর্যাদায় শ্রেষ্ঠতর এবং মজলিস হিসাবে উত্তম?” (সূরা মারইয়াম ১৯:৭৩)।
আল্লাহ তা'আলা তাদের ধ্বংস সাধনের ব্যাপারে বলেন,
{وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنْ قَرْنٍ هُمْ أَحْسَنُ أَثَاثاً وَرِئْياً} [مريم : ٧٤]
আর তাদের পূর্বে আমি কত প্রজন্ম ধ্বংস করে দিয়েছি যারা সাজ-সরঞ্জাম ও বাহ্য দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ ছিল! (সূরা মারইয়াম ১৯:৭৪)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَكَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ عَلِيماً قَدِيراً} [فاطر : ٤٤]
আর তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? তাহলে তারা দেখত, কেমন ছিল তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম। অথচ তারাতো শক্তিতে ছিল এদের চেয়েও প্রবল। আল্লাহ তো এমন নন যে, আসমানসমূহ ও যমীনের কোন কিছু তাকে অক্ষম করে দেবে। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান (সূরা ফাতির ৩৫:৪৪)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُمْ مِنْ قَرْنٍ هُمْ أَشَدُّ مِنْهُمْ بَطْشاً} [ق: ٣٦]
আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিয়েছি যারা পাকড়াও করার ক্ষেত্রে এদের তুলনায় ছিল প্রবলতর (সূরা ক্বফ ৫০:৩৬)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِنْ قَرْنٍ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ مَا لَمْ تُمَكِّنْ لَكُمْ وَأَرْسَلْنَا السَّمَاءَ عَلَيْهِمْ مِدْرَارًا وَجَعَلْنَا الْأَنْهَارَ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَأَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قَرْنَاً آخَرِينَ} [الأنعام: ٦]
তারা কি দেখে না আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদেরকে যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের উপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ যা তাদের নীচে প্রবাহিত হত। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদেরকে ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি (সূরা আল আন'আম ৬:৬)।
এ সকল আয়াত ও উদাহরণ সমূহের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ধন-সম্পদ ও শক্তিতে কোন শিক্ষা নেই। কেননা সম্পদশালী ও ক্ষমতাবানরা যখন ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল তখন তাদের এ ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রাচুর্য কোন কাজে আসেনি। আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেন যে, কাফিরদেরকে পাঁকড়াও করার জন্য তিনি এগুলো তাদেরকে দান করেন। আল্লাহর বাণী:
{ فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُبْلِسُونَ فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِينَ ظَلَمُوا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ} [الأنعام: ٤٤، ٤٥]
অতঃপর তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল, তারা যখন তা ভুলে গেল, আমি তাদের উপর সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তাদেরকে যা প্রদান করা হয়েছিল তার কারণে তারা উৎফুল হল, আমি হঠাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। ফলে তখন তারা হতাশ হয়ে গেল। অতএব যালিম সম্প্রদায়ের মূল কেটে ফেলা হল। আর সকল প্রশংসা রাব্বুল আলামীন আল্লাহর জন্য (সূরা আল আন'আম ৬:৪৪-৪৫)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{فَذَرْنِي وَمَنْ يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِنْ حَيْثُ لا يَعْلَمُونَ وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ} [القلم: ٤٤، ٤٥]
অতএব ছেড়ে দাও আমাকে এবং যারা এ বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে। আমি তাদেরকে ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করব যে, তারা জানতে পারবে না। আর আমি তাদেরকে অবকাশ দেব। অবশ্যই আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ (সূরা আল কুলাম ৬৮:৪৪-৪৫)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, { وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِأَنْفُسِهِمْ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمَا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ} [آل عمران: ۱৭৮]
আর যারা কুফরী করেছে তারা যেন মনে না করে যে, আমি তাদের জন্য যে অবকাশ দেই, তা তাদের নিজেদের জন্য উত্তম। আমি তো তাদেরকে অবকাশ দেই যাতে তারা পাপ বৃদ্ধি করে। আর তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক আযাব (সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৮)।
আল্লাহ তা'আলা কাফিরদেরকে প্রাচুর্য, পৃথিবীতে ক্ষমতা, রাজত্ব ও কর্তৃত্ব দান করেছেন। বিভিন্ন জিনিস আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তিনি তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন। যেমন বর্তমান যুগের কাফিররা এসবের উপরই রয়েছে। এটা প্রমাণ করে না যে, তারা হক্বের উপর আছে। এটাও প্রমাণিত নয় যে, আল্লাহ তা'আলা এসব কিছু তাদেরকে দান করে তাদের উপর সন্তুষ্ট।
এটা কাফিরদেরকে পাঁকড়াও করার অবকাশ ও তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার ক্ষেত্র বিশেষ, যাতে তাদের পাপাচারিতা বৃদ্ধি পায়। জাহিলরা এ সবের মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করে থাকে। পক্ষান্তরে বোধ সম্পন্নরা বিভিন্ন জাতি সম্পর্কে চিন্তা করে, তাদের মাঝে হক্বের সন্ধান পাওয়া গেলে তা গ্রহণ করে, যদিও তারা অভাবী হয়। আর কোন গোষ্ঠী প্রাচুর্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাতিল হলে জ্ঞানীরা তা প্রত্যাখ্যান করে। এ বিষয়ে অনেক আয়াত আছে। শাইখ রহিমাহুল্লাহ এখানে কতিপয় আয়াত উল্লেখ করেছেন। যে আয়াতে আদ জাতির ধ্বংসের কথা আছে তা তিনি উল্লেখ করেন। আল্লাহ তা'আলার বাণী: {وَلَقَدْ مَكَّنَّاهُمْ فِيمَا إِنْ مَكَّنَّاكُمْ فِيهِ وَجَعَلْنَا لَهُمْ سَمْعاً وَأَبْصَاراً وَأَفْئِدَةً فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلَا أَبْصَارُهُمْ وَلَا أَفْئِدَكُمْ ... } [الأحقاف: ২৬]
আর আমি অবশ্যই তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম, তোমাদেরকে তাতে প্রতিষ্ঠিত করি নি। আর আমি তাদেরকে কান, চোখ ও হৃদয় দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা যখন আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত তখন তাদের কান, তাদের চোখ ও তাদের হৃদয় সমূহ তাদের কোন উপকারে আসেনি (সূরা আহক্বাফ ৪৬:২৬)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, {أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ} [الفجر: ৬ - [A
তুমি কি দেখনি তোমার রব 'আদ সম্প্রদায়ের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? ইরাম জাতির প্রতি, যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী (সূরা ফাজর ৮৯: ৬-৮)।
রায় বা সিদ্ধান্ত: ইরাম বলতে ইরাম গোত্র অথবা যে শহরে গোত্রটি বসবাস করতো তার নাম ইরমা।
{إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ وَثَمُودَ الَّذِينَ جَابُوا الصَّخْرَ بِالْوَادِ} [الفجر: [৯-৭
ইরাম জাতির প্রতি, যারা ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী। যার সমতুল্য দেশ সমূহে সৃষ্টি করা হয়নি। এবং সামুদ সম্প্রদায়, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে বাড়ি ঘর নির্মাণ করেছিল? (সূরা ফাজর ৮৯:৭-৯)।
গোত্রটি পাহাড় কেটে কারুকাজ করতো ও সেখানে তাদের বাসস্থান নির্মাণ করতো। বর্তমানেও সিরিয়ার পাহাড়ের পাদদেশে তাদের অবস্থান রয়েছে।
{فَتِلْكَ مَسَاكِنُهُمْ لَمْ تُسْكَنْ مِنْ بَعْدِهِمْ إِلَّا قَلِيلًا وَكُنَّا نَحْنُ الْوَارِثِينَ} [القصص: ٥٨]
আর আমি কত জনপদকে ধ্বংস করেছি, যার বাসিন্দারা তাদের জীবন উপকরণ নিয়ে দম্ভ করত। এগুলো তো তাদের বাসস্থান। তাদের পরে (এখানে) সামান্যই বসবাস করা হয়েছে। আর আমি চূড়ান্ত মালিকানার অধিকারী (সূরা ক্বাসাস ২৮: ৫৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا} [النمل: ৫২]
সুতরাং ঐগুলো তাদের বাড়ীঘর, যা তাদের যুল্মের কারণে বিরান হয়ে আছে। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে সে সম্প্রদায়ের জন্য যারা জ্ঞান রাখে (সূরা নামল ২৭:৫২)।
আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে প্রচুর শক্তি দান করেছিলেন অথচ তারা ছিল কাফির। তাদের নিকট নাবীগণ আগমন করলে তাদের শক্তি, প্রাচুর্য ও বিলাসিতার কারণে তারা প্রতারিত হন। তারা রসূলগণের প্রতি অহংকার প্রদর্শন করতো। তাদের শিরকী আমলের উপরই তারা বহাল ছিল এবং তারা হকুকে গ্রহণ করেনি। গোত্রটি নিজেদের শক্তির মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছিল।
আল্লাহ তা'আলা আদ জাতির কথাও উল্লেখ করেন, তাদের শক্তির মাধ্যমে তারাও প্রতারিত হয়েছিল।
{ وَقَالُوا مَنْ أَشَدُّ مِنَّا قُوَّةً أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَهُمْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُمْ قُوَّةً} [فصلت: ١٥]
(আর 'আদ সম্প্রদায়, তারা যমীনে অযথা অহঙ্কার করত এবং) বলত, আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী কে আছে? তবে কি তারা লক্ষ্য করেনি যে, নিশ্চয় আল্লাহ যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? (সূরা ফুসসিলাত ৪১:১৫)।
বনী ইসরাঈল ও ইয়াহুদীদের জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করা হয় এভাবে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে জ্ঞান ও বুঝশক্তি দান করেছিলেন। তারা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলী সম্পর্কে জানতো যে, অচিরেই তিনি প্রেরিত হবেন, যা তাদের তাওরাত ও ইনজিলে বর্ণিত হয়েছে। আর একথাও বর্ণিত হয়েছে, তিনি শেষ নাবী হিসাবে প্রেরিত হবেন এবং তার বিভিন্ন গুণাবলীরও বর্ণনা আছে। মদিনায় আরবের আউস ও খাযরাজ গোত্রের সাথে তাদের যুদ্ধের বর্ণনাও আছে।
{ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا} [البقرة: ٨٩]
আর তারা (এর মাধ্যমে) পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮৯)।
তারা বলতো, শেষ যুগে অচিরেই একজন নাবী প্রেরিত হবেন। আমরা তার অনুসরণ করবো ও তার সাথে তোমাদেরকে হত্যা করবো।
{فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ} [البقرة: ٨٩]
সুতরাং যখন তাদের নিকট এল, যা তারা চিনত, তারা তা অস্বীকার করল (সূরা আল বাক্বারাহ ২:৮-৯)।
অর্থাৎ মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী ইসমাঈল বংশে প্রেরিত হন। ইয়াহুদীরা তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। কারণ বনী ইসরাঈলের মধ্যে থেকে নাবী হোক তারা এটা কামনা করতো। যাতে তারা নিজেদের জন্য তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করতে পারে। ইসমাঈলী বংশে নাবী হওয়ায় রসূল মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি তারা ঈর্ষান্বিত হয়। তারা জানতো যে, তিনি আল্লাহর রসূল। এ সত্ত্বেও তাদের জ্ঞান ও বোধগম্যতা কোন কাজে আসেনি।
মূলতঃ যারা হক্ব বুঝে, তদনুযায়ী আমল করে। আর হক্ব থেকে বিমুখ করে এমন বিষয় হলো: হিংসা, অহংকার ও দুনিয়া প্রীতি অথবা নেতৃত্বের লোভ। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে মানুষ জেনে বুঝে হক্ব থেকে বিরত থাকে। হেদায়াত ও অনুগ্রহ আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। শিক্ষা, জ্ঞান ও বুঝের মাধ্যমে হেদায়াত লাভ হয় না। তাই যে কোন বিষয় আল্লাহ তা'আলার দিকেই অভিমুখী হয়। একারণে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিম্নোক্ত দু'আটি বেশি বেশি পাঠ করতেন, يا مقلب القلوب والأبصار، ثبت قلبي على دينك হে অন্তর ও চক্ষুর পরিবর্তনকারী! তোমার দীনের উপর আমার অন্তরকে অটল রাখো।
শিক্ষা, জ্ঞান, বুঝ ও ফিক্বহ এসবই ভাল উপকরণ, তবে তা যথেষ্ট নয়। মু'মিনের সতর্কতার জন্য এসব তাকে দান করা হয়। যাতে মু'মিন তার জ্ঞান ও বুঝের মাধ্যমে প্রতারিত না হয়। আর সর্বদা হক্বের উপর অটল থাকা ও সঠিক পথের হিদায়াত লাভের জন্য রবের নিকট দু'আ করবে। এমনিভাবে মু'মিন তার শক্তির মাধ্যমেও প্রতারিত হয় না। যেমন বলা হয়ে থাকে, এটা শক্তিশালী রাষ্ট্র, কেউ এর উপর বিজয় লাভ করতে পারবে না। কেননা এ রাষ্ট্র অস্ত্রাদী, ধ্বংসাত্মক গোলাবারুদ ও পারমাণবিক বোমার সমারোহে সমৃদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئاً وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ} [التوبة: ٢٥]
হুনাইনের দিনে যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে (সূরা আত তাওবা ৯:২৫)।
এটা হলো বৃহত্তর বিষয় যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই সচেতন নয়। শক্তি, প্রাচুর্য, খ্যাতি ও অহংকারের মাধ্যমে জাহিলরা যুক্তি দেখিয়ে বলে, এটা উন্নত জাতি, যাতে প্রমাণিত হয় এ জাতি হক্বের উপর আছে। তাদের ধারণা হকু ছাড়া কেউ এ সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না, কেননা তাদের রয়েছে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান। কতিপয় জনসমষ্টি প্রতারিত হয়ে তাদের বিষয়ে এরূপ ধারণাই করে থাকে, অথচ তারা কুফরীর উপর প্রতিষ্ঠিত, সেদিকে তারা দৃষ্টি দেয় না।
টিকাঃ
২৪. ছহীহ তিরমিযী ৩৫৯৬, হাকিম ১৯৭০, ইবনে মাজাহ ১৯৯, ছহীহ জামে ৭৯৮৭-৮৮।
📄 দুর্বলরা যে নীতির উপর রয়েছে, সেটাকে হক্ মনে না করা
দুর্বলরা ছাড়া কেউ বাতিলের অনুসরণ করে না বলে প্রমাণ পেশ করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ} [الشعراء: ১১১]
তারা বলল, 'আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে? (সূরা আশ শু'আরা ২৬:১১১)।
{أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا} [الأنعام: ৫৩]
এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা (দুর্বলদের প্রতি উপস্থাপিত অভিযোগ) প্রত্যাখ্যান করে বলেন,
{أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّاكِرِينَ} [الأنعام: ৫৩]
আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত নয়? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।
ব্যাখ্যা: এটা পূর্ববর্তী মাসআলার বিপরীত। মাসআলাটি ছিল শক্তিশালীরা হক্বের উপর রয়েছে বলে প্রমাণ পেশ করা। আর এ বিষয়কে তারা দুর্বলতাকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করে যে, দুর্বলরা হক্বের উপর নেই। যদি তারা হক্বের উপরই থাকতো তাহলে তারা দুর্বল হতো না। হক্ব ও বাতিল বুঝার জাহিলদের মাপকাঠি এটাই। তারা জানে না যে, শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা আল্লাহ তা'আলার হাতেই আছে। দুর্বলতা সত্ত্বেও দুর্বলরা কখনো হক্বের উপর থাকে এবং শক্তিসম্পন্নরা কখনো বাতিলের উপর থাকে। নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে দাওয়াত দিলে তারা বলে,
{قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ} [الشعراء: ১১১]
তারা বলল, 'আমরা কি তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব, অথচ নিম্নশ্রেণীর লোকেরা তোমাকে অনুসরণ করছে? (সূরা আশ শু'আরা ২৬:১১১)। অর্থাৎ আমাদের মাঝে যারা দুর্বল তারা (অনুসরণ করবে)। আপনি যদি হক্বের উপর থাকতেন তাহলে শক্তিসম্পন্নরা আপনার অনুসরণ করতো। অন্য আয়াতে আছে,
{وَمَا نَرَاكَ اتَّبَعَكَ إِلَّا الَّذِينَ هُمْ أَرَاذِلُنَا بَادِي الرَّأْي}
আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে। (সূরা হুদ ১১:২৭)
অর্থাৎ যাদের কোন রায় বা সিদ্ধান্ত নেই, তারাই আপনার অনুসরণ করে। আর তারা এ ব্যাপারে অন্য কোন চিন্তা-ভাবনা করে না।
অনুরূপভাবে রসূল এর যুগে মুশরিকরা দুর্বল মু'মিনদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো। যেমন বিলাল, সালমান, আম্মার ইবনে ইয়াসার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম ও তার মাতা-পিতা এবং দুর্বল ছাহাবীগণকে তারা উপহাস করতো। তারা বলতো, ঐসব দুর্বলরা আপনার নিকটে থাকার কারণে আমরা আপনার সাথে বসবো না। তাদের মজলিশ ভিন্ন অন্যত্র আমাদের বসার ব্যবস্থা করেন। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জন্য নির্দিষ্ট মজলিশ নির্ধারণ করার ইচ্ছা করলে আল্লাহ তা'আলা ভর্ৎসনা করে বলেন,
{ وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ وَكَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لِيَقُولُوا أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا} [الأنعام: ٥٢، ٥٣]
আর তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে সকাল সন্ধ্যায় ডাকে, তারা তার সন্তুষ্টি চায়। তাদের কোন হিসাব তোমার উপর নেই এবং তোমার কোন হিসাব তাদের উপর নেই, ফলে তুমি তাদেরকে তাড়িয়ে দিবে এবং তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে (সূরা আল আন'আম ৬:৫২-৫৩)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ أَهَؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنْ بَيْنِنَا }
এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? (সূরা আল আন'আম ৬:৫৩)।
ঐ সব লোকেরা অর্থাৎ দুর্বল ছাহাবীরা। কল্যাণ অর্জনে আমাদের চেয়ে অগ্রগামী হওয়া তাদের সম্ভব নয়।
{ لَوْ كَانَ خَيْراً مَا سَبَقُونَا إِلَيْهِ}
যদি এটা ভাল হত তবে তারা আমাদের থেকে অগ্রণী হতে পারত না। (সূরা আহক্বাফ ৪৬:১১)
জাহিলদের মত বর্তমানেও অজ্ঞরা আলিমদেরকে আখ্যা দেয় যে, তাদের কোন রায় (সিদ্ধান্ত) ও চিন্তা ভাবনা নেই, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ, তারা পাথরে পরিণত হয়েছে, তারা জটিলতা সৃষ্টি করে, শেষ পর্যন্ত এভাবেই বলতে থাকে।
শাইখ রহিমাহুল্লাহ যে ঐতিহাসিক বিষয় লিপিবদ্ধ করেছেন তা কেবল সর্তকতার উদ্দেশ্যেই করেছেন। যাতে এ বিষয়সমূহের ব্যাপারে তিনি সতর্ক করতে পারেন। কেননা তা জাহিলী বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। জাহিলরা তো ফাসেক আলেম ও অজ্ঞ ইবাদতকারীদের অনুসরণ করে।