📄 ইসলাম ও তরবারির কল্পকাহিনি
ইসলামের এই বিস্ময়কর উন্নতিতে সারা বিশ্বের পক্ষ-বিপক্ষ উভয় শ্রেণি বিস্মিত ছিল। ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকদের গ্রন্থগুলো এ ব্যাপারে বিস্ময়োক্তিতে ভরপুর। কতিপয় সাম্প্রদায়িক লোক এমনও আছে, যখন তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না তখন বলতে থাকে—ইসলাম তরবারির জোরে বিস্তার লাভ করেছে। আর এটা এমন এক মিথ্যা অপবাদ— হয়তো আকাশের নীচে, যমীনের উপরে এত বড় মিথ্যা আর বলা হয়নি।
আর সব বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে যদি কেউ অন্তত এ কথা তাদের জিজ্ঞেস করে যে, যেসকল লোকদেরকে তরবারির ঝংকার আর তির বর্ষণের মাধ্যমে ইসলামে দাখিল করা হয়েছে, আমল ও আচরণের উৎকর্ষে তাদেরও কি সেই অবস্থা হওয়ার কথা, যা প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত? যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং ইসলামের জন্য এমন উৎসর্গিতপ্রাণ ছিলেন যে, এর সামনে না ধনসম্পদের পরোয়া ছিল, না স্ত্রী-সন্তানের আর না নিজের দেহ-মনের।
উপরন্তু কেউ তাদের জিজ্ঞেস করুক তো, তরবারির কাজ তো ইসলামের একেবারে শেষ দশ বছরে হয়েছিল, মক্কা মুকাররমায় থাকা অবস্থায় ইসলামের বিস্তার এবং এতে প্রবেশকারীদের যেই আধিক্য মক্কার কুরাইশদের ভীত করে তুলেছিল, ওই সময় কোন তরবারি চালানো হয়েছিল?
বরং হয়েছে এর খেলাফ কিছু। তখনকার সময়ে ইসলাম গ্রহণে বাধা দেওয়ার জন্য প্রতিটি তলোয়ার, প্রতিটি তাগুতিশক্তি পূর্ণ উদ্যমে ময়দানে নেমে এসেছিল। হযরত বেলাল হাবশী রাদিয়াল্লাহু আনহুর বুকের উপর পাথর রেখে তাকে আহাদ আহাদ বলা থেকে বাধা দেওয়া হতো। সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলার কারণে চপেটাঘাত করা হয়েছিল। হযরত সুহাইব রূমী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপর বৃষ্টির মতো তির বর্ষণ করা হয়েছিল। এক কথায় এমন কোনো জুলুম নির্যাতন ছিল না, যা নও-মুসলিমদের উপর প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু আল্লাহর বান্দারা তাগুতি শক্তির বলয়ের নীচে মৃত্যুর সাথে খেলা করে করেও মুসলমান হচ্ছিলেন।
এটাও তো একটু ভাবুন যে, তরবারি তো তখনই চালানো হয় যখন তরবারিচালকদের কিছু শক্তি সঞ্চয় হয়। তাহলে বলুন, এই তরবারি চালকদেরইবা কোন তলোয়ার ইসলামের এমন আত্মোৎসর্গকারী বানিয়েছিল যে, মাথায় কাফন বেঁধে প্রতিটি ময়দানে জানবাজি রেখে লড়াই করতে দেখা যেত তাদের?
বাস্তবতা হলো এই ডাহা মিথ্যা কথার অপনোদন করাও সত্যকে অপমান করার নামান্তর।
📄 ইসলামের বিস্ময়কর সফলতা তার মূলনীতি ও মতাদর্শেরই অপরিহার্য ফলাফল
কিছু অপরিপক্ক লোক এটা ভাবতে পারে যে, ইসলামের বিস্ময়কর উন্নতি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা। উপায়- উপকরণ কিংবা চেষ্টা-প্রচেষ্টার কোনো ভূমিকা এখানে নেই।
একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, এ কথাও সঠিক নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য মুজিযা রয়েছে এবং আপন স্থানে সেগুলো সুনিশ্চিতও বটে। এই সমস্ত রাজ্যজয়েও সেটার প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু এরপরও এ কথা বলা যায় না যে, এই সফলতা একটি মুজিযা ও অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যা একবার ঘটে গেছে এখন আর ঘটা সম্ভব নয়। বরং বাস্তবতা হলো ইসলামের মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা উপকরণগত পর্যায়েও এমন অবস্থানে রয়েছে যে, যদি এগুলোকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে তার ফলাফল ও বরকত প্রতি যুগে, প্রতি ভূখণ্ডে প্রকাশ পাবে। কবি বড় সুন্দর বলেছেন,
فضائے بدر پیدا کر فرشتے تیری نصرت کو
اتر سکتے ہیں گردوں سے قطار اندر قطار اب بھی
‘বদরের পরিবেশ সৃষ্টি করো।
তাহলে আসমান থেকে এখনো নামতে পারে
কাতারে কাতারে ফেরেশতাদের বাহিনী।'
📄 ইসলামী মতাদর্শ এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থাই পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে
এই প্রবন্ধে মূলত আমার এ বিষয়টি দেখানো উদ্দেশ্য যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম জীবনাদর্শ—যা সারা দুনিয়াকে একটি সঠিক মতাদর্শ ও মজবুত ইনসাফভিত্তিক জীবনব্যবস্থা দান করেছে—তা আপন স্থানে পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দান করে। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করার জন্য এই জীবনব্যবস্থার কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখুন যে, এতে এমন কোন রূহ বা জীবনীশক্তি রয়েছে, যার পরশে তাবৎ পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তা এসে আশ্রিত হতে চায়?
তাহলে শুনুন! বৈশ্বিক পর্যায়ের যে-কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক কথা যে, তাতে একক সত্তার চেষ্টা-প্রচেষ্টা সফল হয় না; বরং সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এটি এমন অমোঘ সত্য যাতে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তাই তো দেখা যায় প্রতিটি জাতি ও গোত্রের মাঝে যখন কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়, তখন এর পেছনে জাতির সামষ্টিক শক্তিই কাজ করে থাকে।
কিন্তু এখানে এসে বড় বড় লোকেরাও একটা ধোঁকায় পড়ে যান এবং সারা দুনিয়াও ওই একই ধোঁকার শিকার, যার দরুন তাদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাও বিশ্বব্যাপী সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়। তা এই যে, সমাজ ও সামাজিক শক্তির আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় বা ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়। বরং জনগণের সমষ্টির নাম সমাজ আর তাদের সামষ্টিক শক্তির নাম সামাজিক শক্তি। যদি কোনো জাতির জনগণ ভালো না হয়, তাহলে তাদের সমাজও ভালো হতে পারে না। ফালতু ও অকর্মা সদস্যদের পাল সংস্কারমূলক কোনো কাজ করতে পারে না; বরং সেটিকে ধরেও রাখতে পারে না। সমাজের অঙ্গনে জাতি ও জনতার অবস্থান ঠিক তেমন, যেমন একটি মেশিনের মধ্যে তার পার্টস-এর অবস্থান। যদি পার্টস ঠিকঠাক না হয় তাহলে মেশিনের ফিটিং ঠিক হতে পারে না। ফিটিং করলেও তা টেকসই হবে না, দীর্ঘ সময় চলতে পারবে না।
📄 সামগ্রিক কাজের পূর্বে ব্যক্তিগত
জ্ঞানীদের জ্ঞানী, সর্বশেষ নবী এই গুরুতত্ত্ব উপলব্ধি করেছেন। ফলে তিনি এ নীতি অবলম্বন করেছেন যে, কোনো সমষ্টিগত কাজ করার পূর্বে প্রথমে ব্যক্তিগঠনের কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মূলত এই কাজই সবচেয়ে বেশি জটিল। একজন ব্যক্তির মেধা ও মননকে সুস্থ মানসিকতার উপর নিয়ে আসা, এরপর তার কার্যকলাপ এবং চরিত্রকে সেই মানসিকতা অনুযায়ী গড়ে তোলা অনেক সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার।