📄 মক্কী যুগ কেবল ব্যক্তিগতই ব্যয় হয়েছে
নবুওত লাভের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বমোট তেইশ বছর হায়াত পেয়েছিলেন। তন্মধ্য থেকে মক্কীজীবনে তেরো বছর কেবল এই ব্যক্তিগঠনের কাজে ব্যয় হয়েছিল।
মক্কী ও মাদানী যুগের বিশ্লেষণকারী কতিপয় লোক এ দু'যুগকে ইসলামের দুর্বলতা ও সক্ষমতার দুই অবস্থায় ভাগ করে মক্কী জীবনকে দুর্বলতা আর মাদানী জীবনকে সক্ষমতার যুগ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এরপর নবী জীবনের বিভিন্ন বিধান ও ঘটনাকে এ দু'অবস্থার অধীভুক্ত করে পার্থক্য ও বিশ্লেষণ করেছেন।
তবে যদি একটু গভীরভাবে দেখা হয় তাহলে বোঝা যায়, কেবল দুর্বলতা ও সক্ষমতাই আহকামের তারতম্যের কারণ নয়; বরং অন্যান্য হেকমতও এখানে লুকিয়ে আছে। নতুবা এ দুর্বলতা সত্ত্বেও মক্কার মুশরিকদের বাড়াবাড়ির কিছু না কিছু জবাব তো মক্কাতেও দেওয়া সম্ভব ছিল। বাহ্যত সে হেকমত এটাই ছিল যে, মক্কীজীবনে ব্যক্তিগঠনের কাজ অগ্রগণ্য ছিল। কোনো সামষ্টিক কাজ, চাই তা আত্মরক্ষামূলক হোক বা অগ্রসরমূলক, (ব্যক্তিগঠন) এর পূর্বে সম্ভব নয়।
কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো মেশিনের পার্টস ঠিক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দ্বারা কোনো মেশিন এবং ফ্যাক্টরি তৈরি অসম্ভব?
📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পতাকাবাহী হয়ে আগমন করেছেন। তাই তার অনুসন্ধানী চোখ এদিকে নিবদ্ধ হয়েছে যে, এই কাজ না একা কোনো রাষ্ট্র ও সালতানাতের পক্ষে সম্ভব, না কেবল আইন ও আইনি প্রচারের মাধ্যমে সম্ভব; বরং যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে সঠিক অর্থে মানুষ বানানো না হবে এবং তাকে সুস্থ মানবিকতার সাথে পরিচিত না করানো হবে, ততক্ষণ এই পৃথিবী জুলুম অত্যাচার, হত্যা, দ্বন্দ্ব-কলহ, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার নরক হয়েই থাকবে।
কেননা রাষ্ট্র তো প্রতিটি কাজ নিজের সহযোগী শ্রেণির মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করে থাকে। কোনো আইনই তো নয় স্বয়ংক্রিয় মেশিন যে, সে নিজে নিজেই চলবে; বরং সেটিকে বাস্তবায়ন করার জন্য মানুষেরই প্রয়োজন। মানুষ যদি সঠিক অর্থে মানুষ না হয়, তাহলে কোনো আইন, কোনো সংবিধান ও কোনো রাষ্ট্র কোনো মন্দের সংশোধন ও অপরাধ দমন করে কোনোভাবেই পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা সৃষ্টি করতে পারবে না।
এজন্য মক্কী জীবনের তেরো বছর পুরোটাই কেবল ব্যক্তিগঠনের কাজে ব্যয় হয়েছে। যেখানে নবুওতী প্রজ্ঞার মাধ্যমে কিছু মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করা হয়েছে। এই ব্যক্তিগঠনের কাজ হয়েছে মক্কা মুকাররমার এক অখ্যাত প্রান্তে, ছোট্ট একটি জায়গায়। যেটি ‘দারে আরকাম’ নামে পরিচিত। সাফা-মারওয়ার মাঝে ছিল এর অবস্থান। বর্তমান হারাম শরীফ সম্প্রসারণের পূর্ব পর্যন্ত সেটি বিদ্যমান ছিল। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এই জায়গাতেই উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার নবীজির প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। এরপর সেই তিনিই ইসলামে দীক্ষিত হয়ে তাঁর গোলামীর সৌভাগ্য নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বের নবীগণের ন্যায় বিশেষ কোনো জাতি, ভূখণ্ড বা বিশেষ যুগের রাসূল হয়ে আগমন করেননি। তাঁর আগমন ও দাওয়াত সমগ্র পৃথিবীর জিন-ইনসানের জন্য। কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তাঁকে এই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যে, গোটা পৃথিবীকে পরিশুদ্ধ করে সকল মানুষকে দুনিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা, সম্মান ও সুস্থতার জীবনের সন্ধান দেবেন। এবং পরকালে তাদের প্রভুর সামনে দাড়াবার উপযুক্ত করবেন এবং সেখানকার চিরস্থায়ী শান্তির অধিকারীরূপে গড়ে তুলবেন।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য নবীজির সামনে সর্বপ্রথম কাজ ছিল কিছু মানুষকে গড়ে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যে সমাজ এই মহান লক্ষ্য সাধনে তাঁর হস্ত ও বাহুতে পরিণত হবে এবং ভবিষ্যতে এই মহান দায়িত্ব তারা নিজেই আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে।
ব্যক্তিগঠনের এ মহান কাজ, যা দারুল আরকামের অখ্যাত গৃহে শুরু হয়েছিল, তার সংক্ষিপ্ত কথা তো হলো মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো। আর তার বিস্তারিত রূপরেখা হলো, কুরআন মাজীদের সেই বিশাল অংশখানি যা মক্কী যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল। সে অংশজুড়ে যে সমস্ত হেদায়াত ও নির্দেশনাবলি প্রদত্ত হয়েছে তার সারনির্যাস তৈরি করা হলে মৌলিক কয়েকটি বিষয় সম্মুখে আসে, যা একজন মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বিষয়গুলো হলো-
১. আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও ভালোবাসা।
২. আখেরাতের ফিকির।
৩. দুনিয়ার ক্ষুদ্র জীবন এবং এর সুখ-দুঃখের স্বরূপ উন্মোচন।
৪. সৃষ্টিজীবের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার পূর্ণরূপে আদায় করা আর নিজ অধিকার সম্পর্কে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখা। মানুষের জ্বালাতনকে ক্ষমা করা এবং নিজের পক্ষ থেকে সর্বাবস্থায় তাদের প্রতি কল্যাণ কামনা ও সহমর্মিতা অব্যাহত রাখা।
মক্কীজীবনের সমস্ত সূরা ও আয়াত গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে লক্ষ করা যাবে কত অলৌকিক ও অভাবনীয় উপস্থাপনায় মানুষের মন-মননকে এ মৌলিক বিষয়গুলোর শিক্ষা ও নির্দেশনার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ওহীর সূচনাকালীন প্রাথমিক সূরাগুলো পড়ুন, তাহলে দেখবেন সেখানে অধিকহারে আল্লাহর যিকির এবং সুন্দরভাবে ইবাদতের প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এই বিশ্বাসের প্রতিও জোর দেওয়া হয়েছে যে, বান্দার জীবনে যা-কিছু ঘটনা ঘটে তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও অনুমতিক্রমে ঘটে। তিনি ছাড়া কোনো শত্রু-মিত্রের পক্ষে কারও উপকার বা ক্ষতি করার সাধ্য নেই।
এ বিষয়েও খুব জোর দেওয়া হয়েছে যে, সমস্ত কাজে কেবল আল্লাহর উপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল করা হবে। কিয়ামতের হিসাব নিকাশ, শাস্তি-প্রতিদান, জান্নাত-জাহান্নামের ফিকির থেকে কখনো উদাসীন হওয়া যাবে না। পার্থিব জীবন এবং এর সব ধরনের সুখ ও দুঃখ অস্থায়ী, এর উপর বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত না। একে প্রয়োজন পরিমাণ রাখা উচিত। জীবনের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও ইবাদত এবং তাকে সন্তুষ্ট করা। এ পথে যত বাধা বিঘ্ন আসে সাহসিকতার সাথে সেগুলো অতিক্রম করা এবং কোনো বিপদাপদ এলে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে তা মোকাবিলা করা। মানুষজন যদি তোমার অধিকার আদায় না করে বা তোমার উপর জুলুম করে, তাহলে ক্ষমা করে তা উপেক্ষা কর। কখনোই তাদের থেকে কল্যাণকামী মনোভাব ত্যাগ করো না। তাদের যেসব অধিকার তোমার দায়িত্বে আছে, সেগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় কর।
সূরা ইকরা, ফাতেহা, মুজ্জাম্মিল, মুদ্দাছছির-ইত্যাদি প্রাথমিক সূরাগুলোর অনুবাদ পড়লেই এই কথাগুলোর পুরো সত্যতা মিলবে। এই সমস্ত শিক্ষার সারমর্ম হলো, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে এক আল্লাহর প্রতি ফিরিয়ে তার সমস্ত ইচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির অনুগামী বানিয়ে দেওয়া। যেমনিভাবে ইবাদত কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য, তেমনি পার্থিব সমস্ত কর্মকাণ্ড—খাওয়া দাওয়া, শয়ন জাগরণ, চলাফেরা, জীবন-মৃত্যু, বন্ধুত্ব-শত্রুতা, ভালোবাসা-ঘৃণা সব আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির অনুগামী হতে হবে। নিম্নোক্ত আয়াত এ শিক্ষাই দেয়-
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ
‘বলে দাও, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত ও আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”
টিকাঃ
৬. সূরা আনআম, আয়াত ১৬২
📄 কুরআন ও রাসূলের দীক্ষাপ্রাপ্ত আল্লাহর পবিত্র জামাত এবং একনজরে তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ
সহীহ হাদীসে বান্দার এ উন্নত অবস্থাকে পূর্ণ ঈমানের আলামত আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ وَأَبْغَضَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ إِيْمَانَهُ.
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যই (কাউকে) ভালোবাসে, আল্লাহর জন্যই (তাঁর শত্রুদের সাথে) শত্রুতা পোষণ করে, সে নিজের ঈমানকে পরিপূর্ণ করে নিল।
এই গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তি পরিপূর্ণ মানুষ এবং সমগ্র পৃথিবীর জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার কারণ হতে পারে। এরকম মানুষ থেকে না চুরি ও বদমাশির আশঙ্কা রয়েছে, না ধোঁকাবাজি বা কষ্ট পাওয়ার ভয় রয়েছে। না তার কাছে গোষ্ঠীগত সাম্প্রদায়িকতা পাত্তা পায়, না দুনিয়ার ধনদৌলতের অযাচিত আশা তার ব্যক্তিত্বকে কলুষিত করে। তার তো অবস্থা এমন হয় যে, মানুষের কাছে থেকে নিজের প্রাপ্যঅধিকারটুকু গ্রহণেরও সুযোগ হয় না, তা আবার অন্যের হক নষ্ট করার চিন্তা!
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎকালীন সমগ্র বিশ্বের চিন্তাচেতনা থেকে ভিন্ন যে মতাদর্শ নিয়ে আগমন করেছেন এবং পুরো বিশ্বে যে মতাদর্শ ছড়ানোর জন্য ও সকলকে যার আওতায় আনার মিশন চালিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি না কোনো ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান বানিয়েছেন, না কেল্লাভেদী কামান কিংবা এটমবোমা তৈরি করেছেন। না বিশ্বব্যাপী কোনো সংগঠন ও দল গঠনের ফিকির করেছেন; বরং সর্বপ্রথম এই কাজ করেছেন যে, যেসকল লোক তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছেন তাদেরকে উপরোল্লিখিত মৌলিক বিষয়গুলোর সাহায্যে ফেরেশতার মতো, বরং ফেরেশতা থেকেও উঁচু মাখলুকে পরিণত করেছেন। যা নিঃসন্দেহে কুরআনে কারীমেরই শিক্ষা এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীক্ষার ফল ছিল।
কুরআন ও রাসূলের দীক্ষাপ্রাপ্ত আল্লাহর পবিত্র জামাত এবং একনজরে তাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ
কুরআনের নির্দেশনা ও রাসূলের দীক্ষায় যে পবিত্র জামাত তৈরি হয়েছিল, কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা তার নাম রেখেছেন ‘হিযবুল্লাহ’। এ নামে অভিষিক্ত করার পর তিনি তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা ও কামিয়াবীর নিশ্চয়তাও প্রদান করে দিয়েছেন। বলেছেন-
أُولَيكَ حِزْبُ اللهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
‘তারা আল্লাহর দল। স্মরণ রেখ, আল্লাহর দলই কৃতকার্য হয়।”
আল্লাহর এই দলের গুণ ও বৈশিষ্ট্য কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন সূরায় বিভিন্ন উপস্থাপনায় বর্ণিত হয়েছে। আমার আলোচনা যদিও দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু (প্রবন্ধের উদ্দেশ্যের সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই কুরআনের ভাষায়ই তাদের কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য লক্ষ করুন।
* সূরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ لكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَ الْمَلَكَةِ وَ الْكِتَبِ وَ النَّبِيِّنَ وَ أَتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَى وَ الْمَسْكِينَ وَ ابْنَ السَّبِيلِ وَ السَّابِلِينَ وَ فِي الرِّقَابِ وَ أَقَامَ الصَّلوةَ وَأَتَى الزَّکٰوةَ وَالْمُؤْفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عُهَدُوا وَالصُّبِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَ الضَّرَّاءِ وَ حِيْنَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
‘পুণ্য তো কেবল এটাই নয় যে, তোমরা নিজেদের চেহারা পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; বরং পুণ্য হলো (সেই ব্যক্তির কার্যাবলী), যে ঈমান রাখে আল্লাহর, শেষদিনের ও ফেরেশতাদের প্রতি এবং (আল্লাহর) কিতাব ও নবীগণের প্রতি। আর আল্লাহর ভালোবাসায় নিজ সম্পদ দান করে আত্মীয়স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির ও সুওয়ালকারীদেরকে এবং দাসমুক্তিতে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং যারা কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূরণে যত্নবান থাকে এবং সঙ্কটে, কষ্টে ও যুদ্ধকালে ধৈর্যধারণ করে। এরাই তারা, যারা সাচ্চা (নামে অভিহিত হওয়ার উপযুক্ত) এবং এরাই মুত্তাকী।"
১৮ পারায় সূরা মুমিনুনে ইরশাদ করেছেন-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خُشِعُوْنَ وَ الَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكُوةِ فُعِلُونَ وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَفِظُونَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَبِكَ هُمُ الْعُدُونَ وَ الَّذِينَ هُمْ لِأَمُنْتِهِمْ وَ عَهْدِهِمْ رُعُونَ وَ الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ يُحَافِظُوْنَ أُولَبِكَ هُمُ الْوَرِثُونَ الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خُلِدُونَ
'নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ—যারা তাদের নামাযে আন্তরিকভাবে বিনীত। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। যারা যাকাত সম্পাদনকারী। যারা নিজ লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে। নিজেদের স্ত্রী ও তাদের মালিকানাধীন দাসীদের ছাড়া অন্য সকলের থেকে, কেননা এতে তারা নিন্দনীয় হবে না। তবে কেউ এছাড়া অন্য কিছু কামনা করলে তারাই হবে সীমালঙ্ঘনকারী। আর যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং নিজেদের নামাযের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে, এরাই হলো সেই ওয়ারিশ, যারা জান্নাতুল ফিরদাউসের মীরাস লাভ করবে। তারা তাতে সর্বদা থাকবে।
* সূরা নূরে (আয়াত ৩৭) তাঁদের এই গুণ বর্ণনা করেছেন-
رِجَالٌ لَّا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةً وَ لَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَ إِقَامِ الصَّلوةِ وَإِيتَاءِ الزَّلُوةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوْبُ وَالْأَبْصَارُ
'এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ, নামায কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে গাফেল করতে পারে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যে দিন অন্তর ও দৃষ্টি ওলট-পালট হয়ে যাবে।
* আর সূরা ফুরকানে এই দলের বৈশিষ্ট্য এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-
وَ عِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَ إِذَا خَاطَبَهُمُ الْجُهِلُونَ قَالُوا سَلَمَان وَ الَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَ قِيَامًا وَ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَ مُقَامَانَ وَ الَّذِينَ إِذَا أَنْفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا وَالَّذِينَ لَا يَدْعُوْنَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَ لَا يَزْنُونَ وَ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا وَ الَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَ إِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا وَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِأَيْتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمَّا وَ عُمْيَانًا وَ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَ اجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
'রহমানের বান্দা তারা, যারা ভূমিতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞলোক যখন তাদেরকে লক্ষ্য করে (অজ্ঞতাসুলভ) কথা বলে, তখন তারা শান্তিপূর্ণ কথা বলে। এবং যারা রাত অতিবাহিত করে নিজ প্রতিপালকের সামনে (কখনো) সিজদারত অবস্থায় এবং (কখনো) দণ্ডায়মান অবস্থায়। এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! জাহান্নামের আযাব আমাদের থেকে দূরে রাখুন। নিশ্চয়ই তার আযাব সদা সংলগ্ন হয়ে থাকে। নিশ্চয়ই অবস্থানস্থল ও বাসস্থান হিসেবে তা অতি নিকৃষ্ট। এবং যারা ব্যয় করার সময় না করে অপব্যয় এবং না করে কার্পণ্য; বরং তা হয় উভয়ের মাঝখানে ভারসাম্যমান। এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মাবুদের ইবাদত করে না এবং আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন, তাকে অন্যায়ভাবে বধ করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে ব্যক্তিই এরূপ করবে তাকে তার গুনাহের (শাস্তির) সম্মুখীন হতে হবে।
এরপর বলেন-
এবং (রহমানের বান্দা তারা) যারা অন্যায় কাজে শামিল হয় না এবং যখন কোনো বেহুদা কার্যকলাপের নিকট দিয়ে যায়, তখন আত্মসম্মান বাঁচিয়ে যায়। এবং যখন তাদের প্রতিপালকের আয়াত দ্বারা তাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয়, তখন তারা বধির ও অন্ধরূপে তার উপর পতিত হয় না। এবং যারা (এই) বলে (দুআ করে যে), হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ হতে দান করো নয়নপ্রীতি এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানাও।
আর ২৬ পারার সূরা ফাতহের শেষে এসেছে-
مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ وَ الَّذِينَ مَعَةَ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَابَهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ
'মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। তাঁর সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র। তুমি তাদেরকে দেখবে (কখনো) রুকুতে, (কখনো) সিজদায়, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি সন্ধানে রত। তাদের আলামত তাদের চেহারায় পরিস্ফুট সিজদার ফলে।
এই দলের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সম্পর্কে কুরআন মাজীদে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। সবগুলোর উল্লেখ এখানে উদ্দেশ্য নয়, উপরে উল্লিখিত এ কয়টি আয়াত দ্বারা তাঁদের বৈশিষ্ট্যের একটি চিত্র ফুটে ওঠে। যা থেকে বোঝা যায়, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই গোষ্ঠীর শিক্ষাদীক্ষা কোন পাঠ্যক্রম ও কোন পরিকল্পনায় সম্পন্ন করেছিলেন। শিক্ষা নেওয়া যায়; আজও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি উত্তম আদর্শে আদর্শবান হতে চায় এবং প্রকৃত মানুষ ও উত্তম ব্যক্তিগঠন করতে চায়, তাহলে তাদের কোন পদ্ধতি ও কোন মূলনীতিতে এই কাজ সম্পাদন করা উচিত।
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ থেকে আল্লাহর দলের যে বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে তার সারনির্যাস নিম্নে প্রদত্ত হলো-
* সূরা বাকারার আয়াত থেকে-
১. আল্লাহ তাআলা, পরকাল, ফেরেশতা, কুরআন ও সমস্ত নবীদের উপর পূর্ণ ঈমান।
২. আত্মীয়স্বজন, এতীম মিসকীন, মুসাফির, ভিক্ষুকদের সাহায্য ও দাসমুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে নিজের প্রিয় ধন-সম্পদ খরচ করা।
৩. নামায কায়েম করা (অর্থাৎ নামাযের আদব ও শর্তসমূহ রক্ষা করে আদায় করা)।
৪. সম্পদের যাকাত আদায় করা।
৫. কারও সাথে কোনো অঙ্গীকার করা হলে যথাযথভাবে পূরণ করা।
৬. বিপদাপদ ও দারিদ্র্যে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দীনের শত্রুদের সামনে দৃঢ়পদ থাকা।
এই ছয়টি বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের কুরআনের ভাষায় সাদেকীন ও মুত্তাকীন তথা সত্যবাদী ও খোদাভীরু আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
* সূরা মুমিনুনের আয়াতসমূহ থেকে-
৭. নামাযে খুশু অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া থেকে স্থিরতা অবলম্বন করা। চাই তা শারীরিক নড়াচড়া হোক অথবা মানসিক কিংবা চিন্তাগত।
৮. অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা। অনর্থক কাজ দ্বারা উদ্দেশ্য এমন কথা, কাজ ও বৈঠক, যাতে দ্বীন কিংবা দুনিয়ার কোনো ফায়দা নেই।
৯. অভ্যন্তরীণ পবিত্রতার প্রতি গুরুত্বারোপ। অর্থাৎ ভ্রান্ত বিশ্বাস ও নিন্দনীয় চরিত্রসমূহ থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখা।
১০. নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজত। কেবল যে যে ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা অনুমোদন দিয়েছেন সেগুলো ছাড়া তথা স্ত্রী ও দাসীর ক্ষেত্রে।
১১. নিজের প্রতিটি চুক্তি ও অঙ্গীকারের উপর দৃঢ়পদ থাকা।
১২. সকল নামাযের পাবন্দী করা। গুরুত্ব দেওয়া।
* সূরা নূরের আয়াত থেকে-
১৩. আল্লাহর স্মরণ, নামায-রোযা ও যাকাতের এমন গুরুত্ব উপলব্ধি, যা পৃথিবীর সমস্ত চিন্তাভাবনার উপর প্রাধান্য লাভ করে এবং দুনিয়ার সকল কায়কারবার ও দৌড়ঝাঁপের ভেতর দিয়েও জাগরূক থাকে।
১৪. কেয়ামত দিবস এবং তার হিসাবনিকাশের ভয় রাখা।
* সূরা ফুরকানের আয়াতসমূহ থেকে-
১৫. চালচলনে সদা নম্রতা ও বিনয় অবলম্বন করা। অহংকার ও বড়ত্ব ফলানো থেকে দূরে থাকা।
১৬. ঝগড়া ও কলহপ্রিয় লোকদের থেকে নিরাপদে থাকা।
১৭. রাতের অধিকাংশ সময় রুকু-সিজদা ও ইবাদতে কাটানো।
১৮. জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি চাওয়া।
১৯. খরচে মিতব্যয়ী হওয়া। সাধ্যের অতিরিক্ত খরচ না করা আবার কৃপণতাও না করা।
২০. কাউকে আল্লাহ তাআলার সাথে শরীক বা সমকক্ষ মনে না করা।
২১. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা।
২২. ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে পরিপূর্ণরূপে দূরে থাকা।
২৩. মিথ্যার কাছেও না যাওয়া এবং গুনাহের অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ না করা।
২৪. কোনো অনর্থ কাজ বা অনুষ্ঠানের মুখোমুখি হয়ে গেলে ভদ্রভাবে এড়িয়ে যাওয়া।
২৫. আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম ও আয়াতসমূহকে সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করা। সেগুলোর উপর (না জেনে) আন্দাজে আমল করা থেকে বেঁচে থাকা।
২৬. নিজের সাথে সাথে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনের সংশোধনের চেষ্টা করা এবং দুআ করা।
* সূরা ফাতহের আয়াত থেকে-
২৭. কুফরি ও কাফেরের মোকাবিলায় কঠোর ও সাহসী হওয়া। ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষেত্রে দয়ালু ও নরম হওয়া।
২৮. সাধারণ সময়ের (যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় হবে) কর্মব্যস্ততা হওয়া—নামায, রুকু ও সেজদা।
২৯. তাদের চেহারায় নামাযের ছাপ ও আলামতের উপস্থিতি।
৩০. সমস্ত কাজে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ।
এসবই এমন গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য, যা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই উম্মী লোকদের মাঝে সৃষ্টি করেছিলেন। যাদের ইতিপূর্বে বিশ্বাস, কর্ম, জ্ঞানগত চরিত্র ও সভ্যতার কোনো অঙ্গনেই সংগতি ও সঠিকতা ছিল না। সেই তাদেরই পরবর্তী এই উৎকর্ষ অবস্থা দেখে যদি বলা হয় যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি সাহাবী তার জীবন্ত ও চলমান মুজিযা, তাহলে তা মোটেই অত্যুক্তি হবে না; বরং এটাই বাস্তবতা।
একটু ভাবলেই দিবালোকের ন্যায় এ কথা প্রমাণিত হবে যে, তাদের এ সকল গুণাবলী ও উত্তম চরিত্র সেই তাওহীদ, রিসালাত এবং পরকালের ভয়েরই ফলাফল, যা ইসলামের বুনিয়াদী মতাদর্শ হিসেবে এ মানুষগুলির অন্তরে স্থান করে নিয়েছিল।
‘দারে আরকাম’কে ইসলামের সর্বপ্রথম মাদরাসা বলুন বা সর্বপ্রথম খানকা বলুন, এখানেই এই পবিত্র দলের সূচনা হয়েছিল এবং এখানেই তাদের জীবনে আল্লাহর রঙ পরিস্ফুটিত হয়েছিল। এটাই সেই রঙ, যা অন্য কোনো রঙের সামনে পরাভূত হয় না। এটাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বপ্রথম কীর্তি এবং ইসলামের প্রথম পুঁজি ও মূল শক্তি। যা বিদ্যুৎ গতিতে পৃথিবীকে আপন রঙে রাঙিয়ে নিয়েছিল।
টিকাঃ
৭. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬৮৩
৮. সূরা মুজাদালা, আয়াত ২২
৯. সূরা বাকারা, আয়াত ১৭৭
১০. সূরা মুমিনূন, আয়াত ১-১১
১১. সূরা নূর, আয়াত ৩৭
১২. সূরা ফুরকান, আয়াত ৬৩-৭৪
১৩. সূরা ফাতহ, আয়াত ২৯
📄 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় মহান কীর্তি : পরিবেশ ও সমাজ সংশোধন
এ পর্যন্ত নীরবে-নিভৃতে কিছু ব্যক্তিগঠন করা হয়েছে, যাঁরা ইসলামের আদর্শে আদর্শবান হয়ে ইসলামী জীবনব্যবস্থার দৃঢ়স্তম্ভে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যে দায়িত্ব অর্পিত ছিল, তা কেবল মক্কা বা হিজাযবাসীদের সংশোধন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরো পৃথিবীর প্রাচ্য-প্রতীচ্য, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবার জন্য। সব প্রজন্মের জন্য। আর এটা স্পষ্ট কথা যে, শত্রুদের চাপ ও সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে যাঁরা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছিলেন, তাঁদের একার পক্ষে বিশ্বব্যাপী সংশোধনের কাজ পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না।
এজন্য দ্বিতীয় দফায় আল্লাহর দলের সদস্য বৃদ্ধির জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো। আর তাও পৃথিবীর সাধারণ রীতিনীতির বিপরীতে খুবই অভিনব এবং একেবারে স্বভাবজাত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হলো। তা এভাবে যে, এই আদর্শিক ঘরানার দীক্ষাপ্রাপ্ত প্রতিটি সদস্যের উপর আবশ্যক করে দেওয়া হলো, প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবেশকে সেই রঙে রাঙানোর সর্বাত্মক চেষ্টা ও সর্বোচ্চ শক্তি ব্যয় করবে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজেদের জান-প্রাণ উৎসর্গ করবে। আর যে ব্যক্তি সব ধরনের চেষ্টা-প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সমমনা হবে না, তার থেকে দায়মুক্তি ও সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে তাকে নিজ পরিবেশ থেকে আলাদা করে দেবে।
অভিজ্ঞতা সাক্ষী, যে-কোনো ব্যক্তি বা জাতির গঠন ও বিগড়ানোর পেছনে মূল দায়ী চারপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ। মানুষ স্বভাবগতভাবেই এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অবচেতনে পরিবেশের রঙ ধারণ করে থাকে। যতক্ষণ মানুষের পরিবেশ ঠিক করা না হয় ততক্ষণ কোনো শিক্ষাদীক্ষাই তার মাঝে ক্রিয়াশীল হয় না। নিজ পরিবেশ ও চারপাশের একজন ব্যক্তিও যদি ভিন্ন জাতের হয়, তাহলে সেও পরিবেশ সংশোধনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য এ বাণী বড় প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী-
از مصاحب ناجنس احتراز کنید
'ভিন্নজাতের সঙ্গী থেকে দূরে থাকো।'