📄 ইসলামী মতাদর্শ এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থাই পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে
এই প্রবন্ধে মূলত আমার এ বিষয়টি দেখানো উদ্দেশ্য যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম জীবনাদর্শ—যা সারা দুনিয়াকে একটি সঠিক মতাদর্শ ও মজবুত ইনসাফভিত্তিক জীবনব্যবস্থা দান করেছে—তা আপন স্থানে পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দান করে। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করার জন্য এই জীবনব্যবস্থার কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখুন যে, এতে এমন কোন রূহ বা জীবনীশক্তি রয়েছে, যার পরশে তাবৎ পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তা এসে আশ্রিত হতে চায়?
তাহলে শুনুন! বৈশ্বিক পর্যায়ের যে-কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক কথা যে, তাতে একক সত্তার চেষ্টা-প্রচেষ্টা সফল হয় না; বরং সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এটি এমন অমোঘ সত্য যাতে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তাই তো দেখা যায় প্রতিটি জাতি ও গোত্রের মাঝে যখন কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়, তখন এর পেছনে জাতির সামষ্টিক শক্তিই কাজ করে থাকে।
কিন্তু এখানে এসে বড় বড় লোকেরাও একটা ধোঁকায় পড়ে যান এবং সারা দুনিয়াও ওই একই ধোঁকার শিকার, যার দরুন তাদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাও বিশ্বব্যাপী সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়। তা এই যে, সমাজ ও সামাজিক শক্তির আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় বা ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়। বরং জনগণের সমষ্টির নাম সমাজ আর তাদের সামষ্টিক শক্তির নাম সামাজিক শক্তি। যদি কোনো জাতির জনগণ ভালো না হয়, তাহলে তাদের সমাজও ভালো হতে পারে না। ফালতু ও অকর্মা সদস্যদের পাল সংস্কারমূলক কোনো কাজ করতে পারে না; বরং সেটিকে ধরেও রাখতে পারে না। সমাজের অঙ্গনে জাতি ও জনতার অবস্থান ঠিক তেমন, যেমন একটি মেশিনের মধ্যে তার পার্টস-এর অবস্থান। যদি পার্টস ঠিকঠাক না হয় তাহলে মেশিনের ফিটিং ঠিক হতে পারে না। ফিটিং করলেও তা টেকসই হবে না, দীর্ঘ সময় চলতে পারবে না।
📄 সামগ্রিক কাজের পূর্বে ব্যক্তিগত
জ্ঞানীদের জ্ঞানী, সর্বশেষ নবী এই গুরুতত্ত্ব উপলব্ধি করেছেন। ফলে তিনি এ নীতি অবলম্বন করেছেন যে, কোনো সমষ্টিগত কাজ করার পূর্বে প্রথমে ব্যক্তিগঠনের কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূলত এই কাজই সবচেয়ে বেশি জটিল। একজন ব্যক্তির মেধা ও মননকে সুস্থ মানসিকতার উপর নিয়ে আসা, এরপর তার কার্যকলাপ এবং চরিত্রকে সেই মানসিকতা অনুযায়ী গড়ে তোলা অনেক সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
📄 মক্কী যুগ কেবল ব্যক্তিগতই ব্যয় হয়েছে
নবুওত লাভের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বমোট তেইশ বছর হায়াত পেয়েছিলেন। তন্মধ্য থেকে মক্কীজীবনে তেরো বছর কেবল এই ব্যক্তিগঠনের কাজে ব্যয় হয়েছিল।
মক্কী ও মাদানী যুগের বিশ্লেষণকারী কতিপয় লোক এ দু'যুগকে ইসলামের দুর্বলতা ও সক্ষমতার দুই অবস্থায় ভাগ করে মক্কী জীবনকে দুর্বলতা আর মাদানী জীবনকে সক্ষমতার যুগ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এরপর নবী জীবনের বিভিন্ন বিধান ও ঘটনাকে এ দু'অবস্থার অধীভুক্ত করে পার্থক্য ও বিশ্লেষণ করেছেন।
তবে যদি একটু গভীরভাবে দেখা হয় তাহলে বোঝা যায়, কেবল দুর্বলতা ও সক্ষমতাই আহকামের তারতম্যের কারণ নয়; বরং অন্যান্য হেকমতও এখানে লুকিয়ে আছে। নতুবা এ দুর্বলতা সত্ত্বেও মক্কার মুশরিকদের বাড়াবাড়ির কিছু না কিছু জবাব তো মক্কাতেও দেওয়া সম্ভব ছিল। বাহ্যত সে হেকমত এটাই ছিল যে, মক্কীজীবনে ব্যক্তিগঠনের কাজ অগ্রগণ্য ছিল। কোনো সামষ্টিক কাজ, চাই তা আত্মরক্ষামূলক হোক বা অগ্রসরমূলক, (ব্যক্তিগঠন) এর পূর্বে সম্ভব নয়।
কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো মেশিনের পার্টস ঠিক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দ্বারা কোনো মেশিন এবং ফ্যাক্টরি তৈরি অসম্ভব?
📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পতাকাবাহী হয়ে আগমন করেছেন। তাই তার অনুসন্ধানী চোখ এদিকে নিবদ্ধ হয়েছে যে, এই কাজ না একা কোনো রাষ্ট্র ও সালতানাতের পক্ষে সম্ভব, না কেবল আইন ও আইনি প্রচারের মাধ্যমে সম্ভব; বরং যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে সঠিক অর্থে মানুষ বানানো না হবে এবং তাকে সুস্থ মানবিকতার সাথে পরিচিত না করানো হবে, ততক্ষণ এই পৃথিবী জুলুম অত্যাচার, হত্যা, দ্বন্দ্ব-কলহ, নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনার নরক হয়েই থাকবে।
কেননা রাষ্ট্র তো প্রতিটি কাজ নিজের সহযোগী শ্রেণির মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করে থাকে। কোনো আইনই তো নয় স্বয়ংক্রিয় মেশিন যে, সে নিজে নিজেই চলবে; বরং সেটিকে বাস্তবায়ন করার জন্য মানুষেরই প্রয়োজন। মানুষ যদি সঠিক অর্থে মানুষ না হয়, তাহলে কোনো আইন, কোনো সংবিধান ও কোনো রাষ্ট্র কোনো মন্দের সংশোধন ও অপরাধ দমন করে কোনোভাবেই পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা সৃষ্টি করতে পারবে না।
এজন্য মক্কী জীবনের তেরো বছর পুরোটাই কেবল ব্যক্তিগঠনের কাজে ব্যয় হয়েছে। যেখানে নবুওতী প্রজ্ঞার মাধ্যমে কিছু মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করা হয়েছে। এই ব্যক্তিগঠনের কাজ হয়েছে মক্কা মুকাররমার এক অখ্যাত প্রান্তে, ছোট্ট একটি জায়গায়। যেটি ‘দারে আরকাম’ নামে পরিচিত। সাফা-মারওয়ার মাঝে ছিল এর অবস্থান। বর্তমান হারাম শরীফ সম্প্রসারণের পূর্ব পর্যন্ত সেটি বিদ্যমান ছিল। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এই জায়গাতেই উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার নবীজির প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। এরপর সেই তিনিই ইসলামে দীক্ষিত হয়ে তাঁর গোলামীর সৌভাগ্য নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বের নবীগণের ন্যায় বিশেষ কোনো জাতি, ভূখণ্ড বা বিশেষ যুগের রাসূল হয়ে আগমন করেননি। তাঁর আগমন ও দাওয়াত সমগ্র পৃথিবীর জিন-ইনসানের জন্য। কেয়ামত পর্যন্ত আগত সকল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তাঁকে এই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছে যে, গোটা পৃথিবীকে পরিশুদ্ধ করে সকল মানুষকে দুনিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা, সম্মান ও সুস্থতার জীবনের সন্ধান দেবেন। এবং পরকালে তাদের প্রভুর সামনে দাড়াবার উপযুক্ত করবেন এবং সেখানকার চিরস্থায়ী শান্তির অধিকারীরূপে গড়ে তুলবেন।
এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য নবীজির সামনে সর্বপ্রথম কাজ ছিল কিছু মানুষকে গড়ে আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যে সমাজ এই মহান লক্ষ্য সাধনে তাঁর হস্ত ও বাহুতে পরিণত হবে এবং ভবিষ্যতে এই মহান দায়িত্ব তারা নিজেই আঞ্জাম দিতে সক্ষম হবে।
ব্যক্তিগঠনের এ মহান কাজ, যা দারুল আরকামের অখ্যাত গৃহে শুরু হয়েছিল, তার সংক্ষিপ্ত কথা তো হলো মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো। আর তার বিস্তারিত রূপরেখা হলো, কুরআন মাজীদের সেই বিশাল অংশখানি যা মক্কী যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল। সে অংশজুড়ে যে সমস্ত হেদায়াত ও নির্দেশনাবলি প্রদত্ত হয়েছে তার সারনির্যাস তৈরি করা হলে মৌলিক কয়েকটি বিষয় সম্মুখে আসে, যা একজন মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বিষয়গুলো হলো-
১. আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও ভালোবাসা।
২. আখেরাতের ফিকির।
৩. দুনিয়ার ক্ষুদ্র জীবন এবং এর সুখ-দুঃখের স্বরূপ উন্মোচন।
৪. সৃষ্টিজীবের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার পূর্ণরূপে আদায় করা আর নিজ অধিকার সম্পর্কে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখা। মানুষের জ্বালাতনকে ক্ষমা করা এবং নিজের পক্ষ থেকে সর্বাবস্থায় তাদের প্রতি কল্যাণ কামনা ও সহমর্মিতা অব্যাহত রাখা।
মক্কীজীবনের সমস্ত সূরা ও আয়াত গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে লক্ষ করা যাবে কত অলৌকিক ও অভাবনীয় উপস্থাপনায় মানুষের মন-মননকে এ মৌলিক বিষয়গুলোর শিক্ষা ও নির্দেশনার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ওহীর সূচনাকালীন প্রাথমিক সূরাগুলো পড়ুন, তাহলে দেখবেন সেখানে অধিকহারে আল্লাহর যিকির এবং সুন্দরভাবে ইবাদতের প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এই বিশ্বাসের প্রতিও জোর দেওয়া হয়েছে যে, বান্দার জীবনে যা-কিছু ঘটনা ঘটে তা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও অনুমতিক্রমে ঘটে। তিনি ছাড়া কোনো শত্রু-মিত্রের পক্ষে কারও উপকার বা ক্ষতি করার সাধ্য নেই।
এ বিষয়েও খুব জোর দেওয়া হয়েছে যে, সমস্ত কাজে কেবল আল্লাহর উপর ভরসা ও তাওয়াক্কুল করা হবে। কিয়ামতের হিসাব নিকাশ, শাস্তি-প্রতিদান, জান্নাত-জাহান্নামের ফিকির থেকে কখনো উদাসীন হওয়া যাবে না। পার্থিব জীবন এবং এর সব ধরনের সুখ ও দুঃখ অস্থায়ী, এর উপর বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত না। একে প্রয়োজন পরিমাণ রাখা উচিত। জীবনের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও ইবাদত এবং তাকে সন্তুষ্ট করা। এ পথে যত বাধা বিঘ্ন আসে সাহসিকতার সাথে সেগুলো অতিক্রম করা এবং কোনো বিপদাপদ এলে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে তা মোকাবিলা করা। মানুষজন যদি তোমার অধিকার আদায় না করে বা তোমার উপর জুলুম করে, তাহলে ক্ষমা করে তা উপেক্ষা কর। কখনোই তাদের থেকে কল্যাণকামী মনোভাব ত্যাগ করো না। তাদের যেসব অধিকার তোমার দায়িত্বে আছে, সেগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় কর।
সূরা ইকরা, ফাতেহা, মুজ্জাম্মিল, মুদ্দাছছির-ইত্যাদি প্রাথমিক সূরাগুলোর অনুবাদ পড়লেই এই কথাগুলোর পুরো সত্যতা মিলবে। এই সমস্ত শিক্ষার সারমর্ম হলো, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে এক আল্লাহর প্রতি ফিরিয়ে তার সমস্ত ইচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির অনুগামী বানিয়ে দেওয়া। যেমনিভাবে ইবাদত কেবল আল্লাহ তাআলার জন্য, তেমনি পার্থিব সমস্ত কর্মকাণ্ড—খাওয়া দাওয়া, শয়ন জাগরণ, চলাফেরা, জীবন-মৃত্যু, বন্ধুত্ব-শত্রুতা, ভালোবাসা-ঘৃণা সব আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির অনুগামী হতে হবে। নিম্নোক্ত আয়াত এ শিক্ষাই দেয়-
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ
‘বলে দাও, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত ও আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।”
টিকাঃ
৬. সূরা আনআম, আয়াত ১৬২