📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও দীক্ষাদানের বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য

📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও দীক্ষাদানের বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেবল জ্ঞানের ভাণ্ডারই দেওয়া হয়নি; বরং শিক্ষাদীক্ষার এমন পদ্ধতি দান করা হয়েছে যা অনুসরণ করে তিনি মূর্খ, অবুঝ, আত্মম্ভরি, বদমেজাজি, যুদ্ধংদেহী লোকদেরকেও পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত করেছিলেন। আধ্যাত্মিক এই মুমূর্ষু রোগীগুলো কেবল উপশমই লাভ করেনি; বরং পৃথিবীর অন্য সবার জন্য শুশ্রূষাকারীতেও পরিণত হয়েছে।
পৃথিবীর ন্যায়ানুরাগী অমুসলিম ব্যক্তিরাও আজ পর্যন্ত হযরত আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে রাজনীতি, সুবিচার ও ইনসাফের মানদণ্ড মানতে বাধ্য হয়।
মিস্টার গান্ধীর ওই দিকনির্দেশনা এখনো পর্যন্ত অনেক মানুষের মনে থাকার কথা, যা তিনি তার কংগ্রেসীয় মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন; তাতে তিনি বলেছিলেন, আবু বকর ও উমর এর ন্যায় শাসন করো। তখন এ নিয়ে তারই ধর্মের কিছু হিন্দু লোক আত্মমর্যাদা ও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের মানসে আপত্তি তুলল যে, আপনি হিন্দু সংস্কারবাদীদের মধ্য থেকে কারও নাম কেন নিলেন না? তখন মিস্টার গান্ধী উক্ত আপত্তির জবাবও দিয়েছিলেন স্বীয় ন্যায়ানুরাগ মানসিকতা থেকে এ শব্দ-বাক্যে— 'হিন্দু সংস্কারবাদীদের জীবনবৃত্তান্ত প্রাগৈতিহাসিক যুগের কল্পকাহিনী মাত্র। ইতিহাসে আমি আবু বকর ও উমরের চাইতে উত্তম কোনো শাসনামলের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই না।'
এই আবু বকর, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাও সেই নিরক্ষর সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন।
এখানে ভাবার বিষয় হলো, তাদের এই জ্ঞানগত ও কর্মগত চারিত্রিক সৌন্দর্য কোত্থেকে এল। তাঁরা না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সমাপনকারী ছিলেন, না কোনো অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। তারা স্রেফ নবীগণের নবী, দার্শনিকদের দার্শনিক হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছুদিনের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, যা-কিছু শিখেছেন সেখান থেকেই শিখেছেন।
হযরত সিদ্দীকে আকবর, ফারুকে আযম, উসমান গনী ও আলী মুর্তাযা রাযিয়াল্লাহু আনহুম তো খেলাফতে রাশেদার সদস্য। এ কারণে সবাই তাদের কথা জানে। কিন্তু যারা ইসলাম-পূর্ব আরব ও ইসলাম- পরবর্তী আরবের অবস্থার মাঝে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করবে, তাদের এটা বলা ছাড়া উপায় থাকবে না যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একেকজন সাহাবী তাঁর স্বতন্ত্র মুজিযা। তাদের জ্ঞানগত, কর্মগত, চরিত্রগত চিত্র আমূল পাল্টে যাওয়া নিঃসন্দেহে মুজিযা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুঅতপূর্ব জীবন

📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুঅতপূর্ব জীবন


নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের ৪০ বছর তো এমন নীরবতা ও একাগ্রতার মাঝে কেটেছে যে, মক্কার বাসিন্দারা তার নির্ভরযোগ্যতা, বিশ্বস্ততা ও ভদ্রতার গুণগ্রাহী হয়ে তাঁকে ‘আলআমীন’ অভিধায় স্মরণ করত। এ উপাধিতেই তিনি সমগ্র আরবে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি কখনো কোনো বাজারে, কোনো অনুষ্ঠানে, কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামায় অংশগ্রহণ করেননি। কবিতা আবৃত্তি আরবের স্বভাবজাত বিষয় ছিল। প্রতিটি নারী-পুরুষ কবিতা আবৃত্তি করত এবং গোত্রীয় সভাগুলোতে সেগুলো পাঠ করে শোনাত। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই বাহ্যিক প্রসিদ্ধি লাভের অনুষঙ্গ থেকেও আলাদা রেখেছেন। কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন-
وَمَا عَلَّمْتُهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ
‘আমি তাকে (অর্থাৎ রাসূলকে) কাব্যচর্চা করতে শিখাইনি এবং তা তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়।
মোটকথা, চল্লিশটি বছর তো পরিপূর্ণ নীরবতা ও একাগ্রতার মাঝেই কেটেছে। এরপর যখন নবুওত ও রিসালাতের দায়িত্ব প্রদান করা হলো এবং ওহী নাযিল আরম্ভ হলো, তখন ইতিহাস সাক্ষী যে ওহী নাযিল হওয়ার প্রাথমিক যে ১৩ বছর মক্কায় অতিবাহিত হয়েছে, এ সময়কাল তাঁর জন্য এবং তাঁর সহযোদ্ধা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ধৈর্য সঙ্কুল্যের সময় ছিল।

টিকাঃ
৫. সূরা ইয়াসীন, আয়াত ৬৯

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 পুরো জাতির বিরোধিতা, কঠিন বিপদাপদ এবং বিস্ময়কর সফলতা

📄 পুরো জাতির বিরোধিতা, কঠিন বিপদাপদ এবং বিস্ময়কর সফলতা


যেখানে উঁচু আওয়াজে আযান দেওয়ার সুযোগ ছিল না, যেখানে বন্ধুত্বের উত্তরে শত্রুতা, কল্যাণকামিতার প্রত্যুত্তরে পাথর নিক্ষেপ, সত্য কথনের জবাবে গালাগালি ছাড়া আর কিছুই ছিল না, ওই অবস্থায় কোনো সংস্কারমূলক কার্যক্রম কীইবা চলতে পারত? আর বড় থেকে বড় মহান সংস্কারক কীইবা করতে পারতেন? কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, আল্লাহর মাখলুকের প্রতি সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতার ব্যাকুলতা, পাশাপাশি অক্লান্ত চেষ্টা এবং নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতে নিরাশ না হওয়া ইত্যাদি গুণাবলী এমন প্রবল মাত্রায় ছিল যে, এর ফলে একসময় তিনি বিজয়ী হয়ে আভির্ভূত হন।
মক্কীজীবন তো এভাবেই অতিবাহিত হলো। মদীনায় হিজরতের পরবর্তী দশ বছরের যুগ এমন ছিল, যাকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং গঠনমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের যুগ বলা যেতে পারে। কিন্তু এই দশ বছর সময়েও বদর, উহুদ, খন্দক, খাইবার, মক্কা বিজয়-এর মতো বড় বড় যুদ্ধ এবং এরকম সাতাশটি গাযওয়া সংঘটিত হয়, যাতে দোজাহানের বাদশা স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। আর সাতচল্লিশটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেননি; বরং সাহাবায়ে কেরামদের পাঠিয়েছেন, এগুলোকে সারিয়‍্যা বলা হয়। সাতাশটি গাযওয়া ও সাতচল্লিশটি সারিয়‍্যা মোট চুয়াত্তরটি যুদ্ধ এই দশ বছরে করতে হয়। এই সময়ে অন্য গোত্রগুলোর সাথে সন্ধিস্থাপনও হয়েছে এবং তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় চুক্তি ভঙ্গের ঘটনাও ঘটে।
যদি পৃথিবী ও পৃথিবীর জাতিসমূহের ইতিহাসের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে কেউ এটা ভাবতে পারে কি যে, এমন ব্যস্ততায় জর্জরিত থাকা কোনো রাষ্ট্র মাত্র দশ বছরের মাথায় গঠনমূলক কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে! কিন্তু পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে যে, নবীযুগের এই দশ বছরে পুরো আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে এসে গিয়েছিল, যার প্রতিটি বসতি আযান ও কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজে গুঞ্জরিত হতো। এর প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি ভূখণ্ডে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত ব্যক্তিগণ অত্যন্ত দাপটের সাথে ইসলামী বিধিবিধান বাস্তবায়ন করতেন। পুরো ইসলামী ভূখণ্ডে তাৎক্ষণিকভাবে ও বাধ্যতামূলকভাবে ন্যায় ও ইনসাফ কার্যকর ছিল। শান্তি ও নিরাপত্তার এমন পরিবেশ সৃষ্টি ছিল যে, যে অঞ্চলে শত শত বছর ধরে কারও পক্ষে স্বাধীনভাবে সফর করা সম্ভব ছিল না, সে অঞ্চলে একজন বৃদ্ধা পর্যন্ত অত্যন্ত স্বাধীনভাবে সফর করতে পারতেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর যুগেই পূর্ণ হয়েছিল যে, একটা সময় আসবে যখন এ মানুষ ইয়ামানের সানআ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত একাকী ভ্রমণ করতে পারবে। আল্লাহর ভয় ছাড়া তার আর কারওরই ভয় থাকবে না।
যে রাষ্ট্রে কারও স্ত্রী-কন্যার ইজ্জত-সম্ভ্রম নিরাপদ ছিল না, সেখানে গায়রে মাহরামের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকাবার লোকও ছিল না। পারস্য উপসাগর থেকে নিয়ে সিরিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত এমন শান্তি-নিরাপত্তা, প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা খোদ নবীযুগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পঁচিশ বছর যেতে না যেতেই এই ইসলামী মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা তাঁর সাহাবায়ে কেরামের হাতে বৈদ্যুতিক যানের চেয়েও অধিক দ্রুতগতিতে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 ইসলাম ও তরবারির কল্পকাহিনি

📄 ইসলাম ও তরবারির কল্পকাহিনি


ইসলামের এই বিস্ময়কর উন্নতিতে সারা বিশ্বের পক্ষ-বিপক্ষ উভয় শ্রেণি বিস্মিত ছিল। ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকদের গ্রন্থগুলো এ ব্যাপারে বিস্ময়োক্তিতে ভরপুর। কতিপয় সাম্প্রদায়িক লোক এমনও আছে, যখন তারা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না তখন বলতে থাকে—ইসলাম তরবারির জোরে বিস্তার লাভ করেছে। আর এটা এমন এক মিথ্যা অপবাদ— হয়তো আকাশের নীচে, যমীনের উপরে এত বড় মিথ্যা আর বলা হয়নি।
আর সব বিষয় থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে যদি কেউ অন্তত এ কথা তাদের জিজ্ঞেস করে যে, যেসকল লোকদেরকে তরবারির ঝংকার আর তির বর্ষণের মাধ্যমে ইসলামে দাখিল করা হয়েছে, আমল ও আচরণের উৎকর্ষে তাদেরও কি সেই অবস্থা হওয়ার কথা, যা প্রথম যুগের মুসলমানদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত? যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং ইসলামের জন্য এমন উৎসর্গিতপ্রাণ ছিলেন যে, এর সামনে না ধনসম্পদের পরোয়া ছিল, না স্ত্রী-সন্তানের আর না নিজের দেহ-মনের।
উপরন্তু কেউ তাদের জিজ্ঞেস করুক তো, তরবারির কাজ তো ইসলামের একেবারে শেষ দশ বছরে হয়েছিল, মক্কা মুকাররমায় থাকা অবস্থায় ইসলামের বিস্তার এবং এতে প্রবেশকারীদের যেই আধিক্য মক্কার কুরাইশদের ভীত করে তুলেছিল, ওই সময় কোন তরবারি চালানো হয়েছিল?
বরং হয়েছে এর খেলাফ কিছু। তখনকার সময়ে ইসলাম গ্রহণে বাধা দেওয়ার জন্য প্রতিটি তলোয়ার, প্রতিটি তাগুতিশক্তি পূর্ণ উদ্যমে ময়দানে নেমে এসেছিল। হযরত বেলাল হাবশী রাদিয়াল্লাহু আনহুর বুকের উপর পাথর রেখে তাকে আহাদ আহাদ বলা থেকে বাধা দেওয়া হতো। সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কথা বলার কারণে চপেটাঘাত করা হয়েছিল। হযরত সুহাইব রূমী রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপর বৃষ্টির মতো তির বর্ষণ করা হয়েছিল। এক কথায় এমন কোনো জুলুম নির্যাতন ছিল না, যা নও-মুসলিমদের উপর প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু আল্লাহর বান্দারা তাগুতি শক্তির বলয়ের নীচে মৃত্যুর সাথে খেলা করে করেও মুসলমান হচ্ছিলেন।
এটাও তো একটু ভাবুন যে, তরবারি তো তখনই চালানো হয় যখন তরবারিচালকদের কিছু শক্তি সঞ্চয় হয়। তাহলে বলুন, এই তরবারি চালকদেরইবা কোন তলোয়ার ইসলামের এমন আত্মোৎসর্গকারী বানিয়েছিল যে, মাথায় কাফন বেঁধে প্রতিটি ময়দানে জানবাজি রেখে লড়াই করতে দেখা যেত তাদের?
বাস্তবতা হলো এই ডাহা মিথ্যা কথার অপনোদন করাও সত্যকে অপমান করার নামান্তর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00