📄 স্বভাবজাত ধর্ম হতে পারে সেটিই, যা দ্বীন-দুনিয়া এবং ইহ ও পরকালের সফলতার নিশ্চয়তা দান করে
সঠিক ও স্বভাবজাত ধর্ম তো সেটিই, যা খালিক ও মাখলুকের উভয়ের হককে আপন আপন স্থানে পূর্ণ করতে পারে। যার মাধ্যমে মানুষ একই সময়ে আল্লাহ তাআলার সাথেও পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, আবার সমস্ত মাখলুকের সাথেও। অর্থাৎ নিজ সত্তা, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রয়োজন সম্পাদন করতে পারে এবং আপন মালিক ও সৃষ্টিকর্তাকেও প্রতি কদমে সন্তুষ্ট রাখতে পারে।
হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সমস্ত নবী-রাসূল প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল খালিক ও মাখলুকের মধ্যকার এই সম্পর্ককে দৃঢ় ও মজবুত করা এবং মাখলুককে এই জীবনব্যবস্থার অনুসারী বানানো। সমস্ত আসমানীগ্রন্থ এই জীবনপন্থার ব্যাখ্যা ও পূর্ণতা দানের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছিল। এটাকেই বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য নবীগণ প্রেরিত হয়েছিলেন। এমন কোনো আসমানী ধর্ম ও শরীআত নেই, যাতে আল্লাহ তাআলা ও সৃষ্টিজগত উভয়ের অধিকার আদায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও বান্দার সাথে সম্পর্কের মাঝে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করা হয়নি। এ দুটো বিষয়কে আমরা ভিন্ন শব্দে মাআশ (ইহকালীন জীবন) ও মাআদ (পরকালীন জীবন) বলে ব্যক্ত করতে পারি।
প্রত্যেক নবী ও রাসূল নিজ নিজ যুগে মাআশ ও মাআদ উভয়টির সংরক্ষণ ও সফলতা নিশ্চিতকরণের যিম্মাদার হয়ে আগমন করেন। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে—মাআদ অর্থাৎ আখেরাতের জিন্দেগী থেকে যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে মাআশ তথা দুনিয়াবী জিন্দেগীও নির্ঝঞ্ঝাট ও আনন্দময় থাকে না। ঠিক তেমনি মাআশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাআদ এর ফিকিরও সফল হয় না। খ্রিষ্টানদের ধর্মে যেই রাহবানিয়াত (দুনিয়াবিমুখতা) শিক্ষা দেওয়া হয়, তা মূলত খ্রিষ্টানদেরই নিজস্ব আবিষ্কার। না আল্লাহ তাআলা এর নির্দেশ দিয়েছেন, না তাঁর রাসূল হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এমনটি বলেছেন। কুরআনুল কারীম স্পষ্টভাষায় বলেছে,
وَرَهْبَانِيَّةَ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَهَا عَلَيْهِمْ
'আর রাহবানিয়্যাতের যে বিষয়টা, তা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের উপর তা বাধ্যতামূলক করিনি।”
টিকাঃ
১. সূরা হাদীদ, আয়াত ২৭.
📄 রিসালাতের দায়িত্ব পালনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সফলতা অন্য সকল নবীর শীর্ষে
মোটকথা, না মাআদ ব্যতীত মাআশ ঠিক হতে পারে আর না (সাধারণত) মাআশ ব্যতীত সাধারণ লোকদের মাআদের ফিকির সফলতার মুখ দেখে। আর যেহেতু প্রত্যেক রাসূল আল্লাহ ও বান্দার মাঝে একটি যোগসূত্রের মর্যাদা রাখেন, তাই তার মূল দায়িত্ব এই হয় যে, তিনি মানুষের পরকালের পাশাপাশি ইহকালের জীবন সংশোধন করে দেবেন এবং পরকালের গুরুত্ব ও অগ্রগণ্যতা মানুষের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হতে বাধা দেবেন। এই দায়িত্ব পালনে যিনি যত বেশি সফল হবেন, আল্লাহ তাআলার কাছে তার মর্যাদা ততখানিই উঁচু হবে। তিনি ইরশাদ করেন-
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
অর্থ : এই যে রাসূলগণ, (যাদেরকে আমি মানুষের ইসলাহের জন্য পাঠিয়েছি) তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।'
রিসালাতের দায়িত্ব পালনে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সফলতা অন্য সকল নবীর শীর্ষে
দোজাহানের সরদার হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবীগণের সর্দার ও ইমামুল আম্বিয়া উপাধি দেওয়ার কারণও মানুষের সংশোধনের ক্ষেত্রে তাঁর বিস্ময়কর সাফল্য, যা পূর্ববর্তী সমস্ত নবীদের তুলনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মর্যাদা রাখে।
হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী হাশরের ময়দানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত পূর্ববর্তী সমস্ত নবীর উম্মতদের তুলনায় অধিক ও শ্রেষ্ঠ হবে।
অথচ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত হবার যুগটি এত ভয়ংকর অন্ধকার ও গোমরাহীপূর্ণ যুগ ছিল, যেখানে পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত প্রায় পুরো বিশ্ব আল্লাহ তাআলা থেকে নিজের সম্পর্ক সম্পূর্ণই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। মানুষ আল্লাহ ও পরকালকে ভুলে পৃথিবীর অন্যান্য জীবজন্তুর ন্যায় কেবল উদরপূর্তি ও ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাস অর্জনকেই সফলতার চূড়ান্ত মাত্রা মনে করে বসে ছিল। কুরআনে কারীম তাদের এই অবস্থাকেই বর্ণনা করেছে-
وَرَضُوا بِالْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَتُوا بِهَا
'এবং তারা পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ও তাতেই নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে।"
বাস্তব জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের কাছে এই যুগের উদাহরণ হলো ওই বাচ্চার ন্যায়, যে এক কোটি টাকার চেক ছুঁড়ে ফেলে একটি ঝুনঝুনি পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে গেছে। অন্তরদৃষ্টিসম্পন্নদের দৃষ্টিতে দুনিয়ার পেছনে প্রাণবিসর্জনকারীরা নাবালেগ বাচ্চার ন্যায়, যারা বাস্তবতার কোনো ধারণাই রাখে না। তাদের ব্যাপারে রোমের জ্ঞানীজন (মাওলানা রূমী) কী চমৎকারই না বলেছেন।
خلق اطفال اند جز مردِ خدا
نیست بالغ جز رسیده از ہوا
'আল্লাহওয়ালা ছাড়া বাকি মানুষেরা শিশুর ন্যায়।
প্রবৃত্তি থেকে মুক্তি না পেলে বালেগ হওয়া যায় না।'
দুনিয়ার রঙতামাশায় মত্ত হয়ে আল্লাহ ও আখেরাত বিস্মৃত ব্যক্তি দুনিয়ার রঙিন পর্দাকে নিজ প্রেয়সী মনে করে। তাই এখানে এমন একজন বাস্তব জ্ঞানের অধিকারী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাহবারের প্রয়োজন পড়ে, যিনি তার দৃষ্টিকে রঙিন পর্দা থেকে আরও অগ্রসর করে মূল উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন।
অতঃপর যখন কোনো ব্যক্তি দুনিয়ার রঙিন পর্দার প্রতারণাপূর্ণ বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হয় তখন সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ওঠে
جزاک الله چشم باز کردی
مرا با جانِ جاں ہمراز کردی
'আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন!
আপনি আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে এনেছেন।'
ওই সময় তার অনুভব হয় যে, আমি যাকে প্রিয় মনে করেছিলাম সেটা একটি ধোঁকা ছিল। আসল প্রিয় তো এর থেকেও বহুদূরে।
মোটকথা, সর্বশেষ নবী রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওতের যুগটি ছিল এমন, যখন তাবৎ পৃথিবীর প্রায় সমস্ত মানুষ আল্লাহ, আখেরাত ও পরকালের বিশ্বাসকে পুরোপুরি ভুলে কেবল ইহকালীন জীবনের পেছনে মেতে ছিল। মানুষ আপন অবস্থান ভুলে গিয়ে একটা বুদ্ধিমান প্রাণীস্বর্বস্ব হিসেবে হয়ে রয়েছিল, যে প্রাণী নিজ বুদ্ধিমত্তার বলে অন্য প্রাণীদের উপর রাজত্ব চালাচ্ছিল।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করে তাদের সামনে তাদের আসল আকৃতি ও প্রকৃতি স্পষ্ট করেন এবং এর দাবি ও চাহিদা সম্পর্কে অবহিত করেন। যার সারকথা হলো আল্লাহর পরিচয় লাভ ও তাঁর একনিষ্ঠ দাসত্ব স্বীকার।
যেমনটি পূর্বে বলে এসেছি, পরকালের ধারণা ছাড়া ইহকালের জীবন কখনোই নির্ঝঞ্ঝাট হতে পারে না, এ কারণে তাদের পার্থিব জীবনও নানা রকম বাধা-বিঘ্ন জুলুম-শোষণ, চুরি-ডাকাতি, বদমাশি, বেহায়াপনা ইত্যাদি দ্বারা ছেয়ে গিয়েছিল। এমন ভয়ংকর ভূমি আর জুলুম শোষণে পূর্ণ পরিবেশটিই সংশোধনের জন্য দেওয়া হয়েছিল সায়্যিদুল আম্বিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে।
উপরন্তু তৎকালীন যুগে যদিও পুরো পৃথিবীবাসী আল্লাহ ও আখেরাতকে ভুলে গিয়েছিল, কিন্তু সমাজ সভ্যতা ও শিক্ষা বিবেচনায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলগুলোর আপসের মধ্যে চিত্রে ও চরিত্রে বেশ তারতম্যও ছিল। মিশর, সিরিয়া, হিন্দুস্তান ও চীন প্রমুখ অঞ্চল পার্থিব জ্ঞানবিজ্ঞানে এবং পূর্ববর্তী নবীগণের আনীত সভ্যতার নিভু নিভু হলেও কিছু স্মৃতি ও প্রভাব বহনের বিবেচনায় অন্যান্য ভূখণ্ড থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল। বিশেষত শাম দেশে বনী ইসরাঈলের এত অধিকসংখ্যক নবী প্রেরিত হয়েছিলেন যে, বিলুপ্ত হতে হতেও তাঁদের শিক্ষার কিছু স্মৃতি কিছু প্রভাব সেখানে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা শেষ রাসূলের জন্ম এবং নবুওতের জন্য এ সকল সভ্য ও শিক্ষিত দেশসমূহ থেকে ভিন্ন এমন এক ভূখণ্ড নির্বাচন করলেন, যা না কৃষিনির্ভর ছিল, না ব্যবসা নির্ভর, না শিল্পনির্ভর, না শিক্ষা নির্ভর। বরং ওই ভূমির বাসিন্দাদের বৈশিষ্ট্যই এই ছিল যে, তাদের বলা হতো উম্মী- নিরক্ষর। তাদের মাঝেই তিনি জন্মগ্রহণ করলেন, তাদের মাঝেই তিনি যৌবন লাভ করলেন এবং তাদের মাঝেই তিনি নবী হিসেবে প্রেরিত হলেন। সে কথাই ইরশাদ হয়েছে এভাবে-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ
টিকাঃ
২. সূরা বাকারা, আয়াত ২৫৩
৩. সূরা ইউনুস, আয়াত ৭
📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মী হওয়া তাঁর রিসালাতের মহা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মর্যাদা ছিল
'তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন।'
একজন দক্ষ ও বড় ডাক্তারের কৃতিত্ব তখনই প্রকাশ পায়, যখন তার কোনো মৃতপ্রায় অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসার অবকাশ হয় এবং তিনি সেখানে সফল হন। আরববাসীরা সাধারণত মূর্খ ছিল। কেবল গুটিকয়েক লোক এর ব্যতিক্রম ছিল, যারা শাম ও অন্যান্য দেশ থেকে কিছু শিক্ষা অর্জন করে এসেছিল। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কখনো এই সুযোগ হয়নি যে, কোনো শিক্ষাঙ্গনে গিয়ে কিছুদিন অবস্থান করে সেখান থেকে কিছু শিক্ষা লাভ করবেন।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মী হওয়া তাঁর রিসালাতের মহা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মর্যাদা ছিল
যেহেতু আরবের অধিকাংশ লোক উম্মী ছিল, তাই হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরও প্রধান গুণ ছিল উম্মী হওয়া। একটি বিষয় এখানে প্রণিধানযোগ্য। তা এই যে, উম্মী বলা হয়, যে মানুষ কারও কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তবে এর জন্য এটা অপরিহার্য নয় যে, সে বাস্তবেই জ্ঞানহীন হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা কুরআনের সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সূরা ইকরাতে এটা বলে দিয়েছেন যে, ইলম অর্জনের জন্য যেমন একটি পদ্ধতি পরিচিত ও প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, শিক্ষক এবং কলমের মাধ্যমে তা অর্জন করা যায়। ঠিক তেমনি একটি পদ্ধতি এমনও রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা কাউকে এ সকল মাধ্যম ছাড়া সরাসরি ইলমবা জ্ঞান দান করবেন। এজন্য উল্লিখিত সূরায় عَلَّمَ بِالْقَلَمِ এরপর عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَ বলে দ্বিতীয় প্রকারের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসন্দেহে উম্মী ছিলেন। কোনো শিক্ষক বা উস্তাযের থেকে তিনি কিছুই শিক্ষা গ্রহণ করেননি বটে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা নিজেই তাঁর শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং তাঁকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত ইলম ও জ্ঞানের ভাণ্ডার দান করেছেন।
তাঁর জবান মুবারকে ইলম ও হিকমতের এমন রহস্যাবলি উন্মোচিত হয়েছে, যা শুনে দুনিয়ার জ্ঞানীগুণী ও দার্শনিকগণ হতবাক হয়ে গিয়েছেন। তার দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা স্বতন্ত্র ও সুবৃহৎ এক মুজিযা হয়ে মানুষের সামনে এসেছে। এর শ্রবণকারীর এ কথা বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় নেই যে, এটি হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রচনা নয়; বরং সর্বজ্ঞানী আল্লাহ তাআলার দেওয়া হেদায়েত।
টিকাঃ
৪. সূরা জুমু'আ, আয়াত ২
📄 নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও দীক্ষাদানের বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেবল জ্ঞানের ভাণ্ডারই দেওয়া হয়নি; বরং শিক্ষাদীক্ষার এমন পদ্ধতি দান করা হয়েছে যা অনুসরণ করে তিনি মূর্খ, অবুঝ, আত্মম্ভরি, বদমেজাজি, যুদ্ধংদেহী লোকদেরকেও পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত করেছিলেন। আধ্যাত্মিক এই মুমূর্ষু রোগীগুলো কেবল উপশমই লাভ করেনি; বরং পৃথিবীর অন্য সবার জন্য শুশ্রূষাকারীতেও পরিণত হয়েছে।
পৃথিবীর ন্যায়ানুরাগী অমুসলিম ব্যক্তিরাও আজ পর্যন্ত হযরত আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমাকে রাজনীতি, সুবিচার ও ইনসাফের মানদণ্ড মানতে বাধ্য হয়।
মিস্টার গান্ধীর ওই দিকনির্দেশনা এখনো পর্যন্ত অনেক মানুষের মনে থাকার কথা, যা তিনি তার কংগ্রেসীয় মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন; তাতে তিনি বলেছিলেন, আবু বকর ও উমর এর ন্যায় শাসন করো। তখন এ নিয়ে তারই ধর্মের কিছু হিন্দু লোক আত্মমর্যাদা ও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের মানসে আপত্তি তুলল যে, আপনি হিন্দু সংস্কারবাদীদের মধ্য থেকে কারও নাম কেন নিলেন না? তখন মিস্টার গান্ধী উক্ত আপত্তির জবাবও দিয়েছিলেন স্বীয় ন্যায়ানুরাগ মানসিকতা থেকে এ শব্দ-বাক্যে— 'হিন্দু সংস্কারবাদীদের জীবনবৃত্তান্ত প্রাগৈতিহাসিক যুগের কল্পকাহিনী মাত্র। ইতিহাসে আমি আবু বকর ও উমরের চাইতে উত্তম কোনো শাসনামলের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই না।'
এই আবু বকর, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাও সেই নিরক্ষর সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন।
এখানে ভাবার বিষয় হলো, তাদের এই জ্ঞানগত ও কর্মগত চারিত্রিক সৌন্দর্য কোত্থেকে এল। তাঁরা না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সমাপনকারী ছিলেন, না কোনো অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। তারা স্রেফ নবীগণের নবী, দার্শনিকদের দার্শনিক হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিছুদিনের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, যা-কিছু শিখেছেন সেখান থেকেই শিখেছেন।
হযরত সিদ্দীকে আকবর, ফারুকে আযম, উসমান গনী ও আলী মুর্তাযা রাযিয়াল্লাহু আনহুম তো খেলাফতে রাশেদার সদস্য। এ কারণে সবাই তাদের কথা জানে। কিন্তু যারা ইসলাম-পূর্ব আরব ও ইসলাম- পরবর্তী আরবের অবস্থার মাঝে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করবে, তাদের এটা বলা ছাড়া উপায় থাকবে না যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একেকজন সাহাবী তাঁর স্বতন্ত্র মুজিযা। তাদের জ্ঞানগত, কর্মগত, চরিত্রগত চিত্র আমূল পাল্টে যাওয়া নিঃসন্দেহে মুজিযা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না।