📄 ইসলামের বিস্ময়কর সফলতা তার মূলনীতি ও মতাদর্শেরই অপরিহার্য ফলাফল
কিছু অপরিপক্ক লোক এটা ভাবতে পারে যে, ইসলামের বিস্ময়কর উন্নতি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা। উপায়- উপকরণ কিংবা চেষ্টা-প্রচেষ্টার কোনো ভূমিকা এখানে নেই।
একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, এ কথাও সঠিক নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য মুজিযা রয়েছে এবং আপন স্থানে সেগুলো সুনিশ্চিতও বটে। এই সমস্ত রাজ্যজয়েও সেটার প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু এরপরও এ কথা বলা যায় না যে, এই সফলতা একটি মুজিযা ও অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যা একবার ঘটে গেছে এখন আর ঘটা সম্ভব নয়। বরং বাস্তবতা হলো ইসলামের মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা উপকরণগত পর্যায়েও এমন অবস্থানে রয়েছে যে, যদি এগুলোকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে তার ফলাফল ও বরকত প্রতি যুগে, প্রতি ভূখণ্ডে প্রকাশ পাবে। কবি বড় সুন্দর বলেছেন,
فضائے بدر پیدا کر فرشتے تیری نصرت کو
اتر سکتے ہیں گردوں سے قطار اندر قطار اب بھی
‘বদরের পরিবেশ সৃষ্টি করো।
তাহলে আসমান থেকে এখনো নামতে পারে
কাতারে কাতারে ফেরেশতাদের বাহিনী।'
📄 ইসলামী মতাদর্শ এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থাই পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে
এই প্রবন্ধে মূলত আমার এ বিষয়টি দেখানো উদ্দেশ্য যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম জীবনাদর্শ—যা সারা দুনিয়াকে একটি সঠিক মতাদর্শ ও মজবুত ইনসাফভিত্তিক জীবনব্যবস্থা দান করেছে—তা আপন স্থানে পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দান করে। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করার জন্য এই জীবনব্যবস্থার কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখুন যে, এতে এমন কোন রূহ বা জীবনীশক্তি রয়েছে, যার পরশে তাবৎ পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তা এসে আশ্রিত হতে চায়?
তাহলে শুনুন! বৈশ্বিক পর্যায়ের যে-কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক কথা যে, তাতে একক সত্তার চেষ্টা-প্রচেষ্টা সফল হয় না; বরং সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এটি এমন অমোঘ সত্য যাতে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তাই তো দেখা যায় প্রতিটি জাতি ও গোত্রের মাঝে যখন কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়, তখন এর পেছনে জাতির সামষ্টিক শক্তিই কাজ করে থাকে।
কিন্তু এখানে এসে বড় বড় লোকেরাও একটা ধোঁকায় পড়ে যান এবং সারা দুনিয়াও ওই একই ধোঁকার শিকার, যার দরুন তাদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাও বিশ্বব্যাপী সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়। তা এই যে, সমাজ ও সামাজিক শক্তির আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় বা ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়। বরং জনগণের সমষ্টির নাম সমাজ আর তাদের সামষ্টিক শক্তির নাম সামাজিক শক্তি। যদি কোনো জাতির জনগণ ভালো না হয়, তাহলে তাদের সমাজও ভালো হতে পারে না। ফালতু ও অকর্মা সদস্যদের পাল সংস্কারমূলক কোনো কাজ করতে পারে না; বরং সেটিকে ধরেও রাখতে পারে না। সমাজের অঙ্গনে জাতি ও জনতার অবস্থান ঠিক তেমন, যেমন একটি মেশিনের মধ্যে তার পার্টস-এর অবস্থান। যদি পার্টস ঠিকঠাক না হয় তাহলে মেশিনের ফিটিং ঠিক হতে পারে না। ফিটিং করলেও তা টেকসই হবে না, দীর্ঘ সময় চলতে পারবে না।
📄 সামগ্রিক কাজের পূর্বে ব্যক্তিগত
জ্ঞানীদের জ্ঞানী, সর্বশেষ নবী এই গুরুতত্ত্ব উপলব্ধি করেছেন। ফলে তিনি এ নীতি অবলম্বন করেছেন যে, কোনো সমষ্টিগত কাজ করার পূর্বে প্রথমে ব্যক্তিগঠনের কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূলত এই কাজই সবচেয়ে বেশি জটিল। একজন ব্যক্তির মেধা ও মননকে সুস্থ মানসিকতার উপর নিয়ে আসা, এরপর তার কার্যকলাপ এবং চরিত্রকে সেই মানসিকতা অনুযায়ী গড়ে তোলা অনেক সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
📄 মক্কী যুগ কেবল ব্যক্তিগতই ব্যয় হয়েছে
নবুওত লাভের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বমোট তেইশ বছর হায়াত পেয়েছিলেন। তন্মধ্য থেকে মক্কীজীবনে তেরো বছর কেবল এই ব্যক্তিগঠনের কাজে ব্যয় হয়েছিল।
মক্কী ও মাদানী যুগের বিশ্লেষণকারী কতিপয় লোক এ দু'যুগকে ইসলামের দুর্বলতা ও সক্ষমতার দুই অবস্থায় ভাগ করে মক্কী জীবনকে দুর্বলতা আর মাদানী জীবনকে সক্ষমতার যুগ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এরপর নবী জীবনের বিভিন্ন বিধান ও ঘটনাকে এ দু'অবস্থার অধীভুক্ত করে পার্থক্য ও বিশ্লেষণ করেছেন।
তবে যদি একটু গভীরভাবে দেখা হয় তাহলে বোঝা যায়, কেবল দুর্বলতা ও সক্ষমতাই আহকামের তারতম্যের কারণ নয়; বরং অন্যান্য হেকমতও এখানে লুকিয়ে আছে। নতুবা এ দুর্বলতা সত্ত্বেও মক্কার মুশরিকদের বাড়াবাড়ির কিছু না কিছু জবাব তো মক্কাতেও দেওয়া সম্ভব ছিল। বাহ্যত সে হেকমত এটাই ছিল যে, মক্কীজীবনে ব্যক্তিগঠনের কাজ অগ্রগণ্য ছিল। কোনো সামষ্টিক কাজ, চাই তা আত্মরক্ষামূলক হোক বা অগ্রসরমূলক, (ব্যক্তিগঠন) এর পূর্বে সম্ভব নয়।
কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো মেশিনের পার্টস ঠিক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দ্বারা কোনো মেশিন এবং ফ্যাক্টরি তৈরি অসম্ভব?