📄 জাহিলীয়্যাহ দ্বারা উদ্দেশ্য
)الجاهلية( আল-জাহিলিয়্যাহ শব্দটি )الجهل) আল-জাহল থেকে এসেছে। জাহল অর্থ হলো জ্ঞানহীনতা, জ্ঞানশূন্যতা। আর জাহিলিয়্যাহ বলা হয় সেই সময়কে, যখন কোন রসূল ও কিতাব ছিল না। এখানে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বের অবস্থাকে জাহিলিয়্যাহ বলা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى﴾ [الأحزاب: ٣٣]
তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না (সূরা আল আহযাব ৩৩:৩৩)।
এখানে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বের অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে। কেননা তখন গোটা মানবজাতি ভ্রষ্টতা, কুফরী ও নাস্তিকতায় ডুবে ছিল। কারণ কুরআনের পূর্বের রিসালাত বা আসমানী কিতাব নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। ইয়াহূদীরা তাদের কিতাব তাওরাতকে বিকৃত করে। তারা তাতে অনেক কুফরী, ভ্রষ্টতা ও নোংরা কথা সংযোজন করে। এমনিভাবে খ্রিষ্টানরাও ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর ইনজিল নাযিল হওয়ার সময় তা যে অবস্থায় ছিল, সে অবস্থা থেকে পরিবর্তন করে। ইনজিল পরিবর্তনকারী ব্যক্তির নাম )بلس( বালাস/বুলাস অথবা )شاول( শাবিল। সে ছিল ইয়াহূদী এবং নাবী ঈসা আলাইহিস সালাম এর প্রতি বিদ্বেষী। এ লোক ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ঈসা আলাইহিস সালাম এর দীনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সে ঈসা আলাইহিস সালাম এর উপর ঈমান আনার ভাব দেখায়। সে প্রকাশ করে যে, সে ঈসা আলাইহিস সালাম এর সাথে পূর্ব শত্রুতার জন্য অনুতপ্ত। তার দাবী অনুযায়ী সে একটি স্বপ্ন দেখার পর ঈসা আলাইহিস সালাম এর উপর ঈমান আনে। খ্রিষ্টানরা তার কথাকে সত্যায়ন করল। অতঃপর সে ঈসা আলাইহিস সালাম এর উপর অবতীর্ণ ইনজিল নিল। তারপর সে ইনজিল কিতাবে পৌত্তলিকতা, শিরক ও কুফরী ঢুকিয়ে দেয়। এমনকি তাতে ত্রিত্ববাদও উল্লেখ করে অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা তিন উপাস্যের একজন (না'ঊযুবিল্লাহ)। আর ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর পুত্র অথবা তিনি আল্লাহ (নাউযুবিল্লাহ)। সে তাতে ক্রুশের ইবাদতের বিষয়টি প্রবেশ করায়। এছাড়া আরো অন্যান্য ঘৃণ্য কুফরী সে তাতে প্রবেশ করায়। আর খ্রিষ্টানরা তাকে আলিম এবং ইনজীলে বিশ্বাসী মনে করে এসব ব্যাপারে তার কথার সত্যায়ন করে। তাদের দাবি অনুযায়ী, তারা তাকে বালাস অথবা ঈসা আলাইহিস সালাম এর দূত (রসূল) বলে গণ্য করে। ঈসা আলাইহিস সালাম এর দীনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়াই তার লক্ষ্য ছিল। তার ইচ্ছা পূরণ হয়। পৌত্তলিকতা, ত্রিত্ববাদ এবং ঈসা আলাইহিস সালাম কে আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করার আক্বীদা অথবা তিনি তিন জনের একজন, এসবের মাধ্যমে সে ঈসা আলাইহিস সালাম এর দীনকে নষ্ট করে। সে তাতে অনেক পৌত্তলিকতার অনুপ্রবেশ ঘটায় এবং খ্রিষ্টানরাও তাকে মেনে নেয়। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হওয়ার পূর্বে এটা ছিল আহলে কিতাবদের অবস্থা। তবে তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক সঠিক দীনের উপর ছিল। তাদের অধিকাংশই কুফরী ও আল্লাহর দীনের পরিবর্তনের উপর ছিল।
আরবরা দু'ভাগে বিভক্ত:
(১) পূর্ববর্তী দীনের অনুসারী। যেমন-ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও অগ্নিপূজক (২) একনিষ্ঠ দীনে বিশ্বাসী। ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমাস সালাম এর দীনে বিশ্বাসীরা। বিশেষত হিজায ও মক্কা অঞ্চলে।
তাদের মাঝে একজন লোক ছিল, তার নাম আমর ইবনু লুহাই আল-খুযাঈ। তিনি হিজাযের শাসক ছিলেন। তিনি ইবাদত, ন্যায়নিষ্ঠতা ও যথাযথ ধার্মিকতা প্রকাশ করতো। তিনি চিকিৎসার জন্য সিরিয়া গমন করেন। সেখানে সিরিয়াবাসীকে মূর্তিপূজায় লিপ্ত দেখে তা ভাল মনে করেন। এ কারণে চিকিৎসা শেষে সিরিয়া থেকে কিছু মূর্তি নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি ঐসব মূর্তি খুঁজতে থাকেন, যা নুহ আলাইহিস সালাম এর যুগের পর ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশে যায়।
মূর্তিগুলো হলো: ওয়াদ, সূয়া, ইয়াগূস, ইয়াউক্ব, নাসর ইত্যাদি। তুফানে মূর্তিগুলো ভেঙ্গে যায়। তারপর শয়তান এসে ঐ সব মূর্তির জায়গাসমূহ দেখিয়ে দেয়। এরপর সে মূর্তি খুঁজে বের করে। তারপর আরবের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে মূর্তিগুলো বণ্টন করে দেয় এবং সেগুলোর ইবাদতের আদেশ করে। আরববাসীরা তার নিকট থেকে মূর্তিগুলো গ্রহণ করে। এভাবে হিজায ও আরবের অন্যান্য এলাকায় শিরকের বিস্তার ঘটে। তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর দীনকে পরিবর্তন করে। আর তারা ঐ সব মূর্তিগুলোর নামে চতুষ্পদ জন্তু ছেড়ে দেয়।
এজন্য নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমরকে জাহান্নামে হাড় টানাটানি করতে দেখেন অর্থাৎ সে তার নাড়িভূড়ি টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে মানুষ স্পষ্ট ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল। কিতাবধারী, উম্মি (নিরক্ষর) ও অন্যান্য সবাই পথভ্রষ্ট ছিল। তবে কতিপয় আহলে কিতাব সঠিক দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তারা নবুওয়াতের পূর্বে শেষ হয়েছে। ফলে, যমীনে অন্ধকার ভরে যায়। হাদীছে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীবাসীর প্রতি দৃষ্টি ফিরালেন। অতঃপর আরব-অনারব সবার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করলেন অর্থাৎ ক্রোধ দেখালেন। তবে কতিপয় আহলে কিতাব ব্যতীত।
এই ঘোর অমানিশা, চূড়ান্ত জাহিলিয়্যাত, পথহারা পরিবেশ এবং আসমানী রিসালাত ও কিতাবের অনুপস্থিতিতে মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তা'আলা নাবী মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولاً مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ} [آل عمران: ١٦٤]
অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকুমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৬৪)।
তারা পূর্বে স্পষ্ট ভ্রষ্টতায় ছিল অর্থাৎ নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ভ্রষ্ট ছিল
পূর্বে জাহিলিয়্যাহ (الجاهلية) শব্দের বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, এটি (الجهل) থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো জ্ঞানশূন্যতা, মূর্খতা। আর যা কিছু জাহিলিয়্যাতের দিকে সম্বন্ধিত, তা-ই নিন্দনীয়। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى
তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না (সূরা আল আহযাব ৩৩:৩৩)।
আল্লাহ তা'আলা নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রীদেরকে সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেন। এখানে সৌন্দর্য প্রকাশের অর্থ হলো, হাট-বাজার ও মানুষের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা। কেননা, জাহিলী যুগের মহিলারা সৌন্দর্য প্রকাশ করতো; বরং গোপন অঙ্গও প্রকাশ করে দিতো। যেমন-কাবা তাওয়াফের সময়ও মহিলারা অহংকারবশত সৌন্দর্য প্রকাশ করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِذْ جَعَلَ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي قُلُوبِهِمُ الْحَمِيَّةَ حَمِيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ} [الفتح: ٢٦] যখন কাফিররা তাদের অন্তরে আত্ম-অহমিকা পোষণ করেছিল, জাহেলী যুগের আহমিকা (সূরা আল ফাতাহ ৪৮:২৬)।
এখানে নিন্দা অর্থে এটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ জাহিলী অহমিকা প্রদর্শন নিকৃষ্ট কাজের অন্তর্ভুক্ত। কোন এক যুদ্ধে আনসার ও মুহাজির দু'জন লোকের মাঝে দ্বন্দ্ব হয়। তারা উভয়ে নিজ নিজ গোত্রের লোকদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকতে থাকেন। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ পেয়ে তাদেরকে বললেন, "أبدعوى الجاهلية وأنا بين أظهركم؟! دعوها فإنها منتنة" 'তোমরা কি জাহিলদের মত ডাকাডাকি শুরু করেছ? অথচ আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান। এ ধরণের হাঁকডাক ছেড়ে দাও, কেননা তা নিকৃষ্ট কাজ।
অর্থাৎ গোত্র নিয়ে দ্বন্দ্ব খারাপ কাজ। মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। আনসার ও মুহাজিরের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। বিভিন্ন গোত্রের মাঝেও কোন পার্থক্য নেই। বিশ্বাসগতভাবে তারা ভাই ভাই এবং একটি দেহ ও নির্মিত ভবনের মত, যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরস্পর সম্পৃক্ত। মুসলিমদের উপর আবশ্যক হলো, আরব ও অনারব এবং বিভিন্ন বর্ণ গোত্রের মাঝে তাক্বওয়া (আল্লাহ ভীরুতা) ছাড়া পার্থক্য সৃষ্টি না করা। যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন, {إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ} [الحجرات: ١٣] আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন (সূরা আল হুজরাত ৪৯:১৩)। তিনি আরো বলেন, {إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ} [الحجرات: ١٠] নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও (সূরা আল হুজরাত ৪৯:১০)। অতএব, বংশ ও গোত্রের অহমিকা জাহিলী কাজ। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية 'যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলো, অথচ তার কাঁধে আনুগত্যের বাই'আত নেই, সে জাহিলিয়্যাতের উপর মৃত্যুবরণ করলো'।
কারণ, জাহিল জাতি হলো নৈরাজ্যবাদী। তারা কোন আমীর-শাসক বা সুলতান- সম্রাটকে পরোয়া করে না। এ হলো জাহিলীদের অবস্থা।
সারকথা হলো, জাহিলী সব কর্মকাণ্ড নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয়। জাহিলদের মতো কর্মকাণ্ড করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পর জাহিলী যুগের সমাপ্তি হয়। নবুওয়াতের পর সাধারণ জাহিলিয়্যাতের অবসান হয়। মানুষের মাঝে দীনের জ্ঞান চর্চা ও ঈমান ফিরে আসে। কুরআন-সুন্নাহ নাযিল হয়, জ্ঞানচর্চা চলতে থাকে। ফলে জাহিলিয়্যাত তথা অজ্ঞতা দূরীভূত হয়। কেননা যতক্ষণ কুরআন, হাদীছ এবং বিদ্বানদের কথা চর্চা হয়, ততক্ষণ জাহিলিয়্যাত থাকতে পারে না। ঐ সময় সাধারণ জাহিলিয়্যাতের অবসান হয়। তবে কিছু মানুষ অথবা গোত্র অথবা কিছু অঞ্চলে জাহিলিয়্যাত থাকতে পারে অর্থাৎ আংশিক জাহিলিয়্যাত থাকতে পারে।
এক ব্যক্তি তার ভাইকে 'হে কালোর বেটা!' বলে গালমন্দ করছিলেন, তখন নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন,
أعيرته بأمه؟ إنك امرؤ فيك جاهلية 'তুমি কি তার মায়ের নাম ধরে গালি দিলে? তুমিতো এমন লোক, যার মাঝে এখনও জাহিলিয়্যাত আছে'।
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: أربع في أمتي من أمور الجاهلية لا يتركونهن الطعن في الأنساب، والفخر بالأحساب، والنياحة على الميت، والاستسقاء بالنجوم
আমার উম্মাতের মাঝে চারটি জাহিলিয়্যাতের রীতি চালু থাকবে, যা তারা পরিত্যাগ করবে না: গোত্রের গৌরব করা। বংশ মর্যাদার খোঁটা দেয়া। মৃতের জন্য কান্না- বিলাপ করা। তারকারাজীর মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা'।
হাদীছটি প্রমাণ করে, কিছু মানুষের মাঝে এ নিকৃষ্ট জাহিলী রীতি চালু থাকবে। তবে এসবের মাধ্যমে তারা কাফির হবে না। আল্লাহর রহমতে সাধারণ জাহিলিয়্যাত দূরীভূত হয়েছে। এ জন্য বলা বৈধ নয় যে, মানুষ জাহিলিয়্যাতের মধ্যে আছে অথবা জাহিলী জগত। কেননা এভাবে বলা রিসালাত ও কুরআন-সুন্নাহকে অস্বীকার করার অন্তর্ভুক্ত। তাই এটা বলা বৈধ নয়।
বরং এভাবে বলতে হবে যে, কিছু মানুষের মাঝে জাহিলিয়্যাত আছে অথবা কিছু ব্যক্তি জাহিলী স্বভাবের। অথবা জাহিলী স্বভাবের কিছু অংশ বিদ্যমান। এভাবে বললে নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াত লাভের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের মাঝে পার্থক্য সূচিত হবে।
কিছু মানুষ বলতে পারে, জাহিলিয়্যাত যেহেতু শেষ হয়েছে, তাহলে জাহিলী বিষয়সমূহ আলোচনার প্রয়োজন কি? আমরা তো মুসলিম। প্রশংসা আল্লাহরই।
জবাব হলো, জাহিলী সমস্যা থেকে বেঁচে থাকা। এ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করে মানুষ সতর্ক হবে। তা না হলে মানুষ বুঝবে না। তখন সে তাতে জড়িয়ে যেতে পারে। জাহিলী কর্ম থেকে সতর্ক ও বিরত থাকার জন্য এ সম্পর্কে আলোচনা ও গবেষণা হওয়া দরকার।
কবি বলেন: আমি জেনেছি মন্দ, প্রয়োগের জন্য নয়, যেন তাতে সদা সতর্কতা রয়, যে জানেনি তাহা, ডুবে রবে সেথায়।
জাহিলী সমস্যা সম্পর্কে জানার এটি প্রথম দিক। আর দ্বিতীয় দিক হলো যখন জাহিলিয়্যাত সম্পর্কে জ্ঞানার্জন হবে তখন ইসলামের মর্যাদা বুঝা যাবে।
কবি বলেন: মন্দের বিপরীতে ভাল প্রকাশ পায়। বিপরীতমুখী বিষয় দ্বারা অনেক কিছু জানা যায়। উমার ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: يوشك أن تنقض عرى الإسلام عروة عروة، إذا نشأ في الإسلام من لا يعرف الجاهلية 'ইসলামের রশি একটা একটা করে ছিড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তখনই, যখন কেউ ইসলামের ছায়ায় বড় হয়েও জাহিলিয়্যাত সম্পর্কে জানবে না'। সুতরাং জাহিলী বিষয়ে মানুষ অজ্ঞ হলে জাহিলী কর্মে লিপ্ত হতে পারে। কেননা শয়তান জাহিলী কর্ম ভুলে যায়নি এবং সে অসচেতনও নয়, বরং সে জাহিলী কাজ কর্মের দিকেই মানুষকে ডাকে।
শয়তান ও তার অনুসারীরা ভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারী, জাহিলী কর্ম উজ্জীবিত করা, শিরক, বিদ'আত, কুসংস্কার ও প্রাচীনত্বের দিকে তারা ডাকতেই থাকে। এসবের উদ্দেশ্য হলো: ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা ও মানুষকে জাহিলিয়্যাতের দিকে ডাকা। সুতরাং জাহিলিয়্যাত থেকে বিরত ও দূরে থাকার জন্য এ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানার্জন আবশ্যক।
শাইখ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাত্মক জাহিলিয়্যাত হচ্ছে, অন্তরে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর নাযিলকৃত ওহীর প্রতি বিশ্বাস না রাখা'। কেননা জাহিলরা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং তাকে বিশ্বাস করে না। আর তারা আল্লাহ তা'আলার পথ নির্দেশনা গ্রহণ করে না, যা তিনি নিয়ে এসেছেন। শাইখ রহিমাহুল্লাহ বলেন: 'এর সাথে যদি জাহিলরা যে নীতি অবলম্বন করতো, তা যুক্ত হয়, তাহলে ক্ষতি পূর্ণতা লাভ করবে'। অর্থাৎ প্রকাশ্য ও গোপনে ফাসাদ (বিশৃঙ্খলা) ছড়িয়ে পড়বে।
গোপন ফাসাদ হচ্ছে নাবী জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি বিশ্বাস না থাকা। আর প্রকাশ্য ফাসাদ হচ্ছে জাহিলী বিষয়সমূহকে ভাল মনে করে পালন করা। এভাবে প্রকাশ্য ও গোপন বিষয় ধ্বংস হলে তখন ক্ষতি পূর্ণতা পায়। আমরা এ থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
এটাই হলো জাহিলিয়্যাত সম্পর্কে না জানার কুফল। সুতরাং জাহিলরা যেসব কুনীতির উপর ছিল, তাকে ভাল মনে করা বৈধ নয়। বরং আবশ্যক হলো, এটাকে অস্বীকার করা ও তা জঘন্য মনে করা। সেজন্য, যারা জাহিলী কর্মকে ভাল মনে করে, তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে শাইখের দলীল:
{وَالَّذِينَ آمَنُوا بِالْبَاطِلِ وَكَفَرُوا بِاللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ} [العنكبوت: ٥২]
যারা বাতিলে বিশ্বাস করে ও আল্লাহকে অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত (সূরা আল আনকাবূত ২৯:৫২)।
বাতিলের প্রতি ঈমান এনেছে অর্থাৎ বাতিলকে বিশ্বাস করেছে। বাতিল হলো হক্বের বিপরীত। কোন বিষয় হজ্বের বিরোধী হলে তা বাতিল বলে গণ্য। বাতিল হলো উদ্ভুত ধ্বংসশীল বিষয়, যাতে কোন উপকার নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{فَمَاذَا بَعْدَ الْحَقِّ إِلَّا الضَّلَالُ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ} [يونس: ৩২]
অতঃপর সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া কী থাকে? অতএব কোথায় তোমাদেরকে ফেরানো হচ্ছে? (সূরা ইউনূস ১০:৩২)।
টিকাঃ
১. জ্বহীহ: মুসনাদে আহমাদ ১৭৪৮৪।
২. জ্বহীহ বুখারী ৩৫১৮, ৪৯০৫; মুসলিম ২৫৮৪।
৩. ছহীহ মুসলিম ১৮৫০।
৪. জ্বহীহ বুখারী ৩০, ২৫৪৫, ৬০৫০।
৫. জ্বহীহ বুখারী, জ্বহীহ মুসলিম হা/৯৩৪।
📄 তাক্বলীদ (অন্ধ অনুকরণ) ক্ষতিকর
কতিপয় মূলনীতির উপর জাহিলদের দীনের ভিত্তি গঠিত। বৃহৎ ভিত্তি হলো অন্ধ অনুসরণ করা। পূর্বাপর সব কাফিরের জন্য এটাই বৃহৎ মূলনীতি。
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{ وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ} [الزخرف: ٢٣]
আর এভাবেই তোমাদের পূর্বে যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী পাঠিয়েছি, তখনই সেখানকার বিলাসপ্রিয়রা বলেছে, নিশ্চয় আমরা তো আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে এক মতাদর্শের ওপর পেয়েছি তাই আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি (সূরা আয যুখরুফ ৪৩:২৩)। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ} [لقمان: ۲۱]
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ কর' তখন তারা বলে, বরং আমরা তার অনুসরণ করব যার ওপর আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে পেয়েছি।' শয়তান তাদেরকে প্রজ্বলিত আযাবের দিকে আহবান করলেও কি (তারা পিতৃপুরুষদেরকে অনুসরণ করবে)? (সূরা লুক্বমান ৩১:২১)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{ قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا مَا بِصَاحِبِكُمْ مِنْ جِنَّةِ ...} [سبأ: ٤٦] الآية
বল, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি; তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু'জন অথবা এক একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, অতঃপর চিন্তা করে দেখ, তোমাদের সাথীর মধ্যে কোন পাগলামী নেই। সে তো আসন্ন কঠোর আযাব সম্পর্কে তোমাদের একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নয়' (সূরা সাবা ৩৪:৬৪)।
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, وقوله: {اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ} [الأعراف: ٣]
তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ হতে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর (সূরা আল 'আরাফ ৭:৩)।
ব্যাখ্যা: জাহিলী সমস্যা সমূহ: রসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন তা দিয়ে জাহিলরা দীনের ভিত্তি গঠন করে না। বরং তারা নিজেদের উদ্ভাবিত মূলনীতির মাধ্যমে তারা দীনের ভিত্তি গঠন করে। এ থেকে তারা ফিরেও আসে না। জাহিলী সমস্যার মধ্যে একটি হলো: ]التقليد[ অন্ধ অনুসরণ করা। তা জাহিলদের পরস্পরের মাঝে কতিপয়ের অনুকরণ করা বুঝায়। যদিও অনুসৃত ব্যক্তিরা আদর্শবান নয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, { وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ} [الزخرف: ٢٣]
আর এভাবেই তোমাদের পূর্বে যখনই আমি কোন জনপদে সতর্ককারী পাঠিয়েছি, তখনই সেখানকার বিলাসপ্রিয়রা বলেছে, নিশ্চয় আমরা তো আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে এক মতাদর্শের ওপর পেয়েছি তাই আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি (সূরা আয যুখরুফ ৪৩:২৩)।
বিলাসীরা অধিকাংশই স্বাচ্ছন্দ্যময়ী ও সম্পদশালী। কেননা তারা মন্দ প্রকৃতির লোক ও হক্ব গ্রহণ করা থেকে বিমুখ। এটা দুর্বল ও দরিদ্রদের বিপরীত যাদের অধিকাংশই বিনয়ী ও হক্ব গ্রহণকারী। বিলাসীরা হলো খ্যাতি সম্পন্ন ও ঐশ্বর্যশালী。
আল্লাহর বাণী: )إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا( অর্থাৎ জাহিলদের মাঝে সম্পদশালী ও প্রভাবসম্পন্ন লোক রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার বাণী: {إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ} [الزخرف: ٢٣]
নিশ্চয় আমরা তো আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে এক মতাদর্শের ওপর পেয়েছি (সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩)।
অর্থাৎ জাহিলরা তাদের পূর্ব পুরুষদের আদর্শ ও দীনের অনুসারী। তারা রসূলগণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলে। তাদের ধারণা এটা রসূলগণের আনুগত্য থেকে তাদেরকে বিরত রাখবে। এটা التقليد الأعمى আত-তাক্বলিদুল'আমা বা অন্ধ অনুসরণ এবং أمور الجاهلية উমুরুল জাহিলীয়া বা জাহিলী কর্ম। ভালকাজের অনুকরণ করার নাম ]اتباعاً واقتداء[ ইত্তেবা ও ইক্বতেদা তথা অনুসরণ ও অনুকরণ। আল্লাহ তা'আলা ইউসূফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন,
{ وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ مَا كَانَ لَنَا أَنْ نُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ} [يوسف: [٣٨
আর আমি অনুসরণ করেছি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্ম। আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা আমাদের জন্য সঙ্গত নয় (সূরা ইউসূফ ১২:৩৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ} [٩:١٠٠]
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী ও প্রথম এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে (সূরা আত তাওবা ৯:১০০)। জাহিলদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئاً وَلَا يَهْتَدُونَ} [البقرة: ١٧٠]
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা অনুসরণ কর, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তারা বলে, বরং আমরা অনুসরণ করব আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে যার উপর পেয়েছি। যদি তাদের পিতৃ-পুরুষরা কিছু না বুঝে এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত না হয়, তাহলেও কি? (সূরা আল বাক্বারাহ ২:১৭০)।
যে বিবেক দ্বারা বুঝে না ও সৎ পথে পরিচালিত হয় না, তার কোন আদর্শ নেই। বিবেকসম্পন্ন ও সৎপথে পরিচালিত ব্যক্তির মাঝে আদর্শ রয়েছে। আর অন্ধ অনুসরণ জাহিলী কর্ম। এটার নাম পক্ষপাতিত্ব। কেননা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারীরা একমাত্র আদর্শ। অতঃপর শাইখ রহিমাহুল্লাহ আল্লাহর বাণী উল্লেখ করেন:
{وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ} [لقمان: ٢١]
আর যখন তাদেরকে বলা হয়, 'আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তোমরা তার অনুসরণ কর' তখন তারা বলে, বরং আমরা তার অনুসরণ করব যার ওপর আমাদের পিতৃ-পুরুষদেরকে পেয়েছি।' শয়তান তাদেরকে প্রজ্বলিত আযাবের দিকে আহবান করলেও কি (তারা পিত-পুরুষদেরকে অনুসরণ করবে)? (সূরা লুক্বমান ৩১:২১)
আর কাফির ও মুশরিকদের যখন বলা হয়, (اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ الله) অর্থাৎ আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তথা আল-কুরআনের অনুসরণ করো।
قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ
অর্থাৎ শয়তান ঐ সব পূর্বপুরুষকে (শান্তির দিকে) ডাকে। (إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ) তথা তোমরা কি সাঈর নামক জাহান্নামের জন্য তাদের অনুসরণ করছো? অর্থাৎ তোমাদের পূর্ব পুরুষরা শয়তানের অনুসারী হলে ও সাঈর নামক জাহান্নামের দিকে ডাকলে তবুও কি তোমরা তাদের অনুকরণ করবে?
এ বিষয়ে বিবেক দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা আবশ্যক যে, কার অনুসরণ করা হচ্ছে। অতঃপর শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রসূল জ্বালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিলদের নিকট আল্লাহ তা'আলার এ বাণী নিয়ে আসেন।
{قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا مَا بِصَاحِبِكُمْ مِنْ جِنَّةِ} [سبأ: ٤٦]
বল, 'আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি; তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু'জন অথবা এক একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, অতঃপর চিন্তা করে দেখ, তোমাদের সাথীর মধ্যে কোন পাগলামী নেই। সে তো আসন্ন কঠোর আযাব সম্পর্কে তোমাদের একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নয়' (সূরা সাবা ৩৪:৪৬)।
তিনি আরো বলেন,
{اتَّبِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيلاً مَا تَذَكَّرُونَ} [الأعراف: 3]
তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ হতে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর (সূরা আল 'আরাফ ৭:৩)।
রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকট এ আয়াত নিয়ে আসলে তারা বলে, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের রীতি আঁকড়ে ধরবো। এ ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মাদ এর আনুগত্য করবো না। আল্লাহ তা'আলার কথা হলো, এ ব্যক্তি তোমাদেরকে যা বলে সে বিষয়ে তোমরা ভেবে দেখ ও চিন্তা-ভাবনা করো। তোমরা যেন কোন পক্ষ পাতিত্ব না করো। আল্লাহ তা'আলার বাণী:
{أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى} [ (سبأ: ٤٦]
তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দু'জন অথবা এক একজন করে দাঁড়িয়ে যাও (সূরা সাবা ৩৪:৪৬)।
মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার দিকে কোন বিষয়ে তোমাদের কোন ব্যক্তি বা দলকে ডাকলে তোমরা সে ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখবে। যদি সে হক্বের দিকে তোমাদেরকে ডাকে, তাহলে তার অনুসরণ করা তোমাদের উপর ওয়াজীব। আর পূর্ব পুরুষ ও বাপদাদার রীতির উপর বহাল থাকা তোমাদের জন্য বৈধ নয়।
আল্লাহর কথা }أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ{ আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অর্থাৎ কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ ও পক্ষপাতিত্ব করবে না। বরং আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তোমরা হক্ব গ্রহণে আগ্রহী হবে }مَثْنَى وَفُرَادَى{ দু'জন দু'জন বা একজন করে। অর্থাৎ দু'জন দু'জন করে চিন্তাভাবনা করবে, জামা'আতবদ্ধ হবে, সমবেত হবে। কেননা সমবেত হয়ে অথবা জামা'আতবদ্ধ থেকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হক্বের নিকট পৌঁছানো সহজ হয়।
অথবা রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন সে ব্যাপারে এককভাবে নিজে নিজে চিন্তা-ভাবনা করলে অবশ্যই হক্ব পাবে, যার আনুগত্য করা আবশ্যক | }ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا مَا بِصَاحِبِكُمْ{ অর্থাৎ মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার ব্যাপারে তোমরা বলে থাকো যে, সে উন্মাদ অথচ সে উন্মাদ নয়। বরং তিনি মানুষের মধ্যে অধিক বিবেক সম্পন্ন ও সৃষ্টির মাঝে অধিক বুদ্ধিমত্তা, উপদেশ দাতা ও অধিক জ্ঞানী হিসাবে বিবেচিত। এ সত্ত্বেও তোমরা তাকে কিভাবে উন্মাদ বলো? তার বিবেক সম্পর্কে ভেবে দেখো ও চিন্তা-ভাবনা করো। তার আচরণাদী সম্পর্কে চিন্তা করো, তিনি কি উন্মাদের মতো আচরণ করেন?
{مَا بِصَاحِبِكُمْ مِنْ جِنَّةٍ إِنْ هُوَ إِلَّا نَذِيرٌ لَكُمْ بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ} [سبأ: ٤٦]
তোমাদের সাথীর মধ্যে কোন পাগলামী নেই। সে তো আসন্ন কঠোর আযাব সম্পর্কে তোমাদের একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নয় (সূরা সাবা ৩৪:৪৬)।
যদি তার প্রতি ঈমান না আনো ও তাকে অনুসরণ না করো, তবে তোমাদের জন্য অচিরেই কঠিন শাস্তি নির্ধারিত হবে। তিনি তোমাদের উপদেশ দাতা হিসাবে আগমন করেছেন, তিনি তোমাদের কল্যাণ ও মুক্তি চান। তিনি তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল ও সফলতা কামনা করেন।
কোন রকম চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা ছাড়াই তোমরা কিভাবে তার দিকে উন্মাদ কথাটি সম্বোধন করো অথচ তিনি কুরআন নিয়ে এসেছেন? মানুষ যা বলে তা নিয়ে প্রত্যেক বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তির চিন্তা-ভাবনা করা আবশ্যক। যাতে বিশুদ্ধ কথার পার্থক্য বুঝা যায় ও সঠিকতার মাধ্যমে ভুল নির্ণয় করা যায়। অতঃপর সঠিক বিষয় গ্রহণপূর্বক ভুল প্রত্যাখ্যান করা হয়। ফলে বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি অন্ধ অনুকরণ বশতঃ বাতিলের উপর টিকে থাকবে না。
📄 দলীলের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে অধিকাংশের নিয়ম-নীতি-আমলকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করা
তাদের বৃহৎ কর্মপদ্ধতি: অধিকাংশের উপর ভিত্তির কারণে প্রবঞ্চিত হওয়া, কোন বিষয়ের বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য অধিকাংশকে দলীল গণ্য করা, আর কোন বিষয় বাতিল করার জন্য তা অপরিচিত হওয়া ও কম সংখ্যক সম্প্রদায়ের কর্মকে দলীল গণ্য করা। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ নীতির বিপরীতে তাদের নিকট দলীল পেশ করেন। কুরআন বিরোধী এ নীতির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন。
ব্যাখ্যা: জাহিলী বিষয় সমূহ: হক্ব প্রমাণের জন্য তারা অধিকাংশের দোহাই দিয়ে থাকে। আর কোন কিছু বাতিল করার জন্য কম সংখ্যকের মাধ্যমে দলীল পেশ করে। অধিকাংশরা যে বিষয়ের উপর বহাল থাকে, সেটাকেই তারা হক্ব মনে করে। কম সংখ্যকরা যার উপর বহাল থাকে, সেটা বিশুদ্ধ মনে করে না। এটাই হলো তাদের হক্ব ও বাতিল বুঝার মাপকাঠি। এটা তাদের ভুল কর্মপদ্ধতি। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَخْرُصُونَ} [الأنعام: ١١٦]
আর যদি তুমি যারা যমীনে আছে তাদের অধিকাংশের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা শুধু ধারণারই অনুসরণ করে এবং তারা শুধু অনুমানই করে (সূরা আল আন'আম ৬:১১৬)। তিনি আরো বলেন, { وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لا يَعْلَمُونَ} [الأعراف: ۱۸۷]
কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না (সূরা আল 'আরাফ ৭:১৮৭)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন,
{وَمَا وَجَدْنَا لِأَكْثَرِهِمْ مِنْ عَهْدٍ وَإِنْ وَجَدْنَا أَكْثَرَهُمْ لَفَاسِقِينَ} [الأعراف: ١٠٢]
আর তাদের অধিকাংশ লোককে আমি অঙ্গীকার রক্ষাকারী পাইনি। বরং তাদের অধিকাংশকে আমি ফাসিক-ই পেয়েছি (সূরা আল 'আরাফ ৭: ১০৬)।
সংখ্যায় কম বা বেশি হওয়া কোন পরিমাপ নয়। বরং হকুই হলো পরিমাপ। যদি একজনও হক্বের উপর বহাল থাকে তাহলে তিনিই সঠিক বলে গণ্য হবেন, তার অনুসরণ করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে অধিকাংশই বাতিলের উপর বহাল থাকলে, তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা ও তাদের প্রবঞ্চনা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। হজ্বের শিক্ষারাই গ্রহণ করা জরুরী। একারণে বিদ্বানগণ বলেন, ব্যক্তির সংখ্যা দ্বারা হক্ব চেনা যায় না, বরং হক্বের মাধ্যমেই ব্যক্তি চেনা যায়। তাই কেউ হজ্বের উপর থাকলে, তার আনুগত্য করা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন জাতির কাহিনী বর্ণনা করে জানিয়ে দেন যে, কম সংখ্যকও কখনো হত্ত্বের উপর বহাল থাকে। তিনি বলেন, {وَمَا آمَنَ مَعَهُ إِلَّا قَلِيلٌ} [هود: ٤٠] আর তার সাথে অল্পসংখ্যকই ঈমান এনেছিল (সূরা হুদ ১১:৪০)।
আর হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে, عُرِضَتْ عَلَيَّ الْأُمَمُ، فَرَأَيْتُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ الرُّهَيْطُ، وَالنَّبِيَّ وَمَعَهُ الرَّجُلُ وَالرَّجُلَانِ، وَالنَّبِيَّ لَيْسَ مَعَهُ أَحَدٌ
নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে উম্মতদের পেশ করা হলে তিনি দেখতে পান, একজন নাবীর সাথে একটি দল, অন্য একজন নাবীর সাথে একজন অথবা দু'জন লোক রয়েছে এবং কোন নাবীর সাথে একজন লোকও নেই।
তাই কোন মতামত বা কথার উপর অধিকাংশের অনুসরণের মাধ্যমে কোন শিক্ষা নেই, বরং হক্ব ও বাতিল নির্ণয়ের মাধ্যমেই শিক্ষা রয়েছে। তাই যদি হক্ব প্রমাণিত হয় এবং ঐ হক্বের উপর অল্প সংখ্যক মানুষ বহাল থাকে অথবা কেউই বহাল না থাকে, যতক্ষণ তা হক্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে, ঐ হক্বকেই আঁকড়ে ধরতে হবে। কেননা হকুই হলো মুক্তির কারণ। বহু সংখ্যক মানুষের মাধ্যমে বাতিল কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। সুতরাং সর্বদাই হজ্বের মাপকাঠি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। নাবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, بدأ الإسلام غريباً وسيعود غريباً كما بدأ
অপরিচিত অবস্থায় ইসলামের সূচনা হয় এবং অপরিচিত অবস্থায় তা ফিরে যাবে। মন্দকর্ম, ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) ও ভ্রষ্টতা বৃদ্ধি পেলে তখন অল্পসংখ্যক মানুষ ও কিছু গোত্র ছাড়া কেউ হক্বের উপর বহাল থাকবে না। অল্পসংখ্যকই সমাজে অবস্থান করবে। সমগ্র পৃথিবী যখন কুফরী ও ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল তখন রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিলে একজন, দু'জন করে তার দাওয়াত গ্রহণ করে, ক্রমান্বয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কুরাইশ ও বেদুঈনসহ পৃথিবীর সবাই ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাই মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। পৃথিবীর অল্প সংখ্যক মানুষই তার অনুসারী হয়। সুতরাং সংখ্যায় বেশি হওয়া শিক্ষণীয় নয়। সঠিক ও হক্ব অর্জনে শিক্ষা নিহিত আছে। তবে হ্যাঁ বেশি সংখ্যক হক্বের উপর বহাল থাকলে তা ভাল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিয়মানুযায়ী অধিকাংশই বাতিলের অনুসারী হয়ে থাকে, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
{وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ} [يوسف: ١٠٣]
আর তুমি আকাঙ্খা করলেও অধিকাংশ মানুষ মুমিন নয় (সূরা ইউসূফ ১২:১০৩)। তিনি আরো বলেন,
{وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ} [الأنعام: ١١٦]
আর যদি তুমি যারা যমীনে আছে তাদের অধিকাংশের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। (সূরা আল আন'আম ৬:১১৬)।
টিকাঃ
২২. ছহীহ মুসলিম হা/২২০।
২৩. জ্বহীহ মুসলিম হা/১৪৬।
📄 দলীলের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে পূর্ববর্তীদের নিয়ম-নীতি-আমলকে দলীল হিসাবে পেশ করা
পূর্ববর্তীদের দলীল গ্রহণ করা সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
{قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى} [طه: ٥١]
ফিরআউন বলল, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী? (সূরা ত্বহা ২০:৫১)। তিনি আরো বলেন,
{مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ} [المؤمنون: ٢٤]
এ কথাতো আমরা আমাদের পূর্বতম পিতৃ-পুরুষদের সময়েও শুনিনি (সূরা মুমিনুন ২৩:২৪)।
ব্যাখ্যা: রসূলগণ জাহিলদের নিকট হক্ক পেশ করলে তাদের পূর্ব-পুরুষদের রীতিকে তারা দলীল হিসাবে পেশ করতো। মুসা আলাইহিস সালাম ফেরআউনকে ঈমানের দাওয়াত দিলে সে পূর্ববর্তীদেরকে দলীল হিসাবে পেশ করেছিল। আল্লাহর বাণী:
{قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى} [طه: ٥١]
ফিরআউন বলল, তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী? (সূরা ত্বহা ২০:৫১)। ফেরআউন পূর্ববর্তী যুগের কাফিরদেরকে প্রমাণ স্বরূপ পেশ করতো। এটাই হলো বাতিল ও জাহিলী যুক্তি। নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে আল্লাহর দিকে দা'ওয়াত দিলে তারা বলেছিল,
{مَا هَذَا إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُرِيدُ أَنْ يَتَفَضَّلَ عَلَيْكُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَأَنْزَلَ مَلَائِكَةً مَا سَمِعْنَا بِهَذَا في آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ} [المؤمنون: ٢٤]
এতো তোমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছুই না। সে তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চায়। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে অবশ্যই ফেরেস্তা নাযিল করতেন। এ কথাতো আমরা আমাদের পূর্বতম পিতৃ-পুরুষদের সময়েও শুনিনি (সূরা মুমিনুন ২৩:২৪)।
তারা আল্লাহর নাবী নূহ আলাইহিস সালাম এর দা'ওয়াতের বিরোধিতা করেছিল এবং পূর্ব পুরুষরা যে রীতির উপর ছিল তা হক্ব বলে প্রমাণ পেশ করতো। তারা মনে করতো নূহ আলাইহিস সালাম যা নিয়ে এসেছেন তা বাতিল। কেননা তা ছিল পূর্ব-পুরুষদের বিরোধী। অপর দিকে কুরাইশ কাফিররা বলতো,
{مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلاقُ} [ص: ٧]
আমরা তো সর্বশেষ ধর্মে এমন কথা শুনিনি। এটা তো বানোয়াট কথা ছাড়া আর কিছু নয় (সূরা জ্বদ ৩৮ঃ ৭)।
অর্থাৎ )مَا سَمِعْنَا هَذَا( তথা আমরা এটা শুনিনি যা মুহাম্মাদ জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন。
)فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ( তথা শেষ ধর্মে অর্থাৎ তাদের পূর্বপুরুষ ও বাপদাদার ধর্মে। )إنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقُ তথা এটা মিথ্যা। রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তারা তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো। কিন্তু কেন? কেননা রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রাপ্ত দীন ছিল তাদের পূর্ব-পুরুষ বিরোধী। আর পূর্ব পুরুষদের রীতি ছিল মূর্তি পূজা করা।
তাদের পিতা ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিমাস সালাম এর দীনের দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করেনি। বরং তাদের নিকটতম পূর্ব পুরুষদের রীতির দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করেছিল। মক্কার কাফির কুরাইশরা ছিল তাদের বাপদাদা ও পূর্ব পুরুষদের অনুসারী। এটাই ছিল কাফির ও জাহিলদের রীতি। এভাবে পূর্ববর্তী জাতিদেরকে তারা দলীল হিসাবে গ্রহণ করতো।
রসূলগণের সাথে যা ছিল সে ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা বিবেকবানদের উপর আবশ্যক। রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ ও পূর্ব পুরুষদের রীতির মাঝে তাদের তুলনা করে দেখা আবশ্যক, যাতে তাদের নিকট বাতিল থেকে হকু স্পষ্ট হয়ে যায়। বিবেকহীনরা নিজেরা বলে,
ما نقبل إلا ما عليه آباؤنا، ولا نقبل ما يخالفه
আমরা পূর্ব পুরুষদের রীতিই গ্রহণ করবো, এর বিপরীত কিছু মেনে নিবো না। এটা অধিকন্তু বিবেকবানদের মর্যাদা পরিপন্থী বিষয়, যারা নিজেদের মুক্তি চায়। বর্তমানে কবরের ইবাদত করা হতে কবর পূজারীদের নিষেধ করা হলে তারা বলে, অমুক দেশে এটার প্রচলন আছে, অমুক গোষ্ঠিী এটা করে ও যুগযুগ ধরে তা পালন করা হয়।
রসূল জ্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম দিন পালন করা থেকে যখন মিলাদপন্থীদের নিষেধ করতঃ বলা হয়, এটা বিদ'আত। তখন তারা বলে, আমাদের পূর্ব থেকেই এর উপর আমল চালু আছে। যদি এটা বাতিলই হতো তাহলে পূর্ববর্তীরা এর উপর আমল করতো না। এটাই হলো জাহিলদের দলীল গ্রহণের স্বরূপ।
মানুষ যা পালন করে তাতে কোন শিক্ষা নেই। বরং রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তাতেই শিক্ষা নিহিত আছে। কেননা মানুষ ভুল ও সঠিক উভয়টি করতে পারে। কিন্তু রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন, তা অকাট্যভাবে সঠিক।
তাই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করা আবশ্যক। আল্লাহ তা'আলা আমাদের বাপদাদা ও পূর্ব পুরুষদের উপর নির্ভর করতে বলেন নাই। বাপদাদা ও পূর্ব পুরুষদের রীতি যদি যথেষ্ট হতো, তাহলে রসূলগণের প্রয়োজন হতো না। এরূপভাবে সূফীগণ বলেন, রসূলের আনুগত্য করার চেয়ে আমরা যে অবস্থায় আছি সেটাই যথেষ্ট। আর আমাদের স্বীয় অবস্থায় আল্লাহ তা'আলার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। ফলে আমরা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার নিকট থেকে দীন গ্রহণ করি।
সূফীরা বলে, সুন্নাতের অনুসারীরা মৃতদের কাছ থেকে তাদের দীন গ্রহণ করে, তারা হাদীছের সনদের রাবীগণকে বুঝাতে চায়। আর তাদের কথা হলো আমরা চিরঞ্জীব আল্লাহর কাছ থেকে আমাদের দীন গ্রহণ করি।
তারা বলে, জন সাধারণের জন্য রসূলগণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে বিশেষ ব্যক্তি বর্গের জন্য রসূলের প্রয়োজন নেই। কেননা বিশেষ ব্যক্তিগণ আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেন। তারা বুঝতে পারেন যে, তাদের জন্য রসূলগণ প্রয়োজনহীন। এভাবে শয়তান তাদেরকে বলে, পথ প্রাপ্তদের জন্য রসূলগণের দরকার নেই। কেননা তারা সরাসরি আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে দীন গ্রহণ করে। এটাই জাহিলী দীন। অনেক মানুষই এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।