📄 পুরো জাতির বিরোধিতা, কঠিন বিপদাপদ এবং বিস্ময়কর সফলতা
যেখানে উঁচু আওয়াজে আযান দেওয়ার সুযোগ ছিল না, যেখানে বন্ধুত্বের উত্তরে শত্রুতা, কল্যাণকামিতার প্রত্যুত্তরে পাথর নিক্ষেপ, সত্য কথনের জবাবে গালাগালি ছাড়া আর কিছুই ছিল না, ওই অবস্থায় কোনো সংস্কারমূলক কার্যক্রম কীইবা চলতে পারত? আর বড় থেকে বড় মহান সংস্কারক কীইবা করতে পারতেন? কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, আল্লাহর মাখলুকের প্রতি সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতার ব্যাকুলতা, পাশাপাশি অক্লান্ত চেষ্টা এবং নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে নিরাশ না হওয়া ইত্যাদি গুণাবলী এমন প্রবল মাত্রায় ছিল যে, এর ফলে একসময় তিনি বিজয়ী হয়ে আভির্ভূত হন।
মক্কীজীবন তো এভাবেই অতিবাহিত হলো। মদীনায় হিজরতের পরবর্তী দশ বছরের যুগ এমন ছিল, যাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং গঠনমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের যুগ বলা যেতে পারে। কিন্তু এই দশ বছর সময়েও বদর, উহুদ, খন্দক, খাইবার, মক্কা বিজয়-এর মতো বড় বড় যুদ্ধ এবং এরকম সাতাশটি গাযওয়া সংঘটিত হয়, যাতে দোজাহানের বাদশা স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। আর সাতচল্লিশটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেননি; বরং সাহাবায়ে কেরামদের পাঠিয়েছেন, এগুলোকে সারিয়্যা বলা হয়। সাতাশটি গাযওয়া ও সাতচল্লিশটি সারিয়্যা মোট চুয়াত্তরটি যুদ্ধ এই দশ বছরে করতে হয়। এই সময়ে অন্য গোত্রগুলোর সাথে সন্ধিস্থাপনও হয়েছে এবং তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় চুক্তি ভঙ্গের ঘটনাও ঘটে।
যদি পৃথিবী ও পৃথিবীর জাতিসমূহের ইতিহাসের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে কেউ এটা ভাবতে পারে কি যে, এমন ব্যস্ততায় জর্জরিত থাকা কোনো রাষ্ট্র মাত্র দশ বছরের মাথায় গঠনমূলক কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে! কিন্তু পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে যে, নবীযুগের এই দশ বছরে পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে এসে গিয়েছিল, যার প্রতিটি বসতি আযান ও কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজে গুঞ্জরিত হতো। এর প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি ভূখণ্ডে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত ব্যক্তিগণ অত্যন্ত দাপটের সাথে ইসলামী বিধিবিধান বাস্তবায়ন করতেন। পুরো ইসলামী ভূখণ্ডে তাৎক্ষণিকভাবে ও বাধ্যতামূলকভাবে ন্যায় ও ইনসাফ কার্যকর ছিল। শান্তি ও নিরাপত্তার এমন পরিবেশ সৃষ্টি ছিল যে, যে অঞ্চলে শত শত বছর ধরে কারও পক্ষে স্বাধীনভাবে সফর করা সম্ভব ছিল না, সে অঞ্চলে একজন বৃদ্ধা পর্যন্ত অত্যন্ত স্বাধীনভাবে সফর করতে পারতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর যুগেই পূর্ণ হয়েছিল যে, একটা সময় আসবে যখন এ মানুষ ইয়ামানের সানআ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত একাকী ভ্রমণ করতে পারবে। আল্লাহর ভয় ছাড়া তার আর কারওরই ভয় থাকবে না।
যে রাষ্ট্রে কারও স্ত্রী-কন্যার ইজ্জত-সম্ভ্রম নিরাপদ ছিল না, সেখানে গায়রে মাহরামের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকাবার লোকও ছিল না। পারস্য উপসাগর থেকে নিয়ে সিরিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত এমন শান্তি-নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা খোদ নবীযুগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পঁচিশ বছর যেতে না যেতেই এই ইসলামী মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা তাঁর সাহাবায়ে কেরামের হাতে বৈদ্যুতিক যানের চেয়েও অধিক দ্রুতগতিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
📄 ইসলাম ও তরবারির কল্পকাহিনি
ইসলামের এই বিস্ময়কর উন্নতিতে সারা বিশ্বের পক্ষ-বিপক্ষ উভয় শ্রেণি বিস্মিত ছিল। ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকদের গ্রন্থগুলো এ ব্যাপারে বিস্ময়োক্তিতে ভরপুর। কতিপয় সাম্প্রদায়িক লোক এমনও আছে, যখন তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না তখন বলতে থাকে—ইসলাম তরবারির জোরে বিস্তার লাভ করেছে। আর এটা এমন এক মিথ্যা অপবাদ— হয়তো আকাশের নীচে, যমীনের উপরে এত বড় মিথ্যা আর বলা হয়নি।
আর সব বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে যদি কেউ অন্তত এ কথা তাদের জিজ্ঞেস করে যে, যেসকল লোকদেরকে তরবারির ঝংকার আর তির বর্ষণের মাধ্যমে ইসলামে দাখিল করা হয়েছে, আমল ও আচরণের উৎকর্ষে তাদেরও কি সেই অবস্থা হওয়ার কথা, যা প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত? যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং ইসলামের জন্য এমন উৎসর্গিতপ্রাণ ছিলেন যে, এর সামনে না ধনসম্পদের পরোয়া ছিল, না স্ত্রী-সন্তানের আর না নিজের দেহ-মনের।
উপরন্তু কেউ তাদের জিজ্ঞেস করুক তো, তরবারির কাজ তো ইসলামের একেবারে শেষ দশ বছরে হয়েছিল, মক্কা মুকাররমায় থাকা অবস্থায় ইসলামের বিস্তার এবং এতে প্রবেশকারীদের যেই আধিক্য মক্কার কুরাইশদের ভীত করে তুলেছিল, ওই সময় কোন তরবারি চালানো হয়েছিল?
বরং হয়েছে এর খেলাফ কিছু। তখনকার সময়ে ইসলাম গ্রহণে বাধা দেওয়ার জন্য প্রতিটি তলোয়ার, প্রতিটি তাগুতিশক্তি পূর্ণ উদ্যমে ময়দানে নেমে এসেছিল। হযরত বেলাল হাবশী রাদিয়াল্লাহু আনহুর বুকের উপর পাথর রেখে তাকে আহাদ আহাদ বলা থেকে বাধা দেওয়া হতো। সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলার কারণে চপেটাঘাত করা হয়েছিল। হযরত সুহাইব রূমী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপর বৃষ্টির মতো তির বর্ষণ করা হয়েছিল। এক কথায় এমন কোনো জুলুম নির্যাতন ছিল না, যা নও-মুসলিমদের উপর প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু আল্লাহর বান্দারা তাগুতি শক্তির বলয়ের নীচে মৃত্যুর সাথে খেলা করে করেও মুসলমান হচ্ছিলেন।
এটাও তো একটু ভাবুন যে, তরবারি তো তখনই চালানো হয় যখন তরবারিচালকদের কিছু শক্তি সঞ্চয় হয়। তাহলে বলুন, এই তরবারি চালকদেরইবা কোন তলোয়ার ইসলামের এমন আত্মোৎসর্গকারী বানিয়েছিল যে, মাথায় কাফন বেঁধে প্রতিটি ময়দানে জানবাজি রেখে লড়াই করতে দেখা যেত তাদের?
বাস্তবতা হলো এই ডাহা মিথ্যা কথার অপনোদন করাও সত্যকে অপমান করার নামান্তর।
📄 ইসলামের বিস্ময়কর সফলতা তার মূলনীতি ও মতাদর্শেরই অপরিহার্য ফলাফল
কিছু অপরিপক্ক লোক এটা ভাবতে পারে যে, ইসলামের বিস্ময়কর উন্নতি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা। উপায়- উপকরণ কিংবা চেষ্টা-প্রচেষ্টার কোনো ভূমিকা এখানে নেই।
একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, এ কথাও সঠিক নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য মুজিযা রয়েছে এবং আপন স্থানে সেগুলো সুনিশ্চিতও বটে। এই সমস্ত রাজ্যজয়েও সেটার প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু এরপরও এ কথা বলা যায় না যে, এই সফলতা একটি মুজিযা ও অতিপ্রাকৃত ঘটনা, যা একবার ঘটে গেছে এখন আর ঘটা সম্ভব নয়। বরং বাস্তবতা হলো ইসলামের মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা উপকরণগত পর্যায়েও এমন অবস্থানে রয়েছে যে, যদি এগুলোকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে তার ফলাফল ও বরকত প্রতি যুগে, প্রতি ভূখণ্ডে প্রকাশ পাবে। কবি বড় সুন্দর বলেছেন,
فضائے بدر پیدا کر فرشتے تیری نصرت کو
اتر سکتے ہیں گردوں سے قطار اندر قطار اب بھی
‘বদরের পরিবেশ সৃষ্টি করো।
তাহলে আসমান থেকে এখনো নামতে পারে
কাতারে কাতারে ফেরেশতাদের বাহিনী।'
📄 ইসলামী মতাদর্শ এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থাই পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে
এই প্রবন্ধে মূলত আমার এ বিষয়টি দেখানো উদ্দেশ্য যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তম জীবনাদর্শ—যা সারা দুনিয়াকে একটি সঠিক মতাদর্শ ও মজবুত ইনসাফভিত্তিক জীবনব্যবস্থা দান করেছে—তা আপন স্থানে পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দান করে। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করার জন্য এই জীবনব্যবস্থার কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখুন যে, এতে এমন কোন রূহ বা জীবনীশক্তি রয়েছে, যার পরশে তাবৎ পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তা এসে আশ্রিত হতে চায়?
তাহলে শুনুন! বৈশ্বিক পর্যায়ের যে-কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা খুবই স্বাভাবিক কথা যে, তাতে একক সত্তার চেষ্টা-প্রচেষ্টা সফল হয় না; বরং সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এটি এমন অমোঘ সত্য যাতে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই। তাই তো দেখা যায় প্রতিটি জাতি ও গোত্রের মাঝে যখন কোনো সংস্কারমূলক আন্দোলন শুরু হয়, তখন এর পেছনে জাতির সামষ্টিক শক্তিই কাজ করে থাকে।
কিন্তু এখানে এসে বড় বড় লোকেরাও একটা ধোঁকায় পড়ে যান এবং সারা দুনিয়াও ওই একই ধোঁকার শিকার, যার দরুন তাদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাও বিশ্বব্যাপী সংস্কারের ক্ষেত্রে ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়। তা এই যে, সমাজ ও সামাজিক শক্তির আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই, যা আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয় বা ভূমি থেকে উৎপন্ন হয়। বরং জনগণের সমষ্টির নাম সমাজ আর তাদের সামষ্টিক শক্তির নাম সামাজিক শক্তি। যদি কোনো জাতির জনগণ ভালো না হয়, তাহলে তাদের সমাজও ভালো হতে পারে না। ফালতু ও অকর্মা সদস্যদের পাল সংস্কারমূলক কোনো কাজ করতে পারে না; বরং সেটিকে ধরেও রাখতে পারে না। সমাজের অঙ্গনে জাতি ও জনতার অবস্থান ঠিক তেমন, যেমন একটি মেশিনের মধ্যে তার পার্টস-এর অবস্থান। যদি পার্টস ঠিকঠাক না হয় তাহলে মেশিনের ফিটিং ঠিক হতে পারে না। ফিটিং করলেও তা টেকসই হবে না, দীর্ঘ সময় চলতে পারবে না।