📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা

📄 মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা


আমি পূর্বে দুটি শব্দ ব্যবহার করেছি ১. মতাদর্শ। ২. জীবনব্যবস্থা। মতাদর্শ বলা হয়—যে বিশ্বাস ও চেতনাকে মানুষ সঠিক-সত্য বলে মনে করে এবং যার অধীনে জীবনের উদ্দেশ্যকে পরিচালনা করে। আর জীবনব্যবস্থা বলা হয়—ওই জীবনযাত্রা যার মাধ্যমে উদ্দেশ্য সাধন করা হয়।
এই দুটো বিষয়ের শুদ্ধতা ও ভ্রান্তির উপর পৃথিবীর সকল জাতির শুদ্ধতা ও ভ্রান্তি নির্ভরশীল। যার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা ভ্রান্ত, যে ভুল জিনিসকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছে, তার কর্মপদ্ধতি যতই মজবুত ও যৌক্তিক হোক না কেন, সে ভালো কোনো ফলাফলে পৌঁছতে পারবে না। আর যার মতাদর্শ ও লক্ষ্য সঠিক, কিন্তু কর্মপদ্ধতি ভুল ও অনুপযোগী, তাহলে সেও নিজের বেআমলীর দরুন ওই ফলাফল লাভ করবে না, যা শুদ্ধ বিশ্বাস ও মতাদর্শের কারণে লাভ করতে পারত।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 ইসলামী মতাদর্শের তিনটি মূলনীতি

📄 ইসলামী মতাদর্শের তিনটি মূলনীতি


যে ইসলামী মতাদর্শ নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন, সেটি তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। ১. তাওহীদ (একত্ববাদ)। ২. রিসালত (নবী প্রেরণ)। ৩. আখেরাত (পরকাল)।
তাওহীদের সারকথা হলো—সমস্ত সৃষ্টি জগতের খালিক ও মালিক প্রয়োজন পূরণকারী স্রেফ আল্লাহকে মানতে হবে। তাঁর বিশেষ সিফাতগুলো, যেমন : ইলম, কুদরত, সৃষ্টি, তাকদীর ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো মাখলুককে শরীক করবে না বা তাঁর সমকক্ষ ভাববে না। এই বিশ্বাস রাখবে যে, পৃথিবীতে যা-কিছু ঘটে, সবকিছু তাঁরই ইচ্ছা ও হুকুমে ঘটে। তাঁর হুকুম ছাড়া অণু-পরমাণুও এদিকসেদিক হয় না। সমগ্র পৃথিবীজুড়েই তাঁর রাজত্ব। সর্বত্রে তাঁরই হুকুম ও আইন পালনীয়। এর বিপরীতে অন্য কোনো হুকুম বা আইন পালনীয় নয়; বরং তা পরিত্যাজ্য। তবে তিনি দয়াপরবশ হয়ে মানুষের জন্য বৈধতার বিশাল এক পরিধি রেখে দিয়েছেন, যেখানে মানুষকে নিজ নিজ স্থান-কালের চাহিদানুযায়ী আইনপ্রণয়নের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
যখন তাওহীদের বিশ্বাস মানুষকে এ বার্তা দেয় যে, সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি এবং পালনকর্তা একজনই, তাঁর কথাই শিরোধার্য, তাঁর মর্জিবিরোধী কোনো কাজ মানেই মানবতাবিরোধী কাজ, তখন এ থেকে রিসালাতের বিশ্বাসও আপনা-আপনি সাব্যস্ত হয়। কেননা আল্লাহ তাআলা তো দূরের কথা, কোনো মানুষের পছন্দ-অপছন্দও অন্য মানুষ কেবল বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে জানতে পারে না, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে জানানো হয়। আর এ তো স্পষ্ট যে, খোদায়ী বিধান কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে দেওয়ার পরই জানা সম্ভব। আর মানুষ কখনোই এর উপযুক্ত নয় যে, আল্লাহ তাআলা সরাসরি তাকে সম্বোধন করবেন। এজন্যই রাসূলের “মধ্যস্থতার” প্রয়োজন, যিনি আল্লাহর হুকুম বর্ণনা করবেন এবং সে মোতাবেক আমল করার এমন পদ্ধতি বলে দেবেন, যা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অনুযায়ী হবে। পাশাপাশি তার প্রতিটি কথা ও কাজ আল্লাহ তাআলার হুকুমের মুখপাত্র হবে।
পূর্বের দুই আকীদা থেকে যখন এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহর হুকুমের অনুসরণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত পদ্ধতি অনুযায়ী করা ফরয, এর বিপরীত করা অন্যায। তখন এর মধ্য দিয়ে তৃতীয় বিশ্বাস তথা আখেরাতের বিশ্বাস অবধারিত হয়, যেখানে মানুষের ভালো-মন্দ কর্মের হিসাব হওয়া এবং এর ভিত্তিতে শাস্তি ও পুরস্কার লাভের বিষয়টি যৌক্তিকভাবেও আবশ্যক হয়। নচেৎ হুকুম-আহকাম ও রাসূল প্রেরণ অনর্থক সাব্যস্ত হবে।
মোটকথা, এই তিন মৌলিক বিশ্বাস একটি অপরটির সাথে জড়িত। তিনওটির মূল বুনিয়াদ তাওহীদের বিশ্বাস। এটিই মূলত মানুষের কল্যাণ ও সফলতা, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং স্থিরতা ও স্থিতিশীলতার উৎস। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে যেহেতু ইসলামী আকীদার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ মুখ্য নয়, তাই সংক্ষেপে এটুকুই যথেষ্ট মনে করছি।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 জীবনব্যবস্থা

📄 জীবনব্যবস্থা


এটা খুবই স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াকে যে জীবনব্যবস্থা দান করেছেন, সেটি তাওহীদের বিশ্বাস ও আল্লাহর ইবাদতের ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি তার ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতার মধ্যে ওই সকল জীবন-উপকরণও থাকতে হবে, যা দুনিয়াতে একজন মানুষের সুস্থ ও শান্তিতে সম্মানের সাথে জীবনযাপন করার জন্য প্রয়োজন হয়। যেন ইসলামী জিন্দেগী এমন এক শৃঙ্খল, যার এক মাথা সৃষ্টি জগতের প্রতিপালকের কাছে, আরেক মাথা সৃষ্টিজগতে। এই শৃঙ্খল ও সম্পর্ককেই পরিভাষায় দ্বীন বা ধর্ম বলা হয়।

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 স্বভাবজাত ধর্ম হতে পারে সেটিই, যা দ্বীন-দুনিয়া এবং ইহ ও পরকালের সফলতার নিশ্চয়তা দান করে

📄 স্বভাবজাত ধর্ম হতে পারে সেটিই, যা দ্বীন-দুনিয়া এবং ইহ ও পরকালের সফলতার নিশ্চয়তা দান করে


সঠিক ও স্বভাবজাত ধর্ম তো সেটিই, যা খালিক ও মাখলুকের উভয়ের হককে আপন আপন স্থানে পূর্ণ করতে পারে। যার মাধ্যমে মানুষ একই সময়ে আল্লাহ তাআলার সাথেও পূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, আবার সমস্ত মাখলুকের সাথেও। অর্থাৎ নিজ সত্তা, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রয়োজন সম্পাদন করতে পারে এবং আপন মালিক ও সৃষ্টিকর্তাকেও প্রতি কদমে সন্তুষ্ট রাখতে পারে।
হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সমস্ত নবী-রাসূল প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল খালিক ও মাখলুকের মধ্যকার এই সম্পর্ককে দৃঢ় ও মজবুত করা এবং মাখলুককে এই জীবনব্যবস্থার অনুসারী বানানো। সমস্ত আসমানীগ্রন্থ এই জীবনপন্থার ব্যাখ্যা ও পূর্ণতা দানের জন্যই অবতীর্ণ হয়েছিল। এটাকেই বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য নবীগণ প্রেরিত হয়েছিলেন। এমন কোনো আসমানী ধর্ম ও শরীআত নেই, যাতে আল্লাহ তাআলা ও সৃষ্টিজগত উভয়ের অধিকার আদায় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ও বান্দার সাথে সম্পর্কের মাঝে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করা হয়নি। এ দুটো বিষয়কে আমরা ভিন্ন শব্দে মাআশ (ইহকালীন জীবন) ও মাআদ (পরকালীন জীবন) বলে ব্যক্ত করতে পারি।
প্রত্যেক নবী ও রাসূল নিজ নিজ যুগে মাআশ ও মাআদ উভয়টির সংরক্ষণ ও সফলতা নিশ্চিতকরণের যিম্মাদার হয়ে আগমন করেন। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে—মাআদ অর্থাৎ আখেরাতের জিন্দেগী থেকে যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে মাআশ তথা দুনিয়াবী জিন্দেগীও নির্ঝঞ্ঝাট ও আনন্দময় থাকে না। ঠিক তেমনি মাআশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাআদ এর ফিকিরও সফল হয় না। খ্রিষ্টানদের ধর্মে যেই রাহবানিয়াত (দুনিয়াবিমুখতা) শিক্ষা দেওয়া হয়, তা মূলত খ্রিষ্টানদেরই নিজস্ব আবিষ্কার। না আল্লাহ তাআলা এর নির্দেশ দিয়েছেন, না তাঁর রাসূল হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এমনটি বলেছেন। কুরআনুল কারীম স্পষ্টভাষায় বলেছে,
وَرَهْبَانِيَّةَ ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَهَا عَلَيْهِمْ
'আর রাহবানিয়‍্যাতের যে বিষয়টা, তা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের উপর তা বাধ্যতামূলক করিনি।”

টিকাঃ
১. সূরা হাদীদ, আয়াত ২৭.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00